বঙ্গভবন
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর শূন্য হওয়া পদে নতুন অভিভাবক নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সাংবিধানিক নিয়মে স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করায় সবার নজর এখন বঙ্গভবনের পরবর্তী স্থায়ী বাসিন্দার দিকে। ঘটনাটি খানিকটা আকস্মিক। আমরা দেখতে পেলাম শেখ হাসিনার শেষ আমল থেকে যিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন, তিনি ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেছেন। একই সঙ্গে, সংবিধান অনুযায়ী এই পদের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে বিদ্যমান জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
হঠাৎ করে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করার আগে পুরো বিষয়টি দেখে মনে হচ্ছিল, বর্তমান সংসদে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত সংশোধনীগুলো গৃহীত হওয়ার পর বিএনপি নতুন রাষ্ট্রপতির ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করবে। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ফলে প্রক্রিয়াটি কিছুটা এগিয়ে এসেছে। এতে যা বোঝা যাচ্ছে বা আমি যেভাবে অনুমান করছি, বিএনপির নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছে হয়তো একটি বার্তা দেওয়া হয়েছিল এবং তাদের সরকারের ইচ্ছাকে ব্যক্ত করা হয়েছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি বেশ তড়িঘড়ি করে পদত্যাগ করলেন। প্রথমত আমি বলতে চাই যে, শেখ হাসিনার সবচেয়ে অনুগত একজন ব্যক্তি হিসেবে তিনি যেভাবে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন, তা ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য।
অবিশ্বাস্য এই অর্থে যে, আওয়ামী লীগের প্রথম সারির রাজনীতিবিদদের সবাইকে বাইরে রেখে এমন একজনকে বেছে নেওয়া হয়েছিল, যা মানুষকে বেশ বিস্মিত করেছিল। বিষয়টি একদিকে যেমন হাসি-তামাশার খোরাক জোগায়, অন্যদিকে তেমনি বিস্ময় ও উদ্বেগেরও সৃষ্টি করেছিল। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই বোঝা গিয়েছিল যে, এসব পদের ক্ষেত্রে সরকারের নির্বাহী প্রধান বা সরকারি দল ১০০ ভাগ আনুগত্য দাবি করে; ৯৯ পেলেও সেটাকে যথেষ্ট বিবেচনা করা হয় না।
সম্ভবত মো. সাহাবুদ্দিন সেই ১০০ ভাগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন বলেই ওই পদে আসতে পেরেছিলেন। আমাদের গণঅভ্যুত্থানের পর এটা খুবই প্রত্যাশিত ছিল যে, তিনি নৈতিক দায়দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করবেন। কিন্তু তিনি পদত্যাগ করেননি। বরঞ্চ একটি জটিল ও কঠিন সময়ে কিছুটা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং তাৎক্ষণিকভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও আমরা তার কোনো পদত্যাগ দাবি করিনি। এই বিবেচনা থেকেই দাবি করা হয়নি যে, সে সময় একটা সহিংসতার আশঙ্কা ছিল, অভ্যন্তরীণ সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল এবং একটি সাংবিধানিক শূন্যতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। অভ্যুত্থানের পরপরই রাজনৈতিক নৈরাজ্যের সুযোগ নিয়ে অনেকেই ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে নেমে পড়েছিলেন। সেই জায়গা থেকে আমরা রাষ্ট্রপতির পদে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পরিবর্তন দেখতে চাইনি।
তবে তার পক্ষ থেকে নিজের মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পদত্যাগ করার একটা দায়িত্ব ছিল। পরবর্তীকালে অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা ছাত্ররা যখন তার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন ও বিক্ষোভ করল, তখন বিএনপিসহ আমরা অধিকাংশ রাজনৈতিক দল একমত হইনি। এর কারণ ছিল, তখন দেখা যাচ্ছিল অন্তর্বর্তী সরকার তাদের ক্ষমতা প্রলম্বিত ও দীর্ঘায়িত করতে চায় এবং গোটা নির্বাচনকে অনিশ্চিত সময়ের জন্য ঝুলিয়ে দিতে চায়। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে তাকে কে প্রতিস্থাপন করবেন, রাষ্ট্রপতি পদে কাকে বসানো হবে—এ নিয়ে বহু ধরনের তৎপরতা চলছিল।
এমনকি এটা নিয়ে আরেকটি দ্বিতীয় বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সমীকরণ তৈরির বহুমাত্রিক তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। সম্ভবত সেই আশঙ্কা থেকেই বিএনপি বা অধিকাংশ রাজনৈতিক দল তখন আর পরিবর্তন দেখতে চায়নি। পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। নির্বাচনের পর তিনি এক বিরল সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হিসেবে পরপর তিনজন সরকার প্রধান বা নির্বাহী প্রধানকে শপথ পড়ালেন—শেখ হাসিনা, মুহাম্মদ ইউনূস ও তারেক রহমান। এরপর এখন তিনি বিদায় নিয়েছেন। তবে আমি মনে করি, এই পদের যে একটি নৈতিক জায়গা রয়েছে, তা তিনি বহু আগেই হারিয়েছিলেন। তার কথাবার্তা ও আচরণের মধ্যেও কোনো সঙ্গতি ছিল না।
শেখ হাসিনার সময়ে তার যে বক্তব্য ছিল, মুহাম্মদ ইউনূসের সময়ে তা পরিবর্তিত হয়েছে, আর শেষ কয়েক মাসে তিনি তো একেবারে ১৮০ ডিগ্রি উল্টো দিকে গিয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন, সংসদে ভাষণ দিয়েছেন। অবশ্য, সংসদে রাষ্ট্রপতি যে ভাষণ দেন, সেটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হতে হয়। যে ভাষণে সরকারের গুণকীর্তন এবং মন্ত্রণালয়গুলোর ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সারসংক্ষেপ থাকে। রাষ্ট্রপতি মূলত এটি দেখে দেখে পাঠ করেন মাত্র। ফলে তার ওই ভাষণটি আদৌ তার নিজের কি না, সেটি অন্য তর্ক। কিন্তু তারপরও যেহেতু এটি রাষ্ট্রপতির ভাষণ বলেই গৃহীত এবং স্বীকৃত, এটি সংসদের কার্যবিবরণিতে রাষ্ট্রপতির ভাষণ হিসেবেই উল্লেখিত থাকবে। কিন্তু চাইলে তিনি তখনও পদত্যাগ করতে পারতেন।
যা-ই হোক, শেষ পর্যন্ত একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি পদত্যাগ করেছেন এবং এর ফলে বাংলাদেশের জন্য এখন একটি নতুন পর্যায় ও পরিপ্রেক্ষিত তৈরি হয়েছে।ভবিষ্যতের কথা বলতে গেলে, সংসদের আগামী অধিবেশন পর্যন্ত হয়তো পরবর্তী নির্বাচিত একজন স্থায়ী রাষ্ট্রপতির জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ইতিমধ্যে আমার ধারণা, জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত যে কমিটি গঠিত হয়েছে এবং ‘জুলাই সনদ’-এ যেখানে বিএনপিসহ আমরা অধিকাংশ দল একমত হয়েছি, সে সংক্রান্ত একটি সংবিধান সংশোধন বিল তারা উত্থাপন করবেন। এটি হয়তো সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী আকারে আসবে, যেখানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছুটা বৃদ্ধি বা তাকে ক্ষমতায়ন করার বেশ কিছু প্রস্তাবনা রয়েছে। এসব প্রস্তাবে বিএনপিসহ আমাদের অনেকেরই এক ধরনের সহমত রয়েছে।
আমার ধারণা, রাষ্ট্রপতির কাজ এখনকার মতো কেবল রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অভ্যর্থনা জানানো, মিলাদ মাহফিল করা এবং প্রধান বিচারপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে শপথ পড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তার আরও কিছু নতুন দায়িত্ব ও কর্তব্যের জায়গা তৈরি হবে। আমি দেখতে চাইব এমন একজন রাষ্ট্রপতি, যার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন রয়েছে এবং জনগণের সঙ্গে যার একটি ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান। যিনি গত কয়েক দশকের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে চিন্তার দিক থেকে ও শারীরিকভাবে ধারণ করবেন এবং দেশের মানুষের সঙ্গে যার একটি আত্মিক ও স্বাভাবিক সম্পর্ক রয়েছে।
সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের পরীক্ষায় যিনি উত্তীর্ণ এবং ত্যাগী, সংগ্রামী ও আত্মনিবেদিত মানুষ হিসেবে যার সম্মান ও মর্যাদার জায়গায় বড় কোনো প্রশ্ন নেই—এমন ব্যক্তিকেই সেখানে প্রত্যাশা করি। আমি মনে করি, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে নিশ্চয়ই এরকম যোগ্য ব্যক্তিবর্গ আছেন এবং সেখান থেকেই নীতিনির্ধারকরা একজনকে নির্বাচিত করবেন। কোনোভাবেই সামরিক আমলাতন্ত্রের কাউকে আমি এই পদে দেখতে চাইব না। এটি একটি সর্বসাধারণের পদ এবং রাষ্ট্রের অভিভাবকের স্থান। এই পদটির ওপর আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত; পাশাপাশি নির্বাচিত নতুন রাষ্ট্রপতির অধীনেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে।
আশা করি, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরায় যুক্ত হবে এবং পরবর্তী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। এরই মধ্যে আমি যেমনটি বলেছি, আমি দেখতে চাইব এমন একজন রাষ্ট্রপতি—যার শক্ত মেরুদণ্ড রয়েছে, সততা ও নিষ্ঠা রয়েছে এবং সকল রাজনৈতিক দল ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর কাছে যার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। বিএনপি যদি প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে পারে, তবে এরকম যোগ্য, দেশপ্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ব্যক্তিত্বকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আশা করছি সেভাবেই হয়তো কাজ এগোবে। হাতে ৯০ দিন সময় আছে। সেপ্টেম্বরে যে সংসদ অধিবেশন শুরু হবে, আশা করি সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের মধ্যে ৯০ দিন শেষ হওয়ার আগেই বর্তমান সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা একজন স্থায়ী রাষ্ট্রপতি পাব।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি
ছবি : সংগৃহীত
রাজধানীতে এখন খুব কম এলাকা আছে, যেখানে ‘লাইভ বেকারি’ দেখা যায় না। সেখানে ওভেন থেকে বের হওয়া গরম পাউরুটি, কেক, প্যাটিস, পিৎজা, বিস্কুট, টোস্টসহ নানা ধরনের বেকারি পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। টাটকা খাবারের ঘ্রাণ, চোখের সামনে প্রস্তুত হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং তুলনামূলক কম দাম—সবমিলিয়ে অল্প সময়েই লাইভ বেকারি একটি জনপ্রিয় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও এ ধরনের প্রতিষ্ঠান দ্রুত বাড়ছে। এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে, কর্মসংস্থান বাড়ছে এবং ভোক্তারা তাজা খাবার পাচ্ছেন। তবে এর পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এসেছে—এসব বেকারিতে খাদ্য-নিরাপত্তা ও মান কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে?
