দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, যাজক ও অন্যান্য সেবাকর্মীদের জন্য মাসিক সম্মানি ভাতা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার
দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, যাজক ও অন্যান্য সেবাকর্মীদের জন্য মাসিক সম্মানি ভাতা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাইলট স্কিমের আওতায় প্রথম ধাপে মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধ বিহার ও চার্চে কর্মরতদের এ ভাতা দেয়া হবে।
আজ রোববার (৮ মার্চ) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জাবিউল্লাহ জানিয়েছেন, পাইলট প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি মসজিদের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ইমাম পাবেন ৫ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিন ৩ হাজার টাকা এবং খাদেম পাবেন ২ হাজার টাকা।
তিনি বলেন, মন্দিরের ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য মাসিক ৮ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে পুরোহিত পাবেন ৫ হাজার টাকা এবং সেবাইত পাবেন ৩ হাজার টাকা।
একইভাবে প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারের জন্য ৮ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকবে। এতে বিহার অধ্যক্ষকে ৫ হাজার টাকা এবং উপাধ্যক্ষকে ৩ হাজার টাকা দেয়া হবে।
চার্চের ক্ষেত্রেও মাসিক ৮ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে পালক বা যাজক পাবেন ৫ হাজার টাকা এবং সহকারী পালক বা যাজক পাবেন ৩ হাজার টাকা।
ইসমাইল জাবিউল্লাহ বলেন, এ ছাড়া ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে কর্মরতদের জন্য বিশেষ বোনাসের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। মসজিদের কর্মীরা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় বছরে দুইবার ১ হাজার টাকা করে বোনাস পাবেন। অন্যদিকে দুর্গাপূজা, বৌদ্ধ পূর্ণিমা ও বড়দিন উপলক্ষে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ২ হাজার টাকা করে বোনাস দেওয়া হবে।
ছবি : সংগৃহীত
মহান আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করাই একজন মুমিনের পুরো জীবনের পরম কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। মানুষ আল্লাহকে যত বেশি স্মরণ করে, তাঁর আনুগত্যে নিজেকে সঁপে দেয় এবং তাঁর প্রিয় কাজগুলোয় আত্মনিয়োগ করে, আধ্যাত্মিক জগতের সিঁড়ি বেয়ে সে ততই রবের নিকটবর্তী হতে থাকে। তবে ইসলামি জীবনবিধানে সব আমলের গুরুত্ব ও মর্যাদা এক স্তরের নয়। শরিয়তে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট আমল ও কর্মপন্থা রয়েছে, যা বান্দাকে অতি দ্রুত আল্লাহর রহমত ও ভালোবাসার পরম সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয়।
আল্লাহর নৈকট্যের প্রকৃত অর্থ কী
আমলের পর্যালোচনায় যাওয়ার আগে ‘আল্লাহর নৈকট্য’ (কুরবে ইলাহি)-র তাৎপর্য বোঝা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহর নৈকট্য কোনো স্থানিক বা ভৌগোলিক নৈকট্য নয়। কারণ, মহান আল্লাহ কোনো নির্দিষ্ট স্থান, দিক বা সীমানার মুখাপেক্ষী নন। তিনি স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে।
ইসলামি আকিদার দৃষ্টিতে বান্দার আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার অর্থ হলো—বান্দার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি, রহমত, ভালোবাসা ও বিশেষ অনুগ্রহের প্রকাশ ঘটা এবং বান্দার মর্যাদা আল্লাহর দরবারে সুউচ্চ হওয়া।
১. ফরজ বিধানের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন
আল্লাহর প্রিয়পাত্র হওয়ার পথের প্রথম এবং অলঙ্ঘনীয় ধাপ হলো তাঁর নির্ধারিত ফরজ বিধানগুলো যথাযথভাবে আদায় করা।
‘হাদিসে কুদসি’তে মহান আল্লাহ–তাআলা নৈকট্য লাভের এই প্রাথমিক ভিত্তি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘আমার বান্দা আমার নৈকট্য লাভের জন্য যা কিছু করে, তার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো তা, যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২)
দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রমজানের রোজা, সামর্থ্যবানদের জন্য জাকাত ও হজ এবং শরিয়তের যাবতীয় হারাম বিষয় থেকে বেঁচে থাকা—এগুলো হলো ইমানের মেরুদণ্ড।
কোনো ব্যক্তি যদি ফরজ আমলগুলোয় অবহেলা করে শুধু নফল বা অন্যান্য বাহ্যিক আমলে মগ্ন থাকে, তবে তা দিয়ে কখনোই আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ সম্ভব নয়। ফরজ হলো ভবনের মূল ভিত্তির মতো; ভিত্তি মজবুত না হলে ওপরের কোনো কাঠামোরই স্থায়িত্ব থাকে না।
২. নফল আমলের নিয়মিত চর্চা
ফরজ বিধানগুলো সতর্কতার সঙ্গে পালন করার পর বান্দাকে আল্লাহর একান্ত প্রিয় বানায় ঐচ্ছিক বা নফল ইবাদত। উপরিউক্ত হাদিসে কুদসিতেই মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘এবং আমার বান্দা ক্রমাগত নফল আমলের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে—যতক্ষণ না আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি!’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২)
তাহাজ্জুদ নামাজ, চাশত-ইশরাকের নামাজ, নফল রোজা, দান-সদকা ও পবিত্র কোরআন পাঠ বান্দার অন্তরে আল্লাহর প্রতি বিশেষ ভালোবাসা তৈরি করে।
বিশেষ করে নামাজের মধ্যে সেজদা হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের সবচেয়ে কার্যকর ও চূড়ান্ত মুহূর্ত। রাসুল (সা.) করেছেন, ‘বান্দা সিজদাহরত অবস্থাতেই তার মহান প্রতিপালকের সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয়; সুতরাং তোমরা সেজদায় বেশি বেশি দোয়া করো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২)
৩. ইখলাস বা খাঁটি নিয়ত
আমল কম হোক বা বেশি, আল্লাহর কাছে তা কবুল হওয়ার একমাত্র শর্ত হলো ‘ইখলাস’ বা খাঁটি নিয়ত। মানুষের চোখে অত্যন্ত চমৎকার ও বড় আমলও যদি লোকদেখানো (রিয়া), প্রশংসা কুড়ানো বা পার্থিব স্বার্থের উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে আল্লাহর দরবারে তার কোনো মূল্য থাকে না; বরং তা শিরকে আসগার বা গোপন পাপে পরিণত হয়।
আল্লাহর কাছে যাওয়ার পথ কেবল শারীরিক কসরত নয়, এটি অন্তরের পরিচ্ছন্নতার সফর। প্রতিটি আমলের শুরুতে ও শেষে হৃদয়কে এই বিশ্বাসে স্থির রাখতে হবে যে, আমার এই কাজ কেবল আমার রবের সন্তুষ্টির জন্যই নিবেদিত।
৪. সার্বক্ষণিক সংযোগ: আল্লাহর জিকির ও ধ্যান
বান্দা ও স্রষ্টার মধ্যকার অদৃশ্য সেতুবন্ধন হলো আল্লাহর জিকির। আল্লাহ–তাআলা কোরআনে এক পরম প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঘোষণা করেছেন, ‘অতএব তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব; আর আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫২)
জিকির মানুষের অন্তরকে জীবন্ত ও সতেজ রাখে। প্রাত্যহিক শত ব্যস্ততার মধ্যও যার জিহ্বা আল্লাহর তাসবিহ, তাহমিদ ও ইস্তিগফারে সিক্ত থাকে এবং যার অন্তরে সর্বদা আল্লাহর নজরদারির অনুভূতি জাগ্রত থাকে, সে কখনো আল্লাহর রহমত থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না।
৫. উত্তম চরিত্র ও সৃষ্টির সেবা
ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহর নৈকট্য কেবল জায়নামাজ কিংবা মসজিদের চার দেয়ালের ভেতর সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। মানুষের সঙ্গে নম্র আচরণ, সত্যভাষণ, পিতা-মাতার নিঃস্বার্থ সেবা, আত্মীয়দের খোঁজখবর রাখা, আমানত রক্ষা এবং সততার সঙ্গে হালাল উপার্জন করাও মহান রবের নৈকট্য পাওয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।
মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর করা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি ইবাদত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় মানুষ সে, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।’ (আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস: ৫৭৮৭; সহিহুল জামে, হাদিস: ১৭৬)
একজন মুমিন যখন নিজের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালনা করে, তখন তার জীবনের প্রতিটি কর্মই আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একেকটি সোপানে পরিণত হয়।
আল্লাহর নৈকট্যের পরম পুরস্কার
বান্দা যখন ফরজ ও নফলের সমন্বয়ে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, তখন মহান আল্লাহ তাকে এমন এক মর্যাদায় ভূষিত করেন, যার কোনো তুলনা নেই। হাদিসে কুদসির শেষাংশে আল্লাহ–তাআলা সেই পরম পুরস্কারের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘অতঃপর আমি যখন তাকে ভালোবেসে ফেলি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে; আমি তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে; আমি তার হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে ধরে এবং আমি তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে হাঁটে। সে যদি আমার কাছে কোনো কিছু চায়, আমি অবশ্যই তাকে তা দান করি; আর সে যদি আমার কাছে আশ্রয় চায়, আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দিই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২)
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় হাদিসবেত্তারা বলেছেন, এর অর্থ হলো, আল্লাহ–তাআলা তখন বান্দার যাবতীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে পাপের পথ থেকে রক্ষা করেন এবং তাকে সর্বদা নিজের পছন্দের পথে চলার বিশেষ তাওফিক ও হেফাজত দান করেন। তার দৃষ্টি কেবল হালাল ও কল্যাণময় বিষয় দেখে, তার শ্রবণ কেবল ভালো কথা শোনে এবং তার হাত-পা কেবল পুণ্যের কাজেই অগ্রসর হয়।
শেষ কথা
আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ কোনো জটিল রহস্যময় বিষয় নয়; এটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ এক জীবনাদর্শ। এর সূচনা হয় যাবতীয় ফরজ ও ওয়াজিবের যথাযথ আদায়ের মাধ্যমে, এর প্রবৃদ্ধি ঘটে নিয়মিত নফল ইবাদত ও জিকিরের সুবাসে, আর এর পূর্ণতা পায় উত্তম চরিত্র ও নিঃস্বার্থ সৃষ্টির সেবায়।
ইখলাসপূর্ণ অন্তরে এই পথ অনুসরণ করলেই বান্দা ইহকালে অর্জন করতে পারে রবের বিশেষ অভিভাবকত্ব এবং পরকালে লাভ করতে পারে তাঁর চিরস্থায়ী দিদার ও অনাবিল বেহেশত।
ছবি : সংগৃহীত
সফল মানুষদের দৈনন্দিন রুটিন নিয়ে আজকাল কত আলোচনা হয়। কারও সফলতার মূলমন্ত্র রাতে দ্রুত ঘুম। কারও নিয়মিত জার্নাল লেখা। কারও বড় বড় স্বপ্ন দেখা। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষটির সফল জীবনের রহস্য কী ছিল, তা কি কখনো ভেবে দেখেছেন?
নবুয়তের শুরুর দিনগুলোতে নবীজির কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে নির্দেশ বারবার আসত, তা ছিল রাতের ইবাদত বা কিয়ামুল লাইল।
যিনি সারা দিন মানুষের জন্য কাজ করেন, ইসলামের দাওয়াত দেন, যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন, অন্য সব ইবাদত বাদ দিয়ে তাঁকে কেন রাতের ইবাদত করতে গুরুত্বের সঙ্গে বলা হলো? কারণ, যে শক্তি দিয়ে দিনের বিশাল দায়িত্ব পালন করতে হয়, সেই শক্তি তৈরি হয় রাতের ইবাদতে।
কোরআনের নির্দেশনা
রাতে দাঁড়িয়ে ইবাদত করাই ছিল আল্লাহর প্রথম নির্দেশগুলোর একটি। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে বস্ত্রাবৃত, রাতে দাঁড়াও, তবে অল্প সময় বাদে। অর্ধরাত অথবা তার চেয়ে একটু কম অথবা তার চেয়ে একটু বেশি। আর কোরআন পাঠ করো ধীরে ধীরে স্পষ্টভাবে।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত: ১-৪)
এই আয়াতে আল্লাহ নবীজিকে ডেকেছেন মুজ্জাম্মিল বলে; যার অর্থ যিনি কাপড়ে নিজেকে জড়িয়ে নেন। ওহির প্রথম অভিজ্ঞতার পর মহানবী (সা.) যখন চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহ–তাআলা তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে নামাজে দাঁড়াতে বললেন।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তাঁকে প্রথমেই জনসমাবেশে ভাষণ দিতে বলেননি, যুদ্ধে যেতে বলেননি, রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশও দেননি। শুধু বলেছেন, রাতের ইবাদতে দাঁড়াও।
এরপর আল্লাহ বলেন, ‘আর কোরআন ধীরে ধীরে, স্পষ্টভাবে পাঠ করো।’ এখানে তারতিল শব্দটি শুধু সুন্দর সুরে পড়ার কথা বলে না, বরং থেমে থেমে, অর্থ উপলব্ধি করে, হৃদয়ে অনুধাবন করে পড়ার শিক্ষা দেয়। এরপর আল্লাহ সেই কারণটি জানিয়ে দেন, কেন রাতের সময়কে বেছে নেওয়া হয়েছে। ‘নিশ্চয়ই রাতের ইবাদত মনকে অধিক দৃঢ় করে এবং কথা ও উপলব্ধিকে অধিক সুদৃঢ় করে।’
মুফাসসিররা বলেন, দিনের বেলায় নানা ব্যস্ততায় মানুষের মন বিক্ষিপ্ত থাকে। কিন্তু রাতের নীরবতায় সেই মন একাগ্র হয়। তখন দোয়া গভীর হয়, পাঠ হৃদয়ে পৌঁছে যায়, আত্মা সহজে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।
আধুনিক ভাষায় বললে, দিনের অসংখ্য নোটিফিকেশন, ব্যস্ততা আর আলোচনার ভিড়ে যে মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, রাত তাকে আবার জাগিয়ে তোলে।
হাদিসে রাতের নামাজ
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)
অন্য এক হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমাদের প্রতিপালক প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে নিকটতম আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৪৫)
এ এমন এক আমন্ত্রণ, যা পৃথিবীর কোনো রাজা তাঁর প্রজাদের কখনো দেননি।
সুরার শেষে স্বস্তির বার্তা
শেষের দিকে বলেন, ‘নিশ্চয়ই দিনের বেলায় তোমার রয়েছে দীর্ঘ ব্যস্ততা।’ দিন হলো কাজের জন্য, আর রাত হলো আত্মার পুনর্গঠনের জন্য। যিনি রাতের এই শক্তি অর্জন করতে পারেন, দিনের ঝড় তাঁকে সহজে ভেঙে দিতে পারে না।
এরপর আসে জীবনের আরেকটা মৌলিক শিক্ষা। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ করো এবং সম্পূর্ণভাবে তাঁরই দিকে মনোনিবেশ করো।’
এর অর্থ সংসার ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং সব কাজের মাঝেও আল্লাহকে স্মরণ রাখা। যখন আল্লাহকে কেন্দ্র করে জীবন চলতে থাকে, জাগতিক চাপ ও ক্লান্তি কমে যায়।
তবে সুরা মুজ্জাম্মিলের শেষাংশ আমাদের জন্য স্বস্তির বার্তাও নিয়ে আসে। শুরুতে যে দীর্ঘ রাতের ইবাদতের নির্দেশ ছিল, পরে আল্লাহ বান্দাদের সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে বলেন, ‘অতএব কোরআন থেকে যতটুকু তোমাদের জন্য সহজ, ততটুকুই পড়ো।’
এটা আল্লাহর অসীম দয়ার প্রকাশ। তিনি কষ্ট দিতে চান না, তিনি চান ধারাবাহিকতা। তাই নবীজির মতো দীর্ঘ সময় নিয়ে নামাজে পাঠ করা সম্ভব না হলে অল্প সময়ও যথেষ্ট, যদি তা আন্তরিক হয়।
একই আয়াতে আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দেন, ‘তোমরা নামাজ আদায় করো এবং জাকাত প্রদান করো।’ অর্থাৎ নফল ইবাদত কম করলেও ফরজ নামাজ, জাকাত এবং অন্যান্য মৌলিক দায়িত্বে কোনো অবহেলা চলবে না।
শেষে আল্লাহ এমন একটা প্রতিশ্রুতি দেন, যা প্রতিটি মুমিনের জন্য আশার আলো, ‘তোমরা নিজেদের জন্য যে কল্যাণই আগে পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে আরও উত্তম ও আরও বড় প্রতিদান হিসেবে পাবে।’
আমরা অনেকেই মনে করি, রাতের কিছু ঘুম কমে গেলে হয়তো শরীরের ক্ষতি হবে। অথচ কোরআন শেখায়, আল্লাহর জন্য যে সময় ব্যয় করা হয়, তা কখনো হারিয়ে যায় না। তা দুনিয়ায় প্রশান্তি হয়ে ফিরে আসে, আর পরকালে অসীম পুরস্কার হয়ে অপেক্ষা করে।
আজ রাত থেকেই শুরু করুন
আল্লাহর নেতৃত্বের আলোয় আলোকিত হতে চাইলে কিয়ামুল লাইল, অর্থাৎ রাতের নামাজ বা তাহাজ্জুদের নামাজ আজ রাত থেকেই শুরু করতে পারেন। পুরো রাত নয়। দীর্ঘ তাহাজ্জুদও নয়।
ফজরের আধা ঘণ্টা আগে উঠে মাত্র দুই রাকাত নামাজ, কয়েকটি আয়াত পাঠ, কিছু ইস্তিগফার, আর মন খুলে আল্লাহর সঙ্গে কিছু কথা বিনিময়। কিছু আবেদন, কিছু নিবেদন।
নিশ্চয় সেই কয়েক মিনিটই আপনার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বিনিয়োগ হয়ে থাকবে। যেদিন পৃথিবীর সব হিসাব শেষ হবে, সেদিন এই সামান্য বিনিয়োগ আপনার জন্য অকল্পনীয় লাভ ও আনন্দ বয়ে আনবে।
মানের ৭০টির বেশি শাখা রয়েছে। এর প্রতিটি শাখাই একজন মুমিনের জীবনের কোনো না কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস, কথা কিংবা কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে প্রথম, সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ইমানের ষাটের অধিক অথবা সত্তরের অধিক শাখা রয়েছে। তার মধ্যে সর্বপ্রধান হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা এবং সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর লজ্জা হলো ইমানের একটি শাখা।’ (শুআবুল ইমান লি-বায়হাকি, ৮৮)
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। এই বাক্যটি এই জন্য ইমানের সর্বপ্রধান শাখা, কারণ এর মাধ্যমেই একজন মানুষ ইমানের গণ্ডিতে প্রবেশ করে।
বিখ্যাত মুহাদ্দিস হুসাইন আল হালিমি (রহ.) এই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর অর্থ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছেন:
১. ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর মাধ্যমে আমরা স্বীকার করি, এই বিশ্বজগতের একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। এই পৃথিবী, আকাশ, মানুষ, প্রাণী—কোনোটিই নিজে নিজে অস্তিত্ব লাভ করেনি। সবকিছুর পেছনে একজন সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা ও পরিকল্পনা রয়েছে।
২. সেই সৃষ্টিকর্তা একক ও মহাপরাক্রমশালী। তার কোনো শরিক নেই। যাবতীয় ভালো ও মন্দ তিনিই সৃষ্টি করেছেন। তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন, তার কোনো অংশীদার নেই, এবং তিনি স্ত্রী-সন্তান থেকেও পবিত্র। তিনিই একমাত্র উপাসনার যোগ্য।
৩. আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহকে তার সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করা যায় না। তিনি মানুষের মতো নন, কোনো বস্তু বা দেহ নন এবং সৃষ্টিজগতের কোনো বৈশিষ্ট্য তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার অর্থ তাই শুধু অন্য উপাস্যকে অস্বীকার করা নয়; বরং আল্লাহকে সৃষ্টির ঊর্ধ্বে, অনন্য ও অতুলনীয় হিসেবে বিশ্বাস করাও এর অন্তর্ভুক্ত।
৪. আল্লাহ তাআলাই অনাদি ও অনন্ত। আল্লাহ ছাড়া যা কিছু আছে, এক সময় তার কিছুই ছিল না। আল্লাহই নিজের ইচ্ছায় সবকিছুকে অস্তিত্ব দিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি শুধু এই মহাবিশ্বের কোনো একটি অংশের স্রষ্টা নন; বরং সমগ্র সৃষ্টিজগতের একমাত্র স্রষ্টা। তাই মহাবিশ্বের অস্তিত্বকে আল্লাহর পাশাপাশি অন্য কোনো অনাদি কারণ বা সত্তার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ নেই। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মানুষকে এই বিশ্বাসই শেখায় আল্লাহ ছাড়া কোনো অনাদি সত্তা নেই, তিনিই সবকিছুর স্রষ্টা।
৫. আল্লাহ এই পৃথিবীকে উদ্দেশ্যহীন সৃষ্টি করেননি, আবার সৃষ্টি করে তাকে ছেড়ে দেননি। তিনিই তার সৃষ্টিজগৎ পরিচালনা করছেন। পৃথিবীর ঘটনাপ্রবাহ কোনো স্বাধীন প্রাকৃতিক শক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়নি। নক্ষত্র, ফেরেশতা কিংবা অন্য কোনো সত্তাও স্বাধীনভাবে বিশ্ব পরিচালনা করে না। সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্দেশে পরিচালিত হয়। তাই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার অর্থ হলো সৃষ্টি যেমন একমাত্র আল্লাহর, তেমনই তার পরিচালনাও একমাত্র আল্লাহর হাতে।
ব্যক্তি যখন এই পাঁচটি পয়েন্ট সামনে রেখে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস আনবে, সেই সাথে বিশ্বাসের দায়িত্ব ও কর্তব্যও পালন করবে, তখন সে ইমানদার পরিচয় লাভ করবে। হাদিসে এমন ব্যক্তির জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। যেমন এরশাদ আছে: ‘যে ব্যক্তি এই বিশ্বাস নিয়ে মারা যাবে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (শুআবুল ইমান লি-বায়হাকি: ৯৪)
আরও বলা হয়েছে, ‘যার জীবনের শেষ কথা হবে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (শুআবুল ইমান লি-বায়হাকি, ৯৩)
এ কারণেই ইমানের ৭০টির বেশি শাখার মধ্যে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-কে প্রথম ও সর্বোচ্চ বলা হয়েছে।
প্রতীকী ছবি
ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালেও দেখা যায়, ইসলামের প্রথম যুগের বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তরুণ সাহাবিরাই পালন করেছেন। আলী ইবনে আবি তালিব, মুসআব ইবনে উমাইর, ওসামা ইবনে জায়েদ, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর মতো তরুণেরা নবীজির হাতে গড়ে উঠেছিলেন।
তাঁদের কেউ ছিলেন আলেম, কেউ প্রচারক, কেউ প্রশাসক, কেউ সেনাপতি। তাঁদের যোগ্যতা এক ছিল না। দায়িত্বও এক ছিল না। কিন্তু প্রত্যেকের মধ্যে রাসুল (সা.) এমন কিছু দেখেছিলেন, যা অন্যরা হয়তো তখনো দেখতে পায়নি।
তরুণদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাই মহানবীর পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত বাস্তবমুখী। তিনি উপদেশ দিয়েছেন, আবার দায়িত্বও দিয়েছেন। ভুল শুধরে দিয়েছেন, আবার আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছেন। ইমান তৈরি করেছেন, আবার সেই ইমানের বাস্তব প্রয়োগের সুযোগও দিয়েছেন।
১. ভালোবাসার মাধ্যমে তরুণের হৃদয় জয় করা
কোনো মানুষকে সংশোধন করতে হলে আগে তার হৃদয়ে জায়গা করে নিতে হয়। রাসুল (সা.) তরুণদের সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন, যাতে তারা নির্ভয়ে তাঁর কাছে নিজেদের কথা বলতে পারত। এর একটি অসাধারণ উদাহরণ সেই যুবক, যে নবীজির কাছে এসে ব্যভিচারের অনুমতি চেয়েছিল।
সাহাবিরা তার কথায় ক্ষুব্ধ হলেন। কিন্তু নবীজি (সা.) তাকে ধমক দিলেন না। বললেন, ‘তাকে আমার কাছে আসতে দাও।’ এরপর তাকে কাছে বসিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি তোমার মায়ের জন্য এমনটা পছন্দ করবে?’
যুবক বলল, ‘না, আল্লাহর কসম।’ তিনি বললেন, ‘মানুষও তাদের মায়ের জন্য তা পছন্দ করে না।’ এরপর কন্যা, বোন, ফুফু ও খালার কথা উল্লেখ করলেন। প্রতিবার যুবক একই উত্তর দিল। শেষে রাসুল (সা.) তার জন্য দোয়া করলেন।
বর্ণনাকারী আবু উমামাহ (রা.) বলেন, এরপর ওই যুবকের কাছে ব্যভিচারের চেয়ে অধিক ঘৃণিত আর কিছু ছিল না। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২২২১১)
২. প্রতিভা খুঁজে বের করে তাকে বিকশিত করা
প্রত্যেক মানুষ একই ধরনের যোগ্যতা নিয়ে জন্মায় না। কেউ জ্ঞান অর্জনে এগিয়ে, কেউ নেতৃত্বে, কেউ ভাষা ও লেখায়, কেউ দাওয়াতের কাজে। রাসুল (সা.) তরুণদের সবাইকে একই ছাঁচে গড়ে তোলেননি। তিনি প্রত্যেকের স্বতন্ত্র যোগ্যতা চিনেছেন এবং সেই অনুযায়ী তাদের তৈরি করেছেন।
জায়েদ ইবনে সাবিত ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী তরুণ। রাসুল (সা.) তাঁর শেখার ক্ষমতা লক্ষ করেছিলেন। তাই তাঁকে ইহুদিদের ভাষা শেখার নির্দেশ দেন। জায়েদ (রা.) বলেন, তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ভাষা শিখে ফেলেন। এরপর ইহুদিদের চিঠি নবীজির কাছে পড়ে শোনাতেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে তাদের চিঠি লিখতেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৭১৫)
পরবর্তী সময়ে তিনি ওহি লেখকদের অন্যতম হন। কোরআন সংকলনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন। ফরায়েজ শাস্ত্রেও তিনি বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মধ্যেও তিনি জ্ঞানের বিশেষ যোগ্যতা দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, তাঁকে ধর্মের গভীর জ্ঞান দান করুন এবং তাঁকে কোরআনের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৩)
পরে ইবনে আব্বাস (রা.) উম্মতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ও মুফাসসির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
৩. আত্মবিশ্বাস তৈরি করা
তরুণ বয়সে আত্মবিশ্বাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন তরুণ যদি মনে করে, ‘আমি পারি না’, তাহলে তার অনেক যোগ্যতাই অপ্রকাশিত থেকে যায়। রাসুল (সা.) তাই প্রয়োজনমতো তরুণদের ভালো গুণের প্রশংসা করতেন।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘আবদুল্লাহ কতই না উত্তম মানুষ, যদি সে রাতে নামাজ পড়ত!’ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘এর পর থেকে তিনি খুব কমই রাতের নামাজ ছেড়েছেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১২২)
এখানে নবীজি (সা.) সরাসরি ‘তুমি তাহাজ্জুদ পোড়ো না’ বলে ভর্ৎসনা করেননি। আগে তার ভালো দিকটি উল্লেখ করেছেন। তারপর উন্নতির একটি পথ দেখিয়েছেন। এ ধরনের প্রশংসা মানুষকে অনুপ্রেরণা জোগায়। আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
৪. তরুণদের হাতে বাস্তব দায়িত্ব তুলে দেওয়া
রাসুল (সা.) তরুণদের শুধু ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে প্রস্তুত করেননি; যোগ্যতা দেখলে তাদের বর্তমানেই দায়িত্ব দিয়েছেন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ওসামা ইবনে জায়েদ (রা.)।
নবীজি তাঁকে একটি বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই বাহিনীতে বয়সে তাঁর চেয়ে অনেক বড় সাহাবিও ছিলেন। ওসামা তখন তরুণ। কিছু মানুষ তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে আপত্তি করলে নবীজি বললেন, ‘তোমরা যদি ওসামার নেতৃত্ব নিয়ে আপত্তি করো, এর আগে তাঁর পিতার নেতৃত্ব নিয়েও আপত্তি করেছিলে। আল্লাহর শপথ, সে নেতৃত্বের উপযুক্ত ছিল। আর তার পরে ওসামাও আমার কাছে প্রিয় এবং নেতৃত্বের উপযুক্ত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭৩০)
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। রাসুল (সা.) নেতৃত্ব শেখানোর জন্য ওসামাকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করাননি। তাঁর যোগ্যতার ওপর আস্থা রেখে বাস্তব দায়িত্ব দিয়েছেন। কেননা দায়িত্ব পালন করতে করতেই দায়িত্বশীলতা তৈরি হয়।
৫. পাঠশালা থেকে পাঠিয়ে দিতেন জীবনের মাঠে
শিক্ষা যদি বাস্তব জীবনে প্রয়োগের সুযোগ না পায়, তাহলে তার প্রভাব সীমিত হয়ে যায়। রাসুল (সা.) তরুণদের জ্ঞান দিয়েছেন এবং সেই জ্ঞান কাজে লাগানোর সুযোগও দিয়েছেন।
মুসআব ইবনে ওমাইর (রা.) ছিলেন তরুণ। হিজরতের আগে নবীজি তাঁকে মদিনায় পাঠিয়েছিলেন ইসলামের শিক্ষা ও দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
মদিনায় গিয়ে তিনি মানুষের কাছে ইসলাম তুলে ধরেন। তাঁর দাওয়াতের মাধ্যমে সাদ ইবনে মুয়াজ ও উসাইদ ইবনে হুজাইর (রা.)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের মাধ্যমে আরও বহু মানুষ ইসলামের দিকে আসে।
৬. ইমান ও চিন্তার ভিত শক্ত করা
তরুণকে দায়িত্ব দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার আগে তার চিন্তার ভিত শক্ত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) তাই তরুণদের সঙ্গে এমন কথাও বলতেন, যা তাদের পুরো জীবনদর্শন গড়ে দিত।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ছিলেন তখন কিশোর। এক সফরে তিনি নবীজির বাহনের পেছনে বসে ছিলেন। সেই সময় নবীজি (সা.) তাঁকে বললেন, ‘হে বৎস, আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শেখাব।’
এরপর বললেন, ‘আল্লাহর হুকুমের হেফাজত করলে আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করবেন। কিছু চাইলে আল্লাহর কাছে চাইবে। সাহায্য চাইলে আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর জেনে রাখবে, সমগ্র মানুষ তোমার উপকার করতে চাইলেও আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন, তার বাইরে কিছু করতে পারবে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৬)
পরে ইবনে আব্বাস (রা.) উম্মাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেমে পরিণত হন।
৭. শুধু শিষ্য নয় শিক্ষক বানাতেন
নবীজির কাছে কয়েকজন তরুণ প্রায় ২০ দিন অবস্থান করেছিলেন। তাঁরা নিজেদের পরিবারের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। এটা বুঝতে পেরে তিনি তাঁদের বাড়ি ফিরে যেতে বললেন।
কিন্তু তাঁদের যাওয়ার সময় বললেন, ‘তোমরা তোমাদের পরিবারের কাছে ফিরে যাও, তাদের শিক্ষা দাও এবং তাদের সৎকাজের নির্দেশ দাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭২৪৬)
লক্ষণীয় বিষয় হলো, তাঁরা নবীজির কাছে এসেছিলেন শিখতে। আর ফিরে গেলেন শিক্ষক হয়ে।
এটাই নবীজির দীক্ষার বড় বৈশিষ্ট্য যে মানুষকে নিজের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা নয়; তাকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে সে নিজেই অন্যদের পথ দেখাতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর পরস্পরকে দেখা এবং প্রশ্ন করার বিষয়ে ইসলামে কিছু নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। হাদিসে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া নারীকে দেখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে রয়েছে কিছু শর্ত ও সীমারেখা।
মোহাম্মদপুর জামিআ মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার মুফতি ও মুহাদ্দিস শফিকুল ইসলাম হাটহাজারী এ সম্পর্কে এক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। নিচে তার প্রশ্নে উত্তর তুলে ধরা হলো-
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল যে, আমি জনৈকা আনসারী নারীকে বিয়ে করার ইচ্ছা করেছি (আপনার কী অভিমত?)। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘(বিয়ের পূর্বে) তাকে দেখে নাও। কেননা, আনসারী নারীদের চক্ষুতে কিছু দোষ থাকে।’ (মুসলিম: ১৪২৪, নাসায়ী: ৩২৪৬, আহমাদ: ৭৮৪২, সহীহাহ্: ৯৫)
অন্য হাদিসে এসেছে, জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, তখন সম্ভব হলে তার এমন কিছু বৈশিষ্ট্য যেন দেখে নেয়, যা তাকে বিয়েতে আগ্রহী করে তোলে।’
বর্ণনাকারী বলেন, ‘আমি এক নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর তাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা অন্তরে গোপন রেখেছিলাম। এরপর আমি গোপনে তার মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেখি, যা আমাকে তাকে বিয়ে করতে আগ্রহী করে তুলল। এরপর আমি তাকে বিয়ে করি।’ (আবু দাউদ: ২০৮২)
তবে পাত্রী দেখার সময় শুধুমাত্র পাত্র ব্যতীত অন্য কোনো নন-মাহরাম, যেমন ছেলের বাবা, ভাই, দুলাভাই, বন্ধু প্রমুখ, মেয়েকে দেখতে পারবে না। এটা হারাম।
আর পাত্র যখন পাত্রীকে দেখবে, তখন এক্ষেত্রে শুধু পাত্রীর চেহারা, হাতের কব্জি ও পায়ের পাতা দেখা যাবে। এছাড়া অন্য কোনো অঙ্গ দেখতে পারবে না। এমনকি মাথার চুলও দেখা যাবে না।
এ বিষয়ে ইবন আবেদীন রহ. বলেন, ‘পাত্রীর চেহারা, দুই হাতের কব্জি ও দুই পা (পাতা) দেখা জায়েয। এর বেশি দেখা যাবে না।’ (হাশিয়া ইবন আবেদীন: ৫/৩২৫)
পাত্র-পাত্রীর দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপচারিতায় যেসব শর্ত
পাত্র-পাত্রীর পরস্পর দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপচারিতার কয়েকটি মূলনীতি রয়েছে।
১. খালওয়াত (একা থাকা, গোপন কক্ষে অবস্থান করা বা আত্মগোপন) হতে পারবে না।
২. মুবাহ (ইসলামে যেসব বিষয়ে আদেশ, নিষেধ কিছুই করা হয়নি বা যেসব বিষয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে) বিষয় ব্যতীত অন্য কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যাবে না।
৩. ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকতে হবে। যদি কামভাব জাগ্রত হওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে যায়, অথবা কোনো একজন উপভোগ করতে শুরু করে নেয়, তাহলে তখন সেটা হারাম হয়ে যাবে।
৪. নারী নরম ভাষায় কথা বলতে পারবে না।
৫. নারী পূর্ণ হিজাব তথা কবজা পর্যন্ত হাত, টাখনু পর্যন্ত পা এবং মুখ ব্যতীত সমস্ত শরীর ঢেকে রাখবে।
৬. প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথাবার্তা বলা যাবে না।
যখন এসব শর্ত পাওয়া যাবে, তখনই মূলত পাত্র-পাত্রী পরস্পর আলোচনা ও দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারবে। সুতরাং, পাত্রী দেখার সময় পাত্রের অতিরিক্ত প্রশ্ন না করা উচিত। এতে পাত্রী বিব্রত অবস্থায় পড়তে পারেন। যতটুকু জানার প্রয়োজন থাকবে, পাত্রের মাহরাম মহিলারা তা জেনে নেবেন।
ছবি : সংগৃহীত
পবিত্রতা অর্জন মুমিনের জীবনের এক অনুপম সৌন্দর্য। আত্মাকে স্নিগ্ধ রাখা এবং প্রভুর দরবারে সিজদানত হওয়ার প্রাথমিক চাবিকাঠি হলো অজু। কেবল নামাজ বা কুরআন তিলাওয়াতই নয়, সার্বক্ষণিক অজু অবস্থায় থাকার আত্মিক ও মানসিক ফজিলত অপরিসীম। এটি মনকে সতেজ ও প্রফুল্ল রাখে। পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালোবেসে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন—
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তওবাকারী এবং পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ২২২)
গালি দিলে কি অজু ভেঙে যায়? ফিকহি বিধান
দৈনন্দিন জীবনে রাগ কিংবা অসাবধানতাবশত অজুর পর মুখ থেকে অশালীন বাক্য বা গালি বের হয়ে গেলে অনেকের মনেই এই সংশয় জাগে যে অজু ভেঙে গেল কি না।
ফিকহি বিধান অনুযায়ী, অজু করার পর কাউকে গালি দিলে সরাসরি অজু ভেঙে যায় না। অজু ভেঙে যাওয়ার নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক কারণ রয়েছে। যেহেতু গালি দেওয়া বা অশালীন কথা বলা অজু ভঙ্গের কারণগুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়, তাই অজুর পর গালি দিলে অজু নষ্ট হবে না। তবে গালি দেওয়ার কারণে অজুর আধ্যাত্মিক নুর ও পবিত্রতার মাহাত্ম্য বা বরকত কমে যায়। এ জন্য বিজ্ঞ আলেমদের পরামর্শ হলো— এমন পরিস্থিতি ঘটলে নতুন করে আবার অজু করে নেওয়া উত্তম।
ইসলামে গালি দেওয়া ও কষ্ট দেওয়ার ভয়াবহতা
অজু না ভাঙলেও কাউকে গালি দেওয়া ইসলামে একটি অত্যন্ত গর্হিত ও কবিরা গুনাহের কাজ। কোনো যৌক্তিক বা অযৌক্তিক কারণেই ইসলামে অন্যকে গালি দেওয়ার বিন্দুমাত্র অনুমতি নেই। এমনকি ঠাট্টা-মশকরা কিংবা হাসি-কৌতুকের ছলেও কাউকে গালি দেওয়া বা গালিগালাজ করা কঠোরভাবে নিন্দনীয়।
কাউকে গালি দেওয়া বা মুখে কষ্ট দেওয়ার ভয়াবহতা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন—
وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا
‘যারা বিনা অপরাধে ইমানদার পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই মিথ্যা অপবাদ এবং স্পষ্ট অপরাধের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আল-আহজাব: আয়াত ৫৮)
অজু শুধু শারীরিক পরিচ্ছন্নতার মাধ্যম নয়, এটি মুমিনের আত্মিক উৎকর্ষ সাধনেরও একটি বড় উপায়। তাই বাহ্যিক পবিত্রতা রক্ষার পাশাপাশি মুখের ভাষাকেও সংযত রাখতে হবে। সব ধরনের অশ্লীলতা ও গালিগালাজ থেকে দূরে থেকে নিজেদের জীবনকে ইবাদত ও সুন্দরের আলোয় আলোকিত করাই প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।