মশা
বিশেষজ্ঞদের মতে, রসুন খাওয়া বা ভিটামিন বি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে মশা দূরে থাকে—এমন দাবির পক্ষে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং ডিইইটি, পিকারিডিন বা পিএমডি সমৃদ্ধ রিপেলেন্ট ব্যবহার সবচেয়ে কার্যকর। এর পাশাপাশি লম্বা হাতার পোশাক পরা, শরীরের খোলা অংশ ঢেকে রাখা, মশারি ব্যবহার এবং ঘাম হলে বা কয়েক ঘণ্টা পর রিপেলেন্ট আবার ব্যবহার করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
বিজ্ঞান বলছে, মশা কাকে বেশি কামড়াবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে শরীরের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের ওপর। তবে আপনি মশার প্রিয় লক্ষ্যবস্তু হন বা না হন, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়াসহ মশাবাহিত রোগ থেকে সুরক্ষিত থাকতে সবারই প্রয়োজন সমান সতর্কতা এবং কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
মশা কেন অন্যদের চেয়ে কিছু মানুষকে বেশি কামড়ায়
প্রায় দেখা যায়- একই ঘরে বা একই জায়গায় বসে থাকলেও একজনকে বারবার মশা কামড়াচ্ছে, অথচ পাশের মানুষটিকে কামড়াচ্ছে না। অনেকেই এর কারণ হিসেবে ‘মিষ্টি রক্ত’ এমন কথা বলে থাকেন। বিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি মোটেও তা নয়। মশা অনেক দূর থেকেই মানুষের শরীর থেকে বের হওয়া বিভিন্ন জৈবিক সংকেত শনাক্ত করতে পারে। শ্বাস-প্রশ্বাসে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড, শরীরের তাপ, ত্বকের গন্ধ, ত্বকে থাকা অণুজীব, এমনকি জিনগত বৈশিষ্ট্যও নির্ধারণ করে- মশা কাকে বেশি কামড়াবে। গবেষকদের মতে, একই জায়গায় থাকা চারজনের মধ্যে একজনই কখনও কখনও মোট মশার কামড়ের প্রায় ৯০ শতাংশের শিকার হতে পারেন।
কার্বন ডাই-অক্সাইডই প্রথম সংকেত
মানুষকে কামড়ায় শুধু স্ত্রী মশা। ডিমের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন সংগ্রহ করতেই তারা মানুষের রক্ত পান করে। প্রায় ১০ মিটার দূর থেকেই মশা মানুষের নিঃশ্বাস ও ত্বক থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড শনাক্ত করতে পারে। এই গ্যাসই মশাকে জানিয়ে দেয় কাছাকাছি একটি সম্ভাব্য শিকার রয়েছে। এ কারণেই শিশুদের তুলনায় প্রাপ্তবয়স্কদের মশা বেশি কামড়ায়। কারণ তারা বেশি পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করেন। এমনকি মশা ধরার অনেক ফাঁদেও ড্রাই আইস বা বোতলজাত কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করা হয়। কারণ এটি মশাকে আকৃষ্ট করতে কার্যকর।
শরীরের তাপ ও ঘাম আকৃষ্ট করে
কার্বন ডাই-অক্সাইডের পাশাপাশি শরীরের তাপ ও আর্দ্রতা মশাকে আকৃষ্ট করে। গর্ভবতী নারী এ কারণে অন্যদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেশি মশার কামড়ের শিকার হতে পারেন। গর্ভাবস্থায় শরীরের বিপাকক্রিয়া বেড়ে যাওয়ায় শরীর থেকে বেশি তাপ ও কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। একই কারণে ব্যায়ামের সময় বা ব্যায়ামের পর শরীর গরম ও ঘর্মাক্ত থাকলে মশা বেশি আকৃষ্ট হয়। তুলনামূলক বড় গড়নের মানুষের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। কারণ তাদের শরীর থেকে সাধারণত বেশি তাপ ও কার্বন ডাই-অক্সাইড বের হয়।
ত্বকের গন্ধই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে
মশা যখন মানুষের কাছাকাছি চলে আসে, তখন সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে ত্বকের গন্ধের ওপর। গবেষকদের মতে, মশা এক ধরনের ‘রাসায়নিক জগতে’ বাস করে। মানুষের ত্বক থেকে নির্গত বিভিন্ন উদ্বায়ী জৈব যৌগ তাদের কাছে আলাদা আলাদা সংকেত হিসেবে কাজ করে। ত্বকে থাকা অণুজীব বা স্কিন মাইক্রোবায়োম কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাটি অ্যাসিড ও পেপটাইড ভেঙে এসব রাসায়নিক যৌগ তৈরি করে। মানুষের ত্বকে ৫০০টিরও বেশি ধরনের উদ্বায়ী জৈব যৌগ পাওয়া যায় এবং এগুলোর সমন্বয়ই একজন মানুষের স্বতন্ত্র গন্ধ তৈরি করে।
‘মিষ্টি রক্ত’ নয়, আসল কারণ অন্য
অনেকের ধারণা, যাদের রক্ত মিষ্টি, তাদেরই মশা বেশি কামড়ায়। তবে বিজ্ঞানীরা এই ধারণার কোনো প্রমাণ পাননি। বরং গবেষণায় দেখা গেছে, ত্বকে থাকা অ্যামোনিয়া, ল্যাকটিক অ্যাসিড এবং বিশেষ করে কার্বক্সিলিক অ্যাসিডের মাত্রা বেশি হলে মশার আকর্ষণও বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের রকফেলার ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় ৬৪ জনের ত্বকের গন্ধ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যাদের ত্বকে কার্বক্সিলিক অ্যাসিড বেশি ছিল, মশা তাদেরই সবচেয়ে বেশি বেছে নিয়েছে। একজনের প্রতি মশার আকর্ষণ আরেকজনের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।
এই আকর্ষণ অনেকটাই জিনগত
গবেষকদের মতে, মশার কাছে কারও আকর্ষণীয় হওয়ার বিষয়টি অনেকটাই স্থায়ী এবং জিনগতভাবে নির্ধারিত। যমজদের ওপর চালানো গবেষণায় দেখা গেছে, অভিন্ন যমজদের প্রতি মশার আকর্ষণ প্রায় একই রকম হলেও ভিন্ন যমজদের ক্ষেত্রে তা আলাদা হতে পারে। এ ছাড়া নেদারল্যান্ডসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ত্বকে ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য কম কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি বেশি, তারা ম্যালেরিয়াবাহী মশার কাছে তুলনামূলক বেশি আকর্ষণীয়।
