বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ফ্লাইট ডেক থেকে উড্ডয়ন করছে একটি এফ/এ-১৮ই সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমান। ৩১ জুলাই ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর দায়িত্ব পালন শেষে কবে নাগাদ ফেরা যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পাঠানো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর নাবিক ও সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটেছে। একই সঙ্গে তাঁদের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নাবিকদের পরিবার ও সহকর্মীরা। সম্প্রতি এ উদ্বেগের কথা সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরেছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
সান ডিয়েগোতে অনুষ্ঠিত এক উত্তপ্ত টাউন হল সভায় নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হাং কাও এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সামনে তাঁরা এ ক্ষোভ উগরে দেন। সভায় উপস্থিত দুই নাবিকের স্ত্রী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সান ডিয়েগোর ওই সভায় আনুমানিক ২০০ জন উপস্থিত ছিলেন। সেখানে অংশ নেওয়া এক নাবিকের স্ত্রীর ভাষ্য, সভার দিনই তিনি তাঁর স্বামীর কাছ থেকে একটি বার্তা পান।
অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি কর্মকর্তাদের জানান, তাঁর স্বামী তাঁকে লিখেছেন যে ‘তিনি আশা করেন আগামীকাল যেন তাঁর আর ঘুম না ভাঙে।’
ওই নারী আরও জানান, সভায় উপস্থিত নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই সুনির্দিষ্ট বা আবেগঘন বক্তব্যের কোনো সরাসরি জবাব দেননি। তবে জাহাজে থাকা নাবিকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী, চ্যাপলিন (ধর্মীয় শিক্ষক) এবং চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত সুবিধা রয়েছে বলে আশ্বস্ত করেন তাঁরা।
একই সঙ্গে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুদ্ধজাহাজটিতে আরও বেশি মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ পাঠানোর কাজ চলছে বলে জানান নৌবাহিনীর সেই কর্মকর্তারা।
টানা ২৫০ দিন সমুদ্রে: চরম ক্লান্তি ও হতাশায় মার্কিন নাবিকেরা
গত সপ্তাহের সভায় যে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে, তার সঙ্গে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় নাবিক ও তাঁদের পরিবারের পক্ষ থেকে স্বাধীনভাবে সামরিক সংবাদমাধ্যম ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর কাছে ব্যক্ত করা মতামতের হুবহু মিল রয়েছে।
বর্তমানে কর্মরত নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সাক্ষাৎকার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রু সদস্যদের ডজনখানেক মন্তব্য ও পোস্ট থেকে এ সংকটের গভীরতা স্পষ্ট। তাঁদের বিবরণ অনুযায়ী, চরম ক্লান্তি ও মনোবল ভেঙে পড়ায় নাবিকেরা প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন। এর মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তার মতো গুরুতর বিষয় যেমন রয়েছে, তেমনি অন্তত একজন ক্রু সদস্যকে জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া থেকে বিরত রাখার ঘটনাও ঘটেছে।
নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অস্বাভাবিক ও অত্যন্ত কঠিন এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন এ যুদ্ধজাহাজের নাবিকেরা। মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের অধীন ৪০ দিন ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধাভিযানে অংশ নিতে হয়েছে তাঁদের। সব মিলিয়ে সমুদ্রে টানা ২৫০ দিন পার করার এক নজিরবিহীন ধকল সামলাচ্ছেন তাঁরা।
গত নভেম্বরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েনের উদ্দেশ্যে এ বিমানবাহী রণতরি সান ডিয়েগো ত্যাগ করেছিল। তবে পরে সেটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে কোনো ধরনের বন্দরবিরতি বা যাত্রাবিরতি ছাড়াই সমুদ্রে রেকর্ডসংখ্যক দিন পার করে আট মাসের বেশি সময় ধরে মোতায়েন রয়েছে যুদ্ধজাহাজটি।
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান সফল করতেই ক্রুদের এ দীর্ঘ সময় পার করতে হয়েছে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, গত মে মাসে এ মিশন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা বাড়ানো হয়েছে। তবে কবে নাগাদ তাঁরা ফিরতে পারবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ প্রকাশ করেনি মার্কিন প্রশাসন।
সভায় মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যার ঝুঁকি নিয়ে পরিবারের সদস্যরা যে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, সে বিষয়ে নৌবাহিনী ঠিক কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয়নি। তবে নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রণতরিটিতে পরামর্শক, চ্যাপলিন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, অন্যান্য জরুরি সহায়তাসহ মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক বা ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
খাদ্য-পানির সংকট, বাড়ি ফিরতে চান ৫ হাজার সেনা
মার্কিন নৌবাহিনী গত সোমবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘নাবিকদের মানসিক সুস্থতা পর্যবেক্ষণ ও বজায় রাখার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রতিনিয়ত মূল্যায়ন বা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে যাচ্ছে।’
এদিকে প্রতিশোধ বা আইনি জটিলতার আশঙ্কায় এ প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়া নাবিকদের স্ত্রী, পরিবারের অন্য সদস্য ও কর্তব্যরত নাবিকদের নাম-পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করা হয়েছিল। ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’সেই অনুরোধের প্রতি সম্মান দেখিয়েছে।
পরিবারের সদস্য ও নাবিকদের অভিযোগ, আব্রাহাম লিংকন যুদ্ধজাহাজে থাকা প্রায় ৫ হাজার সেনাসদস্য চরম খাদ্য ও পানিসংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিঠি বা ডাক যোগাযোগে বিঘ্ন এবং একটানা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, যেখানে বিশ্রামের সুযোগ মেলাই ভার।
সাধারণত সাগরে থাকাকালীন নাবিকদের একঘেয়েমি ও ক্লান্তি দূর করতে নিয়মিত বিরতিতে বন্দরে যাত্রাবিরতি বা ‘পোর্ট কল’ দেওয়া হয়। তবে মোতায়েনের দীর্ঘ সময়ে আব্রাহাম লিংকনের ক্রুরা এমন কোনো স্বাভাবিক সুযোগ পাননি বললেই চলে।
মার্কিন নৌবাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী, রসদ সংগ্রহ, জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্রুদের বিশ্রামের জন্য সাধারণত প্রতি ৩০ থেকে ৪৫ দিন পরপর বিমানবাহী রণতরিগুলো কোনো না কোনো বন্দরে নোঙর করতে হয়।
যুদ্ধজাহাজটিতে থাকা এক নাবিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পুরো মোতায়েনজুড়ে আমরা কোনো বিরতি ছাড়াই জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করে গেছি।’ অথচ মোতায়েনের শুরুতে বিভিন্ন বন্দরে যাওয়া এবং বিশ্রামের আশায় সবার মনোবল বেশ চাঙা ছিল বলে তাঁর মন্তব্য।
বর্তমানে ক্রুদের মনোবল এতটাই ভেঙে পড়েছে যে তাঁরা সামনে কোনো বন্দরে বিশ্রামের সুযোগও চান না; বরং যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফেরার স্বার্থে যেকোনো বিরতি ত্যাগ করতে তাঁরা রাজি। সেই নাবিকের আকুতি, ‘এই মুহূর্তে আসলে আমাদের আর কোনো প্রত্যাশা নেই। আমরা শুধু বাড়ি ফেরার একটি সুনির্দিষ্ট তারিখ চাই।’
জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা: নাবিকের করুণ আকুতি
নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান পরিচালনা করা সামরিক জীবনেরই অংশ। তবে সেটি তাঁরা মেনে নিলেও অনেকেরই অভিযোগ, শারীরিক ও মানসিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা না করেই এ যুদ্ধজাহাজের ক্রুদের অস্বাভাবিক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে টানা যুদ্ধাভিযান চালাতে বাধ্য করা হচ্ছে।
গত জুলাই মাসে এক চিন্তিত অভিভাবক ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-কে দেওয়া এক চিঠিতে লেখেন, ‘আমার ছেলে বর্তমানে ওই যুদ্ধজাহাজে আছে। সে এবং তার সহকর্মীরা একটু স্বস্তি পেতে প্রতিনিয়ত জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার কথা ভাবছে, এটি শোনা একজন বাবার জন্য অত্যন্ত কষ্টের।’
নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে এই অভিভাবক আরও বলেন, ‘আমরা রাতে ঘরের নরম বিছানায় আরামে ঘুমাই, অথচ আমাদের প্রিয়জনেরা ওখানে যুদ্ধ করছে। তারা আসলে কিসের জন্য জীবন বাজি রাখছে, সেটিও তাদের কাছে স্পষ্ট নয়।’
জাহাজে থাকা একাধিক নাবিক জানিয়েছেন, কিছুদিন আগে এক ক্রু সদস্যকে জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছিল। এক নাবিকের ভাষ্য, ‘আমাদের এখানে এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে দায়িত্বরত প্রহরীদের এক নাবিককে সাগরে লাফ দেওয়া থেকে আটকাতে হয়েছিল।’ ঘটনাটি পুরো জাহাজের লাউডস্পিকারে ঘোষণার মাধ্যমে সব ক্রুকে জানানো হয়েছিল বলে তাঁদের দাবি।
তবে এই সুনির্দিষ্ট ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও মার্কিন নৌবাহিনী সরাসরি কোনো জবাব দেয়নি। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সাধারণ প্রশ্নের উত্তরে বাহিনী জানিয়েছে, ‘কর্তৃপক্ষ সব সময়ই পরিবারগুলোর কথা শুনতে, সেনাসদস্যদের পাশে দাঁড়াতে এবং আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের লক্ষ্য নিরাপদে ও সফলভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সম্পদ বা সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
নাবিক, তাঁদের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন, এর আগে আব্রাহাম লিংকন যুদ্ধজাহাজে খাবার রেশন করে দেওয়া, তীব্র পানির সংকট এবং টানা এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে কাপড় লন্ড্রি করতে না পারার মতো বড় সমস্যা তৈরি হয়েছিল। তবে এখন সেসব সমস্যার বড় অংশই সমাধান হয়েছে এবং চিঠি বা ডাক যোগাযোগের ব্যবস্থাও ক্রমান্বয়ে উন্নত হচ্ছে বলে তাঁদের মত।
মানসিক ভাঙন ও তীব্র হতাশা, তা-ও মিলছে না ফেরার তারিখ
গত জুলাইয়ের শুরুতে ওমানের একটি বন্দরে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির কারণে যুদ্ধজাহাজটিতে নতুন করে রসদ সরবরাহের সুযোগ হয়। ফলে দীর্ঘ কয়েক মাস পর ক্রুরা তাজা ফলমূল ও শাকসবজি পান বলে জানান এক নাবিক। তবে সে সময় অনেক নাবিককে জাহাজ থেকে নামার অনুমতি দেওয়া হলেও তাঁদের বন্দর এলাকার একটি সুরক্ষিত সীমানার মধ্যেই আটকে রাখা হয়েছিল।
এর আগে গত ডিসেম্বরেও ‘আব্রাহাম লিংকন’ গুয়াম দ্বীপে একটি সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি করেছিল। কিন্তু জাহাজে থাকা অনেক নাবিকই সেই সময় তীরে নামার সুযোগ পাননি বলে জানান তাঁদের স্ত্রীরা।
সেনাসদস্যদের জন্য নিয়মিত বন্দরবিরতির অভাব, ডাক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ঘাটতি নিয়ে এক নাবিকের স্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘নিজের মানুষের (নাবিক) এই অবস্থা দেখাটা দিন দিন অসম্ভব হয়ে উঠছে।’ অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমি চোখের সামনে আমার স্বামীকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেখছি। মনে হচ্ছে, তারা যেন সব আশাই হারিয়ে ফেলছে।’
নৌবাহিনী অবশ্য তাদের জবাবে উল্লেখ করেছে যে লিংকন যুদ্ধজাহাজটি বর্তমানে অত্যন্ত বৈরী ও যুদ্ধসংক্ষুব্ধ এক পরিবেশে দায়িত্ব পালন করছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী রসদ সরবরাহ কেন্দ্রগুলো সামরিক সংঘাতের কারণে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন বাহিনী রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রে মিশনের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর তালিকায় প্রথমে খাবার, তারপর স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী ও সবশেষে চিঠি বা ডাকের স্থান।
নৌবাহিনীর দাবি, যুদ্ধজাহাজ থেকে আসা সাম্প্রতিক প্রতিবেদন নিশ্চিত করছে যে সেখানে পরিষ্কার পানি, সচল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও প্রতিবেলার খাবারে দুটি আমিষের ব্যবস্থা রয়েছে। রসদ সরবরাহের এ প্রবাহ দিন দিন আরও উন্নত হচ্ছে।
গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত দুটি সভার (একটি সশরীর ও অন্যটি অনলাইনে) একটিতে নেভাল এয়ারফোর্সেসের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল ডগলাস ভেরিসিমো, নেভাল সারফেস ফোর্সেসের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল জোসেফ কাহিলসহ অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ভারপ্রাপ্ত নৌ সেক্রেটারি হাং কাও সশরীর উপস্থিত থাকলেও ভিডিও কলে যুক্ত ছিলেন না।
সভায় অংশ নেওয়া এক নারী কাও, ভেরিসিমো ও কাহিলকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনারা আমাদের এবং নেতৃত্বের মধ্যকার বিশ্বাসের জায়গাটি সম্পূর্ণ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন।’
সামরিক সংবাদমাধ্যম ‘ইউএসএনআই নিউজ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ১৬২ দিনের একটি মোতায়েন শেষে ঘরে ফেরার এক বছরের কম সময়ের মধ্যে সান ডিয়েগোর নিজস্ব বন্দর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে মোতায়েনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল লিংকন। কিন্তু এর পরপরই রণতরিটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয় এবং গত জানুয়ারি মাসে সেটি সেখানে পৌঁছায়। সেই থেকে আজ অবধি যুদ্ধজাহাজটি আরব সাগরেই অবস্থান করছে।
সামরিক নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা আব্রাহাম লিংকন কবে দেশে ফিরবে সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বলে জানান নাবিকদের স্ত্রীরা।
বিভিন্ন গবেষণায়ও দেখা গেছে, লিংকন যুদ্ধজাহাজের নাবিক এবং তাঁদের পরিবারের বর্ণনা করা এ পরিস্থিতিগুলো সমুদ্রে থাকা সেনাসদস্যদের জন্য তীব্র মানসিক চাপের অন্যতম প্রধান কারণ।
একাডেমিক জার্নাল ‘মিলিটারি মেডিসিন’-এ ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মোতায়েনকালে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম নিতে না পারা এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগই নাবিকদের সবচেয়ে বেশি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
বিমানবাহী রণতরি, ডেস্ট্রয়ার এবং উভচর যুদ্ধজাহাজে কর্মরত ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর পরিচালিত এ সমীক্ষায় আরও উঠে আসে যে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে জটিলতা এবং মানসিক চাপ কমানোর সুযোগের অভাবও তাঁদের বড় উদ্বেগের কারণ।
নৌবাহিনীতে দীর্ঘ ২০ বছর দায়িত্ব পালন করা ও চারবার মোতায়েন হওয়া অবসরপ্রাপ্ত চিফ পেটি অফিসার থমাস নাটজম্যান জানান, একটি মোতায়েন কবে শেষ হবে, তা না জানাটা নাবিকদের ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।
দীর্ঘ সময় সমুদ্রে কাটানোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে নাটজম্যান বলেন, ‘সেখানে কোনো সোম, মঙ্গল বা বুধবার নেই; প্রতিটি দিনই যেন একটি দিন। আপনি আপনার সাধ্যমতো ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করেন।’
সংকটের জায়গাটি উল্লেখ করে নাটজম্যান বলেন, ‘সমস্যা হলো, আপনি যখন অনেক লম্বা সময় সমুদ্রে থাকবেন, তখন মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা একটা সময় এসে থমকে যাবে আর ঠিক সেখান থেকেই মানসিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে শুরু করবে।’
কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান
জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান। জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনের চতুর্থ দফার অনানুষ্ঠানিক ভোটে তিনি সবচেয়ে বেশি সমর্থন পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন এক কূটনীতিক। খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ডের।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা ইউএনসিটিএডির প্রধান গ্রিনস্প্যান চার দফা গোপন ভোটের মধ্যে তিনবারই শীর্ষে ছিলেন। তবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের যে কোনো একটির ভেটো তার এগিয়ে থাকার অবস্থানকে থামিয়ে দিতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কূটনীতিকের বরাতে জাতিসংঘবিষয়ক বিশেষায়িত সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, মঙ্গলবারের (২৯ সেপ্টেম্বর) ভোটে গ্রিনস্প্যানের পক্ষে ১০টি ভোট পড়ে। বিপক্ষে ‘নিরুৎসাহিত’ বা ডিসকারেজ ভোট পড়ে তিনটি এবং দুটি ভোটে কোনো মতামত জানানো হয়নি।
পর্তুগালের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দ্বিতীয় পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর। তার উত্তরসূরি হতে সাত প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে চার নারী ও তিন পুরুষ। চতুর্থ দফার ভোটে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যারোলিন রড্রিগেস-বিরকেট। তিনি আটটি সমর্থন পেয়েছেন। দ্বিতীয় দফার গোপন ভোটে অল্প ব্যবধানে তিনিই শীর্ষে ছিলেন।
তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রসি। তিনি বর্তমানে জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান।
এছাড়া প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল, ইকুয়েডরের ইভোনে এ-বাকি, ইকুয়েডরের মারিয়া ফের্নান্দা এস্পিনোসা এবং উগান্ডার ওলারা ওতুননু।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের গত সপ্তাহের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে কয়েকজন প্রার্থী বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে গুঞ্জন রয়েছে, নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচ স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স ও রাশিয়া সমঝোতার ভিত্তিতে নতুন কোনো প্রার্থীকে শেষ মুহূর্তে মহাসচিব পদে নিয়ে আসতে পারে।
নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে কোনো প্রার্থীকে কমপক্ষে নয়টি ভোট পেতে হবে। একই সঙ্গে পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কোনো একটি দেশের ভেটোও এড়াতে হবে। এই পাঁচ দেশের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে।
এই দুটি ধাপ পার হলে প্রার্থীর নাম জাতিসংঘের সব সদস্য দেশের প্রতিনিধিত্বকারী সাধারণ পরিষদে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।
১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে দুই প্রার্থীকে ভেটো দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া আটকে যাওয়ার পর অচলাবস্থা কাটাতে নিরাপত্তা পরিষদের এই অনানুষ্ঠানিক ভোটের পদ্ধতি চালু করা হয়। গোপন ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার সমালোচনা থাকলেও বিভিন্ন রূপে এটি এখনো চালু রয়েছে।
ভোটে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য প্রতিটি প্রার্থীর ক্ষেত্রে গোপনে তিন ধরনের মতামত দেন, ‘সমর্থন’, ‘নিরুৎসাহিত’ অথবা ‘কোনো মতামত নেই’।
তবে নির্দিষ্টসংখ্যক ভোটের পর নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ব্যালট আলাদা রঙের হয়ে যায়। এর মাধ্যমে কোনো প্রার্থী সম্ভাব্য ভেটোর মুখে পড়তে পারেন কি না, তা বোঝা যায়। তবে কোন দেশ ওই প্রার্থীকে ভেটো দিতে পারে, তা জানা যায় না।
মঙ্গলবারের ভোটে অবশ্য ব্যালটে কোনো রঙের পার্থক্য রাখা হয়নি। ভোট শেষে নিরাপত্তা পরিষদের পর্যায়ক্রমিক সভাপতি ও জাতিসংঘে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জেরোম বনাফোঁ এ তথ্য নিশ্চিত করেন। পরবর্তী দফার ভোট কবে হবে, তা জানাননি তিনি।
জাতিসংঘের মহাসচিবের পদটি ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ঘুরিয়ে দেওয়ার রীতি রয়েছে। সেই বিবেচনায় এবার লাতিন আমেরিকার কোনো প্রার্থী মহাসচিব হওয়ার কথা। বর্তমান দৌড়ে ওই অঞ্চল থেকে একাধিক প্রার্থী রয়েছেন। তবে ম্যাকি সাল ও ওলারা ওতুননু আফ্রিকার প্রার্থী।
সূত্র : টিআরটি ওয়ার্ল্ডের
ফাতিমা জাহরা এল মানসুরি
মরক্কোর প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফাতিমা জাহরা এল মানসুরিকে মনোনীত করেছেন দেশটির বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মদ। এর মধ্য দিয়ে তিউনিশিয়ার নাজলা বুদেনের পর আরব বিশ্বের দ্বিতীয় নারী হিসেবে সরকারপ্রধানের দায়িত্বে আসছেন তিনি।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে মানসুরির দল অথেন্টিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি (পাম) ৯৭টি আসন পেয়ে সবচেয়ে বেশি আসন অর্জন করে। এরপর দলটির শীর্ষ নেতা ফৌজি লেকজাকে পেছনে ফেলে ৫০ বছর বয়সী মানসুরিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেন বাদশাহ।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেশায় আইনজীবী মানসুরি মরক্কোর মোহাম্মদ ভি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পরে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে করপোরেট আইনে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
রাজনীতিতে তার উত্থানও দীর্ঘদিনের। ২০০৯ সালে মারাকেশের প্রথম নারী মেয়র নির্বাচিত হন মানসুরি। পরে বিদায়ী জোট সরকারের নগর পরিকল্পনা ও আবাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনয়নের আগে দেওয়া এক বক্তব্যে মানসুরি বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মদকে নারীদের সবচেয়ে বড় সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করেন। সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া তার জন্য বড় সম্মানের বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে নারীর অধিকার ও উত্তরাধিকার আইনসহ মরক্কোর কিছু বিতর্কিত রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে মানসুরি বরাবরই সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। একই সঙ্গে নিজেকে ‘লৌহ নারী’ হিসেবে দেখতেও তিনি অনাগ্রহী।
মরক্কোর সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনে জয়ী দলের মধ্য থেকেই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করার বিধান রয়েছে। তবে ৩৯৫ আসনের সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১৯৮টি আসন। ফলে সরকার গঠনে জোটের প্রয়োজন হতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
দীর্ঘ দুই দশকের সামরিক উপস্থিতির পর ইরাক থেকে পুরোপুরি বিদায় নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ২০০৩ সালে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে দেশটিতে থাকা মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে। এ উপলক্ষে ইরাকজুড়ে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। সরকার এ উপলক্ষে চার দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে।
মঙ্গলবার মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি ছেড়েছেন সেখানে থাকা শেষ মার্কিন সেনারা। এর মধ্য দিয়ে ইরাকে নতুন দিনের সূচনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে দেশটির সরকার। যদিও সেনা প্রত্যাহার–পরবর্তী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেক ইরাকি।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে ইরাকিদের মধ্যে আনন্দ–উদ্বেগ উভয়ই আছে। এটি প্রতিবেশী দেশ ইরানের জন্য বড় সুযোগের দরজা খুলে দেবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে। কারণ, ইরাকে ইরানপন্থি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে। মার্কিন বাহিনীর অনুপস্থিতিতে এই গোষ্ঠীগুলো আরও সক্রিয় ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে সুবিধা পেতে পারে তেহরান।
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা ছিল আজ। এর এক দিন আগেই প্রত্যাহার শেষ হয়েছে বলে আলজাজিরাকে জানিয়েছেন ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র। তিনি বলেন, ইরাকে এখন আর মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর কোনো সেনা নেই। তাদের অনুপস্থিতিতে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে সক্ষম ইরাকি বাহিনী।
ইরাক থেকে সেনা পুরোপুরি সরিয়ে নিতে ২০২৪ সালে একটি সমঝোতা করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তখন দেশটিতে আড়াই হাজার মার্কিন সেনা ছিলেন। গত বছরই তাদের বেশির ভাগকে সরিয়ে নেওয়া হয়। শুধু আধা স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি এলাকাগুলোয় কিছু সেনা ছিলেন। যদিও তাদের সংখ্যা কত, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানায়নি মার্কিন বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে হামলা চালায় ২০০৩ সালে। দেশটির প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করে তারা। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে সাদ্দামের ফাঁসি দেওয়া হয়। ২০০৭ সালে ইরাকে মার্কিন সেনার সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এই সেনাদের একটি অংশ ২০১১ সালে ইরাক ছাড়ে। পরে ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিরোধী অভিযানের জন্য ইরাকে আরও সেনা পাঠানো হয়।
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে বাগদাদের জন্য নতুন একটি যুগ শুরু হলো। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে ইরাকের জন্য নতুন একটি দিনের সূচনা হলো। দেশটি বিদেশি সব ধরনের সামরিক উপস্থিতি থেকে মুক্ত হবে। একই সঙ্গে ইরাকের পুরো ভূখণ্ডের ওপর জাতীয় সার্বভৌমত্ব পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হবে।
ইরাকে সক্রিয় ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সের কমান্ডার আবু মোজতাবা আল-ইয়াসিরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘটনাকে ‘ঐতিহাসিক জয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইয়াসিরি বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকের ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়ের অবসান হবে। ইরাকে দখলদারদের ব্যর্থতা উদ্যাপন করবে দেশটির মানুষ।
তবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ফালুজা
অঞ্চলের একটি আদিবাসী গোষ্ঠীর নেতা আবদুল রহমান আল-জোবাইর। তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, এই মুহূর্তে নিরাপত্তার দায়িত্ব পুরোপুরি নিজেদের হাতে নেওয়ার জন্য ইরাক প্রস্তুত নয়। ইরাকের জনগণ পূর্ণ সার্বভৌমত্ব চায়। কিন্তু আমার মনে হয়, মার্কিন বাহিনী এভাবে চলে গিয়ে যে শূন্যতা তৈরি করছে, সেটি সব ইরাকির জন্য সবচেয়ে বড় শঙ্কা।’
তেহরানের সুযোগ
ইরাকে ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সের মতো তেহরান–সমর্থিত বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে। চলমান ইরান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হামলা চালাতে ভূমিকা রাখছে এই গোষ্ঠীগুলো। চলতি মাসেই ইরাক থেকে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পাইপলাইনে হামলা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া ইরান যুদ্ধের সময় যে ১৮ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে সাতজন ইরাকে ছিলেন।
ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি রয়টার্সকে বলেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইরাক থেকে চলে যাওয়ায় কৌশলগতভাবে ইরানেরই লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ, এর ফলে ইরাক থেকে এমন একটি সামরিক উপস্থিতি সরে যাচ্ছে, যারা বহু বছর ধরে দেশটিতে তেহরানের প্রভাবের বিরুদ্ধে ভারসাম্য রক্ষা করে এসেছে।
সূত্র: রয়টার্স, আলজাজিরা
ছবি : সংগৃহীত
নেপালে গত কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টি ও এর জেরে সৃষ্ট বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যেই দুর্যোগের ভয়াবহ নানা ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। খবর হিন্দুস্তান টাইমস।
সংবাদ সংস্থা পিটিআই নেপালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ২৪ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এসব ঘটনায় আরও চারজন নিখোঁজ এবং আটজন আহত হয়েছেন। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার ৮২টি পরিবার। পাশাপাশি ১১৪টি গবাদিপশুরও মৃত্যু হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে ৩০৪টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন চারজন এবং আহত হয়েছেন সাতজন।
এ ছাড়া ৮৭টি বন্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এতে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, ভারী বৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত ১৫১টি ঘটনায় আরও তিনজনের মৃত্যু এবং একজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (এনডিআরআরএমএ)।
টানা বৃষ্টিতে ২২৭টি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং আরও ১৪২টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩১টি সেতুও।
এনডিআরআরএমএ জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরের ওপর সৃষ্ট একটি নিম্নচাপের প্রভাবে নেপালে এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া রবিবার মানাং জেলায় বড় ধরনের একটি ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। এতে বিপুল পরিমাণ মাটি ও ধ্বংসাবশেষ মার্সিয়াংদি নদীতে গিয়ে পড়ে। কিছু সময়ের জন্য নদীটির প্রবাহও বন্ধ হয়ে যায়। ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় আরও ভূমিধস ও দুর্যোগের আশঙ্কা রয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
প্রশিক্ষণ উড্ডয়নে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম কৌশলগত বোমারু বিমান। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় আমুর অঞ্চলে ‘তুপোলেভ টিইউ-৯৫’ বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও একজন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) চীন সীমান্তবর্তী আমুর অঞ্চলের একটি জনবসতিহীন এলাকায় প্রশিক্ষণ উড্ডয়নের সময় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়।
রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনকা বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের কয়েক মিনিট পর ক্রাসনোইয়ারোভো শহরের কাছে বিমানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।
মাটিতে আছড়ে পড়ার পর বিমানের জ্বালানি ট্যাংকে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুন ধরে যায়। দুর্ঘটনার সময় বিমানটিতে কোনো গোলাবারুদ ছিল না বলে জানিয়েছে রাশিয়া।
রুশ সামরিক বাহিনীর বরাতে বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ ও পুরো পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ‘অ্যারোস্পেস ফোর্সেস’-এর একটি কমিশনকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। দুর্ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে জ্বলন্ত বিমান থেকে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। তবে এসব ভিডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি বলে আল জাজিরা জানিয়েছে।
রাশিয়ার ‘তুপোলেভ টিইউ-৯৫’ সোভিয়েত আমলে তৈরি বিশাল আকারের একটি কৌশলগত বোমারু বিমান। এটি পারমাণবিক অস্ত্র বহন, নিক্ষেপ ও সরবরাহে সক্ষম। বিমানটি প্রথম আকাশে ওড়ে ১৯৫২ সালে এবং ১৯৫৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হয়। কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও বিমানটি এখনো রুশ সামরিক বাহিনীর ব্যবহারে রয়েছে এবং নিয়মিত সামরিক মহড়ায় এটি ব্যবহার করা হয়।
রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চলে এ ধরনের বিমান দুর্ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। গত বছরের জুলাইয়ে খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে তিন্দা শহরের দিকে যাওয়ার সময় একটি ‘আন্তোনভ এএন-২৪’ বিমান বিধ্বস্ত হয়। ওই ঘটনায় বিমানে থাকা ৪৮ জনের সবাই নিহত হন।
এর আগে ২০২১ সালের আগস্টে রাশিয়ার কামচাটকা উপদ্বীপে ১৬ আরোহী নিয়ে একটি ‘মিল এমআই-৮’ হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়েছিল। ওই হেলিকপ্টারের অধিকাংশ আরোহী ছিলেন পর্যটক।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আজ মঙ্গলবার মন্ত্রণালয়ের দ্বিসাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল।
বাংলাদেশের এক মন্ত্রী সম্প্রতি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের পরিবর্তে নতুন করে পর্যালোচনার কথা বলেছেন। এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার (এনএসএ) ঢাকা সফরের খবর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গাসহ সব অভিন্ন নদীর বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য যৌথ নদী কমিশন রয়েছে। কারিগরি পর্যায়ের বৈঠকও অব্যাহত রয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার ঢাকা সফরের খবরের বিষয়ে জানতে চাইলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, এ বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য বা হালনাগাদ খবর নেই।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের আবারও জাতিসংঘে কাশ্মীর ইস্যু তোলার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এ মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করছে।
তিনি বলেন, জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং এটি ভারতের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ বিষয়ে কোনো বহিঃস্থ পক্ষের কোনো অধিকার বা এখতিয়ার নেই।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের’ পক্ষে ভারত
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পর প্রকাশিত আইবিএসএ যৌথ বিবৃতিতে গাজা ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন না করার কথা বলা হয়েছে।
ভারত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বসতি স্থাপন নিয়ে দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়ভাবে কোনো আলোচনা করেছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, বৈঠকে উন্নয়ন, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা শেষে যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে ভারতের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, ভারত ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের’ পক্ষে তার সুনির্দিষ্ট অবস্থানে অটল রয়েছে।
পারস্য উপসাগরে ভারতীয় পতাকাবাহী ও ভারতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট জাহাজ এবং সেখানে কর্মরত ভারতীয় নাবিকের সংখ্যা সম্পর্কেও তথ্য দিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
রণধীর জয়সোয়াল বলেন, পারস্য উপসাগরে হরমুজ প্রণালীর পশ্চিমে ভারতের ছয়টি পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ রয়েছে। এ ছাড়া ভারতের দিকে আসা ছয়টি বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজ রয়েছে। সব মিলিয়ে সেখানে ১২টি জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজে ১৬৩ জন ভারতীয় নাবিক কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া পুরো অঞ্চলের অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজে ৪ হাজার ৫০০ জনের বেশি ভারতীয় নাবিক কর্মরত আছেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, দেশটির নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলো নিয়মিত এসব নাবিকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
সম্প্রতি হাঙ্গেরির সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভারত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় (এসসিও) তুরস্কের সদস্যপদের বিরোধিতা করেছে বলে দাবি করা হয়।
এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান জানতে চাইলে রণধীর জয়সোয়াল বলেন, এসসিওতে নতুন কোনো সদস্য নেওয়ার বিষয়টি সংগঠনটির সব সদস্যরাষ্ট্রের সর্বসম্মত ও যৌথ সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।