বর্তমানে অনেক লাইভ বেকারি এমনভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি ও উৎপাদন মান বজায় রাখার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছোট পরিসরের দোকান বা সীমিত জায়গায় উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ফলে কাঁচামাল সংরক্ষণ, উৎপাদন এলাকা পরিষ্কার রাখা, ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করা এবং প্রস্তুতকৃত খাবার নিরাপদে সংরক্ষণের মতো মৌলিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা সম্ভব হয় না।
খাদ্য উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ময়দা, ডিম, মাখন, দুধ, ক্রিমসহ বিভিন্ন কাঁচামাল ব্যবহারের আগে ও পরে পাত্র, ট্রে, মোল্ড, মিক্সারসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়মিত পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখা প্রয়োজন। একইভাবে উৎপাদনস্থলের মেঝে ও পরিবেশও পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক ছোট বেকারিতে এসবের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা বা পৃথক ওয়াশিং স্টেশন থাকে না। ফলে খাদ্যের মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
খাদ্য কেবল একটি পণ্য নয়; এটি মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই প্রতিটি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপত্তা মান অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে লাইভ বেকারিগুলোর একটি বড় অংশই সেই মানদণ্ডের বাইরে পরিচালিত হচ্ছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। স্বাস্থ্যবিধি ও মানদণ্ড অনুসরণ না করার কারণে বিভিন্ন সময়ে অনেক লাইভ বেকারিকে জরিমানাও করা হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, গত ৯ ফেব্রুয়ারি দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যশোর শহরের রেল রোড এলাকার লাইভ বেকারি অ্যান্ড ফাস্টফুড প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার প্রস্তুত ও সংরক্ষণের অভিযোগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
অনেকেই মনে করেন, লাইভ বেকারিতে চোখের সামনেই তৈরি হচ্ছে বলে খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। কিন্তু দৃশ্যমান এই স্বচ্ছতা সবসময় খাদ্য-নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না। অনেক প্রতিষ্ঠান খুব ছোট জায়গায় উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করে, যেখানে কাঁচামাল সংরক্ষণ, উৎপাদন এলাকা, প্রস্তুত পণ্য ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
খাদ্য প্রস্তুতকারীদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক খাদ্য-নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী, খাদ্য উৎপাদনের সময় গ্লাভস, হেয়ার নেট, অ্যাপ্রন এবং প্রয়োজন হলে মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। কিন্তু বাস্তবে বেকারিতে অনেক কর্মী খালি হাতে খাদ্য স্পর্শ করেন। আবার বেশির ভাগ লাইভ বেকারিতে খাদ্য উৎপাদনের সময় গ্লাভস, হেয়ার নেট, অ্যাপ্রন ও মাস্ক ব্যবহার করা হয় না।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, লাইভ বেকারিতে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ পণ্যে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং ব্যবহৃত উপাদান উল্লেখ থাকে না। ফলে ভোক্তা জানতে পারেন না পণ্যটি কখন তৈরি হয়েছে, কতদিন নিরাপদ থাকবে কিংবা এতে এমন কোনো উপাদান রয়েছে কি না, যা তার জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অথচ, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি মোড়কজাত বা প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্যের গায়ে বেশকিছু তথ্য স্পষ্টভাবে বাংলায় অথবা বাংলার পাশাপাশি অন্য ভাষায় লেখা বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে অন্যতম হলো খাদ্য উপাদান বা উপকরণের ধরন ও নাম; উৎপাদনের তারিখ; মোড়কীকরণের তারিখ; মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ; পুষ্টিগত তথ্যাবলি; খাদ্য-সংযোজন দ্রব্য ইত্যাদি।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে লাইভ বেকারি পরিচালনার ক্ষেত্রে খাদ্য-নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিধি, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, উৎপাদন পরিবেশ ও মান নিয়ন্ত্রণ কঠোরভাবে তদারকি করা হয়। ফলে ভোক্তারা আস্থার সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের খাদ্য গ্রহণ করতে পারেন।
বাংলাদেশেও খাদ্য উৎপাদনের জন্য আইন ও বিধিমালা রয়েছে। একটি বেকারি পরিচালনার জন্য শুধু ট্রেড লাইসেন্সই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ, প্রয়োজনীয় অনুমোদন গ্রহণ এবং নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায় থাকা। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা শুরু করে, আবার অনেকের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও থাকে না।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক প্রতিষ্ঠান মানসনদ, প্রশিক্ষিত জনবল ও স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদন পরিবেশ ছাড়াই এই ব্যবসা পরিচালনা করছে। গত ১৫ জুন জাগো নিউজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজশাহী মহানগরীতে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়াই খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বিক্রি করাসহ আরও কিছু অভিযোগে একটি লাইভ বেকারিকে ১২ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই অনলাইন পোর্টালের গত ২৪ আগস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএসটিআইয়ের মান সনদ না নিয়ে মিষ্টি, দই, বিস্কুট, পাউরুটি ও কেকসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদন এবং বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন প্রচারের অভিযোগে চাঁদপুরের ইলিশ চত্বর এলাকার কাশ্মীরি সুইটস অ্যান্ড লাইভ বেকারিকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের এসব অভিযানে যা পাওয়া যাচ্ছে সেটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, লাইভ বেকারিগুলোকে আইনের মধ্যে রেখে নিয়মিত তদারকি করা জরুরি।
বেকারি খাতে দক্ষ জনবলেরও ঘাটতি রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই কর্মীদের দিয়ে খাদ্য উৎপাদনের কাজ করানো হচ্ছে, যা খাদ্যের মান ও নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অনেকের কাছে হয়তো মনে হতে পারে, এই আলোচনাটা লাইভ বেকারি খাতকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা। কিন্তু বাস্তবতা মোটেও তেমন নয়। বরং এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে আরও নিরাপদ, টেকসই ও ভোক্তাবান্ধব করে তোলাই এই আলোচনার লক্ষ্য। লাইভ বেকারি নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করছে, কর্মসংস্থান বাড়াচ্ছে এবং ভোক্তাদের চাহিদাও পূরণ করছে। তাই এই খাতের বিকাশের পাশাপাশি খাদ্য-নিরাপত্তার মানও সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
এ জন্য বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে লাইভ বেকারির জন্য একটি গাইডলাইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। সেখানে উৎপাদনস্থলের ন্যূনতম আয়তন, নিরাপদ পানি ব্যবহার, কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বাধ্যতামূলক সুরক্ষা পোশাক, যন্ত্রপাতি পরিষ্কার রাখার মানদণ্ড, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পণ্যের লেবেলিং এবং নিয়মিত পরিদর্শনের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হলে তারা সহজেই এসব মানদণ্ড অনুসরণ করতে পারবেন।
একইসঙ্গে ভোক্তাদের সচেতনতাও বাড়াতে হবে। শুধু গরম বা টাটকা দেখেই খাদ্য কেনার পরিবর্তে দোকানের পরিচ্ছন্নতা, কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি এবং পণ্যের প্রয়োজনীয় তথ্য দেখে কেনার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সচেতন ভোক্তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার অন্যতম বড় শক্তি।
বাংলাদেশে লাইভ বেকারি শিল্পের সম্ভাবনা অনেক। প্রয়োজন শুধু এমন একটি নীতিমালা, যেখানে উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং ভোক্তার স্বাস্থ্য, উভয়ই সমান গুরুত্ব পাবে। কার্যকর তদারকি, বাস্তবসম্মত নির্দেশিকা এবং উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এই শিল্প আরও আস্থার জায়গা তৈরি করবে।