সবার শরীরে প্রতিক্রিয়া এক নয়
মশার কামড় খেলেই যে সবার শরীরে একই ধরনের দাগ বা চুলকানি হবে, তা নয়। কারও শরীরে বড় ফোলা দাগ, তীব্র চুলকানি ও অ্যালার্জির মতো প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, আবার কারও ক্ষেত্রে ছোট একটি লাল দাগ হয় বা কোনো লক্ষণই থাকে না। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু জিন মশার কামড়ের প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। তাই অনেক সময় মনে হতে পারে একজনকে বেশি মশা কামড়াচ্ছে, অথচ বাস্তবে তার শরীরের প্রতিক্রিয়াই বেশি দৃশ্যমান।
ছবি : সংগৃহীত
ঘরের ভেতরে বা অফিসে সুরক্ষিত থেকেও, প্রতিদিন অজান্তে ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে চলেছে, সে বিষয়ে হয়ত অনেকেই সচেতন নয়।
আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে সারাদিন মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, কম্পিউটার কিংবা এলইডি টিভির স্ক্রিনের সামনে বসে থাকার কারণে, সেখান থেকে অনবরত নির্গত হচ্ছে এক ধরনের উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন দৃশ্যমান নীল আলো, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘ব্লু লাইট’ বা ‘হাই এনার্জি ভিজিবল (এইচইভি) লাইট নামে পরিচিত।
চর্মরোগ বিজ্ঞানীদের মতে, এই কৃত্রিম নীল আলো সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির মতোই ত্বকের গভীর স্তর পর্যন্ত প্রবেশ করে অকাল বার্ধক্য এবং পিগমেন্টেশনের মতো দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিসাধন করছে।
স্ক্রিনের নীল আলো যেভাবে ত্বকের ক্ষতি করে
বিজ্ঞান সাময়িকী ‘জার্নাল অফ ইনভেস্টিগেটিভ ডার্মাটোলজি’-তে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, ব্লু লাইট বা নীল আলো ত্বকের গভীরে ঢুকে কোষের ডিএনএ কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের মাউন্ট সিনাই হসপিটালের কসমেটিক ও ক্লিনিক্যাল রিসার্চের পরিচালক ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জোশুয়া জেইচনার স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট হেল্থলাইন ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করেন যে, “নীল আলোর কারণে ত্বকের ভেতরে ‘অক্সিডেটিভ স্ট্রেস’ তৈরি হয়, যা প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকর ফ্রি-র্যাডিক্যাল উৎপন্ন করে। এই ফ্রি-র্যাডিক্যালগুলো ত্বকের টানটান ভাব ধরে রাখা প্রধান দুটি প্রোটিন ‘কোলাজেন’ এবং ‘ইলাস্টিন’ খুব দ্রুত ভেঙে ফেলে।
ফলে বয়স ৩০ পার হওয়ার আগেই মুখে বলিরেখা পড়া, চামড়া ঝুলে যাওয়া এবং এক ধরনের কালচে ছোপ ছোপ দাগ বা ‘ডিজিটাল পিগমেন্টেইশন’ দেখা দেয়।”
স্ক্রিনের আলো থেকে ত্বক সুরক্ষার ৪টি নিয়ম
মোবাইল ও ল্যাপটপের এই অদৃশ্য ক্ষতি থেকে ঘরের ভেতরেও ত্বককে নিরাপদ রাখতে এই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়মগুলো মেনে চলার পরামর্শ দেন।
জিঙ্ক অক্সাইডযুক্ত সানস্ক্রিন ব্যবহার
সাধারণ কেমিক্যাল সানস্ক্রিনগুলো মোবাইলের নীল আলো পুরোপুরি আটকাতে করতে পারে না।
ডা. জোশুয়া জেইচনারের মতে, “ঘরের ভেতরে থাকার সময়ও এমন সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত যাতে ‘জিঙ্ক অক্সাইড’ বা ‘টাইটানিয়াম ডাইঅক্সাইড’ উপাদান থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘মিনারেল বা ফিজিক্যাল সানস্ক্রিন’ বলে এগুলোকে। এই উপাদানগুলো ত্বকের ওপর একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে আয়নার মতো ব্লু লাইটকে প্রতিফলিত করে বাইরে ফিরিয়ে দেয়।”
আয়রন অক্সাইড যুক্ত টিন্টেড সানস্ক্রিন, নীল আলো প্রতিরোধে বেশি কার্যকর।
অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সেরামের ব্যবহার
নীল আলোর কারণে তৈরি হওয়া ফ্রি-র্যাডিক্যালগুলোকে ধ্বংস করতে ত্বকে প্রতিদিন সকালে ভিটামিন-সি বা ভিটামিন-ই যুক্ত অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সেরাম ব্যবহার করা উপকারী।
এই উপাদানগুলো ত্বকের কোষে এক ধরনের অদৃশ্য রক্ষাকবচ তৈরি করে কোলাজেন ভেঙে যাওয়া প্রতিরোধ করে। আর অকাল বার্ধক্যের ছাপ পড়তে দেয় না।
‘ডিভাইস’-এ নাইট মোড ও ডার্ক ফিল্টার চালু করা
শুধুমাত্র প্রসাধনী মাখাই যথেষ্ট নয়, সরাসরি উৎসের আলো কমানো প্রয়োজন।
প্রতিটি স্মার্টফোন ও ল্যাপটপের সেটিংসে গিয়ে ‘নাইট লাইট’, ‘আই কমফোর্ট শিল্ড’ বা ‘ডার্ক মোড’ সার্বক্ষণিকভাবে চালু করে রাখা উচিত।
এগুলো স্ক্রিন থেকে বের হওয়া ক্ষতিকর নীল আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যকে কমিয়ে একটি মৃদু হলুদ আলোতে রূপান্তর করে, যা চোখ এবং ত্বক উভয়ের জন্যই নিরাপদ।
কোষের অভ্যন্তরীণ পরিচ্ছন্নতা ও পানি পানের নিয়ম
ডিজিটাল স্ক্রিন দীর্ঘ সময় ব্যবহারে ত্বক খুব দ্রুত তার স্বাভাবিক আর্দ্রতা বা পানি হারিয়ে শুষ্ক ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
এর প্রতিকারে মস্তিস্ক ও ত্বকের কোষ সতেজ রাখতে এবং অভ্যন্তরীণ দূষণ দূর করতে সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করা আবশ্যক।
পরামর্শ
আধুনিক প্রযুক্তির যুগে মোবাইল বা ল্যাপটপ পুরোপুরি বর্জন করা সম্ভব নয়। তবে সচেতনতাই পারে এই ডিজিটাল ক্ষতির হাত থেকে ত্বককে রক্ষা করতে।
‘আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ ডার্মাটোলজি’র চিকিৎসকদের মতে, স্ক্রিন থেকে অন্তত এক হাত বা ১২ থেকে ১৮ ইঞ্চি দূরত্ব বজায় রেখে, ফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহার করা এবং স্ক্রিন টাইম কিছুটা পরিমিত করে এই ডিজিটাল ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়।
মারওয়া খায়ের
মারওয়া খায়েরের বাংলা শুনলে মনে হয়, সারাটা জীবন বুঝি বাংলাতেই কাটিয়েছেন। অথচ তাঁর জন্ম সৌদি আরবে, বেড়ে ওঠা যুক্তরাজ্যে। তারপরও কী সুন্দর ঝরঝরে বাংলা বলেন, গিটার বাজিয়ে পছন্দের বাংলা গানে সুর তোলেন। তাঁর গান কিংবা বাংলাচর্চা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলার মতো সময় অবশ্য পাওয়া গেল না।
কেননা কিছুক্ষণ পরই তাঁকে প্যাসেঞ্জার সার্ভিস এজেন্টদের (পিএসএ) প্রশিক্ষণ দিতে ছুটতে হবে। তার আগেই তাঁর পিএসএ থেকে প্রশিক্ষক হয়ে ওঠার গল্পটা শুনতে চাই।
২০১০ সালের দিকে ন্যাটওয়েস্ট ব্যাংকে চাকরি করতেন মারওয়া খায়ের। তার আগে ওষুধের দোকান আর মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানেও কাজ করেছেন। ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পর ভেবেছিলেন, এই চাকরিতেই থিতু হবেন। কিন্তু ২০০৮–০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে ব্যাংকিং খাতের চাকরিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে নতুন কোনো পেশা খুঁজতে শুরু করেন।
সে সময় ডকল্যান্ডস লাইট রেলওয়েতে (ডিএলআর) কাজ করতেন এক বন্ধু। তিনিই মারওয়াকে রেলওয়েতে আবেদন করার পরামর্শ দেন। তুলনামূলক ভালো বেতন ও দীর্ঘমেয়াদি চাকরির নিশ্চয়তা তাঁকে এই পেশার প্রতি আগ্রহী করে।
আন্ডারগ্রাউন্ড, ওভারগ্রাউন্ড ও ডিএলআর—মূলত এই তিন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চলে লন্ডনের মেট্রোরেলব্যবস্থা। এর মধ্যে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোকে সংযুক্ত করেছে ৪৫টি স্টেশনে বিস্তৃত ডিএলআর। প্রায় ৪০ বছর আগে চালু হওয়া এই স্বয়ংক্রিয় রেলব্যবস্থা প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করে। স্বয়ংক্রিয় প্রতিটি ট্রেনে চালকের বদলে একজন করে পিএসএ থাকেন। প্রতিটি স্টেশনে ট্রেন থামার পর আবার যাত্রা শুরুর আগে দরজা নিরাপদে বন্ধ করা এবং ট্রেনকে পরবর্তী যাত্রার জন্য প্রস্তুত করা পিএসএর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পাশাপাশি যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও কাস্টমার সার্ভিস দেওয়াও তাঁর কাজের অংশ। ট্রেনে নিয়মিত ঘোষণা দেওয়া, যাত্রীদের গন্তব্য খুঁজে পেতে সহায়তা করা, ম্যাপ বুঝিয়ে দেওয়া—এসবও করতে হয়।
লন্ডনে বিভিন্ন দেশের মানুষ বসবাস করেন, পর্যটকের সংখ্যাও কম নয়। বিশেষ করে ইস্ট লন্ডনে অনেক যাত্রী আছেন, যাঁদের কেউ কেউ ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ নন কিংবা লন্ডনের ম্যাপ বুঝতে সমস্যায় পড়েন। তাঁদের গন্তব্যে যাওয়ার পথ বুঝিয়ে দেওয়াও প্যাসেঞ্জার সার্ভিস এজেন্টের দায়িত্ব। খোঁজখবর নিয়েই ডিএলআর পদে আবেদন করেন মারওয়া। ‘এখানে কাজ করতে টেকনিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড বাধ্যতামূলক নয়। প্রয়োজনীয় সবকিছুই চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শেখানো হয়,’ বলছিলেন মারওয়া।
প্রায় চার মাসের প্রশিক্ষণ। এরপর আরও দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন। এ সময় লিখিত ও ব্যবহারিক—দুই ধরনের পরীক্ষাই দিতে হয়। সব ধাপ সফলভাবে শেষ করার পর মেলে ট্রেন পরিচালনার লাইসেন্স। ২০১১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিএলআরে ট্রেন অপারেটর হিসেবে যোগ দেন মারওয়া।
প্যারালিম্পিক মশাল বহনকারী ট্রেন
রেলওয়েতে কাজ করার সিদ্ধান্তটা অবশ্য সহজ ছিল না। সবচেয়ে বড় বাধাটি নিজের পরিবার থেকেই এসেছিল। পরিবারের ধারণা ছিল, এটা ছেলেদের কাজ। মেয়েরা এ ধরনের কাজ করে না। একসময় পরিবারের মনোভাব বদলে যায়। তাঁরাই এখন মারওয়ার সবচেয়ে বড় সমর্থক।
চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরের বছরই মারওয়ার কর্মজীবনে আসে স্মরণীয় এক মুহূর্ত। ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিকের সময় ক্যানারি ওয়ার্ফ থেকে প্যারালিম্পিক মশাল বহন করে স্ট্র্যাটফোর্ডে নিয়ে যাওয়া ডিএলআর ট্রেনটির অপারেটর হিসেবে তাঁকে নির্বাচিত করা হয়।
অনেক পিএসএর মধ্য থেকে মারওয়াকে বেছে নেওয়ার কারণ—যাত্রীদের উদ্দেশে তাঁর ঘোষণা দেওয়ার ধরন। তাঁর ঘোষণার কণ্ঠস্বর তত দিনে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছিল। প্যারালিম্পিক মশাল বহনের সেই বিশেষ যাত্রায় বিবিসিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম উপস্থিত ছিল। যাত্রার বিভিন্ন মুহূর্ত ধারণ করার পাশাপাশি ডিএলআরের প্রতিনিধিত্বকারী কণ্ঠ হিসেবে মারওয়ার ঘোষণাও সেই আয়োজনের অংশ হয়ে ওঠে।
মারওয়ার সেই কণ্ঠ এখনো ডিএলআরের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছে। ট্রেন অপারেটরদের জন্য তৈরি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ভিডিওতে পরিচালন পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনার বর্ণনা তাঁর কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়েছে।
ম্যানুয়াল ড্রাইভিংয়ের দিনগুলো
‘আমি যখন পিএসএ হিসেবে কাজ করতাম, তখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ সিগন্যালিং সিস্টেম,’ বলেন মারওয়া। ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকের আগে ডিএলআরের সিগন্যালিং ব্যবস্থা ছিল খুবই অনির্ভরযোগ্য। এমনও হয়েছে, সিগন্যালিং-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে দিনে পাঁচ-ছয়বার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে ম্যানুয়ালি ট্রেন চালাতে হয়েছে। পরে অলিম্পিকের সময় সিগন্যালিং ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিনিয়োগ করা হয়। এরপর সিস্টেম হয়ে ওঠে অনেক নির্ভরযোগ্য।
ম্যানুয়ালি ট্রেন চালানোর অভিজ্ঞতা মারওয়ার কাছে একদিকে ছিল রোমাঞ্চকর, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জেরও। ইচ্ছা করলেই ম্যানুয়াল মোডে যাওয়া যায় না। অনুমতি ও নির্দেশনা নিয়ে নির্দিষ্ট স্টেশন থেকে নির্দিষ্ট স্টেশন পর্যন্ত ট্রেন চালাতে হয়।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল যাত্রীদের সামলানো। এসব ট্রেনে চালকের জন্য আলাদা কোনো কেবিন নেই। ফলে যাত্রীরা সরাসরি চালকের কাছে এসে কথা বলতে পারেন। কিন্তু ম্যানুয়াল ড্রাইভিংয়ের সময় চালককে পুরো মনোযোগ সামনের দিকে রাখতে হয়। ‘তাই আমরা আগে থেকেই ঘোষণা দিয়ে যাত্রীদের জানিয়ে দিতাম যে ট্রেনটি এখন ম্যানুয়াল মোডে চলছে। তাঁদের অনুরোধ করতাম, যেন আমাদের সঙ্গে কথা বলে বা প্রশ্ন করে মনোযোগে ব্যাঘাত না ঘটান। একই সঙ্গে জানিয়ে দিতাম, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার তুলনায় ট্রেনের গতি কিছুটা কম থাকবে এবং গন্তব্যে পৌঁছাতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগবে।’
তারপরও অনেক যাত্রী এসে প্রশ্ন করতেন—ট্রেন এত ধীরে চলছে কেন, আরও দ্রুত চালানো যাচ্ছে না কেন। তাঁদের হয়তো কোথাও পৌঁছানোর তাড়া। কিন্তু চালকের কাছে তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিরাপত্তা।
রেলওয়ের কাজ করতে গেলে নানা ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এর মধ্যে কখনো কেউ ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি অনুযায়ী ট্রেন সরিয়ে নেওয়া বা রিভার্স করার মতো কঠিন দায়িত্বও পিএসএকে পালন করতে হয়। ‘আমার কয়েকজন সহকর্মী এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁরা তখন এতটাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে তাঁদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে আমাকে নিয়ে গিয়ে ট্রেনটি সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়।’
অপারেটর থেকে প্রশিক্ষক
চার বছর ট্রেন পরিচালনার পর নতুন দায়িত্ব পান মারওয়া—অপারেটরদের প্রশিক্ষক। কাজটি ভিন্ন। এত দিন নিজে যে দায়িত্ব পালন করেছেন, এখন অন্য একজনকে সেই দায়িত্ব পালনের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। ‘নতুন এই পেশায় টিকে থাকতে আমাকে আরও কর্তৃত্বপূর্ণ হতে হয়েছে। বিশেষ করে আমার বয়স এবং আমি একজন নারী—এই দুটি কারণে,’ বলেন মারওয়া।
পুরুষ-প্রধান কর্মপরিবেশে কখনো কখনো সরাসরি প্রতিরোধের মুখেও পড়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নারীর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিতে হবে—শুধু এই কারণে কোর্স ছেড়ে দিয়েছিলেন দুজন প্রশিক্ষণার্থী। আরেকজন তাঁকে সরাসরি বলেছিলেন, ‘আমি আমার স্ত্রীকে ছেড়ে দিয়েছি, কারণ আমি চাই না কোনো নারী আমাকে কী করতে হবে, তা বলে দিক।’ এসব অভিজ্ঞতা কষ্ট দিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে। শিখেছেন কোথায় সীমারেখা টানতে হয় এবং কীভাবে নিজের অবস্থানে অটল থাকতে হয়।
বর্তমানে মারওয়া ডিএলআরের একজন অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক। তাঁর দাবি, তাঁর বিভাগে কর্মরত প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অপারেটর কোনো না কোনো সময়ে তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।
শিকড় সিলেটে
মারওয়ার দাদাবাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায়। সুযোগ পেলেই দেশে যান। সর্বশেষ গত অক্টোবরে ঘুরে গেছেন। তবে দেশের মেট্রোরেলে এখনো ওঠা হয়নি—এ নিয়ে তাঁর আক্ষেপ আছে।
তাঁর বাবা প্রকৌশলী হিসেবে পেশা জীবনের বড় সময় কাটিয়েছেন সৌদি আরবে। খুব অল্প বয়সে লেখাপড়ার জন্য যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। দক্ষিণ লন্ডনের বিভিন্ন স্কুল ও সিক্সথ ফর্ম কলেজে পড়াশোনা করেছেন। পরে নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা শুরু করেন। চাকরির পাশাপাশি এখনো সেই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানই এই শিক্ষার ব্যয় বহন করছে।
চার বোনের পরিবারে বেড়ে ওঠা মারওয়া মনে করেন, তাঁর আজকের অবস্থানের পেছনে মা-বাবার বড় অবদান রয়েছে। মেয়েদের জন্য সুযোগ তৈরিতে তাঁরা কখনো ছেলে-মেয়ের পার্থক্য করেননি। পড়াশোনার পাশাপাশি গান, বাদ্যযন্ত্রসহ নানা বিষয়ে আগ্রহী হওয়ার সুযোগও দিয়েছেন তাঁরা।
তিনি চান, নতুন প্রজন্মের ব্রিটিশ-বাংলাদেশি মেয়েরা প্রচলিত কয়েকটি পেশার বাইরেও নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে শিখুক। ডাক্তার, শিক্ষক কিংবা সংসারের গণ্ডির বাইরেও যে রেলওয়ে, প্রকৌশল, প্রযুক্তিসহ অসংখ্য পেশা তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে—সেটা তাঁরা জানুক।
ছবি : সংগৃহীত
বর্তমানে ভারতীয় উপমহাদেশে পুরুষদের মধ্যে একটি নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হচ্ছে, যা মূলত সামাজিক লজ্জা এবং রোগ লুকিয়ে রাখার মানসিকতার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চ-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় পুরুষদের মধ্যে শীর্ষ ১০টি ক্যানসারের একটি হয়ে উঠেছে প্রোস্টেট ক্যানসার। বিশেষ করে দিল্লি, বেঙ্গালুরু এবং মুম্বাইয়ের মতো মেগাসিটিগুলোতে এই রোগে আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, জাতীয় অনকোলজি রেজিস্ট্রিগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে আক্রান্তদের মধ্যে ৬০ শতাংশেরও বেশি পুরুষের ক্ষেত্রে রোগটি একদম শেষ পর্যায়ে (মেটাস্ট্যাটিক স্টেজ) গিয়ে ধরা পড়ে। পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় এই চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো, কারণ সেখানে নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে শুরুতেই রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হয়।
সাধারণত ডায়াবেটিস, মেটাবলিক সিন্ড্রোম বা হার্টের স্বাস্থ্য নিয়ে ব্যাপক সচেতনতা থাকলেও, পুরুষদের দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করার এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটি এখনো উপেক্ষিত রয়ে গেছে।
৪৫ বছর পার হওয়ার পর প্রস্রাবের অভ্যাস বা যৌন স্বাস্থ্যের যেকোনো পরিবর্তনকে বেশিরভাগ পুরুষই ‘বয়স বাড়ার সাধারণ লক্ষণ’ বলে উড়িয়ে দেন।
চিকিৎসকদের মতে, এই ভুল ধারণার কারণেই রোগীরা সঠিক সময়ে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমে দেশটির শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসকেরা এই ট্যাবু ভেঙে পুরুষদের স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় একটি বিজ্ঞানসম্মত গাইডলাইন দিয়েছেন।
প্রোস্টেটের ৩টি বিপজ্জনক লক্ষণ
ফোর্টিস মেমোরিয়াল রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর ইউরোলজি এবং রোবোটিক ইউরোলজিক্যাল সার্জারির প্রধান ও পরিচালক ডক্টর বিক্রম শর্মা বলেন, ‘পুরুষেরা চিকিৎসকদের কাছেও প্রস্রাব বা যৌন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে কথা বলতে দ্বিধা করেন। এই নীরবতাই রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাকে পিছিয়ে দেয়।’
তিনি মূলত ৩টি প্রধান লক্ষণের দিকে নজর দিতে বলেছেন:
১. রাতে বারবার প্রস্রাবের বেগ হওয়া
রাতে ঘুমানোর পর বারবার প্রস্রাবের জন্য জেগে ওঠাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘নকচুরিয়া’ বলা হয়। এটি প্রোস্টেটের সমস্যার প্রথম এবং অন্যতম প্রধান লক্ষণ। অনেকেই এটিকে রাতে বেশি পানি খাওয়া বা বয়স বাড়ার স্বাভাবিক ফল মনে করেন।
চিকিৎসকের ব্যাখ্যা: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যাটি মূলত ‘বিনাইন প্রোস্টেটিক হাইপারপ্লাজিয়া’ বা প্রোস্টেটের স্থানীয় টিউমারের কারণে হতে পারে।
ইউরোলজি জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, এর ফলে ঘুম ভেঙে যায়, যা সারাদিনের কাজের ক্ষতি করে এবং মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। প্রোস্টেট গ্রন্থি আকারে বড় হয়ে গেলে তা মূত্রনালীকে সংকুচিত করে ফেলে, ফলে মূত্রথলিকে দ্বিগুণ শক্তিতে কাজ করতে হয়। একপর্যায়ে মূত্রথলির দেয়াল সংবেদনশীল হয়ে পড়ে এবং সামান্য প্রস্রাব জমলেই তীব্র বেগ অনুভূত হয়। এটি ক্যানসার নাকি সাধারণ টিউমার-তা কেবল একজন ইউরোলজিস্টই নিশ্চিত করতে পারেন।
২. দুর্বল, ধীর বা থেমে থেমে প্রস্রাব হওয়া
একটি সুস্থ মূত্রথলি খুব সহজেই এবং তীব্র গতিতে একবারে খালি হয়ে যায়। কিন্তু যদি প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হয়, প্রস্রাব শুরু করতে অতিরিক্ত চাপ দিতে হয় বা শেষ হওয়ার পর ফোঁটা ফোঁটা পড়তে থাকে, তবে বুঝতে হবে মূত্রনালীর স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
চিকিৎসকের ব্যাখ্যা: দ্য জার্নাল অব ইউরোলজি-তে প্রকাশিত দীর্ঘমেয়াদী তথ্য অনুসারে, প্রোস্টেটের প্রতিবন্ধকতার কারণে মূত্রথলিতে দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব জমে থাকলে বারবার ইউটিআই বা প্রস্রাবের ইনফেকশন, মূত্রথলিতে পাথর এবং কিডনির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এই লক্ষণ অবহেলা করলে মূত্রথলির পেশি চিরতরে তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে।
৩. হঠাৎ বা ক্রমাগত যৌন অক্ষমতা
ক্যানসারের ভয়, নপুংসকতা বা অপারেশনের আতঙ্কে পুরুষেরা স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা করাতে চান না। চিকিৎসকদের মতে, যৌন অক্ষমতা বা ইডি-কে কেবল মানসিক সমস্যা বা হার্টের রোগ ভেবে ভুল করা যাবে না; এটি প্রোস্টেটের মারাত্মক ক্ষতির সংকেত হতে পারে।
চিকিৎসকের ব্যাখ্যা: প্রোস্টেট গ্রন্থিটি পুরুষাঙ্গের উত্থানের জন্য দায়ী সূক্ষ্ম স্নায়ু এবং রক্তনালীগুলোর খুব কাছাকাছি থাকে। ফলে প্রোস্টেটে টিউমার বা তীব্র প্রদাহ হলে রক্ত সঞ্চালন এবং স্নায়ুর সংকেত ব্যাহত হয়।
ডক্টর বিক্রম শর্মা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে যৌনশক্তি বাড়ানোর ওষুধ খাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। এতে মূল সমস্যা বা টিউমারের বৃদ্ধি আড়ালে পড়ে যায় এবং সংকট আরও ঘনীভূত হয়।
কেন ৪৫ বছরের পর নিয়মিত পরীক্ষা জরুরি?
ভারতে প্রোস্টেট চিকিৎসার উন্নত সুযোগ থাকলেও, রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বড় বাধা হলো পুরুষের মানসিক জড়তা। ডক্টর শর্মা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘লক্ষণ দেখা দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করবেন না। ৪৫ বছর পার হলেই, বিশেষ করে যাদের পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস আছে, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শে পিএসএ পরীক্ষা করা উচিত।’
একটি সাধারণ পিএসএ রক্ত পরীক্ষা এবং ডিআরই-এর মাধ্যমেই প্রাথমিক পর্যায়ে প্রোস্টেট ক্যানসার শনাক্ত করা সম্ভব।
প্রাথমিক অবস্থায় রোগ ধরা পড়লে আক্রান্তদের ৫ বছর বেঁচে থাকার হার প্রায় ৬০ শতাংশ। কিন্তু লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর রোগটি প্রোস্টেটের বাইরে ছড়িয়ে পড়লে উন্নত রোবোটিক সার্জারি বা আধুনিক থেরাপির কার্যকারিতাও সীমিত হয়ে পড়ে।
তাই শরীর কোনো সংকেত দিলে তা লুকিয়ে না রেখে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। সচেতনতাই পারে এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে পুরুষদের জীবন রক্ষা করতে।
সূত্র: এনডিটিভি
ছবি : সংগৃহীত
বর্তমান ডিজিটাল যুগে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই কম্পিউটার, মোবাইল অথবা অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসে স্ক্রিন ব্যবহার করে। এআই আসার পর ডিজিটাল স্ক্রিন–নির্ভরতা আরও বাড়ছে।
যেমন চোখ শুষ্ক হয়ে আসে, চোখে জ্বালাপোড়া, চুলকানি দেখা দেয়, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে, মাথাব্যথা, ঘাড়ব্যথা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। এটিকে বলা হয় কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম বা ডিজিটাল স্ক্রিন সিনড্রোম।
চোখের শুষ্কতা বা ড্রাই আই
চোখ খুবই স্পর্শকাতর একটি অঙ্গ। সম্মুখভাগে বিদ্যমান স্বচ্ছ পর্দা বা কর্নিয়া খুবই স্বচ্ছ এবং মসৃণ। এর প্রধান কাজ হলো চোখে আলো প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করে দেখতে সাহায্য করা। স্বচ্ছতা ও মসৃণভাবের ব্যত্যয় ঘটলেই সমস্যা। কর্নিয়া মসৃণ রাখার জন্য চোখের পানির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
পলক ফেলার মাধ্যমে চক্ষুকোঠরে তৈরি হওয়া পানিকে চোখের উপরিভাগে সমভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি করে চোখের পাতা। চোখের উপরিভাগে সমভাবে বিস্তৃত এই চোখের পানির স্তরকে বলে টিয়ার ফিল্ম। কোনো কারণে চোখের পানি কম তৈরি হলে বা টিয়ার ফিল্ম ক্ষতিগ্রস্ত হলে চোখে দেখা দেয় শুষ্কভাব। তখন চোখ জ্বালাপোড়া করে, দেখা দেয় চুলকানি ইত্যাদি উপসর্গ। এটিই শুষ্ক চোখ।
ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারে কেন চোখে শুষ্কতা দেখা দেয়?
চোখের উপরিভাগে বিদ্যমান টিয়ার বা চোখের পানি স্বাভাবিক নিয়মে বাতাসে বাষ্পীভূত হয়ে যায়। সাথে সাথে কর্নিয়াতে বিদ্যমান স্নায়ুর মাধ্যমে সিগন্যাল যায় লেক্রিমাল গ্রন্থিতে, যা দ্রুত টিয়ার প্রবাহিত করে ঘাটতি পূরণ করে। এটি চোখের একটি স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া। প্রতি মিনিটে ১৫-২০ বারের মতো পলক ফেলে টিয়ার ফিল্মকে সামলে রাখে চোখের পাতা।
ডিজিটাল স্ক্রিনে যখন চোখ থাকে, তখন চোখের পলক ফেলার হার অর্ধেকের বেশি কমে যায়। ফলে টিয়ার ফিল্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং চোখে শুষ্কভাব অনুভূত হয়। শুষ্কতার প্রভাবে কর্নিয়ার স্নায়ু কোষগুলো জ্বালাপোড়া ও ব্যথার অনুভূতির সৃষ্টি করে। দীর্ঘক্ষণ অব্যাহত থাকলে একসময় এটি প্রচণ্ড অস্বস্তির জন্ম দেয় এবং কাজের ব্যাঘাত সৃষ্টি করে।
করণীয় কী?
> চোখকে ডিজিটাল আই স্ট্রেইন থেকে নিরাপদ রাখতে কিছু কাজ অবশ্যকরণীয়।
> স্ক্রিনটি চোখের সমান্তরাল থেকে কিছুটা নিচুতে রাখতে হবে ।
> স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা চোখের জন্য আরামদায়ক হতে হবে।
> ২০ মিনিট পর পর বিরতি নিতে হবে।
> স্ক্রিনটি চোখের খুব কাছে নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। সাধারণত ২০-২৮ ইঞ্চি দূরে রাখা ভালো।
> চোখকে ভেজা রাখতে আর্টিফিশিয়াল টিয়ার ব্যবহার করতে হবে।
> অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিনের ব্যবহার সীমিত করতে হবে।
> জীবনশৈলী বা লাইফস্টাইলে পরিবর্তন আনতে হবে।
> ঘুমের ঘাটতি রাখা যাবে না। রাতে স্ক্রিনের ব্যবহার উচিত নয়।
> ঘন ঘন পানি খেতে হবে।
> নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম করতে হবে। ঘাড়ের ব্যায়াম করতে হবে।
ছবি : সংগৃহীত
থাইরয়েডের সমস্যা এখন অনেকের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। শরীরের ওজন হঠাৎ বেড়ে বা কমে যাওয়া, সবসময় ক্লান্ত লাগা, চুল পড়া, মাসিক অনিয়ম কিংবা হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে থাইরয়েডের সমস্যা আছে কি না, তা নিয়ে সচেতন হওয়া দরকার।
থাইরয়েড হলো গলার সামনের দিকে থাকা ছোট, প্রজাপতির মতো একটি গ্রন্থি। এটি শরীরের শক্তি ব্যবহার, তাপমাত্রা, হৃদস্পন্দন, ওজনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। থাইরয়েড বেশি সক্রিয় হলে তাকে অতিসক্রিয় থাইরয়েড এবং কম সক্রিয় হলে স্বল্পসক্রিয় থাইরয়েড বলা হয়।
তবে ঘরে বসে থাইরয়েডের সমস্যা পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায় না। আয়নার সামনে ঘাড় পরীক্ষা করে শুধু কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন বোঝা সম্ভব। নিশ্চিত হতে রক্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
ঘরে বসে ঘাড় পরীক্ষা করবেন যেভাবে
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, কয়েকটি সহজ ধাপে ঘাড় পরীক্ষা করা যায়।
প্রথমে আয়নার সামনে দাঁড়ান। ভালো আলোতে দাঁড়িয়ে গলার নিচের অংশ পরিষ্কারভাবে দেখুন। থাইরয়েডের জায়গাটি চিহ্নিত করুন। এটি চিবুকের নিচে ও কলারবোনের ওপরের দিকে গলার সামনের অংশে থাকে। ঘাড় সামান্য পেছনে হেলান। এরপর এক চুমুক পানি পান করুন। পানি গেলার সময় ঘাড়ের দিকে তাকান। গলার ওই অংশে কোনো ফোলা, পিণ্ড, উঁচু হয়ে থাকা জায়গা বা অস্বাভাবিক নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে কি না, খেয়াল করুন। কয়েকবার পানি পান করে একইভাবে দেখুন। কোনো অস্বাভাবিকতা চোখে পড়লে নিজে থেকে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
থাইরয়েড কম কাজ করলে
থাইরয়েড কম সক্রিয় হলে শরীরের বিভিন্ন কাজ ধীর হয়ে যেতে পারে। তখন দেখা দিতে পারে—
> সবসময় ক্লান্ত বা দুর্বল লাগা
> কারণ ছাড়াই ওজন বেড়ে যাওয়া
> ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
> চুল পাতলা হয়ে যাওয়া বা বেশি পড়া
> কোষ্ঠকাঠিন্য
> মন খারাপ বা বিষণ্নতা
> অন্যদের তুলনায় বেশি ঠান্ডা লাগা
> মাসিক অনিয়ম
> শরীরে শক্তি কমে যাওয়া
থাইরয়েড বেশি কাজ করলে
থাইরয়েড বেশি সক্রিয় হলে শরীরের অনেক কাজ দ্রুত হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে—
> কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
> হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া
> অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
> শরীর কাঁপা
> অস্থিরতা বা দুশ্চিন্তা
> ঘুমের সমস্যা
> গরম সহ্য না হওয়া
যেসব লক্ষণ অবহেলা করবেন না
ঘাড়ে দৃশ্যমান ফোলা বা পিণ্ড দেখা গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। বিশেষ করে পিণ্ড দ্রুত বড় হতে থাকলে, খাবার বা পানি গিলতে সমস্যা হলে, গলায় চাপ বা ভার অনুভূত হলে, কণ্ঠস্বর বসে গেলে কিংবা শ্বাস নিতে কষ্ট হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ঘাড়ে কোনো পিণ্ড দেখা গেলেই সেটি ক্যানসার—এমন নয়। থাইরয়েডের অনেক পিণ্ড ক্ষতিকর নয়। তবে পিণ্ডের ধরন জানতে চিকিৎসকের পরীক্ষা প্রয়োজন। প্রয়োজনে আল্ট্রাসনোগ্রাম ও কোষের পরীক্ষা করা হতে পারে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
থাইরয়েডের সমস্যা যে কারও হতে পারে। তবে নারীদের মধ্যে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া ৬০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি, পরিবারে থাইরয়েড রোগের ইতিহাস থাকা ব্যক্তি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি এবং গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মের পরের সময়ে নারীদের ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে। শরীরে আয়োডিনের ঘাটতিও থাইরয়েড সমস্যার একটি কারণ হতে পারে।
কোন রক্ত পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়
শুধু ঘাড় দেখে বা লক্ষণ মিলিয়ে থাইরয়েডের সমস্যা নিশ্চিত করা যায় না। চিকিৎসকের পরামর্শে কয়েকটি রক্ত পরীক্ষা করা হয়।
থাইরয়েড উদ্দীপক হরমোন পরীক্ষা: থাইরয়েড স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে কি না, তা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
মুক্ত থাইরক্সিন পরীক্ষা: রক্তে সক্রিয় থাইরক্সিনের মাত্রা জানতে করা হয়।
মুক্ত ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন পরীক্ষা: বিশেষ করে থাইরয়েড বেশি সক্রিয় কি না, তা বুঝতে এই পরীক্ষা করা হতে পারে।
থাইরয়েড অ্যান্টিবডি পরীক্ষা: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাইরয়েডকে আক্রমণ করছে কি না, তা বোঝার জন্য করা হয়।
কোন পরীক্ষা প্রয়োজন এবং পরীক্ষার ফলাফলের অর্থ কী—তা চিকিৎসকই ঠিক করবেন।
ঘরে পরীক্ষা কেন যথেষ্ট নয়
ঘাড়ে কোনো ফোলা বা পিণ্ড না থাকলেও থাইরয়েডের সমস্যা থাকতে পারে। আবার ঘাড়ে সামান্য পরিবর্তন দেখা গেলেও সেটি থাইরয়েডের সমস্যা নাও হতে পারে। তাই ঘরে বসে করা পরীক্ষা শুধু প্রাথমিকভাবে সতর্ক হওয়ার একটি উপায়। কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্লান্তি, ওজনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, মাসিকের অনিয়ম, চুল পড়া, হৃদস্পন্দনের পরিবর্তন বা অন্য কোনো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পরিবারে থাইরয়েড রোগের ইতিহাস থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ।
শরীরে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে সেটি দীর্ঘদিন অবহেলা না করাই ভালো। সময়মতো পরীক্ষা করলে থাইরয়েডের সমস্যা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব।
প্রতীকী ছবি
বাঙালির খাবারের থালায় ধোঁয়া ওঠা এক বাটি ডাল ছাড়া যেন তৃপ্তি আসে না। সাধারণ ডাল-ভাত থেকে শুরু করে বিশেষ অনুষ্ঠানের জমকালো ‘ডাল মাখনি’; সবক্ষেত্রেই ডাল আমাদের খাবারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সম্প্রতি এনডিটিভি ফুড-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে ডালকে আমাদের এই অঞ্চলের খাবারের ‘মেরুদণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। উদ্ভিদজাত আমিষ বা প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর জন্য এটি অন্যতম সাশ্রয়ী এবং নির্ভরযোগ্য উৎস।
তবে সব ধরনের ডালে পুষ্টির পরিমাণ এক নয়। ২০২৩ সালে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন মাইক্রোবায়োলজি’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়েটে বড় কোনো পরিবর্তন না এনেই কেবল ডালের ধরনে সামান্য রদবদল করে শরীরের প্রোটিনের জোগান অনেকাংশে বাড়িয়ে তোলা সম্ভব।
শীর্ষ প্রোটিন সমৃদ্ধ ডালগুলোর তালিকা
গবেষণায় ১০০ গ্রাম কাঁচা ডালের পুষ্টিগুণ বিশ্লেষণ করে একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেই তালিকা অনুযায়ী প্রোটিনের পরিমাণে এগিয়ে থাকা ডালগুলো হলো:
> মাষকলাই বা উরাদ ডাল: প্রোটিনের দৌড়ে এটি তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে। এতে প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ২৫.২১ গ্রাম প্রোটিন থাকে।
> মসুর ডাল: প্রোটিনের পরিমাণে মাষকলাই ডালের প্রায় সমান অবস্থানে রয়েছে মসুর ডাল। এতে প্রতি ১০০ গ্রামে প্রোটিনের পরিমাণ ২৪.৬৩ গ্রাম। দ্রুত রান্না করা যায় বলে এটি দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় সবচেয়ে জনপ্রিয়।
> মুগ ডাল: এই ডালটিও প্রোটিনের চমৎকার উৎস, যাতে প্রতি ১০০ গ্রামে ২৩.৮৬ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যায়।
> রাজমা (কিডনি বিন): রাজমায় প্রোটিনের পরিমাণ প্রায় ২২.৫৩ গ্রাম।
> ছোলার ডাল: পুষ্টিবিদদের মতে এটিও অত্যন্ত পুষ্টিকর, যাতে ১০০ গ্রামে ২০.৪৭ গ্রাম প্রোটিন থাকে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি:
শরীরভেদে ডালের প্রভাব
পুষ্টি ও হরমোন বিশেষজ্ঞ ড. অলকা বিজয়ন মনে করেন, কেবল প্রোটিনের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে ডাল নির্বাচন করা উচিত নয়। তার মতে, উরাদ ডাল এবং মসুর ডাল আমাদের শরীরে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে কাজ করে। এর মধ্যে মসুর ডাল লিভারের কার্যকারিতা বাড়াতে এবং শরীরে পিত্তের ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে। এমনকি এটি নিয়মিত খেলে কিডনিতে পাথর এবং অনিয়মিত মাসিকের মতো সমস্যা সমাধানেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, উরাদ ডাল প্রাকৃতিকভাবে আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে। যারা হাড়ের সমস্যা যেমন অস্টিওপোরোসিস বা অস্টিওআর্থ্রাইটিসে ভুগছেন, তাদের জন্য এই ডাল অত্যন্ত উপকারী। এটি রক্ত সঞ্চালন উন্নত করতেও ভূমিকা রাখে।
পরিপূর্ণ প্রোটিন পেতে বিশেষ কৌশল
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি যে, কোনো ডালই একা শরীরের জন্য ‘পরিপূর্ণ’ প্রোটিন সরবরাহ করতে পারে না। প্রোটিন তৈরি হয় ২০টি অ্যামাইনো অ্যাসিডের সমন্বয়ে, যার মধ্যে ৯টি আমাদের শরীর নিজে তৈরি করতে পারে না। ডালের মধ্যে লাইসিন প্রচুর থাকলেও মেথিওনিন নামক প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো অ্যাসিডের অভাব থাকে। অন্যদিকে ভাত বা আটার মতো শস্যে মেথিওনিন প্রচুর থাকলেও লাইসিন কম থাকে। এই অভাব দূর করতেই আমাদের চিরচেনা ডাল-ভাত বা ডাল-রুটি খাওয়ার চল তৈরি হয়েছে। যখন আমরা ডালের সাথে ভাত বা রুটি মিশিয়ে খাই, তখন সেই খাবারটি একটি ‘কমপ্লিট প্রোটিন’ বা পরিপূর্ণ আমিষে পরিণত হয়, যা শরীরের জন্য সবচেয়ে বেশি কার্যকর।