ছবি : সংগৃহীত
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার বিষয়ে সংসদে আনা বিরোধী দলের নোটিস ঘিরে বিতর্ক হয়েছে।নোটিসের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের এক পর্যায়ে হট্টগোলও হয়।
ঈদের ছুটির পর রোববার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান নোটিসটি উত্থাপন করলে এর বৈধতা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। পরে সভাপতির আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল মঙ্গলবার দুই ঘণ্টা আলোচনা হবে বলে রুলিং দেন।
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা ঠিক করে দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়। আর সেসব সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়নের বিষয়ে জনগণের সম্মতি নিতে ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন হয় গণভোট।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ অনুযায়ী, বর্তমান সংসদের সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও ভূমিকা রাখার কথা। সংসদের মতই সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার কথা।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে, নির্বাচনে জয়ী ব্যক্তিরা একই দিনে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সে অনুযায়ী প্রস্তুতি রেখেছিল সংসদ সচিবালয়।
জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী দলের সদস্যরা সেদিন দুটি শপথ নিলেও বিএনপির এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। ফলে নির্ধারিত সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি।
রোববার বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান কার্যপ্রণালী-বিধির ৬২ বিধি অনুসারে জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের নোটিস দেন।
তিনি বলেছেন, বিষয়টি তিনি ১৫ মার্চ সংসদে উত্থাপন করেছিলেন। তখন স্পিকার আনুষ্ঠানিক নোটিস দিতে বলেছিলেন।
শফিকুর রহমানের নোটিসে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি।
নোটিসে বলা হয়, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আইনে বর্ণিত সময়সীমার মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না হওয়ায় ‘জাতির প্রত্যাশাকে পাশ কাটিয়ে এ ধরনের অচলাবস্থা সৃষ্টি’ হয়েছে।
আদেশের ১০ অনুচ্ছেদ তুলে ধরে ফল ঘোষণার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে সংসদের মতো সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের বিধানটি স্মরণ করিয়ে দেন বিরোধী দলের নেতা।
পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে নোটিস উত্থাপন ও আলোচনার দাবি তোলার পক্ষে যুক্তি দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ১৫ মার্চ তিনি একই বিষয়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে কথা বলেছিলেন। স্পিকার তাকে নোটিস দিতে বলেছিলেন। সেই অনুযায়ী নোটিস দিয়ে তিনি আলোচনার দাবি জানাচ্ছেন।
তবে সরকারি দলের পক্ষ থেকে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী আগে প্রশ্নোত্তর ও বিধি-৭১ এর নোটিসের ওপর আলোচনা শেষ করতে হবে। এরপর অন্য বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, প্রশ্নোত্তরের পরই এ আলোচনা হওয়ার কথা। সে অনুযায়ীই তিনি দাঁড়িয়েছেন।
এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কথা বলতে চাইলে বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি তোলেন। তবে তাকে ফ্লোর দেওয়া হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বিরোধীদলীয় নেতা একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। সরকারি দল বিধি মোতাবেক আলোচনার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে।”
তিনি বলেন, রীতি অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধির নোটিসের পর মুলতবি প্রস্তাবের আলোচনা হতে পারে। স্পিকারকে বিধি অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এ সময় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, “সংসদের কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে কীভাবে এই সংসদ গঠিত হয়েছে, তা সবাই ভুলে যাচ্ছেন। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটও হয়েছিল। কিন্তু এখন কার্যক্রম দেখলে মনে হয় এ ধরনের কিছুই হয়নি।”
তিনি বলেন, এটি ‘সবচেয়ে বেশি জনগুরুত্বপূর্ণ’ বিষয় এবং নিয়মিত কার্যক্রমের আগে এটির সুরাহা হওয়া ‘উচিত’।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, স্পিকার চাইলে অনুমতি দিতে পারেন, তবে প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধির বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ এবং সংসদ সদস্যদের অধিকার। এ দুই কার্যসূচির জন্য দুই ঘণ্টা বরাদ্দ রয়েছে।
পরে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, তিনি বিরোধী দলের নোটিস পেয়েছেন এবং সংসদের রীতি মেনে বিধি-৭১ এর নোটিসগুলোর ওপর আলোচনা শেষে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।
নোটিস উত্থাপনের পর আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, “যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী একটি প্রস্তাব মনে করছি। এ বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে, ওনাদের পক্ষ থেকেও আলোচনা হবে, আমাদের পক্ষ থেকেও আলোচনা হবে। আমরা আলোচনা করতে চাই, তবে আলোচনার আগে একটু সময় প্রয়োজন।”
তিনি বলেন, এ বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে সংসদ সদস্যদের সামনে বাংলাদেশের সংবিধান, জুলাই জাতীয় সনদ, বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোট অধ্যাদেশের কপি থাকা দরকার।
আইনমন্ত্রীর ভাষায়, “আমরাও চাই, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন হোক এবং আমরা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পথ ধরে হেঁটে চলেছি।”
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পরে বিধিগত আপত্তি তুলে বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা ৬২ বিধিতে নোটিস দিলেও এটি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে নোটিস দেওয়ার ক্ষেত্রে ৬৮ বিধিতে যাওয়ার বিষয় আছে।
তিনি বলেন, “প্রস্তাবটি নিয়ে আমি আপত্তিও তুলছি না, অনাপত্তিও তুলছি না। কিন্তু আলোচনা হবে, নোটিসটাই তো বৈধ হয় নাই। বৈধভাবে আগে নোটিস হলে তারপরে আলোচনা হবে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সময় বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান এবং সংসদে হট্টগোল তৈরি হয়। এক পর্যায়ে তিনি ডেপুটি স্পিকারের কাছে ‘প্রোটেকশন’ চান।
পরে তিনি বলেন, কার্যপ্রণালী-বিধির ৬৩ অনুযায়ী এমন কোনো প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হতে পারে না, ‘যার প্রতিকার কেবল আইন প্রণয়নের মাধ্যমে হতে পারে’।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নে সংসদীয় ভাষায় সংবিধান ‘প্রণীত হবে অথবা রহিত হবে অথবা স্থগিত হবে অথবা সংশোধিত হবে’ এবং বিলের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের পথেই এগোনো উচিত।
রাষ্ট্র সংস্কার আলোচনায় বিএনপির পরিচিত মুখ সালাহউদ্দিন আহমদ সংবিধান সংশোধনে একটি ‘কনস্টিটিউশন রিফর্ম কমিটি’ গঠনের প্রস্তাবও দেন। যেখানে সরকারি দল, বিরোধী দল, স্বতন্ত্র সদস্যসহ সবার মতামত নেওয়া যেতে পারে বলেছেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা সমঝোতার ভিত্তিতে জাতীয় সংসদে এমন একটি সংবিধান সংশোধন করতে চাই—যেই দলিলটা জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের শহীদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পারে।”
এরপর আবার ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তিনি চান আগে সংসদ মূলতবি করে আলোচনা হোক, তারপর বিষয়টি নিয়ে কথা হবে।
সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ডেপুটি স্পিকার রুলিং দেন, কার্যপ্রণালী-বিধির ৬৫(২) অনুযায়ী ৩১ মার্চ, মঙ্গলবার দিনের কার্যসূচি শেষ করে এ বিষয়ে দুই ঘণ্টা আলোচনা হবে।
রুলিংয়ের পরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নোটিস সংশোধনের বিষয়টি তুলে ধরতে চাইলে ডেপুটি স্পিকার তাকে বসতে বলেন। এক পর্যায়ে তার মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, তিনি তার সিদ্ধান্ত দিয়ে দিয়েছেন এবং মঙ্গলবার আলোচনার জন্য দুই ঘণ্টা সময় থাকবে।
এরপরও কিছু সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্যকে মাইক ছাড়া কথা বলতে দেখা যায়।
পরে বিদ্যমান জ্বালানি সংকট ও যুদ্ধকেন্দ্রিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে করণীয় বিষয়ে জামায়াতের সংসদ সদস্য নজিবুর রহমান আরেকটি মুলতবি আলোচনার নোটিস দিলেও তা গ্রহণ করা হয়নি।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পরে ডেপুটি স্পিকার রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনার জন্য সরকারদলীয় সদস্য খন্দকার আবু আশফাককে আহ্বান করেন।
এরপর চিফ হুইপ ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপকে বিষয়টি নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের সুযোগ দেওয়া হয়।
বিমানবন্দরে ভুটানের রাজার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগে ওয়াংচুক-কে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বাগত জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
ভুটানের রাজাকে বহনকারী একটি বিশেষ বিমান সিঙ্গাপুর থেকে ভুটান যাওয়ার পথে বুধবার (২৬ আগস্ট) ভোরে ঢাকায় যাত্রাবিরতি করে। বিমানবন্দরে প্রায় এক ঘণ্টার অবস্থানকালে ভিভিআইপি লাউঞ্জে রাষ্ট্রপতি ভুটানের রাজার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। তারা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা করেন। এসময় রাষ্ট্রপতি ভুটানের রাজা ও রাজপরিবারের সদস্যদের সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। জবাবে ভুটানের রাজা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে তাদের সুবিধাজনক সময়ে ভুটান সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগে ওয়াংচুক রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভ কামনা জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের পক্ষ থেকে ভুটানের রাজা ও রাজপরিবারের সদস্যদের প্রতি উষ্ণ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। জবাবে ভুটানের রাজাও বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের প্রতি শুভকামনা জ্ঞাপন করেন।
আলাপকালে রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে গভীর ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিদ্যমান। তিনি বলেন, ভুটান সবসময় আমাদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে আছে। কারণ, ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া বিশ্বের প্রথম দেশ ভুটান।
বাংলাদেশের প্রতি ভুটানের বর্তমান রাজার পিতা, রাজা জিগমে সিংগে ওয়াংচুকের বিশেষ মমত্ববোধ ও শুভ কামনাও রাষ্ট্রপতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
দুই দেশের অভিন্ন উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরে ভুটানের রাজা শিক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
ভুটানের রাজা তার দূরদর্শী ‘গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি’ প্রকল্প সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন এবং এ উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা কামনা করেন। রাষ্ট্রপতি প্রকল্পটির প্রতি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং এর প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, পারস্পরিক কল্যাণ, সমৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে এ অঞ্চলের রূপান্তরমূলক উদ্যোগগুলো এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ভুটানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে প্রস্তুত।
সৌজন্য সাক্ষাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভুটানের রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ভুটানের রাজাকে বহনকারী বিশেষ বিমানটি সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ভুটানের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষ্যে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহমর্মিতা, ক্ষমা ও মানবিকতার আদর্শ অনুসরণ করে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষ্যে আজ দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ অনুসরণ করে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
তিনি বলেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শুভাগমন মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য ও মহিমান্বিত ঘটনা। তাঁর আবির্ভাব মানুষের জন্য সত্য ও আলোর এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। তিনি মানুষকে তাওহিদের দিকে আহ্বান করার পাশাপাশি সত্য, ন্যায়, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, মানবিকতা ও শান্তির শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর পবিত্র জীবন ও কর্ম সমগ্র মানবজাতির জন্য চিরন্তন পথনির্দেশ ও অনুসরণীয় আদর্শ হয়ে আছে।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ মুসলমানসহ বিশ্বের সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে আন্তরিক মোবারকবাদ ও শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি, যিনি মানবজাতির হেদায়াত ও কল্যাণের জন্য সর্বশেষ নবী ও রাসূল, রহমাতুল্লিল আলামিন হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তাঁর প্রতি অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক।’
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ’ (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ২১)। মহানবী (সা.)-এর জীবন ছিল পবিত্র কুরআনের শিক্ষার বাস্তব ও জীবন্ত প্রতিফলন। সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়বিচার, ক্ষমাশীলতা, সহনশীলতা, দয়া ও পরোপকারের অনন্য দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন। তাঁর জীবনাচরণে আমরা যেমন আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্যের শিক্ষা পাই, তেমনি মানুষের প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও মহানুভবতার অপূর্ব প্রকাশ দেখতে পাই।
মহানবী (সা.) জাতি, বর্ণ, গোত্র, ভাষা ও সামাজিক অবস্থানের বিভেদ অতিক্রম করে মানুষের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় জোর দিয়েছেন উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, তিনি এতিম, দরিদ্র, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল ও সহমর্মী হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। পরিবার, প্রতিবেশী, নারী, শিশু এবং সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তাঁর শিক্ষা মানুষে মানুষে বিভেদ নয়, বরং ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব নানা সংকট ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। যুদ্ধ, সংঘাত, হিংসা, বৈষম্য, অসহিষ্ণুতা ও নৈতিক অবক্ষয় মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করছে। এমন এক সময়ে মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহমর্মিতা, ক্ষমা ও মানবিকতার শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণ করে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায়, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের তরুণ প্রজন্মই দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের মাদক, সন্ত্রাস, উগ্রতা ও অপরাধের পথ থেকে দূরে রেখে জ্ঞান, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের চেতনায় গড়ে তুলতে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ হতে পারে এক অনন্য প্রেরণার উৎস। তাঁর আদর্শ তরুণদের সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকতে, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে এবং সমাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা শুধু মুসলমানদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য নয়, মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশের ক্ষেত্রেও গভীর তাৎপর্য বহন করে। তাঁর আদর্শকে আমাদের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন ও সামাজিক আচরণে ধারণ করতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও ন্যায়বোধকে শক্তিশালী করার মধ্য দিয়েই আমরা একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুমহান জীবনাদর্শ ও সুন্নাহ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ আমাদের ব্যক্তি ও সমাজজীবনে সত্য, ন্যায়, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার চেতনাকে আরো সুদৃঢ় করুক। বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বে শান্তি, ন্যায়, সাম্য, সমৃদ্ধি ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠিত হোক-এই পবিত্র দিনে এটাই আমার আন্তরিক প্রার্থনা।’
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষ্যে তিনি দেশবাসীসহ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর প্রতি আন্তরিক মোবারকবাদ ও শুভেচ্ছা জানান।
দেশে সারের সংকট নেই
দেশে সারের কোনো সংকট নেই, পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, 'কৃষকদের চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত সার আমদানির অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। ফলে সামনে সারের কোনো ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা নেই।' আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের তথ্য জানাতে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন গুদামে মোট ১৩ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন সার মজুত রয়েছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে মজুত ছিল প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার মজুত বেড়েছে। তবে দেশের কোথাও কোথাও সার বিতরণে অনিয়মের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে উল্লেখ করে জাহেদ উর রহমান বলেন, বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে এবং এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, সার বিতরণে কিছুটা অনিয়ম রয়েছে। কৃষক ও জনগণের স্বার্থে সরকার বিতরণব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। নতুন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করতে গিয়ে কোথাও কোথাও কিছুটা অস্থিরতা ও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, কোনো কোনো ডিলার তাঁদের বরাদ্দের সার উত্তোলন করছেন না। এর ফলে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সাময়িক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তবে সরকার আশা করছে, এ সমস্যা বেশি দূর গড়াবে না।
গ্যাস পরিস্থিতি
সংবাদ সম্মেলনে দেশের গ্যাস পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, গ্যাসের ক্ষেত্রে একটি ভালো অবস্থানে যেতে সরকারের প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, এ সময়ের মধ্যে দেশের গ্যাস পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হবে। বরং ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, তথ্যসচিব মাহবুবা ফারজানা এবং তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন।
বিদিশা এরশাদ
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মরহুম হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের স্ত্রী বিদিশা এরশাদকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। আজ মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর গুলশানের একটি রেস্টুরেন্ট থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গুলশান থানার ওসি দাউদ হোসেন বলেন, ২০০৮ সালের একটি প্রতারণা মামলায় তিনি অভিযুক্ত ছিলেন। ওই মামলার বিচারে তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য আদালত পরোয়ানা জারি করেন। সেই পরোয়ানামূলে আজ মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে গুলশান-২ নম্বর সেকশন থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কাল বুধবার তাকে আদালতে হাজির করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্য চীনের তৈরি যুদ্ধবিমান জে-১০সি কেনার পথে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার।
আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের সমসাময়িক কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন মডেলের চতুর্থ প্রজন্মের এমআরসিএ ফাইটার এয়ারক্রাফট, অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার ও ইউএভি সিস্টেম-এগুলো কেনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এই অর্থবছরে বাজেট পাওয়া গেলে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। তা সম্ভব না হলে পরবর্তী বাজেটে চলে যাবে।
উপদেষ্টা বলেন, এমআরসিএ (জে-১০ সিই) এবং অ্যাটাক হেলিকপ্টার সংগ্রহের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে নেগোসিয়েশন মিটিংয়ের খসড়া চুক্তিপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে।
চীনের তৈরি জে-১০ সিই ফাইটারের সক্ষমতার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, ‘সাম্প্রতিক একটা রিয়েল এক্সপেরিয়েন্স আছে কমব্যাট সিচুয়েশনে। ভারত-পাকিস্তানে যখন যুদ্ধ হচ্ছে, ভারতের রাফাল ডাউন হয়েছিল, সেটা করেছিল চায়নিজ জে-১০। এই তথ্য এখন প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং চায়নার তৈরি একটা মাল্টিরোল ফাইটার, এখন রাফালকে বলা হয় ৪.৫ জেনারেশনের সবচেয়ে আধুনিক ফাইটারগুলোর একটা। তার সঙ্গে কমব্যাট সিচুয়েশনে খুবই ভালো করেছে। সো, বাংলাদেশ সেদিকে মনোযোগ দিয়েছে এবং আশা করা যায় আমরা এই পথে খুব ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছি।’
জাহেদ উর রহমান আরও বলেন, ‘একটা কথা বলে রাখা ভালো, সিমিলার কোয়ালিটির রাফাল বলি বা ইউরো ফাইটার টাইফুন বলি, ইউরোপিয়ান ভেরিয়েন্টের-তার তুলনায় চায়নিজ ফাইটারগুলোর দাম তুলনামূলকভাবে অনেক কম। আশা করি, আমাদের সরকার জনগণের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সব রকমের পদক্ষেপ নেবে।’
এ বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, এমআরসিএ (জে-১০ সিই) এবং অ্যাটাক হেলিকপ্টার সংক্রান্ত কমিটি ‘নেগোসিয়েশন বৈঠকের’ মাধ্যমে খসড়া চুক্তিপত্র তৈরি করেছে। সেটা অনুমোদনের জন্য সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, তথ্যসচিব মাহবুবা ফারজানা, তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ।
প্রতীকী ছবি
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় থাকা ১১৭টি ওষুধের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশের উৎপাদন বন্ধ রেখেছে কোম্পানিগুলো। ওষুধ শিল্প সমিতি বলছে মূল্যস্ফীতি, ডলারের বিনিময় হার, শ্রমিকের মজুরি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের লোকসান গুণতে হচ্ছে। এ কারণে বিভিন্ন সময়ে এসবের উৎপাদন বন্ধ হয়েছে।
গতকাল সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (বাপি) কার্যালয়ে ‘ওষুধ শিল্পের অগ্রগতি: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় সমিতির নেতারা এসব কথা বলেন। উৎপাদন বন্ধ থাকায় এসব ওষুধের পরিবর্তে রোগীদের তুলনামূলক বেশি দামের বিকল্প ওষুধ কিনতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসায় ব্যয় বাড়ছে।
বাপির নেতারা বলেন, বর্তমানে ১৯৯৪ সালের প্রাইসিং কাঠামোর ভিত্তিতে ওষুধের দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে। গত ৩২ বছরে মাত্র দুবার দাম সমন্বয় করা হয়েছে। তবে বছরে গড়ে ৮ শতাংশ হারে মূল্য সমন্বয়ের কথা ছিল। এই সময়ে মূল্যস্ফীতি, ডলারের বিনিময় হার, শ্রমিকের মজুরি ও উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই নির্দিষ্ট সময় পরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাম সমন্বয়ের ব্যবস্থা থাকা দরকার।
তারা আরও বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদে ওষুধ শিল্প মালিকদের কোনো আপত্তি নেই। তবে তালিকা তৈরিতে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া এবং ওষুধের দাম নির্ধারণে স্বচ্ছ, টেকসই ও নিয়মিত সমন্বয়যোগ্য নীতি প্রণয়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি ব্যয়ের চাপ দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত থাকলে ওষুধের দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
সমিতির সাবেক মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. জাকির হোসেন বলেন, ওষুধ শিল্পকে শুধু মূল্য নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে তাদের কোনো বিরোধিতা নেই। তবে যোগ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে তালিকাটি নিয়মিত হালনাগাদ এবং ওষুধের দাম নির্ধারণে সঠিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন।
প্রয়োজনীয় ওষুধ সুলভ মূল্যে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব উল্লেখ করে ডা. জাকির হোসেন বলেন, সরকার চাইলে ভর্তুকি বা সরকারি ক্রয়ের মাধ্যমে কম দামে ওষুধ সরবরাহ করতে পারে। তবে বেসরকারি উৎপাদনকারীদের কোনো ধরনের ভর্তুকি ছাড়া দীর্ঘদিন কম দামে ওষুধ উৎপাদনের প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি তুলনা করাও ঠিক নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ইডিসিএলের নির্দিষ্ট সরকারি ক্রয়াদেশ ও নিশ্চিত বাজার রয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো বিপণন ব্যয়ের চাপও তাদের নেই। সরকার চাইলে ইডিসিএলের মাধ্যমে ওষুধ উৎপাদন করে সরকারি হাসপাতালের রোগীদের বিনা মূল্যে বা কম দামে দিতে পারে।
বাপির ভাইস প্রেসিডেন্ট মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ১৯৯৪ সালের ওষুধ নীতি দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের বিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছে। সেই সময় ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রস্তুত করা হয়। তবে উৎপাদনের জন্য ১৯টি ওষুধ নিবন্ধন করা হয়নি। ফলে ৯৮টি ওষুধের প্রাপ্যতা ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা হয়। তিনি বলেন, বর্তমানে এসব ওষুধের উৎপাদন খরচ উঠে আসে না। তাই দাম সমন্বয় না হওয়ায় প্রায় ৬০ শতাংশ ওষুধের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটেও ওষুধের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে বলে জানান বাপির মহাসচিব মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান। তিনি বলেন, কর্মঘণ্টার বড় একটি অংশে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। কারখানাগুলোকে জেনারেটর, বড় ইউপিএস ও বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
তিনি বলেন, ওষুধের উৎপাদন প্রক্রিয়া একবার শুরু হলে তা মাঝপথে বন্ধ করা যায় না। বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কারখানাগুলোতে জেনারেটর ও বড় ইউপিএসের ব্যাকআপ রাখতে হয়। গ্যাসের সংকটে জেনারেটর চালাতেও ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে জানিয়ে হালিমুজ্জামান বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠানের ডিজেল মজুতের সক্ষমতাও পর্যাপ্ত নয়। মজুত শেষ হয়ে গেলে দ্রুত ডিজেল সংগ্রহ করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যায়।