হলি আর্টিজানে হামলা
২০১৬ সালের ১ জুলাই বিশ্ব তাকিয়ে ছিল বাংলাদেশের দিকে। কারণ, এ দিনই দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নারকীয় জঙ্গি হামলার শিকার হয়েছিল বাংলাদেশ। এ হামলায় ১৭ জন বিদেশিসহ নিহত হন মোট ২২ জন। নিহতদের মধ্যে দুজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। জঙ্গিদের গুলি ও বোমায় আহত হন পুলিশের অনেকে। আজ সেই হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো।
ওইদিন রাত ৮টা ৪৫-৫০ মিনিটের দিকে ওয়ারলেস সেটে পুলিশ জানতে পারে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে গোলাগুলি হচ্ছে। খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ সেখানে হাজির হয়। এভাবে কয়েক বার প্রস্তুতি নেওয়া সত্ত্বেও স্পর্শকাতর বিবেচনায় রাতে হলি আর্টিজানে অভিযান চালানো থেকে বিরত থাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো সদস্যদের পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্টে’ অবসান হয় জিম্মিদশার, নিহত হয় হামলাকারী পাঁচ জঙ্গি।
ভয়াবহ ওই জঙ্গি হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে বেরিয়ে আসতে থাকে জঙ্গিদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের নীলনকশা। বিভিন্ন সময় এ হামলার সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের যোগসাজসের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
তবে, তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ জানিয়েছে—হামলায় জড়িত জঙ্গিরা সবাই ‘হোম গ্রোন’, অর্থাৎ দেশীয়। জেএমবির কিছু সদস্য নতুনভাবে উজ্জীবিত হয়ে এ নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়, যারা ‘নব্য জেএমবি’ বলে আখ্যায়িত।
নব্য জেএমবির সদস্যদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকলেও হলি আর্টিজানের ঘটনার পর ধারাবাহিক অভিযানে জঙ্গিদের রুখে দিতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব অভিযানে অনেক নব্য জেএমবির সদস্য নিহত হয় এবং গ্রেপ্তার করা হয় আরও অনেককে।
তবে, হলি আর্টিজানে নৃশংস জঙ্গি হামলার ছয় বছরেও শেষ হয়নি মামলার বিচার প্রক্রিয়া। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর এ মামলায় সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং একজনকে বেকসুর খালাসের রায় দেন আদালত।
রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—হামলার মূল সমন্বয়ক তামিম চৌধুরীর সহযোগী আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আবু জাররা, অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহকারী নব্য জেএমবি নেতা হাদিসুর রহমান সাগর, জঙ্গি রাকিবুল হাসান রিগ্যান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব ওরফে রাজীব গান্ধী, হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী আব্দুস সবুর খান (হাসান) ওরফে সোহেল মাহফুজ, শরিফুল ইসলাম ও মামুনুর রশিদ।
আসামিদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করেন বিচারিক আদালত। আর, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় এ মামলার অপর আসামি মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে খালাস দেওয়া হয়।
র্যাব সূত্রে জানা যায়, এ ছাড়া র্যাবের অভিযানে বন্ধ হয় হলি আর্টিজানের বীভৎস ছবি তাৎক্ষণিক প্রচার করা আত্-তামকীন ওয়েবসাইট এবং গ্রেপ্তার হয়েছিল অ্যাডমিনসহ বেশ কয়েক জন সদস্য। হলি আর্টিজান ঘটনার পরে অভিযানে র্যাব জঙ্গি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা, অর্থদাতা ও বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের গ্রেপ্তার করে জঙ্গি সংগঠনগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছে। এখন সে অর্থে জঙ্গিদের কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায় না।
সেদিন যা ঘটেছিল
১ জুলাই শুক্রবার। সন্ধ্যার পর হঠাৎ করে খবর আসে গুলশানে ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে’ পুলিশের গোলাগুলি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানা গেল—একটি রেস্তোরাঁয় সশস্ত্র হামলাকারী ঢুকে বেশ কয়েকজনকে জিম্মিও করেছে। কিন্তু, ঘটনাটি আসলে কী? গুজব, নাকি সত্যি—সেটি নিশ্চিত হতেও ঘণ্টাখানেক সময় চলে গেল। পরে জানা গেল হামলাকারীরা ওই রেস্তোরাঁয় থাকা বিদেশি নাগরিকসহ বেশ কয়েকজনকে জিম্মি করেছে। একপর্যায়ে জানা যায়, গুলশান ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গিরা হামলা চালিয়েছে।
তখন ওই জোনের দায়িত্বে থাকা ডিএমপির ডিসি আহাদ তখন গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগে ইউনাইটেড হাসপাতালের পাশে থাকা গুলশান থানার একটি মোবাইল টিম সেখানে পৌঁছায়। একজন উপপরিদর্শকের (এসআই) নেতৃত্বে মোবাইল টিমটি হলি আর্টিজানের সামনে যাওয়া মাত্রই তাদের লক্ষ্য করে সন্ত্রাসীরা গুলি ছুড়তে থাকে। সন্ত্রাসীদের গুলির জবাবে মোবাইল টিমের সদস্যরাও গুলি ছোড়ে। এরই মধ্যে ওই মোবাইল টিমের দলনেতা হলি আর্টিসানের প্রধান ফটকটি বাইরে থেকে বন্ধ করে দেন, যাতে সন্ত্রাসীরা বের হয়ে যেতে না পারে। গুলি বিনিময়ের একপর্যায়ে ওই এসআই গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
আবদুল আহাদ আরও বলেন, ঘটনাস্থলে পৌঁছে আমরা এবং আশপাশ থেকে আসা মোবাইল টিমগুলো হলি আর্টিসানের দুটি গেটে অবস্থান নিই। এর মধ্যে ডিসি স্যার একটি গেটে, আরেকটিতে আমি। এ সময় প্রচুর গোলাগুলির আওয়াজ আসছিল হলি আর্টিসানের ভেতর থেকে। গোলাগুলির শব্দ শুনে আমাদের মনে নানা ধরনের সন্দেহ জাগছিল। তখনও আমরা নিশ্চিত ছিলাম না—এটি জঙ্গি হামলা কি না। আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আমাদের একাধিকবার গুলি বিনিময় হয়। তারা বাইরে বের হতে চেয়েছিল, কিন্তু, আমাদের প্রতিরোধের কারণে তারা বের হতে পারেনি।
এভাবে রাত ১০টার দিকে পুলিশ, র্যাব এবং আধা সামরিক বাহিনী বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশের কয়েকশো সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে অবস্থান নেয়। গণমাধ্যমকর্মীরাও ৭৯ নম্বর রোডের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান নেন। রাত সোয়া ১১টার দিকে হাসপাতালে মারা যান বনানী থানার ওসি মোহাম্মদ সালাউদ্দীন। এর কিছুক্ষণ পরই ডিবির সহকারী কমিশনার (এসি) মো. রবিউল করিম নিহত হন।
এর মধ্যে পুলিশের আইজিপি ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে তৎকালীন র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, হলি আর্টিসানের ভেতরে অন্তত ২০ জন বিদেশিসহ কয়েকজন বাংলাদেশিও আটকা পড়েছেন। ভেতরে যাঁরা আছেন, তাঁদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য তাঁরা বিপথগামীদের সঙ্গে কথা বলতে চান। রাত ৪টা পর্যন্ত অস্ত্রধারীদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যেরা।
আইএসের দায় স্বীকার
রাতেই ইসলামিক স্টেট জঙ্গি গোষ্ঠী তাদের বার্তা সংস্থা বলে পরিচিত ‘আমাক’ এ গুলশান হামলার দায় স্বীকার করে ২০ জন নিহত হওয়ার কথা জানায়। আইএস-এর পক্ষ থেকে হামলাকারীদের মধ্যে পাঁচজনকে তাদের ‘সৈনিক’ বলে দাবি করে, হামলার দায় নেয় তারা।
২ জুলাই অভিযানের ঘটনাক্রম
সকাল ৭টা ৩০ মিনিট : রাতভর গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট সংলগ্ন এলাকা ঘিরে রাখার পর যৌথ সেনা, নৌ, পুলিশ, র্যাব এবং বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ কমান্ডো দল গুলশানে অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়।
৭টা ৪৫ মিনিট : কমান্ডো বাহিনী অভিযান শুরু করে। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত দলের সদস্যেরা রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়।
সকাল সোয়া ৮টায় রেস্টুরেন্ট থেকে প্রথম দফায় নারী, শিশুসহ ছয় জনকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। পাশের একটি ভবন থেকে একজন বিদেশি নাগরিক তাঁর মোবাইল ফোনে সেটি ধারণ করেন। সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয় অভিযানকারীরা। গোয়েন্দা দল ভবনের ভেতর বিস্ফোরকের জন্য তল্লাশি শুরু করে। কিছুক্ষণ পরই আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করে গোয়েন্দারা।
৯টা ১৫ মিনিটে অভিযান শেষ হয়। কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে প্রায় ১২ ঘণ্টার রক্তাক্ত জিম্মি সংকটের অবসান হয়।
থান্ডারবোল্ট নামের সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা যে অভিযান চালায়, সেখানে জঙ্গি হামলায় সরাসরি অংশ নেয়া পাঁচ তরুণের সবাই মারা পড়েন। তাঁরা হলেন—মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ওরফে মামুন, নিবরাজ ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল। সকাল ১০টায় চার জন বিদেশিসহ ১৩ জন জীবিত উদ্ধারের খবর জানানো হয়। রেস্টুরেন্টের ভেতরে অজ্ঞাত পাঁচজনের মরদেহ পাওয়ার কথা পুলিশ জানায়।
অভিযানে জঙ্গিদের ছয় জন নিহত এবং এক জন ধরা পড়ে। জিম্মি সংকটের ঘটনায় ১ জুলাই সন্ধ্যা থেকে দিবাগত সারা রাত অর্থাৎ ২ জুলাই সারা বিশ্বের গণমাধ্যমের নজর ছিল ঢাকার অভিজাত গুলশান এলাকায় অবস্থিত হোলি আর্টিজান বেকারির দিকে।
হরমুজ প্রণালি
প্রায় ৭ মাস ধরে যুদ্ধ চলছে ইরানের সঙ্গে। হরমুজ প্রণালির অস্থিরতাও শুরু তখন থেকে। এর মধ্যে নতুন আতঙ্ক তৈরি করছে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও। বিশ্বের প্রায় ৩৫ শতাংশ তেলের সরবরাহ চ্যানেলে এভাবে বাধা তৈরি হলেও বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বাস্তবতা মেনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এগোচ্ছে বিকল্প পথে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে কমাচ্ছে চাহিদা। কমাচ্ছে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা। এমন পরিবর্তনের কারণে আগের তুলনায় কম আমদানির পরও সচল রয়েছে দেশের ইস্টার্ন রিফাইনারি।
রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠান আগে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার হাজার টন এলপিজি, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, ডিজেল, ফার্নেসসহ ১৬ ধরনের তেলজাতীয় পণ্য উৎপাদন করলেও এখন তাতে পরিবর্তন এনেছে। তারপরও বড় ধরনের সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়নি বাংলাদেশেও। জ্বালানির দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু অন্যতম প্রধান দুটি প্রণালি আক্রান্ত হওয়ার পরও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠেনি এখনও।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার বাজারে যাওয়া মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এলএনজির ১৫ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। প্রতিদিন যার পরিমাণ ছিল প্রায় ২ কোটি ব্যারেল। হরমুজ দিয়ে যাওয়া এই জ্বালানির প্রায় ৮৯ শতাংশ আসে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বাজারে। আরেক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব দিয়ে বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ১২ শতাংশ পরিবহন করা হয়। এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরকে যুক্ত করেছে এবং সুয়েজ খালের দিকে যাওয়ার অন্যতম পথও এটি।
জেপি মরগ্যানের প্রধান পণ্যবাজার বিশ্লেষক নাতাশা কানেভার সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, তিন কারণে তেলের বাজার ধারণার চেয়ে কম বেড়েছে। তাঁর হিসাবে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপর তেলের দাম দেড়শ ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে শঙ্কা থাকলেও এখন মনে হচ্ছে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলেও তেলের দাম সে পর্যায়ে বাড়বে না। তাঁর সর্বশেষ এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের বিকল্পব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। হুতিদের দ্বারা বিকল্প পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগে সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল ইরানের নাগালের বাইরে থাকা বন্দরে পাঠিয়েছে। এটির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিল, গায়ানা ও কানাডা সম্মিলিতভাবে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের জ্বালানি চাহিদা আগের তুলনায় কমিয়েছে। আবার যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ছাড়া অধিকাংশ দেশ ধারণার তুলনায় কম তেল ব্যবহার করেছে তাদের মজুত থেকে। এজন্য যুদ্ধের সময়ে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল কমেছে। ভ্রমণ কমে যাওয়া, গণপরিবহন ব্যবহার ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ার কারণে যেমন তেলের চাহিদা কমেছে, তেমনি অনেক প্রতিষ্ঠানের বাড়ি থেকে কাজের ধারায় ফিরে যাওয়ার কারণেও তা কমেছে।
সরবরাহ চ্যানেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ কমেছে। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে চাহিদাও কমেছে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানায়, স্বাভাবিক সময়ে দেশে প্রতিবছর ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ বেশি। প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে, যা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। এলপিজি, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, ডিজেল, ফার্নেসসহ ১৬ রকমের তেলজাতীয় পণ্য উৎপাদন করে ইস্টার্ন রিফাইনারি। আগে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার হাজার টন জ্বালানি পণ্য উৎপাদন হলেও এখন হচ্ছে গড়ে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টন। উৎপাদিত পণ্যের পরিমাণও ১৬ থেকে কমে নেমেছে আট থেকে দশে। এই কারখানায় এতদিন কেবল সৌদি আরবের ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা হলেও যুদ্ধ শুরুর পর বিকল্প দেশ হিসেবে মালয়েশিয়ার ক্রুড অয়েল ব্যবহারের কথা ভেবেছে ইস্টার্ন রিফাইনারি।
সৌদি ক্রুড অয়েলের অভাবে চলতি বছরের এপ্রিলে পরিশোধন কার্যক্রম কিছুদিন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল ইস্টার্ন রিফাইনারি। অবশ্য সেই সময়টাতেও কারখানা সংস্কারের বিকল্প কাজ সম্পন্ন করেছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগারটি। তখন থেকে উৎপাদনের পরিমাণও কমিয়েছে সংস্থাটি। দেশে এলএনজি ও এলপিজির সরবরাহ প্রক্রিয়াতেও সম্প্রতি বাধা তৈরি হয়েছিল।
কারিগরি ত্রুটির কারণে কয়েকদিন সমস্যা হলেও দেশে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়নি মজুতে। কারণ, দাম বেশি পড়লেও বাংলাদেশ বিকল্প দেশ থেকে বিকল্প উপায়ে জ্বালানি সরবরাহ করেছে।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না বাংলাদেশকে। জ্বালানি তেল ও গ্যাস সংগ্রহের জন্য বিকল্প উৎসের সহায়তা নিচ্ছি আমরা।’
র্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকনালি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, তেলের দাম আর হু হু করে বাড়বে না। একশ ডলার ছাড়িয়ে দেড় শতকের ঘর এটি আর স্পর্শ করবে না শিগগির। বিশ্ববাজারে মিলছে এর ইঙ্গিতও। বাব আল-মান্দেব হুতিরা নিয়ন্ত্রণে নিলেও গত সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের নভেম্বর মাসের ফিউচার দর ২ দশমিক ১১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৬৮ ডলারে নেমেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর তেলের দাম ১০৯ ডলারে উঠেছিল। ১৬ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ এক দিনের মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০৪ ডলারে নেমে আসে। এরপর সোমবার তেলের দাম ১০১ ডলারে নেমে যায়। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করে। এর পর ৩০ এপ্রিল তেলের দাম সর্বোচ্চ ১২৬ ডলার পর্যন্ত ওঠে। পরে আবার তা কমে আবার বাড়লেও অতিক্রম করেনি ১২৬ ডলারের ঘর।
ছবি : সংগৃহীত
ভোরের আলো ফুটতেই সন্ধ্যা নদীর বুকে যেন প্রাণের সঞ্চার হয়। চারপাশ থেকে ছুটে আসে শত শত ছোট-বড় ডিঙি ও ট্রলার। নদীর স্নিগ্ধ হাওয়ায় মিশে যায় মানুষের কোলাহল, দাঁড় টানার ছপছপ শব্দ আর ধান-চাল মাপার খসখস আওয়াজ। এক নৌকায় হয়তো চলছে ধানের দরদাম, তো ঠিক পাশে অন্য নৌকায় মাপা হচ্ছে চকচকে চাল।
ক্রেতা-বিক্রেতার দরকষাকষি, বস্তা টানাটানি আর নগদ লেনদেন-সবকিছুই চলছে নদীর বুকে ভাসমান নৌকায়। বরিশালের বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীর বুকে বসা ধান-চালের এ ভাসমান হাট কেবল একটি বাজার নয়, এটি যেন আবহমান বাংলার কৃষিনির্ভর অর্থনীতির এক জীবন্ত ক্যানভাস।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, প্রমত্তা সন্ধ্যা নদীর তীরে ধান-চালের এই ভাসমান বাণিজ্যের বয়স প্রায় ২০০ বছর। একসময় নদীর দুই পাশে সারি সারি ধান-চালের আড়ত ও চালকল ছিল। মোল্লা, ব্যাপারী, মৃধা, সরদারসহ বিভিন্ন উপাধিধারী ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত পুরো এলাকা। কালের বিবর্তনে অনেক কিছু বদলে গেলেও নদীর বুকে নৌকায় নৌকায় বেচাকেনার সেই আদি রীতি আজও টিকে আছে।
বানারীপাড়ার নামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ‘বালাম চাল’। সরু, লম্বাটে ও সুগন্ধি এই চালের একসময় দেশজুড়ে ব্যাপক কদর ছিল। বালামের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের ধান ও চাল বেচাকেনা হয় এখানে। তবে এই হাটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলেন ‘কুটিয়াল’রা।
ধান কিনে তা প্রক্রিয়াজাত করে চালে রূপান্তরের কারিগরদের স্থানীয় ভাষায় কুটিয়াল বলা হয়। নৌকায় ধান কিনে প্রথমে তা পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর ভোরে বিশাল আকৃতির চুলায় বিশেষ পাত্রে সেই ধান সেদ্ধ করা হয়।
এরপর দুই-তিন দিন কড়া রোদে উঠানে শুকিয়ে চালকলে ভাঙানোর পর মেলে সেই কাঙ্ক্ষিত ঝরঝরে চাল। একসময় বানারীপাড়ার ঘরে ঘরে কুটিয়ালদের ব্যস্ততা ছিল, যা আজ অনেকটাই ম্রিয়মাণ।
বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে নদীপথে ব্যবসায়ীরা ছুটে আসেন এই হাটে। বরগুনার ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন যেমন এক নৌকা ধান নিয়ে এসেছেন। তাঁর মতে, এখানে ধানের ন্যায্য দাম পাওয়া যায়, আবার ফেরার পথে তুলনামূলক কম দামে ভালো মানের চালও কিনে নেওয়া যায়। যাতায়াতে সময় ও দূরত্ব বেশি হলেও নদীপথে পণ্য পরিবহনের সুবিধা এবং ব্যবসায়িক বিশ্বস্ততার কারণে তিনি দশকের পর দশক ধরে এই হাটে আসেন।
আগে যেখানে পালতোলা নৌকার আধিক্য ছিল, এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে যন্ত্রচালিত ট্রলার বা ইঞ্জিন নৌকা। তবে নদীর বুকে সারি সারি নৌকায় ধান-চালের পসরা সাজানোর সেই চিরায়ত দৃশ্যটি বদলায়নি।
বানারীপাড়ার এই মূল হাট বসে সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার। তবে আগের দিনের হাটের রেশ ধরে রবি ও বুধবারও কিছুটা বেচাকেনা চলে, যাকে স্থানীয়রা বলেন ‘গালার হাট’। হাটের দিনগুলোয় পাইকার, কুটিয়াল আর শ্রমিকদের দম ফেলার ফুরসত থাকে না। এত ব্যস্ততার মধ্যেও রয়েছে এক অন্য রকম প্রশান্তি।
ছবি : সংগৃহীত
বিসিএসসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার লিখিত ধাপ পেরিয়ে ভাইভায় পৌঁছানো একটি বড় অর্জন। তবে ভাইভায় ভালো করার জন্য শুধু সাধারণ জ্ঞান ও সাম্প্রতিক ঘটনা জানলেই হবে না। প্রার্থীর একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড, বিষয়ভিত্তিক মৌলিক জ্ঞান, বিশ্লেষণক্ষমতা, ব্যক্তিত্ব এবং নিজের পড়াশোনাকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভাইভার আগে একাডেমিক প্রস্তুতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রথমেই নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রতিটি স্তর সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিতে হবে। কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েছেন, কোন বিষয়ে পড়েছেন, কেন সেই বিষয়টি বেছে নিয়েছেন, বিষয়টির গুরুত্বপূর্ণ শাখা কী এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রে এর ব্যবহার কী– এসব প্রশ্নের উত্তর অনুশীলন করা প্রয়োজন। নিজের সিভি বা আবেদনপত্রে দেওয়া প্রতিটি তথ্য সম্পর্কে প্রস্তুত থাকতে হবে। কোনো তথ্য উল্লেখ করে থাকলে সেখান থেকেই প্রশ্ন আসতে পারে। নিচের বিষয়গুলোকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।
> নিজের পরিচয় ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে। নিজের নাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভাগ, বিষয়, শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং কেন নির্দিষ্ট বিষয়টি বেছে নিয়েছেন– এসব প্রশ্নের উত্তর সাবলীলভাবে দিতে পারতে হবে।
> নিজের একাডেমিক বিষয়ের মৌলিক ধারণাগুলো ভালোভাবে ঝালিয়ে নিতে হবে। সংজ্ঞা, গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব, সূত্র, পরিভাষা, ধারণা ও ব্যবহারিক প্রয়োগ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। শুধু মুখস্থ নয়, কোনো বিষয় কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবে কোথায় এর প্রয়োগ রয়েছে, সেটিও বুঝতে হবে।
> নিজের বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কোর্সগুলো পুনরালোচনা করতে হবে। বিশেষ করে যেসব বিষয় স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়েছেন, সেগুলোর মৌলিক অধ্যায় ও গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলো আবার পড়া প্রয়োজন।
> একাডেমিক ফলাফল নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে। কোনো বিষয়ে ভালো বা খারাপ ফলাফলের কারণ, প্রিয় বিষয়, কঠিন বিষয় এবং নিজের একাডেমিক শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে যুক্তিসংগত উত্তর অনুশীলন করা উচিত।
> থিসিস, গবেষণা, প্রজেক্ট বা ইন্টার্নশিপ করে থাকলে সেগুলো ভালোভাবে ঝালিয়ে নিতে হবে। গবেষণার বিষয়, উদ্দেশ্য, পদ্ধতি, ফলাফল এবং বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে প্রশ্ন আসতে পারে।
> নিজের একাডেমিক বিষয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতার সম্পর্ক বুঝতে হবে। নিজের বিষয়ের জ্ঞান কীভাবে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রযুক্তি, পরিবেশ বা প্রশাসনে কাজে লাগতে পারে, তা নিয়ে চিন্তা করা দরকার।
> বাংলাদেশের সংবিধান, মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে মৌলিক ধারণা রাখতে হবে।
> নিজ জেলা সম্পর্কে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, অর্থনীতি, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, নদনদী, শিল্প ও উল্লেখযোগ্য স্থাপনা সম্পর্কে প্রশ্ন আসতে পারে।
> সাম্প্রতিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি নিয়মিত পড়তে হবে। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, প্রযুক্তি, পরিবেশ ও সামাজিক ঘটনাগুলোর কারণ ও প্রভাব বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
> নিজের ক্যারিয়ার পরিকল্পনা পরিষ্কার রাখতে হবে। কেন সরকারি চাকরি করতে চান, কেন বিসিএস বেছে নিয়েছেন এবং পছন্দের ক্যাডার সম্পর্কে আপনার ধারণা কী—এসব প্রশ্নের উত্তর অনুশীলন করা প্রয়োজন।
> পরিস্থিতিভিত্তিক প্রশ্নের অনুশীলন করতে হবে। একজন কর্মকর্তা হিসেবে কোনো সমস্যা দেখা দিলে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন, কীভাবে জনগণের সঙ্গে কাজ করবেন বা সংকট মোকাবিলা করবেন—এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর যুক্তি দিয়ে দেওয়ার অভ্যাস করতে হবে।
> বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় নিজের পরিচয় এবং একাডেমিক বিষয় সহজভাবে ব্যাখ্যা করার অনুশীলন করা ভালো।
> প্রতিদিন কিছু সময় মক ভাইভা দিতে হবে। শিক্ষক, বন্ধু বা অভিজ্ঞ ব্যক্তির সামনে বসে প্রশ্নের উত্তর দিলে ভয় ও জড়তা কমবে।
> শরীরী ভাষা ও আচরণের দিকে নজর দিতে হবে। চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা, স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসা, প্রশ্ন মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সংক্ষিপ্ত ও পরিষ্কার উত্তর দেওয়ার অভ্যাস করতে হবে।
> উত্তর জানা না থাকলে কীভাবে তা সামলাতে হবে, সেটিও অনুশীলন করতে হবে। ভুল তথ্য দেওয়ার চেয়ে বিনয়ের সঙ্গে না জানার বিষয়টি স্বীকার করা বেশি গ্রহণযোগ্য।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, ভাইভায় বোর্ড সাধারণত শুধু কত কিছু মুখস্থ আছে তা জানতে চায় না; বরং প্রার্থী নিজের জ্ঞান কতটা বুঝেছেন এবং সেই জ্ঞান বাস্তব পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রয়োগ করতে পারেন, সেটিও দেখতে চায়। তাই ভাইভার আগে একাডেমিক বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পুনরালোচনা, নিজের গবেষণা বা প্রজেক্ট ঝালিয়ে নেওয়া, সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং মক ভাইভার মাধ্যমে দুর্বলতা চিহ্নিত করাই হতে পারে প্রস্তুতির সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
ছবি : সংগৃহীত
অধিকাংশ মায়ের অভিযোগ তাদের সন্তান খায় না, রুচি নেই। এ জন্য তারা তাদের ছোট শিশুকে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। ফলে একপর্যায়ে দেখা যায় সন্তানকে সারাদিন খাবার না দিলেও তার ক্ষুধা লাগে না।
সন্তানকে খাওয়ানোর সময় দুটি জিনিস মনে রাখতে হবে। তার আসলে ক্ষুধা লেগেছে কিনা এবং খাবারের নির্দিষ্ট সময় মেনে চলছেন কিনা। ক্ষুধা না লাগলে সন্তান খাবে না। কাজেই আগের খাবারটা হজম হওয়ার সময় দিতে হবে। অনেক মা শিশুকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় এটা-সেটা খাইয়ে ক্ষুধা নষ্ট করেন। আবার ভাত খাওয়ার সময় কলা, কলা খাওয়ানোর সময় ভাত নিয়ে বসেন। আবার পেট ভরে গেলেও পুরোটা খাওয়ানোর জন্য তাড়াহুড়া করেন।
এতে যে যে সমস্যা হয়
১. শিশু খেতে না পেরে বমি করতে পারে, হজম না হয়ে পাতলা পায়খানা হতে পারে।
২. জোর করায় খাবার গলায় আটকে শ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফুসফুসে গিয়ে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। এমনকি ফুসফুসে ঘা বা নিউমোনিয়া হতে পারে।
৩. সন্তানের খাবারে ভীতি জন্মাতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে তীব্র ক্ষুধামান্দ্য হতে পারে।
৪. খাবারে ভীতি জন্মানোর ফলে না খেয়ে পুষ্টিহীনতায় ভুগতে পারে।
৫. অনেক সময় খাদ্যভীতি জন্মানোর ফলে সন্তানের স্বাভাবিক ক্ষুধা নষ্ট হয়। শিশু মানসিকভাবে এতটা অসুস্থ হয়ে পড়ে যে খাবার দেখতে, খাবার তৈরি করার আওয়াজ বা গন্ধ পেলে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, বমি করা শুরু করে। এতে শিশু মায়ের প্রতি বিরূপ আচরণও করতে পারে, অবিশ্বাস থেকে সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দিতে পারে।
৬. জোর করে খাওয়াতে থাকলে শিশু অস্বাভাবিক রকম খুঁতখুঁতে হয়ে যেতে পারে, বেছে বেছে খাওয়ার ফলে নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে অস্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের কারণে অতিরিক্ত স্থূলতার সমস্যায়ও পড়তে পারে। তাই শিশুকে জোর করে খাওয়ানোর বদলে খাবার খাওয়ার পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য নিয়ে আসুন। যেমন তাকে খাবার হজমের জন্য সময় দিন, দুই খাবারের মধ্যে পর্যাপ্ত সময়ের ব্যবধান রাখুন, খাবার দেওয়ার একটা নির্দিষ্ট সময় ও জায়গা নির্বাচন করুন, একসঙ্গে বেশি খাবার না খেতে চাইলে অল্প অল্প করে খাবার দিন।
পুরো বাটির খাবার শেষ না করা পর্যন্ত মায়েরা থামতে চান না। কখন থামতে হবে তা অভিভাবককে বুঝতে হবে। শিশু মুখ না খুললে, মাথা সরিয়ে নিলে, বমিভাব করলে খাবার দেওয়া বন্ধ করুন। কম খেলে চেষ্টা করুন যতটুকু খাবার খায় তা যেন পুষ্টিকর হয়। এক চামচ খেলে ওই এক চামচে যেন যথেষ্ট পরিমাণ প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল, কার্ব ও ফ্যাট থাকে সেটি নিশ্চিত করুন।
শিশুকে জোর করে খাওয়ালে হয়তো আপনি সাময়িকভাবে তার পেট ভরাতে পারবেন, এতে আপনার মানসিক শান্তি মিলবে। সময়ের সঙ্গে এটি বুমেরাং হয়ে আপনাকে বিপদে ফেলবে। আপনার সন্তান সত্যি সত্যিই ‘কিছুই খায় না’ রোগ বাঁধিয়ে শারীরিক ও মানসিক অশান্তির কারণ ঘটাবে।
মাহবুবের বয়স ২৫ বছর। মাঝে মধ্যে তাঁর বুক ধরফর করা শুরু হয়। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় হাত-পা অবশ হয়ে আসা, বুকে ব্যথা করা। ক্রমশ তাঁর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। মনে হয় এখনই মরে যাবেন। এই ধরনের রোগীরা একটার পর একটা ইসিজি আর ইকোকার্ডিওগ্রাম করতে করতে তাঁর চিকিৎসা ফাইল অনেক বড় করে ফেলেন। চিকিৎসকও বদলাতে থাকেন, তাঁর রোগ ধরতে পারছেন না বিধায়। এর মধ্যে রোগীর গায়ে কিন্তু বড় অসুখের সিল পড়ে গেছে। আত্মীয়স্বজনরা বলতে থাকেন ওকে কোনো বড় কাজে দিও না। ওর বড় জটিল অসুখ। আসলে এটি একটি টেনশন বা অস্থিরতা গ্রুপের রোগ; যাকে আমরা প্যানিক ডিজঅর্ডার বলে থাকি।
কীভাবে বুঝবেন যে প্যানিক ডিজঅর্ডার রোগে ভুগছেন
> হঠাৎ করে বুক ধরফর করা, শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়া, মাথা ঝিমঝিম করা ।
> দম বন্ধ হয়ে আসা, বড় বড় করে হাঁপানি রোগীর মতো শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া।
>হাত-পা অবশ হয়ে আসা। শরীরে কাঁপুনি হওয়া।
>বুকের মধ্যে চাপ লাগা এবং ব্যথা অনুভব করা।
>এমনও দেখা গেছে, কোনো কোনো রোগী বলেন, হঠাৎ পেটের মধ্যে একটা মোচর দেয় তারপর ওপর দিকে উঠে বুক ধরফর শুরু হয় সঙ্গে সঙ্গে হাত-পা অবশ হয়ে যায়। আর কথা বলতে পারেন না।
> বমি বমি ভাব লাগে। পেটের মধ্যে অস্বস্তি বোধ লাগা ও গলা শুকিয়ে আসা।
> পেটের মধ্যে গ্যাস ওঠে, খালি গ্যাস ওঠে এবং বুকে চাপ দেয়।
> দুশ্চিন্তা থেকেও মাথাব্যথা হতে পারে। কোনো কোনো রোগী বুকে ব্যথা ও হাত-পায়ের ঝিমঝিমকে হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ মনে করে প্রায়ই ছুটে যান হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে চিকিৎসক দেখাতে।
> মৃত্যু ভয় দেখা দেওয়া। মনে হয় যেন এখনই মরে যাবেন রোগ যন্ত্রণায়।
> নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা।
> বারবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া / ইসিজি করা।
> দূরে কোথাও গেলে স্বজনদের কাউকে সঙ্গে নিয়ে যান, যেন মাঝখানে অসুস্থ হলে ধরতে পারেন।
> নামাজ পড়তে গেলে একপাশে দাঁড়ান, যেন অসুস্থ হলে তাড়াতাড়ি বের হতে পারেন।
> রোগীর মধ্যে ভয় কাজ করে এই বুঝি আবার একটি অ্যাটাক হতে পারে।
> লক্ষণগুলো হঠাৎ করে শুরু হয়। ১০ থেকে ২০ মিনিট পরে কমে যায়।
> সেফটি বিহেভিয়ার, যেমন অ্যাটাকের সময় বসে পড়া, কোনো কিছু হাত দিয়ে ধরে সাপোর্ট নেওয়া ইত্যাদি লক্ষণ রোগীর মাঝে দেখা দেয়; যা কিনা হৃদরোগীর মাঝে লক্ষণীয় নয়।
রোগীর ভাবনা
> তাঁর হার্টের অসুখ এজন্য বারবার ইসিজি ও ইকোকার্ডিওগ্রাম করে বেড়াচ্ছেন।
> মাথা ঝিমঝিম করছে। মানে স্ট্রোক করে ফেলবেন।
> হাত-পা অবশ হয়ে আসছে; মনে হয় প্যারালাইসিস হয়ে যাবে।
> যে কোনো সময় মৃত্যু হতে পারে।
কী কী পরিণতি হতে পারে
> সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না করালে, এ ধরনের রোগী চিকিৎসকের দ্বারে দ্বারে ঘুরে সর্বস্বান্ত হন এবং সব শেষে নিজে একজন হার্টের রোগী বলে কাজকর্ম ছেড়ে দেন।
> বিষণ্নতায় ভুগতে পারেন।
> নেশায় জড়িয়ে যেতে পারেন।
> এগোরেফোবিয়া নামক আরও একটি সমস্যার উদ্ভব হতে পারে। তখন রোগী বাইরে বের হতে, হাটবাজার, রেস্টুরেন্ট, ক্যান্টিন ইত্যাদি জায়গায় যেতেও ভয় পান।
> গুমের সমস্যা হতে পারে।
> আত্মহত্যার চিন্তা মাথায় আসতে পারে।
> সর্বোপরি এই মানুষটি আর সমস্যার কারণে পরিবার, সমাজ ও জাতির বোঝা হয়ে যেতে পারেন।
চিকিৎসা:
> নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানো।
> রোগীকে আশ্বাস দেওয়া। নির্দিষ্ট সময়ান্তে মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া।
সঠিক সময়ে সাইকিয়াট্রিস্টের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত চিকিৎসা নিলে এসব রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান।