রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তার হত্যাকাণ্ড ঘিরে ভয়াবহ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় ঘাতক সোহেল রানা আদালতে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
জবানবন্দিতে দ্বিতীয় শ্রেণির এই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা এবং তার নিথর দেহ থেকে মাথা ধারালো চাকু দিয়ে আলাদা করাসহ ছোট্ট শিশুটির শরীরের ওপর স্বামী-স্ত্রীর নৃশংসতার লোমহর্ষক কাহিনি উঠে এসেছে।
জবানবন্দিতে সোহেল রানা বলেন, দরজা খোলার পর মেয়েটিকে দেখে তার বিকৃত যৌন লালসা জেগে ওঠে। ওই সময় ইয়াবা আসক্ত হওয়ায় মেয়েটিকে ডেকে ঘরের বাথরুমে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়। মেয়েটি তার বাবা-মাকে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়ার কথা বললে গোটা ঘটনা ফাঁস হওয়ার আতঙ্কে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। একপর্যায়ে লাশ গুমে সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন রানার স্ত্রী।
বুধবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন।
আদালতে জবানবন্দিতে সোহেল রানা বলেন, তারা একই ভবনে পাশাপাশি কক্ষে থাকতেন। শিশুটির পরিবারসহ তিনটি পরিবারের বাস ছিল একই তলার পাশাপাশি। ঘটনার দিন সকাল ৯টার দিকে শিশুটিকে দেখে ইয়াবা আসক্ত সোহেলের মধ্যে বিকৃত যৌন লালসা তৈরি হয়। সুযোগ বুঝে শিশুটিকে নিজের কক্ষে ডেকে নেয় সে। পরে জোর করে বাথরুমে নিয়ে শিশুটির ওপর যৌন নির্যাতন চালিয়ে ধর্ষণ করে।
সোহেল জানায়, ঘটনার পর শিশুটি তার মা-বাবাকে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়ার কথা বললে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে সোহেল। নিজের অপরাধ ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় একপর্যায়ে শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডের পর সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার বিষয়টি জানতে পারেন। পরে স্বামীকে বাঁচাতে লাশ গোপন করার পরিকল্পনা করেন। লাশ গুম করতে তার মাথা ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে গলা থেকে আলাদা করে ফেলা হয়।
এছাড়া তার যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করা হয় এবং দুই হাত কাঁধের কাছ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করা হয়। এরপর লাশ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখা হয়। এ সময় মেয়েটির মা দরজায় নক করছিলেন। তখন মূল আসামি সোহেল যাতে পালাতে পারে, সেই সুযোগ করে দিতে স্ত্রী স্বপ্না দীর্ঘক্ষণ দরজা বন্ধ রাখেন। সোহেল জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যাওয়ার পর স্বপ্না দরজা খোলেন। পুরো প্রক্রিয়াতেই সোহেলকে সহযোগিতা করেন তিনি।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে একই ভবনের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার কৌশলে তার মেয়েকে নিজেদের কক্ষে নিয়ে যায়। পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে অভিযুক্তদের কক্ষের সামনে মেয়ের উপস্থিতি টের পেয়ে ডাকাডাকি করা হয়। কোনো সাড়া না পেয়ে পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। পরে শয়নকক্ষের মেঝেতে তার মেয়ের মস্তকবিহীন লাশ ও বিচ্ছিন্ন মাথা পাওয়া যায়।
এজাহারে বলা হয়, শিশুটিকে কক্ষে নেওয়ার সময় সোহেলের সঙ্গে অজ্ঞাতপরিচয় আরও এক ব্যক্তি ছিল।
ডিএমপির যুগ্ম–কমিশনার তোফায়েল আহমেদ মিয়া ও এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
ঢাকায় ককটেল বিস্ফোরণ নিয়ে মন্তব্যের সূত্র ধরে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত বলে মনে করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম–কমিশনার তোফায়েল আহমেদ মিয়া। শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থেকে ককটেল তৈরির সরঞ্জাম ও ৯ হাজার মুখোশ উদ্ধার এবং একজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানাতে ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সম্প্রতি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা তো তিনটি দাবিতে রাজপথে আছি। আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে বাদ দেওয়া, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাইয়ের ঘটনার বিচার। এই দাবিগুলো সরকার মানছে না! দাবিগুলো মানলে তো ককটেল আর ফুটবে না ঢাকা শহরে।’
এ প্রসঙ্গ টেনে এক সাংবাদিক পুলিশের বক্তব্য জানতে চান। জবাবে যুগ্ম–কমিশনার বলেন, এটা অবশ্যই আমার কাছে মনে হয় যে, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত। তা না হলে, তিনি এই কথা বললেন কেন?
তাহলে কি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ? জানতে চাইলে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা আসলে আমি এখন বলতে পারব না। এটা হয়তো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলতে পারবেন।’
বিস্ফোরক দ্রব্য ও ককটেল তৈরির সরঞ্জামসহ ৯ হাজার মুখোশ উদ্ধার
এর আগে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থেকে বিস্ফোরক দ্রব্য ও ককটেল তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং ৯ হাজার পিস কাগজের মুখোশ উদ্ধারের বিষয়ে জানায় পুলিশ। সংবাদ সম্মেলনে যুগ্ম–কমিশনার বলেন, গত ১৯ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এর তদন্তে যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুরসহ সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করে। একপর্যায়ে জাহিদ হাসান ইমনের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়। এরই ধারাবাহিকতায় শ্যামপুর মডেল থানা পুলিশ শুক্রবার ভোরে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের বাগাশুর এলাকায় স্থানীয় থানা পুলিশের সহায়তায় অভিযান চালায়। এ সময় ওয়ার্ড যুবলীগের নেতা ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ইমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ককটেল তৈরিতে ব্যবহৃত কস্টিক সোডা দেড় কেজি, সালফার ১ কেজি ৬০০ গ্রাম, মারবেল ৫ কেজি, ১ ইঞ্চি তারকাঁটা ২ কেজি, ককটেল মোড়ানোয় ব্যবহৃত লাল কসটেপ ২০টি ও কালো কসটেপ ১১টি, অসৎ উদ্দেশ্যে কাগজ দিয়ে তৈরি ৯ হাজার মুখোশ, মুখোশ পরার ইলাস্টিক ৩০ প্যাকেট, ককটেল তৈরির উপাদান বিচূর্ণ করার কাজে ব্যবহৃত একটি ব্লেন্ডার ও একটি জার উদ্ধার করা হয়। ইমন স্বীকার করেন, লালবাগের এক নেতার মাধ্যমে অজ্ঞাত এক ভ্যানচালকের সাহায্যে মুখোশগুলো তার কাছে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন নেতা-কর্মীর মধ্যে বিতরণের উদ্দেশ্যে সেগুলো তার বাসায় সংরক্ষণ করা হয়েছিল। ইমনের বিরুদ্ধে শাহবাগ ও লালবাগ থানায় দুটি মামলা রয়েছে।
রাজধানীর কদমতলী থানাধীন রাজধানী আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ এর সামনে অভিযান চালিয়ে ডিএমপির তালিকাভূক্ত আন্তঃ জেলা ডাকাত দলের সক্রিয় সদস্য ও ২ বছরের সাজাসহ একাধিক পরোয়ানাভূক্ত আসামি মোঃ ইকবাল হোসেন বাদশাকে (৫২) গ্রেফতার করেছে এসআরবি-৩।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ১টা ৩০ মিনিটে আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-৩।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ধৃত আসামি ইকবাল হোসেন এর বিরুদ্ধে রাজধানীর শ্যামপুর থানায় ২০২১ সালের দস্যুতা মামলায় ৩৯৩ ধারায় অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় বিজ্ঞ জজ আদালত-১০, ঢাকা কর্তৃক গত ১৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখ ধৃত আসামিকে ২ বছরের সশ্রম কারাদন্ড প্রদান করেন।
উল্লেখ্য যে, আদালত কর্তৃক সাজা প্রদানের পর থেকে আসামি দেশের বিভিন্ন স্থানে ছদ্মবেশে পলাতক অবস্থায় নিজের নাম ও বেশভূষা পরিবর্তন করে জীবন যাপন করে আসছে। উক্ত মামলার প্রেক্ষিতে রাজধানীর শ্যামপুর থানার অধিযাচনের ভিত্তিতে এসআরবি-৩ এর একটি চৌকষ আভিযানিক দল আসামির অবস্থান শনাক্ত করে ইকবাল হোসেনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। ধৃত আসামির বিরুদ্ধে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর ও কদমতলী থানায় চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইসহ মোট ১০টি মামলা রয়েছে।
ধৃত আসামির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রতীকী ছবি
শিশু নিখোঁজ হলে বা হারিয়ে গেলে কী করা উচিত- এই প্রসঙ্গটি বাংলাদেশে সম্প্রতি আবার আলোচনায় এসেছে; বিশেষ করে কুমিল্লায় ১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়া এবং হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর।
পুলিশের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সারাদেশে প্রায় ১৬ হাজার শিশু নিখোঁজ হয়, যাদের মধ্যে দুই হাজারের বেশি শিশুর সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। এই তথ্য জানানো হয়েছিল চলতি মাসের শুরুতে।
আবার বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, বছরের শুরু থেকে অগাস্ট পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অন্তত ৩৬টি নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের সন্তান অপ্রতিমের নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা সারাদেশে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। ওই ঘটনায় অপ্রতিমেরই পূর্ব-পরিচিত কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।
নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান নিয়ে কাজ করা প্ল্যাটফর্ম মুন অ্যালার্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রতিষ্ঠান জিরো মিসিং ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট সাদাত রহমান বলছেন, নিখোঁজের পর প্রথম তিন ঘণ্টায় অনেকে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে থাকে এবং সে কারণে ওই সময়ের প্রতিটি সেকেন্ডকে শিশুটির উদ্ধারের জন্য কাজে লাগাতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিতি সানজানা বলছেন, বাচ্চা নিখোঁজ হলে সঙ্গে সঙ্গে জরুরি নম্বরে কল দিয়ে কিংবা স্থানীয় থানায় গিয়ে পুলিশকে জানাতে হবে এবং তাদের পরামর্শ অনুযায়ী যত বেশি সম্ভব তথ্য দিয়ে দ্রুততার সঙ্গে জিডি করতে হবে। পুলিশের একজন মুখপাত্রও একই পরামর্শ দিয়েছেন।
শিশু হারালে কী করবেন
জামালপুরের মাদারগঞ্জে গত ১০ই সেপ্টেম্বর সাত বছরের একটি শিশু স্কুলে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি। পরে ওই শিশুর মৃতদেহ তারই এক সহপাঠীর বাড়ির মেঝেতে মাটিচাপা অবস্থায় পায় পুলিশ।
রপর সংবাদ সম্মেলন করে সেখানকার পুলিশ জানিয়েছিল যে ওই শিশুর সহপাঠীর বাবা শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করেন।
গত ১৬ই সেপ্টেম্বর পাবনা সদর উপজেলার দোগাছি ইউনিয়নে নিখোঁজের সাত দিন পর দশ বছর বয়সের এক শিশুর টুকরো করা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। আবার বাংলাদেশের খুলনার ১২ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ভারত থেকে উদ্ধারের ঘটনা আলোচনার জন্ম দিয়েছিল; ২০২৫ সালের ২৩শে জুলাই ওই কিশোরীটিকে মহারাষ্ট্রের পালঘর জেলার নাইগাঁও থেকে উদ্ধারের পর ওই শিশু তারও উপর হওয়া নিপীড়নের মর্মস্পর্শী বিবরণ দিয়েছিল।
নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে পাওয়ার প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে জিরো মিসিং ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট সাদাত রহমান বলছেন, শিশু হারালে বা নিখোঁজ হলে দ্রুততম সময়েই কিছু পদক্ষেপ নিলে অনেক ক্ষেত্রেই শিশুটিকে ফিরে পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
জিরো মিসিং ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্ম মুন অ্যালার্ট নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান নিয়ে কাজ করে। এটি সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় সামাজিক মাধ্যম ও বিলবোর্ডে নিখোঁজ শিশুর বিস্তারিত তথ্য দিয়ে অ্যালার্ট দিয়ে থাকে।
সাদাত রহমান বলছেন, এফবিআইসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী নিখোঁজের পর প্রথম তিন ঘণ্টায় অনেক শিশু হত্যার শিকার হয় এবং সে কারণে ওই সময়ের প্রতিটি সেকেন্ড শিশুটিকে খুঁজে পেতে কাজে লাগাতে হবে।
'গোল্ডেন আওয়ার' কাজে লাগানো
সাদাত রহমানের মতে, ওই তিন ঘণ্টাই গোল্ডেন আওয়ার, যার প্রতিটি মুহূর্ত শিশুকে খুঁজে পেতে কাজে লাগাতে হবে। এক্ষেত্রে নিখোঁজ শিশুর তথ্য জানাতে বা অ্যালার্ট ইস্যু করতে মুন অ্যালার্টের হটলাইন (১৩২১৯) ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
পাশাপাশি শিশুর বিস্তারিত তথ্য দ্রুত পুলিশকে অবহিত করতে হবে এবং সেক্ষেত্রে থানায় যাওয়া এবং বাংলাদেশের পুলিশের জরুরি নম্বর ৯৯৯ এ কল করে পুলিশকে অবহিত করা উচিত বলেও মনে করেনি তিনি।
আইনজীবী মিতি সানজানা বলছেন, দ্রুত স্থানীয় থানায় গিয়ে শিশুর বিস্তারিত তথ্য-সহ জিডি করতে হবে। একই সঙ্গে, কারও সাথে পূর্ব-শত্রুতা থাকলে বা সন্দেহভাজন কেউ থাকলে অভিভাবকের উচিত সেটি পুলিশকে অবহিত করা। পাশাপাশি আগের কোনো শত্রুতা বা হুমকি থাকলে তাও পুলিশকে জানাতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, বর্তমানে অনলাইন জিডি সুবিধা চালুর ফলে জিডির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৪১৪ এবং ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৫৫০। যদিও সাদাত রহমান বলছেন, নিখোঁজের ক্ষেত্রে অনলাইনে জিডি করার সুবিধা কাজ করে না। এ ধরনের জিডি করতে ভুক্তভোগী পরিবারকে থানায় যেতে হয়।
আশেপাশে সন্ধান চালানো
চলতি মাসের শুরুতে পুলিশ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল যে, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার কারণ হিসেবে অভিমান, পড়ালেখার চাপ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে লজ্জায় বা ভয়ে পালিয়ে থাকা, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা আদায়ের কৌশল, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাব কাজ করে।
সাদাত রহমান বলছেন, স্কুলের বাচ্চারা নিখোঁজ হলে শুরুতেই তাদের কোনো বন্ধু-বান্ধবের বাসায় গেলো কি না তার খোঁজ নিতে হবে। ছয় থেকে ১২ বছর বয়সী অনেক শিশুর ক্ষেত্রে এটি ঘটে এবং তাদের অনেককে পরে পাওয়া যায়। এছাড়া ছোটো শিশুর ক্ষেত্রে বাড়ির আশেপাশের ডোবা নালাসহ বিপজ্জনক জায়গাগুলো ভালো করে দেখতে হবে। বাচ্চারা অনেক সময় পছন্দের ব্যক্তিদের কাছে যায়। এমন কারও কাছে গিয়েছে কি-না সেটি নিশ্চিত হতে হবে। কনস্ট্রাকশন সাইট কিংবা মাঠ থাকলে সেগুলোতে সন্ধান করতে হবে। তিনি বলেন, কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে অনেকের বাসা থেকে রাগ করে বা পড়াশোনার ভয়ে বের হয়ে যাওয়ার উদাহরণও আছে।
আইনজীবী মিতি সানজানা বলছেন, শিশুটি সম্পর্কে ভালোভাবে ধারণা করা যাবে এমন প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে কোনো বিলম্ব না করে এলাকায় মাইকিং করে সবাইকে জানাতে হবে।
আরও যেসব জায়গায় খোঁজ নিতে হবে
শিশুটি কোথায় যেতে পারে- সেই সম্ভাবনা ধরে কাছাকাছি থাকা হাসপাতাল, ক্লিনিক, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনকেন্দ্রে খোঁজ নেওয়া যেতে পারে। শিশুর নিয়মিত যাতায়াতের জায়গাগুলোতে ভালো করে সন্ধান চালাতে হবে।
নিখোঁজ বা হারিয়ে যাওয়া শিশু পেলে অনেক সময় আদালতের মাধ্যমে সরকারি শিশু সদনে রাখে পুলিশ। শিশুটি সেখানে আছে কি-না সেই খোঁজের জন্য আদালতের নন-এফআইআর শাখায় খোঁজ নিতে হবে।
শিশুকে যা শেখাবেন
সাদাত রহমান বলছেন, অনেক সময় শিশু হারিয়ে যাওয়ার পর লোকজন পেলেও কোনো তথ্য দিতে পারে না। এজন্য যত দ্রুত সম্ভব শিশুকে মোবাইল নম্বর মুখস্থ করানোর চেষ্টা করতে হবে।একই সঙ্গে শিশুকে অপরিচিতদের কাছে না যাওয়ার বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে। পিতামাতাসহ পরিবারের অভিভাবকদের শিশুদের প্রতি আরও দৃষ্টি দিতে হবে। তারা কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে এসব বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
সানজানাও বলছেন, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শিশুকে সচেতন করে তুলতে হবে অভিভাবকদেরই।
মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে দু’পক্ষের সংঘর্ষ
রাজধানীর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে আজ সোমবার ফের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে চাকরিচ্যুত সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ফোরামের সদস্যদের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সকালে এস আলমের সময়ে যাচাই-বাছাই ছাড়া চট্রগ্রামের পটিয়া থেকে নিয়োগ পাওয়া চাকরিচ্যুতদের একাংশের সঙ্গে সচেতন গ্রাহক ফোরামের সদস্যদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় দুই পক্ষের অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়।
প্রতক্ষদর্শীরা জানান, সকাল সাড়ে ৭টায় মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে পটিয়া অঞ্চল থেকে আসা কিছু সাবেক কর্মী চাকরি পুনর্বহালের দাবিতে অবস্থান নেন। এ সময় গ্রাহক ফোরামের সদস্যরা সেখানে অবস্থান নিলে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে গ্রাহক ফোরামের সদস্যরা তাদের ধাওয়া দেয়। এতে দুই গ্রুপের পক্ষের অর্ধশতাধিক সদস্য আহত হন।
গ্রাহক ফোরামের সভাপতি নুর উন নবী মানিক সাংবাদিকদের বলেন, ‘অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্তদের সঙ্গে ব্যাংকের কোনো সম্পর্ক নেই। ব্যাংকটির বিরুদ্ধে নতুন করে ষড়যন্ত্র করতে তারা অবস্থান নিয়েছেন। আজ যখন শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছি, তখন পুলিশের ছত্রছায়ায় আমাদের সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছেন। আরও ২৫ থেকে ৩০ জন আহত হয়েছেন। তারা চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরে গেছেন। যারা পরিকল্পিতভাবে হামলা করেছে, তাদের খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।’
অন্যদিকে, চাকরিচ্যুতদের ২৫ জনের ওপর হামলা হয়েছে বলে দাবি করেন শহিদুল ইসলাম নামের সাবেক এক কর্মী। তিনি বলেন, ‘আমরা দ্বিতীয় দিনের মতো ব্যাংকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি নিয়ে দাঁড়িয়েছি। আজ উপস্থিত হওয়ার ২০ মিনিটের মধ্যে গ্রাহক ফোরামের সদস্যরা আমাদের ওপর হামলা চালায়। পুলিশ প্রোটেকশন দিয়ে আমাদের সরিয়ে দিয়েছে। ২০ থেকে ২৫ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।’
পুলিশ জানায়, সোমবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে দুই পক্ষ অবস্থান নেয়। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে প্রথমে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে তা ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতিতে রূপ নেয়। পরে উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মহসীন আল মুরাদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘সকালের ঘটনা আমি জানি না। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে চাকরিচ্যুতরা অবস্থান নিয়েছেন। যেহেতু এটি কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠান, তাই তাদের এখান থেকে চলে যেতে বলেছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশৃঙ্খলা এড়াতে প্রস্তুত রয়েছে।’
মতিঝিল বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার সাকিবুল আলম ভূইয়া বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্ন ঘটালে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এক তরুণীকে ঘিরে ত্রিভুজ প্রেমের দ্বন্দ্বে রাজধানীর সবুজবাগে খুন হয়েছেন কাতারপ্রবাসী সিফাত উল্লাহ (২৭)। দেড় মাস আগে কাতার থেকে দেশে আসেন সিফাত। এরপর তিনি জানতে পারেন সাজিদুল ইসলাম সাজিদ নামে আরেক যুবকের সঙ্গে চার বছর ধরে সম্পর্ক চলছে ওই তরুণীর। এ নিয়েই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত।
গত রবিবার বিকেলে রাজধানীর মাদারটেক এলাকায় সিফাত হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় র্যাব সাজিদ ও তার সহযোগী আল আমিন হোসেন জয়কে গ্রেপ্তার করেছে।
গতকাল সোমবার র্যাব-৩ সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে র্যাব ৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন এ তথ্য জানান।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন বলেন, রবিবার বিকেল ৩টার দিকে রাজধানীর মাদারটেক বড়ইতলা এলাকায় ওই তরুণীর বাসায় তার সঙ্গে দেখা করতে যান সিফাত। এ খবর পেয়ে জয়ের সহযোগী ইয়াছিন, অনিক, তুহিন ও রাজুসহ কয়েকজন ওই বাসায় যায়। জয় তখন ভবনের নিচে অবস্থান করছিলেন। জয়ের সহযোগীরা বাসায় ঢুকে সিফাতের সঙ্গে কথা কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তিতে জড়ায়। ধস্তাধস্তিতে সময় ইয়াছিন ও রাজু আহত হয়। পরে তারা নিচে নেমে আসে। সিফাতও মোটরসাইকেলে করে সেখান থেকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে জয়ের সহযোগীরা তাকে পেছন থেকে হামলা করে এবং ধারালো ছুরি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে রাস্তায় ফেলে যায়। স্থানীয়রা সিফাতকে উদ্ধার করে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন তার মৃত্যু হয়। র্যাব ৩-এর অধিনায়ক বলেন, রবিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে খিলগাঁও হাজিবাড়ি বালুরপাড় এলাকা থেকে মামলার দ্বিতীয় আসামি সাজিদকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভোর ৫টার দিকে খিলগাঁও শেখের জায়গাবাজার থেকে প্রধান আসামি জয়কে গ্রেপ্তার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন বলেন, সিফাত প্রায় দেড় মাস আগে কাতার থেকে দেশে আসেন। ওই তরুণীর সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। অন্যদিকে সাজিদের সঙ্গেও তার চার বছরের বেশি সময় ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সিফাতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি জানার পর সাজিদের সঙ্গে মেয়েটির সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটে।
অন্যদিকে জয় ওই মেয়েটির সঙ্গে মাদারটেক আব্দুল আজিজ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুবাদে পরিচিত ছিলেন। জয় এলাকায় সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত। তিনি মাঝেমধ্যে বন্ধুদের নিয়ে ওই বাসায় গিয়ে মাদক সেবন করতেন। বিষয়টি সিফাত জানতে পেরে জয়সহ তাদের ওই বাসায় আসতে নিষেধ করেছিলেন। এ নিয়ে জয়ের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
র্যাব-৩ অধিনায়ক জানান, হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেপ্তার দুই আসামিকে সবুজবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
মুক্তা ইসলাম মাওয়া
২৫ বছর বয়সী মুক্তা ইসলাম মাওয়ার পায়ে শিকল। বাসার খাটের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে তাঁকে। ওই তরুণীকে সহিংস শাস্তি দিতে এমন অমানবিক আয়োজন তাঁর স্বামী সোহেল শিকদারের (৩১)। কয়েক সেকেন্ড পরপর তাঁকে চামড়ার বেল্ট দিয়ে সজোরে পেটানো হচ্ছিল। ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল মুক্তার চোখ-মুখ। শরীরজুড়ে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। মায়ের ওপর এমন বর্বর নির্যাতনের সময় পাশের রুমে কাঁদছিল তাঁর দুই সন্তান সাফওয়ান (৫) ও তাসফিয়া (৪)। দুই শিশুর কান্না কী করে সহ্য করবেন মা! তখন মুক্তা তাঁর স্বামীকে বলেন, ‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি।’ সন্তানের কান্না ও স্ত্রীর অশ্রুসজলেও মন গলেনি সোহেলের।
রাজধানীর খিলক্ষেতের ৫ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে স্ত্রীকে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে এর ভিডিও করেন সোহেল শিকদার। সেই ভিডিও মুক্তার ভাইয়ের মোবাইল ফোনে পাঠিয়ে সোহেল লেখেন, ‘তোমার বোনকে নিয়ে যাও।’ এরপর খিলক্ষেতের বাসা থেকে গত বৃহস্পতিবার মুক্তাকে নিয়ে যান স্বজনরা। তবে সেটি তাঁর নিথর দেহ! সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছিলেন মুক্তা। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, সোহেল নির্যাতনের পর হত্যা করে স্ত্রীকে ঝুলিয়ে রেখে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করছেন। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ ও যৌতুকের জন্য কয়েক মাস ধরে মুক্তাকে নির্যাতন করে আসছিলেন সোহেল।
৩ মিনিটের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তাকে পেটানোর সময় সোহেল বলছিলেন, ‘কথা ক, কথা ক, তোরে আজ পিটাইয়া মাইরা ফালামু। তোকে আমি ছাড়ব না। তোকে আজ ছাড়ব কি ছাড়ব না, এটা আমার বিবেচনা। একবার শুধু কথা ক।’ বেল্ট দিয়ে নির্দয়ভাবে পেটানোর পর তাঁর শরীরে রক্তাক্ত কালচে জখম হয়ে যায়। এক পর্যায়ে মুক্তা বলছিলেন, ‘আমি কিছু করিনি। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’ এ কথা বলার পর তাঁকে আরও পেটানো হয়। তখন মুক্তা বলছিলেন, ‘আমাকে আর মাইরো না, ও আল্লাগো।’ নির্যাতনের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে এক পর্যায়ে চোখ বন্ধ করে অনুচ্চ স্বরে কিছু একটা বলছিলেন তিনি। তখনও তাঁর শরীরে বেল্ট দিয়ে আঘাত চলছিল।
মুক্তার লাশ উদ্ধারের ঘটনায় গত শুক্রবার খিলক্ষেত থানায় মামলা করেন তাঁর ছোট ভাই তানভীর রহমান। এজাহারে বলা হয়, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে এমন সন্দেহে মুক্তার ওপর নির্যাতন করে আসছিলেন সোহেল শিকদার। সর্বশেষ ৩০ আগস্ট মুক্তাকে বেল্ট দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে জখম করা হয়। এতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ওই দিন মুক্তার ওপর নির্যাতনের ভিডিও তার এক স্বজনকে পাঠান সোহেল। তখন হুমকি দেন, মুক্তাকে মেরে ফেলা হবে। পরে গত বৃহস্পতিবার মুক্তার লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়ার খবর পান স্বজনরা।
তানভীর রহমান জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগেই তাঁর বোনের লাশ সিলিং ফ্যান থেকে নামানো হয়েছে। কয়েক মাস আগে আমার কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিলেন সোহেল। সেই টাকা দিতে দেরি হওয়ায় বোনকে মারধর করা হতো। তিনি আরও বলেন, মাকে হারিয়ে তাঁর দুই বাচ্চা সারা দিন কান্নাকাটি করছে। বারবার বলছে, বাবা মাকে মেরে ঝুলিয়ে রেখেছে। এই ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
তানভীর বলেন, আমরা চার ভাই-বোন। বাবা ছোটবেলায় মারা যান। মা আমাদের বড় করেছেন। অনেক নির্যাতনের পর মায়ের কষ্টের কথা চিন্তা করে আমার বোন অনেক কিছু গোপন করতেন। নির্যাতন সহ্য করার পরও মারা যাওয়ার আগে পুলিশের কাছে যায়নি। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুক্তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। একই এলাকার সোহেল শিকদারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ের পর থেকে মুক্তা খিলক্ষেতে স্বামীর সঙ্গে থাকেন। সোহেল প্রথমে খিলক্ষেত এলাকার মুদি দোকানি ছিলেন। পরে তিনি এম্ব্রয়ডারি ব্যবসায় জড়ান। সেখানেও ভালো করতে পারেননি। এরপর স্ত্রীর সঙ্গে অশান্তি শুরু করেন। শ্বশুরবাড়ি থেকে যৌতুক চাওয়া শুরু করেন।
খিলক্ষেত থানার ওসি মুহাম্মাদ সোহরাব আল হোসাইন বলেন, মুক্তাকে পেটানোর যে ভিডিওটি পাওয়া গেছে, সেটি তাঁর মৃত্যুর তিন দিন আগের। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে এটি হত্যা, না আত্মহত্যা। প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর কল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগে কল এসেছিল ১৮ হাজার ৬২৬টি। ২০২৪ সালে অভিযোগ আসে ২৩ হাজার ৩৩টি। এর মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ ছিল ১১ হাজার ৪১৮টি। ২০২৩ সালে ২৬ হাজার ৭৯৮টি কলের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৯ হাজার ৯১৩টি। ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭১২টি কলের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৬ হাজার ৫৬০টি। ২০২১ সালে ১২ হাজার ১৬৯টি অভিযোগের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে ছিল ৩ হাজার ৩৪৮টি।