সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া।ফাইল ছবি

  • প্রকাশ : শুক্রবার ১৪ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ১২:০০ এএম

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক অবিস্মরণীয় নাম। বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের অপ্রতিরোধ্য কণ্ঠস্বর। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতে বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছে কয়েক দশকের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে। জটিল আর অনিশ্চিত সেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলের হাল ধরেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া।


তাঁর নেতৃত্বে ছিল প্রজ্ঞা আর অবিচল দৃঢ়তার মিশেল; তিনি কখনো কারোও কাছে মাথা নত করেননি, কোনো বাধায় পিছু হটেননি। এই আপসহীন মনোভাবই তাঁকে কোটি কোটি মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত করেছে। দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে রাজপথের আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা—সবক্ষেত্রেই তিনি রেখেছেন দূরদর্শী নেতৃত্বের স্বাক্ষর। শত প্রতিকূলতা ও দমন-পীড়নের মুখেও নিজের অবস্থানে অটল থেকে আপসহীন পথচলাই বেগম জিয়াকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক অনিবার্য অধ্যায়ে পরিণত করেছে।


১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশ ও দলের চরম সংকটময় মুহূর্তে ঘর থেকে রাজনীতির ময়দানে নামতে হয়েছিল বেগম খালেদা জিয়াকে। দীর্ঘ নয় বছরের সামরিক স্বৈরশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কিংবা বারবার কারারুদ্ধ হয়েও তিনি কারও সঙ্গে আপস করেননি। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবির্ভূত হন। পাশপাশি বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম নারী সরকারপ্রধান হওয়ারও গৌবর অর্জন করেছিলেন। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে সংসদীয় শাসনব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন-বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রতিটি বাঁকে তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অদম্য।




১৫ আগস্ট  প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন। এবারের জন্মদিনে শোক, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়ায় তাকে স্মরণ করবেন বিএনপির অগণিত নেতা-কর্মীসহ দেশবাসী।


একগুচ্ছ নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের আবির্ভাব ঘটে। ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতিতে জিয়াউর রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে সেই যাত্রার শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের বীর সেনানী ও সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যেমন সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি স্বাধীনতার পর দেশের এক চরম অস্থিতিশীল মুহূর্তে জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন এই চৌকস ও মেধাবী সেনা কর্মকর্তা।


১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ফের দেশের হাল ধরেন। আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও দূরদর্শী নেতৃত্বই পরবর্তীতে তাঁকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির আসনে আসীন করে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে একটি জাতি গঠনে সচেষ্ট হন তিনি। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন।


১৯৮১ সালের ৩০ মে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে শাহাদত বরণ করেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। এই ঘটনা দেশকে এক গভীর নেতৃত্ব সংকটের মুখে ফেলে দেয়। সেই শূন্যতার মাঝেই রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার অভিষেক ঘটে। বলা যায়, অনেকটা বাধ্য হয়েই রাজনীতির এক অচেনা জগতে পা রেখেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী গৃহবধূ খালেদা জিয়া।




তিনি এমন এক সংকটময় সময়ে বিএনপির নেতৃত্বে আসেন, যখন দলটির রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হওয়ার পরপরই যেন শেষ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তৎকালীন বিএনপির নেতাদের পরামর্শ ও অনুরোধে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালে বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। এরপর অল্প সময়ের ব্যবধানেই ১৯৮৩ সালে ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।


প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাহাদত বরণের পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক ফরমান জারি করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। এমনকি তিনি বিএনপিকে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের মুখে ঠেলে দেওয়ার চষ্টা করেন।


দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বেগম খালেদা জিয়া তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। তবে তাঁর এই রাজনৈতিক যাত্রা মোটেও মসৃণ ছিল না। বিএনপির দায়িত্ব নিয়েই বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করেন। 


১৯৮৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক বিশাল জনসভায় বেগম জিয়া প্রথমবারের মতো জনসাধারণের সামনে উপস্থিত হন, যা দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করে। একই বছরের ২৮ অক্টোবর তিনি দেশের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কেন্দ্রস্থল ‘বাংলাদেশ সচিবালয়’ ঘেরাও কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন। যদিও পুলিশ সেই আন্দোলন দমন করে। এই ঘটনার পর তাঁকে কিছুদিনের জন্য গৃহবন্দী করে রাখা হয়।




পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি রাজপথে সাত-দলীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। নিষেধাজ্ঞা ও পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ ধর্মঘট, ‘ঘেরাও’ কর্মসূচি, ‘গণপ্রতিরোধ দিবস’ এবং ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’-এর মতো ধারাবাহিক কর্মসূচিতেও নেতৃত্বেও সারিতে ছিলেন এই মহিয়সী নেত্রী। ফলশ্রুতিতে ১৯৮৫ সালে বেগম জিয়াকে আবারও গৃহবন্দী করা হয়।


বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সাত-দলীয় জোট এবং অন্য জোটগুলোর যুগপৎ আন্দোলনের মুখে এরশাদ ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। প্রাথমিক আলোচনার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় জোট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট এবং বামপন্থী পাঁচ-দলীয় জোট নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং জামায়াতে ইসলামীসহ আরও ছয়টি দল শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেয়। অপরদিকে, বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে।


১৯৮৬ সালের মার্চ মাসের সেই নির্বাচনের আগে এরশাদ সরকার তাঁকে ফের গৃহবন্দী করে। ব্যাপক কারচুপির ওই নির্বাচনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থায় জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে এরশাদ পুনরায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বয়কটের পর বেগম জিয়ার জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়।


১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদের পতনে তাঁর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। দীর্ঘ আন্দোলনে গণতন্ত্র প্রশ্নে লড়াই সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন’ নেত্রীর খ্যাতি লাভ করেন। একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর জোরালো অবস্থান ছিল অতুলনীয়।


দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী :




১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতনের পর আন্দোলনরত প্রধান তিন রাজনৈতিক জোটের সর্বসম্মত প্রস্তাব ও যৌথ রূপরেখার ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে প্রধান করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনের সরকার ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে। এতে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম নারী সরকারপ্রধান হন। তাঁর নেতৃত্বে নতুন সংসদ সংবিধান সংশোধন করে দেশের রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় পুনঃপ্রবর্তন করা হয়।


বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ১৯৯১ সালের সরকারকে মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধারের সময়কাল হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। এ সময় সরকার বাজারমুখী অর্থনৈতিক সংস্কারের পথ বেছে নেয় এবং শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দিয়ে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে। নারী শিক্ষার প্রসার এবং বিদ্যালয়ে মেয়েদের ভর্তি উৎসাহিত করতে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রয়াত এই প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।


ক্ষমতার পালাবদল




১৯৯৬ সালে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় নির্বাচিত হলেও তাদের মেয়াদ ছিল সংক্ষিপ্ত। নির্বাচন পরিচালনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে আওয়ামী লীগ রাজপথে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। পরিপ্রেক্ষিতে একটি নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর অধীনে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা হয়।


১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। বেগম জিয়া সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে তাঁর নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০১ সালের নির্বাচন পর্যন্ত এই পদে বহাল থাকেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তাঁর দল বিজয়ী হলে তিনি আবারও প্রধানমন্ত্রী হন এবং ২০০৬ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করে সরকার পরিচালনা করেন।


সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে, যা ‘১/১১’ নামে পরিচিত। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্গঠন করতে বাধ্য করে। পরবর্তী দুই বছর দেশ পরিচালনা করে সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার।




এই সরকার বেগম জিয়াকে কারাগারে পাঠায়, তাঁর বড় ছেলে এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লন্ডনে দীর্ঘমেয়াদি নির্বাসনে পাঠায়। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে থাইল্যান্ড ও পরবর্তীতে মালয়েশিয়ায় পাঠায়। ২০১৫ সালে আরাফাত রহমান কোকো সেখানেই ইন্তেকাল করেন। ওই সময়ে বেগম জিয়াকে দেশ ছাড়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশই তাঁর একমাত্র ঠিকানা এবং বিদেশে তাঁর কোনো দ্বিতীয় কোনো বাড়ি নেই।


এরপর তিনি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চরম মাত্রার দমন-পীড়ন সহ্য করেন। কিন্তু কারও কাছে মাথা নত করেননি। এর মধ্য দিয়ে তাঁর আপসহীন নেতৃত্বের পরিচয়ই ফুটে উঠেছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের রাজপথে আন্দোলন এবং বিরোধী দলগুলোর সংসদ বয়কটের মুখে তাঁর নেতৃত্বাধীন ষষ্ঠ সংসদ ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে ত্রয়োদশ সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করে।


কিন্তু পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার পর সংসদে তা বাতিল করে। অথচ এর আগে এই ব্যবস্থার দাবিতে আওয়ামী লীগই মরিয়া আন্দোলন করেছিল। বেগম জিয়া এ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেন, এর ফলে বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের চর্চা নষ্ট হয়েছে। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সুপ্রিম কোর্টের রায়কে পক্ষপাতদুষ্ট ও অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেন।


ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৫ বছরের সরকারের সময়ে বেগম জিয়া কঠোর দমন-পীড়ন ও হয়রানির শিকার হন। এর মধ্যে ছিল সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, কারাবন্দিত্ব ও দীর্ঘদিনের বন্দিজীবন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিপীড়ন হিসেবে বর্ণনা করে।


বিশ্লেষকরা জানান, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই হয়রানির মূল উদ্দেশ্য ছিল বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। তবে শেষ পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক জনরোষের মুখে পড়ে আওয়ামী লীগ সরকার। গণঅভ্যুত্থানের জেরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার টানা সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরে আসার পথ সুগম হয়।


দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন দেশনেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর জানাজায় লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন, যা মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের অন্যতম বড় জানাজায় পরিণত হয়। শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে চিরবিদায় জানায় দেশের অগণিত জনগণ।


২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় বিএনপি। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে ধারণ করে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে বর্তমানে দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁরই সুযোগ্য পুত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।



  • প্রকাশ : মঙ্গলবার ২৮ জুলাই, ২০২৬, সময় : ৯:৩৬ এএম
  • আপডেট : রবিবার ০৯ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৫:৫৪ পিএম

এ সম্পর্কিত আরও খবর


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : মঙ্গলবার ২৮ জুলাই, ২০২৬, সময় : ৯:৩৬ এএম

পরিবেশবান্ধব শিল্প উপকরণের দিকে ঝুঁকছে বিশ্ব। কৃষিজ বর্জ্যকে মূল্যবান শিল্পপণ্যে রূপান্তরের গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল। এর খোসা, আঁশ ও বোঁটা থেকে পরিবেশবান্ধব ‘বায়ো-লেদার’ বা ভেগান চামড়া তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে দেশবিদেশে গবেষণা চলছে। 


সংশ্লিষ্টদের মতে, এ প্রযুক্তি সফলভাবে বাণিজ্যিক পর্যায়ে প্রয়োগ করা গেলে দেশের চামড়া ও ফ্যাশন শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। বিশ্বজুড়ে প্রাণীর চামড়ার বিকল্প হিসেবে ভেগান লেদারের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। জুতা, ব্যাগ, পোশাক ও আসবাবশিল্পে পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো গুরুত্ব দিচ্ছে। এ বাস্তবতায় কাঁঠালের মতো সহজলভ্য কৃষিপণ্য বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় কাঁচামাল হতে পারে। সম্প্রতি আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির মেকানিক্যাল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একদল গবেষক কাঁঠালের খোসা থেকে সেলুলোজ আহরণ করে বায়োডিগ্রেডেবল কম্পোজিট ফিল্ম তৈরিতে সফল হয়েছে। গবেষণার নেতৃত্ব দেন শাহ মো. আশিকুজ্জামান নিপু। তার সঙ্গে ছিলেন আকিব রহমান ও মো. শামসুল আলম। 


অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের গবেষক ও প্রযুক্তিবিদ ড. আবু আলী ইবনে সিনা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিশ্বে এখন কৃত্রিম প্লাস্টিকভিত্তিক বিকল্পের পরিবর্তে উদ্ভিজ উৎস থেকে পরিবেশবান্ধব বায়ো-লেদার তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। বাংলাদেশের কাঁঠালের খোসা ও আঁশ এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় কাঁচামাল হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে ফলের বর্জ্য থেকে ভেগান লেদার উৎপাদন শুরু হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের ফ্রুটলেদার রটারডাম আম ও আপেলের বর্জ্য ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে বায়ো-লেদার তৈরি করছে। ভারতের কেরালা ও কর্ণাটকের গবেষকরাও কাঁঠালের খোসার সেলুলোজ নিয়ে কাজ করছেন। যদিও কাঁঠালের খোসা থেকে পরিবেশবান্ধব চামড়ার উৎপাদন এখনো পরীক্ষামূলক ও সীমিত পর্যায়েই রয়েছে। 


গবেষক শাহ মো. আশিকুজ্জামান নিপু তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেন, ব্লিচিং ও ক্ষারীয় প্রক্রিয়ায় কাঁঠালের খোসা থেকে প্রায় ২৮ শতাংশ সেলুলোজ আহরণ করা সম্ভব হয়েছে। এই সেলুলোজ দিয়ে জৈবভাবে অবক্ষয়যোগ্য (বায়োডিগ্রেডেবল) প্যাকেজিং ফিল্ম তৈরি করা যায়, যা ভবিষ্যতে প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের টেকসই বিকল্প হতে পারে। 


প্রযুক্তিবিদ অধ্যাপক ড. খন্দকার সিদ্দিক-ই-রাব্বানী বলেন, কাঁঠালের বর্জ্যকে মূল্যবান শিল্পপণ্যে রূপান্তর করা গেলে তা শিল্প, বাণিজ্য ও রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে। এজন্য গবেষণায় বিনিয়োগ, শিল্পোদ্যোক্তা এবং সরকারি নীতিগত সহায়তা জরুরি। 


বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বিত গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও শিল্পায়নের মাধ্যমে কাঁঠালের খোসা থেকে তৈরি ভেগান লেদার ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য নতুন রপ্তানি পণ্য হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি গ্রামীণ পর্যায়ে গড়ে উঠতে পারে নতুন উদ্যোক্তা, সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান এবং কৃষিজ বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও হবে আরও কার্যকর।


সংগৃহীত ছবি

  • প্রকাশ : মঙ্গলবার ১৪ জুলাই, ২০২৬, সময় : ১:১৯ এএম

বন্যার সময় ও বন্যা-পরবর্তী সময়ে পানিবাহিত ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। নিচে বন্যার ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি ও তা প্রতিরোধের উপায়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


বন্যার সময় যেসব রোগ হতে পারে


ডায়রিয়া: বন্যার সময় বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং পচাবাসি খাবার খাওয়ার ফলে ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। এটি শিশু ও বয়স্কদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। দ্রুত খাবার স্যালাইন ও প্রয়োজনে শিরাপথে স্যালাইন দিতে না পারলে রোগী তীব্র পানিশূন্যতায় মারা যেতে পারে।


কলেরা: দূষিত পানি ও পচাবাসি খাবারের মাধ্যমে কলেরার জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে। এতে তীব্র ডায়রিয়া ও বমি হয়। দ্রুত চিকিৎসা না নিলে কলেরার কারণে জীবন সংকটাপন্ন হতে পারে।


জন্ডিস (হেপাটাইটিস এ ও ই): দূষিত পানির মাধ্যমে এ ভাইরাসগুলো শরীরে প্রবেশ করে যকৃৎ বা লিভারকে আক্রান্ত করে। যদিও এগুলো সবসময় প্রাণঘাতী নয়, তবে শরীরে ব্যাপক দুর্বলতা তৈরি করে।


টাইফয়েড: দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে এই জীবাণু ছড়ায়। টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হলে দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, মাথাব্যথা এবং পেটের সমস্যা দেখা দেয়।


জিয়ারডিয়াসিস: বন্যার সময় পানিবাহিত এই রোগের কারণে পেটের পীড়া এবং আমাশয়ের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।


ত্বকের সংক্রমণ ও চর্মরোগ: বন্যার পানিতে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করলে পায়ে ফোসকা পড়া, খোসপাঁচড়া এবং বিভিন্ন ধরনের ফাংগাল ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।


শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা: ভেজা ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় সর্দি, কাশি এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কিওলাইটিসের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।


মশাবাহিত রোগ: পানি জমে থাকা স্থানে মশার বংশবৃদ্ধি ঘটে, যা ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটায়।


মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা: ঘরবাড়ি হারানো, খাদ্য সংকট ও অনিশ্চয়তার কারণে মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হতে পারে।


স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রতিরোধে করণীয়


বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা


বন্যার সময় বিশুদ্ধ পানির সংকট সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই পানি ফুটিয়ে ঠান্ডা করে পান করা উত্তম। খাওয়ার পানি বিশুদ্ধ করতে ক্লোরিন ট্যাবলেট ব্যবহার করা যেতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, তিন পাল্লার ভাঁজ করা পরিষ্কার সুতির কাপড়ে পানি ছেঁকে পান করলে কলেরায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়। নলকূপের মাথায় পলিথিন দিয়ে ভালোমতো বেঁধে রাখতে হবে যেন বন্যার দূষিত পানি পাইপের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।


স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা


খাওয়ার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে। খাবার সবসময় ঢেকে রাখতে হবে এবং পচাবাসি খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। বন্যার পানির সংস্পর্শ যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। যদি একান্তই পানিতে নামতে হয়, তবে পায়ে পলিথিন জড়িয়ে বা পানিরোধক জুতা ব্যবহার করতে হবে।


মশা থেকে সতর্ক থাকা


দিনে ও রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। ফুলের টব, বালতি, টায়ার বা অন্য কোনো পাত্রে পানি জমতে দেওয়া যাবে না।


খাবার ও পুষ্টি


ত্রাণে শুকনো ও পুষ্টিকর খাবার যেমন–চিড়া, মুড়ি, ছাতু, ডাল ভাজা, গুড়, গুঁড়া দুধ ও আমসত্ত্ব অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পানিশূন্যতা রোধে নিয়মিত পানি  পান করতে হবে।


প্রাথমিক চিকিৎসা কিট


বন্যা চলাকালীন একটি প্রাথমিক চিকিৎসা কিট প্রস্তুত রাখা জরুরি। এতে ব্যান্ডেজ, গজ, অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম, প্যারাসিটামল ও ওআরএস থাকা প্রয়োজন।


সতর্কতা: 


যে কোনো অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে বিলম্ব না করে স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা মা, শিশু এবং নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা উঁচু নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করতে হবে।


বিষয় : বন্যা


  • প্রকাশ : সোমবার ১৩ জুলাই, ২০২৬, সময় : ৫:৩৬ এএম

‘ঊনত্রিশ বছর বয়সে এসে মনে হচ্ছে, ঢাকার এই তুমুল ব্যস্ততায় মনের মতো একটা মানুষ খুঁজে পাওয়া লটারির টিকিট পাওয়ার মতো। অনেক ডেটিং অ্যাপে আলাপ হয় ঠিকই; কিন্তু দিন শেষে সেখানে মেকি আবহের শঙ্কা থেকেই যায়। ওদিকে আত্মীয়স্বজন এখন আর আগের মতো সম্বন্ধ খোঁজেন না। শূন্যতায় অদ্ভুত দিন কাটছে’– এসব  কথা বলছিলেন ঢাকার বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত আশরাফুল ইসলাম। 


জীবনে একা থাকার আক্ষেপ বা একাকিত্ব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আধুনিক নাগরিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ঢাকার শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত তরুণ-তরুণীর বড় অংশই এখন জীবনসঙ্গী খোঁজার ক্ষেত্রে আস্থার সংকটে ভুগছেন। প্রথাগত ডেটিং অ্যাপের ওপর তীব্র অনীহা।


অন্যদিকে পুরোনো পারিবারিক কাঠামোর অনুপস্থিতি– এ দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের চিরচেনা বিয়ে ও ডেটিং কালচার। প্রযুক্তিকেন্দ্রিক ম্যাচমেকিং কনসালট্যান্সি সাইয়োনিতে নিবন্ধিত তরুণ-তরুণীর মধ্যে পরিচালিত জরিপ ও প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত ডেটা বিশ্লেষণে পাওয়া গেছে চমকে দেওয়া কিছু তথ্য।


আগের ধারণা ছিল, আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পশ্চিমা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ডেটিং অ্যাপের বাড়বাড়ন্ত হবে। কিন্তু জরিপ বলছে আরেক কথা। পরিসংখ্যান বলছে, ৫৭ শতাংশ তরুণ-তরুণী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করেছেন। তবে বর্তমানে মাত্র ১৫ শতাংশ সেখানে সক্রিয় আছেন। 