অভিবাসন নিতে আগ্রহী ব্যক্তিদের তালিকায় অস্ট্রেলিয়া হচ্ছে অন্যতম আকর্ষণীয় দেশ
অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতি ও জনপরিসরে অভিবাসন এখন সবচেয়ে উত্তপ্ত আলোচনার বিষয়। সিডনি, মেলবোর্নের কিংবা অন্য যেকোনো রাজপথে হাঁটলে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এখন মূলত দুটি সংকটের কথা শোনা যায়; বাসাবাড়ির ভাড়ার আকাশছোঁয়া বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার তীব্র ব্যয়ভার।
দীর্ঘদিনের এই ক্ষোভ ও রাজনৈতিক উত্তাপের পুরো দায় একপর্যায়ে গিয়ে পড়েছিল অভিবাসীদের কাঁধে। সেই পটভূমিতেই ক্যানবেরার ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে দাঁড়িয়ে দেশটির অভিবাসন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক অভিবাসনব্যবস্থার এক ব্যাপক সংস্কারের রূপরেখা ঘোষণা করলেন।
সিডনির মাটি থেকে প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা দিয়ে দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, ক্যানবেরা থেকে আসা বার্তাটি কোনো সাধারণ রুটিন প্রশাসনিক ঘোষণা নয়। এর সঙ্গে একদিকে যেমন যুক্ত রয়েছে দেশটির অভিবাসনব্যবস্থার দীর্ঘদিনের তৈরি হওয়া ফাঁকফোকর বন্ধের কড়া প্রশাসনিক তাগিদ, অন্যদিকে রয়েছে আসন্ন ফেডারেল নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন লেবার সরকারের জনমত ধরে রাখার সূক্ষ্ম রাজনৈতিক চাল।
ঘোষিত নীতিতে কী কী বদলাচ্ছে
নতুন নীতিমালায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী অভিবাসীদের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে। যে পরিবর্তনগুলো সরাসরি কার্যকর হতে যাচ্ছে, তার মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো:
১. পরিবার আনার সুযোগ বন্ধ: নতুন আসা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা আর তাঁদের সঙ্গে স্বামী, স্ত্রী বা সন্তানদের আনতে পারবেন না। গ্র্যাজুয়েট ভিসার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। কেবল ডক্টরেট বা পিএইচডি পর্যায়ের গবেষকেরা এই কড়াকড়ির বাইরে থাকবেন। তবে যাঁরা ইতিমধ্যে পরিবার নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন, তাঁদের পরিবার বিচ্ছিন্ন করা হবে না।
২. ভিসা বদলের ফাঁকফোকর বন্ধ: এত দিন অনেকেই পড়াশোনা শেষে দেশে না ফিরে কিংবা পিআর (স্থায়ী আবাসন) পাওয়ার শর্ত পূরণ করতে না পেরে ভিসার মেয়াদ বাড়াতে অপেক্ষাকৃত নিচু স্তরের কোনো মানহীন কারিগরি বা ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হতেন। এই ‘ভিসা হপিং’ পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষার্থীকে কেবল উচ্চতর স্তরের যোগ্যতায় যেতে হবে—যেমন স্নাতক শেষ করলে স্নাতকোত্তরে যাওয়া যাবে, কিন্তু ভিসা টিকিয়ে রাখতে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নিচের স্তরের ডিপ্লোমায় নামা যাবে না।
৩. ভ্রমণ ভিসায় স্থায়ী হওয়ার পথ রুদ্ধ: পর্যটক বা ভিজিটর ভিসায় বাধ্যতামূলকভাবে ‘অতিরিক্ত অবস্থানের সুযোগ নেই’ (নো ফারদার স্টে) শর্ত যুক্ত করা হচ্ছে। ফলে ভ্রমণের ভিসা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় এসে অনশোরে শিক্ষার্থী বা অন্য ভিসায় আবেদনের সুযোগ কার্যত শেষ।
৪. অবৈধ অভিবাসী প্রত্যাবাসন: বৈধ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান করা প্রায় ৭৭ হাজার অবৈধ ব্যক্তিকে শনাক্ত করে দ্রুত দেশত্যাগে বাধ্য করতে সীমান্ত রক্ষা বাহিনীতে নতুন ১০০ জন কর্মকর্তা নিয়োগ এবং মেলবোর্নের পুরোনো কোয়ারেন্টিন কেন্দ্র ব্যবহারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
৫. দক্ষ অভিবাসনের অগ্রাধিকার পরিবর্তন: অস্ট্রেলিয়ায় তীব্র আবাসনসংকট মেটাতে নির্মাণ খাতের কারিগরি দক্ষতাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রির সমান পয়েন্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষকতা ও কৃষিশ্রমের মতো ঘাটতি থাকা খাতগুলোতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
সংস্কারের বার্তা নাকি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ
এখন মূল প্রশ্ন হলো-এটি কি সত্যিই অভিবাসনব্যবস্থার ফাঁকফোকর বন্ধের সৎ প্রয়াস, নাকি আসন্ন নির্বাচনের বৈতরণি পার হওয়ার রাজনৈতিক চাল? বাস্তবতা হলো, এটি একই সঙ্গে দুটিই।
প্রশাসনিক দিক থেকে দেখলে, গত দুই দশকে জন হাওয়ার্ডের সরকারের আমল থেকে অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসনব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ চাহিদাভিত্তিক। বাজারের ওপর সব ছেড়ে দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন খাতে অস্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা হু হু করে বাড়ে।
আজ অস্ট্রেলিয়ার কর্মক্ষম জনসংখ্যার প্রায় ১৬ শতাংশই অস্থায়ী অভিবাসী। সংখ্যাটি প্রায় ৩০ লাখে পৌঁছে গেছে। ফলে আবাসন ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধার ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। সেই জায়গা থেকে অনিয়ম, অসৎ শিক্ষা এজেন্টদের দৌরাত্ম্য ও নামকাওয়াস্তে কলেজের ব্যবসা বন্ধ করতে নিয়মনীতি কঠোর করা একদিক থেকে যৌক্তিক।
কিন্তু ঘোষণার সময় এবং পরিপ্রেক্ষিতটি বিবেচনা করলে এর পেছনের রাজনৈতিক চালটি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে কট্টর ডানপন্থী নেত্রী পলিন হ্যানসনের দল ‘ওয়ান নেশন’ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে এবং শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের আবাসনসংকটের ভয় দেখিয়ে জনপ্রিয়তায় বড় উল্লম্ফন ঘটিয়েছে। জনমত জরিপে বিরোধী জোটের চেয়েও তারা এগিয়ে যাচ্ছিল এবং ক্ষমতাসীন লেবার দলের ভোটেও ভাগ বসাচ্ছিল। বিরোধী দলও অভিবাসী কমানোর দাবিতে সরকারকে কাঠগড়ায় তুলছিল।
অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান ক্ষমতাসীন লেবার সরকারের সামনে উভয়সংকট তৈরি হয়েছিল, একদিকে তারা অর্থনীতিকে ধাক্কা দিতে চায় না; কারণ দেশটির ৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাত ভেঙে পড়লে কিংবা নির্মাণ ও স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ কর্মী না এলে সার্বিক অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে।
তাই সরকার মোট অভিবাসীর সংখ্যায় নতুন কোনো বড় কাটছাঁট করেনি; মে মাসের বাজেটে ঘোষিত প্রাক্কলনকেই (চলতি অর্থবছরে ২ লাখ ৪৫ হাজার এবং পরবর্তী বছরে ২ লাখ ২৫ হাজার) কঠোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রূপ দিয়েছে। অর্থাৎ বাস্তবে নতুন কোনো সংখ্যা কমানো হয়নি, বরং ‘আমরা পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেছি’-জনগণ ও ওয়ান নেশন-ঘেঁষা ভোটারদের এই বার্তা দিয়ে নির্বাচনী ঝুঁকি কমানোই সরকারের মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব
এই নতুন বাস্তবতা বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য এক বিরাট ধাক্কা।
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার তরুণ অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। অনেক পরিবার জমিজমা বিক্রি করে কিংবা সঞ্চয় ভেঙে সন্তানদের পাঠান এই আশায় যে সেখানে গিয়ে স্বামী বা স্ত্রী কাজ করে পড়াশোনার খরচ জোগাবেন এবং কোনো না কোনো উপায়ে স্থায়ী হবেন।
নতুন নিয়মে পরিবার আনার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিবাহিত শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক ও আর্থিক চাপ বহুগুণ বেড়ে যাবে। একা একটি দেশে এসে আকাশছোঁয়া টিউশন ফি ও থাকার খরচ জোগাড় করা অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে উঠবে।
তা ছাড়া ঢাকা ও অন্যান্য শহরের কিছু মধ্যস্বত্বভোগী এজেন্সির পক্ষ থেকে চটকদার প্রচারণা চালানো হতো, ‘ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে শিক্ষার্থী হওয়া যায়’ কিংবা ‘একবার ঢুকতে পারলে কোনো না কোনো প্রাইভেট কলেজে ভর্তি হয়ে ভিসা নবায়ন করে থাকা যায়’। অস্ট্রেলিয়া সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপে সেই সব চোরাগলি একরাতের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেল।
বাংলাদেশিদের এখন কী করা উচিত?
সিডনির রাজপথে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ কিংবা অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটিতে তৈরি হওয়া উৎকণ্ঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তবে আতঙ্কিত না হয়ে এই বাস্তবতাকে ঠান্ডা মাথায় মোকাবিলা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
প্রথমত, এজেন্সির ফাঁদে পা দেওয়া বন্ধ করতে হবে: ঢাকায় বসে কোনো এজেন্টের কথায় বিশ্বাস করে ‘যেকোনো উপায়ে আগে অস্ট্রেলিয়া পৌঁছাই, পরে দেখা যাবে’-এই আত্মঘাতী ভাবনা মাথা থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে হবে। ভিসা বদল বা আপিলের দীর্ঘসূত্রতায় বছর পার করার দিন শেষ।
দ্বিতীয়ত, মেধা ও আর্থিক সক্ষমতার সঠিক মূল্যায়ন: অস্ট্রেলিয়া উচ্চশিক্ষার দরজা বন্ধ করেনি, বরং মানসম্মত উচ্চশিক্ষার জন্য পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে। যাদের চমৎকার একাডেমিক রেকর্ড, ভালো ইংরেজি দক্ষতা এবং পড়াশোনার খরচ চালানোর মতো বাস্তব আর্থিক সংগতি রয়েছে, তাঁদের জন্য দরজা এখনো খোলা। যাঁদের মূল লক্ষ্য স্রেফ কাজ করা বা পরিবার নিয়ে থাকা, তাঁদের বর্তমান নিয়মে অস্ট্রেলিয়া না আসাই শ্রেয়।
তৃতীয়ত, চাহিদাসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া: যাঁরা শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হতে চান, তাঁদের অস্ট্রেলিয়ার শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার দিকে তাকাতে হবে। নির্মাণ প্রকৌশল, নার্সিং, স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষায়িত শিক্ষকতা ও প্রযুক্তিগত পেশাগুলোতে এখনো দক্ষ অভিবাসীদের তীব্র প্রয়োজন। তাই সাধারণ কোনো ব্যবসায়িক বা নামকাওয়াস্তে ডিপ্লোমা কোর্সে না গিয়ে সরাসরি অস্ট্রেলিয়ার অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা পেশাভিত্তিক বিষয়ে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করতে হবে।
চতুর্থত, যাঁরা ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় আছেন: যে শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যে দেশটিতে অবস্থান করছেন, তাঁদের জন্য পরিবার বিচ্ছিন্ন করার নিয়ম নেই। তবে তাঁদের উচিত হবে কোনো অসৎ পরামর্শে সস্তা কোর্সে না গিয়ে নিজ নিজ মেধা দিয়ে মূলধারার পড়াশোনা শেষ করা এবং যত দ্রুত সম্ভব বৈধ পথে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করা।
অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে অভিবাসন এখন একটি কঠিন ফুটবলের মতো, এক দল অন্য দলের দিকে ছুড়ে মারছে। তবে এই রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যেও মূল সত্যটি হলো: অস্ট্রেলিয়া কখনোই অভিবাসন পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবে না।
কারণ, তাদের অর্থনীতির টিকে থাকার জন্যই দক্ষ মানুষ দরকার। যাঁরা নিয়ম মেনে প্রকৃত মেধা ও স্পষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোবেন, তাঁদের পথ এখনো খোলা। কিন্তু ফাঁকফোকর খুঁজে টিকে থাকার দিন যে শেষ, ক্যানবেরার এই কঠোর বার্তায় তা নিয়ে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।
কাজী আসমা আজমেরী ও অপ্রিতম
একজন বিদেশি বাবা আমাকে শিখিয়েছিলেন—সন্তানকে ভালোবাসা আর দামি কিছু দেওয়া, ভালোবাসা প্রকাশের একমাত্র উপায় নয়। আজ একটি মর্মান্তিক ঘটনা দেখে হঠাৎ ২০১২ সালের নিউজিল্যান্ডের একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। ঘটনাটি এত বছর পরও আমার মনে স্পষ্ট। ২০১২ সালে আমি নিউজিল্যান্ডে কাজ করতাম। সেই সময় নিউজিল্যান্ডের রাজধানী ওয়েলিংটনে আমার বন্ধু পিটারের সঙ্গে দেখা হয়। পিটারের ছোট্ট একটি মেয়ে ছিল এলিনা। বয়স তখন মাত্র সাড়ে ছয় কিংবা সাত বছর।
পিটারের ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল। তার সাবেক স্ত্রী কানাডায় থাকতেন। আর পিটার তার মেয়েকে নিয়ে একটি বোটে থাকতেন- যাকে বলা হয় ‘বোট হাউস’। জায়গাটি ছিল পিকটন এলাকায়। পিটার একদিন আমাকে বলল, “তুমি পিকটনে এসো। আমাদের সঙ্গে থেকো। তোমার খুব ভালো লাগবে।”
আমি তখন কায়াকুরা যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলাম। পৃথিবীর বিখ্যাত তিমি দেখার জায়গাগুলোর একটি কায়াকুরা—আর তিমি দেখা আমার অনেক দিনের স্বপ্ন। তাই ভাবলাম, ওয়েলিংটন থেকে ফেরিতে পিকটন হয়ে তারপর কায়াকুরা যাব। পরের মাসে ছুটি পেয়ে আমি সত্যিই পিকটনে চলে গেলাম।
পিটার তখন শুধু ট্যুর গাইডই ছিল না; সে একজন বিশ্বমানের প্যারাগ্লাইডিং চ্যাম্পিয়নও ছিল। ২০০৪ থেকে ২০০৮ সালের সময়কালে সে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নিউজিল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করেছিল। পাশাপাশি প্যারাগ্লাইডিং প্রশিক্ষণ দিত এবং নিজের বোটে পর্যটকদের ঘুরিয়ে দেখাত।
প্রথম রাতে আমি পিকটনের একটি হোস্টেলে থাকলাম। সেখানে সুইডেন থেকে আসা কয়েকজন নতুন বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় হলো। অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে পরদিন পিটারের বোটে যাওয়ার কথা হলো। রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। পিটারের বোটটি ঘাটের একেবারে পাশে ছিল না। সেখানে পৌঁছাতে কায়াক করতে হতো। আমি কায়াক করতে পারতাম না।
আর তখনই ঘটল এমন একটি ঘটনা, যা আজও আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে। সাড়ে ছয়-সাত বছরের ছোট্ট এলিনা ঘুম থেকে উঠে, আধো ঘুম চোখে, আমাকে কায়াক করে বোটে নিয়ে গেল! আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিল—আল্লাহ! এত ছোট একটা বাচ্চা, আর সে আমার জন্য এত রাতে কায়াক করছে!
পিটার নিজের একটি বোটে যাচ্ছিল, আর এলিনা আমাকে নিয়ে অন্যদিকে যাচ্ছিল।
বোটে পৌঁছে আমি আরও অবাক হলাম। এটি ছিল সুন্দর, আধুনিক এবং বেশ বিলাসবহুল একটি বোট—তিনটি বেডরুম, রান্নাঘর, বসার জায়গা, ডাইনিং স্পেস, এমনকি ছাদেও বসার ব্যবস্থা ছিল। পিটারের স্বপ্ন ছিল একদিন এই বোট নিয়ে পৃথিবী ভ্রমণ করবে। আমি সেখানে কয়েকদিন ছিলাম। একদিন সকালে পিটার বাজারে চলে গেল। এলিনা তখন একা।
তার সঙ্গে গল্প করতে গিয়ে আমার হঠাৎ একটা বিষয় মনে হলো—পিটার বাইরে গেলে এই ছোট্ট মেয়েটি যদি কোনো বিপদে পড়ে? যদি ভয় পায়? যদি তার বাবার সঙ্গে জরুরি যোগাযোগ করার প্রয়োজন হয়? কিন্তু তার কাছে কোনো মোবাইল ফোন নেই, ওয়াকি-টকি নেই—যোগাযোগের তেমন কোনো ব্যবস্থাই নেই।
আমি তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই ভাবলাম, একটা ফোন কিনে দিলে কেমন হয়?
আমি এলিনাকে নিয়ে শপিং সেন্টারে গেলাম এবং ২০১৩ সালের সেই সময়ে প্রায় ১৮০ ডলার দিয়ে একটি সুন্দর গোলাপি রঙের ফোন কিনে দিলাম। ফোনটিতে ছবি তোলা যেত, হাতে লিখে ব্যবহার করা যেত—একজন ছোট শিশুর জন্য বেশ চমৎকার একটি ডিভাইস ছিল। আমার ধারণা ছিল, পিটার নিশ্চয়ই খুশি হবে।
কিন্তু আমি সম্পূর্ণ ভুল ভেবেছিলাম।
পিটার ফোনটি দেখেই আমার ওপর প্রচণ্ড রেগে গেল। সে বলল, “তোমার এত বড় সাহস কীভাবে হলো আমার মেয়েকে এত দামি একটা উপহার দেওয়ার?”
আমি তো হতবাক! আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, “আমি তো ওকে নষ্ট করার জন্য দিইনি। তুমি যখন বাইরে থাকবে, তখন যেন ও তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। ওর মায়ের সঙ্গেও যদি কখনো কথা বলার দরকার হয়, যেন যোগাযোগ করতে পারে—সেই জন্যই দিয়েছি।” কিন্তু পিটার রাজি হলো না।
সে বলল, “আজ ওর জন্মদিন নয়। কোনো বিশেষ দিনও নয়। তাহলে ওকে এত দামি উপহার কেন দেওয়া হবে?” তারপর সে আমাকে এমন একটি কথা বলল, যা তখন আমার খুব খারাপ লেগেছিল। সে বলল, “একটা ছোট বাচ্চা যদি খুব সহজে দামি জিনিস পেয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে সে কোনো কিছুর মূল্য বুঝবে না। কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করা, পরিশ্রম করা কিংবা মায়া তৈরি করা—এসব শেখা দরকার।”
সে আমাকে ফোনটি ফেরত দিয়ে টাকা নিয়ে আসতে বলল। আমি সত্যিই লজ্জায় পড়ে গেলাম। আমাদের দেশে কাউকে একটি মোবাইল ফোন উপহার দিলে আমরা সাধারণত খুশি হই। বরং ১৫-২০ হাজার টাকার একটি ফোন উপহার পেলে অনেকে সেটাকে অনেক বড় ভালোবাসার প্রকাশ মনে করেন। কিন্তু পিটারের কাছে বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
শেষ পর্যন্ত আমি দোকানে গিয়ে ফোনটি ফেরত দিলাম এবং ক্রেডিট নোট নিয়ে বের হলাম। ঘটনা এখানেই শেষ নয়। সেদিন আমি এলিনাকে নিয়ে একটি ভালো রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়ার কথা ভাবলাম। আইসক্রিম খাওয়াব বলে তাকে নিয়ে ঢুকছিলাম। ঠিক তখন পিটার ফোন করল। “তুমি কোথায়?” আমি বললাম, “ওকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে এসেছি। আইসক্রিম খাওয়াব।”
পিটার আবার বলল, “আজ কি ওর জন্মদিন?” আমি বললাম, “না।” সে বলল, “তাহলে এত দামি জায়গায় কেন? বার্গার খাওয়াতে চাইলে Burger King-এ নিয়ে যাও, McDonald's-এ নিয়ে যাও। কিন্তু প্রতিদিন যদি তুমি ওকে দামি রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাও, তাহলে কোনো বিশেষ দিনে দামি জায়গায় গেলেও সেটা তার কাছে আর বিশেষ মনে হবে না।”
সেদিন আমার সত্যিই মন খারাপ হয়েছিল। মনে হয়েছিল—কী অদ্ভুত মানুষ! আমি ভালোবেসে একটা ফোন কিনে দিলাম, সে নিল না। বাচ্চাকে একটু ভালো জায়গায় খাওয়াতে চাইলাম, সেটাও পছন্দ হলো না। কিন্তু আজ এত বছর পর দাঁড়িয়ে আমি বুঝি—সেদিন পিটার আমাকে আসলে একটা বড় শিক্ষা দিয়েছিল।
শিশুকে ভালোবাসা আর শিশুর প্রতিটি চাওয়া পূরণ করা—এক জিনিস নয়।
শিশুকে সবকিছু সহজে দিয়ে দেওয়া হয়তো সাময়িক আনন্দ দিতে পারে। কিন্তু কোনো কিছু পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করা, প্রয়োজন আর বিলাসিতার পার্থক্য বোঝা এবং জিনিসের মূল্য উপলব্ধি করা—এসবও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আজকের একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাকে আবার সেই ছোট্ট এলিনার কথা মনে করিয়ে দিলো।
একটি ছোট ছেলে আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে গিয়েছিল। পরে সেই ফোনকে ঘিরে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনায় শিশুটির জীবন হারানোর খবর আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। একটি শিশুর এভাবে চলে যাওয়া সত্যিই অত্যন্ত কষ্টের। তার পরিবারের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা। একই সঙ্গে এই ঘটনা আমাদের সবার জন্য একটি সতর্কবার্তাও হতে পারে।
আমি কোনো শিশুর মৃত্যুর জন্য তার বাবা-মাকে সরাসরি দায়ী করতে চাই না। আমরা পুরো ঘটনা, পরিস্থিতি এবং পরিবারের বাস্তবতা জানি না। কিন্তু একজন মা-বাবা হিসেবে আমাদের নিজেদের কাছে কিছু প্রশ্ন করা দরকার। আমরা কি সন্তানকে শুধু দামি জিনিস দিচ্ছি, নাকি তাকে সেই জিনিস ব্যবহারের সঠিক শিক্ষা ও দায়িত্ববোধও শেখাচ্ছি?
আমরা কি সন্তানের হাতে মোবাইল দিয়ে নিজের দায়িত্ব শেষ করছি, নাকি তার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছি? আমরা কি তাকে শুধু ভালো স্কুলে পড়াচ্ছি, নাকি ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাটাও দিচ্ছি? মোবাইল ফোন খারাপ নয়। প্রযুক্তিও খারাপ নয়। আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তি আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিন্তু একটি ছোট শিশুর হাতে স্মার্টফোন দেওয়ার আগে তাকে শেখানো জরুরি—কোথায় ফোন ব্যবহার করতে হয়, কোথায় করা উচিত নয়, অপরিচিত কারও সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করতে হয়, নিজের অবস্থান কীভাবে নিরাপদ রাখতে হয় এবং কোনো বিপদে পড়লে কীভাবে বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে ফোন দেওয়ার বিষয়টি বয়স, প্রয়োজন, নিরাপত্তা এবং অভিভাবকের তত্ত্বাবধান বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
পশ্চিমা বিশ্বের অনেক পরিবারে আমি দেখেছি, সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই শুধু প্রযুক্তির সঙ্গে নয়—প্রকৃতি, খেলাধুলা, বই, সংগীত, ভ্রমণ এবং বিভিন্ন বাস্তব জীবনের দক্ষতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। রাশিয়ায় গিয়ে আমি এমনও দেখেছি—৬-৭ বছরের শিশুদের বাবা-মা পার্কে নিয়ে যাচ্ছেন, দৌড়াতে শেখাচ্ছেন, বিভিন্ন শারীরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দিচ্ছেন, নতুন কিছু শেখাচ্ছেন।
আর আমাদের অনেক পরিবারে কী হচ্ছে? বাচ্চা বিরক্ত করছে? “এই নাও মোবাইল। ইউটিউব দেখো।” মা-বাবা ব্যস্ত? “এই নাও ফোন। আমাকে বিরক্ত করো না।” এভাবে ধীরে ধীরে মোবাইল হয়ে যায় শিশুর খেলনা, সঙ্গী এবং বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। অথচ একটা শিশুর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাবা-মায়ের সময়, ভালোবাসা, শাসন, খেলাধুলা, গল্প, বই, প্রকৃতি এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা।
আমি আমার বিভিন্ন বক্তব্যে প্রায়ই বলি— সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য বিশেষ কোনো ডিগ্রি লাগে না। কিন্তু একজন ভালো বাবা-মা হওয়ার জন্য শিক্ষা, সচেতনতা, ধৈর্য এবং দায়িত্ববোধ প্রয়োজন। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকলেই কেউ ভালো বাবা বা মা হয়ে যায় না। সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করানোই শিক্ষা নয়।
সন্তানকে দামি ফোন কিনে দেওয়াও ভালোবাসার শেষ প্রমাণ নয়।
তাকে শেখাতে হবে—কোনটা তার প্রয়োজন। কোনটা বিলাসিতা। কোনটা নিরাপদ। কোনটা বিপজ্জনক। কোন জিনিস অনুমতি নিয়ে নিতে হয়। কোন পরিস্থিতিতে “না” বলতে হয়। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— নিজের জীবন ও নিরাপত্তার দায়িত্ব কীভাবে নিতে হয়। স্কুলে সব শিশুকে একই রঙের ইউনিফর্ম পরানোর একটি সুন্দর সামাজিক উদ্দেশ্য আছে—ধনী-গরিবের পার্থক্য যেন পোশাক দিয়ে স্পষ্ট না হয়, সবাই যেন একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে নিজেকে অনুভব করে।
কিন্তু স্কুলের বাইরে আমরা যেন আবার সন্তানদের মধ্যে এমন প্রতিযোগিতা তৈরি না করি— “কার ফোন বেশি দামি?” “কার পোশাক বেশি দামি?” “কার গাড়ি বড়?” “কার জীবনযাপন বেশি বিলাসী?” একটি শিশুর আত্মসম্মান যেন তার হাতে থাকা ফোনের দামের ওপর নির্ভর না করে। আমি নিজের জীবনেও সবসময় বুঝেছি—কোনো কিছু পাওয়ার আনন্দ তখনই বেশি হয়, যখন তার মূল্য বোঝা যায়।
২০১৩ সালে এলিনার সেই গোলাপি ফোনটি আমি শেষ পর্যন্ত তাকে দিতে পারিনি। তখন আমার খুব খারাপ লেগেছিল। কিন্তু আজ মনে হয়, পিটার আমাকে যে শিক্ষা দিয়েছিল, সেই শিক্ষাটাই হয়তো সেই ১৮০ ডলারের ফোনের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান ছিল। কিছু ভালোবাসা হাতে তুলে দিতে হয়। আবার কিছু ভালোবাসা শিক্ষা হিসেবে দিতে হয়।
আজ যে ছোট্ট শিশুটি আমাদের ছেড়ে চলে গেল, তার পরিবারের জন্য সত্যিই আমার হৃদয় থেকে কষ্ট হচ্ছে। একটি শিশুর জীবন কোনোভাবেই একটি ফোন, একটি খেলনা, একটি স্ট্যাটাস কিংবা কোনো বস্তুগত জিনিসের চেয়ে মূল্যবান হতে পারে না। তাই বাংলাদেশের প্রতিটি মা-বাবার কাছে আমার অনুরোধ— সন্তানকে শুধু সফল বানানোর চেষ্টা করবেন না, তাকে সচেতন ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন।
তাকে শুধু ইংরেজি শেখাবেন না—জীবন শেখান। শুধু ভালো স্কুলে পাঠাবেন না—ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিন। শুধু ফোন কিনে দেবেন না—জরুরি অবস্থা ছাড়া, সেটাও শেখান। শুধু টাকা খরচ করবেন না—সময় দিন। কারণ সন্তানকে বড় করা সহজ। কিন্তু একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা—সেটাই আসল দায়িত্ব।
সন্তানের হাতে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ফোন তুলে দেওয়ার চেয়ে, তার মাথার ভেতর সঠিক শিক্ষা আর হৃদয়ের ভেতর মানবিকতা তৈরি করা অনেক বেশি জরুরি। তাহলে তাদের সন্তানটি হয়তোবা আজকে বেঁচে থাকত। হাজার মন্ত্রী মিনিস্টারকে ফোন করলেও বাচ্চাটার ফিরে আসবে না, হয়তো বাচ্চাটার মৃত্যুর বিচার হবে ? কিন্তু মৃত্যুর আগে যদি আমরা একটু কেয়ারফুল হতাম তাহলে তিনি বাচ্চাটা মরতো?
হায় আল্লাহ, আমাদের সবাইকে ভালো বাবা-মা হওয়ার শিক্ষা দিন। চিন্তা চেতনার পরিবর্তনার। নাহলে আপনাদের সুন্দর ছেলেমেয়েরা নষ্ট হয়ে যাবে, এটা কোন শিক্ষা নয় এটা অশিক্ষা কে বলে। আমাদের সন্তানদের নিরাপদ রাখুন, সচেতন রাখুন এবং ভালো শিশুর জীবন অপ্রয়োজনীয় কোনো জিনিসের কারণে অঝোরে হারিয়ে না যায়।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)
২০২৭ সালের নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ পাঠ্যবইয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধ ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নতুন অধ্যায় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে- এটা নতুন খবর নয়। এরই মধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় সব সংবাদমাধ্যমে খবরটা প্রকাশিত হয়েছে।
সেই খবর অনুযায়ী, ইতিহাসে যার যতটুকু অবদান, তা নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে পাঠ্যবইয়ে তুলে ধরতে আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নির্মোহ থেকে এবং ক্ষমতার প্রভাব মুক্ত হয়ে ইতিহাস রচনা করে নিরপেক্ষ ও সত্য ইতিহাস জাতির কাছে তুলে ধরতে পারা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু সেটা যে পারা যায় না, তা এতকাল পরে আবারও নিরপেক্ষ ও সত্য ইতিহাস জানাবার প্রয়াস থেকেই বোঝা যায়।
কোনো জাতি কতটা পথহারা হলে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও তার জন্মের সত্য ইতিহাস খুঁজতে মাঠে নামতে বাধ্য হয় এবং পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন আনতে হয়। এই সত্য খোঁজাখুঁজির ফলে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ একেক রকম করে উপস্থাপিত হচ্ছে।
ইতিহাস যেন বাস করে ক্ষমতার ঘরে। ‘বিজয়ীরাই ইতিহাস লেখে’-এমন একটা কথা নাকি উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন। ঠিক এই বাক্যটি তিনি বলেছিলেন কিনা তা খুঁজে পাওয়া না গেলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যখন যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে চার্চিল পরাজিত হলেন, তখন তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন, “ইতিহাস আমার প্রতি সদয় হবে, কারণ এটি লেখার ইচ্ছা আমার নিজেরই আছে।”
এই প্রচ্ছন্ন অহংকার আর দূরদর্শিতা থেকেই পরবর্তীকালে তিনি রচনা করেন তার বিখ্যাত বহুখণ্ডের গ্রন্থ ‘দ্য সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার'। মিত্রপক্ষের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে চার্চিল ভালো করেই জানতেন, যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র দিয়ে সাম্রাজ্য জয় করা সম্ভব হলেও, মানবমন জয় করতে হলে ইতিহাসকে নিজের বয়ানে সাজাতে হয়। তাই সেই বিশাল ঐতিহাসিক স্মারকে তিনি নিজের ও মিত্রশক্তির সামরিক সিদ্ধান্ত, কৌশল ও বীরত্বকে উজ্জ্বলতম আলোয় ফুটিয়ে তুলেছিলেন, আর কৌশলগতভাবে আড়াল করেছিলেন তাদের নানাবিধ ভুলত্রুটি ও কূটনৈতিক অন্ধকার দিকগুলো। চার্চিল প্রমাণ করেছিলেন যে বিজয়ী রাষ্ট্রনায়করা শুধু যুদ্ধই জেতেন না, যুদ্ধের পর নিজেদের সুবিধামতো ইতিহাস পুনর্নির্মাণ করে নিজেদের অপরাধ ঢেকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নিজেদের চিরন্তন নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেল, নতুন পাঠ্যপুস্তকে থাকছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। বলা হচ্ছে, যার যতটা অবদান ততটাই থাকবে পাঠ্যপুস্তকে। কিন্তু এই অবদান পরিমাপ হবে কিসের ভিত্তিতে?
আশা করি কর্তৃপক্ষ সেক্ষেত্রে সময়, পরিধি, প্রেক্ষাপট, পরিস্থিতি, পরিবেশ, প্রতিকূলতা, অনুকূলতা, দূরদর্শিতা, নেতৃত্বের গভীরতা, স্বাধীনতা সংগ্রামে দৃঢ়চিত্ততা, মুক্তির লক্ষ্যে একনিষ্ঠতা, সঠিক ও সময়মাফিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সত্যিকারের দেশপ্রেমকে বিবেচনায় নিয়ে তাদের অবদান তুলে ধরবেন। নতুন অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করা হলেও জাতির অন্যান্য বীর সন্তানদের অবদান কিভাবে তুলে ধরা হবে তা সুস্পষ্ট নয়। আশা করি শিগগিরই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এ সংশয় দূর করবে।
একটি দেশের ইতিহাস শুধু আর্কাইভ, গবেষণাগার এবং ইতিহাসবিদের বইয়ে সংরক্ষিত থাকে না। ইতিহাসকে সামনে এগিয়ে নেয় নতুন প্রজন্ম। আর নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের প্রথম ও প্রভাবশালী পরিচয় হয় পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে। যদিও বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাস বদলেছে বারবার। কখনো পুরো শিক্ষাক্রম, কখনো নির্দিষ্ট বই, কখনো একই বইয়ের একটি অধ্যায় বা কয়েকটি অনুচ্ছেদ। কখনো বা পরিবর্তিত হয়েছে একটি ঘটনার কয়েকটি বাক্যও।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত প্রথম থেকে দশম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক সংশোধন, পরিমার্জন ও পুনর্লিখন করা হয় খুব দ্রুত। নবজাত রাষ্ট্রের প্রয়োজন, নতুন রাষ্ট্রচেতনা ও আধুনিক ধারণা পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। পরে ১৯৭৮-৭৯ সালে নতুন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে বই প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯৯১ সালের প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত। ১৯৭১-সংক্রান্ত বিষয় হিসেবে বীরশ্রেষ্ঠদের সংক্ষিপ্ত জীবনীই ছিল প্রধান উপাদানগুলোর একটি। ১৯৯৩ সালে পরিবেশ পরিচিতি (সমাজ) বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ যুক্ত হয়। সেখানে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে এম এ হান্নান ও মেজর জিয়াউর রহমানের নাম ছিল। এই বর্ণনা বহাল ছিল ২০০১ সাল পর্যন্ত। ১৯৯৬ সালে মাধ্যমিক স্তরের বিভিন্ন বইয়ে ১৯৭১-এর ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক লেখা, কবিতা ও জীবনী নতুনভাবে যুক্ত করা হয়।
২০০১ সালে সরকার পরিবর্তনের পর সেই বর্ণনায় আবার বড় পরিবর্তন আসে। ৭ই মার্চের ভাষণ এবং বঙ্গবন্ধুর নামের কিছু উল্লেখ বাদ দেওয়া হয়। পরিবেশ পরিচিতি (সমাজ) বইয়ে আগের এম এ হান্নান ও মেজর জিয়া সংক্রান্ত বর্ণনা পরিবর্তন করে এম এ হান্নানের নাম এবং ‘বঙ্গবন্ধুর পক্ষে’ কথাটি বাদ দেওয়া হয়; ঘোষণার তারিখও ২৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ করা হয়। ফলে একই ঐতিহাসিক ঘটনা পাঠ্যবইয়ের ভাষায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে কীভাবে বদলেছে, এটা তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
২০১০ সালের পরের বইগুলোতে আবার বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা জোরালোভাবে উপস্থাপিত হয়। ২০২৫ সালের বইয়ে সেই বর্ণনা পুনরায় পরিবর্তিত হয়ে বলা হয়, ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আবার ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘জাতির পিতা’ পরিচয়ও নতুন বই থেকে বাদ দেওয়া হয়। কিছু বইয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নামের সঙ্গে ব্যবহৃত ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির ব্যবহার কমানো এবং ৭ই মার্চের ভাষণ-সংবলিত কিছু পাঠ বাদ দেওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
একই ঐতিহাসিক ঘটনার ব্যাখ্যা রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায়। তাই পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের বর্ণনা কেবল শিক্ষাব্যবস্থার বিষয় নয়; রাষ্ট্র, রাজনীতি ও জাতীয় পরিচয়ের ওপরও নির্ভরশীল! একটি জাতির ইতিহাস শুধু অতীতের ঘটনা নয়, নতুন প্রজন্ম সেই ইতিহাসকে কীভাবে জানবে তার ওপর নির্ভর করে জাতীয় স্মৃতি ও সেই রাষ্ট্রের পরিচয়। একই ঘটনা কোন সময়ে কীভাবে লেখা হয়েছে, কী বাদ গেছে, কী যুক্ত হয়েছে এবং কেন পরিবর্তন করা হয়েছে? প্রশ্নগুলোর উত্তরই বলে দেয় জাতির ইতিহাস পাঠ্যবইয়ে কতবার পরিবর্তন হয়েছে এবং কতটা সময়ের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বয়ানের প্রভাবে নির্মিত হয়েছে।
স্বাধীনতার ঘোষণা বিষয়টি এ বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০১০ সালের পর পাঠ্যবইয়ে বলা হতো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ গ্রেপ্তারের আগে ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের বইয়ে আবার বর্ণনা পরিবর্তন করে বলা হয়, ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে পুনরায় ঘোষণা করেন।
একই ঘটনা একেক সরকারের সময়ে একেকভাবে লেখা হলে শিক্ষার্থীর সামনে ইতিহাসের ব্যাখ্যা বদলে যায়। তাই ভবিষ্যতের পাঠ্যবই প্রণয়নের গুরুত্বপূর্ণ নীতি কোনো রাজনৈতিক সরকারের তাৎক্ষণিক বয়ানের ওপর নির্ভর করে নয়- কে ঘোষণা করেছিলেন, কোন পরিস্থিতিতে করেছিলেন, কেন করেছিলেন তা পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তুলে ধরা উচিত। এক্ষেত্রে ১৯৭১ সালের মূল ঐতিহাসিক দলিল, বেতার বার্তা, সমকালীন সংবাদপত্র, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, সরকারি নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ এবং পরবর্তী সাংবিধানিক দলিল পাশাপাশি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
তবেই প্রতিষ্ঠিত সত্য উঠে আসা সম্ভব। প্রতিনিয়ত পরিবর্তন মূলত দেখায়- রাষ্ট্র কোন সময়ে ইতিহাসকে কীভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করেছে। কারণ সরকার বদলাবে, রাজনৈতিক বয়ানও বদলাতে পারে। কিন্তু পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের সত্য অনুসন্ধানের পদ্ধতি যেন না বদলায়।
একটি সরকারের সময়ে ইতিহাসের যে ভাষা সত্য হিসেবে শিক্ষার্থীর সামনে আসে, পরবর্তী সরকারের সময়ে সেটিই যদি পাল্টে যায় তাহলে প্রশ্ন ওঠে- ইতিহাস কি তবে রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত? তাই কোনো রাজনৈতিক বয়ানে সীমিত রাখা নয়; বহুমাত্রিক প্রাথমিক দলিল, স্বাধীন গবেষণা, সমকালীন নথি ও যাচাইযোগ্য প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত পাঠ্যবইয়ে জাতির ইতিহাস।
একটি জাতির ইতিহাস কতবার বদলায়, কেন বদলায়, কী প্রমাণের ভিত্তিতে বদলায় এবং কে সেই পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়? ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে যদি পাঠ্যপুস্তকে জাতির ইতিহাস পরিবর্তিত হয় তাহলে ইতিহাস বদলায় নাকি তার বয়ান? এটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জাতির সত্য ইতিহাস না জানাতে পারার লজ্জা! ক্ষমতার প্রভাব ও মসনদ ধরে রাখার জন্য স্রোতের অনুকূলে গুণকীর্তন করা হয়, যার প্রভাব পড়ে কোমলমতি শিশুদের চিন্তায়। যে শিশু সময়ের সঙ্গে তার জন্মভূমির ইতিহাসের পরিবর্তন হতে দেখে, তার মনে আপনি দেশপ্রেমের বীজ বুনবেন কী করে?
যে শিশুটি নবম-দশম শ্রেণিতে ইতিহাস সম্পর্কে নিরপেক্ষ, নির্মোহ এবং নতুন করে আরেকটি অধ্যায় জানবে, সে কিন্তু বছর আড়াই আগে তার পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের আরেক রূপ দেখেছে; তার স্কুলে জাতীয় দিবসগুলো অন্যরকমভাবে পালন করেছে। এই যে সময়ে ইতিহাসের অতিরঞ্জন, নিরপেক্ষ আর সত্যের নামে স্বার্থান্বেষিত- এগুলোই শিক্ষার্থীদের মনে সংশয়ের জন্ম দেয়, যা পরবর্তীতে রূপ নেয় সাংঘর্ষিকতায়।
ইতিহাস কি রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন করে লেখা হবে, নাকি প্রাথমিক দলিল ও যাচাইযোগ্য গবেষণার ভিত্তিতে স্থিতিশীল একটি ইতিহাসচর্চা গড়ে উঠবে- যা হবে চিরস্থায়ী? স্বাধীনতাযুদ্ধ কোনো দলের একার নয়, নির্দিষ্ট কোনো নেতার নয়; এ যুদ্ধ ছিল সাড়ে সাত কোটি জনতার মুক্তির লড়াই। যে লড়াইয়ে কেউ হারিয়েছে সহায়-সম্বল, কেউ প্রিয়জন।
লাখো শহীদের রক্তে পাওয়া স্বাধীনতা কারো ক্ষমতা ধরে রাখার তাসের টেক্কা হতে পারে না। পাঠ্যবই কোনো সরকারের রাজনৈতিক স্মারক নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অতীতকে জানার ও বোঝার জানালা। সেই জানালায় রাজনৈতিক পালাবদলের ছায়া নয়, সত্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে স্থায়ী এবং সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং একসঙ্গে
বিশ্বরাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে নয়াদিল্লিতে হয়ে গেল ব্রিকসের ২০২৬ সালের সম্মেলন। সম্প্রসারিত এই জোটে সদস্যসংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্বও। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত থেকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মতো নেতাদের অংশগ্রহণ এবারের সম্মেলনকে অ–পশ্চিমা বিশ্বের বড় কূটনৈতিক সমাবেশে পরিণত করেছে। এ কারণেই ব্রিকস বড় ধরনের আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্রিকসের চেয়ারম্যান হিসেবে ভারতের চতুর্থ মেয়াদ অবশ্য বেশ নিরুত্তাপ। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনের মতো এবার জাঁকজমক দেখা যাচ্ছে না। সে সময় কয়েক মাস ধরে রাজধানীর সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হয়েছিল। বিভিন্ন স্থানে রঙিন দেয়ালচিত্র আঁকা হয়েছিল। বিদেশি অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশাল বিলবোর্ডও ছিল। এবার প্রস্তুতি অনেকটাই নীরব ও সংযত।
ব্রিকস এখন যুক্তরাষ্ট্রের নজরেও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ব্রিকসের ১১টি সদস্যদেশ ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর পথে এগোলে তাদের ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপ করা হবে।
অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাত ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ বিরোধও সামনে এনেছে। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই সংঘাতে ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। ফলে জোটটি যত বড় হয়েছে, তাকে একমত করানো তত কঠিন হয়েছে। অথচ ১১ বছর আগে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর উল্লেখযোগ্য বাস্তব সাফল্যের তালিকা খুব দীর্ঘ নয়।
তারপরও ভারতের জন্য এবারের সম্মেলন একটি বড় কূটনৈতিক সুযোগ। নয়াদিল্লির প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, তার দুই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে একই জায়গায় এনে একটি যৌথ ঘোষণা গ্রহণ করানো। ভারত যদি তা করতে পারে, তাহলে পশ্চিম এশিয়ার পরস্পরবিরোধী দুই দেশের মধ্যে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার ভূমিকা আরও জোরালো হবে।
এমন সাফল্য পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর ভারতের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হবে। পাকিস্তান কিছুদিন আগে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতায় সাফল্যের দাবি করেছিল। কিন্তু ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক কার্যকর হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ভেঙে পড়ে। ভারত সফল হলে সেটি ২০২৩ সালে জি-২০ সম্মেলনে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে অভিন্ন ভাষা তৈরির সাফল্যের ধারাবাহিকতা হবে।
ভারতের জন্য এবারের সম্মেলনে কোনো বড় বিরোধ ছাড়াই বর্তমান অবস্থান ধরে রাখতে পারা একটি কূটনৈতিক সাফল্য হবে। কিন্তু তাতেও ১১টি দেশের সামনে থাকা সবচেয়ে বড় প্রশ্নটির উত্তর মিলবে না। ব্রিকস শেষ পর্যন্ত কী হতে চায়; একটি অর্থনৈতিক সহযোগিতার মঞ্চ, নাকি পশ্চিমা প্রভাবের বিকল্প একটি ভূরাজনৈতিক শক্তি? এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে জরুরি।
একই সঙ্গে রাশিয়া ও ইউক্রেনকে আলোচনার টেবিলে আনায় ভারতের প্রচেষ্টাও শক্তিশালী হবে। গত মাসে কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে মোদি পুতিনকে ‘অন্তহীন যুদ্ধ থেকে অবসানের’ পথে যাওয়ার আহ্বান জানান। কয়েক দিন পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ সফর করে বলেন, যুদ্ধ বন্ধে সংলাপ ও কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই। ইউক্রেন যুদ্ধ প্রায় পাঁচ বছরে পা দিতে চলেছে।
এসব কারণে ভারতের এবারের ব্রিকস সভাপতিত্বের গুরুত্ব অনেক বেশি। শুক্রবার বিকেলে মোদি পুতিনের সঙ্গে এবং পরে সন্ধ্যায় ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন। উভয় বৈঠকেই বৈশ্বিক সংঘাত এবং তার প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে খাদ্য, সার ও জ্বালানির ওপর সংঘাতের প্রভাব ছিল আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ব্রিকসের শুরু অবশ্য ভূরাজনীতি দিয়ে হয়নি। ২০০১ সালে গোল্ডম্যান স্যাকসের একটি গবেষণাপত্রে ‘ব্রিক’ শব্দটির জন্ম। সেখানে বলা হয়েছিল, ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্ব আগামী দিনে আরও বাড়বে। পরে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ও উৎপাদনশিল্পের বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ব্রাজিল, রাশিয়া ও ভারতও গত ২৫ বছরে বিভিন্ন মাত্রায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
২০০৬ সালে চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা প্রথমবার বৈঠক করেন। ২০০৯ সালে হয় প্রথম নেতাদের সম্মেলন। ২০১১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দিলে ব্রিকস পাঁচ সদস্যের জোটে পরিণত হয়। অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তখন অগ্রগতি হচ্ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেওয়ার চার বছরের মধ্যেই নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। উন্নয়ন সহায়তার জন্য এটি ছিল একটি নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। পশ্চিমা দেশগুলোর প্রচলিত ভূমিকার বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটিই ছিল ব্রিকসের প্রথম বড় পদক্ষেপ।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি ভূরাজনীতি দ্রুত ব্রিকসের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ২০২০ সালে গালওয়ানে ভারত ও চীনের সংঘর্ষ হয়। ২০২২ সালে রাশিয়া ও ইউক্রেনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার হোয়াইট হাউসে ফিরে আসেন।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ২০২৩ সালে ব্রিকস সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয়। ব্রাজিল ও ভারত সম্প্রসারণের জন্য কিছু নিয়ম তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল, নতুন সদস্যদের জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ব্রাজিল, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার স্থায়ী সদস্যপদের দাবিকে সমর্থন করতে হবে।
সৌদি আরবকে পূর্ণ সদস্য হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হলেও দেশটি মূল ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাঠায়নি। শুধু আউটরিচ সম্মেলনে অংশ নিয়েছিল। আরও একটি নতুন দিক হলো, ভারত এখন ব্রিকসের আর সম্প্রসারণের বিরোধিতা করছে। কিন্তু তাতে মূল প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়েছে, ১১টি সদস্যদেশ আসলে ব্রিকসের মাধ্যমে কী অর্জন করতে চায়?
ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন, চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়তে থাকা সংঘাত ব্রিকসকে আবার আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। বিশ্বের বড় উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো বৈশ্বিক সমস্যা নিয়ে কী ভাবছে, ব্রিকস তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠেছে।
ভারতের জন্য এবারের সম্মেলনে কোনো বড় বিরোধ ছাড়াই বর্তমান অবস্থান ধরে রাখতে পারা একটি কূটনৈতিক সাফল্য হবে। কিন্তু তাতেও ১১টি দেশের সামনে থাকা সবচেয়ে বড় প্রশ্নটির উত্তর মিলবে না। ব্রিকস শেষ পর্যন্ত কী হতে চায়; একটি অর্থনৈতিক সহযোগিতার মঞ্চ, নাকি পশ্চিমা প্রভাবের বিকল্প একটি ভূরাজনৈতিক শক্তি? এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে জরুরি।
লেখক- দ্য প্রিন্ট-এর প্রধান প্রতিবেদক
ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বরাজনীতিতে ক্ষমতার মানচিত্র কখনো স্থির থাকে না। যে রাষ্ট্রগুলো একসময় আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রান্তে অবস্থান করত, অর্থনৈতিক শক্তি অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে তারাই একসময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে আসে। ব্রিকসের উত্থানকে এই বৃহত্তর ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্যেই বুঝতে হবে।
এটি কেবল কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতির সহযোগিতা কাঠামো নয়, বরং বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতা, অর্থ, প্রতিনিধিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অসম বণ্টন সম্পর্কে একধরনের রাজনৈতিক প্রশ্ন।
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার নামের আদ্যক্ষর থেকে ‘ব্রিকস’ নামটির উৎপত্তি। পরবর্তী সময়ে এর পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া-এই ১১টি দেশ এর সদস্য। একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রকে অংশীদার দেশের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
ফলে ব্রিকস এখন আর পাঁচ দেশের একটি সীমিত মঞ্চ নয়, এটি ক্রমে বৃহত্তর দক্ষিণের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশভূমিতে পরিণত হচ্ছে।
ব্রিকস কেন গুরুত্বপূর্ণ?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমন এক সময়ে নির্মিত হয়েছিল, যখন বর্তমানের বহু উদীয়মান শক্তির অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত।
কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির ভরকেন্দ্র ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে। চীন ও ভারত বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে; ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজ নিজ অঞ্চল ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে-বিশ্ব অর্থনীতির বাস্তব ক্ষমতাবিন্যাস যদি বদলে যায়, তবে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে কেন? ব্রিকস মূলত এই অসামঞ্জস্যের জায়গাটিতেই প্রবেশ করেছে।
এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে অধিকতর বহুকেন্দ্রিক, প্রতিনিধিত্বশীল এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতি সংবেদনশীল করা।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও উন্নয়ন কাঠামোতে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর কণ্ঠ শক্তিশালী করা, অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়নে অর্থায়ন বৃদ্ধি, সদস্যদের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সংকটে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা-এসবই ব্রিকসের বৃহত্তর উদ্দেশ্যের অংশ।
ব্রিকসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন হলো নতুন উন্নয়ন ব্যাংক। এই ব্যাংক অবকাঠামো, জ্বালানি, পানি, নগরায়ণ, পরিবহন, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নমূলক প্রকল্পে অর্থায়ন করে। এর লক্ষ্য প্রচলিত আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিলুপ্ত করা নয় বরং উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর জন্য অর্থায়নের আরও একটি পথ তৈরি করা।
ব্রিকস কি অন্য আঞ্চলিক সংস্থার জন্য হুমকি? এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন, ব্রিকস প্রকৃত অর্থে কোনো আঞ্চলিক সংস্থা নয়।
কারণ, এর সদস্যরা একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত নয়। এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার রাষ্ট্র এতে রয়েছে। ফলে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রাষ্ট্রগুলোর জোট কিংবা আফ্রিকার আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এর সরাসরি প্রতিযোগিতা নেই।
বরং ব্রিকসের উত্থান সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলছে সেই আন্তর্জাতিক কাঠামোগুলোর প্রাধান্য নিয়ে, যেখানে ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা শক্তির প্রভাব প্রবল। তবে ব্রিকসকে ‘পশ্চিমবিরোধী জোট’ হিসেবে দেখা অতিসরলীকরণ হবে।
ভারত যেমন ব্রিকসের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও তার গভীর কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রেখেছে। অতএব, ব্রিকসের প্রকৃত তাৎপর্য সম্ভবত পশ্চিমকে প্রতিস্থাপনে নয়; বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিকল্প দর-কষাকষির ক্ষেত্র সৃষ্টি করার মধ্যে।
বাংলাদেশ কী অর্জন করতে পারে?
বাংলাদেশের জন্য ব্রিকসের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। প্রথমত, বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী পর্যায়ে বিপুল অবকাঠামোগত অর্থায়ন প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ২০২১ সাল থেকে নতুন উন্নয়ন ব্যাংকের সদস্য। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের জন্য ব্যাংকটির অনুমোদিত অর্থায়নের পরিমাণ প্রায় ৪৫ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ব্রিকসের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক আগ্রহের পর্যায়ে নেই; এর একটি কার্যকর আর্থিক ভিত্তিও ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ব্রিকস বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির পরিসর বাড়াতে পারে। চীন ও ভারত বাংলাদেশের দুই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ব্রিকস সদস্যরাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের জ্বালানিনিরাপত্তা, শ্রমবাজার ও বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়ার মতো রাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
তৃতীয়ত, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে বৈদেশিক অর্থায়ন, বাজার সুবিধা এবং উন্নয়ন অংশীদারত্বের নতুন উৎস খুঁজতে হবে।
ব্রিকস সেই পরিবর্তনপর্বে একটি অতিরিক্ত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবলম্বন হতে পারে।
চতুর্থত, ব্রিকসের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতিকে আরও কার্যকর বহুমুখিতা দিতে পারে।
একটি ক্ষুদ্র বা মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রের কৌশলগত সাফল্য সব সময় কোনো একটি শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে নিজেকে আবদ্ধ করার মধ্যে থাকে না; বরং একাধিক শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের দর-কষাকষির পরিসর বাড়ানোর মধ্যেই থাকে।
তাহলে বাধা কোথায়?
সম্ভাবনা যত বড়, কূটনৈতিক হিসাবও তত জটিল। বাংলাদেশের প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য রক্ষা। দেশটির রপ্তানি, উন্নয়ন সহযোগিতা ও আর্থিক ব্যবস্থায় ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার গুরুত্ব বিপুল। অন্যদিকে চীন, ভারত, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য এশীয় রাষ্ট্রও বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে ব্রিকসে যোগদানকে যদি কোনো পক্ষের দিকে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ঝুঁকে পড়া হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে অপ্রয়োজনীয় কূটনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ ব্রিকসের অভ্যন্তরেই। এর সদস্যদের স্বার্থ সর্বক্ষেত্রে অভিন্ন নয়। চীন ও ভারতের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে; রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের গভীর বিরোধ বিদ্যমান; ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-অগ্রাধিকারও এক নয়। এত বৈচিত্র্যের মধ্যে ব্রিকস কতটা সুসংহত রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠবে, তা এখনো নির্ধারিত নয়।
তৃতীয়ত, সদস্যপদ নিজেই কোনো অর্থনৈতিক সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। একটি রাষ্ট্র কোনো জোটে প্রবেশ করলেই বিনিয়োগ, বাণিজ্য কিংবা উন্নয়ন অর্থায়ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যায় না।
তার জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট জাতীয় কৌশল, প্রকল্প প্রস্তুতির সক্ষমতা, বাণিজ্যিক পরিকল্পনা এবং দক্ষ অর্থনৈতিক কূটনীতি।
বাংলাদেশের সামনে ‘ব্রিকসে যোগ দেওয়া উচিত কি না’ এত সরল নয়। অধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ব্রিকসকে বাংলাদেশ তার জাতীয়
স্বার্থে কীভাবে ব্যবহার করবে?
পররাষ্ট্রনীতিতে সদস্যপদ কোনো অলংকার নয়, এটি একটি উপকরণ। ব্রিকসে প্রবেশের লক্ষ্য যদি কেবল একটি নতুন পরিচয় অর্জন হয়, তার মূল্য সীমিত। কিন্তু যদি এর মাধ্যমে বাংলাদেশ অবকাঠামো অর্থায়ন, নতুন বাজার, জ্বালানিনিরাপত্তা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং বৃহত্তর দক্ষিণের রাজনৈতিক মঞ্চে অধিক কণ্ঠস্বর অর্জন করতে পারে, তবে এর কৌশলগত মূল্য অনেক বেশি।
আজকের বিশ্ব আর একক কেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে না। ক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ছে, নতুন মেরু তৈরি হচ্ছে, পুরোনো জোটের পাশাপাশি নতুন সমীকরণ গড়ে উঠছে।
এই পরিবর্তিত বিশ্বে বাংলাদেশের প্রয়োজন কোনো একটি শিবির নির্বাচন করা নয়; প্রয়োজন নিজের অবস্থানের মূল্য বৃদ্ধি করা। ব্রিকস সেই সুযোগগুলোর একটি।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য তখনই হবে, যখন ঢাকা বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করেও ওয়াশিংটনকে হারাবে না, দিল্লির সঙ্গে সহযোগিতা রেখেও নিজস্ব কৌশলগত স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখবে, মস্কোর সঙ্গে কাজ করেও ব্রাসেলসের বাজারকে বিপন্ন করবে না এবং ব্রিকসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েও অন্য অংশীদারদের কাছে নিজেকে কোনো ভূরাজনৈতিক শিবিরের অনুসারী হিসেবে তুলে ধরবে না।
কারণ, ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি সব সময় তার সামরিক সামর্থ্য নয়-অনেক সময় তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কারও স্যাটেলাইট স্টেট বা অনুগ্রহ নির্ভর রাষ্ট্র না হয়ে সবার কাছে প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠার কূটনৈতিক সক্ষমতা।
ব্রিকস বাংলাদেশের জন্য সেই সক্ষমতা বাড়ানোর একটি পথ হতে পারে-যদি সদস্যপদকে গন্তব্য নয়, জাতীয় স্বার্থ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়।
ড. এ কে এম আহসান উল্লাহ অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা এবং অভিবাসন। ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই। ই–মেইল: akmahsanullah@gmail.com