ছবি : সংগৃহীত
যুদ্ধ নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্য মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করাকে রোববার নিজেদের ইতিহাসের ‘উজ্জ্বল মুহূর্ত’ হিসেবে অভিহিত করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ।
যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খানের মূল্যায়নও একই রকম।
তার ভাষায়, “আমার দীর্ঘ কূটনৈতিক জীবনে পাকিস্তানকে এত উঁচু অবস্থানে কখনও দেখিনি।”
পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্রের অতীত টানতে গিয়ে এই কূটনীতিক বলেন, “২০২২ সালে আমি যখন রাষ্ট্রদূত হিসেবে ওয়াশিংটনে যাই, তখন পরিস্থিতি ছিল খুব কঠিন। অথচ এখন পাকিস্তান সেই কাজটি করছে, যা করার কথা জাতিসংঘের।”
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘ড্রপ সাইট’ লিখেছে, ইরান যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে হাজির হওয়াটা অনেকের কাছে অপ্রত্যাশিত মনে হতে পারে। কিন্তু দেশটি এখন বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে বড় ধরনের ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনায় বসলেও তেহরান অবশ্য ইসলামাবাদকে খুব একটা ভরসা করে না।
রোববার ইরানের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই টুইটারে লেখেন, “পাকিস্তান আমাদের ভালো বন্ধু ও প্রতিবেশী। কিন্তু আলোচনার জন্য উপযুক্ত মধ্যস্থতাকারী নয়। মধ্যস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্বাসযোগ্যতাও তাদের নেই।
“তারা সবসময় ট্রাম্পের স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়। তারা যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটি কথাও বলে না।”
পাকিস্তান কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভালোবাসার পাত্র হয়ে উঠল, সেই আলোচনায় ‘ড্রপ সাইট’ লিখেছে, এটা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক চাপ ও নানা কৌশলের গল্প। একই সঙ্গে তা পাকিস্তানের রাজনীতিতে দেশটির সামরিক বাহিনীর আধিপত্য ধরে রাখার দক্ষতার প্রমাণও।
ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের কাছে আসার ঘটনাক্রম হিসেবে ২০২২ সালে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানক ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া; ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ‘কারচুপি করা’ এবং দেশটির সামরিক শক্তিকে আরো ক্ষমতাবান করার বিষয়গুলো সামনে এনেছে ‘ড্রপ সাইট’।
তবে নতুন এই সম্পর্ক আঞ্চলিক রাজনীতির অবয়বে পরিবর্তনের আশা জাগালেও তা দুর্বল ভিত্তির কারণে ধসে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
পাকিস্তানকে নিয়ে এখন যেসব প্রশংসা সংবাদমাধ্যমে আসছে, সেগুলোর কারণ হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে ইরান যুদ্ধে তাদের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাকে। কিন্তু এই গল্পের বুনন শুরু হয়েছে অনেক আগেই।
ইসলামাবাদে বার্নস
২০২১ সালের জুনে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ইসলামাবাদ সফর করেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা— সিআইএর পরিচালক উইলিয়াম জে. বার্নস।
ওই সময়ের খবর অনুযায়ী, তিনি ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করার জন্য পুরো একটা দিন অপেক্ষা করেছিলেন, কিন্তু সেই বৈঠক আর হয়নি।
ইমরান খানের কার্যালয় ফোনে বার্নসকে জানিয়ে দেয়, কূটনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী কেবল তার সমপর্যায়ের নেতার সঙ্গেই কথা বলবেন।
ওই সময় ইমরান খানের সমপর্যায়ের ব্যক্তি ছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, যিনি ওই বছরের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর ইমরান খানের ফোনালাপের অনুরোধ একাধিকবার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
বাইডেনের এই অস্বীকৃতি ছিল তার আগের প্রশাসনের অবস্থান থেকে অনেকটাই ভিন্ন।
২০১৯ সালের জুলাইয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় ইমরান খানকে হোয়াইট হাউজে সংক্ষিপ্ত বৈঠকের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। যদিও সেই বৈঠক চলে দেড় ঘণ্টার বেশি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইমরান খানের মধ্যে তখন উষ্ণ সম্পর্ক ছিল। বেশ কিছু বিষয়ে মিলও ছিল তাদের মধ্যে।
দুজনই রাজনীতির বাইরের মানুষ হিসেবে আশি ও নব্বইয়ের দশকে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এছাড়া দুজনই প্রায় একই সময়ে রাজনীতিক পরিচয়ে হাজির হন।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ট্রাম্প ও ইমরান খান আবার দেখা করেন। পরের বছরের জানুয়ারিতে তাদের আরেক দফা সাক্ষাৎ হয় হোয়াইট হাউজে।
কিন্তু বাইডেন প্রশাসনের কাছে ইমরান খান ছিলেন ‘পাকিস্তানের ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মাত্র।
দুই দশক ধরে মার্কিন কর্মকর্তারা অভিযোগ করে আসছিলেন, পাকিস্তান একদিকে তালেবানকে আশ্রয় দেয়, অন্যদিকে উপরে উপরে মিত্রতা দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শত শত কোটি ডলার সামরিক সহায়তা নেয়।
২০১১ সালে পাকিস্তানের সামরিক একাডেমির শহর অ্যাবোটাবাদে মার্কিন বাহিনী অভিযান চালিয়ে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে। ওই ঘটনার পর পাকিস্তাননের সামরিক বাহিনী বেশ সমালোচনায় পড়ে যায়। কারণ সেই অভিযান চালানো হয় ইসলামাবাদকে না জানিয়েই।
২০২০ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী মহল বলতে থাকে, ওয়াশিংটনের আফগানিস্তান ছেড়ে দেওয়া এবং পাকিস্তানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা উচিত।
ড্রপ সাইট লিখেছে, একই সময়ে সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করার জন্য চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু ইমরান খানের সরকার সেটি প্রত্যাখ্যান করে।
নীতিগতভাবে ইমরান খানের সরকার ওয়াশিংটন ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ— উভয়ের সঙ্গেই একটা কূটনৈতিক সীমারেখা টেনেছিল। কিন্তু ইমরানের খানের এই নীতির কারণে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ভাবতে শুরু করেছিল, দেশটি হয়ত আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
এমন মনোভাবের কারণেই ২০২১ সালের জুলাইয়ে ইমরানের অজান্তেই পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী সিআইএর ইসলামাবাদ স্টেশনের সাবেক প্রধানকে ওয়াশিংটনে লবিস্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়।
পাকিস্তানের জেনারেলরা যে নির্বাচিত সরকারের বাইরে নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করেছে, এ ঘটনা ছিল তার প্রাথমিক ইঙ্গিত।
‘সবই ক্ষমা করে দেওয়া হবে’
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ও ইউক্রেইনের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যায়। ওই সময় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে মোকাবেলা করাই ছিল তৎকালীন বাইডেন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।
মার্কিন কূটনীতিকরা বিভিন্ন দেশকে যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন।
রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ ঘিরে বিশ্ব যখন বিভক্ত হতে শুরু করে, তখন পাকিস্তান অপ্রত্যাশিতভাবে নিজেকে এই বিভক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে আবিষ্কার করে।
ওই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি, যেদিন রুশ বাহিনী ইউক্রেইনে প্রবেশ করে, সেদিন প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে পূর্ব নির্ধারিত একটি বৈঠক করতে মস্কোতে অবস্থান করছিলেন ইমরান খান।
সেই বৈঠকের কয়েক দিন আগে বাইডেনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে ফোন করে ইমরান খানকে রাশিয়া সফর বাতিল করার অনুরোধ জানান।
ফাঁস হওয়া সেই ফোনালাপ থেকে জানা যায়, সুলিভান সেদিন ইমরান খানের সফরের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন এবং ইউক্রেইন যুদ্ধে ইসলামাবাদকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। কিন্তু ইমরান খান সেই সতর্কতা তোয়াক্কা করেননি।
ওই বৈঠকের পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রাশিয়ার নিন্দা জানিয়ে আনা একটি প্রস্তাবে পাকিস্তান ভোটদানে বিরত থাকে।
ড্রপ সাইট লিখেছে, সবকিছু মিলিয়ে ক্ষুব্ধ মার্কিন কূটনীতিকরা গোপনে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদের এই বার্তা দেন যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই সম্পর্ক আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
২০২২ সালের ৭ মার্চ ওয়াশিংটনে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর সঙ্গে দেখা করেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আসাদ মজিদ খান।
সেই কথোপকথন পরে ফাঁস হয়ে যায়, যা পরবর্তী সময়ে ওয়াশিংটন-ইসলামাবাদ সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
ফাঁস হওয়া সেই কথোপকথন অনুযায়ী, লু সেদিন রাষ্ট্রদূতকে বলেছিলেন, একটি অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরান খানকে যদি ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তবে ইমরান খানের সরকারের প্রতি ওয়াশিংটনের ক্ষোভ প্রশমিত করা যাবে, অর্থাৎ ‘সব ক্ষমা করে দেওয়া হবে’ (এই বাক্যটি পরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের মুখ থেকে এসেছিল)।
এরপর ২০২২ সালের ৯ এপ্রিল পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সমর্থনে একটি অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
সামরিক বাহিনীর সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার ওয়াশিংটনকে এমন সব সুবিধা দিতে থাকে, যা ইমরান খান প্রত্যাখ্যান করেছিল।
কয়েক মাসের মধ্যেই পাকিস্তান ইউক্রেইনের জন্য কামানের গোলাসহ বিভিন্ন সামরিক রসদ সরবরাহকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়।
ফাঁস হওয়া নথিপত্র থেকে জানা যায়, এসব অস্ত্র মার্কিন প্রতিরক্ষা ঠিকাদার এবং তৃতীয় দেশের মধ্যস্থতায় পাঠানো হয়েছিল। পাকিস্তানের এসব রসদ ইউক্রেইনের অস্ত্রের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক বাহিনী যখন ব্যাপকভাবে নির্বাচনে কারচুপি করে ইসলামাবাদে পছন্দের সরকার বসায়, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা যুক্তরাষ্ট্র, কেউই কোনো কথা বলেনি।
পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র
২০২২ সালের ৯ এপ্রিল, যেদিন ইমরান খানের সরকারের পতন ঘটে, সেদিনই একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায় পাকিস্তান। ক্ষেপণাস্ত্রটি ছিল 'শাহীন-৩’। এটি পাকিস্তানের সবচেয়ে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।
পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ভারতকে মাথায় রেখে পরিচালিত হয়। কিন্তু সেদিন যে ক্ষেপণাস্ত্রটি পরীক্ষা করা হয়, সেটি ইসরায়েলেও আঘাত হানতে সক্ষম।
ক্ষেপণাস্ত্রের এই পরীক্ষার সূত্র ধরে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের উদ্বেগকে আবার সামনে আনা হয়।
যে সেনাপ্রধানের হাতে ইমরান খানের পতন ঘটে, সেই কামার জাভেদ বাজওয়ার ২০২২ সালের অক্টোবরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে ওয়াশিংটন সফর করেন। সফরটি হয় সেনাপ্রধান হিসেবে তার মেয়াদের শেষ মাসে।
সফরকালে বাজওয়া মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভানসহ বাইডেন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
সেসব বৈঠকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করেন, পাকিস্তান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের সীমা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে, যা ইসরায়েল পর্যন্ত পৌঁছাবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের আরো বেশি সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টায় বাজওয়া এই আশ্বাসও দেন, চীনের কাছ থেকে পাকিস্তান দূরে সরে আসতে চায়।
২০২২ সালের অক্টোবরে দেশে ফেরার পরেই জেনারেল বাজওয়া ‘স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানস ডিভিশনের’ (এসপিডি) প্রধানকে ফোন করেন। এসপিডি মূলত পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র তদারকি করে থাকে।
বাজওয়া ও এসপিডি প্রধানের কথোপকথনের বিবরণ সম্পর্কে জানা যায়, জেনারেল বাজওয়া সেদিন তাকে দেশের কিছু পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন প্রতিনিধিদের পরিদর্শন ও পরীক্ষা করার অনুমতি দেওয়ার নির্দেশ দেন।
পাকিস্তানে এসপিডি প্রধান সরাসরি জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ (জেসিএসসি) কমিটির কাছে জবাবদিহি করেন। এই কমিটি আবার সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে কাজ করে, সেনাপ্রধানের অধীনে নয়।
এই যুক্তি দেখিয়ে এসপিডি প্রধান সেদিন সেনাপ্রধানের আদেশ অমান্য করেন। অমান্য করার কারণে এটা স্পষ্ট হয় যে, সামরিক বাহিনীর প্রধান দেশের পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখেন না।
একই মাসের শেষ দিকে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন একটি বিবৃতি দেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, "পাকিস্তান সম্ভবত বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক দেশ। কারণ এই দেশটির কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলেও অভ্যন্তরীণভাবে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।"
হুট করে আসা এই বিবৃতি অনেক পর্যবেক্ষককে অবাক করেছিল। কিন্তু ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভাষ্য, এই বিবৃতির সঙ্গে পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন প্রতিনিধিদের প্রবেশাধিকার না দেওয়ার সম্পর্ক ছিল।
এই ঘটনার এক মাস পর বাজওয়া পদত্যাগ করেন। ২০২২ সালের নভেম্বরে তার স্থলাভিষিক্ত হন জেনারেল আসিম মুনির, যিনি ২০২৫ সালে নিজেকে 'ফিল্ড মার্শাল' পদে উন্নীত করেন। নিজের জন্য 'চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস' নামে একটি নতুন পদও তৈরি করেন।
এছাড়া সংবিধানে সংশোধনী এনে জেসিএসসির ভূমিকা বিলুপ্ত করেন তিনি, যা পাকিস্তানের ইতিহাসে নজিরবিহীনভাবে যুক্তরাষ্ট্রপন্থি আসিম মুনিরকে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও দেয়।
আসিম মুনিরের দ্বিতীয় অধ্যায়
আসিম মুনির হলেন ট্রাম্পের ভাষায় ‘আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’। মুনির নিজেও এই উপাধি বেশ উপভোগ করেন। তবে মুনির যে এমন পদে আসীন হবেন, তা কখনোই হিসাবে ছিল না।
২০১৯ সালের এপ্রিলে মুনির যখন দেশের শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের মহাপরিচালক ছিলেন, তখন তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে ইরানি কর্মকর্তা এবং ইরানের রেভলুশনারি গার্ড কোরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য তেহরান সফর করেছিলেন।
ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মতে, ইরান-পাকিস্তান সীমান্তের বেলুচ অঞ্চলে দীর্ঘদিনের বিদ্রোহ নিয়ে ইরানিদের সঙ্গে বিবাদে জড়ান আসিম মুনির।
কিন্তু বেলুচ অঞ্চলের বিদ্রোহ দমনে পাকিস্তান ও ইরানের পারস্পরিক সহযোগিতা দুই দেশকে আরো কাছে টানতে পারত। কিন্তু সেটা হতো ইরানকে একঘরে করার মার্কিন পরিকল্পনার পরিপন্থি।
মার্কিন নির্দেশে হোক, কিংবা নিজের সহজাত প্রবৃত্তির কারণে হোক, আসিম মুনির সেই সম্ভাবনা নস্যাৎ করে মার্কিনিদের মস্ত বড় উপকার করেছিলেন।
আসিম মুনিরের এই আচরণ নিয়ে ইরানের কর্মকর্তারা ইমরান খানের কাছে নালিশ জানান। সেই নালিশের জেরেই ২০১৯ সালের জুনে ইমরান খান তাকে সরিয়ে দেন বলে ধারণা করা হয়।
আইএসআই প্রধান হিসেবে আসিম মুনিরই সবচেয়ে কম সময় দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া বাজওয়া তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে যাদের তালিকা করেছিলেন, সেখানে আসিম মুনিরের নামই ছিল না।
ইমরান খান পরে অভিযোগ করেন, চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর মুনির লন্ডনে যান এবং নওয়াজ শরিফের সঙ্গে দেখা করেন।
ইমরান খানের মতে, ওই বৈঠক ছিল সেই ষড়যন্ত্রের সূচনা, যাকে তিনি পরে ‘লন্ডন প্ল্যান’ বলে অভিহিত করেন।
বলা হয়, ওই পরিকল্পনাটি ছিল আসিম মুনির, নওয়াজ শরিফ এবং পাকিস্তানের উচ্চ আদালতের কিছু বিচারপতির মধ্যকার একটি সমঝোতা, যার অধীনে ইমরান খানের সরকার ও তার দলকে ধ্বংস করার বিনিময়ে আসিম মুনিরকে সেনাপ্রধানের পদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
২০২২ সালের ২৪ নভেম্বর আসিম মুনিরকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাকে দায়িত্ব দেওয়ার কয়েক মাসের মাথায় ইমরান খানকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দুর্নীতি, আদালত অবমাননা ও জাতীয় নিরাপত্তার একগুচ্ছ মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
২০২৩ সালের অক্টোবরে নওয়াজ শরিফ পাকিস্তানে ফিরে আসেন এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার দণ্ড বাতিল হয়ে যায়।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে তার ছোট ভাই শেহবাজ শরিফ আবারও প্রধানমন্ত্রী হন এবং আসিম মুনির হয়ে যান দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। ইমরান খান এখনো কারাগারেই আছেন।
চীনকে ঠেকানো
গত দশকের প্রায় পুরোটা সময় পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সুসম্পর্ক ছিল। বেইজিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প হিসেবে ২০১৫ সালে চালু হয় ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর’।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে পাকিস্তানে শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ এসেছিল, যারা কিনা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে হিমশিম খাচ্ছিল।
ইসলামাবাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই সম্পর্ককে কখনো কখনো ‘সবচেয়ে গভীর সমুদ্রের চেয়েও গভীর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আসিম মুনিরের অধীনে সেই সম্পর্ক প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
চীনের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে যে ৯০টি প্রকল্প ছিল, তার মধ্যে মাত্র ৩৮টি সম্পন্ন হয়েছে। ২৩টি এখনো নির্মাণাধীন। প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কাজই শুরু হয়নি।
কাজ শেষ হওয়া সর্বশেষ বড় প্রকল্প ছিল ‘গোয়াদার ইস্ট বে এক্সপ্রেসওয়ে’। এটি শেষ হয় ২০২২ সালে। এরপর থেকে পাইপলাইনে নতুন কোনো বড় প্রকল্প যুক্ত হয়নি।
নতুন অর্থায়নের উদ্দেশ্যে ২০২৪ সালে চীন সফর করার পর প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ খালি হাতে বেইজিং ছাড়েন।
চীনের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের বকেয়া পরিশোধ না করায় পাকিস্তানের দেনা আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে, যা দুই দেশের দ্বন্দের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পর্দার আড়ালের সম্পর্ক ছিল আরও শীতল। পাকিস্তান বেইজিংকে গোপনে আশ্বস্ত করেছিল যে, তারা চীনকে গোয়াদারের গভীর সমুদ্র বন্দরে স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি বানানোর অনুমতি দেবে। সেই ঘাঁটির বিনিময়ে বেইজিংয়ের কাছে একগুচ্ছ দাবি তুলে ধরে পাকিস্তান।
তারা চীনের কাছে দাবি করে, এই অনুমোদনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রতিশোধ হিসেবে কোনো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক ব্যবস্থা নেয়, তবে চীন যেন তার ক্ষতিপূরণ বা সুরক্ষা দেয়।
তারা ভারতের সঙ্গে সামরিক ও গোয়েন্দা সক্ষমতায় পাল্লা দিতে চীনের সহায়তাও চান। সবচেয়ে বড় দাবি ছিল, তারা বেইজিংয়ের কাছে পাকিস্তানের জন্য একটি সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক 'সেকেন্ড-স্ট্রাইক' সক্ষমতা অর্জনের দাবি তুলেছিল। তবে চীন তাতে রাজি হয়নি।
ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের বিষয়ে ২০২৫ সালের অগাস্টে এক সাক্ষাৎকারে আসিম মুনির বলেছিলেন, "আমরা এক বন্ধুকে অন্য বন্ধুর জন্য কোরবানি দেব না।"
তবে নিজেদের স্বার্থে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত ঠিক সেটাই করেছে।
জোটের জাল
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করে পাকিস্তান। তিন বছর আগে ইমরান খানের সরকার এই চুক্তি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
অন্যদিকে পাকিস্তানের নতুন সামরিক নেতৃত্বাধীন সরকার নতুন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে তৎপর হয়ে ওঠে।
ট্রাম্প পরিবার যখন ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবসায় নামে, ইসলামাবাদও তা অনুসরণ করে ‘পাকিস্তান ক্রিপ্টো কাউন্সিল’ গঠন করে।
এই কাউন্সিল গঠনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ট্রাম্প পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্স’ এর শীর্ষ কর্তারা ইসলামাবাদে যান।
২০২৪ সালের ২৬ এপ্রিল পাকিস্তানে পা রাখা সেই প্রতিনিধি দলটির নেতৃত্বে ছিলেন ওয়ার্ল্ড লিবার্টির প্রধান নির্বাহী এবং স্টিভ উইটকফের ছেলে জ্যাচ উইটকফ এবং এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা জাক ফোকম্যান ও চেজ হিরো।
সফরের শেষ দিকে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের উপস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেন। এই স্মারকের মাধ্যমে পাকিস্তান তার বার্ষিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সের একটি অংশ ট্রাম্প পরিবারের মালিকানাধীন ফার্মের মাধ্যমে লেনদেন করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
যখন চীনের ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল খনিজ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর মার্কিন নির্ভরতা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্বেগ প্রকাশ পাচ্ছিল, পাকিস্তান তখন মার্কিন অংশীদারদের সঙ্গে একটি ‘বিরল খনিজ’ চুক্তি ঘোষণা করে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের সেই চুক্তিটি হয় সামরিক বাহিনী পরিচালিত ফ্রন্টিয়ার ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন এবং মিসৌরি-ভিত্তিক ফার্ম ‘ইউএস স্ট্র্যাটেজিক মেটালস’-এর মধ্যে।
এই চুক্তির অধীনে, পাকিস্তানি অ্যান্টিমনি, তামা, টংস্টেন এবং বিরল খনিজ উপাদানের বিনিময়ে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের মার্কিন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আসে।
এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন যখন গাজায় তার প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক বাহিনীর জন্য একটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের সন্ধান করছিল, তখন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী স্বেচ্ছায় সেখানে সেনা পাঠানোর প্রস্তাব দেয়।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পুরোটা সময় পাকিস্তান প্রাসঙ্গিক থাকার চেষ্টা করেছে। এই চেষ্টায় তারা প্রতিশ্রুতি অনেক দিয়েছে, বাস্তবায়ন করেছে খুবই কম।
ইসলামাবাদ থেকে অনবরত প্রচার চালানো হলেও ইরান যুদ্ধের শান্তি আলোচনা অনেকটা অচল হয়ে পড়েছে।
ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলপন্থি গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা থেকে বাদ দিতে ট্রাম্প প্রশাসনকে চাপ দেওয়া শুরু করেছে।
তবে ট্রাম্প এখনো পাকিস্তান নিয়ে বিরক্ত নন। সম্প্রতি এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “তারা চমৎকার। আমি মনে করি পাকিস্তানিরা দারুণ কাজ করেছে। পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল এবং প্রধানমন্ত্রী এক কথায় অসাধারণ।”
হরমুজ প্রণালি টহল দিচ্ছে আইআরজিসির নৌবাহিনীর সদস্যরা। ছবি : গেটি ইমেজেস
জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতার সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলবে না বলে জানিয়েছে ইরান। রোববার (০৪ অক্টোবর) দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এ কথা বলেছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবিতে প্রকাশিত বক্তব্যে গালিবাফ বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের অবস্থান পুরোপুরি স্পষ্ট ও দৃঢ়। ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে নির্ধারিত আমাদের সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খোলা হবে না।’
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় ইরান একটি প্রস্তাব দিয়েছিল। এতে বলা হয়, নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়ে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরায় চালু করা সম্ভব। গত সপ্তাহে কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওই প্রস্তাবের জবাব দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের প্রধান আলোচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা গালিবাফ বলেন, ওয়াশিংটনকে বুঝতে হবে, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা এবং একতরফা দাবি চাপিয়ে দেওয়ার সময় শেষ হয়ে গেছে।
রোববার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইও যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব নিয়ে তেহরানের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের প্রস্তাবের বিষয়ে ইরান তার মৌলিক অবস্থান স্পষ্ট করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও কিছু বিষয় জানানো বাকি রয়েছে।
বাঘাই বলেন, ‘পারমাণবিক ইস্যুসহ বেশির ভাগ বিষয়ে আমেরিকানদের প্রস্তাব আগের অবস্থানের কাছাকাছি। আমরা তাদের জানিয়েছি, এই পর্যায়ে আমাদের মূল মনোযোগ হরমুজ প্রণালির ওপর। এই নৌপথে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্ট কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে।’
ইরান তার পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থার পরিদর্শনের বিনিময়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে; এমন খবরও নাকচ করেছেন বাঘাই। তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারমাণবিক ইস্যুতে কোনো আলোচনা শুরু করেনি তেহরান।
আলোচনার বিষয়ে অবহিত এক কর্মকর্তা গত সপ্তাহে জানিয়েছিলেন, প্রচারিত নথিতে সাত দিনের আস্থাবর্ধক একটি প্রক্রিয়ার কথা রয়েছে। এর লক্ষ্য জুনে হওয়া সমঝোতা স্মারকের আরও বিস্তৃত সংস্করণে দুই দেশকে ফিরিয়ে আনা। এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপও রয়েছে। তবে পরিকল্পনার বিষয়বস্তু নিয়ে নয়, কোন পদক্ষেপ আগে বাস্তবায়িত হবে এ নিয়েই মূল মতবিরোধ রয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
সূত্র : রয়টার্স
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ছবি: এএফপি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের অবসানে সামরিক কোনো সমাধান নেই বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেছেন, আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেও এই যুদ্ধ তারা থামাতে পারবে না। খবর আইআরএনএর।
রোববার (০৪ অক্টোবর) তেহরানে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে আরাগচি বলেন, তেহরান আশা করে ওয়াশিংটন কূটনীতির পথ বেছে নেবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র আবার সামরিক পদক্ষেপ নিলে ইরান পাল্টা জবাব দিতে প্রস্তুত। মনে রাখতে হবে, কোনো সামরিক আগ্রাসনে এই যুদ্ধ থামবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এই যুদ্ধ থামাতেও পারবে না।
তিনি বলেন, শুধু আলোচনা, ন্যায়বিচার ও কূটনৈতিক মর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি সমাধানই বর্তমান পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে এবং এই যুদ্ধ ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে চালানো বেআইনি আগ্রাসন বন্ধে চূড়ান্ত সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে।
এর আগে বৃহস্পতিবার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সামরিক হামলা পুনরায় শুরু করলে ইরান আরও ব্যাপক ও শক্তিশালী জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এদিকে রোববার ফার্স নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেন, ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বাড়াবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। এর জবাবে তেহরান অঞ্চলজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় এবং কার্যত কৌশলগত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করে।
যুদ্ধের অবসানে গত ১৮ জুন একটি কাঠামোগত চুক্তি হওয়ার পর থেকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ওই চুক্তির লক্ষ্য ছিল একটি চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির পথ তৈরি করা, যেখানে কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি; দুই বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সূত্র : আনাদোলু এজেন্সি
ইতালি। ছবি : সংগৃহীত
বিদেশি কর্মীদের জন্য বড় পরিসরে শ্রমবাজার খুলছে ইতালি। দেশটির ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের ‘ডিক্রেতো ফ্লুসি’ কর্মসূচির আওতায় ২০২৭ সালে মোট ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫০ জন বিদেশি কর্মী নেওয়া হবে। এর মধ্যে মৌসুমি, অমৌসুমি ও স্বনিয়োজিত-তিন ধরনের কাজের সুযোগ রয়েছে।
ইতালির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মোট কোটার মধ্যে ৭৬ হাজার ২০০ জনকে অমৌসুমি চাকরিতে, ৮৯ হাজার জনকে কৃষি ও পর্যটন খাতের মৌসুমি কাজে এবং ৬৫০ জনকে স্বনিয়োজিত কাজের জন্য নেওয়া হবে। পরিবারভিত্তিক পরিচর্যা বা কেয়ারগিভিং খাতের জন্য অমৌসুমি কোটার মধ্যে ১৪ হাজার স্থান রাখা হয়েছে।
এই কর্মী নিয়োগে বাংলাদেশও যোগ্য দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে। ইতালির সরকারি তালিকায় বাংলাদেশসহ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, নেপাল-সংলগ্ন বিভিন্ন শ্রমবাজারের দেশ এবং আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের জন্য কোটা রাখা হয়েছে।
২০২৭ সালের কোটার জন্য আবেদনপত্র প্রাক-পূরণ বা ‘প্রিকম্পাইলেশন’ শুরু হবে ২৩ অক্টোবর ২০২৬ সকাল ৯টা থেকে এবং চলবে ৭ ডিসেম্বর ২০২৬ রাত ৮টা পর্যন্ত। আবেদন করতে হবে ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের Portale Servizi ALI প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে।
তবে সাধারণভাবে বিদেশি কর্মী নিজে সরাসরি এই কোটার আবেদন করেন না। ইতালিতে থাকা নিয়োগকর্তা বা অনুমোদিত প্রতিনিধি সংশ্লিষ্ট কর্মীর জন্য চাকরির অনুমোদন বা nulla osta চেয়ে আবেদন করেন। এরপর অনুমোদন পেলে কর্মী নিজ দেশে ইতালীয় দূতাবাস বা কনস্যুলেটের মাধ্যমে কাজের ভিসার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।
২০২৭ সালের ‘ক্লিক ডে’ নির্ধারণ করা হয়েছে খাতভেদে আলাদা দিনে। কৃষি খাতের মৌসুমি কর্মীদের আবেদন জমা শুরু হবে ১২ জানুয়ারি ২০২৭, পর্যটন খাতে ৯ ফেব্রুয়ারি, অমৌসুমি কাজের জন্য ১৬ ফেব্রুয়ারি এবং পরিবারভিত্তিক পরিচর্যা খাতের জন্য ১৮ ফেব্রুয়ারি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই আবেদন শুরু হবে ইতালির স্থানীয় সময় সকাল ৯টায়। কোটা অবশিষ্ট থাকা সাপেক্ষে আবেদন জমা দেওয়া যাবে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত।
ইতালি ২০২৬ থেকে ২০২৮- এই তিন বছরে মোট ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫০ জন বিদেশি কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে ২০২৬ সালে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৫০, ২০২৭ সালে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫০ এবং ২০২৮ সালে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫০ জনের কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কেবল বৈধ নিয়োগকর্তা ও সরকারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আবেদন এগোয়। তাই চাকরি বা ভিসার নামে কোনো ব্যক্তি বা দালালকে অর্থ দেওয়ার আগে নিয়োগপত্র, নিয়োগকর্তা এবং nulla osta–র সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
ভারতীয় নৌসেনা। প্রতীকী ছবি
পাকিস্তানি এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার কাছে নৌবাহিনীর গোপন তথ্য পাচারের অভিযোগে ভারতের ৩১ বছর বয়সী এক নৌসেনা সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হানিট্র্যাপের’ মাধ্যমে তাকে ফাঁদে ফেলে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআই।
গ্রেপ্তার হওয়া নৌসেনা সদস্যের নাম প্রদীপ মুখার্জি। ৩ অক্টোবর তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটোরে ভারতীয় নৌবাহিনীর নেতৃত্ব প্রশিক্ষণকেন্দ্র আইএনএস অগ্রাণী থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স (সিআই) সেল।
পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা মুখার্জি গ্রেপ্তারের সময় কোয়েম্বাটোরের ওই কেন্দ্রে ব্যবস্থাপনা উন্নয়নসংক্রান্ত একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নিচ্ছিলেন। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সেখানে অবস্থান করছিলেন তিনি।
২০১৪ সালে ভারতীয় নৌবাহিনীতে যোগ দেন মুখার্জি। পরে তাকে বিশাখাপত্তনমভিত্তিক ইস্টার্ন নেভাল কমান্ডে নিয়োগ দেওয়া হয়।
তদন্তকারীদের দাবি, কয়েক মাস আগে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার এক নারী সদস্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুখার্জির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তাদের মধ্যে অনলাইন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে কৌশলগত নৌসম্পদ, নৌবহরের গতিবিধি এবং বিশাখাপত্তনম নৌঘাঁটির কার্যক্রমসংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তদন্তকারীদের।
সীমান্তপারের গুপ্তচরবৃত্তি ও সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট হুমকি তদন্তে বিশেষায়িত সিআই সেল ওই নৌসেনা সদস্যের সন্দেহজনক ডিজিটাল কার্যক্রম শনাক্ত করার পর তদন্ত শুরু করে। পরে তাকে নজরদারিতে রাখা হয়। এর ধারাবাহিকতায় গ্রেপ্তার করা হয় মুখার্জিকে।
সূত্র : হিন্দুস্তান টাইমস
সাপ্তাহিক সাময়িকী আল বায়ানে আল কায়দার হুমকি ও ফ্লাইদুবাইয়ের কো-পাইলট হামাম আল হামামি। ছবি: নিউইয়র্ক পোস্ট
দুবাইগামী ফ্লাইদুবাই বিমানে হামলাচেষ্টার প্রশংসা করে মার্কিন ও ইসরায়েলি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে ৯/১১-এর অনুকরণে হামলা চালানোর আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল কায়দা। সংগঠনটির সমর্থকদের প্রকাশিত সাপ্তাহিক সাময়িকী আল বায়ানের সর্বশেষ সংখ্যায় এই প্রাণঘাতী হুমকির তথ্য উঠে এসেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্ট এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সাময়িকীটির আরবি ভাষার নিবন্ধে বলা হয়েছে, যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। ইসরায়েলি, আমেরিকান ও তার মিত্রদের বহনকারী বিমানগুলো আকাশে উড়ছে। সেগুলোকে ১১ ও ৩০ সেপ্টেম্বরের মতো লক্ষ্যবস্তু বানানো সম্ভব। এতে আরও সতর্ক করে বলা হয়, আমেরিকা ও ইসরায়েলের শত্রু সংখ্যা এখন অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
ঘটনার সূত্রপাত ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটের ককপিট দখলের চেষ্টার মধ্য দিয়ে। ওই ফ্লাইটের অভিযুক্ত ওমানি কো-পাইলট হামাম আল হামামিকে আটকের প্রায় ৯ ঘণ্টা পর তার ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টগুলোতে একাধিক পোস্ট দেখা যায়।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি ভিডিওতে ককপিটের ভেতরের দৃশ্য ফুটে ওঠে, যেখানে পাশে থাকা একটি ইসরায়েলি বিমানের ওপর ক্যামেরা জুম করা হচ্ছিল। এরপরই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে আল কায়দার প্রয়াত শীর্ষ নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরি এবং ২০০৯ সালে সিআইএ কর্মকর্তাদের ওপর আত্মঘাতী হামলা চালানো হুমাম খলিল আল বালাউইর ছবি। এ ছাড়া তার অ্যাকাউন্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি মক্কা, মদিনা ও জেরুজালেমের সংযোগকারী একটি ছবিও পোস্ট করা হয়।
অভিযুক্ত পাইলট পুলিশ হেফাজতে থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এই পোস্টগুলো প্রকাশিত হলো, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। পোস্টগুলো আগে থেকে সিডিউল করা ছিল নাকি অন্য কেউ পোস্টগুলো করেছে, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। ইতোমধ্যে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বাণিজ্যিক বিমান চলাচলে নতুন করে নিরাপত্তা জোরদার করেছে।
সূত্র : নিউইয়র্ক পোস্ট
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান থেকে আইনজীবীদের আবেদন হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বিদেশি আইনজীবীদের জন্য বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্রিটেন। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ব্যারিস্টার হিসেবে কাজের যোগ্যতা অর্জনের জন্য বিদেশি আইনজীবীদের নতুন আবেদন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে দেশটির নিয়ন্ত্রক সংস্থা। আবেদনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সৃষ্ট দীর্ঘ জট কমানো এবং প্রকৃতপক্ষে ব্রিটেনে আইন পেশায় কাজ করতে চান—এমন প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, যুক্তরাজ্যের ব্যারিস্টার পেশা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বার স্ট্যান্ডার্ডস বোর্ড (বিএসবি) সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জমে থাকা আবেদনের চাপ কমাতে ‘ট্রান্সফারিং কোয়ালিফায়েড ল’ইয়ার’ (টিকিউএল) কর্মসূচির কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।
এর ফলে বিদেশি আইনজীবীরা ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ব্যারিস্টার হিসেবে যোগ্যতা অর্জনের জন্য নতুন করে আবেদন করতে পারবেন না। তবে ব্রিটেনের অনুমোদিত কোনো ব্যারিস্টার চেম্বারে কাজের প্রস্তাব পেয়ে থাকলে তারা এর আওতামুক্ত থাকবেন। ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের আইনজীবীদের কাছ থেকে আবেদনের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার পর এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বর্তমানে টিকিউএল কর্মসূচিতে জমা পড়া মোট আবেদনের অর্ধেকের বেশি আসছে এই তিন দেশ থেকে। মূলত টিকিউএল এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে অন্য দেশের যোগ্য আইনজীবীরা ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ব্যারিস্টার হিসেবে নতুন করে যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ পান।
দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, গত তিন বছরে টিকিউএল কর্মসূচিতে আবেদনের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২১-২২ সালে যেখানে ৩২৫টি আবেদন জমা পড়েছিল, ২০২৪-২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩৪টিতে। এর ফলে আবেদন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব বেড়েছে।
বিএসবি জানিয়েছে, বিদেশি প্রার্থীরা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি বা চ্যালেঞ্জ জানানোর সম্ভাবনা বেশি হওয়ায় এই জট আরও বেড়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি আরও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে টিকিউএলে আবেদনকারীদের অনেকেরই ব্রিটেনে ব্যারিস্টার হিসেবে কাজ করার প্রকৃত ইচ্ছা নেই। তাদের অনেকে অন্য দেশেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিএসবির মহাপরিচালক ফিল গোল্ডিং বলেন, ‘আমাদের প্রক্রিয়া ও নিয়মে পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে এই ব্যবস্থা তাদের ওপরই বেশি গুরুত্ব দেয় যারা এই এখতিয়ারের মধ্যে আইন পেশায় কাজ করবেন। একই সঙ্গে এটি বর্তমানে জমে থাকা বিপুলসংখ্যক আবেদন কমাতেও সহায়তা করবে।’
ব্রিটিশ আইনের বিভিন্ন পরীক্ষায় বিদেশি প্রার্থীদের অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগের মধ্যেই এই পরিবর্তন আনা হলো। এমনকি কেউ কেউ নিজেদের হয়ে পরীক্ষা দেয়ার জন্য ব্যারিস্টারদের অর্থ দেয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এর আগে ২০২৩ সালে ‘অনিয়মের’ অভিযোগে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের প্রার্থীদের অনলাইনে পরীক্ষা দেয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ব্রিটেনের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। এরপর পরীক্ষায় প্রতারণার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে পরের বছর সব অনলাইন পরীক্ষা স্থগিত করে বিএসবি। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এখন বিদেশি সব প্রার্থীকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত পরীক্ষাকেন্দ্রে সরাসরি উপস্থিত হয়ে পরীক্ষা দিতে হবে।
ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে, বিশেষ করে যারা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে আইন পেশায় কাজ করেন না, তাদের আবেদন কেন এত বেড়েছে—তা স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছে বিএসবি।
তবে কিছু আইন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একসঙ্গে দুটি দেশের আইনি যোগ্যতা অর্জনের সুযোগকে আইনজীবীদের জীবনবৃত্তান্ত বা সিভি শক্তিশালী করার উপায় হিসেবে প্রচার করছে। ফলে তারা নিজ দেশেই আইন পেশায় কাজ করলেও যুক্তরাজ্যের যোগ্যতা অর্জনে আগ্রহী হচ্ছেন।
এছাড়া ব্রিটিশ চেম্বারে প্রশিক্ষণকালীন পদ বা চাকরি পাওয়া বিদেশি ব্যারিস্টারদের জন্য ভিসার ব্যবস্থাও করে থাকে বার কাউন্সিল।