ছবি : সংগৃহীত
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করা মানুষের নিত্য অভ্যাস। শিশু থেকে বয়স্ক– সব বয়সী মানুষের ব্যবহৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় টুথপেস্ট নিয়ে এবার উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে।
দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টুথপেস্টের প্রায় চারটির মধ্যে তিনটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের নয়, শিশুদের জন্য বাজারজাত টুথপেস্টেও মিলেছে এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা।
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) এক বছরের গবেষণায় বাজারের ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করে দেখেছে, এর মধ্যে ২৬টিতে, অর্থাৎ ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। গবেষণায় প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। রোববার রাজধানীর লালমাটিয়ায় এসডোর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক ইন টুথপেস্ট’ শীর্ষক গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়।
সংস্থাটি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশে বাজারজাত টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে এটিই প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণা। গবেষণার উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডকে লক্ষ্যবস্তু করা নয়; বরং ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণে ব্যবহারযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্যভান্ডার তৈরি করা।
এক বছরে সংগ্রহ ও পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ
গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে গত জুন পর্যন্ত। এই সময় দেশের বিভিন্ন সুপারশপ, খুচরা দোকান ও পাইকারি বাজার থেকে স্থানীয় ও আমদানি করা ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি (ইএইচই) গবেষণাগারে এসব নমুনার বিশ্লেষণ করা হয়। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকার দুই হাজার ৭৬০ জন ভোক্তার ওপর চালানো হয় একটি জরিপ।
পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে উৎপাদিত ২৫ নমুনার মধ্যে ২২টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা দুটি নমুনার দুটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক মিলেছে। থাইল্যান্ডের দুটি নমুনার একটিতে এবং ভারতের পাঁচটি নমুনার একটিতে এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
কোন টুথপেস্টে সবচেয়ে বেশি
গবেষণায় সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে মেডিপ্লাস ফ্লুরাইড জেল টুথপেস্টে। প্রতি ১০০ গ্রামে এতে ৩২০টি কণা শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া ক্লোজআপ রেড হট ও ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশে ১৬০টি করে, কোদোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলায় ১৪০টি, সিগন্যাল গ্রিন টিতে ১২০টি, পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্ট ও হিমালয়া কমপ্লিট কেয়ারে ১০০টি করে এবং সেনসোডাইন ফ্রেশ মিন্টে ৮০টি কণা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া পেপসোডেন্ট সেনসিটিভ এক্সপার্ট, হোয়াইট প্লাস রেড, হোয়াইট প্লাস প্রো সেনসিটিভ জেল, মেরিল বেবি স্ট্রবেরি, সিগন্যাল হোয়াইটেনিং ও মেডিপ্লাস টিজিপি ফর্মুলা টুথপেস্টে ৬০টি করে কণা শনাক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে এএমপিএম হার্বাল, মেডিপ্লাস ডিএস, পেপসোডেন্ট জার্মিচেক+, মেরিল বেবি অরেঞ্জ, ম্যাজিক হারবাল, মেসওয়াক ও ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশ স্যাশেতে ৪০টি করে কণা পাওয়া গেছে। ডেন্টিন জেল, পেপসোডেন্ট কিডস অরেঞ্জ, ক্লোজআপ লেমন সি সল্ট, ব্রাশআপ হোয়াইটেনিং জেল এবং হোয়াইট প্লাস প্রো সেনসিটিভে পাওয়া গেছে ২০টি করে কণা।
মাইক্রোপ্লাস্টিক মেলেনি আটটিতে
গবেষণায় আটটি টুথপেস্টে কোনো শনাক্তযোগ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি। এগুলো হলো জেনফ্রেশ, প্যারাসুট জাস্ট ফর বেবি (ম্যাঙ্গো), ক্লোজআপ রেড-হট জিংক ফ্রেশ টেকনোলজি, প্যারোডনট্যাক্স এক্সপার্ট গাম কেয়ার, সেনসোডাইন ফ্রেশ জেল, কোলগেট ম্যাক্সফ্রেশ, কোলগেট অ্যাক্টিভ সল্ট এবং কোদোমো অরেঞ্জ।
শিশুদের টুথপেস্টও মুক্ত নয়
শিশুদের জন্য বাজারজাত করা ছয়টি টুথপেস্টও গবেষণার আওতায় আনা হয়। এর মধ্যে চারটিতে অর্থাৎ, প্রায় ৬৭ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এসব টুথপেস্টে প্রতি ১০০ গ্রামে ২০ থেকে ১৪০টি পর্যন্ত কণা শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ১৪০টি কণা পাওয়া যায় কোদোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলায়। মেরিল বেবি স্ট্রবেরিতে পাওয়া গেছে ৬০টি, মেরিল বেবি অরেঞ্জে ৪০টি এবং পেপসোডেন্ট কিডস অরেঞ্জে ২০টি কণা। তবে প্যারাসুট জাস্ট ফর বেবি ও কোদোমো অরেঞ্জে কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি।
মোড়কে নেই কোনো তথ্য
গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। পরীক্ষা করা কোনো টুথপেস্টের মোড়কে মাইক্রোপ্লাস্টিক কিংবা ব্যবহৃত সিনথেটিক পলিমারের তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। এসডো বলছে, এর ফলে ভোক্তারা সচেতনভাবে পণ্য বেছে নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জন্যও বাজার তদারকি কঠিন হয়ে পড়ছে।
সংবাদ সম্মেলনে এসডোর মহাসচিব ও সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, গবেষণায় ব্যবহৃত সব নমুনা সরাসরি সুপারশপ, খুচরা বিক্রেতা ও বাজার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে নকল বা ভেজাল পণ্য গবেষণার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ ছিল না। তিনি বলেন, প্রতিদিন ব্যবহৃত একটি পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকতে পারে এ বিষয়টি অধিকাংশ ভোক্তারই অজানা। তাই টুথপেস্টের উপাদান লেবেলে উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং নিয়ন্ত্রক তদারকি জোরদার করা জরুরি।
ভোক্তাদের সচেতনতা সীমিত
গবেষণার অংশ হিসেবে পরিচালিত ভোক্তা জরিপে দেখা গেছে, টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা এখনও খুবই সীমিত। জরিপে অংশ নেওয়া ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা আগে কখনও এ বিষয়ে শোনেননি। ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ বলেছেন, শুনেছেন তবে বিস্তারিত জানেন না। মাত্র ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা এ বিষয়ে সচেতন। জরিপে আরও দেখা গেছে, ৮২ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা নিয়মিত টুথপেস্ট ব্যবহার করেন এবং ৯০ দশমিক ৬ শতাংশ নিয়মিত টুথব্রাশ ব্যবহার করেন। ৫৬ দশমিক ৯ শতাংশ দিনে একবার এবং ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ দিনে দুইবার দাঁত ব্রাশ করেন।
টুথপেস্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হিসেবে উঠে এসেছে মেডিপ্লাস। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা এই ব্র্যান্ড ব্যবহার করেন। এর পর রয়েছে ক্লোজআপ ও পেপসোডেন্ট, যেগুলো ব্যবহার করেন ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ করে উত্তরদাতা। কোলগেট ব্যবহার করেন ১১ দশমিক ৩ শতাংশ।
মান সংশোধনের উদ্যোগ নেবে বিএসটিআই
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটের (বিএসটিআই) উপপরিচালক (রসায়ন) মো. মনজুরুল করিম বলেন, বর্তমানে টুথপেস্টের জাতীয় মানে ৪০টি অনুমোদিত উপাদান এবং কণার আকারের সীমা নির্ধারণ রয়েছে। কিছু উৎপাদক কম খরচে ওজন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার করতে পারেন, যা একটি খারাপ চর্চা। তিনি জানান, ২০১৯ সাল থেকেই প্রসাধনী পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারের বিষয়টি বিএসটিআইয়ের নজরে রয়েছে। ইতোমধ্যে ফেসওয়াশ ও ফেসপ্যাকের মান সংশোধন করা হয়েছে। এখন টুথপেস্টের মানেও একই ধরনের সংশোধনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
নীতিমালা নেই, বাধ্যতামূলক নয় পরীক্ষা
এসডো বলছে, বাংলাদেশে বর্তমানে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের জন্য কোনো জাতীয় মানদণ্ড, অনুমোদিত সীমা, পরীক্ষার পদ্ধতি কিংবা বাধ্যতামূলক লেবেলিং নীতি নেই। ফলে উৎপাদকরা এ বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশে বাধ্য নন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থারও কার্যকর নজরদারির সুযোগ সীমিত।
সংস্থাটির চেয়ারম্যান সৈয়দ মারগুব মোরশেদ বলেন, বিশ্বাসযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতেই কার্যকর জননীতি প্রণয়ন করা উচিত। এই গবেষণা টুথপেস্টের মানদণ্ড উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা জোরদার এবং ভোক্তা ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাস্থ্য ও পরিবেশে সম্ভাব্য ঝুঁকি
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দাঁত ব্রাশের সময় টুথপেস্টের সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক বর্জ্য পানির মাধ্যমে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তা নদী, জলাশয় ও খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে। খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমে এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মানবদেহেও প্রবেশের শঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শের সঙ্গে শ্বাসতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, হৃদরোগ, স্নায়ুতন্ত্র ও প্রজননস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এসব প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণার ফল প্রকাশের পর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় একটি পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শুধু ভোক্তার স্বাস্থ্য নয়, পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। তাই দ্রুত জাতীয় মানদণ্ড প্রণয়ন, বাধ্যতামূলক লেবেলিং, নিয়মিত পরীক্ষাগার তদারকি এবং উৎপাদকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা বলেন, এই গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক শূন্যতা পূরণ হয়েছে। এর ফলাফল ভবিষ্যতে ওরাল কেয়ার পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মানদণ্ড নির্ধারণ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং তথ্যভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়নে সহায়ক হবে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক লাইন ডিরেক্টর দন্ত চিকিৎসক অধ্যাপক মো. মোশাররফ হোসেন খন্দকার বলেন, মুখ পরিষ্কারে ব্যবহৃত পণ্যগুলোতে এ ধরনের ক্ষতিকর উপাদান থাকা উচিত নয়। দাঁতের সুরক্ষায় ফ্লোরাইড, কার্বনেট ও সিলিকাকে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মনে করা হয়। মাইক্রোপ্লাস্টিক তার ঘর্ষণ ক্ষমতার কারণে দাঁত সাদা করতে পারলেও, এটি দাঁতের এনামেলের ওপর বিরূপ ও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মাহমুদা তামান্না খান বলেন, গবেষণায় যে বিষয়টি উন্মোচিত করেছি, এর ওপর ভিত্তি করে আমরা কাজ করতে আগ্রহী। বিএসটিআইকে সব ধরনের সহায়তা দিতে আমরা প্রস্তুত। সরকারি সংস্থা ও এনজিওগুলো একযোগে কাজ করলেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
এই নির্বাসন প্রক্রিয়াটি ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে সম্পন্ন করা হয়। বাগডোগরায়, বাংলাদেশি নাগরিকদের বিএসএফ সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।(ছবি-দ্য প্রিন্ট)
‘অবৈধভাবে’ বসবাসের অভিযোগে ভারতের কাশ্মীর থেকে অন্তত ১৫০ ‘বাংলাদেশিকে’ আটকের পর তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর খবর দিয়েছে ভারতের একটি সংবাদমাধ্যম। দ্য প্রিন্টের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সোমবার ওই বাংলাদেশিদের আটকের পর তাদের ফেরত পাঠাতে ভারতীয় বিমান বাহিনীর বিমানে করে পশ্চিমবঙ্গের বাগডোগরা বিমানবন্দরে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ভারতের কাশ্মীর থেকে এটিই প্রথম কোনো প্রকাশ্যে নথিভুক্ত বৃহৎ পরিসরের ফেরত পাঠানোর ঘটনা। দ্য প্রিন্ট লিখেছে, ভারতের সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী জম্মু ও কাশ্মীরে মোট ৫০৪ জন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন। আটক ১৫০ জনও তাদেরই অংশ।
পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে খবরে বলা হয়েছে, “কাশ্মীরে কর্মরত শ্রমিকদের নিবন্ধনের জন্য আধার কার্ড জমা দিতে বলা হয়েছিল। সে সময় আধার কার্ডের তথ্যে গরমিল বা অসঙ্গতি ধরা পড়লে বিষয়টি বাংলাদেশে পাঠিয়ে তাদের জাতীয়তা নিশ্চিত করা হয়। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ‘ফরেনার্স অ্যাক্ট’ এর অধীনে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে দুটি ট্রানজিট পয়েন্ট আছে। একটি মালদা, আরেকটি বাগডোগরা। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের পাহারা দিয়ে সীমান্ত পার করে দিয়েছে। তার আগে ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে তাদের পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে আসা হয়।” তবে মালদা নাকি বাগডোগরা, ঠিক কোন সীমান্ত দিয়ে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি তিনি।
পশ্চিমবঙ্গে দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমার একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বাগডোগরা। এর অপরপাশে অর্থাৎ দক্ষিণ দিকে বাংলাদেশের পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা সীমান্ত। অন্যদিকে মালদা পশ্চিমবঙ্গে উত্তরাঞ্চলীয় জেলা। এর অপরপাশে বাংলাদেশের রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সীমান্ত। দ্য প্রিন্ট বলছে, জনমিতিগত পরিবর্তন রুখতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি প্রকাশ প্রভাকর নাভালকারের নেতৃত্বে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি সম্প্রতি জম্মু ও কাশ্মীর পরিদর্শনের কয়েক মাস পর এই বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানো হলো। কমিটির নথিতে জম্মু ও কাশ্মীরে মোট ৫০৪ জন বাংলাদেশি নাগরিকের উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়, যার মধ্যে ৪৬ জন জম্মুতে এবং বাকি ৪৫৮ জন কাশ্মীরে অবস্থান করছেন। জম্মু ও কাশ্মীর প্রশাসন আটক বাংলাদেশিদের আরও একটি দলকে ৭ অক্টোবর ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ মো. কায়েস বলেন, “আমরা এ ধরনের খবর জেনেছি বিভিন্ন মাধ্যমে। তবে কোনোভাবেই যেন পুশইন না হয় সে ব্যাপারে আমরা সতর্ক আগে থেকেই আছি। এ খবর পাওয়ার পর সীমান্তে সতর্কতা আরও বাড়ানো হয়েছে। একই সাথে গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি টহল বাড়িয়েছি।” তারা সকলের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করছেন, বলেন বিজিবির এই কর্মকর্তা।
ছবি : সংগৃহীত
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও নিয়োগপত্র বঞ্চিত হয়েছেন ৮৩ জন। ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া প্রার্থীদের মধ্যে অনেকে ধাপে ধাপে নিয়োগপত্র পেলেও শেষ পর্যন্ত তারা বঞ্চিতই রয়ে গেছেন। পাশাপাশি নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হলেও চাকরিতে যোগ দেননি এমন প্রার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৪৭১ জন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেননি। তারা অন্য কোথাও চাকরি করছেন বলে জানা গেছে। আর বড় একটি সংখ্যা নিয়োগপত্র নিয়েও যোগদান করেননি।
আজ মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিএ) পলিসি অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগের কর্মকর্তারা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ‘সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা, ২০২৫’ দুই ধাপে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এতে মোট শূন্যপদ ছিল ১৪ হাজার ৩৮৫টি। এসব পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছিল ১০ লাখ ৮০ হাজার ৮০টি। সে হিসাবে গড়ে প্রতিটি পদের বিপরীতে লড়াই করেন প্রায় ৭৫ জন চাকরিপ্রার্থী।
অধিদপ্তরের তথ্যমতে, প্রথম ধাপে (রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগ) ১০ হাজার ২১৯টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে ৭ লাখ ৪৫ হাজার ৯২৯টি। দ্বিতীয় ধাপে (ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ) ৪ হাজার ১৬৬টি পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ১৫১টি।
এদিকে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ৬৯ হাজার ২৬৫ জন প্রার্থী। তাদের মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করা হয়। গত ৮ ফেব্রুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীকে নিয়োগে চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ সেপ্টেম্বর জেলাভিত্তিক নিয়োগের আদেশ জারি করা হয়। কয়েক ধাপে জারি করা এ আদেশের পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তাতে কাগজপত্র জমা দেন ১৩ হাজার ৮৩১ জন। বাকিদের মধ্যে ৫৫২ জন কাগজপত্র জমা দেননি। আরেকজন মারা গেছেন।
এদিকে কাগজপত্র জমা দিয়ে নিয়োগপত্র হাতে পান ১৩ হাজার ৭৪৮ জন। তাদের মধ্যে নির্ধারিত সময়ে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন ১২ হাজার ৮৩০ জন।
হিসাব অনুযায়ী- কাগজপত্র জমা দিয়ে নিয়োগপত্র হাতে পেয়েও সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান করেননি ৯১৮ জন। আর কাগজপত্র জমা দেননি ৫৫৩ জন। সেই হিসাবে ১ হাজার ৪৭১ জন চাকরিতে যোগদানে আগ্রহ দেখাননি।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) আবদুর রহিম বলেন, অনেকে কাগজপত্র জমা দেননি। তারা কোনো আগ্রহই দেখাননি। আবার অনেকে নিয়োগপত্র হাতে পেয়েও যোগদান করেননি। হয়তো তাদের অন্যত্র চাকরি হয়েছে। সেটিকে তারা গুরুত্ব দিয়েছেন। সব সরকারি নিয়োগে এমন ঘটনা ঘটে থাকে।
তিনি বলেন, ‘কিন্তু সহকারী শিক্ষক পদে ১ হাজার ৪৭১ জন যোগ না দেওয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ আমাদের এতবড় নিয়োগ প্রক্রিয়া বারবার চালানো কষ্টসাধ্য। এর সঙ্গে সরকারের যে বাড়তি খরচ, সে বিষয়টিও রয়েছে। পাশাপাশি পদ শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট পড়বে। আমরা শিগগির আরেকটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছি। সেটি হয়ে গেলে আর সংকট থাকবে না।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এমনভাবে পুনঃস্থাপন করা হবে যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার বা সংসদ চাইলেই তা সহজে বাতিল করতে না পারে। ভবিষ্যতে এটি সরাতে হলে জনগণের মতামত নিতে ‘গণভোট’-এর প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ। আজ মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান।
এদিন বৈঠকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে কমিটি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরানো প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, উচ্চ আদালতের রায়ের বিষয়গুলো সংবিধান সংশোধনীতে প্রতিফলিত হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আসতে পারে, তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বিরোধী দলসহ বিভিন্ন পক্ষের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে রাষ্ট্রপতি যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে পারবেন না- সে বিষয়ে কমিটির সুস্পষ্ট মতামত রয়েছে।
বৈঠকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শহীদ পরিবার ও আহতদের পক্ষ থেকে যেসব দাবি এসেছে, তা বৈঠকে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্রে থাকা অনেক বিষয় রাজনৈতিক দলগুলোও স্বীকার করেছে। এসব বিষয় সংবিধানে যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। এক্ষেত্রে তফসিলে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে জুলাই যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শেখ হাসিনাসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে সরকার আন্তরিক। বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। সরকার অন্যান্য মামলার বিষয়গুলোও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সনদ যেভাবে স্বাক্ষর হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে যাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত রয়েছে, সেগুলো বাদ দিয়ে তা বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সবার মতামতই ধারণ করার চেষ্টা করবে বিশেষ কমিটি।
সংবিধান সংশোধনের দাবিতে বিভিন্ন পক্ষের লংমার্চ কর্মসূচি প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, লংমার্চ করা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। যে কেউ তা করতে পারেন। তবে লংমার্চ বা অন্য কোনো কর্মসূচির মাধ্যমে তো আর সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব নয়। সংবিধান সংশোধন করতে হলে অবশ্যই সংসদীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
কানাডার বিনিয়োগ বৃদ্ধির আহ্বান রাষ্ট্রপতির
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশে কানাডার বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধির জন্য দেশটির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আজ মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বঙ্গভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে রাষ্ট্রপতি এ আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম বাসসকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতি গণতন্ত্র চর্চায় কানাডার দীর্ঘ ঐতিহ্যের প্রশংসা করেন এবং বাংলাদেশেও এক্ষেত্রে কানাডার সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে গণতন্ত্র ও সংসদীয় রীতির অনুপস্থিতির কারণে বর্তমান সরকারকে বেগ পেতে হচ্ছে এবং সরকার গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে।
এ সময় কানাডার হাইকমিশনার জানান, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ বার্ষিক চার বিলিয়ন কানাডীয় ডলার ছাড়িয়েছে এবং এক্ষেত্রে বাণিজ্য সম্প্রসারণের আরও সুযোগ রয়েছে।
এ সময় রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, সার, আইটি, আউটসোর্সিংসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অধিকতর সহযোগিতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান।
এ সময় কানাডার হাইকমিশনার দেশটির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর আসন্ন বাংলাদেশ সফরের বিষয়টি রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন।
একইসাথে তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে কানাডা সরকারের সহযোগিতার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, কানাডা সরকার এ পর্যন্ত প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা প্রদান করেছে।
অব্যাহত সহযোগিতার জন্য রাষ্ট্রপতি কানাডা সরকারকে ধন্যবাদ জানান এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে স্বেচ্ছায় ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তনে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টিতে কানাডাকে কার্যকর ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান।
তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে, বিশেষ করে কারিগরি, প্রযুক্তি, নার্সিং ও চিকিৎসা খাতে কানাডার সহযোগিতা বৃদ্ধির অনুরোধ জানান।
রাষ্ট্রপতি বলেন, এক লাখেরও অধিক বাংলাদেশি কানাডার উন্নয়নে অবদান রাখছে।
সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতির সচিবগণ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া কানাডার পক্ষে রাজনৈতিক কাউন্সেলর মার্কাস ডেভিস উপস্থিত ছিলেন।
৭ নভেম্বর ছুটি ঘোষণা
‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে ৭ নভেম্বর সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। একই সঙ্গে দিনটিকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস উদযাপনসংক্রান্ত পরিপত্রে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গতকাল সোমবার (০৫ অক্টোবর) বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত ২৩তম মন্ত্রিসভা বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর প্রেস ব্রিফিংয়ে বলা হয়, প্রতি বছর ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’-এ সাধারণ ছুটি থাকবে। এদিনটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস উদ্যাপনসংক্রান্ত পরিপত্রে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হবে।
অন্যদিকে, আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকার নির্বাহী আদেশে ২২ অক্টোবর ছুটি ঘোষণা করেছে। এর ফলে দুর্গাপূজায় থাকছে টানা পাঁচদিনের বন্ধ। তবে, ২২ অক্টোবরের এই ছুটির পরিবর্তে দেশের সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ১৭ অক্টোবর খোলা থাকবে।
সরকারি ছুটির পূর্বনির্ধারিত তালিকায় ২০ ও ২১ অক্টোবর ছুটি ছিল। ২২ অক্টোবর অফিস খোলার কথা থাকলেও নতুন সিদ্ধান্তে ওই দিনও ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এর পরের দুই দিন ২৩ ও ২৪ অক্টোবর যথাক্রমে শুক্রবার ও শনিবার। ফলে ২০ অক্টোবর থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিন ছুটি ভোগ করবেন সরকারি চাকরিজীবীরা।
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত রয়েছে। আজ মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। যা চলতি বছরে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু।
গত সোমবার একদিনে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮১। আজ মঙ্গলবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধী টিকা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার চিন্তাভাবনা করছে সরকার। তবে এই মুহূর্তে ডেঙ্গুর টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২৮ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৯৬ জন। আর জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯০ হাজার ৩৫৬ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১০ জনের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার দুজন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার একজন, বরিশাল বিভাগের দুজন, খুলনা বিভাগের তিনজন, রাজশাহী বিভাগের একজন এবং ঢাকা বিভাগের (সিটি করপোরেশনের বাইরে) একজন রয়েছেন।
নতুন আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে (ঢাকা সিটি করপোরেশনের বাইরে), ৪৮০ জন। এ ছাড়া খুলনা বিভাগে ৩০২, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৪২, বরিশাল বিভাগে ২০৩, রাজশাহী বিভাগে ১৯৯, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৯৪, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৮৭, ময়মনসিংহ বিভাগে ৯৬, রংপুর বিভাগে ৭৫ এবং সিলেট বিভাগে ১৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ নারী।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কমাতে দীর্ঘমেয়াদে টিকা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সরকার চিন্তাভাবনা করছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। তবে এখনই দেশে ডেঙ্গুর টিকা দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানান তিনি। রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অডিটরিয়ামে মঙ্গলবার ‘ডেঙ্গু সংকট মোকাবিলায় করণীয়’ শীর্ষক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) এ সেমিনারের আয়োজন করে।
ডা. এম এ মুহিত বলেন, দীর্ঘমেয়াদে ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিশ্বে বর্তমানে কয়েকটি ক্যান্ডিডেট ডেঙ্গু ভ্যাকসিন রয়েছে। বাংলাদেশেও এ নিয়ে চিন্তাভাবনা ও আলোচনা চলছে। তবে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও কাজ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
সম্প্রতি জাপান সফরের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জাপানেও একটি ক্যান্ডিডেট ডেঙ্গু ভ্যাকসিন রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টদের আলোচনা চলছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর দাবি, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর সব ধরনের ভ্যারিয়েন্টই দেখা যাচ্ছে। তিনি এটিকে ‘ইউনিক সায়েন্টিফিক ফাইন্ডিং’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কমাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। তাঁর মতে, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ প্রয়োজন। ডা. এম এ মুহিত বলেন, মৃত্যুর হার ও আক্রান্তের সংখ্যা কমাতে হলে প্রথমেই প্রতিরোধের জন্য কাজ করতে হবে। শুধু সরকার বা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পুরো দেশ পরিষ্কার রাখা সম্ভব নয়। এ জন্য জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। তিনি জানান, পাড়া-মহল্লা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো মশার লার্ভা ধ্বংস ও মশা নিধনে কাজ করছে।
এ বছর ডেঙ্গু মোকাবিলায় আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। বলেন, অতীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হওয়ার পর সংবাদ প্রকাশ হলে সরকারের পক্ষ থেকে তৎপরতা শুরু হতো। এবার পরিস্থিতি তৈরির প্রায় তিন মাস আগে থেকেই পরিকল্পনা ও কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর উন্নত ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় সোসাইটি অব মেডিসিনের সহযোগিতায় একটি ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন প্রচার করা হচ্ছে। গত দুই মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় ২ হাজার চিকিৎসককে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা বিষয়ে হালনাগাদ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
ডা. এম এ মুহিত বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে প্রতিরোধ, দ্রুত রোগ নির্ণয়, দ্রুত রেফারেল এবং হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে জনগণ ও পেশাজীবীদের সম্পৃক্ত করে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা চলছে।
সেমিনারে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান তার উপস্থাপিত প্রবন্ধে বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় বড় চ্যালেঞ্জ হলো রোগীর অতিরিক্ত চাপ, সীমিত জনবল ও হাসপাতাল সুবিধা, বিলম্বিত রোগ শনাক্তকরণ এবং গুরুতর রোগীর দ্রুত অবনতি।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীকে নিয়মিত ও ঘন ঘন পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সময়মতো সিবিসি ও হেমাটোক্রিট পরীক্ষা এবং সতর্কতার সঙ্গে ফ্লুইড ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু প্লেটলেটের সংখ্যার ওপর গুরুত্ব না দিয়ে রোগীর সামগ্রিক ক্লিনিক্যাল অবস্থা মূল্যায়ন করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক, স্টেরয়েড ও অতিরিক্ত ফ্লুইড দেওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
ডেঙ্গু চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়াতে ডেডিকেটেড ডেঙ্গু ওয়ার্ড, পর্যাপ্ত আইসিইউ ও এইচডিইউ, দক্ষ জনবল, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
নিপসমের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসরিন সুলতানা তাঁর প্রবন্ধে বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশা নিধন যথেষ্ট নয়; এর জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ডেঙ্গুর সংক্রমণ মশা, ভাইরাস, মানুষের আচরণ, পরিবেশ, জলবায়ু ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি বলেন, ফগিংয়ের মাধ্যমে সাময়িকভাবে প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও ডিম ও লার্ভা ধ্বংস করা যায় না। তাই পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকেও মশার কামড় থেকে নিরাপদ রাখার পরামর্শ দেন তিনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী আন্তঃখাত সমন্বয়, সামাজিক সম্পৃক্ততা ও জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা বলেন, প্রতি সপ্তাহে অন্তত পাঁচ মিনিট বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী আগাম সতর্কতা এবং টিকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ। ড্যাবের মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিলসহ সংগঠনটির নেতারা বক্তব্য দেন।