ফ্যাটি লিভার
লিভার শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। একটি সুস্থ লিভারে অল্প পরিমাণে চর্বি জমা থাকতে পারে, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমে গেলে তাকে বলে ফ্যাটি লিভার ডিজিজ।
লিভারের ওজনের ৫ থেকে ১০ শতাংশে ফ্যাট পৌঁছালে এই সমস্যা হয়। খাবার থেকে পাওয়া ফ্যাটি লিভারে জমা হতে হতে এ সমস্যা বড় আকার ধারণ করে। তাই ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হলে খাওয়া-দাওয়া সংক্রান্ত নানা সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ইত্যাদি হরমোনজনিত নানা অসুখেও ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। সাবধান না হলে এই অসুখে লিভারের ক্ষতি হতে পারে।
ফ্যাটি লিভার কেন হয় এবং এটি প্রতিরোধে করণীয় কী- এ সম্পর্কে একটি বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে দেশের লিভার বিশেষজ্ঞদের সংগঠন হেপাটোলজি সোসাইটি।
লিভারে চর্বি জমা হওয়ার বা ফ্যাটি লিভার হওয়ার প্রধান কিছু কারণ
অতিরিক্ত ক্যালরি ও পরিশ্রমের অভাব: বর্তমান যুগে প্রক্রিয়াজাত খাবারের আধিক্য এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ার ফলে শরীরে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ক্যালরি জমা হয়। যকৃৎ বা লিভার এই অতিরিক্ত ক্যালরিকে চর্বিতে রূপান্তর করে নিজের কোষে জমা করে রাখে।
লিভারে চর্বির পরিমাণ: সাধারণত লিভারের নিজস্ব ওজনের ৫-১০ শতাংশের বেশি চর্বি জমা হলে তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বলা হয়।
মেটাবলিক সিনড্রোম: এটি ফ্যাটি লিভারের অন্যতম প্রধান কারণ। যদি কোনও ব্যক্তির অতিরিক্ত ওজন (বিএম ২৫-এর বেশি), উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি এবং অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থাকে, তবে এই রোগগুলোকে একত্রে মেটাবলিক সিনড্রোম বলা হয়; যা ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
অন্যান্য শারীরিক সমস্যা: উৎস অনুযায়ী পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম, স্লিপ অ্যাপনিয়া (ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্ট হওয়া) এবং হাইপোথাইরয়েডিজমের মতো সমস্যার সঙ্গেও ফ্যাটি লিভারের যোগসূত্র রয়েছে।
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও বিষক্রিয়া: কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ (যেমন: টেমোক্সিফেন, ইস্ট্রোজেন, গ্লুকোকর্টিকয়েড ইত্যাদি) নিয়মিত সেবন, বিষক্রিয়া অথবা অন্ত্রে অতিরিক্ত ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির কারণেও লিভারে চর্বি জমতে পারে।
দ্রুত ওজন হ্রাস ও সার্জারি: খুব দ্রুত ওজন কমানো বা পাকস্থলির কোনও সার্জারির ফলেও অনেক সময় ফ্যাটি লিভার হতে দেখা যায়।
মদ্যপান: অ্যালকোহল সেবনের ফলেও ফ্যাটি লিভার হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস। এ ক্ষেত্রে করণীয় হলো-
ওজন নিয়ন্ত্রণ ও শারীরিক ব্যায়াম
ওজন কমানো: ফ্যাটি লিভারের প্রধান চিকিৎসা হলো শরীরের বাড়তি ওজন কমানো। গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের মোট ওজনের ৩-৫ শতাংশ কমালে লিভারের ফাইব্রোসিস উন্নত হয় এবং ১০ শতাংশ কমালে লিভারের প্রদাহ কমে যায়।
ব্যায়াম: শুধু ডায়েট নয়, সঙ্গে নিয়মিত শরীরচর্চা প্রয়োজন। প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট ব্যায়াম করা লিভারের চর্বি কমাতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর।
খাদ্যাভ্যাসের মূলনীতি
ক্যালরি কমানো: প্রতিদিনের প্রয়োজনের চেয়ে ২০০-৩০০ ক্যালরি কম খাবার গ্রহণ করতে হবে। তবে হঠাৎ খুব দ্রুত ওজন কমানো ঠিক নয়; সপ্তাহে আধ কেজি থেকে এক কেজি ওজন কমানো আদর্শ।
শর্করা: দৈনিক ক্যালরির ৪০-৫০ শতাংশ শর্করা থেকে আসা উচিত, তবে তা হতে হবে আঁশযুক্ত শর্করা যেমন-লাল চালের ভাত, আটা, ওটমিল বা বার্লি।
প্রোটিন ও চর্বি: দৈনিক খাদ্যের ২০ শতাংশ প্রোটিন এবং ৩০ শতাংশের কম চর্বি থাকা উচিত। সম্পৃক্ত চর্বি (যেমন-গরু বা খাসির মাংস) এড়িয়ে অসম্পৃক্ত চর্বি (যেমন-সামুদ্রিক মাছের তেল বা অলিভ অয়েল) গ্রহণ করা ভালো।
কী খাবেন এবং কী বর্জন করবেন
বর্জনীয় খাবার: চিনিযুক্ত খাবার, সফট ড্রিংকস (কোক, সেভেন আপ), কৃত্রিম জুস, প্যাকেটজাত মিষ্টি খাবার, ফাস্টফুড এবং ডুবো তেলে ভাজা খাবার পুরোপুরি পরিহার করতে হবে।
উপকারী খাবার: প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাকসবজি (পালং শাক, লাউ, পটল, করলা ইত্যাদি) এবং টক জাতীয় ফল (লেবু, আমলকী, জাম্বুরা, পেয়ারা) খাওয়া উচিত। এছাড়া প্রতিদিন ৩০ গ্রাম আখরোট খেলে লিভারের চর্বি উল্লেখযোগ্য হারে কমে।
দৈনিক খাবারের তালিকা যেমন হতে পারে
সকাল: আটার রুটি, ডিম (কুসুম ছাড়া বা সিদ্ধ) এবং প্রচুর সবজি।
দুপুর: অল্প পরিমাণ ভাত, মাছ বা মুরগির মাংস, ডাল ও সবজি বা সালাদ।
বিকাল: চিনি ছাড়া বিস্কুট, মুড়ি বা ফল।
রাত: দুপুরের মতোই অল্প পরিমাণ ভাত বা রুটি ও সবজি।
বিশেষ অবস্থার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে
১. কিডনি রোগ থাকলে
কিডনি সমস্যা থাকলে লিভারের ডায়েটের পাশাপাশি কিছু অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। কারণ কিডনি ঠিকমতো শরীরের বর্জ্য নিষ্কাশন করতে পারে না।
প্রোটিন নিয়ন্ত্রণ: প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাবার (মাছ, মাংস) মেপে খেতে হবে। প্রতি কেজি ওজনের জন্য শূন্য দশমিক ৭ থেকে ১ গ্রাম আমিষ বরাদ্দ থাকে। উদাহরণস্বরূপ, খাদ্য তালিকায় দুই টুকরা মাছ থাকলে তার বদলে এক টুকরা খেতে হবে।
লবণ ও পটাশিয়াম: দিনে দুই গ্রামের কম লবণ খেতে হবে এবং রান্নায় লবণের পরিমাণ কমাতে হবে। পটাশিয়ামযুক্ত ফল যেমন-কলা, ডাব, কমলা, মাল্টা, খেজুর ও অ্যাভোকাডো খাওয়া যাবে না; এর পরিবর্তে আপেল, পেয়ারা বা আঙুর খাওয়া যেতে পারে।
সবজি: রোগের তীব্রতা অনুযায়ী সবজির পরিমাণ কমাতে হতে পারে, বিশেষ করে টমেটো এবং অন্যান্য রঙিন সবজি কম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
২. গর্ভাবস্থায় খাদ্যাভ্যাস
গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি ক্যালরি গ্রহণ করতে হয়, তবে বিএমআই অনুযায়ী তা ভিন্ন হতে পারে।
স্বাভাবিক ওজনের ক্ষেত্রে (বিএম ২৫-এর নিচে): গর্ভাবস্থার চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ মাসে ৩০০ ক্যালরি এবং সপ্তম থেকে নবম মাসে ৫০০ ক্যালরি অতিরিক্ত গ্রহণ করতে হবে।
অতিরিক্ত ওজনের ক্ষেত্রে (বিএম ২৫-এর বেশি): এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ কিছুটা কম; দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে ১৫০ ক্যালরি এবং তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে ৩০০ ক্যালরি বেশি নিতে হবে।
৩. দুগ্ধদানকারী মায়ের খাদ্যাভ্যাস
সন্তানকে দুধ দান করছেন এমন মায়েদের জন্য স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ক্যালরি প্রয়োজন।
মায়ের বিএমআই ২৫-এর নিচে হলে স্বাভাবিক খাদ্য তালিকার সঙ্গে অতিরিক্ত ৫০০ ক্যালরি যোগ করতে হবে।
বিএমআই ২৫ এর বেশি হলে অতিরিক্ত ৩০০ ক্যালরি যোগ করতে হবে।
৪. মেটাবলিক সিনড্রোম
যদি ফ্যাটি লিভারের সঙ্গে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা রক্তে অতিরিক্ত চর্বি থাকে, তবে ডায়েট কন্ট্রোলের মাধ্যমে ওজন কমানো এই প্রতিটি সমস্যার জন্যই সমানভাবে উপকারী।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়
দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে জনবলের ঘাটতি পূরণে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতাধীন সারা দেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডের শূন্য পদে জরুরি ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (২০ আগস্ট) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমীর সই করা এক চিঠিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। চিঠিটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন সব পরিচালক, সিভিল সার্জন, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এবং সংশ্লিষ্ট উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালকদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগে অনুষ্ঠিত মাসিক সমন্বয় সভার সিদ্ধান্ত এবং সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের জনবল ঘাটতি পূরণে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে এ নিয়োগ কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিশেষ অনুরোধের কথা বলা হয়েছে নির্দেশনায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নন-মেডিকেল কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা-২০১৮ অনুযায়ী পদোন্নতি এবং সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডের সব শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
এছাড়া বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যেসব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে শূন্য পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও আবেদন গ্রহণ করা হলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হয়নি, সেসব প্রতিষ্ঠানে নতুন করে শূন্য পদের ছাড়পত্র নিয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে বলা হয়েছে। আগের সময়ে নেওয়া আবেদনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
নিয়োগ নিয়ে কোনো স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে মামলা বা প্রশাসনিক জটিলতা থাকলে তা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলোও সচল করার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, নন-মেডিকেল কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা-১৯৮৫ অনুযায়ী বিভাগীয় কার্যালয়সহ সিভিল সার্জনের নিয়ন্ত্রণাধীন কিছু স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ১৩তম গ্রেডের প্রধান সহকারী পদ রয়েছে। কিন্তু ২০১৮ সালের বিধিমালায় এসব পদ ১৪তম গ্রেড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় পদোন্নতিতে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ১৪তম গ্রেডে কর্মরত প্রধান সহকারী, উচ্চমান সহকারী বা সমমানের পদধারীদের ১৩তম গ্রেডের শূন্য পদে নিজ বেতনে বা চলতি দায়িত্বে পদায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
নিয়োগ কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। দেশের সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের নিয়োগসংক্রান্ত অগ্রগতির তথ্য নির্ধারিত ছকে প্রতি মাসের ৫ তারিখের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখায় পাঠাতে হবে। হার্ডকপির পাশাপাশি ই-মেইলেও এসব তথ্য পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সায়মা ওয়াজেদ পুতুল
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক সায়মা ওয়াজেদ পুতুল তাকে অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত চেয়েছেন।
ভারতের সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বুধবার এক প্রতিবেদনে লিখেছে, গত আট মাসে একাধিকবার ডব্লিউএইচও এবং সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়াসুসের কাছে বিষয়টি তুলেছেন পুতুল। সর্বশেষ গত মাসে আইনজীবীর মাধ্যমে পাঠানো চিঠিতে ডব্লিউএইচওর সিদ্ধান্তের বিষয়ে স্বচ্ছতা দাবি করার পাশাপাশি প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
২০২৩ সালের নভেম্বরে ভারতের নয়াদিল্লিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক কমিটির ৭৬তম অধিবেশনে সংস্থাটির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক নির্বাচিত হন পুতুল। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি পাঁচ বছরের জন্য ওই দায়িত্ব নেন।
ওই বছর অগাস্টের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন তার মা শেখ হাসিনা। এরপর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শেখ হাসিনার পাশাপাশি পুতুলকেও কয়েকটি দুর্নীতি মামলায় আসামি করা হয়। তার চার মাস পর, ২০২৫ সালের ১১ জুলাই পুতুলকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে পাঠায় ডব্লিউএইচও। সে সময় একজনকে ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হলেও ইতোমধ্যে তার মেয়াদ শেষ হয়েছে।
গতবছর নভেম্বরে প্লট দুর্নীতির অভিযোগে এক মামলায় পুতুলকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে ঢাকার একটি আদালত। তার আগে তাকে ধরতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারিরও আদেশ দিয়েছিল আদালত।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুতুল অভিযোগ করেছেন, ‘যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই’ ডব্লিউএইচও বাংলাদেশের তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের ‘অনুরোধে’ তাকে ছুটিতে পাঠিয়েছে। এমনকি ওই সিদ্ধান্তের কারণও তাকে স্পষ্ট করে জানায়নি।
তিনি ডব্লিউএইচওর বিরুদ্ধে ‘পক্ষপাত ও হয়রানির’ অভিযোগও তুলেছেন। পাশাপাশি, জানতে চেয়েছেন, এক বছরের বেশি সময় ধরে ছুটিতে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত চলেছে কি না।
সূত্রের বরাত দিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ডব্লিউএইচও পুতুলের কয়েকটি ইমেইলের প্রাপ্তি স্বীকার করলেও তার অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো স্পষ্ট জবাব দেয়নি।
সংস্থাটির মহাপরিচালক কর্মীদের কাছে পাঠানো এক ইমেইলে পুতুলকে ছুটিতে পাঠানোর বিষয়টি জানান। ওই ইমেইলে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের আপত্তি, পুতুলের নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন এবং দুদকের মামলা—এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে তাকে ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, তাদের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আর ডব্লিউএইচও এক ইমেইল বার্তায় পুতুলের ‘ছুটিতে থাকার’ বিষয়টি তুলে ধরে বলেছে, “কর্মীদের অভিযোগ জানানোর জন্য নির্ধারিত মাধ্যম রয়েছে। তবে গোপনীয়তা বজায় রাখার স্বার্থে আমরা নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নিয়ে মন্তব্য করি না।”
সূত্রের বরাত দিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, ডব্লিউএইচও সরাসরি দুদক ও তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ‘কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করেছে’ বলে অভিযোগ করেছেন পুতুল।
নয়াদিল্লিতে এসইএআরও-এর আঞ্চলিক পরিচালক পদে তার মনোনয়নে ভোট দেওয়া ভারতসহ অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের কাছে ‘বিকৃত তথ্য’ উপস্থাপন করে ‘সম্মানহানি’ করা হয়েছে বলেও তার অভিযোগ ।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, ভারত সরকার ‘উপযুক্ত মাধ্যমে’ বিষয়টি ডব্লিউএইচওর কাছে তুললেও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
একটি সূত্র ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেছেন, “একটি রাজনৈতিক অনুরোধ পাওয়ার পরপরই সায়মা ওয়াজেদকে ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তটি ডব্লিউএইচওর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থি। স্বয়ং তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়াসুস যখন নিজ দেশ ইথিওপিয়া থেকে একই ধরনের রাজনৈতিক আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন, তখন সংস্থার প্রতিক্রিয়া এমন ছিল না।”
ওই সূত্রটি আরও বলেছে, “ঢাকায় পুতুলের অনুপস্থিতিতে বিচার করে তাকে পলাতক ঘোষণা করা হয়েছে। একজন নির্বাচিত আঞ্চলিক পরিচালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে বাইরের রাজনৈতিক প্রভাব কতটা যাচাই-বাছাই করা হয়েছে, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা ডব্লিউএইচও এখনও দেয়নি।”
পুতুলের দাবি, তার যোগ্যতা ও স্বাস্থ্যখাতে অবদানকে ‘পাশ কাটিয়ে, কেবল শেখ হাসিনার মেয়ে হওয়ার কারণেই’ তাকে বাংলাদেশ সরকারের ‘ইশারায়’ নিশানা বানানো হয়েছে।
সূত্রের বরাত দিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, প্রথমে পুতুলকে সবেতনে ছুটিতে পাঠানো হলেও, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলায় কয়েক মাস পর তাকে 'বিনা বেতনে প্রশাসনিক ছুটিতে' পাঠানো হয়।
২০২৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক নির্বাচনে ১০ ভোটের মধ্যে ভারতের ভোটসহ আটটি ভোট পেয়েছিলেন পুতুল।
আরেকটি সূত্রের বরাত দিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, “সায়মাকে যারা নির্বাচিত করেছিল, সেই সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়াই একটি তড়িঘড়ি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ওই ম্যান্ডেট পরিবর্তন করা হয়েছে। আঞ্চলিক পরিচালকরা মূলত তাদের নির্বাচিত করা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছেই দায়বদ্ধ।”
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমটি বলছে, বর্তমানে আঞ্চলিক পরিচালকের পদটি শূন্য ঘোষণা করা না হলেও নির্বাচিত পরিচালক সায়মাকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর জন্য ‘ক্রমাগত চাপ’ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
আপনার প্রতিদিনের ক্লান্তি কেবল কাজের চাপ নয়, বরং এর পেছনে থাকতে পারে গভীর কোনো কারণ। বিশ্ববিখ্যাত স্বাস্থ্যবিষয়ক পোর্টাল হেলথলাইন-এর এক প্রতিবেদনে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি বা অবসাদ অনেক সময় জীবনযাত্রার ভুল অভ্যাস কিংবা শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো রোগের লক্ষণ হতে পারে।
নিচে আপনার অতিরিক্ত ক্লান্তির ১২টি প্রধান কারণ ও প্রতিকার তুলে ধরা হলো:
১. পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুমের অভাব: ঘুমের সময় শরীর তার প্রয়োজনীয় মেরামত কাজ এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমোন নিঃসরণ করে। কেবল কয়েক ঘণ্টা ঘুমানো যথেষ্ট নয়, ঘুমের মান ভালো হওয়া জরুরি। ঘুমের অভাব সরাসরি শরীরকে অবসাদগ্রস্ত করে তোলে।
২. পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি: অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায় ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানোর পরও ক্লান্তি যাচ্ছে না। এর কারণ হতে পারে আয়রন, ভিটামিন বি২ (রিবোফ্লাভিন), নিয়াসিন বা ভিটামিন বি১২-এর অভাব। সুষম খাবার গ্রহণের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব।
৩. দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ: অতিরিক্ত মানসিক চাপ শরীর ও মনকে নিস্তেজ করে দেয়। দীর্ঘদিনের স্ট্রেস থেকে ‘এক্সহশন ডিসঅর্ডার’ বা অবসাদজনিত সমস্যা তৈরি হতে পারে।
৪. অপ্রকাশিত শারীরিক সমস্যা: যদি কোনো কারণ ছাড়াই সবসময় ক্লান্ত লাগে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। থাইরয়েড সমস্যা (হাইপোথাইরয়েডিজম), ডায়াবেটিস, স্লিপ অ্যাপনিয়া বা ডিপ্রেশন ক্লান্তির বড় কারণ হতে পারে।
৫. ভারসাম্যহীন খাদ্যাভ্যাস: শরীরের শক্তি বজায় রাখতে পুষ্টিকর খাবারের কোনো বিকল্প নেই। অতিরিক্ত প্রসেসড ফুড বা চিনিযুক্ত খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা ওঠানামা করিয়ে আপনাকে দ্রুত ক্লান্ত করে ফেলে।
৬. অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ: কফি বা এনার্জি ড্রিংক সাময়িকভাবে চাঙা ভাব দিলেও এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা উল্টো ফল দেয়। বেশি ক্যাফেইন ঘুমের সাইকেল নষ্ট করে দেয়, যা পরের দিন আপনাকে আরও বেশি ক্লান্ত করে তোলে।
৭. পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন: শরীরের প্রতিটি জৈবিক প্রক্রিয়ার জন্য পানি অপরিহার্য। পর্যাপ্ত পানি পান না করলে শরীরের শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং অবসাদ দেখা দেয়।
৮. অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা: শরীরের বাড়তি ওজন হৃদরোগ বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি শরীরকে দ্রুত ক্লান্ত করে ফেলে। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখলে কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
৯. মাদক ও অ্যালকোহলের প্রভাব: যারা নিয়মিত অ্যালকোহল বা মাদকাসক্ত, তাদের শরীরে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি এবং অবসাদ বাসা বাঁধে।
১০. শিফট ডিউটি ও অনিয়মিত রুটিন: কাজের প্রয়োজনে যাদের নিয়মিত শিফট পরিবর্তন করতে হয়, তাদের ঘুমের স্বাভাবিক চক্র বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ ব্যাহত হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তির অন্যতম কারণ।
১১. অলস জীবনযাপন: সারাদিন বসে থাকা বা শারীরিক পরিশ্রম না করা শরীরকে আরও দুর্বল করে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত হালকা ব্যায়াম বা শারীরিক কার্যকলাপ শরীরের শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
১২. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: রক্তচাপের ওষুধ, স্টেরয়েড বা অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্টের মতো কিছু ওষুধের প্রভাবেও শরীর সবসময় ক্লান্ত থাকতে পারে।
পরিত্রাণের উপায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্লান্তি দূর করতে প্রথমে আপনার ঘুমের পরিবেশ উন্নত করুন এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনুন। তবে যদি জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার পরও ক্লান্তি না কমে, তবে দেরি না করে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। মনে রাখবেন, আপনার শরীর আপনার চেয়ে ভালো আর কেউ বোঝে না; তাই অস্বাভাবিক ক্লান্তিকে অবহেলা করবেন না।
মাইক্রোপ্লাস্টিক
প্লাস্টিক প্রাকৃতিকভাবে পচনশীল নয়। এটি পরিবেশে শত শত, এমনকি হাজার হাজার বছর টিকে থাকতে পারে। এই প্লাস্টিক ধীরে ধীরে ভেঙে আরও ছোট ছোট কণায় পরিণত হয়, যাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক মাটি, নদী ও সমুদ্রে জমা হতে থাকে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করেছে। এর অর্থ- আমরা যে মাছ, মুরগি, কৃষিপণ্য ও সামুদ্রিক খাবার খাই, তাতে মাইক্রোপ্লাস্টিক মিশে থাকতে পারে।
স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
প্লাস্টিক যখন ভেঙে অতি ক্ষুদ্র ন্যানো আকারের কণায় পরিণত হয়, তখন সেগুলো খাবার, পানি, এমনকি শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এই ক্ষুদ্র কণাগুলো হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে।
নারীদের ক্ষেত্রে ফাইব্রয়েড, এন্ডোমেট্রিওসিস ও পিএমওএসের মতো হরমোনজনিত সমস্যা বাড়ায়। পুরুষদের ক্ষেত্রে শুক্রাণুর গুণমান ও টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যেতে পারে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক সময়ের আগে বয়ঃসন্ধি বা বিলম্বিত বয়ঃসন্ধি ঘটাতে পারে। শিশুর বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। মাইক্রোপ্লাস্টিকের সঙ্গে ফুসফুস, স্তন ক্যানসার, প্রোস্টেট ও লিভার ক্যানসারের মতো রোগের যোগসূত্র রয়েছে। এ ছাড়া অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার ও পিত্তনালির ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় মাইক্রোপ্লাস্টিক।
মাইক্রোপ্লাস্টিক অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমকে ব্যাহত করতে পারে। এই কণাগুলো অন্ত্রের আস্তরণে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, যা খাদ্য সংবেদনশীলতা থেকে শুরু করে অটোইমিউন রোগ ও মাানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হতে পারে।
করণীয়
শিশুদের জন্য
কী খাওয়া যেতে পারে
নীল, বেগুনি, লাল ফল ও সবজিতে অ্যান্থোসায়ানিন থাকে। এটি মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারে।
তাই খাদ্যতালিকায় ডালিম, ড্রাগন, বিট, গাজর, স্ট্রবেরি, চেরি, ব্লুবেরি, লাল পেঁয়াজ ইত্যাদি রাখতে হবে।
বর্তমান সময়ে হাড়, জোড়া ও মেরুদণ্ডজনিত রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এসব জটিল রোগের আধুনিক চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন বিশিষ্ট অর্থোপেডিক ও স্পাইন সার্জন ডাঃ নাবিল যুনায়েদ সিডনী।
দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও মানবিক আচরণের কারণে রোগীদের কাছে তিনি আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
তিনি এমবিবিএস ও ডি-অর্থো (বিএসএমএমইউ) ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ অর্থোপেডিক সোসাইটি, এশিয়া প্যাসিফিক অর্থোপেডিক অ্যাসোসিয়েশন, এশিয়া প্যাসিফিক স্পাইন সোসাইটি ও ইন্ডিয়ান অর্থোপেডিক সোসাইটির লাইফ মেম্বার হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে তিনি নিয়মিত আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি ও গবেষণার সঙ্গে নিজেকে আপডেট রাখছেন।
গুরুতর দুর্ঘটনায় আহত বহু রোগীর ক্ষেত্রে, যেখানে অঙ্গচ্ছেদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, সেখানে ডাঃ নাবিল যুনায়েদ সিডনী সফলভাবে বিকল্প চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীদের সুস্থ করে তুলেছেন।
ঝিনাইদার বাইক দুর্ঘটনায় আহত তপু রায়ের পা কেটে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হলেও তাঁর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিয়ে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন।
সম্প্রতি নোয়াখালীর এক যুবক ভয়াবহ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হলে তাঁকে শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ডাঃ নাবিল যুনায়েদ সিডনির নিবিড় চিকিৎসায় টানা ৯৭ দিন পর ওই রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সক্ষম হন।
বর্তমানে তিনি শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক, ট্রমা ও স্পাইন সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি নতুন চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনাও দিয়ে যাচ্ছেন নিয়মিত।
বাংলাদেশে প্রতিবছরই বাড়ছে ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, দেশটিতে প্রতিবছর বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে ভুগে এক লাখ ১৬ হাজার পাঁচশ' জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন।
সংস্থাটির হিসাবে, একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন এক লাখ ৬৭ হাজারেরও বেশি মানুষ। যদিও বাস্তবে সংখ্যাটি আরও বেশি হবে বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। শুধু ঢাকার জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালেই গতবছর সাড়ে ৪২ হাজারের মতো ক্যান্সার রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩১ হাজারই নতুন রোগী।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, বাংলাদেশে বর্তমানে ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা তিন লাখ ৪৬ হাজারের মতো, যা ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বেশি।
একই সময়ে ক্যান্সার আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার বেড়েছে প্রায় আট শতাংশ। প্রাপ্ত বয়স্ক নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশুরাও ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে শিশুদের হার প্রায় দুই দশমিক চার শতাংশ।
২০২৫ সালে প্রকাশিত ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির মানুষ ৩৮ ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। এর মধ্যে পুরুষরা ফুসফুস, খাদ্যনালী, মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সারে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে, নারীদের মধ্যে স্তন, জরায়ুমুখ এবং ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে গবেষণা প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু সার্বিকভাবে দেশে কোন কোন ধরনের ক্যান্সার বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সেটার পেছনে কারণ কী, চলুন জেনে নেওয়া যাক।
খাদ্যনালীর ক্যান্সার
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে খাদ্যনালির ক্যান্সারে। ২০২২ সালে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে এই ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৪২ হাজারেরও বেশি। প্রতিবছর আরও ২৫ হাজারের বেশি মানুষ এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ১৫ দশমিক এক শতাংশ।
নারীদের তুলনায় পুরুষরাই খাদ্যনালির ক্যান্সারে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। আক্রান্তের হারের মতো এ ধরনের ক্যান্সারে মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবছর বাংলাদেশে যে সোয়া এক লাখ মানুষ ক্যান্সারে ভুগে মারা যাচ্ছেন, তাদের মধ্যে খাদ্যনালির ক্যান্সারে প্রাণ হারাচ্ছেন ২৪ হাজারের বেশি।
ক্যান্সারের মোট মৃত্যু হারের হিসেবে এটি প্রায় ২০ দশমিক নয় শতাংশ।
মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সার
আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, বর্তমানে দেশে এমন ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৪০ হাজারের কিছু বেশি।
এছাড়া প্রতিবছর ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষ এই ক্যান্সারে নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার এবং নারীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। এ রোগে ভুগে প্রতিবছর মারা যাচ্ছেন প্রায় সাড়ে নয় হাজারের মতো মানুষ, যা ক্যান্সারের মোট মৃত্যুর প্রায় আট দশমিক এক শতাংশ।
২০২৬ সালে প্রকাশিত জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর তাদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে আট দশমিক ৭১ শতাংশই এসেছিলেন মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সার নিয়ে।
ফুসফুসের ক্যান্সার
মৃত্যুহার বিবেচনায় খাদ্যনালির ক্যান্সারের পরেই রয়েছে ফুসফুসের ক্যান্সার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, এ ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবছর বাংলাদেশে ১২ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন।
সংস্থাটির হিসেবে, বর্তমানে বাংলাদেশে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার। প্রতিবছর নতুন করে আরও প্রায় ১৩ হাজার মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর মধ্যে দশ হাজার জনই পুরুষ।
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল বলছে, ২০২৫ সালে তাদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে ১৮ শতাংশই ছিল ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত।
সংখ্যার হিসেবে সেটি সাড়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি বলে হাসপাতালের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্তনের ক্যান্সার
বাংলাদেশের নারীরা যেসব ক্যান্সারে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন, সেগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে স্তনের ক্যান্সার।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটিতে ক্যান্সার আক্রান্ত নারীদের মধ্যে ৩৬ দশমিক চার শতাংশই স্তনের ক্যান্সারে ভুগছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৩৫ হাজারের বেশি নারী এ ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত।
প্রতিবছর নতুন করে আরও প্রায় ১৩ হাজার নারী স্তনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। সেইসঙ্গে, এর কারণে প্রায় প্রতি বছরই ছয় হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
জরায়ুমুখের ক্যান্সার
স্তনের ক্যান্সারের পর নারীদের মধ্যে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি জরায়ুমুখের ক্যান্সারে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশটিতে নারী ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে ১৯ শতাংশই প্রজনন সম্পর্কিত ক্যান্সারে ভুগছেন।
এর মধ্যে ১১ শতাংশই জরায়ুমুখের ক্যান্সারে ভুগছেন। এর বাইরে, পাঁচ শতাংশ ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে এবং তিন শতাংশ জরায়ু ক্যান্সারে আক্রান্ত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশ এখন সাড়ে ২৬ হাজারেরও বেশি নারী জরায়ুমুখের ক্যান্সারে ভুগছেন।
এছাড়া প্রতিবছর আরও প্রায় সাড়ে নয় হাজার নারী এই ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। একই সময়ে, পাঁচ হাজার আটশ' জনেরও বেশি নারী জরায়ুমুখের ক্যান্সারের কারণে মারা যাচ্ছেন।
কেন বাড়ছে?
ক্যান্সারের বিষয়ে বাংলাদেশে এখনো জাতীয়ভাবে কোনো তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা হয়নি। যতটুকু তথ্য উপাত্ত পাওয়া যায়, সেগুলো মূলত বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে সংগ্রহ করা।
কিন্তু চিকিৎসকরা বলছেন, আক্রান্তদের মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য অংশই হাসপাতালে যান না।
"ফলে ক্যান্সার আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যাটা যে আরও বড়, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই," গণমাধ্যমকে বলছিলেন জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, দেশে প্রতিবছরই ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। পরিবেশ দূষণ এক্ষেত্রে অনেকটা দায়ী বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা।
"বায়ু দূষণের সঙ্গে ফুসফুসের ক্যান্সার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আর আমাদের দেশের বাতাস যে মাত্রায় দূষিত, তাতে এখানে সুস্থ থাকাটা খুবই কঠিন," বলছিলেন ডা. সুমন।
একইসঙ্গে, খাদ্যাভ্যাসসহ মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রার কারণেই ক্যান্সার বাড়ছে।
"বিশেষ করে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, ধূমপান করা বা তামাকপাতা সেবন ইত্যাদি কর্মকাণ্ড ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে," বলেন ডা. সুমন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্যদেশের তুলনায় বাংলাদেশের নারীরা কম বয়সে স্তন ও জরায়ুর ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন।
"সারা পৃথিবীতে যেভাবে ব্রেস্ট ক্যান্সার পাওয়া যায় বয়স্ক নারীদের মধ্যে, আমাদের দেশে সেখানে বেশিরভাগ রোগী পাচ্ছি ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে," বলছিলেন ডা. সুমন।
তবে সঠিক সময়ে টিকা গ্রহণ এবং সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে স্তন ও জরায়ুর ক্যান্সার কমানো সম্ভব বলে মনে করেন চিকিৎসকরা।
"আমাদের দেশে ইতোমধ্যে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হলেও সেগুলোর কাভারেজ এখনও অনেক কম। ফলে টিকা কাভারেজ বাড়ানোর পাশাপাশি ক্যান্সার বিষয়ে যদি সবাইকে সচেতন করে তোলা যায়, তাহলে নারীদের মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার- উভয়ই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে,"জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. সুমন।