সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া।ফাইল ছবি

  • প্রকাশ : শুক্রবার ১৪ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ১২:০০ এএম

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক অবিস্মরণীয় নাম। বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের অপ্রতিরোধ্য কণ্ঠস্বর। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতে বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছে কয়েক দশকের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে। জটিল আর অনিশ্চিত সেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলের হাল ধরেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া।


তাঁর নেতৃত্বে ছিল প্রজ্ঞা আর অবিচল দৃঢ়তার মিশেল; তিনি কখনো কারোও কাছে মাথা নত করেননি, কোনো বাধায় পিছু হটেননি। এই আপসহীন মনোভাবই তাঁকে কোটি কোটি মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত করেছে। দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে রাজপথের আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা—সবক্ষেত্রেই তিনি রেখেছেন দূরদর্শী নেতৃত্বের স্বাক্ষর। শত প্রতিকূলতা ও দমন-পীড়নের মুখেও নিজের অবস্থানে অটল থেকে আপসহীন পথচলাই বেগম জিয়াকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক অনিবার্য অধ্যায়ে পরিণত করেছে।


১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশ ও দলের চরম সংকটময় মুহূর্তে ঘর থেকে রাজনীতির ময়দানে নামতে হয়েছিল বেগম খালেদা জিয়াকে। দীর্ঘ নয় বছরের সামরিক স্বৈরশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কিংবা বারবার কারারুদ্ধ হয়েও তিনি কারও সঙ্গে আপস করেননি। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবির্ভূত হন। পাশপাশি বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম নারী সরকারপ্রধান হওয়ারও গৌবর অর্জন করেছিলেন। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে সংসদীয় শাসনব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন-বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রতিটি বাঁকে তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অদম্য।




১৫ আগস্ট  প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন। এবারের জন্মদিনে শোক, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়ায় তাকে স্মরণ করবেন বিএনপির অগণিত নেতা-কর্মীসহ দেশবাসী।


একগুচ্ছ নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের আবির্ভাব ঘটে। ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতিতে জিয়াউর রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে সেই যাত্রার শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের বীর সেনানী ও সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যেমন সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি স্বাধীনতার পর দেশের এক চরম অস্থিতিশীল মুহূর্তে জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন এই চৌকস ও মেধাবী সেনা কর্মকর্তা।


১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ফের দেশের হাল ধরেন। আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও দূরদর্শী নেতৃত্বই পরবর্তীতে তাঁকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির আসনে আসীন করে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে একটি জাতি গঠনে সচেষ্ট হন তিনি। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন।


১৯৮১ সালের ৩০ মে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে শাহাদত বরণ করেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। এই ঘটনা দেশকে এক গভীর নেতৃত্ব সংকটের মুখে ফেলে দেয়। সেই শূন্যতার মাঝেই রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার অভিষেক ঘটে। বলা যায়, অনেকটা বাধ্য হয়েই রাজনীতির এক অচেনা জগতে পা রেখেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী গৃহবধূ খালেদা জিয়া।




তিনি এমন এক সংকটময় সময়ে বিএনপির নেতৃত্বে আসেন, যখন দলটির রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হওয়ার পরপরই যেন শেষ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তৎকালীন বিএনপির নেতাদের পরামর্শ ও অনুরোধে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালে বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। এরপর অল্প সময়ের ব্যবধানেই ১৯৮৩ সালে ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।


প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাহাদত বরণের পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক ফরমান জারি করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। এমনকি তিনি বিএনপিকে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের মুখে ঠেলে দেওয়ার চষ্টা করেন।


দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বেগম খালেদা জিয়া তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। তবে তাঁর এই রাজনৈতিক যাত্রা মোটেও মসৃণ ছিল না। বিএনপির দায়িত্ব নিয়েই বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করেন। 


১৯৮৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক বিশাল জনসভায় বেগম জিয়া প্রথমবারের মতো জনসাধারণের সামনে উপস্থিত হন, যা দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করে। একই বছরের ২৮ অক্টোবর তিনি দেশের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কেন্দ্রস্থল ‘বাংলাদেশ সচিবালয়’ ঘেরাও কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন। যদিও পুলিশ সেই আন্দোলন দমন করে। এই ঘটনার পর তাঁকে কিছুদিনের জন্য গৃহবন্দী করে রাখা হয়।




পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি রাজপথে সাত-দলীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। নিষেধাজ্ঞা ও পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ ধর্মঘট, ‘ঘেরাও’ কর্মসূচি, ‘গণপ্রতিরোধ দিবস’ এবং ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’-এর মতো ধারাবাহিক কর্মসূচিতেও নেতৃত্বেও সারিতে ছিলেন এই মহিয়সী নেত্রী। ফলশ্রুতিতে ১৯৮৫ সালে বেগম জিয়াকে আবারও গৃহবন্দী করা হয়।


বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সাত-দলীয় জোট এবং অন্য জোটগুলোর যুগপৎ আন্দোলনের মুখে এরশাদ ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। প্রাথমিক আলোচনার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় জোট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট এবং বামপন্থী পাঁচ-দলীয় জোট নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং জামায়াতে ইসলামীসহ আরও ছয়টি দল শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেয়। অপরদিকে, বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে।


১৯৮৬ সালের মার্চ মাসের সেই নির্বাচনের আগে এরশাদ সরকার তাঁকে ফের গৃহবন্দী করে। ব্যাপক কারচুপির ওই নির্বাচনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থায় জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে এরশাদ পুনরায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বয়কটের পর বেগম জিয়ার জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়।


১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদের পতনে তাঁর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। দীর্ঘ আন্দোলনে গণতন্ত্র প্রশ্নে লড়াই সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন’ নেত্রীর খ্যাতি লাভ করেন। একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর জোরালো অবস্থান ছিল অতুলনীয়।


দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী :




১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতনের পর আন্দোলনরত প্রধান তিন রাজনৈতিক জোটের সর্বসম্মত প্রস্তাব ও যৌথ রূপরেখার ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে প্রধান করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনের সরকার ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে। এতে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম নারী সরকারপ্রধান হন। তাঁর নেতৃত্বে নতুন সংসদ সংবিধান সংশোধন করে দেশের রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় পুনঃপ্রবর্তন করা হয়।


বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ১৯৯১ সালের সরকারকে মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধারের সময়কাল হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। এ সময় সরকার বাজারমুখী অর্থনৈতিক সংস্কারের পথ বেছে নেয় এবং শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দিয়ে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে। নারী শিক্ষার প্রসার এবং বিদ্যালয়ে মেয়েদের ভর্তি উৎসাহিত করতে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রয়াত এই প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।


ক্ষমতার পালাবদল




১৯৯৬ সালে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় নির্বাচিত হলেও তাদের মেয়াদ ছিল সংক্ষিপ্ত। নির্বাচন পরিচালনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে আওয়ামী লীগ রাজপথে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। পরিপ্রেক্ষিতে একটি নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর অধীনে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা হয়।


১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। বেগম জিয়া সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে তাঁর নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০১ সালের নির্বাচন পর্যন্ত এই পদে বহাল থাকেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তাঁর দল বিজয়ী হলে তিনি আবারও প্রধানমন্ত্রী হন এবং ২০০৬ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করে সরকার পরিচালনা করেন।


সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে, যা ‘১/১১’ নামে পরিচিত। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্গঠন করতে বাধ্য করে। পরবর্তী দুই বছর দেশ পরিচালনা করে সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার।




এই সরকার বেগম জিয়াকে কারাগারে পাঠায়, তাঁর বড় ছেলে এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লন্ডনে দীর্ঘমেয়াদি নির্বাসনে পাঠায়। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে থাইল্যান্ড ও পরবর্তীতে মালয়েশিয়ায় পাঠায়। ২০১৫ সালে আরাফাত রহমান কোকো সেখানেই ইন্তেকাল করেন। ওই সময়ে বেগম জিয়াকে দেশ ছাড়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশই তাঁর একমাত্র ঠিকানা এবং বিদেশে তাঁর কোনো দ্বিতীয় কোনো বাড়ি নেই।


এরপর তিনি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চরম মাত্রার দমন-পীড়ন সহ্য করেন। কিন্তু কারও কাছে মাথা নত করেননি। এর মধ্য দিয়ে তাঁর আপসহীন নেতৃত্বের পরিচয়ই ফুটে উঠেছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের রাজপথে আন্দোলন এবং বিরোধী দলগুলোর সংসদ বয়কটের মুখে তাঁর নেতৃত্বাধীন ষষ্ঠ সংসদ ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে ত্রয়োদশ সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করে।


কিন্তু পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার পর সংসদে তা বাতিল করে। অথচ এর আগে এই ব্যবস্থার দাবিতে আওয়ামী লীগই মরিয়া আন্দোলন করেছিল। বেগম জিয়া এ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেন, এর ফলে বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের চর্চা নষ্ট হয়েছে। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সুপ্রিম কোর্টের রায়কে পক্ষপাতদুষ্ট ও অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেন।


ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৫ বছরের সরকারের সময়ে বেগম জিয়া কঠোর দমন-পীড়ন ও হয়রানির শিকার হন। এর মধ্যে ছিল সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, কারাবন্দিত্ব ও দীর্ঘদিনের বন্দিজীবন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিপীড়ন হিসেবে বর্ণনা করে।


বিশ্লেষকরা জানান, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই হয়রানির মূল উদ্দেশ্য ছিল বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। তবে শেষ পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক জনরোষের মুখে পড়ে আওয়ামী লীগ সরকার। গণঅভ্যুত্থানের জেরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার টানা সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরে আসার পথ সুগম হয়।


দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন দেশনেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর জানাজায় লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন, যা মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের অন্যতম বড় জানাজায় পরিণত হয়। শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে চিরবিদায় জানায় দেশের অগণিত জনগণ।


২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় বিএনপি। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে ধারণ করে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে বর্তমানে দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁরই সুযোগ্য পুত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।



সর্বশেষ সব খবর

ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শুক্রবার ০২ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১১:৫৫ এএম

একটি শিশুর হাসি যেমন একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি, তেমনি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের কারণে সেই হাসি ম্লান হয়ে যাওয়া আমাদের সবার জন্য বেদনাদায়ক। বাংলাদেশে সম্প্রতি শিশুদের মধ্যে হাম রোগের পুনরুত্থান আমাদের সামনে এমনই এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরছে; যেখানে সামান্য অসচেতনতা বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।


কতটা ভয়ংকর এই ‘হাম’?


হাম পৃথিবীর অন্যতম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত শিশু থেকে গড়ে ১২-১৮ জন অ-টিকাপ্রাপ্ত শিশু সংক্রমিত হতে পারে। বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাস খুব দ্রুত পরিবার ও সমাজে বিস্তার লাভ করে।


লক্ষণ: প্রথমেই চিনে নিন

 

> উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া


> চোখ লাল হয়ে যাওয়া

 

> মুখের ভেতরে সাদা দাগ (Koplik spots)


> মুখ থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া লাল ফুসকুড়ি


জটিলতা: অবহেলার সুযোগ নেই


হাম কখনোই ‘হালকা’ রোগ নয়; বিশেষ করে কিছু শিশুর জন্য এটি জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সম্ভাব্য জটিলতা–


> নিউমোনিয়া 


> ডায়রিয়া ও ডিহাইড্রেশন

 

> কানের সংক্রমণ 


> এনসেফালাইটিস


 দীর্ঘমেয়াদে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়া জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশু: তারা কি বেশি ঝুঁকিতে? একজন পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্ট হিসেবে আমার অভিজ্ঞতায়; জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুরা হামের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকে, বিশেষ করে–


>  যাদের হার্টের সমস্যা এখনও সম্পূর্ণ সংশোধন (corrected) হয়নি


>  যাদের হার্ট ফেইলিউর বা ফুসফুসে অতিরিক্ত রক্তপ্রবাহ রয়েছে


> অপুষ্ট বা বারবার অসুস্থ হয়ে পড়া শিশু


কেন তারা বেশি ঝুঁকিতে?


>  হামের সময় নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা আগে থেকেই দুর্বল হার্ট ও ফুসফুসের জন্য বিপজ্জনক


> জ্বর ও সংক্রমণের কারণে হার্টের ওপর চাপ বাড়ে


>  অক্সিজেনের চাহিদা বাড়ে, যা সায়ানোটিক হার্ট ডিজিজে আক্রান্ত শিশুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে


> ডিহাইড্রেশন ও ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা হার্টের অবস্থা খারাপ করতে পারে অর্থাৎ একটি ‘সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণ’ এই শিশুদের জন্য দ্রুত জটিল অবস্থায় রূপ নিতে পারে।


এসব শিশুর জন্য বিশেষ সতর্কতা


> টিকাদানে কোনো বিলম্ব নয়


> নির্ধারিত সময়েই MR টিকা অবশ্যই দিতে হবে


> প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে আগাম সুরক্ষা পরিকল্পনা করা যেতে পারে


> ভিড় বা অসুস্থ মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন


> পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে শিশুকে আলাদা রাখুন


দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ


> জ্বর, কাশি বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান


> ‘দেখি নিজে নিজে ভালো হয় কিনা’–এই অপেক্ষা বিপজ্জনক হতে পারে


পুষ্টি ও ফলোআপ নিশ্চিত করা


> অপুষ্টি থাকলে ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে


> নিয়মিত কার্ডিওলজি ফলোআপ বজায় রাখা জরুরি


প্রতিরোধ: টিকাই একমাত্র ঢাল। 

বিষয় :

সর্বশেষ সব খবর

হরমুজ প্রণালি

  • প্রকাশ : শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ১:০৯ পিএম

প্রায় ৭ মাস ধরে যুদ্ধ চলছে ইরানের সঙ্গে। হরমুজ প্রণালির অস্থিরতাও শুরু তখন থেকে। এর মধ্যে নতুন আতঙ্ক তৈরি করছে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও। বিশ্বের প্রায় ৩৫ শতাংশ তেলের সরবরাহ চ্যানেলে এভাবে বাধা তৈরি হলেও বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বাস্তবতা মেনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এগোচ্ছে বিকল্প পথে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে কমাচ্ছে চাহিদা। কমাচ্ছে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা। এমন পরিবর্তনের কারণে আগের তুলনায় কম আমদানির পরও সচল রয়েছে দেশের ইস্টার্ন রিফাইনারি। 


রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠান আগে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার হাজার টন এলপিজি, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, ডিজেল, ফার্নেসসহ ১৬ ধরনের তেলজাতীয় পণ্য উৎপাদন করলেও এখন তাতে পরিবর্তন এনেছে। তারপরও বড় ধরনের সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়নি বাংলাদেশেও। জ্বালানির দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু অন্যতম প্রধান দুটি প্রণালি আক্রান্ত হওয়ার পরও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠেনি এখনও। 


মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার বাজারে যাওয়া মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এলএনজির ১৫ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। প্রতিদিন যার পরিমাণ ছিল প্রায় ২ কোটি ব্যারেল। হরমুজ দিয়ে যাওয়া এই জ্বালানির প্রায় ৮৯ শতাংশ আসে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বাজারে। আরেক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব দিয়ে বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ১২ শতাংশ পরিবহন করা হয়। এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরকে যুক্ত করেছে এবং সুয়েজ খালের দিকে যাওয়ার অন্যতম পথও এটি। 


জেপি মরগ্যানের প্রধান পণ্যবাজার বিশ্লেষক নাতাশা কানেভার সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, তিন কারণে তেলের বাজার ধারণার চেয়ে কম বেড়েছে। তাঁর হিসাবে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপর তেলের দাম দেড়শ ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে শঙ্কা থাকলেও এখন মনে হচ্ছে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলেও তেলের দাম সে পর্যায়ে বাড়বে না। তাঁর সর্বশেষ এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের বিকল্পব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। হুতিদের দ্বারা বিকল্প পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগে সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল ইরানের নাগালের বাইরে থাকা বন্দরে পাঠিয়েছে। এটির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিল, গায়ানা ও কানাডা সম্মিলিতভাবে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের জ্বালানি চাহিদা আগের তুলনায় কমিয়েছে। আবার যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ছাড়া অধিকাংশ দেশ ধারণার তুলনায় কম তেল ব্যবহার করেছে তাদের মজুত থেকে। এজন্য যুদ্ধের সময়ে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল কমেছে। ভ্রমণ কমে যাওয়া, গণপরিবহন ব্যবহার ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ার কারণে যেমন তেলের চাহিদা কমেছে, তেমনি অনেক প্রতিষ্ঠানের বাড়ি থেকে কাজের ধারায় ফিরে যাওয়ার কারণেও তা কমেছে। 


সরবরাহ চ্যানেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ কমেছে। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে চাহিদাও কমেছে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল।


বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানায়, স্বাভাবিক সময়ে দেশে প্রতিবছর ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ বেশি। প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে, যা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। এলপিজি, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, ডিজেল, ফার্নেসসহ ১৬ রকমের তেলজাতীয় পণ্য উৎপাদন করে ইস্টার্ন রিফাইনারি। আগে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার হাজার টন জ্বালানি পণ্য উৎপাদন হলেও এখন হচ্ছে গড়ে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টন। উৎপাদিত পণ্যের পরিমাণও ১৬ থেকে কমে নেমেছে আট থেকে দশে। এই কারখানায় এতদিন কেবল সৌদি আরবের ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা হলেও যুদ্ধ শুরুর পর বিকল্প দেশ হিসেবে মালয়েশিয়ার ক্রুড অয়েল ব্যবহারের কথা ভেবেছে ইস্টার্ন রিফাইনারি।


সৌদি ক্রুড অয়েলের অভাবে চলতি বছরের এপ্রিলে পরিশোধন কার্যক্রম কিছুদিন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল ইস্টার্ন রিফাইনারি। অবশ্য সেই সময়টাতেও কারখানা সংস্কারের বিকল্প কাজ সম্পন্ন করেছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগারটি। তখন থেকে উৎপাদনের পরিমাণও কমিয়েছে সংস্থাটি। দেশে এলএনজি ও এলপিজির সরবরাহ প্রক্রিয়াতেও সম্প্রতি বাধা তৈরি হয়েছিল। 


কারিগরি ত্রুটির কারণে কয়েকদিন সমস্যা হলেও দেশে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়নি মজুতে। কারণ, দাম বেশি পড়লেও বাংলাদেশ বিকল্প দেশ থেকে বিকল্প উপায়ে জ্বালানি সরবরাহ করেছে। 


জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না বাংলাদেশকে। জ্বালানি তেল ও গ্যাস সংগ্রহের জন্য বিকল্প উৎসের সহায়তা নিচ্ছি আমরা।’


র‍্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকনালি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, তেলের দাম আর হু হু করে বাড়বে না। একশ ডলার ছাড়িয়ে দেড় শতকের ঘর এটি আর স্পর্শ করবে না শিগগির। বিশ্ববাজারে মিলছে এর ইঙ্গিতও। বাব আল-মান্দেব হুতিরা নিয়ন্ত্রণে নিলেও গত সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের নভেম্বর মাসের ফিউচার দর ২ দশমিক ১১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৬৮ ডলারে নেমেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর তেলের দাম ১০৯ ডলারে উঠেছিল। ১৬ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ এক দিনের মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০৪ ডলারে নেমে আসে। এরপর সোমবার তেলের দাম ১০১ ডলারে নেমে যায়। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করে। এর পর ৩০ এপ্রিল তেলের দাম সর্বোচ্চ ১২৬ ডলার পর্যন্ত ওঠে। পরে আবার তা কমে আবার বাড়লেও অতিক্রম করেনি ১২৬ ডলারের ঘর।

সর্বশেষ সব খবর

ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ১০:২৬ এএম

ভোরের আলো ফুটতেই সন্ধ্যা নদীর বুকে যেন প্রাণের সঞ্চার হয়। চারপাশ থেকে ছুটে আসে শত শত ছোট-বড় ডিঙি ও ট্রলার। নদীর স্নিগ্ধ হাওয়ায় মিশে যায় মানুষের কোলাহল, দাঁড় টানার ছপছপ শব্দ আর ধান-চাল মাপার খসখস আওয়াজ। এক নৌকায় হয়তো চলছে ধানের দরদাম, তো ঠিক পাশে অন্য নৌকায় মাপা হচ্ছে চকচকে চাল। 


ক্রেতা-বিক্রেতার দরকষাকষি, বস্তা টানাটানি আর নগদ লেনদেন-সবকিছুই চলছে নদীর বুকে ভাসমান নৌকায়। বরিশালের বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীর বুকে বসা ধান-চালের এ ভাসমান হাট কেবল একটি বাজার নয়, এটি যেন আবহমান বাংলার কৃষিনির্ভর অর্থনীতির এক জীবন্ত ক্যানভাস।


স্থানীয় প্রবীণদের মতে, প্রমত্তা সন্ধ্যা নদীর তীরে ধান-চালের এই ভাসমান বাণিজ্যের বয়স প্রায় ২০০ বছর। একসময় নদীর দুই পাশে সারি সারি ধান-চালের আড়ত ও চালকল ছিল। মোল্লা, ব্যাপারী, মৃধা, সরদারসহ বিভিন্ন উপাধিধারী ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত পুরো এলাকা। কালের বিবর্তনে অনেক কিছু বদলে গেলেও নদীর বুকে নৌকায় নৌকায় বেচাকেনার সেই আদি রীতি আজও টিকে আছে।


বানারীপাড়ার নামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ‘বালাম চাল’। সরু, লম্বাটে ও সুগন্ধি এই চালের একসময় দেশজুড়ে ব্যাপক কদর ছিল। বালামের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের ধান ও চাল বেচাকেনা হয় এখানে। তবে এই হাটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলেন ‘কুটিয়াল’রা।


ধান কিনে তা প্রক্রিয়াজাত করে চালে রূপান্তরের কারিগরদের স্থানীয় ভাষায় কুটিয়াল বলা হয়। নৌকায় ধান কিনে প্রথমে তা পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর ভোরে বিশাল আকৃতির চুলায় বিশেষ পাত্রে সেই ধান সেদ্ধ করা হয়। 


এরপর দুই-তিন দিন কড়া রোদে উঠানে শুকিয়ে চালকলে ভাঙানোর পর মেলে সেই কাঙ্ক্ষিত ঝরঝরে চাল। একসময় বানারীপাড়ার ঘরে ঘরে কুটিয়ালদের ব্যস্ততা ছিল, যা আজ অনেকটাই ম্রিয়মাণ।


বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে নদীপথে ব্যবসায়ীরা ছুটে আসেন এই হাটে। বরগুনার ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন যেমন এক নৌকা ধান নিয়ে এসেছেন। তাঁর মতে, এখানে ধানের ন্যায্য দাম পাওয়া যায়, আবার ফেরার পথে তুলনামূলক কম দামে ভালো মানের চালও কিনে নেওয়া যায়। যাতায়াতে সময় ও দূরত্ব বেশি হলেও নদীপথে পণ্য পরিবহনের সুবিধা এবং ব্যবসায়িক বিশ্বস্ততার কারণে তিনি দশকের পর দশক ধরে এই হাটে আসেন।


আগে যেখানে পালতোলা নৌকার আধিক্য ছিল, এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে যন্ত্রচালিত ট্রলার বা ইঞ্জিন নৌকা। তবে নদীর বুকে সারি সারি নৌকায় ধান-চালের পসরা সাজানোর সেই চিরায়ত দৃশ্যটি বদলায়নি।


বানারীপাড়ার এই মূল হাট বসে সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার। তবে আগের দিনের হাটের রেশ ধরে রবি ও বুধবারও কিছুটা বেচাকেনা চলে, যাকে স্থানীয়রা বলেন ‘গালার হাট’। হাটের দিনগুলোয় পাইকার, কুটিয়াল আর শ্রমিকদের দম ফেলার ফুরসত থাকে না। এত ব্যস্ততার মধ্যেও রয়েছে এক অন্য রকম প্রশান্তি।

বিষয় :

সর্বশেষ সব খবর

ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : মঙ্গলবার ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ১২:৪৩ পিএম

বিসিএসসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার লিখিত ধাপ পেরিয়ে ভাইভায় পৌঁছানো একটি বড় অর্জন। তবে ভাইভায় ভালো করার জন্য শুধু সাধারণ জ্ঞান ও সাম্প্রতিক ঘটনা জানলেই হবে না। প্রার্থীর একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড, বিষয়ভিত্তিক মৌলিক জ্ঞান, বিশ্লেষণক্ষমতা, ব্যক্তিত্ব এবং নিজের পড়াশোনাকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভাইভার আগে একাডেমিক প্রস্তুতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।


প্রথমেই নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রতিটি স্তর সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিতে হবে। কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েছেন, কোন বিষয়ে পড়েছেন, কেন সেই বিষয়টি বেছে নিয়েছেন, বিষয়টির গুরুত্বপূর্ণ শাখা কী এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রে এর ব্যবহার কী– এসব প্রশ্নের উত্তর অনুশীলন করা প্রয়োজন। নিজের সিভি বা আবেদনপত্রে দেওয়া প্রতিটি তথ্য সম্পর্কে প্রস্তুত থাকতে হবে। কোনো তথ্য উল্লেখ করে থাকলে সেখান থেকেই প্রশ্ন আসতে পারে। নিচের বিষয়গুলোকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।


> নিজের পরিচয় ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে। নিজের নাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভাগ, বিষয়, শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং কেন নির্দিষ্ট বিষয়টি বেছে নিয়েছেন– এসব প্রশ্নের উত্তর সাবলীলভাবে দিতে পারতে হবে।


> নিজের একাডেমিক বিষয়ের মৌলিক ধারণাগুলো ভালোভাবে ঝালিয়ে নিতে হবে। সংজ্ঞা, গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব, সূত্র, পরিভাষা, ধারণা ও ব্যবহারিক প্রয়োগ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। শুধু মুখস্থ নয়, কোনো বিষয় কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবে কোথায় এর প্রয়োগ রয়েছে, সেটিও বুঝতে হবে।


> নিজের বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কোর্সগুলো পুনরালোচনা করতে হবে। বিশেষ করে যেসব বিষয় স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়েছেন, সেগুলোর মৌলিক অধ্যায় ও গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলো আবার পড়া প্রয়োজন।


> একাডেমিক ফলাফল নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে। কোনো বিষয়ে ভালো বা খারাপ ফলাফলের কারণ, প্রিয় বিষয়, কঠিন বিষয় এবং নিজের একাডেমিক শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে যুক্তিসংগত উত্তর অনুশীলন করা উচিত।


> থিসিস, গবেষণা, প্রজেক্ট বা ইন্টার্নশিপ করে থাকলে সেগুলো ভালোভাবে ঝালিয়ে নিতে হবে। গবেষণার বিষয়, উদ্দেশ্য, পদ্ধতি, ফলাফল এবং বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে প্রশ্ন আসতে পারে।


> নিজের একাডেমিক বিষয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতার সম্পর্ক বুঝতে হবে। নিজের বিষয়ের জ্ঞান কীভাবে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রযুক্তি, পরিবেশ বা প্রশাসনে কাজে লাগতে পারে, তা নিয়ে চিন্তা করা দরকার।


> বাংলাদেশের সংবিধান, মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে মৌলিক ধারণা রাখতে হবে।


> নিজ জেলা সম্পর্কে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, অর্থনীতি, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, নদনদী, শিল্প ও উল্লেখযোগ্য স্থাপনা সম্পর্কে প্রশ্ন আসতে পারে।


> সাম্প্রতিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি নিয়মিত পড়তে হবে। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, প্রযুক্তি, পরিবেশ ও সামাজিক ঘটনাগুলোর কারণ ও প্রভাব বোঝার চেষ্টা করতে হবে।


> নিজের ক্যারিয়ার পরিকল্পনা পরিষ্কার রাখতে হবে। কেন সরকারি চাকরি করতে চান, কেন বিসিএস বেছে নিয়েছেন এবং পছন্দের ক্যাডার সম্পর্কে আপনার ধারণা কী—এসব প্রশ্নের উত্তর অনুশীলন করা প্রয়োজন।


> পরিস্থিতিভিত্তিক প্রশ্নের অনুশীলন করতে হবে। একজন কর্মকর্তা হিসেবে কোনো সমস্যা দেখা দিলে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন, কীভাবে জনগণের সঙ্গে কাজ করবেন বা সংকট মোকাবিলা করবেন—এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর যুক্তি দিয়ে দেওয়ার অভ্যাস করতে হবে।


> বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় নিজের পরিচয় এবং একাডেমিক বিষয় সহজভাবে ব্যাখ্যা করার অনুশীলন করা ভালো।


> প্রতিদিন কিছু সময় মক ভাইভা দিতে হবে। শিক্ষক, বন্ধু বা অভিজ্ঞ ব্যক্তির সামনে বসে প্রশ্নের উত্তর দিলে ভয় ও জড়তা কমবে।

 

> শরীরী ভাষা ও আচরণের দিকে নজর দিতে হবে। চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা, স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসা, প্রশ্ন মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সংক্ষিপ্ত ও পরিষ্কার উত্তর দেওয়ার অভ্যাস করতে হবে।


> উত্তর জানা না থাকলে কীভাবে তা সামলাতে হবে, সেটিও অনুশীলন করতে হবে। ভুল তথ্য দেওয়ার চেয়ে বিনয়ের সঙ্গে না জানার বিষয়টি স্বীকার করা বেশি গ্রহণযোগ্য।


সবশেষে মনে রাখতে হবে, ভাইভায় বোর্ড সাধারণত শুধু কত কিছু মুখস্থ আছে তা জানতে চায় না; বরং প্রার্থী নিজের জ্ঞান কতটা বুঝেছেন এবং সেই জ্ঞান বাস্তব পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রয়োগ করতে পারেন, সেটিও দেখতে চায়। তাই ভাইভার আগে একাডেমিক বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পুনরালোচনা, নিজের গবেষণা বা প্রজেক্ট ঝালিয়ে নেওয়া, সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং মক ভাইভার মাধ্যমে দুর্বলতা চিহ্নিত করাই হতে পারে প্রস্তুতির সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।

সর্বশেষ সব খবর

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

  • প্রকাশ : শুক্রবার ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ১:০৮ এএম

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এক চির অমলিন ধূমকেতুর নাম। তাঁর জীবনের পুরো গল্পটাই দারুণ সব ঘটনার নাটকে ভরা। বিশেষ করে ময়মনসিংহের ত্রিশালের সময়টার কথা যদি ধরা হয়, তবে সেখানে রয়েছে এক অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর ইতিহাস।

কীভাবে এক কিশোর সাধারণ একটি রুটির দোকান থেকে হুট করে এসে হাজির হলেন ত্রিশালে, আর কীভাবে নিজের আত্মসম্মানের জন্য এক কাপড়ে হঠাৎ হারিয়ে গেলেন এই পুরো ঘটনাটি এক অনন্য আখ্যান। ত্রিশালের বুকে কবির আগমন, শৈশবের দিনগুলো এবং সেখান থেকে চলে যাওয়ার পুরো বিবরণী তুলে ধরছেন ইকবাল মাহমুদ। 

অভিমানী দুখু মিয়া: রুটির দোকান থেকে হঠাৎ ত্রিশালে

ঘটনার শুরু ১৯১৪ সালের দিকে। ভারতে তখন ব্রিটিশদের শাসন চলছে। পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে এক রুটির দোকানে কাজ করতেন কিশোর নজরুল। অভাবের কারণে পড়ালেখা ছেড়ে খুব ছোট বয়সেই পেটের টানে তাঁকেই নামতে হয়েছিল কাজে। বাড়ির সবাই তাঁহাকে ডাকত 'দুখু মিয়া' বলে। একদিন মায়ের কথা খুব মনে পড়ায় রুটির দোকানের মালিকের কাছ থেকে এক দিনের ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়ি গেলেন কিশোর দুখু। কিন্তু মায়ের আদর-ভালোবাসায় কাটা সময় এত দ্রুত চলে গেল যে, এক দিনের জায়গায় কাটিয়ে দিলেন তিন দিন! তিন দিন পর যখন দোকানে ফিরলেন, তখন দোকানের মালিক তাঁকে ভীষণ বকাঝকা করলেন। মালিক একপ্রকার ধমক দিয়েই বললেন,

"এক দিনের কথা বলে তিন দিন কাটিয়ে এলে? এভাবে চললে কাজ করার দরকার নেই, কেটে পড়ো!"

ছোটবেলা থেকেই নজরুলের আত্মসম্মানবোধ ছিল মারাত্মক রকমের বেশি। এই কড়া কথা শোনার পর তিনি এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। রাত তখন ৯টা বাজে। পরনের জামাকাপড় নিয়েই সোজা বেরিয়ে এলেন রাস্তায়। সে রাতে কোথায় যাবেন? হঠাৎ আশ্রয় মিলল কাজী রফিজউল্লাহ নামের এক পুলিশ দারোগার বাড়ির বারান্দায়।

শেষরাতে দারোগা রফিজউল্লাহ যখন ঘর থেকে বের হলেন, তখন বারান্দায় কোণে বসে থাকা চঞ্চল কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত বালকটিকে দেখলেন। নজরুল তাঁর নিজের দুঃখের কথা ও দূরবস্থার গল্প সব খুলে বললেন। দারোগা সাহেব নজরুলের কথা বলার ধরন ও তাঁর প্রতিভা দেখে খুব মায়ায় পড়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন, এই ছেলে তো সাধারণ কোনো ছেলে নয়, একে পড়ালেখা করানো দরকার। ব্যস, তিনি বালক নজরুলকে নিজের সঙ্গে নিয়ে সোজা চলে এলেন নিজের জন্মভূমি ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার কাজীর শিমলা গ্রামে।

ত্রিশালের নতুন জীবন ও দরিরামপুর স্কুল

ত্রিশালে নিয়ে এসে দারোগা সাহেব প্রথমে ভেবেছিলেন কবিকে কাজের তদারকিতে রাখবেন। কিন্তু বাড়ির লোকেরা নজরুলের পড়ালেখার প্রতি টান দেখে অবাক হন। দারোগা সাহেবের মা বললেন, "এ তো কাজ করার ছেলে নয়, এ যে সারাদিন বই নিয়ে মেতে থাকে!"

এরপর নজরুলকে স্কুলে ভর্তি করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯১৪ সালের জুন মাসের দিকে নজরুলকে ত্রিশালের নামকরা 'দরিরামপুর ইংলিশ হাই স্কুলে' সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়।

কাজীর শিমলা গ্রামে যেখানে নজরুল থাকতেন, সেখান থেকে স্কুলের দূরত্ব ছিল প্রায় ১০ থেকে ১১ কিলোমিটার! প্রতিদিন এত দূরের পথ হেঁটে স্কুলে আসা- যাওয়া করা ছিল খুবই কষ্টের কাজ। তাই কিছুদিন পর স্কুলের কাছেই 'নামাপাড়া' গ্রামের এক সচ্ছল কৃষক বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়িতে নজরুলের থাকার ব্যবস্থা (জায়গির) করা হয়। সেখানে থেকে কবি নিয়মিত স্কুলে যাতায়াত শুরু করলেন।

ত্রিশালের প্রকৃতি, সুতিয়া নদীর পাড়, আর সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় কবি খুব দ্রুত মিশে গেলেন। এই ত্রিশালেই কবি জীবনের প্রথম বাংলাদেশের মাটি ও এখানকার সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে চেনার ও ভালোবাসার সুযোগ পেয়েছিলেন।

লোকমুখে জমে থাকা নজরুলের শৈশবের দারুণ সব গল্প

ত্রিশালে কাটানো সময়টাকে কেন্দ্র করে সেখানকার মানুষের মুখে মুখে আজ পর্যন্ত অনেক মজার মজার গল্প প্রচলিত রয়েছে। এসব গল্প সত্য নাকি কেবলই রটনাতা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন হলেও ত্রিশালবাসী আজও নজরুলকে মনে রাখতে এই কিংবদন্তিগুলো মনে প্রাণে ধরে রেখেছে

লুকিয়ে যাত্রাপালা দেখা ও গোয়ালঘরের চোর: কিশোর নজরুলের যাত্রাপালা আর গানবাজনার প্রতি ছিল প্রচণ্ড ঝোঁক। রাতে বাড়ির লোক ঘুমিয়ে পড়লে তিনি লুকিয়ে দূরের গ্রামে চলে যেতেন যাত্রা দেখতে। সেখান থেকে ফিরতে ফিরতে ভোররাত ৩টা বা ৪টা বেজে যেত। একদিন ভোররাতে ফিরে দেখলেন বাড়ির দরজা বন্ধ। ধরা পড়ার ভয়ে বুদ্ধিমান নজরুল সোজা গোয়ালঘরে গিয়ে গরুর দড়ি ছেড়ে দিয়ে চেঁচাতে শুরু করলেন "চোর! চোর! চোর গরু নিয়ে পালাচ্ছে!" ঘরের লোকজন হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলো এবং গরুগুলোকে তাড়িয়ে আনলো। চোর না পেলেও গৃহকর্তা নজরুলের ওপর খুশি হলেন যে নজরুল সময়ে চেঁচিয়ে না উঠলে গরুগুলো চুরি হয়ে যেত! কবিকে আদর করে বললেন, "তোর খিদে লেগেছে, যা ভাত খেয়ে নে!" এতে যেমন রাতে পেট পুরে ভাত জুটলো, তেমনি যাত্রাপালা দেখে আসার অপরাধ থেকেও তিনি বেঁচে গেলেন!

বাঁদরে খেল পাকা কলা: একদিন জায়গিরবাড়ির গৃহকর্ত্রী নজরুলকে বললেন গাছে উঠে পাকা কলাগুলো কেটে নিয়ে আসতে। নজরুল গাছে উঠলেন। গাছে উঠে তাঁর এতই খিদে পেল যে তিনি সবকটি পাকা কলা নিজেই পেট পুরে খেয়ে ফেললেন! এরপর কেবল কাঁচা কলার কাঁদিটি নিচে নামিয়ে গম্ভীর মুখে এসে কাকিমাকে বললেন, "কাকিমা, গাছে কোনো পাকা কলা নেই, সব পাকা কলা তো বাঁদরে খেয়ে ফেলেছে!"

নদী পারের আড়বাঁশি ও গানের আড্ডা: স্কুলের পড়া ফাঁকি দেওয়া কিংবা বন্ধুদের সাথে অভিমান হলে নজরুল সোজা চলে যেতেন সুতিয়া নদীর তীরে শুকনি বিলের পাশের বটগাছটার নিচে। সেখানে নিজের সঙ্গে রাখা একটা আড়বাঁশি বাজাতেন। বাঁশির মিষ্টি সুরে মুগ্ধ হয়ে কাজ ফেলে ছুটে আসতো নদীর পাড়ের রাখাল আর কৃষকেরা। নজরুল মাঝেমধ্যে কবিগানের লড়াই করতেন, আবার কখনো লোকনাটক তৈরি করে তাতে অভিনয়ও করতেন।

ফারসি পরীক্ষায় ৯৮ নম্বর ও অপ্রত্যাশিত এক বিতর্ক

ত্রিশালে থাকতে থাকতেই নজরুল নিয়মিত স্কুলে পড়ালেখা করে সপ্তম শ্রেণি পার হয়ে অষ্টম শ্রেণিতে উঠলেন। তিনি ক্লাসের পড়ালেখায় খুব ভালো ছিলেন, বিশেষ করে ফারসি ভাষায় কবির দক্ষতা ছিল অসাধারণ। অষ্টম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় নজরুল ফারসি বিষয়ে ১০০ নম্বরের মধ্যে পান ৯৮ নম্বর! কিন্তু গোল বাধল অন্য জায়গায়। ওই বছর স্কুলের বেশিরভাগ ছেলেই ফারসি পরীক্ষায় ফেল করেছিল।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিপিনচন্দ্র চক্রবর্তী এবং ফারসি শিক্ষক মৌলভি জহুরুল হক ভেবে দেখলেন, এত ছেলে ফেল করলে তো স্কুলের সুনাম থাকবে না। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সবাইকে 'গ্রেস' বা বোনাস ৫ নম্বর করে বাড়িয়ে দিয়ে পাশ করিয়ে দেবেন।

এই সিদ্ধান্তের কথা শোনামাত্রই ক্লাসের ফার্স্ট বয় নজরুলের মনে খটকা লাগল। তিনি সোজা গিয়ে হাজির হলেন হেডমাস্টার সাহেবের কক্ষে।

নজরুল গিয়ে অত্যন্ত শান্ত ও ধীর গলায় শিক্ষকদের বললেন, "আপনারা যদি ফেল করা ছাত্রদের পাস করানোর জন্য ৫ নম্বর করে বোনাস দেন, তবে আমাকেও ৫ নম্বর বাড়িয়ে ১০৩ করতে হবে!" শিক্ষকেরা তো শুনে অবাক! প্রধান শিক্ষক বললেন, "তুমি তো এমনিতেই ৯৮ পেয়ে ফার্স্ট হয়েছ! ৯৮ পাওয়া ছাত্রকে কেন আবার ৫ নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া হবে?" নজরুল তাঁর যুক্তিতে অনড় রইলেন। তিনি বললেন, "আইন ও নিয়ম সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। সমবিচারের স্বার্থে বাড়ালে সবারই বাড়ানো উচিত!"

খাস ইংরেজিতে কড়া জবাব ও এক কাপড়ে ত্রিশাল ত্যাগ

শিক্ষকেরা নজরুলের এমন অদ্ভুত দাবি মেনে নিতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে প্রধান শিক্ষক ইংরেজি ভাষায় কথা বলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়া কিশোর নজরুলকে ভয় দেখিয়ে দমানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু নজরুল কি ভয় পাওয়ার পাত্র? তিনি এক চুলও পিছু না হেটে, হেডমাস্টার সাহেবের সবকটি কথার জবাব টানা ১৫ মিনিট ধরে ঝরঝরে ও খাস ইংরেজিতে দিতে শুরু করলেন! অষ্টম শ্রেণির একটি ছেলে কীভাবে একজন অভিজ্ঞ প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে ইংরেজিতে এমন কঠিন তর্ক করতে পারে, তা দেখে স্কুলের অন্যান্য শিক্ষকেরা পুরো হতবাক ও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে রইলেন! তর্কে না পেরে প্রধান শিক্ষক রেগে গেলেন। তখন স্বাভিমানী নজরুল সোজা বলে উঠলেন, "যে স্কুলে ন্যায়বিচার নেই, যে স্কুলে সমান নিয়ম মানা হয় না, নজরুল ইসলাম আর সেই স্কুলে পড়ে না! আপনারা আমাকে স্কুল সার্টিফিকেট না দিলেও আমার কিছুই যায় আসে না!"

এই কথা বলামাত্রই কবি স্কুল কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি এতটাই ক্ষুব্ধ ও অপমানিত বোধ করেছিলেন যে, ব্যাগ গোছানো কিংবা বই-খাতা নেওয়ার জন্য জায়গিরবাড়িতেও আর ফেরত যাননি। গায়ের পরনে যে জামাকাপড়টুকু ছিল, সেই এক কাপড়ে ত্রিশালের পথ ধরে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন!

ইতিহাসের অমলিন স্মৃতির অধ্যায়

১৯১৫ সালের শেষের দিকে নজরুল চিরতরে ত্রিশাল ছাড়েন। ত্রিশাল থেকে বিদায় নিয়ে তিনি আবার পশ্চিমবঙ্গে ফিরে যান এবং সেখানে রাণীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ হাই স্কুলে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করেন। কাজী নজরুল ইসলাম ত্রিশালে ছিলেন মাত্র দেড় বছরের মতো। এই সামান্য সময়ের আসা-যাওয়া কিন্তু ত্রিশালের মানুষকে এক চিরন্তন স্মৃতি উপহার দিয়ে গেছে। নজরুল ত্রিশাল ছেড়ে চলে গেলেও, ত্রিশালের মানুষ আজও কবিকে ভুলে যায়নি। আজও সুতিয়া নদীর তীর, দরিরামপুরের বটতলা আর কাজীর শিমলা গ্রামে বাতাসে যেন সেই বাঁশি বাজানো চঞ্চল দুখু মিয়ারই স্মৃতি ভেসে বেড়ায়। কিশোর নজরুলের এই হঠাৎ আগমন আর নিজের আত্মসম্মানের টানে হঠাৎ প্রস্থান বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের এক অপরূপ ও অদ্ভুত সুন্দর সত্যি গল্প হয়ে রয়।

ইকবাল মাহমুদ 
শিক্ষার্থী, ফিল্ম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ সব খবর

ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : বুধবার ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ১০:২৭ এএম

অধিকাংশ মায়ের অভিযোগ তাদের সন্তান খায় না, রুচি নেই। এ জন্য তারা তাদের ছোট শিশুকে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। ফলে একপর্যায়ে দেখা যায় সন্তানকে সারাদিন খাবার না দিলেও তার ক্ষুধা লাগে না। 


সন্তানকে খাওয়ানোর সময় দুটি জিনিস মনে রাখতে হবে। তার আসলে ক্ষুধা লেগেছে কিনা এবং খাবারের নির্দিষ্ট সময় মেনে চলছেন কিনা। ক্ষুধা না লাগলে সন্তান খাবে না। কাজেই আগের খাবারটা হজম হওয়ার সময় দিতে হবে। অনেক মা শিশুকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় এটা-সেটা খাইয়ে ক্ষুধা নষ্ট করেন। আবার ভাত খাওয়ার সময় কলা, কলা খাওয়ানোর সময় ভাত নিয়ে বসেন। আবার পেট ভরে গেলেও পুরোটা খাওয়ানোর জন্য তাড়াহুড়া করেন। 


এতে যে যে সমস্যা হয় 


১. শিশু খেতে না পেরে বমি করতে পারে, হজম না হয়ে পাতলা পায়খানা হতে পারে। 


২. জোর করায় খাবার গলায় আটকে শ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফুসফুসে গিয়ে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। এমনকি ফুসফুসে ঘা বা নিউমোনিয়া হতে পারে। 


৩. সন্তানের খাবারে ভীতি জন্মাতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে তীব্র ক্ষুধামান্দ্য হতে পারে। 


৪. খাবারে ভীতি জন্মানোর ফলে না খেয়ে পুষ্টিহীনতায় ভুগতে পারে। 


৫. অনেক সময় খাদ্যভীতি জন্মানোর ফলে সন্তানের স্বাভাবিক ক্ষুধা নষ্ট হয়। শিশু মানসিকভাবে এতটা অসুস্থ হয়ে পড়ে যে খাবার দেখতে, খাবার তৈরি করার আওয়াজ বা গন্ধ পেলে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, বমি করা শুরু করে। এতে শিশু মায়ের প্রতি বিরূপ আচরণও করতে পারে, অবিশ্বাস থেকে সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দিতে পারে। 


৬. জোর করে খাওয়াতে থাকলে শিশু অস্বাভাবিক রকম খুঁতখুঁতে হয়ে যেতে পারে, বেছে বেছে খাওয়ার ফলে নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে অস্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের কারণে অতিরিক্ত স্থূলতার সমস্যায়ও পড়তে পারে। তাই শিশুকে জোর করে খাওয়ানোর বদলে খাবার খাওয়ার পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য নিয়ে আসুন। যেমন তাকে খাবার হজমের জন্য সময় দিন, দুই খাবারের মধ্যে পর্যাপ্ত সময়ের ব্যবধান রাখুন, খাবার দেওয়ার একটা নির্দিষ্ট সময় ও জায়গা নির্বাচন করুন, একসঙ্গে বেশি খাবার না খেতে চাইলে অল্প অল্প করে খাবার দিন। 


পুরো বাটির খাবার শেষ না করা পর্যন্ত মায়েরা থামতে চান না। কখন থামতে হবে তা অভিভাবককে বুঝতে হবে। শিশু মুখ না খুললে, মাথা সরিয়ে নিলে, বমিভাব করলে খাবার দেওয়া বন্ধ করুন। কম খেলে চেষ্টা করুন যতটুকু খাবার খায় তা যেন পুষ্টিকর হয়। এক চামচ খেলে ওই এক চামচে যেন যথেষ্ট পরিমাণ প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল, কার্ব ও ফ্যাট থাকে সেটি নিশ্চিত করুন।  


শিশুকে জোর করে খাওয়ালে হয়তো আপনি সাময়িকভাবে তার পেট ভরাতে পারবেন, এতে আপনার মানসিক শান্তি মিলবে। সময়ের সঙ্গে এটি বুমেরাং হয়ে আপনাকে বিপদে ফেলবে। আপনার সন্তান সত্যি সত্যিই ‘কিছুই খায় না’ রোগ বাঁধিয়ে শারীরিক ও মানসিক অশান্তির কারণ ঘটাবে।

বিষয় : শিশু

সর্বশেষ সব খবর