ইশরাক হোসেন
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া দেশে মাদক কারবার পরিচালনা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন।
তিনি বলেন, মাদক চোরাচালান, পরিবহন ও স্থানীয় পর্যায়ে বিক্রির সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যও মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাজধানীর তোপখানা রোডে সিরডাপ মিলনায়তনে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘মাদককে না বলি, মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ি’ স্লোগানে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি এ সেমিনারের আয়োজন করে। এতে সহযোগিতা করে স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ডিবেটিং সোসাইটি ও ইডেন মহিলা কলেজ ডিবেটিং ক্লাব।ইশরাক হোসেন বলেন, মাদক কারবারে জড়িত রাজনীতিবিদদের রাজনীতি করার অধিকার নেই। জনগণ রাজনীতিবিদদের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেন। সেই দায়িত্বে থেকে কেউ মাদক কারবারে যুক্ত হলে তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। মাদক একটি সমাজ ও জাতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার মতো অপরাধ।তিনি বলেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি জাতীয় গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশে আনুমানিক ৮২ লাখ অবৈধ মাদক ব্যবহারকারী রয়েছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ। তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ২৫ বছর বয়সের আগেই মাদক গ্রহণে জড়িয়ে পড়ছেন। তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
মাদক কারবারের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রসঙ্গে বিএনপির এ সংসদ সদস্য বলেন, সীমান্ত দিয়ে মাদক দেশে প্রবেশের পর পরিবহন ও স্থানীয় পর্যায়ে বিতরণের জন্য বিভিন্ন চক্র কাজ করে। এসব চক্রের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অনেক ক্ষেত্রে মাদক কারবার পরিচালিত হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
নিজের নির্বাচনী এলাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইশরাক হোসেন বলেন, রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ঘুন্টিঘর এলাকায় একসময় মাদকের সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। রাতের বেলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেওয়াল টপকে সেখানে তরুণ-তরুণীরা মাদক সেবন করতে প্রবেশ করত। মাদক বিক্রেতারাও সেখানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে মাদক বিক্রি করত। এমন দৃশ্যের ফুটেজ দেখে মাদকের বিরুদ্ধে মাঠপর্যায়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেই।তিনি আরও বলেন, ঢাকা-৬ আসনের ৪৫ ও ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের জুরাইন রেলগেট থেকে গেন্ডারিয়ার ঘুন্টিঘর পর্যন্ত এলাকায় মাদকবিরোধী তৎপরতা চালানো হয়েছে। এ কাজে স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা এবং ঢাকা-৪ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী তানভীর আহমেদ রবিনের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। ওই এলাকায় নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
মাদকের সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সংসদ সদস্য জানান, তার অনুসন্ধানে কয়েকটি নামিদামি পরিবহন প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের গাড়িতে বিপুল পরিমাণ মাদক পরিবহন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার অভিজাত এলাকায় মেথামফেটামিন তৈরির ল্যাব এবং কয়েকটি ওষুধ কোম্পানির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথাও জানান তিনি। এসব অভিযোগ তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।ইশরাক হোসেন বলেন, শুধু সভা-সেমিনার ও আলোচনা করে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মাদকের চাহিদা কমানোর পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে অভিযান চালাতে হবে। মাদক উৎপাদন, পরিবহন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। মাদক শতভাগ নির্মূল করা সম্ভব না হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, সামর্থ্যবান পরিবারগুলো মাদকাসক্ত সদস্যদের পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঠাতে পারলেও ছিন্নমূল ও ঠিকানাহীন মাদকাসক্তদের জন্য কার্যকর পুনর্বাসনব্যবস্থা নেই। আমার নির্বাচনী এলাকায় মাদকাসক্তদের সংশ্লিষ্টতায় ছিনতাই, চুরি ও ডাকাতির মতো অপরাধ ঘটছে। নারীদের ব্যাগ ছিনতাই, শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন চুরি এবং বাসাবাড়ি থেকে বৈদ্যুতিক মিটার, লাইট ও সিসিটিভি ক্যামেরা খুলে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ। তিনি বলেন, মাদকের কারণে পারিবারিক কলহ, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মতো সামাজিক অপরাধ বাড়ছে। দেশে মাদকের সহজলভ্যতা এর বিস্তারের অন্যতম কারণ।তিনি বলেন, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক এখন শহর থেকে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি অনলাইনে অর্ডার দিলে ঘরে মাদক পৌঁছে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। মাদক কারবারিরা ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে। ফলে কোনো মাদক কারবারি যেন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধা নিতে না পারে, সে বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।
হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ আরও বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানে মাদকসেবী, বাহক ও ছোট কারবারিরা গ্রেফতার হলেও মূল হোতারা প্রায়ই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। মাদক পরিবহনে কখনো দোকান, ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কেন্দ্র, যাত্রীবাহী যানবাহনের গোপন চেম্বার, এমনকি পাকস্থলী ও মোবাইল ফোনের ব্যাটারির চেম্বারও ব্যবহার করা হচ্ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ, মনোচিকিৎসাবিদ্যার অধ্যাপক ডা. এম এ মোহিত কামাল, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি মো. মুন্না হুসাইন এবং ইডেন মহিলা কলেজ বিতর্ক দলের দলনেতা মাসনুন নাবিলা আলম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাবেক জাতীয় বিতার্কিক মো. কাউসার আলম।
ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে দুই দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। আগামী ৭ ও ৮ নভেম্বর এসব কর্মসূচি পালন করবে সংগঠনটি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ছাত্রদলের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচির কথা জানানো হয়। কর্মসূচি সফল করতে সংগঠনের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ৭ নভেম্বর (শনিবার) দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা, মহানগর ও কলেজে দিবসটি উপলক্ষে পোস্টার সাঁটানো হবে। একই দিন বেলা ১১টায় মহান স্বাধীনতার ঘোষক, সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম) এবং বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করবেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
এছাড়া দুপুর ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ছাত্রদলের উদ্যোগে আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। বিকেল ৩টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত বর্ণাঢ্য র্যালিতে অংশ নেবে ছাত্রদলের ঢাকা মহানগরের সব ইউনিট।দুই দিনের কর্মসূচির শেষ দিন ৮ নভেম্বর (রোববার) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি অডিটরিয়ামে আলোচনা সভার আয়োজন করবে ছাত্রদল। একই দিন দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, মহানগর ও জেলা পর্যায়েও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
মানসুরা আক্তার
চিত্রনায়িকা পরীমনির বিরুদ্ধে সাংবাদিক রবিউলকে আক্রমণের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় সাংবাদিকের পক্ষে অবস্থান জানিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মানসুরা আলম।
তিনি মনে করেন, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কাউকে মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে হেয় করা বা তার চরিত্র হনন করা উচিত নয়। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকালে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এ কথা বলেন মানসুরা আলম।
পোস্টে তিনি লেখেন, সাংবাদিক ভদ্রলোককে আমি দীর্ঘদিন ধরে চিনি। দীর্ঘদিনের পরিচয়ে তাকে দেখেছি অত্যন্ত ভদ্র ও সেনসিটিভ একজন মানুষ হিসেবে। সুযোগ পেয়ে কারো গায়ে হাত দিয়ে দিলাম, এইরকম মানসিকতা উনি কখনো পোষণ করেন বলে মনে হয়নি। ভিডিও বাইট নিতে গিয়ে উনি কতটা সতর্ক থাকতেন, সেটাও দেখেছি। একজন মেয়ে হয়ে এতটুকু অন্তত বুঝি যে কে কীভাবে দেখছে, ভাবছে।
ইচ্ছা করলেই এই প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু শক্তিশালী নায়িকার কথা ভেবে যেন কারো ওপর মিডিয়া ট্রায়াল করে জুলুম না হয়, চরিত্র হনন না হয়, সেই জন্যই এই পোস্ট। ধন্যবাদ।
পোস্টের শেষে তিনি উল্লেখ করেন, সাংবাদিক রবিউলের একটি হাত নেই, জন্ম থেকেই।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিক্ষোভ মিছিল। ছবি: সংগৃহীত
সামান্তা শারমিন
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। পদত্যাগের কারণ হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট, দলের আদর্শচ্যুতি, নারীর রাজনৈতিক অধিকার উপেক্ষা এবং সংগঠনে গণতন্ত্র চর্চার অভাবের অভিযোগ তুলেছেন।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে এক দীর্ঘ বিবৃতিতে এসব কারণ তুলে ধরেন তিনি।
একই সঙ্গে এনসিপির বর্তমান রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে নতুন ধারার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।বিবৃতিতে সামান্তা শারমিন বলেন, প্রায় এক বছর আগে এনসিপির জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন। জামায়াতে ইসলামী নীতিগত কিংবা কৌশলগত কোনো ক্ষেত্রেই মিত্র হওয়ার যোগ্য নয় বলে মনে করেন তিনি।গত ১১ মাসে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ, প্রস্তাব এবং আলোচনার মাধ্যমে এনসিপিকে ভুল রাজনৈতিক পথ থেকে ফেরানোর চেষ্টা করেছেন বলেও জানান তিনি।
তবে দলের প্রাথমিক মূল্যবোধের প্রতি এনসিপি আর আন্তরিক থাকতে পারবে না- এমন উপলব্ধি থেকেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।
পদত্যাগের কারণ হিসেবে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন সামান্তা শারমিন। চারটি বিষয় হলো:
সংস্কারের বন্ধু জামায়াত হতে পারে কি না
সামান্তা শারমিনের বক্তব্য, দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষার দল হিসেবে এনসিপির রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল সংস্কার। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় উত্তরণের পথে বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে জন্য সাংবিধানিক, আইনি এবং রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন ছিল।
তবে জামায়াতে ইসলামী এসব সংস্কারের কোনো একটিকেও নিজেদের দলীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্রপ্রকল্পের অংশ মনে করে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, জামায়াত প্রকৃত অর্থে সংস্কারের রাজনীতি ধারণ করে না। সংগঠনটির দার্শনিক ভিত্তি ও প্রস্তাবিত রাষ্ট্রপ্রকল্প গণতান্ত্রিক নয়।
পোস্টে সামান্তা বলেন, ‘জামায়াতকে যতটুকু সংস্কারের কথা বলতে দেখা যায়, ততটুকু বলে ২৪-এর আকাঙ্ক্ষাকে কুক্ষিগত করার প্রয়োজন থেকে, ভণিতা হিসেবে।’
তার ভাষ্য, গণতান্ত্রিক সংস্কারের মূল ভিত্তি উদার গণতান্ত্রিক সামাজিক মূল্যবোধ। অন্যদিকে জামায়াত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিপন্থী এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই সংগঠনটির রাজনৈতিক অভিপ্রায়। এ কারণে দলটির রাজনীতির মূল ভিত্তিতে পরিবর্তন আসেনি বলেও দাবি করেন তিনি।
জামায়াতের ১৯৭১ সালের ভূমিকা এবং এ জন্য জাতির কাছে ক্ষমা না চাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে সামান্তা বলেন, ‘তার প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনে গণহত্যাকেও জায়েজ মনে করে জামায়াত। ৭১-এ জামায়াতের ভূমিকাকে অপরাধ মনে না করা এবং এর জন্য জাতির কাছে ক্ষমা না চাওয়া—এই সাংগঠনিক ও দার্শনিক ভিত্তির ওপরই দণ্ডায়মান।’
এনসিপি যখন জামায়াতকে সংস্কারের পথে বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করেছে, তখন উদার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষ সংস্কারের রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তার অভিযোগ, এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট না থাকায় দলটি জামায়াতের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতের প্রতিক্রিয়ামূলক ও সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
সামান্তা বলেন, ‘যেহেতু জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেওয়া দল এনসিপি, তাই আমি দলকে বারবার এসব সমস্যা সম্পর্কে সতর্ক করে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছি।’
নির্বাচন
২০২৬ সালের নির্বাচনকে কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের নির্বাচন নয়, বরং রাজনৈতিক পরিবর্তনের উপলক্ষ হিসেবে দেখার সুযোগ ছিল বলে মনে করেন সামান্তা শারমিন। তাঁর মতে, ১৯৪৬, ১৯৫৪, ১৯৭০ ও ১৯৯০ সালের মতো এ নির্বাচনও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারত।
তিনি বলেন, ‘২৬-এর নির্বাচনের পূর্বে এটি যেন একটি রাজনৈতিক নির্বাচন না হয়ে ক্ষমতা বদলের নির্বাচনে পর্যবসিত হয়, সেই লক্ষ্যে নির্বাচনকে অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক চরিত্র থেকে সরাতে চেয়েছে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো।’
সামান্তার দাবি, ঐকমত্য কমিশন, নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের ব্যর্থতার পরও এনসিপির সামনে পুরোনো ব্যবস্থাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে চাওয়া শক্তিগুলোর সঙ্গে জোট করা অথবা এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে রাজনৈতিক নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল। তা করা হলে দলটি বর্তমান ফলাফলের চেয়েও ভালো ফল করতে পারত বলে মনে করেন তিনি।
তার ভাষ্য, ‘কিন্তু এনসিপি ইতিহাসের এই শিক্ষাকে গুরুত্ব না দিয়ে ‘বড়’ রাজনৈতিক দলের লেজুড় হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে এনসিপির নিজস্ব রাজনীতি আর অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করেছে।’
১১ দলীয় ঐক্যের মতো নির্বাচনী কৌশলে অংশ না নিয়েও আরও বেশি রাজনৈতিক প্রভাব তৈরির পাঁচটি পদ্ধতির কথা দলের নেতৃত্বকে জানিয়েছিলেন বলে দাবি করেন সামান্তা। তবে দল সেই পথে হাঁটেনি। তার মতে, রাজনৈতিক জয়ের চেয়ে নির্বাচনী জয়কে প্রাধান্য দেওয়ায় সংস্কারবিহীন ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফল নিয়ে আপত্তি জানানোর গ্রহণযোগ্যতাও হারিয়েছে এনসিপি।
নিরাপত্তাহীনতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি শহীদ ওসমান হাদির নির্বাচনী প্রচারণার উদাহরণ দেন। সামান্তার দাবি, ঢাকার একটি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে ন্যূনতম ৫০০ ভোট পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে সম্পূর্ণ এককভাবে নতুন ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন ওসমান হাদি।
সামান্তা বলেন, ‘অথচ অগণতান্ত্রিক ও অতি পুরোনো নির্বাচনী কৌশল ‘বড় পার্টির সঙ্গে জোট’ করার কারণ হিসেবে উনার মৃত্যুর ঘটনাকেই ব্যবহার করা হয়েছে, যা পুরোপুরি অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’
অভ্যুত্থানে নারীর অধিকার ও মালিকানা
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকার যথাযথ স্বীকৃতি এবং রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত না করার অভিযোগও এনসিপির বিরুদ্ধে তুলেছেন সামান্তা শারমিন। তার মতে, গণঅভ্যুত্থানে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক, সম্মুখসারির যোদ্ধা ও আন্দোলনের রক্ষাকর্তা হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন।
তিনি বলেন, ‘নারীর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, ন্যায্য হিস্যা, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান—এসবই ছিল এই অভ্যুত্থানে তাদের অংশগ্রহণের ভিত্তি। গণঅভ্যুত্থানে নারীরা শুধু অংশ নেননি, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। ব্যারিকেডের সামনে তাদের অবস্থান, সাহস ও সক্রিয়তা অভ্যুত্থানকে সার্বজনীন রূপ দিয়েছে।’
সামান্তার মতে, পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে এসে এনসিপির সামনে ভিন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপনের সুযোগ ছিল। নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারত দলটি। এ জন্য শুধু নারীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করাই যথেষ্ট ছিল না; নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক ক্ষমতায় তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু এনসিপি সেই পথ বেছে নেয়নি বলে অভিযোগ তার। বরং দলটির ভূমিকা নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিলে গেছে। সামান্তার দাবি, নারীদের প্রতিবাদ যথাযথ গুরুত্ব পায়নি এবং পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও অভিজ্ঞতা সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে থেকে গেছে।
কাউন্সিল ছাড়াই পুনর্গঠন
এনসিপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও সাংগঠনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন সামান্তা শারমিন। তার মতে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষ এমন একটি রাজনৈতিক দল প্রত্যাশা করেছিল, যার নেতৃত্ব, রাজনৈতিক বক্তব্য ও সাংগঠনিক কাঠামো প্রচলিত দলগুলোর চেয়ে আলাদা হবে। দলের অর্থনৈতিক কাঠামোয় স্বচ্ছতা এবং অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চার মধ্য দিয়েও সেই নতুনত্বের প্রতিফলন ঘটার কথা ছিল।
সামান্তা বলেন, ‘পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোতে আমরা দেখেছি—ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, পরিবারতন্ত্র, পদ-পদবি বণ্টনে স্বজনপ্রীতি, অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব, দলের আর্থিক ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা, তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা, ভিন্নমত দমনের প্রবণতা এবং নেতৃত্বের জবাবদিহি না থাকা।’
তার ভাষ্য, এসব কারণে দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণ কর্মীদের অংশগ্রহণ সীমিত থাকে এবং নেতৃত্ব পরিবর্তন ও বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে। পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতো এনসিপিতেও কাউন্সিল এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সামান্তা বলেন, ‘দলের কাউন্সিল না করে পুনরায় আহ্বায়ক কমিটি ‘রিস্ট্রাকচার’ দলের অভ্যন্তরের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যে প্রবণতা পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আছে। বিরোধী মত দমন করার পুরোনো প্রক্রিয়া অবলম্বন করেছে এনসিপি।’
তার অভিযোগ, নেতৃত্ব নির্বাচনের আগেই এ ধরনের বড় রদবদল দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতার বিষয়ে নেতৃত্বের উদাসীনতা স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনী ব্যবস্থার গণতান্ত্রিকতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এনসিপির রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও জনআস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
সামান্তা বলেন, ‘যে দল নিজের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে না, তার পক্ষে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতার দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা সম্ভব—সেই প্রশ্নও সামনে আসে।’
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর লোগো
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত