হরমুজ প্রণালি

  • প্রকাশ : শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ১:০৯ পিএম

প্রায় ৭ মাস ধরে যুদ্ধ চলছে ইরানের সঙ্গে। হরমুজ প্রণালির অস্থিরতাও শুরু তখন থেকে। এর মধ্যে নতুন আতঙ্ক তৈরি করছে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও। বিশ্বের প্রায় ৩৫ শতাংশ তেলের সরবরাহ চ্যানেলে এভাবে বাধা তৈরি হলেও বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বাস্তবতা মেনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এগোচ্ছে বিকল্প পথে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে কমাচ্ছে চাহিদা। কমাচ্ছে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা। এমন পরিবর্তনের কারণে আগের তুলনায় কম আমদানির পরও সচল রয়েছে দেশের ইস্টার্ন রিফাইনারি। 


রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠান আগে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার হাজার টন এলপিজি, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, ডিজেল, ফার্নেসসহ ১৬ ধরনের তেলজাতীয় পণ্য উৎপাদন করলেও এখন তাতে পরিবর্তন এনেছে। তারপরও বড় ধরনের সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়নি বাংলাদেশেও। জ্বালানির দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু অন্যতম প্রধান দুটি প্রণালি আক্রান্ত হওয়ার পরও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠেনি এখনও। 


মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার বাজারে যাওয়া মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এলএনজির ১৫ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। প্রতিদিন যার পরিমাণ ছিল প্রায় ২ কোটি ব্যারেল। হরমুজ দিয়ে যাওয়া এই জ্বালানির প্রায় ৮৯ শতাংশ আসে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বাজারে। আরেক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব দিয়ে বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ১২ শতাংশ পরিবহন করা হয়। এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরকে যুক্ত করেছে এবং সুয়েজ খালের দিকে যাওয়ার অন্যতম পথও এটি। 


জেপি মরগ্যানের প্রধান পণ্যবাজার বিশ্লেষক নাতাশা কানেভার সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, তিন কারণে তেলের বাজার ধারণার চেয়ে কম বেড়েছে। তাঁর হিসাবে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপর তেলের দাম দেড়শ ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে শঙ্কা থাকলেও এখন মনে হচ্ছে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলেও তেলের দাম সে পর্যায়ে বাড়বে না। তাঁর সর্বশেষ এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের বিকল্পব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। হুতিদের দ্বারা বিকল্প পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগে সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল ইরানের নাগালের বাইরে থাকা বন্দরে পাঠিয়েছে। এটির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিল, গায়ানা ও কানাডা সম্মিলিতভাবে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের জ্বালানি চাহিদা আগের তুলনায় কমিয়েছে। আবার যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ছাড়া অধিকাংশ দেশ ধারণার তুলনায় কম তেল ব্যবহার করেছে তাদের মজুত থেকে। এজন্য যুদ্ধের সময়ে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল কমেছে। ভ্রমণ কমে যাওয়া, গণপরিবহন ব্যবহার ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ার কারণে যেমন তেলের চাহিদা কমেছে, তেমনি অনেক প্রতিষ্ঠানের বাড়ি থেকে কাজের ধারায় ফিরে যাওয়ার কারণেও তা কমেছে। 


সরবরাহ চ্যানেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ কমেছে। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে চাহিদাও কমেছে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল।


বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানায়, স্বাভাবিক সময়ে দেশে প্রতিবছর ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ বেশি। প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে, যা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। এলপিজি, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, ডিজেল, ফার্নেসসহ ১৬ রকমের তেলজাতীয় পণ্য উৎপাদন করে ইস্টার্ন রিফাইনারি। আগে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার হাজার টন জ্বালানি পণ্য উৎপাদন হলেও এখন হচ্ছে গড়ে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টন। উৎপাদিত পণ্যের পরিমাণও ১৬ থেকে কমে নেমেছে আট থেকে দশে। এই কারখানায় এতদিন কেবল সৌদি আরবের ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা হলেও যুদ্ধ শুরুর পর বিকল্প দেশ হিসেবে মালয়েশিয়ার ক্রুড অয়েল ব্যবহারের কথা ভেবেছে ইস্টার্ন রিফাইনারি।


সৌদি ক্রুড অয়েলের অভাবে চলতি বছরের এপ্রিলে পরিশোধন কার্যক্রম কিছুদিন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল ইস্টার্ন রিফাইনারি। অবশ্য সেই সময়টাতেও কারখানা সংস্কারের বিকল্প কাজ সম্পন্ন করেছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগারটি। তখন থেকে উৎপাদনের পরিমাণও কমিয়েছে সংস্থাটি। দেশে এলএনজি ও এলপিজির সরবরাহ প্রক্রিয়াতেও সম্প্রতি বাধা তৈরি হয়েছিল। 


কারিগরি ত্রুটির কারণে কয়েকদিন সমস্যা হলেও দেশে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়নি মজুতে। কারণ, দাম বেশি পড়লেও বাংলাদেশ বিকল্প দেশ থেকে বিকল্প উপায়ে জ্বালানি সরবরাহ করেছে। 


জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না বাংলাদেশকে। জ্বালানি তেল ও গ্যাস সংগ্রহের জন্য বিকল্প উৎসের সহায়তা নিচ্ছি আমরা।’


র‍্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকনালি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, তেলের দাম আর হু হু করে বাড়বে না। একশ ডলার ছাড়িয়ে দেড় শতকের ঘর এটি আর স্পর্শ করবে না শিগগির। বিশ্ববাজারে মিলছে এর ইঙ্গিতও। বাব আল-মান্দেব হুতিরা নিয়ন্ত্রণে নিলেও গত সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের নভেম্বর মাসের ফিউচার দর ২ দশমিক ১১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৬৮ ডলারে নেমেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর তেলের দাম ১০৯ ডলারে উঠেছিল। ১৬ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ এক দিনের মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০৪ ডলারে নেমে আসে। এরপর সোমবার তেলের দাম ১০১ ডলারে নেমে যায়। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করে। এর পর ৩০ এপ্রিল তেলের দাম সর্বোচ্চ ১২৬ ডলার পর্যন্ত ওঠে। পরে আবার তা কমে আবার বাড়লেও অতিক্রম করেনি ১২৬ ডলারের ঘর।




ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ১০:২৬ এএম

ভোরের আলো ফুটতেই সন্ধ্যা নদীর বুকে যেন প্রাণের সঞ্চার হয়। চারপাশ থেকে ছুটে আসে শত শত ছোট-বড় ডিঙি ও ট্রলার। নদীর স্নিগ্ধ হাওয়ায় মিশে যায় মানুষের কোলাহল, দাঁড় টানার ছপছপ শব্দ আর ধান-চাল মাপার খসখস আওয়াজ। এক নৌকায় হয়তো চলছে ধানের দরদাম, তো ঠিক পাশে অন্য নৌকায় মাপা হচ্ছে চকচকে চাল। 


ক্রেতা-বিক্রেতার দরকষাকষি, বস্তা টানাটানি আর নগদ লেনদেন-সবকিছুই চলছে নদীর বুকে ভাসমান নৌকায়। বরিশালের বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীর বুকে বসা ধান-চালের এ ভাসমান হাট কেবল একটি বাজার নয়, এটি যেন আবহমান বাংলার কৃষিনির্ভর অর্থনীতির এক জীবন্ত ক্যানভাস।


স্থানীয় প্রবীণদের মতে, প্রমত্তা সন্ধ্যা নদীর তীরে ধান-চালের এই ভাসমান বাণিজ্যের বয়স প্রায় ২০০ বছর। একসময় নদীর দুই পাশে সারি সারি ধান-চালের আড়ত ও চালকল ছিল। মোল্লা, ব্যাপারী, মৃধা, সরদারসহ বিভিন্ন উপাধিধারী ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত পুরো এলাকা। কালের বিবর্তনে অনেক কিছু বদলে গেলেও নদীর বুকে নৌকায় নৌকায় বেচাকেনার সেই আদি রীতি আজও টিকে আছে।


বানারীপাড়ার নামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ‘বালাম চাল’। সরু, লম্বাটে ও সুগন্ধি এই চালের একসময় দেশজুড়ে ব্যাপক কদর ছিল। বালামের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের ধান ও চাল বেচাকেনা হয় এখানে। তবে এই হাটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলেন ‘কুটিয়াল’রা।


ধান কিনে তা প্রক্রিয়াজাত করে চালে রূপান্তরের কারিগরদের স্থানীয় ভাষায় কুটিয়াল বলা হয়। নৌকায় ধান কিনে প্রথমে তা পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর ভোরে বিশাল আকৃতির চুলায় বিশেষ পাত্রে সেই ধান সেদ্ধ করা হয়। 


এরপর দুই-তিন দিন কড়া রোদে উঠানে শুকিয়ে চালকলে ভাঙানোর পর মেলে সেই কাঙ্ক্ষিত ঝরঝরে চাল। একসময় বানারীপাড়ার ঘরে ঘরে কুটিয়ালদের ব্যস্ততা ছিল, যা আজ অনেকটাই ম্রিয়মাণ।


বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে নদীপথে ব্যবসায়ীরা ছুটে আসেন এই হাটে। বরগুনার ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন যেমন এক নৌকা ধান নিয়ে এসেছেন। তাঁর মতে, এখানে ধানের ন্যায্য দাম পাওয়া যায়, আবার ফেরার পথে তুলনামূলক কম দামে ভালো মানের চালও কিনে নেওয়া যায়। যাতায়াতে সময় ও দূরত্ব বেশি হলেও নদীপথে পণ্য পরিবহনের সুবিধা এবং ব্যবসায়িক বিশ্বস্ততার কারণে তিনি দশকের পর দশক ধরে এই হাটে আসেন।


আগে যেখানে পালতোলা নৌকার আধিক্য ছিল, এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে যন্ত্রচালিত ট্রলার বা ইঞ্জিন নৌকা। তবে নদীর বুকে সারি সারি নৌকায় ধান-চালের পসরা সাজানোর সেই চিরায়ত দৃশ্যটি বদলায়নি।


বানারীপাড়ার এই মূল হাট বসে সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার। তবে আগের দিনের হাটের রেশ ধরে রবি ও বুধবারও কিছুটা বেচাকেনা চলে, যাকে স্থানীয়রা বলেন ‘গালার হাট’। হাটের দিনগুলোয় পাইকার, কুটিয়াল আর শ্রমিকদের দম ফেলার ফুরসত থাকে না। এত ব্যস্ততার মধ্যেও রয়েছে এক অন্য রকম প্রশান্তি।

বিষয় :


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : মঙ্গলবার ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ১২:৪৩ পিএম

বিসিএসসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার লিখিত ধাপ পেরিয়ে ভাইভায় পৌঁছানো একটি বড় অর্জন। তবে ভাইভায় ভালো করার জন্য শুধু সাধারণ জ্ঞান ও সাম্প্রতিক ঘটনা জানলেই হবে না। প্রার্থীর একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড, বিষয়ভিত্তিক মৌলিক জ্ঞান, বিশ্লেষণক্ষমতা, ব্যক্তিত্ব এবং নিজের পড়াশোনাকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভাইভার আগে একাডেমিক প্রস্তুতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।


প্রথমেই নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রতিটি স্তর সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিতে হবে। কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েছেন, কোন বিষয়ে পড়েছেন, কেন সেই বিষয়টি বেছে নিয়েছেন, বিষয়টির গুরুত্বপূর্ণ শাখা কী এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রে এর ব্যবহার কী– এসব প্রশ্নের উত্তর অনুশীলন করা প্রয়োজন। নিজের সিভি বা আবেদনপত্রে দেওয়া প্রতিটি তথ্য সম্পর্কে প্রস্তুত থাকতে হবে। কোনো তথ্য উল্লেখ করে থাকলে সেখান থেকেই প্রশ্ন আসতে পারে। নিচের বিষয়গুলোকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।


> নিজের পরিচয় ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে। নিজের নাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভাগ, বিষয়, শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং কেন নির্দিষ্ট বিষয়টি বেছে নিয়েছেন– এসব প্রশ্নের উত্তর সাবলীলভাবে দিতে পারতে হবে।


> নিজের একাডেমিক বিষয়ের মৌলিক ধারণাগুলো ভালোভাবে ঝালিয়ে নিতে হবে। সংজ্ঞা, গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব, সূত্র, পরিভাষা, ধারণা ও ব্যবহারিক প্রয়োগ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। শুধু মুখস্থ নয়, কোনো বিষয় কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবে কোথায় এর প্রয়োগ রয়েছে, সেটিও বুঝতে হবে।


> নিজের বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কোর্সগুলো পুনরালোচনা করতে হবে। বিশেষ করে যেসব বিষয় স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়েছেন, সেগুলোর মৌলিক অধ্যায় ও গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলো আবার পড়া প্রয়োজন।


> একাডেমিক ফলাফল নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে। কোনো বিষয়ে ভালো বা খারাপ ফলাফলের কারণ, প্রিয় বিষয়, কঠিন বিষয় এবং নিজের একাডেমিক শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে যুক্তিসংগত উত্তর অনুশীলন করা উচিত।


> থিসিস, গবেষণা, প্রজেক্ট বা ইন্টার্নশিপ করে থাকলে সেগুলো ভালোভাবে ঝালিয়ে নিতে হবে। গবেষণার বিষয়, উদ্দেশ্য, পদ্ধতি, ফলাফল এবং বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে প্রশ্ন আসতে পারে।


> নিজের একাডেমিক বিষয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতার সম্পর্ক বুঝতে হবে। নিজের বিষয়ের জ্ঞান কীভাবে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রযুক্তি, পরিবেশ বা প্রশাসনে কাজে লাগতে পারে, তা নিয়ে চিন্তা করা দরকার।


> বাংলাদেশের সংবিধান, মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে মৌলিক ধারণা রাখতে হবে।


> নিজ জেলা সম্পর্কে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, অর্থনীতি, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, নদনদী, শিল্প ও উল্লেখযোগ্য স্থাপনা সম্পর্কে প্রশ্ন আসতে পারে।


> সাম্প্রতিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি নিয়মিত পড়তে হবে। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, প্রযুক্তি, পরিবেশ ও সামাজিক ঘটনাগুলোর কারণ ও প্রভাব বোঝার চেষ্টা করতে হবে।


> নিজের ক্যারিয়ার পরিকল্পনা পরিষ্কার রাখতে হবে। কেন সরকারি চাকরি করতে চান, কেন বিসিএস বেছে নিয়েছেন এবং পছন্দের ক্যাডার সম্পর্কে আপনার ধারণা কী—এসব প্রশ্নের উত্তর অনুশীলন করা প্রয়োজন।


> পরিস্থিতিভিত্তিক প্রশ্নের অনুশীলন করতে হবে। একজন কর্মকর্তা হিসেবে কোনো সমস্যা দেখা দিলে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন, কীভাবে জনগণের সঙ্গে কাজ করবেন বা সংকট মোকাবিলা করবেন—এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর যুক্তি দিয়ে দেওয়ার অভ্যাস করতে হবে।


> বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় নিজের পরিচয় এবং একাডেমিক বিষয় সহজভাবে ব্যাখ্যা করার অনুশীলন করা ভালো।


> প্রতিদিন কিছু সময় মক ভাইভা দিতে হবে। শিক্ষক, বন্ধু বা অভিজ্ঞ ব্যক্তির সামনে বসে প্রশ্নের উত্তর দিলে ভয় ও জড়তা কমবে।

 

> শরীরী ভাষা ও আচরণের দিকে নজর দিতে হবে। চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা, স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসা, প্রশ্ন মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সংক্ষিপ্ত ও পরিষ্কার উত্তর দেওয়ার অভ্যাস করতে হবে।


> উত্তর জানা না থাকলে কীভাবে তা সামলাতে হবে, সেটিও অনুশীলন করতে হবে। ভুল তথ্য দেওয়ার চেয়ে বিনয়ের সঙ্গে না জানার বিষয়টি স্বীকার করা বেশি গ্রহণযোগ্য।


সবশেষে মনে রাখতে হবে, ভাইভায় বোর্ড সাধারণত শুধু কত কিছু মুখস্থ আছে তা জানতে চায় না; বরং প্রার্থী নিজের জ্ঞান কতটা বুঝেছেন এবং সেই জ্ঞান বাস্তব পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রয়োগ করতে পারেন, সেটিও দেখতে চায়। তাই ভাইভার আগে একাডেমিক বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পুনরালোচনা, নিজের গবেষণা বা প্রজেক্ট ঝালিয়ে নেওয়া, সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং মক ভাইভার মাধ্যমে দুর্বলতা চিহ্নিত করাই হতে পারে প্রস্তুতির সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।


জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

  • প্রকাশ : শুক্রবার ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ১:০৮ এএম

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এক চির অমলিন ধূমকেতুর নাম। তাঁর জীবনের পুরো গল্পটাই দারুণ সব ঘটনার নাটকে ভরা। বিশেষ করে ময়মনসিংহের ত্রিশালের সময়টার কথা যদি ধরা হয়, তবে সেখানে রয়েছে এক অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর ইতিহাস।

কীভাবে এক কিশোর সাধারণ একটি রুটির দোকান থেকে হুট করে এসে হাজির হলেন ত্রিশালে, আর কীভাবে নিজের আত্মসম্মানের জন্য এক কাপড়ে হঠাৎ হারিয়ে গেলেন এই পুরো ঘটনাটি এক অনন্য আখ্যান। ত্রিশালের বুকে কবির আগমন, শৈশবের দিনগুলো এবং সেখান থেকে চলে যাওয়ার পুরো বিবরণী তুলে ধরছেন ইকবাল মাহমুদ। 

অভিমানী দুখু মিয়া: রুটির দোকান থেকে হঠাৎ ত্রিশালে

ঘটনার শুরু ১৯১৪ সালের দিকে। ভারতে তখন ব্রিটিশদের শাসন চলছে। পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে এক রুটির দোকানে কাজ করতেন কিশোর নজরুল। অভাবের কারণে পড়ালেখা ছেড়ে খুব ছোট বয়সেই পেটের টানে তাঁকেই নামতে হয়েছিল কাজে। বাড়ির সবাই তাঁহাকে ডাকত 'দুখু মিয়া' বলে। একদিন মায়ের কথা খুব মনে পড়ায় রুটির দোকানের মালিকের কাছ থেকে এক দিনের ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়ি গেলেন কিশোর দুখু। কিন্তু মায়ের আদর-ভালোবাসায় কাটা সময় এত দ্রুত চলে গেল যে, এক দিনের জায়গায় কাটিয়ে দিলেন তিন দিন! তিন দিন পর যখন দোকানে ফিরলেন, তখন দোকানের মালিক তাঁকে ভীষণ বকাঝকা করলেন। মালিক একপ্রকার ধমক দিয়েই বললেন,

"এক দিনের কথা বলে তিন দিন কাটিয়ে এলে? এভাবে চললে কাজ করার দরকার নেই, কেটে পড়ো!"

ছোটবেলা থেকেই নজরুলের আত্মসম্মানবোধ ছিল মারাত্মক রকমের বেশি। এই কড়া কথা শোনার পর তিনি এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। রাত তখন ৯টা বাজে। পরনের জামাকাপড় নিয়েই সোজা বেরিয়ে এলেন রাস্তায়। সে রাতে কোথায় যাবেন? হঠাৎ আশ্রয় মিলল কাজী রফিজউল্লাহ নামের এক পুলিশ দারোগার বাড়ির বারান্দায়।

শেষরাতে দারোগা রফিজউল্লাহ যখন ঘর থেকে বের হলেন, তখন বারান্দায় কোণে বসে থাকা চঞ্চল কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত বালকটিকে দেখলেন। নজরুল তাঁর নিজের দুঃখের কথা ও দূরবস্থার গল্প সব খুলে বললেন। দারোগা সাহেব নজরুলের কথা বলার ধরন ও তাঁর প্রতিভা দেখে খুব মায়ায় পড়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন, এই ছেলে তো সাধারণ কোনো ছেলে নয়, একে পড়ালেখা করানো দরকার। ব্যস, তিনি বালক নজরুলকে নিজের সঙ্গে নিয়ে সোজা চলে এলেন নিজের জন্মভূমি ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার কাজীর শিমলা গ্রামে।

ত্রিশালের নতুন জীবন ও দরিরামপুর স্কুল

ত্রিশালে নিয়ে এসে দারোগা সাহেব প্রথমে ভেবেছিলেন কবিকে কাজের তদারকিতে রাখবেন। কিন্তু বাড়ির লোকেরা নজরুলের পড়ালেখার প্রতি টান দেখে অবাক হন। দারোগা সাহেবের মা বললেন, "এ তো কাজ করার ছেলে নয়, এ যে সারাদিন বই নিয়ে মেতে থাকে!"

এরপর নজরুলকে স্কুলে ভর্তি করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯১৪ সালের জুন মাসের দিকে নজরুলকে ত্রিশালের নামকরা 'দরিরামপুর ইংলিশ হাই স্কুলে' সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়।

কাজীর শিমলা গ্রামে যেখানে নজরুল থাকতেন, সেখান থেকে স্কুলের দূরত্ব ছিল প্রায় ১০ থেকে ১১ কিলোমিটার! প্রতিদিন এত দূরের পথ হেঁটে স্কুলে আসা- যাওয়া করা ছিল খুবই কষ্টের কাজ। তাই কিছুদিন পর স্কুলের কাছেই 'নামাপাড়া' গ্রামের এক সচ্ছল কৃষক বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়িতে নজরুলের থাকার ব্যবস্থা (জায়গির) করা হয়। সেখানে থেকে কবি নিয়মিত স্কুলে যাতায়াত শুরু করলেন।

ত্রিশালের প্রকৃতি, সুতিয়া নদীর পাড়, আর সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় কবি খুব দ্রুত মিশে গেলেন। এই ত্রিশালেই কবি জীবনের প্রথম বাংলাদেশের মাটি ও এখানকার সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে চেনার ও ভালোবাসার সুযোগ পেয়েছিলেন।

লোকমুখে জমে থাকা নজরুলের শৈশবের দারুণ সব গল্প

ত্রিশালে কাটানো সময়টাকে কেন্দ্র করে সেখানকার মানুষের মুখে মুখে আজ পর্যন্ত অনেক মজার মজার গল্প প্রচলিত রয়েছে। এসব গল্প সত্য নাকি কেবলই রটনাতা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন হলেও ত্রিশালবাসী আজও নজরুলকে মনে রাখতে এই কিংবদন্তিগুলো মনে প্রাণে ধরে রেখেছে

লুকিয়ে যাত্রাপালা দেখা ও গোয়ালঘরের চোর: কিশোর নজরুলের যাত্রাপালা আর গানবাজনার প্রতি ছিল প্রচণ্ড ঝোঁক। রাতে বাড়ির লোক ঘুমিয়ে পড়লে তিনি লুকিয়ে দূরের গ্রামে চলে যেতেন যাত্রা দেখতে। সেখান থেকে ফিরতে ফিরতে ভোররাত ৩টা বা ৪টা বেজে যেত। একদিন ভোররাতে ফিরে দেখলেন বাড়ির দরজা বন্ধ। ধরা পড়ার ভয়ে বুদ্ধিমান নজরুল সোজা গোয়ালঘরে গিয়ে গরুর দড়ি ছেড়ে দিয়ে চেঁচাতে শুরু করলেন "চোর! চোর! চোর গরু নিয়ে পালাচ্ছে!" ঘরের লোকজন হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলো এবং গরুগুলোকে তাড়িয়ে আনলো। চোর না পেলেও গৃহকর্তা নজরুলের ওপর খুশি হলেন যে নজরুল সময়ে চেঁচিয়ে না উঠলে গরুগুলো চুরি হয়ে যেত! কবিকে আদর করে বললেন, "তোর খিদে লেগেছে, যা ভাত খেয়ে নে!" এতে যেমন রাতে পেট পুরে ভাত জুটলো, তেমনি যাত্রাপালা দেখে আসার অপরাধ থেকেও তিনি বেঁচে গেলেন!

বাঁদরে খেল পাকা কলা: একদিন জায়গিরবাড়ির গৃহকর্ত্রী নজরুলকে বললেন গাছে উঠে পাকা কলাগুলো কেটে নিয়ে আসতে। নজরুল গাছে উঠলেন। গাছে উঠে তাঁর এতই খিদে পেল যে তিনি সবকটি পাকা কলা নিজেই পেট পুরে খেয়ে ফেললেন! এরপর কেবল কাঁচা কলার কাঁদিটি নিচে নামিয়ে গম্ভীর মুখে এসে কাকিমাকে বললেন, "কাকিমা, গাছে কোনো পাকা কলা নেই, সব পাকা কলা তো বাঁদরে খেয়ে ফেলেছে!"

নদী পারের আড়বাঁশি ও গানের আড্ডা: স্কুলের পড়া ফাঁকি দেওয়া কিংবা বন্ধুদের সাথে অভিমান হলে নজরুল সোজা চলে যেতেন সুতিয়া নদীর তীরে শুকনি বিলের পাশের বটগাছটার নিচে। সেখানে নিজের সঙ্গে রাখা একটা আড়বাঁশি বাজাতেন। বাঁশির মিষ্টি সুরে মুগ্ধ হয়ে কাজ ফেলে ছুটে আসতো নদীর পাড়ের রাখাল আর কৃষকেরা। নজরুল মাঝেমধ্যে কবিগানের লড়াই করতেন, আবার কখনো লোকনাটক তৈরি করে তাতে অভিনয়ও করতেন।

ফারসি পরীক্ষায় ৯৮ নম্বর ও অপ্রত্যাশিত এক বিতর্ক

ত্রিশালে থাকতে থাকতেই নজরুল নিয়মিত স্কুলে পড়ালেখা করে সপ্তম শ্রেণি পার হয়ে অষ্টম শ্রেণিতে উঠলেন। তিনি ক্লাসের পড়ালেখায় খুব ভালো ছিলেন, বিশেষ করে ফারসি ভাষায় কবির দক্ষতা ছিল অসাধারণ। অষ্টম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় নজরুল ফারসি বিষয়ে ১০০ নম্বরের মধ্যে পান ৯৮ নম্বর! কিন্তু গোল বাধল অন্য জায়গায়। ওই বছর স্কুলের বেশিরভাগ ছেলেই ফারসি পরীক্ষায় ফেল করেছিল।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিপিনচন্দ্র চক্রবর্তী এবং ফারসি শিক্ষক মৌলভি জহুরুল হক ভেবে দেখলেন, এত ছেলে ফেল করলে তো স্কুলের সুনাম থাকবে না। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সবাইকে 'গ্রেস' বা বোনাস ৫ নম্বর করে বাড়িয়ে দিয়ে পাশ করিয়ে দেবেন।

এই সিদ্ধান্তের কথা শোনামাত্রই ক্লাসের ফার্স্ট বয় নজরুলের মনে খটকা লাগল। তিনি সোজা গিয়ে হাজির হলেন হেডমাস্টার সাহেবের কক্ষে।

নজরুল গিয়ে অত্যন্ত শান্ত ও ধীর গলায় শিক্ষকদের বললেন, "আপনারা যদি ফেল করা ছাত্রদের পাস করানোর জন্য ৫ নম্বর করে বোনাস দেন, তবে আমাকেও ৫ নম্বর বাড়িয়ে ১০৩ করতে হবে!" শিক্ষকেরা তো শুনে অবাক! প্রধান শিক্ষক বললেন, "তুমি তো এমনিতেই ৯৮ পেয়ে ফার্স্ট হয়েছ! ৯৮ পাওয়া ছাত্রকে কেন আবার ৫ নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া হবে?" নজরুল তাঁর যুক্তিতে অনড় রইলেন। তিনি বললেন, "আইন ও নিয়ম সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। সমবিচারের স্বার্থে বাড়ালে সবারই বাড়ানো উচিত!"

খাস ইংরেজিতে কড়া জবাব ও এক কাপড়ে ত্রিশাল ত্যাগ

শিক্ষকেরা নজরুলের এমন অদ্ভুত দাবি মেনে নিতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে প্রধান শিক্ষক ইংরেজি ভাষায় কথা বলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়া কিশোর নজরুলকে ভয় দেখিয়ে দমানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু নজরুল কি ভয় পাওয়ার পাত্র? তিনি এক চুলও পিছু না হেটে, হেডমাস্টার সাহেবের সবকটি কথার জবাব টানা ১৫ মিনিট ধরে ঝরঝরে ও খাস ইংরেজিতে দিতে শুরু করলেন! অষ্টম শ্রেণির একটি ছেলে কীভাবে একজন অভিজ্ঞ প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে ইংরেজিতে এমন কঠিন তর্ক করতে পারে, তা দেখে স্কুলের অন্যান্য শিক্ষকেরা পুরো হতবাক ও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে রইলেন! তর্কে না পেরে প্রধান শিক্ষক রেগে গেলেন। তখন স্বাভিমানী নজরুল সোজা বলে উঠলেন, "যে স্কুলে ন্যায়বিচার নেই, যে স্কুলে সমান নিয়ম মানা হয় না, নজরুল ইসলাম আর সেই স্কুলে পড়ে না! আপনারা আমাকে স্কুল সার্টিফিকেট না দিলেও আমার কিছুই যায় আসে না!"

এই কথা বলামাত্রই কবি স্কুল কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি এতটাই ক্ষুব্ধ ও অপমানিত বোধ করেছিলেন যে, ব্যাগ গোছানো কিংবা বই-খাতা নেওয়ার জন্য জায়গিরবাড়িতেও আর ফেরত যাননি। গায়ের পরনে যে জামাকাপড়টুকু ছিল, সেই এক কাপড়ে ত্রিশালের পথ ধরে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন!

ইতিহাসের অমলিন স্মৃতির অধ্যায়

১৯১৫ সালের শেষের দিকে নজরুল চিরতরে ত্রিশাল ছাড়েন। ত্রিশাল থেকে বিদায় নিয়ে তিনি আবার পশ্চিমবঙ্গে ফিরে যান এবং সেখানে রাণীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ হাই স্কুলে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করেন। কাজী নজরুল ইসলাম ত্রিশালে ছিলেন মাত্র দেড় বছরের মতো। এই সামান্য সময়ের আসা-যাওয়া কিন্তু ত্রিশালের মানুষকে এক চিরন্তন স্মৃতি উপহার দিয়ে গেছে। নজরুল ত্রিশাল ছেড়ে চলে গেলেও, ত্রিশালের মানুষ আজও কবিকে ভুলে যায়নি। আজও সুতিয়া নদীর তীর, দরিরামপুরের বটতলা আর কাজীর শিমলা গ্রামে বাতাসে যেন সেই বাঁশি বাজানো চঞ্চল দুখু মিয়ারই স্মৃতি ভেসে বেড়ায়। কিশোর নজরুলের এই হঠাৎ আগমন আর নিজের আত্মসম্মানের টানে হঠাৎ প্রস্থান বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের এক অপরূপ ও অদ্ভুত সুন্দর সত্যি গল্প হয়ে রয়।

ইকবাল মাহমুদ 
শিক্ষার্থী, ফিল্ম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : বুধবার ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ১০:২৭ এএম

অধিকাংশ মায়ের অভিযোগ তাদের সন্তান খায় না, রুচি নেই। এ জন্য তারা তাদের ছোট শিশুকে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। ফলে একপর্যায়ে দেখা যায় সন্তানকে সারাদিন খাবার না দিলেও তার ক্ষুধা লাগে না। 


সন্তানকে খাওয়ানোর সময় দুটি জিনিস মনে রাখতে হবে। তার আসলে ক্ষুধা লেগেছে কিনা এবং খাবারের নির্দিষ্ট সময় মেনে চলছেন কিনা। ক্ষুধা না লাগলে সন্তান খাবে না। কাজেই আগের খাবারটা হজম হওয়ার সময় দিতে হবে। অনেক মা শিশুকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় এটা-সেটা খাইয়ে ক্ষুধা নষ্ট করেন। আবার ভাত খাওয়ার সময় কলা, কলা খাওয়ানোর সময় ভাত নিয়ে বসেন। আবার পেট ভরে গেলেও পুরোটা খাওয়ানোর জন্য তাড়াহুড়া করেন। 


এতে যে যে সমস্যা হয় 


১. শিশু খেতে না পেরে বমি করতে পারে, হজম না হয়ে পাতলা পায়খানা হতে পারে। 


২. জোর করায় খাবার গলায় আটকে শ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফুসফুসে গিয়ে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। এমনকি ফুসফুসে ঘা বা নিউমোনিয়া হতে পারে। 


৩. সন্তানের খাবারে ভীতি জন্মাতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে তীব্র ক্ষুধামান্দ্য হতে পারে। 


৪. খাবারে ভীতি জন্মানোর ফলে না খেয়ে পুষ্টিহীনতায় ভুগতে পারে। 


৫. অনেক সময় খাদ্যভীতি জন্মানোর ফলে সন্তানের স্বাভাবিক ক্ষুধা নষ্ট হয়। শিশু মানসিকভাবে এতটা অসুস্থ হয়ে পড়ে যে খাবার দেখতে, খাবার তৈরি করার আওয়াজ বা গন্ধ পেলে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, বমি করা শুরু করে। এতে শিশু মায়ের প্রতি বিরূপ আচরণও করতে পারে, অবিশ্বাস থেকে সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দিতে পারে। 


৬. জোর করে খাওয়াতে থাকলে শিশু অস্বাভাবিক রকম খুঁতখুঁতে হয়ে যেতে পারে, বেছে বেছে খাওয়ার ফলে নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে অস্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের কারণে অতিরিক্ত স্থূলতার সমস্যায়ও পড়তে পারে। তাই শিশুকে জোর করে খাওয়ানোর বদলে খাবার খাওয়ার পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য নিয়ে আসুন। যেমন তাকে খাবার হজমের জন্য সময় দিন, দুই খাবারের মধ্যে পর্যাপ্ত সময়ের ব্যবধান রাখুন, খাবার দেওয়ার একটা নির্দিষ্ট সময় ও জায়গা নির্বাচন করুন, একসঙ্গে বেশি খাবার না খেতে চাইলে অল্প অল্প করে খাবার দিন। 


পুরো বাটির খাবার শেষ না করা পর্যন্ত মায়েরা থামতে চান না। কখন থামতে হবে তা অভিভাবককে বুঝতে হবে। শিশু মুখ না খুললে, মাথা সরিয়ে নিলে, বমিভাব করলে খাবার দেওয়া বন্ধ করুন। কম খেলে চেষ্টা করুন যতটুকু খাবার খায় তা যেন পুষ্টিকর হয়। এক চামচ খেলে ওই এক চামচে যেন যথেষ্ট পরিমাণ প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল, কার্ব ও ফ্যাট থাকে সেটি নিশ্চিত করুন।  


শিশুকে জোর করে খাওয়ালে হয়তো আপনি সাময়িকভাবে তার পেট ভরাতে পারবেন, এতে আপনার মানসিক শান্তি মিলবে। সময়ের সঙ্গে এটি বুমেরাং হয়ে আপনাকে বিপদে ফেলবে। আপনার সন্তান সত্যি সত্যিই ‘কিছুই খায় না’ রোগ বাঁধিয়ে শারীরিক ও মানসিক অশান্তির কারণ ঘটাবে।

বিষয় : শিশু


  • প্রকাশ : শনিবার ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ১০:১১ এএম

মাহবুবের বয়স ২৫ বছর। মাঝে মধ্যে তাঁর বুক ধরফর করা শুরু হয়। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় হাত-পা অবশ হয়ে আসা, বুকে ব্যথা করা। ক্রমশ তাঁর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। মনে হয় এখনই মরে যাবেন। এই ধরনের রোগীরা একটার পর একটা ইসিজি আর ইকোকার্ডিওগ্রাম করতে করতে তাঁর চিকিৎসা ফাইল অনেক বড় করে ফেলেন। চিকিৎসকও বদলাতে থাকেন, তাঁর রোগ ধরতে পারছেন না বিধায়। এর মধ্যে রোগীর গায়ে কিন্তু বড় অসুখের সিল পড়ে গেছে। আত্মীয়স্বজনরা বলতে থাকেন ওকে কোনো বড় কাজে দিও না। ওর বড় জটিল অসুখ। আসলে এটি একটি টেনশন বা অস্থিরতা গ্রুপের রোগ; যাকে আমরা প্যানিক ডিজঅর্ডার বলে থাকি। 


কীভাবে বুঝবেন যে প্যানিক ডিজঅর্ডার রোগে ভুগছেন


> হঠাৎ করে বুক ধরফর করা, শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়া, মাথা ঝিমঝিম করা । 

  

> দম বন্ধ হয়ে আসা, বড় বড় করে হাঁপানি রোগীর মতো শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া। 


>হাত-পা অবশ হয়ে আসা। শরীরে কাঁপুনি হওয়া। 


>বুকের মধ্যে চাপ লাগা এবং ব্যথা অনুভব করা। 


>এমনও দেখা গেছে, কোনো কোনো রোগী বলেন, হঠাৎ পেটের মধ্যে একটা মোচর দেয় তারপর ওপর দিকে উঠে বুক ধরফর শুরু হয় সঙ্গে সঙ্গে হাত-পা অবশ হয়ে যায়। আর কথা বলতে পারেন না। 


> বমি বমি ভাব লাগে। পেটের মধ্যে অস্বস্তি বোধ লাগা ও গলা শুকিয়ে আসা। 


> পেটের মধ্যে গ্যাস ওঠে, খালি গ্যাস ওঠে এবং বুকে চাপ দেয়।


> দুশ্চিন্তা থেকেও মাথাব্যথা হতে পারে।  কোনো কোনো রোগী বুকে ব্যথা ও হাত-পায়ের ঝিমঝিমকে হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ মনে করে প্রায়ই ছুটে যান হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে চিকিৎসক দেখাতে।


> মৃত্যু ভয় দেখা দেওয়া। মনে হয় যেন এখনই মরে যাবেন রোগ যন্ত্রণায়। 


> নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা। 


> বারবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া / ইসিজি করা। 


>  দূরে কোথাও গেলে স্বজনদের কাউকে সঙ্গে নিয়ে যান, যেন মাঝখানে অসুস্থ হলে ধরতে পারেন। 


> নামাজ পড়তে গেলে একপাশে দাঁড়ান, যেন অসুস্থ হলে তাড়াতাড়ি বের হতে পারেন। 


> রোগীর মধ্যে ভয় কাজ করে এই বুঝি আবার একটি অ্যাটাক হতে পারে।


> লক্ষণগুলো হঠাৎ করে শুরু হয়। ১০ থেকে ২০ মিনিট পরে কমে যায়।


> সেফটি বিহেভিয়ার, যেমন অ্যাটাকের সময় বসে পড়া, কোনো কিছু হাত দিয়ে ধরে সাপোর্ট নেওয়া ইত্যাদি লক্ষণ রোগীর মাঝে দেখা দেয়; যা কিনা হৃদরোগীর মাঝে লক্ষণীয় নয়।


রোগীর ভাবনা


> তাঁর হার্টের অসুখ এজন্য বারবার ইসিজি ও ইকোকার্ডিওগ্রাম করে বেড়াচ্ছেন। 


> মাথা ঝিমঝিম করছে। মানে স্ট্রোক করে ফেলবেন।


> হাত-পা অবশ হয়ে আসছে; মনে হয় প্যারালাইসিস হয়ে যাবে। 


> যে কোনো সময় মৃত্যু হতে পারে।

 

কী কী পরিণতি হতে পারে


> সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না করালে, এ ধরনের রোগী চিকিৎসকের দ্বারে দ্বারে ঘুরে সর্বস্বান্ত হন এবং সব শেষে নিজে একজন হার্টের রোগী বলে কাজকর্ম ছেড়ে দেন।


> বিষণ্নতায় ভুগতে পারেন। 


> নেশায় জড়িয়ে যেতে পারেন। 


> এগোরেফোবিয়া নামক আরও একটি সমস্যার উদ্ভব হতে পারে। তখন রোগী বাইরে বের হতে, হাটবাজার, রেস্টুরেন্ট, ক্যান্টিন ইত্যাদি জায়গায় যেতেও ভয় পান।


> গুমের সমস্যা হতে পারে। 


> আত্মহত্যার চিন্তা মাথায় আসতে পারে। 


> সর্বোপরি এই মানুষটি আর সমস্যার কারণে পরিবার, সমাজ ও জাতির বোঝা হয়ে যেতে  পারেন। 


চিকিৎসা:


> নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানো। 


> রোগীকে আশ্বাস দেওয়া। নির্দিষ্ট সময়ান্তে মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া।


সঠিক সময়ে সাইকিয়াট্রিস্টের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত চিকিৎসা নিলে এসব রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান।


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ২৯ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ১০:৩৫ এএম

টেবিলে দারুণ সুন্দর একটা কেক রাখা। হঠাৎ ঘরময় অন্ধকার হয়ে গেল। কেকের ওপর মোমবাতিতে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। তুমি গাল ফুলিয়ে ফুঁউউউ দিয়ে সেই আগুন নেভালে। তারপর সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ’।


একটু লজিক দিয়ে চিন্তা করলে পুরো ব্যাপারটা চরম হাস্যকর ও অদ্ভুত মনে হয় না? একটা দারুণ সুস্বাদু খাবারের ওপর আমরা আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছি, আবার পরক্ষণেই নিজের মুখের বাতাস দিয়ে সেটা নেভানোর চেষ্টা করছি। কেন এমন অদ্ভুত কাজ করছি আমরা? হয়তো বলবে, ছোটবেলা থেকেই তো এভাবে করে আসছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আজব প্রথা কে শুরু করেছিল? খাবার জিনিসের ওপর আগুন দিয়ে এই খেলা দেখানোর আইডিয়াটাই কার মাথা থেকে এসেছিল? এর পেছনে নিশ্চয়ই সেই ব্যক্তির কোনো যুক্তি ছিল। কী সেই যুক্তি?


মজার ব্যাপার হলো, এর একটা নিখুঁত ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা আছে। এই মোমবাতি নেভানোর প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাচীন দেব-দেবী, জার্মান শিশুদের উৎসব, সুইস ফোকলোর জার্নাল এবং মিকি মাউস! চলো, তোমাকে সঙ্গে নিয়েই আজ এই অদ্ভুত ইতিহাসের রহস্যটা ভেদ করা যাক।


জন্মদিনের কেকে কি সব সময় মোমবাতি থাকত


এককথায় উত্তর হলো, না। ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ের আগে জন্মদিনের কেকে মোমবাতির কোনো অস্তিত্বই ছিল না। ব্যাপারটা একটু অবাক করার মতো। কারণ, মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে ধর্মীয় বা দরকারি কাজে মোমবাতি জ্বালিয়ে আসছে। কিন্তু এতগুলো বছর ধরে কারও মাথাতেই আসেনি যে এই মোমবাতিটাকে তুলে নিয়ে কেকের ওপর গুঁজে দেওয়া যায়!


তাহলে কেক আর মোমবাতি আসার আগে মানুষ জন্মদিন কীভাবে উদ্‌যাপন করত? ইতিহাসের বেশির ভাগ সময়জুড়ে জন্মদিন পালনের ব্যাপারটা কোনো পার্টির মতো ছিল না, বরং এটি ছিল অনেকটা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মতো। যেমন ধরো, প্রাচীন রোমানরা অভিজাতদের জন্য রীতিমতো জন্মদিনের আয়োজন করত ঠিকই, কিন্তু সেখানে কোনো হইহুল্লোড় হতো না। সেই আয়োজন ছিল মূলত একজন মানুষের রক্ষাকারী আত্মার প্রতি উৎসর্গ। রোমানদের বিশ্বাস ছিল, এই আত্মা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের ছায়ার মতো পাশে থাকে। অর্থাৎ সেখানে কোনো হ্যাপি বার্থডে গান ছিল না, ছিল শুধুই প্রার্থনা।


মোমবাতির ইতিহাস


প্রাচীনকালের ওই প্রার্থনা থেকে আজকের দিনের এই কেক-মোমবাতি পর্যন্ত আসার রাস্তাটা বুঝতে হলে তোমাকে একদম পুরোনো একটা ধারণায় ফিরে যেতে হবে। প্রাচীন মানুষের কাছে আগুন মানেই ছিল পবিত্র কিছু, দেবতার রূপ!


বেদান্ত আমল থেকে শুরু করে পারস্য, গ্রিস এবং রোম—সব প্রাচীন সংস্কৃতিতেই আগুনকে পবিত্র কিছু হিসেবে মানা হতো। মানুষ যখন সুরেলা গলায় কেক কাটার গান গাইতে শেখেনি, তারও বহু আগে থেকে তারা নিজেদের প্রার্থনালয়ে পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে আগুন ব্যবহার করত।


জন্মদিনের মোমবাতি নিয়ে ইন্টারনেটে বা অনেক বইয়ে তুমি খুব জনপ্রিয় একটা গল্প পাবে। বলা হয়, প্রাচীন গ্রিসে চাঁদের দেবী আর্টেমিসকে উৎসর্গ করে একধরনের চিজকেক (যাতে মধু আর ময়দা থাকত) বানানো হতো। চাঁদের আলোর মতো বোঝাতে সেই কেকের ওপর মশাল বা ছোট আগুন জ্বেলে দেওয়া হতো। গল্পটা শুনতে দারুণ। কিন্তু সমস্যা হলো, এই ‘মুন কেক’-এর সঙ্গে আমাদের আধুনিক জন্মদিনের মোমবাতির কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ইতিহাসবিদদের মতে, এটা পুরোটাই একটা লোককথা বা মিথ।


খ্রিষ্টধর্মের আগমনে পাল্টে গেল জন্মদিনের ধারণা


গ্রিকদের পর দৃশ্যপটে হাজির হলো শুরুর দিকের খ্রিষ্টানরা। তারা এসে জন্মদিনের উৎসবের একেবারে বারোটা বাজিয়ে দিল! শুরুর দিকের চার্চের নেতারা জন্মদিন পালন করার ঘোরবিরোধী ছিলেন। তাঁদের মতে, জন্মদিন পালন করাটা চরম স্বার্থপরতা এবং এটা অনেকটা বিধর্মীদের মতো আচরণ। এর বদলে তাঁরা যিশুর ব্যাপটিজম, ইস্টার এবং শহীদদের মৃত্যুর দিন পালন করা শুরু করলেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, মৃত্যুর দিনটিই হলো স্বর্গে ‘জন্ম’নেওয়ার আসল দিন।


তবে মোমবাতি কিন্তু হারিয়ে যায়নি। চার্চের বিভিন্ন পবিত্র মুহূর্তে ঠিকই মোমবাতি জ্বলত। শুধু কেক বেচারা ওই পার্টি থেকে অনেক লম্বা সময়ের জন্য ছিটকে পড়ে।


কেকের ফিরে আসা


মধ্যযুগের শেষের দিকে এসে কেক আবার উৎসবের খাবারে পরিণত হতে শুরু করে। তবে সেটা শুধু বড়লোকদের বাড়িতে। এরপর ১৬০০ শতকের দিকে মানুষ জন্মদিন বা বিয়ের মতো ব্যক্তিগত জীবনের মাইলফলকগুলো উদ্‌যাপন করতে শুরু করে।


এখান থেকেই জার্মানির মঞ্চ প্রস্তুত হলো। ১৬৯১ সালে জোহান ক্রিস্টোফ ওয়াগেনসাইল নামে এক জার্মান পণ্ডিত নুরেমবার্গ শহরের শিশুদের জন্মদিনের কেক নিয়ে প্রথমবারের মতো লেখালেখি করেন। তখনো মোমবাতির দেখা মেলেনি ঠিকই, তবে জন্মদিনের কেকের একেবারে প্রথম লিখিত প্রমাণ এটিই!


তাহলে মোমবাতি নেভানোর চল শুরু হলো কবে


মোমবাতি, কেক আর জন্মদিন—এই তিনের জাদুকরি মিলন ঘটেছিল ১৮ শতকের জার্মানিতে। সেখানে শিশুদের জন্য কিন্ডারফেস্ট নামে একটি উৎসব হতো। পপ কালচার ইতিহাসবিদ মারি নিকোলা বলেন, ‘১৬৯১ থেকে ১৭৪০ সালের মাঝামাঝি কোনো একসময়ে মানুষের লজিক ও প্রতীকী চিন্তার দারুণ এক সংমিশ্রণ ঘটে। কেক তো আগে থেকেই উৎসবের অংশ ছিল, মোমবাতি মানে ছিল পবিত্র জীবন, আর শিশু মানেই হলো দারুণ এক সম্ভাবনা। এই তিন জিনিসকে এক করে দেওয়া হলো।’


বিখ্যাত লেখক জোহান উলফগ্যাং ফন গ্যেটে ১৭৪০-এর দশকে একটি জন্মদিনের কেকের বর্ণনা দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘কেকের চারপাশটা আলো দিয়ে এমনভাবে ঘেরা ছিল, যেন সেটা একটা বেদি বা প্রার্থনার জায়গা!’


কিন্ডারফেস্টের এই উৎসব মূলত শুরু হয়েছিল জার্মানির পায়েটিজম আন্দোলন থেকে। এই প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলনের মূল কথা ছিল, ঘরই হলো মানুষের নৈতিকতা শেখার আসল জায়গা। মোমবাতিগুলো ছিল শিশুর ভেতরের সুন্দর বিকাশের প্রতীক। শিশুর যত বছর বয়স, কেকে ঠিক ততগুলো মোমবাতি বসানো হতো। তার সঙ্গে যোগ করা হতো বাড়তি একটি মোমবাতি, যার মানে হলো ‘আগামী দিনের বেড়ে ওঠা’।


১৮৮১ সাল নাগাদ এই প্রথা সুইজারল্যান্ডে পৌঁছে যায়। সুইস ফোকলোর জার্নালে সে দেশের মধ্যবিত্তদের এই কেক ও মোমবাতি প্রথার কথা রেকর্ড করা হয়। আর সেখানেই প্রথম লেখা হয়, কেক খাওয়ার আগে মোমবাতি ফুঁ দিয়ে নেভানো হতো!


ইচ্ছা পূরণের ব্যাপারটা কোথা থেকে এল


পৃথিবীর বহু প্রাচীন ধর্মে এবং বিশ্বাসে মানুষের মুখের বাতাস বা শ্বাসকে তার আত্মা বা জীবনীশক্তির প্রতীক ধরা হতো। মোমবাতি নেভানোর সময় মনে মনে কোনো ইচ্ছা বা প্রার্থনা করাটা আসলে সেই পুরোনো বিশ্বাসের আধুনিক রূপ। তুমি যখন চোখ বন্ধ করে ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নেভাও, তুমি আসলে শুধু এক টুকরা মোমের আগুন নেভাচ্ছ না; তুমি একটা ছোট্ট, ব্যক্তিগত প্রার্থনা করছ। শুধু চার্চের বদলে সেটা হচ্ছে তোমার ড্রয়িংরুমে, আর সঙ্গে ফ্রি পাচ্ছো দারুণ স্বাদের খাবার!


কীভাবে এটা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল


জার্মানির এই কিন্ডারফেস্ট প্রথাকে আটলান্টিক মহাসাগর পার করে আমেরিকায় নিয়ে এসেছিল জার্মান অভিবাসীরা। ১৮০০ শতকের দিকে ফিলাডেলফিয়া বা মিলওয়াকির মতো শহরের জার্মান ভাষার পত্রিকাগুলোয় কিন্ডারফেস্টের খবর ছাপা হতো।


১৯০০ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে আমেরিকা এবং ব্রিটেনে কেকের ওপর মোমবাতি জ্বালানোটা মধ্যবিত্তদের একটা সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়ে যায়। ১৯২০-এর দশকে বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলো জন্মদিনের বয়স অনুযায়ী বক্সে ভরে মোমবাতি বিক্রি করা শুরু করে।


কিন্তু পুরো দুনিয়াকে এই নিয়মটা পাকাপাকিভাবে কে শেখাল জানো? ১৯৩১ সালে ডিজনির বানানো একটি শর্ট ফিল্ম! সেই ফিল্মে ঠিক আজকের মতো করে একটি জন্মদিনের পার্টি দেখানো হয়েছিল—প্রথমে কেক, তারপর মোমবাতি, তারপর গান, এবং শেষে উইশ করে ফুঁ দেওয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার এই পপ কালচার, মিডিয়া ও সিনেমা পুরো বিশ্বকে এই একই স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করিয়ে দিল।


সবাই কি একই নিয়মে জন্মদিন পালন করে


না, পৃথিবীর সব দেশের মানুষ আমাদের মতো ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নেভায় না! অনেক দেশের নিজস্ব প্রাচীন প্রথা ছিল। কিন্তু ডিজনির কল্যাণে এই জার্মান-আমেরিকান স্টাইলটা এতই জনপ্রিয় হলো যে ১৯৫০-এর দশকে জাপানও এই প্রথা আপন করে নিল।


তবে এখনো অনেক দেশে ভিন্ন নিয়ম আছে। যেমন ঘানাতে জন্মদিনের সকালে মিষ্টি আলুর তৈরি ওতো (oto) নামে একটি খাবার খাওয়া হয়। রুশরা জন্মদিনে কেকের বদলে বিশেষ একধরনের পাই কাটে। আর চীনারা তো কেক বাদ দিয়ে লম্বা আয়ুর আশায় লংজিভিটি নুডলস খায়!


জার্মানিতেও এখনো একটা নিজস্ব পুরোনো স্টাইল টিকে আছে। অনেক জার্মান পরিবার কেকের মোমবাতি সঙ্গে সঙ্গে ফুঁ দিয়ে নেভায় না। তারা কাঠের তৈরি একটা গোলাকার রিংয়ে মোমবাতি বসিয়ে সারা দিন সেটা জ্বালিয়ে রাখে। ১২ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের জন্য তারা এটা করে।


শেষ কথা


তাহলে কী বুঝলে? এরপর যখন ঘর অন্ধকার করে, বন্ধুদের হাততালির মাঝখানে দাঁড়িয়ে কেকের ওপর ফুঁ দেওয়ার জন্য গাল ফোলাবে, তখন মনে রেখো, তুমি শুধু একটা সাধারণ কাজ করছ না। তুমি একটা বিশাল ঐতিহাসিক শেকলের অংশ। প্রাচীন রোমানদের প্রার্থনা, খ্রিষ্টানদের রীতি, জার্মানদের উৎসব আর ডিজনির সিনেমা—সবকিছু পার হয়ে ওই মোমবাতিটা আজ তোমার কেকের ওপর এসে বসেছে।


তাই চোখ বন্ধ করো, মনের সবচেয়ে সুন্দর উইশটা করো। আর হ্যাঁ, একটু সাবধানে ফুঁ দিয়ো, যাতে কেকের ওপর থুথু ছিটে না যায়!

বিষয় : জন্মদিন