জানা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া ৮৮ শতাংশ তরুণ-তরুণীই এখন ডেটিং কালচার নিয়ে তীব্র নেতিবাচক ও হতাশাজনক ধারণা পোষণ করেন।


অনেকের কাছে ডেটিং অ্যাপে মোহভঙ্গ, আরেকদিকে সম্পর্কের প্রতারণা– এই দুইয়ের মাঝখানের শূন্যস্থান পূরণ করতে এখন কাজ করছে দায়িত্বশীল ও প্রযুক্তিকেন্দ্রিক ম্যাচমেকিং প্ল্যাটফর্ম। যেখানে পারিবারিক গোপনীয়তা সুরক্ষা পাবে, প্রোফাইল যাচাই করা হবে ও পুরো প্রক্রিয়াটি থাকবে পেশাদার তত্ত্বাবধানে। ধারণার এমন ভিত্তিতেই তৈরি সাইয়োনি।


এই প্ল্যাটফর্মের উদ্যোক্তা তানভীর রহমান সমকালকে বলেন, আমি নিজে ঘটকের কাছে প্রতারিত হয়েছি। কিন্তু বেশি কষ্ট পেয়েছি, যখন দেখেছি এটি শুধু আমার গল্প নয়; সমাজে হাজারো শিক্ষিত পরিবারের অভিজ্ঞতা এখন অনেকটা এ রকমই। এই ধারণা থেকেই সাইয়োনি তৈরির কাজ হাতে নেই।


আত্মকেন্দ্রিক নাগরিক জীবনে যেখানে আস্থার বড্ড অভাব, সেখানে এমন প্ল্যাটফর্ম আধুনিক প্রযুক্তির মিশেলে আশির দশকের সেই হারিয়ে যাওয়া পারিবারিক আন্তরিকতা ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে। বিয়ে কোনো সাময়িক চুক্তি নয়; এটি দুটি পরিবারের দীর্ঘ পথচলার সেতুবন্ধ। তাই জীবনসঙ্গী খোঁজার এই যাত্রায় আজকের তরুণ প্রজন্ম এমন মাধ্যম খুঁজছে, যেখানে আধুনিক মননশীলতার সঙ্গে মিশে থাকবে চিরন্তন পারিবারিক মূল্যবোধ। 

বিষয় : জীবন


পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

  • প্রকাশ : সোমবার ০৬ জুলাই, ২০২৬, সময় : ৯:৫২ এএম

২০২৫ এবং ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম থেকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের, বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলমানদের, বাংলাদেশে পুশ-ইন বা জোরপূর্বক পাঠানোর হচ্ছে। আসাম সরকার মূলত অভিবাসী (আসাম থেকে বহিস্কার) নির্দেশ-(১৯৫০ আইন from Assam Act, 1950) নামক একটি ঔপনিবেশিক আমলের আইন ব্যবহার করে বাংলাভাষী ও কথিত অবৈধ অভিবাসীদের বাংলাদেশে পুশ-ইন করছে।




অভিবাসী বহিস্কার আইন-১৯৫০ করার ১০ বছর আগে ১৯৬০ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পিতা শিশির অধিকারী (পূর্বনাম মাখনলাল ভট্টাচার্য) ও মা গায়ত্রী দেবী (পূর্বনাম গায়ত্রী ভট্টাচার্য) নাম পরিবর্তন করে আদি বাড়ি বাংলাদেশের বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার বাটাজোর গ্রাম ছেড়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। শুভেন্দু অধিকারীও ১৯৭০ সালে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁকুলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন অভিবাসী বহিস্কার আইন-১৯৫০ করার ২০ বছর পর। তাঁর বাবা-মা এখনও জীবিত আছেন।


প্রশ্ন উঠেছে,পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পরিবারও ১৯৫০ সালের অভিবাসী বহিস্কার আইন অনুযায়ী 'অবৈধ অভিবাসী'। কারণ তাঁর বাবা-মা বাংলাদেশের আদি বাড়ি বরিশাল ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে গেছেন ১৯৬০ সালের ঔপনিবেশিক আমলের অভিবাসী বহিস্কার আইন, ১৯৫০, এর ১০ বছর পর। শুভেন্দু অধিকারীও জন্মগ্রহন করেছেন ১৯৫০ সালের অভিবাসী বহিস্কার আইন করার ২০ বছর পর। তাহলে শুভেন্দু অধিকারীর পরিবার 'বাংলাভাসী হিন্দু' বলে অবৈধ অভিবাসী হবে না কেন? বা তাদেরকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করা যাবে না কেন? ভারত-বাংলাদেশ প্রটোকল ও মানবাধিকার সনদের অনুস্বাক্ষরকারী দেশ হয়েও শুধু বাংলাভাষী মুসলমানদের ভারত থেকে তারিয়ে দেওয়ার নামই হচ্ছে 'পুশ ইন'। 


অপরদিকে, শুভেন্দু অধিকারী নিজেই বলেছেন, "আমার মা বরিশাল থেকে এসেছিলেন, হিন্দু নিপীড়নের যন্ত্রণা আমি বুঝি।" অপরদিকে, শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন মমতা ব্যানার্জীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। সেই শুভেন্দু অধিকারীই মমতা ব্যানার্জীকে পরাজিত করে বিজেপি থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর হয়েছেন। তিনি বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভা ও রাজনৈতিক সমাবেশে 'আসাম মডেল' অনুসরণ করে বাংলাভাষী মুসলিমদের চিহ্নিত করার এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করার কড়া বার্তা দিয়েছিলেন। গত ১২ মে আসামের গুয়াহাটিতে তিনি বলেছেন, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে অনুপ্রবেশ রোধে যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হয়েছিল, তা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে পশ্চিমবঙ্গেও বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি অভিযোগ করেন যে, আগের সরকার অনুপ্রবেশের বিষয়ে উদাসীন ছিল এবং বিএসএফকে বর্ডার অবকাঠামো নির্মাণের জন্য জমি পর্যন্ত দেয়নি।


পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর, প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে শুভেন্দু অধিকারী ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে (বিএসএফ) জমি বরাদ্দের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করছে যে, ভারতের প্রাদেশিক সরকার 'অবৈধভাবে বসবাসকারী' ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাচ্ছে। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই বন্দুকের মুখে বা জোর করে অনেককে সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।


বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অভিযানের শিকার হয়ে অনেকেই—যাঁরা দাবি করছেন তাঁরা ভারতেরই নাগরিক—বাংলাদেশে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, মে ২০২৫ সালে ভারত থেকে ১২০০ জনেরও বেশি মানুষকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।


বাংলাদেশ সরকার সীমান্তে এই ধরনের পুশ-ইন প্রচেষ্টা ঠেকাতে নজরদারি বাড়িয়েছে এবং প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। ভারতের আসামসহ বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষী মুসলিমদের 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী' হিসেবে চিহ্নিত করার একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা বা কৌশল হিসেবে এই পুশ-ইন চলছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তাঁরা মনে করেন, ভারত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিবেশি দেশ। অনেক ক্ষেত্রেই ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের উপর নির্ভরশীল। তাই দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে বাংলাদেশ সরকার উভয় পক্ষই পক্ষপাতহীন আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো সমস্যার সমাধান করাই কল্যাণকর।


লেখক: এম এ আজিজ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক


হলি আর্টিজানে হামলা

  • প্রকাশ : বুধবার ০১ জুলাই, ২০২৬, সময় : ৩:১৬ পিএম

২০১৬ সালের ১ জুলাই বিশ্ব তাকিয়ে ছিল বাংলাদেশের দিকে। কারণ, এ দিনই দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নারকীয় জঙ্গি হামলার শিকার হয়েছিল বাংলাদেশ। এ হামলায় ১৭ জন বিদেশিসহ নিহত হন মোট ২২ জন। নিহতদের মধ্যে দুজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। জঙ্গিদের গুলি ও বোমায় আহত হন পুলিশের অনেকে। আজ সেই হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো।


ওইদিন রাত ৮টা ৪৫-৫০ মিনিটের দিকে ওয়ারলেস সেটে পুলিশ জানতে পারে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে গোলাগুলি হচ্ছে। খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ সেখানে হাজির হয়। এভাবে কয়েক বার প্রস্তুতি নেওয়া সত্ত্বেও স্পর্শকাতর বিবেচনায় রাতে হলি আর্টিজানে অভিযান চালানো থেকে বিরত থাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো সদস্যদের পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্টে’ অবসান হয় জিম্মিদশার, নিহত হয় হামলাকারী পাঁচ জঙ্গি।


ভয়াবহ ওই জঙ্গি হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে বেরিয়ে আসতে থাকে জঙ্গিদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের নীলনকশা। বিভিন্ন সময় এ হামলার সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের যোগসাজসের বিষয়টি আলোচনায় আসে।


তবে, তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ জানিয়েছে—হামলায় জড়িত জঙ্গিরা সবাই ‘হোম গ্রোন’, অর্থাৎ দেশীয়। জেএমবির কিছু সদস্য নতুনভাবে উজ্জীবিত হয়ে এ নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়, যারা ‘নব্য জেএমবি’ বলে আখ্যায়িত।


নব্য জেএমবির সদস্যদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকলেও হলি আর্টিজানের ঘটনার পর ধারাবাহিক অভিযানে জঙ্গিদের রুখে দিতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব অভিযানে অনেক নব্য জেএমবির সদস্য নিহত হয় এবং গ্রেপ্তার করা হয় আরও অনেককে।


তবে, হলি আর্টিজানে নৃশংস জঙ্গি হামলার ছয় বছরেও শেষ হয়নি মামলার বিচার প্রক্রিয়া। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর এ মামলায় সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং একজনকে বেকসুর খালাসের রায় দেন আদালত।


রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—হামলার মূল সমন্বয়ক তামিম চৌধুরীর সহযোগী আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আবু জাররা, অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহকারী নব্য জেএমবি নেতা হাদিসুর রহমান সাগর, জঙ্গি রাকিবুল হাসান রিগ্যান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব ওরফে রাজীব গান্ধী, হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী আব্দুস সবুর খান (হাসান) ওরফে সোহেল মাহফুজ, শরিফুল ইসলাম ও মামুনুর রশিদ।


আসামিদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করেন বিচারিক আদালত। আর, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় এ মামলার অপর আসামি মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে খালাস দেওয়া হয়।


র‍্যাব সূত্রে জানা যায়, এ ছাড়া র‍্যাবের অভিযানে বন্ধ হয় হলি আর্টিজানের বীভৎস ছবি তাৎক্ষণিক প্রচার করা আত্-তামকীন ওয়েবসাইট এবং গ্রেপ্তার হয়েছিল অ্যাডমিনসহ বেশ কয়েক জন সদস্য। হলি আর্টিজান ঘটনার পরে অভিযানে র‍্যাব জঙ্গি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা, অর্থদাতা ও বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের গ্রেপ্তার করে জঙ্গি সংগঠনগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছে। এখন সে অর্থে জঙ্গিদের কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায় না।


সেদিন যা ঘটেছিল


১ জুলাই শুক্রবার। সন্ধ্যার পর হঠাৎ করে খবর আসে গুলশানে ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে’ পুলিশের গোলাগুলি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানা গেল—একটি রেস্তোরাঁয় সশস্ত্র হামলাকারী ঢুকে বেশ কয়েকজনকে জিম্মিও করেছে। কিন্তু, ঘটনাটি আসলে কী? গুজব, নাকি সত্যি—সেটি নিশ্চিত হতেও ঘণ্টাখানেক সময় চলে গেল। পরে জানা গেল হামলাকারীরা ওই রেস্তোরাঁয় থাকা বিদেশি নাগরিকসহ বেশ কয়েকজনকে জিম্মি করেছে। একপর্যায়ে জানা যায়, গুলশান ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গিরা হামলা চালিয়েছে।


তখন ওই জোনের দায়িত্বে থাকা ডিএমপির ডিসি আহাদ তখন গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগে ইউনাইটেড হাসপাতালের পাশে থাকা গুলশান থানার একটি মোবাইল টিম সেখানে পৌঁছায়। একজন উপপরিদর্শকের (এসআই) নেতৃত্বে মোবাইল টিমটি হলি আর্টিজানের সামনে যাওয়া মাত্রই তাদের লক্ষ্য করে সন্ত্রাসীরা গুলি ছুড়তে থাকে। সন্ত্রাসীদের গুলির জবাবে মোবাইল টিমের সদস্যরাও গুলি ছোড়ে। এরই মধ্যে ওই মোবাইল টিমের দলনেতা হলি আর্টিসানের প্রধান ফটকটি বাইরে থেকে বন্ধ করে দেন, যাতে সন্ত্রাসীরা বের হয়ে যেতে না পারে। গুলি বিনিময়ের একপর্যায়ে ওই এসআই গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।


আবদুল আহাদ আরও বলেন, ঘটনাস্থলে পৌঁছে আমরা এবং আশপাশ থেকে আসা মোবাইল টিমগুলো হলি আর্টিসানের দুটি গেটে অবস্থান নিই। এর মধ্যে ডিসি স্যার একটি গেটে, আরেকটিতে আমি। এ সময় প্রচুর গোলাগুলির আওয়াজ আসছিল হলি আর্টিসানের ভেতর থেকে। গোলাগুলির শব্দ শুনে আমাদের মনে নানা ধরনের সন্দেহ জাগছিল। তখনও আমরা নিশ্চিত ছিলাম না—এটি জঙ্গি হামলা কি না। আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আমাদের একাধিকবার গুলি বিনিময় হয়। তারা বাইরে বের হতে চেয়েছিল, কিন্তু, আমাদের প্রতিরোধের কারণে তারা বের হতে পারেনি।


এভাবে রাত ১০টার দিকে পুলিশ, র‍্যাব এবং আধা সামরিক বাহিনী বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশের কয়েকশো সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে অবস্থান নেয়। গণমাধ্যমকর্মীরাও ৭৯ নম্বর রোডের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান নেন। রাত সোয়া ১১টার দিকে হাসপাতালে মারা যান বনানী থানার ওসি মোহাম্মদ সালাউদ্দীন। এর কিছুক্ষণ পরই ডিবির সহকারী কমিশনার (এসি) মো. রবিউল করিম নিহত হন।


এর মধ্যে পুলিশের আইজিপি ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে তৎকালীন র‍্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, হলি আর্টিসানের ভেতরে অন্তত ২০ জন বিদেশিসহ কয়েকজন বাংলাদেশিও আটকা পড়েছেন। ভেতরে যাঁরা আছেন, তাঁদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য তাঁরা বিপথগামীদের সঙ্গে কথা বলতে চান। রাত ৪টা পর্যন্ত অস্ত্রধারীদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যেরা।


আইএসের দায় স্বীকার


রাতেই ইসলামিক স্টেট জঙ্গি গোষ্ঠী তাদের বার্তা সংস্থা বলে পরিচিত ‘আমাক’ এ গুলশান হামলার দায় স্বীকার করে ২০ জন নিহত হওয়ার কথা জানায়। আইএস-এর পক্ষ থেকে হামলাকারীদের মধ্যে পাঁচজনকে তাদের ‘সৈনিক’ বলে দাবি করে, হামলার দায় নেয় তারা।


২ জুলাই অভিযানের ঘটনাক্রম


সকাল ৭টা ৩০ মিনিট : রাতভর গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট সংলগ্ন এলাকা ঘিরে রাখার পর যৌথ সেনা, নৌ, পুলিশ, র‍্যাব এবং বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ কমান্ডো দল গুলশানে অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়।


৭টা ৪৫ মিনিট : কমান্ডো বাহিনী অভিযান শুরু করে। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত দলের সদস্যেরা রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়।


সকাল সোয়া ৮টায় রেস্টুরেন্ট থেকে প্রথম দফায় নারী, শিশুসহ ছয় জনকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। পাশের একটি ভবন থেকে একজন বিদেশি নাগরিক তাঁর মোবাইল ফোনে সেটি ধারণ করেন। সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয় অভিযানকারীরা। গোয়েন্দা দল ভবনের ভেতর বিস্ফোরকের জন্য তল্লাশি শুরু করে। কিছুক্ষণ পরই আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করে গোয়েন্দারা।


৯টা ১৫ মিনিটে অভিযান শেষ হয়। কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে প্রায় ১২ ঘণ্টার রক্তাক্ত জিম্মি সংকটের অবসান হয়।


থান্ডারবোল্ট নামের সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা যে অভিযান চালায়, সেখানে জঙ্গি হামলায় সরাসরি অংশ নেয়া পাঁচ তরুণের সবাই মারা পড়েন। তাঁরা হলেন—মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ওরফে মামুন, নিবরাজ ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল। সকাল ১০টায় চার জন বিদেশিসহ ১৩ জন জীবিত উদ্ধারের খবর জানানো হয়। রেস্টুরেন্টের ভেতরে অজ্ঞাত পাঁচজনের মরদেহ পাওয়ার কথা পুলিশ জানায়।


অভিযানে জঙ্গিদের ছয় জন নিহত এবং এক জন ধরা পড়ে। জিম্মি সংকটের ঘটনায় ১ জুলাই সন্ধ্যা থেকে দিবাগত সারা রাত অর্থাৎ ২ জুলাই সারা বিশ্বের গণমাধ্যমের নজর ছিল ঢাকার অভিজাত গুলশান এলাকায় অবস্থিত হোলি আর্টিজান বেকারির দিকে।


সংগৃহীত ছবি

  • প্রকাশ : মঙ্গলবার ২৩ জুন, ২০২৬, সময় : ৩:২৫ এএম

বিশ্বকাপ ফুটবল মানে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের উন্মাদনা। গ্যালারি থেকে শুরু করে ড্রয়িংরুমের টেলিভিশন পর্দা–সবখানেই তখন টানটান উত্তেজনা। প্রিয় দলের প্রতিটি আক্রমণ, গোল আমাদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু খেলা দেখার এই অতিউত্তেজনা বা প্রিয় দলের হারে তৈরি হওয়া তীব্র মানসিক চাপ আমাদের শরীরের জন্য গুরুতর–এমনকি জীবনঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।


চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে যখন কোনো হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ চলে, তখন স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেড়ে যায়। এর মূল কারণ হলো, অতিরিক্ত উত্তেজনা। আমরা যখন ব্যাপক উৎকণ্ঠা বা উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাই, তখন শরীরে ‘অ্যাড্রেনালিন’ ও ‘কর্টিসল’ নামক স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ দ্রুত বেড়ে যায়।


এই হরমোনগুলোর আধিক্যের কারণে রক্তচাপ (Blood Pressure) হঠাৎ অনেক বেড়ে যায়, হৃদস্পন্দন দ্রুত হয় এবং রক্তনালি সংকুচিত হয়ে পড়ে। এর ফলে হার্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। যাদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন বা হৃদরোগের মতো সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই আকস্মিক চাপ হার্ট অ্যাটাক বা ব্রেন স্ট্রোকের কারণ হতে পারে। এমনকি অনেক সময় সুস্থ মানুষেরও ‘স্ট্রেস-ইনডিউসড কার্ডিওমায়োপ্যাথি’ বা বুক ধড়ফড়ানির সমস্যা হতে পারে।


সতর্কতায় করণীয়:


খেলাধুলা বিনোদনের অংশ। এটিকে জীবনের চেয়ে বড় করে দেখা যাবে না। খেলা দেখার সময় শরীর ও মন সুস্থ রাখতে কিছু বিষয়ে সতর্ক হওয়া জরুরি:


মানসিক প্রস্তুতি: খেলা শুরুর আগেই মনকে বোঝান, এটি কেবলই একটি খেলা এবং এখানে যেকোনো একদল হারবে ও অন্যদল জিতবে। হার-জিতকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার মানসিকতা রাখুন।


বিরতি নিন: ম্যাচ যদি অতিরিক্ত উত্তেজনাপূর্ণ বা স্নায়ুচাপের হয়, তবে মাঝে মাঝে টিভি স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে নিন। প্রয়োজনে কিছুক্ষণ হেঁটে আসুন বা একটু পানি পান করুন।


ওষুধ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা: যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা হার্টের সমস্যা আছে, তারা খেলার উত্তেজনায় কোনোভাবেই নিয়মিত ওষুধ খাওয়া মিস করবেন না। বুক ধড়ফড় বা মাথা ঘোরার মতো লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে খেলা দেখা বন্ধ করে বিশ্রাম নিন।


পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম: গভীর রাত জেগে খেলা দেখার কারণে শরীরে ক্লান্তি বাড়ে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই খেলার পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুমের দিকে নজর দিন।


খেলা উপভোগ করার জন্য, জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলার জন্য নয়। প্রিয় দলকে সমর্থন করুন সুস্থ থেকে, সুন্দরভাবে। 


[লেখক: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক]