ইরানে লক্ষ্য অর্জনে যা যা প্রয়োজন, সবই করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানে হামলায় যোগ দিয়ে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রটির প্রেসিডেন্ট কী লক্ষ্য অর্জন করতে চান?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনও ‘শাসন পরিবর্তন’কে যুদ্ধের লক্ষ্য বলে বর্ণনা করছেন। কখনও বলছেন, ইরান যেন পারমাণনিবক অস্ত্র বানাতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে চান তিনি।
তিনি কখনো বলেন, যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে, আবার কখনো বলছেন, তা অনেক দীর্ঘ হতে পারে। ইরানে হামলার পর এ কয়েক দিনে গোটা মধ্যপ্রাচ্যই যুদ্ধের মঞ্চে পরিণত হয়েছে, এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে? এই আলোচনা এখন সামনে এসেছে।
প্রায় দুই দশক আগে ইরাকে যে অজুহাতে হামলা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, এবারও প্রায় একই অজুহাত সামনে আনা হয়েছে, যার কোনো গোয়েন্দাভিত্তি নেই। বরং এরকম এক যুদ্ধ গোটা বিশ্বকে অর্থনৈতিক সংকটের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আরেকটি ঝুঁকির দিকে ইঙ্গিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন, আর তা হল- একটি সন্দেহজনক যুক্তির উপর ভিত্তি করে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দিতে পারে। যা শেষ পর্যন্ত হাজার হাজার সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু ঘটাতে পারে। এছাড়া এই যুদ্ধ আগামী বছরগুলোতে মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে নতুন ‘সন্ত্রাসী হামলার ভিত্তিও’ তৈরি করতে পারে।
আরেকটি বিকল্প পরিস্থিতির কথাও বলেছে সিএনএন। সেটি হল-এই হামলার মাধ্যমে ট্রাম্প যদি এ অঞ্চলে ৫০ বছরের জন্য ইরানের হুমকি কমিয়ে আনতে পারেন এবং সে দেশে স্বাধীনতার সূচনাকে ত্বরান্বিত করতে পারেন।
গত শনিবার সকালে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরু করে। হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। রাজনৈতিক ও সামরিক শীর্ষ পর্যায়েরও কয়েকজন নিহত হয়েছেন হামলায়।
গত সোমবার হোয়াইট হাউজে এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরানে হামলা চালানোর এটিই ছিল ‘শেষ সেরা সুযোগ’। এ পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, “একটি অসুস্থ ও পাপিষ্ঠ শাসনব্যবস্থা থেকে আসা অসহনীয় হুমকি দূর করতেই আমরা বর্তমানে এই পদক্ষেপ নিচ্ছি।”
গত গ্রীষ্মে পরিচালিত ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন, “সেই অভিযানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার পর আমরা তাদের সতর্ক করেছিলাম অন্য কোথাও নতুন করে পারমাণবিক কেন্দ্র না গড়তে। কিন্তু তারা সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে পারমাণবিক অস্ত্রের পেছনে ছোটা অব্যাহত রেখেছে।”
ইরানে এবারের মার্কিন অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে, ‘এপিক ফিউরি বা মহাতাণ্ডব’। ইসরায়েল নাম দিয়েছে ‘রোরিং লায়ন বা গর্জনরত সিংহ’।
‘হামলা বাড়াবে যুক্তরাষ্ট্র’
খামেনির বিদায়ের পর যা আশা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, তা এখনও দেখা যায়নি ইরানে, অর্থাৎ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ইরানিরা এখনো রাস্তায় নামেনি। চারদিকে যখন শোকের মাতম আর বিশৃঙ্খলা ঘনিয়ে উঠছে, ঠিক তখনই তেহরানের ক্ষমতার অলিন্দ থেকে নাটকীয়ভাবে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়েছেন প্রবীণ এক ঝানু রাজনীতিবিদ আলি লারিজানি।
গত রোববার তিনি জানিয়েছেন, দেশে একটি ‘অস্থায়ী পরিচালনা পরিষদ’ গঠন করা হবে। এই ঘোষণা দিয়ে তিনি যেন বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছেন, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি না থাকলেও ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো স্থিতিশীল আছে।
খামেনির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও অত্যন্ত বিশ্বস্ত কৌশলবিদ হিসেবে বিবেচিত লারিজানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানকে ধ্বংসের চেষ্টার অভিযোগ আনেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী’ এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চাইলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
এ অবস্থায় মঙ্গলবার চতুর্থ দিনে প্রবেশে করেছে যুদ্ধ। সিএনএন লিখেছে, ইরানে হামলা বাড়াবে যুক্তরাষ্ট্র। সিএনএনকে এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে সবথেকে বড় হামলা এখনো চালানো হয়নি।
সিএনএন সঞ্চালক জেক ট্যাপারকে তিনি বলেন, “আমরা তাদের ওপর চরম আঘাত হানছি। মনে হয় খুব ভালোভাবেই এগোচ্ছে। অত্যন্ত শক্তিশালী একটি অভিযান। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সামরিক বাহিনী আছে আমাদের। আমরা সেটি ব্যবহার করছি।”
ট্রাম্প বলেন, “আমরা এখনো তাদের ওপর খুব কঠোরভাবে আঘাত শুরুই করিনি। বড় ঢেউটি এখনো আসেনি। সেটি আসছে খুব শিগগিরই।” মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোতে ইরানের আক্রমণকে ‘বড় বিস্ময়’ বলে বর্ণনা করেন ট্রাম্প।
তিনি বলেন, “আমরা অবাক হয়েছি। আমরা তাদের (আরব দেশগুলোকে) বলেছিলাম, ‘আমরা এটি সামলে নেব’। কিন্তু এখন তারা লড়াই করতে চাইছে। তারা বেশ আগ্রাসীভাবেই লড়াই করছে। তাদের ভূমিকা খুব সামান্যই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন তারা এতে যুক্ত হওয়ার জন্য জোরাজুরি করছে।”
সিএনএন বলছে, ইরানের নেতৃত্বের যারা এখনো টিকে আছেন, তারাও ‘আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা উসকে দিতে সংকল্পবদ্ধ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পরিণতি কী হতে পারে?
• বিমান অভিযান চালিয়ে রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্রের লক্ষ্যস্থলগুলোতে ধ্বংসাত্মক হামলা করলে এটি জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ ও প্রতিবাদের জোয়ার সৃষ্টি করতে পারে, যা দীর্ঘ সময় ধরে চলা ক্ষমতা কেন্দ্রের ওপর চাপ তৈরি করবে এবং একটি নতুন ইরান মধ্যপ্রাচ্যকে বদলে দিতে সক্ষম হতে পারে।
• ইরানের বাকি নেতৃত্ব নতুন শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলে পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে যে যেন দেশটি আর আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে কার্যকরভাবে দাঁড়াতে না পারে।
• খারাপ যা ঘটতে পারে, তা হল- ইরানের পরিস্থিতি লিবিয়ার মতো হতে পারে। বছরের পর বছর ধরে চলা কতৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর নেতৃত্ব শূন্যতা তৈরি হতে পারে। গোষ্ঠীগত লড়াই বা গৃহযুদ্ধ লেগে যেতে পারে, যা ছড়িয়ে পড়তে পারে অঞ্চলজুড়ে, উদ্বাস্তু সংকট তৈরি হতে পারে এবং ইরানের ইউরেনিয়াম মজুদ উগ্রপন্থিদের হাতে চলে যেতে পারে।
গত সোমবার রয়টার্সের এক সাংবাদিক জানিয়েছেন সীমান্ত পেরিয়ে তুরস্কে ঢুকছে শত শত ইরানি।
সে দিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসবিদ ও বৈশ্বিক নীতি বিশারদ ম্যাক্স বুট কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস সম্মেলনে বলেছেন, “ট্রাম্প যে যুদ্ধ শুরু করেছেন, তা অযৌক্তিক এবং অবৈধ। তবে এর মানে এই নয় যে এটি ব্যর্থ হবে।” তিনি একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সমালোচনা করেন।
তবে ইরানের সামরিক বাহিনী এখনো সক্রিয় থাকায় দেশটির শাসক গোষ্ঠীকে উৎখাত করাটা ‘কঠিন’ মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা-সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা ডেভিড পেট্রাউস।
কারণ হিসেবে সংস্থার সাবেক এ পরিচালক বলেন, “সমস্যা হলো, কোনো দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া বেশ কঠিন, যদি সেখানে লাখ লাখ সদস্যের সশস্ত্র ও সংগঠিত বাহিনী মাঠে উপস্থিত থাকে।” ট্রাম্প বলেছিলেন ইরানে তিনি স্থলবাহিনী মোতায়েন করবেন না।
এ অবস্থায় ইরানে সরকার পরিবর্তন না হলেও এই অভিযানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র হয় বেশ কিছু লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে বলে মনে করেন ডেভিড পেট্রাউস।
তবে সোমবার নিউ ইয়র্ক পোস্ট পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, “ইরানে মার্কিন স্থলসেনা পাঠানো নিয়ে আমার কোনো জড়তা নেই। অন্য প্রেসিডেন্টরা যেমন বলেন, স্থলভাগে কোনও সেনা মোতায়েন করা হবে না। আমি তা বলি না। আমি বলি, সম্ভবত তাদের (স্থলসেনা) প্রয়োজন নেই অথবা যদি প্রয়োজন হয় (তবে পাঠানো হবে)।”
কী চলছে ইরানে
বিবিসি লিখেছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র শনিবার ইরানের সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ও নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে যে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে, তাতে ১৯৮৯ সাল থেকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে ইরানকে নেতৃত্ব দেওয়া আলি খামেনি নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী-আইডিএফ দাবি করেছে, খামেনির সঙ্গে নিহত হয়েছেন ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদের প্রধান, সেনাবাহিনীর চিফ অফ স্টাফ এবং ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)-এর প্রধানের মতো শীর্ষস্থানীয় কয়েক ডজন কর্মকর্তা।
মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৮৭ জনে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট।
সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক হামলায় অন্তত ১৫৩টি শহর আক্রান্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ৫০৪টি স্থান লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। আর নথিভুক্ত হামলার সংখ্যা ১০৩৯-এ পৌঁছেছে।
খামেনির মৃত্যুতে সাত দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং ৪০ দিনের শোক পালনের জন্য দেশের সব সরকারি এবং সাধারণ কার্যক্রম স্থগিত রাখা হবে। সরকার শোককাঠিন্যকে “জাতির একত্রিত ক্ষতি” হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিবিসি লিখেছে, সোমবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে যে তারা ওমান উপসাগরে ইরানের ১১টি জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে, ওই এলাকায় ইরানের আর কোনো জাহাজ নেই।
ইরানের পাল্টা হামলা
ইরানের পাল্টা হামলায় ইসরায়েল, কুয়েত, আরব আমিরাতেও মৃত্যুর খবর এসেছে। নিহতদের মধ্যে মার্কিন সেনাও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত সাতটি দেশে মার্কিন স্থাপনা ইরানের হামলার লক্ষ্যস্থল।
মঙ্গলবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে ড্রোন হামলা হয়েছে। এর পর সৌদি আরবের বিভিন্ন মিশনে তাদের সব ধরনের সেবা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে।
কুয়েতে মার্কিন দূতাবাস ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দূতাবাস এক্স পোস্টে বলেছে, “আমরা সব ধরনের নিয়মিত এবং জরুরি কনস্যুলার অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করেছি।”
এর আগে সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ‘গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকির’ কারণ দেখিয়ে কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের বাণিজ্যিক মাধ্যমে দেশত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছিল।
বাহরাইনে একটি মার্কিন বিমানঘাঁটির প্রধান কমান্ড সদর দপ্তর ইরানের হামলায় ধ্বংস হওয়ার খবর এসেছে।
গত সোমবার অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ড্রোন হামলায় তাদের দুটি ডেটা সেন্টার অঞ্চলে ‘সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত’ হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় নতুন করে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান আশপাশের যেসব শহরকে পাল্টা হামলার নিশানা বানিয়েছে, দোহা সে তালিকার একটি।
আল জাজিরা লিখেছে, এর আগে সোমবার কাতারের বিমান বাহিনী তাদের আকাশসীমায় দুটি ইরানি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে এবং কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির মুসাফাহ এলাকায় একটি জ্বালানি ট্যাংক টার্মিনালে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। ওমান, জর্ডান ও ইরাকেও মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে ইরান। ইরানের সমর্থনে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা করছে। ইসরায়েল পাল্টা লেবাননের বৈরুতে হামলা করেছে।
জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আলি বাহরাইনি জেনেভায় সাংবাদিকদের বলেন, “যদি কোনো প্রতিবেশী দেশের কোনো ঘাঁটি অন্য কোনো দেশে হামলা বা আক্রমণ চালানোর জন্য ব্যবহার করা হয়, তবে সেই ঘাঁটি ইরানের জন্য একটি বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য হবে।”
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কী প্রভাব?
উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চলার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
ইরানের হামলার কারণে কাতার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে, যে কারণে সোমবার ইউরোপে গ্যাসের দাম হঠাৎ করেই ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়।
আল জাজিরা জানিয়েছে, দিনের শুরুতেই দাম ২৫ শতাংশ বেশি ছিল। কাতার এনার্জির উৎপাদন বন্ধের খবরের পর সেই ঊর্ধ্বগতি আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
ইরানের ড্রোন হামলা জেরে সৌদি আরবের রাস তানুরা শোধনাগার আংশিক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সোমবার দেশটির জ্বালানি মন্ত্রী এ তথ্য দিয়েছেন। সেদিন সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে আরামকোর একটি তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা হয়।
বিবিসি লিখেছে, ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বিশ্বের তেল-গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হয় এই প্রণালী হয়ে।
সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালীতে তিনটি জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার খবরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম সোমবার প্রতি ব্যারেল ৮২ ডলারে উঠেছে।
আসলে কী চায় যুক্তরাষ্ট্র?
ইরানে কেন যুক্তরাষ্ট্র হামলা করেছে? ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে কী এ বিষয়ে স্পষ্ট কারণ রয়েছে?
হামলার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা একেক সময় একেক যুক্তি দিচ্ছেন। ফলে এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী, এ বিষয়ে যদি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বিভ্রান্তি থাকে, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।
সিএনএন লিখেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থান ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা বদলানো। ইরানিদের ‘স্বাধীনতা’ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষাও ব্যক্ত করেছেন তিনি। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংসের অঙ্গীকার করেছেন তিনি, যদিও এর আগে ১২ দিনের হামলায় তাদের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসের দাবি করেছিলেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সোমবার জোর দিয়েই বলেছেন, ইরানি সন্ত্রাসী বা ইরাকে মার্কিন দখলদারিত্বের সময় ইরান সমর্থিত মিলিয়াশিয়াদের হাতে আমেরিকানদের হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়া প্রয়োজন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হামলার যুক্তি হাজির করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আগাম হামলা চালিয়েছে কারণ তারা জানতেন ইসরায়েলে হামলার পরিকল্পনা করছে এবং তাতে ওই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনী ইরানের পাল্টা হামলার শিকার হতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এ ধরনের বক্তব্যে বোঝা যায়, কী কারণে যুদ্ধে জড়িয়েছেন সেটি তারা জানে না। ফলে ইতোমধ্যে তাদের এই সামরিক অভিযান সমস্যায় পড়ে থাকতে পারে।
ডেমোক্রেটিক সেনেটর জিন সাহিন সোমবার সিএনএনকে বলেন, “সত্যি কোনো স্পষ্ট কৌশল নেই এবং প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে আমাদের শোনা দরকার তিনি কী চান।”
“সফল হলে এটি মধ্যপ্রাচ্যে একটি প্রকৃত মোড় ঘোরানোর সুযোগ হতে পারে। তবে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত কীভাবে ঘটবে, তা মোটেও স্পষ্ট নয়,” বলেন তিনি।
ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এই অস্পষ্টতা যেন অসঙ্গতিপূর্ণ নয়, বরং তার কৌশলেরই একটি অংশ। যুদ্ধে লক্ষ্য অনিশ্চিত রেখে তিনি রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করতে চান, যাতে যখন চাইবেন তখনই বিজয় ঘোষণা করতে পারেন।
তিনি যেন ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন- বৃহৎ পরিসরের স্থলযুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা ও অচলাবস্থার ঝুঁকি তৈরি করে।
কিন্তু আকাশ হামলার মাধ্যমে কোনো দেশের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন ও অনুগত শাসক বসানোর একমাত্র নজির চিন্তা করা কী সম্ভব? যদিও ট্রাম্প বলেছেন, কিছু সমালোচকের কথায় তিনি বিরক্ত নন, যারা বলছেন-ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে গেলে তার নিজের ক্ষমতায় থাকা নিয়ে তারা সন্দিহান।
সিএনএন লিখেছে, ট্রাম্প ইতোমধ্যেই যুদ্ধে লক্ষ্য সীমিত করে এনেছেন বলে মনে করা হয়েছে।
গত সোমবার তিনি বলেছেন, তাদের পরিকল্পনা হল ইরানে নৌবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূর্চি ও ভবিষ্যৎ পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্খা ধ্বংস করা। মনে হচ্ছে তিনি এবং হেগসেথ দুজনই আগে থেকেই ব্যর্থতার অজুহাত তৈরি করে রাখছেন, যাতে ইরানের বর্তমান পুনর্গঠিত হলে সে দেশের জনগণের ঘাড়েই দোষ চাপানো যায়, ‘তোমরাই তো সুযোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছ’।
হেগসেথ বলেছেন, “আমি মনে করি ইরানিদের প্রতি প্রেসিডেন্টের বার্তা স্পষ্ট। ইরানের জনগণ: এটা তোমাদের সময়।”
কিছু বিশ্লেষক ভেনিজুয়েলায় মাদুরাকে উৎখাত প্রসঙ্গ টেনেছেন। মাদুরাকে ধরে আনার পর ভেনিজুয়েলায় অন্তর্বর্তী নেতা ডেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু বহু দশক ধরে চেষ্টা করেও ইরানে মধ্যপন্থি কোনো নেতাকে যুক্তরাষ্ট্র খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছে।
এমনকি খামেনিকে হত্যা করার পর এখনও এমন কোনো নেতা খুঁজে পায়নি তারা। যে অজুহাতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র, সেই অভিযোগকে নাকচ করে দিল আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)।
সংস্থাটির প্রধান, মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি এনবিসি নিউজকে বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ইরানের কোনো সমন্বিত কর্মসূচির প্রমাণ তারা পাননি। ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য কোনো সুশৃঙ্খল ও পরিকল্পিত কর্মসূচির আলামত শনাক্ত হয়নি।
‘শিগগিরই আগ্রহ হারাবে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র’
আল জাজিরা লিখেছে, নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ও কৌশলগত পর্বে এগিয়ে থাকতে পারেন—যদিও এই ‘জয়’ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে মূলত তাদের স্বল্পমেয়াদি স্বার্থের ঐক্যের কারণে।
তবে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু পরস্পরের প্রতি পুরোপুরি আস্থাশীল নন। উভয় পক্ষের সহযোগিতার ক্ষেত্রটি মূলত তাৎক্ষণিক স্বার্থে সীমাবদ্ধ—দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ঐক্যের ভিত্তি স্পষ্ট নয়।
মনোযোগ সরে গেলে, দুজনই এক অনিশ্চিত যুদ্ধের মুখোমুখি হবেন। ট্রাম্প দ্রুত অভিযান গুটিয়ে নেওয়ার চাপ অনুভব করতে পারেন, যেখানে নেতানিয়াহু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার কৌশল নিতে পারেন।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় জনসমর্থন ও রাজনৈতিক ধৈর্য ট্রাম্পের নেই—এমন অভিযোগ উঠছে। তিনি স্থলবাহিনী মোতায়েন করতে পারবেন না বলেই বারবার ইরানিদের ‘সহায়তা করা’ বা তারা নিজেদের দেশ নিয়ন্ত্রণে নিলে ‘পাশে থাকার’ বার্তা দিচ্ছেন। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ শুরুর অভিযোগ, সম্ভাব্য মার্কিন হতাহতের ঝুঁকি এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে তিনি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু-ট্রাম্পের এই ‘অস্বস্তিকর’ জোটটি ধীরে ধীরে গড়ে উঠলেও স্বল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে পড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত তাদের অর্জন ‘বড় মূল্য দিয়ে সীমিত সাফল্য লাভ’ হয়ে থাকতে পারে।
কতদিন চলবে এ যুদ্ধ?
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচিত করবে যে বিশেষজ্ঞ পরিষদ, তার এক সদস্য বলেছেন, নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া ‘দীর্ঘায়িত’ হবে না।
আলি মোআলেমি বলেছেন, নতুন নেতা নির্বাচনের সময় ‘ব্যক্তিগত পছন্দ’ বা রাজনৈতিক ও দলীয় গোষ্ঠীর প্রাধান্য যে বিবেচ্য হবে না, সেই বিষয়ে শপথ নিয়েছেন বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্যরা। তিনি বলেন, “বিপ্লবের শহীদ নেতার মতোই একজনকে নির্বাচিত করবে বিশেষজ্ঞ পরিষদ।”
মিডল ইস্ট মনিটর লিখেছে, ইসলামি ঐতিহ্যে, বিশেষ করে শিয়া ইতিহাসচেতনায়, শহীদ হওয়া পরাজয়ের প্রতীক নয়। বরং এটি ‘স্রষ্টার সঙ্গে অঙ্গীকারের প্রতি সর্বোচ্চ আনুগত্যের’ প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
খামেনির মৃত্যু ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ তিনি ‘সাম্রাজ্যবাদ ও জায়নবাদের’ বিরুদ্ধে কয়েক দশক ধরে সংগ্রাম করে গেছেন।
খামেনির মৃত্যু ইরানে গভীর জাতীয় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এর পরপরই ইরানি কর্তৃপক্ষ প্রতিশোধ নেওয়া এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা ঘোষণা করেছে। এতে আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ হত্যাকাণ্ড আঞ্চলিক উত্তেজনা ও সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। খামেনির এই ‘কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ড’ একটি মোড় পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যে ঘটনাকে তার বিরোধীরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আঘাত হিসেবে ভেবেছিল, সেটিই উল্টো ব্যাপক জনসমাবেশ ও সংগঠনের শক্তিশালী প্রেরণা হয়ে উঠতে পারে। ফলে এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে যাচ্ছে কি না, সে আলোচনাও সামনে এসেছে।
গত শনিবার ট্রাম্পের এক বক্তব্যের বরাতে বিবিসি লিখেছে, ইরানের ওপর হামলা ‘সপ্তাহজুড়ে বা যতদিন প্রয়োজন অব্যাহত থাকবে’। তবে পরে তিনি আরও দীর্ঘ সময়সীমার ইঙ্গিত দেন।
গত রোববার নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ একই গতিতে অভিযান চালিয়ে যেতে পারে।
গত সোমবার হোয়াইট হাউসে তিনি বলেন, “শুরু থেকেই আমরা চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের কথা বলেছি, তবে আমাদের সক্ষমতা এর চেয়েও অনেক দীর্ঘ সময় ধরে চালানোর।”
এই যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে, এমন প্রশ্নে তিনি সিএনএনকে বলেছেন, “প্রায় এক মাস। আমি চাই না এটি খুব দীর্ঘ হোক। আমি সবসময় ভেবেছি এটা চার সপ্তাহ চলবে।”
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ শেষ হতে ‘কিছুটা সময় লাগলেও তা বছরের পর বছর চলবে না’।
নেতানিয়াহু অবশ্য এই সংঘাতকে আগের দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধগুলোর মতো দেখতে নারাজ, জানিয়েছে রয়টার্স।
ফক্স নিউজের ‘হ্যানিটি’ অনুষ্ঠানে সোমবার তিনি বলেন, “আমি বলেছিলাম এটি দ্রুত ও চূড়ান্ত হতে পারে। এতে কিছুটা সময় লাগতে পারে, কিন্তু এটি বছরের পর বছর ধরে চলবে না। এটি কোনো অন্তহীন যুদ্ধ নয়।”
পাকিস্তানে আফগান শিক্ষার্থীদের মেডিকেল শিক্ষা স্থগিত
পাকিস্তানে আফগান শিক্ষার্থীদের মেডিকেল ও ডেন্টাল পড়ালেখা স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির শিক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘পাকিস্তান মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল’ (পিএমডিসি) । পাশাপাশি বর্তমানে অধ্যয়নরত আফগান শিক্ষার্থীদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পিএমডিসির প্রকাশিত এক দাপ্তরিক চিঠির বরাতে আফগান বার্তা সংস্থা খামা প্রেস জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানের সব সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ আদেশ কার্যকর থাকবে।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকারের উচ্চপর্যায়ের জাতীয় নীতিগত নির্দেশনা এবং গত ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত পিএমডিসির বৈঠকের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নতুন এই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আফগান শিক্ষার্থীদের জন্য চিকিৎসাবিদ্যা ও দন্ত চিকিৎসায় নতুন ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।
পাশাপাশি ইতোমধ্যে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা স্থগিত রেখে আফগানিস্তানে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। পড়াশোনা চলাকালে পাকিস্তানের এক মেডিকেল বা ডেন্টাল প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলি বা স্থানান্তরের সুবিধাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অন্যদিকে যেসব আফগান শিক্ষার্থী ইতিমধ্যে কোর্স শেষ করেছেন, তাদের ডিগ্রি অর্জন এবং পাকিস্তান ছাড়ার বিষয়টি প্রামাণিকভাবে নথিবদ্ধ ও নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল এবং ডেন্টাল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজকে তাদের প্রতিষ্ঠানে পড়া আফগান শিক্ষার্থীদের যাবতীয় তথ্য আগামী তিন দিনের মধ্যে পিএমডিসির কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে।
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তথ্য জমা দিতে ব্যর্থ হলে, বিলম্ব করলে বা তথ্য গোপন রাখা হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে পিএমডিসি।
পাকিস্তানের মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার মান ও পেশাগত নিবন্ধন নিয়ন্ত্রণ করে থাকে সংবিধিবদ্ধ সংস্থা পিএমডিসি। সংস্থাটির এই আকস্মিক পদক্ষেপে দেশটিতে অবস্থানরত আফগান শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা শিক্ষা অর্জনের পথ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
মর্কিন সেনা
মার্কিন সেনাকে হত্যা বা আটক করে ইরানের সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করতে পারলে ৩০ হাজার ডলার পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। কোনো ইরানি নারী এ কাজ করলে পুরস্কারের পরিমাণ দ্বিগুণ করা হবে বলে জানিয়েছেন দেশটির সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি। রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএকে দেওয়া বক্তব্যে হাতামি এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, বিপুলসংখ্যক মানুষ ‘আর্থিক জিহাদে’ অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করায় এ পুরস্কারের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
হাতামি বলেন, কোনো ব্যক্তি কোনো ‘আগ্রাসী মার্কিন সামরিক সদস্যকে’ হত্যা বা আটক করে ইরানের সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করলে তাকে ৩০ হাজার ডলার বা ৫ বিলিয়ন ইরানি তোমান পুরস্কার দেওয়া হবে। কোনো ‘সাহসী ইরানি নারী’ এ কাজ করলে তিনি দ্বিগুণ পুরস্কার পাবেন।
তবে মার্কিন সেনাদের কোথায় বা কখন হত্যা কিংবা আটকের চেষ্টা করা হবে, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি ইরানের সেনাপ্রধান।
হাতামি আরও বলেন, কোনো ব্যক্তি মার্কিন সেনাকে হত্যায় যে অস্ত্র ব্যবহার করবেন, সেটি দ্বিগুণ দামে কিনে নেওয়া হবে এবং তাকে নতুন একটি অস্ত্র দেওয়া হবে। ব্যবহৃত অস্ত্রটি পরে একটি পরিকল্পিত জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে ইরানের ভূখণ্ডে মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েনের কোনো তথ্য নেই। গত এপ্রিলে একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর একজন মার্কিন বিমানসেনাকে উদ্ধারে অভিযান চালানো হয়েছিল।
এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবি আবারও জানিয়েছেন হাতামি। তিনি বলেন, পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর কিংবা হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের অনুমতি যুক্তরাষ্ট্রের আর নেই।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত কয়েক মাসে হামলা ও পাল্টা হামলা হয়েছে। বর্তমানে সংঘাতের বড় অংশ দক্ষিণ ইরান ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও বড় কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি এখনো দেখা যায়নি।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরান কয়েকটি শর্ত দিয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের দাবিও রয়েছে। প্রণালিটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর দুই দেশের উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
এদিকে ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি এর আগে ট্রাম্পকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ‘বিপজ্জনক রসিকতা’ না করার সতর্কতা দেন। তিনি বলেন, ইরানকে নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য করা বড় ভুল এবং প্রয়োজনে ইরানি যোদ্ধারা ট্রাম্পের ‘পা ভেঙে’ দিতে পারে।
বর্তমান সংঘাতে এ পর্যন্ত ১৭ মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। নিহতদের কেউই ইরানের ভেতরে মারা যাননি; জর্ডান ও ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলায় একটি হোটেলে আগুন লেগে অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার ভোরে তারাপীঠ মন্দিরের কাছে এ ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে; খবর ভারতীয় গণমাধ্যমের।
এনডিটিভি জানিয়েছে, বীরভূমের মন্দির শহর তারাপীঠের একটি পাঁচতলা হোটেলের নিচতলায় ভোর প্রায় সাড়ে ৪টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। তখন হোটেলের অধিকাংশ অতিথি ঘুমিয়ে ছিল। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
খবর পেয়ে দমকল বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কিন্তু ততক্ষণে আগুনে দগ্ধ হয়ে ও ধোঁয়ায় দমবদ্ধ হয়ে অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়। হোটেলটির নিচতলার অধিকাংশই পুড়ে যায়।
আহতদের উদ্ধার করে নিকটবর্তী রামপুরহাট সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হোটেলের মালিক কল্যাণ পাল আনন্দবাজার পত্রিকাকে বলেন, “আমাদের এখানে রাতে পাহারার দায়িত্বে যারা ছিলেন তার সঙ্গে সঙ্গে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র সচল করেন, বিদ্যুৎ সরবরাহের তার বিচ্ছিন্ন করেন। কিন্তু ততক্ষণে আগুন হোটেলের সাজসজ্জার ফাইবার আবরণগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।
“ধোঁয়া পাঁচতলা পর্যন্ত উঠে যায়। আতঙ্কিত অতিথিরা ঘর ছেড়ে বাইরে এসে আগুনের মধ্যে পড়ে যান। পিছন দিক দিয়ে বের হওয়ার দরজা থাকলেও অন্ধকারের মধ্যে সেটা কেউ খুঁজে পাননি। তারা রিসেপশনের সামনে দিয়ে বের হতে শুরু করলে আগুন দগ্ধ হন।”
হোটেলের উপরের তলাগুলোতে অনেকে আটকা পড়েছিলেন। তবে আগুন দোতালার উপরে উঠেনি। তাই তারা বেঁচে যান। হোটেলটির অধিকাংশ অতিথিই পুণ্যার্থী। তারা তারাপীঠ মন্দিরে পূজা দিতে এসেছিলেন। মৃতদের নাম, পরিচয় জানা যায়নি।
দমকল বিভাগের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়।
ঘটনার খবর পেয়ে নিকটবর্তী থানা থেকে পুলিশ হাজির হয়েছে ও তদন্ত শুরু করেছে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক (ফাইল ফটো)
মিয়ানমারের সামরিক সমর্থিত সরকার শনিবার (১৫ আগস্ট) জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে বাংলাদেশের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে থাকা ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে তারা প্রস্তুত। রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের নয় বছর পূর্তির প্রাক্কালে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘোষণা দিলো। মিয়ানমারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জুলাইয়ের শেষ নাগাদ বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন শরণার্থীর তালিকা তারা যাচাই করেছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের পরিচয় যাচাই করা সম্ভব হয়েছে। যাচাই করা ব্যক্তিদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আরও ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় সফলভাবে যাচাই করা যায়নি। এছাড়া ৪ হাজার ২৪১ জন ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত ছিলেন বলে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যাচাই করা এসব সাবেক বাসিন্দাকে ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে মিয়ানমার।
এদিকে রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে- এমন দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছে মিয়ানমার। দেশটির দাবি, ২০১৭ সালের সহিংসতার পর ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে যায়। আর উত্তর রাখাইনে ২ লাখের বেশি মানুষ থেকে যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ দুই বছরের একটি প্রত্যাবাসন কাঠামোতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালে দেশটির সেনাবাহিনী নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়। এতে মিয়ানমারে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে ব্যাপক সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়। এরপর থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগগুলো বাস্তবে কার্যকর হয়নি।
২০২৩ সালে রাখাইনভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নতুন করে সংঘাত শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলা এই যুদ্ধে আরও বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। জীবন বাঁচাতে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। বর্তমানে রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জীবনযাত্রার অবনতি, আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তায় বড় ধরনের কাটছাঁট এবং মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা না থাকায় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় বাধ্য হচ্ছেন। অযোগ্য ও অনিরাপদ নৌযানে করে তারা মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উদ্দেশে সমুদ্র পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করছেন।
জুলাইয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানান, মিয়ানমার তার দেশে বসবাসরত ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে। এটি একটি প্রত্যাবাসন উদ্যোগের অংশ বলে তিনি জানিয়েছিলেন। তবে সে সময় মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হান উইন অং এপি’কে জানান, ওই কর্মসূচি শুধু মালয়েশিয়ার আটককেন্দ্রে থাকা যাচাই করা মিয়ানমারের নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য।
রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে মিয়ানমার সরকার সম্মত হয়েছে- এমন প্রতিবেদনও তিনি নাকচ করে দিয়েছিলেন। সর্বশেষ বাংলাদেশে থাকা তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিয়ে রাজি হয়েছে দেশটি। তবে এতেও দেশটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ভয়াবহ দমন-পীড়নের মুখে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
এর আগে থেকেই কয়েক দফা সহিংসতার কারণে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে বসবাস করছিলেন। এসব সহিংসতা মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অভিযানের ফলে সংঘটিত হয়েছিল। ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানের ব্যাপকতা, পরিকল্পনা ও নৃশংসতার কারণে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের ব্যাপক অভিযোগ তোলে।
মিয়ানমার, যা আগে বার্মা নামে পরিচিত ছিল, দেশটির ১৩৫টি স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর একটি হিসেবে রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দেয় না। বরং তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করে। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
ছবি : সংগৃহীত
ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে আজ শনিবার ৭ দশমিক ৭ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প এবং তা পরবর্তী একের পর এক পরাঘাতের ঘটনায় অন্তত ৩৮ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা।
এদিকে উদ্ধারকর্মীরা উপকেন্দ্রের সবচেয়ে কাছের এলাকাগুলোয় পৌঁছাতে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভোররাতের এই ভূকম্পনের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দ্বীপরাষ্ট্রটির বেশ কিছু এলাকায় ১ মিটারের কম উচ্চতার সুনামি ঢেউ রেকর্ড করা হয়। তবে ভূমিকম্পের প্রায় তিন ঘণ্টা পর সুনামি সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়।
দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার প্রধান সুহারিয়ান্তো এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গতকাল শুক্রবার বেলা ৩টা পর্যন্ত ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে ও ১৩ জন আহত হয়েছেন। প্রায় ২ হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে সরে গেছেন।
এর আগে বন্দর নগরী মাউমেরের উদ্ধার সংস্থার প্রধান ফাতুর রহমান জানান, সেখানে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ২০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, আহত হয়েছেন ৬ জন এবং ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়ে আছেন ২ জন। ইন্দোনেশিয়ার বিশাল দ্বীপপুঞ্জের পূর্বাঞ্চলীয় ফ্লোরেস দ্বীপের সিক্কা রেজেন্সির প্রধান শহর হলো এই মাউমেরে।
সুহারিয়ান্তো জানান, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকটি ভবনে এখনো বাসিন্দারা আটকা পড়ে আছেন এবং ভূমিধসের কারণে কয়েকটি সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
উপকেন্দ্রের সবচেয়ে কাছের অঞ্চল নাগেকেওতে এখনো উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি এবং সেখানকার যোগাযোগের ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলে নিশ্চিত করেছেন ফাতুর। তিনি জানান, সড়কপথে গাড়িতে করে নাগেকেও যাওয়ার চেষ্টা ভূমিধসের কারণে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আরেকটি দল ফেরিতে করে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
ইস্ট নুসা টেঙ্গারা প্রদেশের গভর্নর এমানুয়েল মেলকিয়াদেস লাকা লেনা এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ঘুমের মধ্যে ধসে পড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে অন্তত ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ইস্ট নুসা টেঙ্গারার তালিবুরা গ্রামের ৫১ বছর বয়সী বাসিন্দা নোনা বলেন, ভূমিকম্পটি ছিল প্রচণ্ড শক্তিশালী, ধাক্কাটা এতই তীব্র ছিল যে প্রাণ বাঁচাতে আমরা সবাই দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসি।
ইন্দোনেশিয়ার ভূপ্রকৃতিবিদ্যা সংস্থা বিএমকেজি জানিয়েছে, ভোর ৪টা ৫৮ মিনিটে ১৫ কিলোমিটার গভীরে প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে এবং পরবর্তী সময় বেশ কয়েকটি পরাঘাত রেকর্ড করা হয়।
ইন্দোনেশিয়া প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অগ্নিবলয়ে অবস্থিত, যা একটি ভূকম্পন সক্রিয় অঞ্চল। পৃথিবীর ভূত্বকের বিভিন্ন টেকটোনিক প্লেটের মিলনস্থল হওয়ায় এই অঞ্চলে প্রচুর সংখ্যায় ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে থাকে।
বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ফ্লাইট ডেক থেকে উড্ডয়ন করছে একটি এফ/এ-১৮ই সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমান। ৩১ জুলাই ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর দায়িত্ব পালন শেষে কবে নাগাদ ফেরা যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পাঠানো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর নাবিক ও সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটেছে। একই সঙ্গে তাঁদের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নাবিকদের পরিবার ও সহকর্মীরা। সম্প্রতি এ উদ্বেগের কথা সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরেছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
সান ডিয়েগোতে অনুষ্ঠিত এক উত্তপ্ত টাউন হল সভায় নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হাং কাও এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সামনে তাঁরা এ ক্ষোভ উগরে দেন। সভায় উপস্থিত দুই নাবিকের স্ত্রী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সান ডিয়েগোর ওই সভায় আনুমানিক ২০০ জন উপস্থিত ছিলেন। সেখানে অংশ নেওয়া এক নাবিকের স্ত্রীর ভাষ্য, সভার দিনই তিনি তাঁর স্বামীর কাছ থেকে একটি বার্তা পান।
অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি কর্মকর্তাদের জানান, তাঁর স্বামী তাঁকে লিখেছেন যে ‘তিনি আশা করেন আগামীকাল যেন তাঁর আর ঘুম না ভাঙে।’
ওই নারী আরও জানান, সভায় উপস্থিত নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই সুনির্দিষ্ট বা আবেগঘন বক্তব্যের কোনো সরাসরি জবাব দেননি। তবে জাহাজে থাকা নাবিকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী, চ্যাপলিন (ধর্মীয় শিক্ষক) এবং চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত সুবিধা রয়েছে বলে আশ্বস্ত করেন তাঁরা।
একই সঙ্গে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুদ্ধজাহাজটিতে আরও বেশি মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ পাঠানোর কাজ চলছে বলে জানান নৌবাহিনীর সেই কর্মকর্তারা।
টানা ২৫০ দিন সমুদ্রে: চরম ক্লান্তি ও হতাশায় মার্কিন নাবিকেরা
গত সপ্তাহের সভায় যে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে, তার সঙ্গে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় নাবিক ও তাঁদের পরিবারের পক্ষ থেকে স্বাধীনভাবে সামরিক সংবাদমাধ্যম ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর কাছে ব্যক্ত করা মতামতের হুবহু মিল রয়েছে।
বর্তমানে কর্মরত নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সাক্ষাৎকার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রু সদস্যদের ডজনখানেক মন্তব্য ও পোস্ট থেকে এ সংকটের গভীরতা স্পষ্ট। তাঁদের বিবরণ অনুযায়ী, চরম ক্লান্তি ও মনোবল ভেঙে পড়ায় নাবিকেরা প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন। এর মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তার মতো গুরুতর বিষয় যেমন রয়েছে, তেমনি অন্তত একজন ক্রু সদস্যকে জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া থেকে বিরত রাখার ঘটনাও ঘটেছে।
নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অস্বাভাবিক ও অত্যন্ত কঠিন এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন এ যুদ্ধজাহাজের নাবিকেরা। মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের অধীন ৪০ দিন ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধাভিযানে অংশ নিতে হয়েছে তাঁদের। সব মিলিয়ে সমুদ্রে টানা ২৫০ দিন পার করার এক নজিরবিহীন ধকল সামলাচ্ছেন তাঁরা।
গত নভেম্বরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েনের উদ্দেশ্যে এ বিমানবাহী রণতরি সান ডিয়েগো ত্যাগ করেছিল। তবে পরে সেটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে কোনো ধরনের বন্দরবিরতি বা যাত্রাবিরতি ছাড়াই সমুদ্রে রেকর্ডসংখ্যক দিন পার করে আট মাসের বেশি সময় ধরে মোতায়েন রয়েছে যুদ্ধজাহাজটি।
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান সফল করতেই ক্রুদের এ দীর্ঘ সময় পার করতে হয়েছে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, গত মে মাসে এ মিশন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা বাড়ানো হয়েছে। তবে কবে নাগাদ তাঁরা ফিরতে পারবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ প্রকাশ করেনি মার্কিন প্রশাসন।
সভায় মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যার ঝুঁকি নিয়ে পরিবারের সদস্যরা যে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, সে বিষয়ে নৌবাহিনী ঠিক কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয়নি। তবে নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রণতরিটিতে পরামর্শক, চ্যাপলিন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, অন্যান্য জরুরি সহায়তাসহ মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক বা ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
খাদ্য-পানির সংকট, বাড়ি ফিরতে চান ৫ হাজার সেনা
মার্কিন নৌবাহিনী গত সোমবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘নাবিকদের মানসিক সুস্থতা পর্যবেক্ষণ ও বজায় রাখার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রতিনিয়ত মূল্যায়ন বা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে যাচ্ছে।’
এদিকে প্রতিশোধ বা আইনি জটিলতার আশঙ্কায় এ প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়া নাবিকদের স্ত্রী, পরিবারের অন্য সদস্য ও কর্তব্যরত নাবিকদের নাম-পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করা হয়েছিল। ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’সেই অনুরোধের প্রতি সম্মান দেখিয়েছে।
পরিবারের সদস্য ও নাবিকদের অভিযোগ, আব্রাহাম লিংকন যুদ্ধজাহাজে থাকা প্রায় ৫ হাজার সেনাসদস্য চরম খাদ্য ও পানিসংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিঠি বা ডাক যোগাযোগে বিঘ্ন এবং একটানা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, যেখানে বিশ্রামের সুযোগ মেলাই ভার।
সাধারণত সাগরে থাকাকালীন নাবিকদের একঘেয়েমি ও ক্লান্তি দূর করতে নিয়মিত বিরতিতে বন্দরে যাত্রাবিরতি বা ‘পোর্ট কল’ দেওয়া হয়। তবে মোতায়েনের দীর্ঘ সময়ে আব্রাহাম লিংকনের ক্রুরা এমন কোনো স্বাভাবিক সুযোগ পাননি বললেই চলে।
মার্কিন নৌবাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী, রসদ সংগ্রহ, জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্রুদের বিশ্রামের জন্য সাধারণত প্রতি ৩০ থেকে ৪৫ দিন পরপর বিমানবাহী রণতরিগুলো কোনো না কোনো বন্দরে নোঙর করতে হয়।
যুদ্ধজাহাজটিতে থাকা এক নাবিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পুরো মোতায়েনজুড়ে আমরা কোনো বিরতি ছাড়াই জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করে গেছি।’ অথচ মোতায়েনের শুরুতে বিভিন্ন বন্দরে যাওয়া এবং বিশ্রামের আশায় সবার মনোবল বেশ চাঙা ছিল বলে তাঁর মন্তব্য।
বর্তমানে ক্রুদের মনোবল এতটাই ভেঙে পড়েছে যে তাঁরা সামনে কোনো বন্দরে বিশ্রামের সুযোগও চান না; বরং যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফেরার স্বার্থে যেকোনো বিরতি ত্যাগ করতে তাঁরা রাজি। সেই নাবিকের আকুতি, ‘এই মুহূর্তে আসলে আমাদের আর কোনো প্রত্যাশা নেই। আমরা শুধু বাড়ি ফেরার একটি সুনির্দিষ্ট তারিখ চাই।’
জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা: নাবিকের করুণ আকুতি
নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান পরিচালনা করা সামরিক জীবনেরই অংশ। তবে সেটি তাঁরা মেনে নিলেও অনেকেরই অভিযোগ, শারীরিক ও মানসিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা না করেই এ যুদ্ধজাহাজের ক্রুদের অস্বাভাবিক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে টানা যুদ্ধাভিযান চালাতে বাধ্য করা হচ্ছে।
গত জুলাই মাসে এক চিন্তিত অভিভাবক ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-কে দেওয়া এক চিঠিতে লেখেন, ‘আমার ছেলে বর্তমানে ওই যুদ্ধজাহাজে আছে। সে এবং তার সহকর্মীরা একটু স্বস্তি পেতে প্রতিনিয়ত জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার কথা ভাবছে, এটি শোনা একজন বাবার জন্য অত্যন্ত কষ্টের।’
নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে এই অভিভাবক আরও বলেন, ‘আমরা রাতে ঘরের নরম বিছানায় আরামে ঘুমাই, অথচ আমাদের প্রিয়জনেরা ওখানে যুদ্ধ করছে। তারা আসলে কিসের জন্য জীবন বাজি রাখছে, সেটিও তাদের কাছে স্পষ্ট নয়।’
জাহাজে থাকা একাধিক নাবিক জানিয়েছেন, কিছুদিন আগে এক ক্রু সদস্যকে জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছিল। এক নাবিকের ভাষ্য, ‘আমাদের এখানে এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে দায়িত্বরত প্রহরীদের এক নাবিককে সাগরে লাফ দেওয়া থেকে আটকাতে হয়েছিল।’ ঘটনাটি পুরো জাহাজের লাউডস্পিকারে ঘোষণার মাধ্যমে সব ক্রুকে জানানো হয়েছিল বলে তাঁদের দাবি।
তবে এই সুনির্দিষ্ট ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও মার্কিন নৌবাহিনী সরাসরি কোনো জবাব দেয়নি। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সাধারণ প্রশ্নের উত্তরে বাহিনী জানিয়েছে, ‘কর্তৃপক্ষ সব সময়ই পরিবারগুলোর কথা শুনতে, সেনাসদস্যদের পাশে দাঁড়াতে এবং আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের লক্ষ্য নিরাপদে ও সফলভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সম্পদ বা সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
নাবিক, তাঁদের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন, এর আগে আব্রাহাম লিংকন যুদ্ধজাহাজে খাবার রেশন করে দেওয়া, তীব্র পানির সংকট এবং টানা এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে কাপড় লন্ড্রি করতে না পারার মতো বড় সমস্যা তৈরি হয়েছিল। তবে এখন সেসব সমস্যার বড় অংশই সমাধান হয়েছে এবং চিঠি বা ডাক যোগাযোগের ব্যবস্থাও ক্রমান্বয়ে উন্নত হচ্ছে বলে তাঁদের মত।
মানসিক ভাঙন ও তীব্র হতাশা, তা-ও মিলছে না ফেরার তারিখ
গত জুলাইয়ের শুরুতে ওমানের একটি বন্দরে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির কারণে যুদ্ধজাহাজটিতে নতুন করে রসদ সরবরাহের সুযোগ হয়। ফলে দীর্ঘ কয়েক মাস পর ক্রুরা তাজা ফলমূল ও শাকসবজি পান বলে জানান এক নাবিক। তবে সে সময় অনেক নাবিককে জাহাজ থেকে নামার অনুমতি দেওয়া হলেও তাঁদের বন্দর এলাকার একটি সুরক্ষিত সীমানার মধ্যেই আটকে রাখা হয়েছিল।
এর আগে গত ডিসেম্বরেও ‘আব্রাহাম লিংকন’ গুয়াম দ্বীপে একটি সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি করেছিল। কিন্তু জাহাজে থাকা অনেক নাবিকই সেই সময় তীরে নামার সুযোগ পাননি বলে জানান তাঁদের স্ত্রীরা।
সেনাসদস্যদের জন্য নিয়মিত বন্দরবিরতির অভাব, ডাক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ঘাটতি নিয়ে এক নাবিকের স্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘নিজের মানুষের (নাবিক) এই অবস্থা দেখাটা দিন দিন অসম্ভব হয়ে উঠছে।’ অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমি চোখের সামনে আমার স্বামীকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেখছি। মনে হচ্ছে, তারা যেন সব আশাই হারিয়ে ফেলছে।’
নৌবাহিনী অবশ্য তাদের জবাবে উল্লেখ করেছে যে লিংকন যুদ্ধজাহাজটি বর্তমানে অত্যন্ত বৈরী ও যুদ্ধসংক্ষুব্ধ এক পরিবেশে দায়িত্ব পালন করছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী রসদ সরবরাহ কেন্দ্রগুলো সামরিক সংঘাতের কারণে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন বাহিনী রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রে মিশনের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর তালিকায় প্রথমে খাবার, তারপর স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী ও সবশেষে চিঠি বা ডাকের স্থান।
নৌবাহিনীর দাবি, যুদ্ধজাহাজ থেকে আসা সাম্প্রতিক প্রতিবেদন নিশ্চিত করছে যে সেখানে পরিষ্কার পানি, সচল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও প্রতিবেলার খাবারে দুটি আমিষের ব্যবস্থা রয়েছে। রসদ সরবরাহের এ প্রবাহ দিন দিন আরও উন্নত হচ্ছে।
গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত দুটি সভার (একটি সশরীর ও অন্যটি অনলাইনে) একটিতে নেভাল এয়ারফোর্সেসের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল ডগলাস ভেরিসিমো, নেভাল সারফেস ফোর্সেসের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল জোসেফ কাহিলসহ অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ভারপ্রাপ্ত নৌ সেক্রেটারি হাং কাও সশরীর উপস্থিত থাকলেও ভিডিও কলে যুক্ত ছিলেন না।
সভায় অংশ নেওয়া এক নারী কাও, ভেরিসিমো ও কাহিলকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনারা আমাদের এবং নেতৃত্বের মধ্যকার বিশ্বাসের জায়গাটি সম্পূর্ণ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন।’
সামরিক সংবাদমাধ্যম ‘ইউএসএনআই নিউজ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ১৬২ দিনের একটি মোতায়েন শেষে ঘরে ফেরার এক বছরের কম সময়ের মধ্যে সান ডিয়েগোর নিজস্ব বন্দর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে মোতায়েনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল লিংকন। কিন্তু এর পরপরই রণতরিটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয় এবং গত জানুয়ারি মাসে সেটি সেখানে পৌঁছায়। সেই থেকে আজ অবধি যুদ্ধজাহাজটি আরব সাগরেই অবস্থান করছে।
সামরিক নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা আব্রাহাম লিংকন কবে দেশে ফিরবে সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বলে জানান নাবিকদের স্ত্রীরা।
বিভিন্ন গবেষণায়ও দেখা গেছে, লিংকন যুদ্ধজাহাজের নাবিক এবং তাঁদের পরিবারের বর্ণনা করা এ পরিস্থিতিগুলো সমুদ্রে থাকা সেনাসদস্যদের জন্য তীব্র মানসিক চাপের অন্যতম প্রধান কারণ।
একাডেমিক জার্নাল ‘মিলিটারি মেডিসিন’-এ ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মোতায়েনকালে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম নিতে না পারা এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগই নাবিকদের সবচেয়ে বেশি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
বিমানবাহী রণতরি, ডেস্ট্রয়ার এবং উভচর যুদ্ধজাহাজে কর্মরত ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর পরিচালিত এ সমীক্ষায় আরও উঠে আসে যে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে জটিলতা এবং মানসিক চাপ কমানোর সুযোগের অভাবও তাঁদের বড় উদ্বেগের কারণ।
নৌবাহিনীতে দীর্ঘ ২০ বছর দায়িত্ব পালন করা ও চারবার মোতায়েন হওয়া অবসরপ্রাপ্ত চিফ পেটি অফিসার থমাস নাটজম্যান জানান, একটি মোতায়েন কবে শেষ হবে, তা না জানাটা নাবিকদের ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।
দীর্ঘ সময় সমুদ্রে কাটানোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে নাটজম্যান বলেন, ‘সেখানে কোনো সোম, মঙ্গল বা বুধবার নেই; প্রতিটি দিনই যেন একটি দিন। আপনি আপনার সাধ্যমতো ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করেন।’
সংকটের জায়গাটি উল্লেখ করে নাটজম্যান বলেন, ‘সমস্যা হলো, আপনি যখন অনেক লম্বা সময় সমুদ্রে থাকবেন, তখন মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা একটা সময় এসে থমকে যাবে আর ঠিক সেখান থেকেই মানসিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে শুরু করবে।’