ঢাকায় প্রতি বছর কোরবানির আগে জমে ওঠে পশুর হাট
কোরবানির সময় এলেই অনেকেই নিজের নাম ছাড়াও বাবা-মা, নাবালক সন্তান বা মৃত আত্মীয়স্বজনের নামেও কোরবানি দিয়ে থাকেন। অনেক পরিবারে আবার একটি পশু কোরবানিতে কয়েকজন শরিক হন, কেউ কেউ মৃত আত্মীয়-স্বজনের জন্য নামেও অংশ রাখেন। কোরবানি কার নামে হবে, কার ওপর ওয়াজিব এবং অন্যের নামে কোরবানি দেওয়া যাবে কিনা‒ এসব বিষয় নিয়ে ইসলামি শরিয়তে নির্দিষ্ট কিছু বিধান রয়েছে।
মূলত, ছাগল, ভেড়া বা দুম্বার মতো প্রাণী একজনের পক্ষ থেকে একটি কোরবানি হিসেবেই আদায় করা হয়। অর্থাৎ, এসব পশুতে একাধিক ব্যক্তি শরিক হতে পারেন না। তবে গরু, মহিষ বা উটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাতজন পর্যন্ত শরিক হয়ে কোরবানি দেওয়া যায়। প্রত্যেকের নিয়ত ও অংশ আলাদা হলেও কোরবানি একটি পশুর মাধ্যমেই আদায় করা সম্ভব। ‘সাতজন মানে সাতটি নামের পক্ষ থেকে। সাতটি নামের চেয়ে কমও হতে পারে, বেশি হতে পারবে না। ভাগের ক্ষেত্রে নামের বিষয়টি হলো, অমুকের পক্ষ থেকে (কোরবানি হচ্ছে) এবং এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোরবানির পশু জবাই আল্লাহ'র নামে করতে হয় ‘ বলেন ইসলাম বিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ।
কিন্তু মৃত বাবা-মায়ের নামে কোরবানি করা যাবে? স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই কি আলাদা কোরবানি প্রয়োজন? নাবালক সন্তান বা যাদের আয় রোজগার নেই, তাদের নামে কোরবানি দেওয়া যাবে?
কোরবানি মূলত কার ওপর ওয়াজিব?
ঈদ-উল-আযহা বা কোরবানির ঈদ বাংলাদেশের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব। প্রতিবছর কোরবানির ঈদে সৃষ্টিকর্তার সন্তষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে মুসলিম বিশ্বসহ বাংলাদেশের মুসলমানরা পশু কোরবানি করে থাকেন। আরবি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, প্রতিবছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখ কোরবানির দিন ও পরবর্তী দুই দিন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা কোরবানি দিয়ে থাকেন।
ধর্মীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, যাদের ওপর কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব তারা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোরবানি না দেন, তাহলে গোনাহের ভাগীদার হতে হবে।
ইসলামের বিধান অনুযায়ী, নেসাব অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তির কাছে সাড়ে সাত ভরি পরিমাণ স্বর্ণ অথবা, সাড়ে ৫২ ভরি পরিমাণ রুপা বা এর সমমূল্যের নগদ টাকা অথবা সম্পদ থাকলে তার জন্য কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব। যাদের এই পরিমাণ সম্পদ বা সম্পত্তি নেই, তাদের জন্য পশু কোরবানি বাধ্যতামূলক নয়। এই নিয়ম নারী-পুরুষ সবার জন্য প্রযোজ্য।
ইসলামের নবী মুহাম্মদের সময় মানুষের সম্পদের হিসাব অনেক ক্ষেত্রে স্বর্ণ-রুপা দিয়েই করা হতো। তাই, ইসলামে "নেসাব" নির্ধারণে স্বর্ণ ও রুপাকে ভিত্তি ধরা হয়েছে।
বর্তমান বাজারে মানভেদে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের দাম প্রায় ১৮ লাখ কিংবা ১৮ লাখের চেয়ে কিছুটা বেশি। অন্যদিকে, সাড়ে ৫২ ভরি রুপার দাম প্রায় তিন লাখ টাকার কাছাকাছি। সেক্ষেত্রে রুপার নেসাব ধরলে যারা স্বচ্ছল নয়, তাদের ওপরও কোরবানি ওয়াজিব হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ এ বিষয়েবলছিলেন, ওই সময় (ইসলামের নবী মুহাম্মদের সময়) সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ এবং সাড়ে ৫২ ভরি রুপার দাম এক ছিল। যুগ পরিক্রমায় এখন দামে পার্থক্য হয়ে গেছে। তাই, এখন সাড়ে ৫২ ভরি রুপা বাজারে যে দামে বিক্রি হয়, সেই পরিমাণ অর্থ যদি জিলহজ মাসের ১০, ১১, ১২–এই তিন দিনে যদি কারও হাতে জমা থাকে, তাহলে উনি কোরবানি দিবেন।
কখন অন্য কারও নামে কোরবানি দেওয়া যাবে?
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারী-পুরুষের ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়। তবে অনেকেই আছেন, যারা অন্যদের নামেও কোরবানি দেন। যেমন, কেউ তার কোনো পরিবারের সদস্য বা প্রিয় মানুষের নামে কোরবানি দেন। অনেকেই আছেন, যারা তাদের মৃত বাবা-মায়ের নামে বা কোনো আত্মীয়ের নামে কোরবানি দেন।
বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে মৃত বাবা-মা বা স্বজনদের নামে কোরবানি দেওয়ার প্রচলন অনেক পুরোনো। ইসলামি দৃষ্টিতে মৃত ব্যক্তির নামে কোরবানি দেওয়া জায়েজ। অনেকেই মনে করেন, এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির জন্য সওয়াবের দোয়া করা হয়। তবে, জীবিত বা মৃত, অন্য কারও নামে কোরবানি দেওয়ার সর্বপ্রথম শর্ত হলো, আগে নিজের ওয়াজিব কোরবানি আদায় করতে হবে। তারপর সে অন্য কারও নামও যুক্ত করতে পারবে, বলছিলেন শরীফ মুহাম্মদ।
অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদও বলছিলেন, নিজের নামে দিয়ে অন্যদের নামে দেওয়া যায়। তা হতে পারে কোনো মহান ব্যক্তি বা কোনো প্রিয় মানুষ বা পরিবারের সদস্য।
তবে মৃত ব্যক্তির পক্ষে কোরবানি দিলে সেই মাংস গরীবকে একটু বেশি দিলে ভালো হয়। এছাড়া, অনেকেই আছেন যারা তাদের নাবালক সন্তানের নামে কোরবানি দেন।নাবালক সন্তানের নামেও কোরবানি দেওয়ার জায়েজ আছে বলে জানান শরীফ মুহাম্মদ।
সব শরীককে কি সমান অর্থ দিতে হবে?
বিধান অনুযায়ী, সব শরীককে সমান অর্থ দিতে হবে এবং মাংসও সমবন্টন করতে হবে। ইসলাম বিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ বলেছেন, সাতজন যদি একদমই স্বতন্ত্র হয়, যেমন- ভিন্ন ভিন্ন পরিবারের বা ভিন্ন ব্যক্তি, তাহলে তারা প্রত্যেকে সমান টাকা দিবেন এবং মাংসও সমানভাবে ভাগ করে নিবেন। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেমন, অনেকেই আছেন, যারা কোরবানি দিতে চান কিন্তু প্রতি ভাগে যে পরিমাণ টাকা দিতে হবে, তিনি সেই পরিমাণ দিতে পারছে না। তখন "কেউ তাকে ১০ হাজার টাকা উপহার হিসেবে দিতে পারে। কিন্তু মাংস সমানভাবে ভাগ করে দিতে হবে। কেউ উপহার হিসেবে দিলে সমস্যা নাই," বলছিলেন অধ্যাপক আব্দুর রশীদ।
তবে কেউ যদি সন্তান হিসেবে তার মায়ের বা বাবার নামে কোরবানি দেন, এমনকি পরিবারের অন্য কারও নামে বা একাধিক ব্যক্তির নামে স্বেচ্ছায় কোরবানি দেন, তখন তাদের কাছে সেই টাকা চাওয়া জরুরি না বলে জানিয়েছেন ইসলামি স্কলাররা। ‘আর স্বামী হিসেবে কেউ যদি স্ত্রীর নামে কোরবানি দিতে চান, স্ত্রীর কোরবানি ওয়াজিব হোক বা না হোক, সেক্ষেত্রে স্ত্রীকে না জানিয়ে করার চেয়ে জানিয়ে করা ভালো। যদি স্ত্রীর কোরবানি ওয়াজিব হয় সেক্ষেত্রে স্ত্রীকে নিয়ত করতে হবে যে তার কোরবানিটা তার স্বামী করছেন,’ বলেন শরীফ মুহাম্মদ।
যদিও অধ্যাপক আব্দুর রশীদের মতে, মৃত ব্যক্তি বা অন্য কারও নামে কোরবানি দিলে এখানে অনুমতির প্রয়োজন নাই। যে কারও নামেই কোরবানি দেওয়া যেতে পারে। আর কোনো নারী যদি অবিবাহিত হন এবং তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়, তাহলে তাকেও আগে নিজের ওয়াজিব কোরবানি আদায় করতে হবে। এরপর তিনিও তার বাবা-মা বা অন্য কোনো আত্মীয়-স্বজন বা প্রিয়জনের নামে নিজ অর্থেই কোরবানি দিতে পারবেন।
ঋণ নিয়ে কোরবানি করা যায়?
এদিকে, অনেকেই আছেন, যারা খুব স্বচ্ছল নন, কিন্তু কোরবানি দিতে চান। সেক্ষেত্রে তারাও কোরবানি দিতে পারবেন এবং তা নফল হিসেবে কবুল হবে উল্লেখ করে ইসলাম বিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ বলছিলেন, এখানে একটা শর্ত আছে। ‘ধরলাম, বাচ্চাদের মন খারাপ হয়ে আছে। সেজন্য তিনি কোরবানি দিতে চান। তাহলে হবে না। এখানে শর্ত হলো, কোনো সামাজিক উপলক্ষ্যই এখানে মূখ্য হতে পারবে না। নিয়ত থাকতে হবে যে আল্লাহকে খুশি করার জন্য করছি। অর্থাৎ, এটা প্রদর্শনমূলক না,’ বলেন তিনি।
এক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি ঋণ নিয়ে সেই নফল কোরবানি আদায় করতে পারবেন। ‘কিন্তু বারবার ঋণ করার পর সেই ঋণ ওয়াদামাফিক পূরণ না করতে পারলে সেটারও দরকার নাই করার।’ এছাড়া যারা একশো বা হাজার কোটি টাকা শিল্প ঋণ নিয়েছেন নেসাবের পরিমাণ মিলাতে গিয়ে তাদের ঋণের পরিমাণ ধর্তব্য হবে না। কারণ ঋণের টাকা হিসাবে ধরা হলে সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও তার কোরবানি আবশ্যকীয় থাকে না। কিন্তু ব্যক্তিগত লোন, তা ১০ হাজার টাকা হোক বা ১০ লাখ টাকা হোক, এটা প্লাস-মাইনাস করে যদি দেখা যায় যে লোন পরিশোধ করেও আপনার কাছে নেসাব পরিমাণ অতিরিক্ত টাকা আছে, তাহলে আপনার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়ে যাবে,’ যোগ করেন তিনি।
মানের ৭০টির বেশি শাখা রয়েছে। এর প্রতিটি শাখাই একজন মুমিনের জীবনের কোনো না কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস, কথা কিংবা কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে প্রথম, সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ইমানের ষাটের অধিক অথবা সত্তরের অধিক শাখা রয়েছে। তার মধ্যে সর্বপ্রধান হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা এবং সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর লজ্জা হলো ইমানের একটি শাখা।’ (শুআবুল ইমান লি-বায়হাকি, ৮৮)
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। এই বাক্যটি এই জন্য ইমানের সর্বপ্রধান শাখা, কারণ এর মাধ্যমেই একজন মানুষ ইমানের গণ্ডিতে প্রবেশ করে।
বিখ্যাত মুহাদ্দিস হুসাইন আল হালিমি (রহ.) এই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর অর্থ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছেন:
১. ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর মাধ্যমে আমরা স্বীকার করি, এই বিশ্বজগতের একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। এই পৃথিবী, আকাশ, মানুষ, প্রাণী—কোনোটিই নিজে নিজে অস্তিত্ব লাভ করেনি। সবকিছুর পেছনে একজন সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা ও পরিকল্পনা রয়েছে।
২. সেই সৃষ্টিকর্তা একক ও মহাপরাক্রমশালী। তার কোনো শরিক নেই। যাবতীয় ভালো ও মন্দ তিনিই সৃষ্টি করেছেন। তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন, তার কোনো অংশীদার নেই, এবং তিনি স্ত্রী-সন্তান থেকেও পবিত্র। তিনিই একমাত্র উপাসনার যোগ্য।
৩. আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহকে তার সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করা যায় না। তিনি মানুষের মতো নন, কোনো বস্তু বা দেহ নন এবং সৃষ্টিজগতের কোনো বৈশিষ্ট্য তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার অর্থ তাই শুধু অন্য উপাস্যকে অস্বীকার করা নয়; বরং আল্লাহকে সৃষ্টির ঊর্ধ্বে, অনন্য ও অতুলনীয় হিসেবে বিশ্বাস করাও এর অন্তর্ভুক্ত।
৪. আল্লাহ তাআলাই অনাদি ও অনন্ত। আল্লাহ ছাড়া যা কিছু আছে, এক সময় তার কিছুই ছিল না। আল্লাহই নিজের ইচ্ছায় সবকিছুকে অস্তিত্ব দিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি শুধু এই মহাবিশ্বের কোনো একটি অংশের স্রষ্টা নন; বরং সমগ্র সৃষ্টিজগতের একমাত্র স্রষ্টা। তাই মহাবিশ্বের অস্তিত্বকে আল্লাহর পাশাপাশি অন্য কোনো অনাদি কারণ বা সত্তার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ নেই। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মানুষকে এই বিশ্বাসই শেখায় আল্লাহ ছাড়া কোনো অনাদি সত্তা নেই, তিনিই সবকিছুর স্রষ্টা।
৫. আল্লাহ এই পৃথিবীকে উদ্দেশ্যহীন সৃষ্টি করেননি, আবার সৃষ্টি করে তাকে ছেড়ে দেননি। তিনিই তার সৃষ্টিজগৎ পরিচালনা করছেন। পৃথিবীর ঘটনাপ্রবাহ কোনো স্বাধীন প্রাকৃতিক শক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়নি। নক্ষত্র, ফেরেশতা কিংবা অন্য কোনো সত্তাও স্বাধীনভাবে বিশ্ব পরিচালনা করে না। সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্দেশে পরিচালিত হয়। তাই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার অর্থ হলো সৃষ্টি যেমন একমাত্র আল্লাহর, তেমনই তার পরিচালনাও একমাত্র আল্লাহর হাতে।
ব্যক্তি যখন এই পাঁচটি পয়েন্ট সামনে রেখে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস আনবে, সেই সাথে বিশ্বাসের দায়িত্ব ও কর্তব্যও পালন করবে, তখন সে ইমানদার পরিচয় লাভ করবে। হাদিসে এমন ব্যক্তির জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। যেমন এরশাদ আছে: ‘যে ব্যক্তি এই বিশ্বাস নিয়ে মারা যাবে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (শুআবুল ইমান লি-বায়হাকি: ৯৪)
আরও বলা হয়েছে, ‘যার জীবনের শেষ কথা হবে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (শুআবুল ইমান লি-বায়হাকি, ৯৩)
এ কারণেই ইমানের ৭০টির বেশি শাখার মধ্যে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-কে প্রথম ও সর্বোচ্চ বলা হয়েছে।
প্রতীকী ছবি
ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালেও দেখা যায়, ইসলামের প্রথম যুগের বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তরুণ সাহাবিরাই পালন করেছেন। আলী ইবনে আবি তালিব, মুসআব ইবনে উমাইর, ওসামা ইবনে জায়েদ, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর মতো তরুণেরা নবীজির হাতে গড়ে উঠেছিলেন।
তাঁদের কেউ ছিলেন আলেম, কেউ প্রচারক, কেউ প্রশাসক, কেউ সেনাপতি। তাঁদের যোগ্যতা এক ছিল না। দায়িত্বও এক ছিল না। কিন্তু প্রত্যেকের মধ্যে রাসুল (সা.) এমন কিছু দেখেছিলেন, যা অন্যরা হয়তো তখনো দেখতে পায়নি।
তরুণদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাই মহানবীর পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত বাস্তবমুখী। তিনি উপদেশ দিয়েছেন, আবার দায়িত্বও দিয়েছেন। ভুল শুধরে দিয়েছেন, আবার আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছেন। ইমান তৈরি করেছেন, আবার সেই ইমানের বাস্তব প্রয়োগের সুযোগও দিয়েছেন।
১. ভালোবাসার মাধ্যমে তরুণের হৃদয় জয় করা
কোনো মানুষকে সংশোধন করতে হলে আগে তার হৃদয়ে জায়গা করে নিতে হয়। রাসুল (সা.) তরুণদের সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন, যাতে তারা নির্ভয়ে তাঁর কাছে নিজেদের কথা বলতে পারত। এর একটি অসাধারণ উদাহরণ সেই যুবক, যে নবীজির কাছে এসে ব্যভিচারের অনুমতি চেয়েছিল।
সাহাবিরা তার কথায় ক্ষুব্ধ হলেন। কিন্তু নবীজি (সা.) তাকে ধমক দিলেন না। বললেন, ‘তাকে আমার কাছে আসতে দাও।’ এরপর তাকে কাছে বসিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি তোমার মায়ের জন্য এমনটা পছন্দ করবে?’
যুবক বলল, ‘না, আল্লাহর কসম।’ তিনি বললেন, ‘মানুষও তাদের মায়ের জন্য তা পছন্দ করে না।’ এরপর কন্যা, বোন, ফুফু ও খালার কথা উল্লেখ করলেন। প্রতিবার যুবক একই উত্তর দিল। শেষে রাসুল (সা.) তার জন্য দোয়া করলেন।
বর্ণনাকারী আবু উমামাহ (রা.) বলেন, এরপর ওই যুবকের কাছে ব্যভিচারের চেয়ে অধিক ঘৃণিত আর কিছু ছিল না। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২২২১১)
২. প্রতিভা খুঁজে বের করে তাকে বিকশিত করা
প্রত্যেক মানুষ একই ধরনের যোগ্যতা নিয়ে জন্মায় না। কেউ জ্ঞান অর্জনে এগিয়ে, কেউ নেতৃত্বে, কেউ ভাষা ও লেখায়, কেউ দাওয়াতের কাজে। রাসুল (সা.) তরুণদের সবাইকে একই ছাঁচে গড়ে তোলেননি। তিনি প্রত্যেকের স্বতন্ত্র যোগ্যতা চিনেছেন এবং সেই অনুযায়ী তাদের তৈরি করেছেন।
জায়েদ ইবনে সাবিত ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী তরুণ। রাসুল (সা.) তাঁর শেখার ক্ষমতা লক্ষ করেছিলেন। তাই তাঁকে ইহুদিদের ভাষা শেখার নির্দেশ দেন। জায়েদ (রা.) বলেন, তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ভাষা শিখে ফেলেন। এরপর ইহুদিদের চিঠি নবীজির কাছে পড়ে শোনাতেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে তাদের চিঠি লিখতেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৭১৫)
পরবর্তী সময়ে তিনি ওহি লেখকদের অন্যতম হন। কোরআন সংকলনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন। ফরায়েজ শাস্ত্রেও তিনি বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মধ্যেও তিনি জ্ঞানের বিশেষ যোগ্যতা দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, তাঁকে ধর্মের গভীর জ্ঞান দান করুন এবং তাঁকে কোরআনের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৩)
পরে ইবনে আব্বাস (রা.) উম্মতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ও মুফাসসির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
৩. আত্মবিশ্বাস তৈরি করা
তরুণ বয়সে আত্মবিশ্বাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন তরুণ যদি মনে করে, ‘আমি পারি না’, তাহলে তার অনেক যোগ্যতাই অপ্রকাশিত থেকে যায়। রাসুল (সা.) তাই প্রয়োজনমতো তরুণদের ভালো গুণের প্রশংসা করতেন।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘আবদুল্লাহ কতই না উত্তম মানুষ, যদি সে রাতে নামাজ পড়ত!’ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘এর পর থেকে তিনি খুব কমই রাতের নামাজ ছেড়েছেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১২২)
এখানে নবীজি (সা.) সরাসরি ‘তুমি তাহাজ্জুদ পোড়ো না’ বলে ভর্ৎসনা করেননি। আগে তার ভালো দিকটি উল্লেখ করেছেন। তারপর উন্নতির একটি পথ দেখিয়েছেন। এ ধরনের প্রশংসা মানুষকে অনুপ্রেরণা জোগায়। আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
৪. তরুণদের হাতে বাস্তব দায়িত্ব তুলে দেওয়া
রাসুল (সা.) তরুণদের শুধু ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে প্রস্তুত করেননি; যোগ্যতা দেখলে তাদের বর্তমানেই দায়িত্ব দিয়েছেন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ওসামা ইবনে জায়েদ (রা.)।
নবীজি তাঁকে একটি বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই বাহিনীতে বয়সে তাঁর চেয়ে অনেক বড় সাহাবিও ছিলেন। ওসামা তখন তরুণ। কিছু মানুষ তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে আপত্তি করলে নবীজি বললেন, ‘তোমরা যদি ওসামার নেতৃত্ব নিয়ে আপত্তি করো, এর আগে তাঁর পিতার নেতৃত্ব নিয়েও আপত্তি করেছিলে। আল্লাহর শপথ, সে নেতৃত্বের উপযুক্ত ছিল। আর তার পরে ওসামাও আমার কাছে প্রিয় এবং নেতৃত্বের উপযুক্ত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭৩০)
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। রাসুল (সা.) নেতৃত্ব শেখানোর জন্য ওসামাকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করাননি। তাঁর যোগ্যতার ওপর আস্থা রেখে বাস্তব দায়িত্ব দিয়েছেন। কেননা দায়িত্ব পালন করতে করতেই দায়িত্বশীলতা তৈরি হয়।
৫. পাঠশালা থেকে পাঠিয়ে দিতেন জীবনের মাঠে
শিক্ষা যদি বাস্তব জীবনে প্রয়োগের সুযোগ না পায়, তাহলে তার প্রভাব সীমিত হয়ে যায়। রাসুল (সা.) তরুণদের জ্ঞান দিয়েছেন এবং সেই জ্ঞান কাজে লাগানোর সুযোগও দিয়েছেন।
মুসআব ইবনে ওমাইর (রা.) ছিলেন তরুণ। হিজরতের আগে নবীজি তাঁকে মদিনায় পাঠিয়েছিলেন ইসলামের শিক্ষা ও দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
মদিনায় গিয়ে তিনি মানুষের কাছে ইসলাম তুলে ধরেন। তাঁর দাওয়াতের মাধ্যমে সাদ ইবনে মুয়াজ ও উসাইদ ইবনে হুজাইর (রা.)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের মাধ্যমে আরও বহু মানুষ ইসলামের দিকে আসে।
৬. ইমান ও চিন্তার ভিত শক্ত করা
তরুণকে দায়িত্ব দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার আগে তার চিন্তার ভিত শক্ত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) তাই তরুণদের সঙ্গে এমন কথাও বলতেন, যা তাদের পুরো জীবনদর্শন গড়ে দিত।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ছিলেন তখন কিশোর। এক সফরে তিনি নবীজির বাহনের পেছনে বসে ছিলেন। সেই সময় নবীজি (সা.) তাঁকে বললেন, ‘হে বৎস, আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শেখাব।’
এরপর বললেন, ‘আল্লাহর হুকুমের হেফাজত করলে আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করবেন। কিছু চাইলে আল্লাহর কাছে চাইবে। সাহায্য চাইলে আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর জেনে রাখবে, সমগ্র মানুষ তোমার উপকার করতে চাইলেও আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন, তার বাইরে কিছু করতে পারবে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৬)
পরে ইবনে আব্বাস (রা.) উম্মাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেমে পরিণত হন।
৭. শুধু শিষ্য নয় শিক্ষক বানাতেন
নবীজির কাছে কয়েকজন তরুণ প্রায় ২০ দিন অবস্থান করেছিলেন। তাঁরা নিজেদের পরিবারের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। এটা বুঝতে পেরে তিনি তাঁদের বাড়ি ফিরে যেতে বললেন।
কিন্তু তাঁদের যাওয়ার সময় বললেন, ‘তোমরা তোমাদের পরিবারের কাছে ফিরে যাও, তাদের শিক্ষা দাও এবং তাদের সৎকাজের নির্দেশ দাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭২৪৬)
লক্ষণীয় বিষয় হলো, তাঁরা নবীজির কাছে এসেছিলেন শিখতে। আর ফিরে গেলেন শিক্ষক হয়ে।
এটাই নবীজির দীক্ষার বড় বৈশিষ্ট্য যে মানুষকে নিজের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা নয়; তাকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে সে নিজেই অন্যদের পথ দেখাতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর পরস্পরকে দেখা এবং প্রশ্ন করার বিষয়ে ইসলামে কিছু নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। হাদিসে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া নারীকে দেখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে রয়েছে কিছু শর্ত ও সীমারেখা।
মোহাম্মদপুর জামিআ মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার মুফতি ও মুহাদ্দিস শফিকুল ইসলাম হাটহাজারী এ সম্পর্কে এক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। নিচে তার প্রশ্নে উত্তর তুলে ধরা হলো-
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল যে, আমি জনৈকা আনসারী নারীকে বিয়ে করার ইচ্ছা করেছি (আপনার কী অভিমত?)। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘(বিয়ের পূর্বে) তাকে দেখে নাও। কেননা, আনসারী নারীদের চক্ষুতে কিছু দোষ থাকে।’ (মুসলিম: ১৪২৪, নাসায়ী: ৩২৪৬, আহমাদ: ৭৮৪২, সহীহাহ্: ৯৫)
অন্য হাদিসে এসেছে, জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, তখন সম্ভব হলে তার এমন কিছু বৈশিষ্ট্য যেন দেখে নেয়, যা তাকে বিয়েতে আগ্রহী করে তোলে।’
বর্ণনাকারী বলেন, ‘আমি এক নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর তাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা অন্তরে গোপন রেখেছিলাম। এরপর আমি গোপনে তার মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেখি, যা আমাকে তাকে বিয়ে করতে আগ্রহী করে তুলল। এরপর আমি তাকে বিয়ে করি।’ (আবু দাউদ: ২০৮২)
তবে পাত্রী দেখার সময় শুধুমাত্র পাত্র ব্যতীত অন্য কোনো নন-মাহরাম, যেমন ছেলের বাবা, ভাই, দুলাভাই, বন্ধু প্রমুখ, মেয়েকে দেখতে পারবে না। এটা হারাম।
আর পাত্র যখন পাত্রীকে দেখবে, তখন এক্ষেত্রে শুধু পাত্রীর চেহারা, হাতের কব্জি ও পায়ের পাতা দেখা যাবে। এছাড়া অন্য কোনো অঙ্গ দেখতে পারবে না। এমনকি মাথার চুলও দেখা যাবে না।
এ বিষয়ে ইবন আবেদীন রহ. বলেন, ‘পাত্রীর চেহারা, দুই হাতের কব্জি ও দুই পা (পাতা) দেখা জায়েয। এর বেশি দেখা যাবে না।’ (হাশিয়া ইবন আবেদীন: ৫/৩২৫)
পাত্র-পাত্রীর দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপচারিতায় যেসব শর্ত
পাত্র-পাত্রীর পরস্পর দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপচারিতার কয়েকটি মূলনীতি রয়েছে।
১. খালওয়াত (একা থাকা, গোপন কক্ষে অবস্থান করা বা আত্মগোপন) হতে পারবে না।
২. মুবাহ (ইসলামে যেসব বিষয়ে আদেশ, নিষেধ কিছুই করা হয়নি বা যেসব বিষয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে) বিষয় ব্যতীত অন্য কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যাবে না।
৩. ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকতে হবে। যদি কামভাব জাগ্রত হওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে যায়, অথবা কোনো একজন উপভোগ করতে শুরু করে নেয়, তাহলে তখন সেটা হারাম হয়ে যাবে।
৪. নারী নরম ভাষায় কথা বলতে পারবে না।
৫. নারী পূর্ণ হিজাব তথা কবজা পর্যন্ত হাত, টাখনু পর্যন্ত পা এবং মুখ ব্যতীত সমস্ত শরীর ঢেকে রাখবে।
৬. প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথাবার্তা বলা যাবে না।
যখন এসব শর্ত পাওয়া যাবে, তখনই মূলত পাত্র-পাত্রী পরস্পর আলোচনা ও দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারবে। সুতরাং, পাত্রী দেখার সময় পাত্রের অতিরিক্ত প্রশ্ন না করা উচিত। এতে পাত্রী বিব্রত অবস্থায় পড়তে পারেন। যতটুকু জানার প্রয়োজন থাকবে, পাত্রের মাহরাম মহিলারা তা জেনে নেবেন।
ছবি : সংগৃহীত
পবিত্রতা অর্জন মুমিনের জীবনের এক অনুপম সৌন্দর্য। আত্মাকে স্নিগ্ধ রাখা এবং প্রভুর দরবারে সিজদানত হওয়ার প্রাথমিক চাবিকাঠি হলো অজু। কেবল নামাজ বা কুরআন তিলাওয়াতই নয়, সার্বক্ষণিক অজু অবস্থায় থাকার আত্মিক ও মানসিক ফজিলত অপরিসীম। এটি মনকে সতেজ ও প্রফুল্ল রাখে। পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালোবেসে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন—
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তওবাকারী এবং পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ২২২)
গালি দিলে কি অজু ভেঙে যায়? ফিকহি বিধান
দৈনন্দিন জীবনে রাগ কিংবা অসাবধানতাবশত অজুর পর মুখ থেকে অশালীন বাক্য বা গালি বের হয়ে গেলে অনেকের মনেই এই সংশয় জাগে যে অজু ভেঙে গেল কি না।
ফিকহি বিধান অনুযায়ী, অজু করার পর কাউকে গালি দিলে সরাসরি অজু ভেঙে যায় না। অজু ভেঙে যাওয়ার নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক কারণ রয়েছে। যেহেতু গালি দেওয়া বা অশালীন কথা বলা অজু ভঙ্গের কারণগুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়, তাই অজুর পর গালি দিলে অজু নষ্ট হবে না। তবে গালি দেওয়ার কারণে অজুর আধ্যাত্মিক নুর ও পবিত্রতার মাহাত্ম্য বা বরকত কমে যায়। এ জন্য বিজ্ঞ আলেমদের পরামর্শ হলো— এমন পরিস্থিতি ঘটলে নতুন করে আবার অজু করে নেওয়া উত্তম।
ইসলামে গালি দেওয়া ও কষ্ট দেওয়ার ভয়াবহতা
অজু না ভাঙলেও কাউকে গালি দেওয়া ইসলামে একটি অত্যন্ত গর্হিত ও কবিরা গুনাহের কাজ। কোনো যৌক্তিক বা অযৌক্তিক কারণেই ইসলামে অন্যকে গালি দেওয়ার বিন্দুমাত্র অনুমতি নেই। এমনকি ঠাট্টা-মশকরা কিংবা হাসি-কৌতুকের ছলেও কাউকে গালি দেওয়া বা গালিগালাজ করা কঠোরভাবে নিন্দনীয়।
কাউকে গালি দেওয়া বা মুখে কষ্ট দেওয়ার ভয়াবহতা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন—
وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا
‘যারা বিনা অপরাধে ইমানদার পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই মিথ্যা অপবাদ এবং স্পষ্ট অপরাধের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আল-আহজাব: আয়াত ৫৮)
অজু শুধু শারীরিক পরিচ্ছন্নতার মাধ্যম নয়, এটি মুমিনের আত্মিক উৎকর্ষ সাধনেরও একটি বড় উপায়। তাই বাহ্যিক পবিত্রতা রক্ষার পাশাপাশি মুখের ভাষাকেও সংযত রাখতে হবে। সব ধরনের অশ্লীলতা ও গালিগালাজ থেকে দূরে থেকে নিজেদের জীবনকে ইবাদত ও সুন্দরের আলোয় আলোকিত করাই প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
ছবি : সংগৃহীত
ইসলামের দৃষ্টিতে জুমার দিন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। হাদিসে এ দিনকে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ দিনে বিশেষ কিছু আমল রয়েছে, যেগুলো পালনের মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করতে পারেন। কোরআনে ‘জুমা’ নামে একটি স্বতন্ত্র সূরাও রয়েছে।
জুমার দিনের মর্যাদা ও আমল সম্পর্কে একাধিক হাদিসে বিস্তারিত নির্দেশনা এসেছে।
১. জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদা
আবু লুবাবা ইবনে আবদুল মুনজির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিনের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, পৃথিবীতে অবতরণ করানো হয়েছে এবং তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এ দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে তিনি তা দান করেন-যদি সে হারাম কিছু প্রার্থনা না করে। আর এ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।(ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৮৯৫)
২. জুমার নামাজ আদায়
জুমার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো জুমার নামাজ আদায় করা। এ দিনের জন্য গোসল করে, পরিচ্ছন্ন হয়ে, সুগন্ধি ব্যবহার করে মসজিদে যাওয়ার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে, ভালোভাবে পবিত্র হয়, সুগন্ধি ব্যবহার করে মসজিদে যায়, দুজন মুসল্লির মাঝখানে গিয়ে তাদের আলাদা না করে, নির্ধারিত নামাজ আদায় করে এবং ইমাম খুতবা শুরু করলে নীরব থাকে-তার এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত সময়ের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৩)
৩. জুমার দিন গোসল করা
জুমার দিন গোসল করা এবং পরিচ্ছন্ন হয়ে মসজিদে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমল।
আউস ইবনে আউস সাকাফি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন ভালোভাবে গোসল করে, দ্রুত মসজিদে যায়, ইমামের কাছাকাছি বসে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে-তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে এক বছরের রোজা ও নামাজের সওয়াব রয়েছে।
(আবু দাউদ, হাদিস: ৩৪৫)
৪. আগে আগে মসজিদে যাওয়া
জুমার দিন যত আগে মসজিদে যাওয়া যায়, তত বেশি ফজিলতের কথা হাদিসে এসেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রথমে মসজিদে যায়, সে যেন একটি উট কোরবানি করল; এরপর যে যায়, সে যেন একটি গরু কোরবানি করল; এরপর যে যায়, সে যেন একটি ছাগল কোরবানি করল। এরপর যারা আসে, তাদের জন্যও পর্যায়ক্রমে সওয়াবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম খুতবার জন্য বের হলে ফেরেশতারা খুতবা শুনতে উপস্থিত হন।
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৪১)
৫. দোয়া কবুলের বিশেষ সময়
জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে দোয়া করলে তা কবুল হওয়ার কথা হাদিসে এসেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কোনো কল্যাণের জন্য দোয়া করলে আল্লাহ তাকে তা দান করেন। হাদিসে এ সময়টি আসরের পর অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে।
(আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৮)
তাই জুমার দিনে বিশেষ করে আসরের পর বেশি বেশি দোয়া করা উচিত।
৬. সুরা কাহাফ পাঠ
জুমার দিনের অন্যতম আমল হলো সুরা কাহাফ পাঠ করা। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পড়বে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় আলোয় আলোকিত থাকবে।
(আল-মুস্তাদরাক: ২/৩৯৯)
৭. বেশি বেশি দরুদ পড়া
জুমার দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করার প্রতি বিশেষভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
আউস ইবনে আবি আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। ... অতএব, তোমরা এ দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো। কারণ জুমার দিনে তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।’
(আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৭)
৮. গুনাহ থেকে বিরত থাকা
জুমার দিনের মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি সব ধরনের গুনাহ থেকে নিজেকে দূরে রাখা জরুরি। হাদিসে জুমার নামাজ ও অন্যান্য আমলের মাধ্যমে এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফ হওয়ার কথা এসেছে-তবে কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকার শর্তও উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই জুমার দিনকে শুধু নামাজের দিন হিসেবে নয়, বরং তওবা, ইবাদত, কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের বিশেষ সুযোগ হিসেবে নেওয়া উচিত।
প্রতীকী ছবি
ইবাদতের প্রথম পুরস্কার হলো আত্মার প্রশান্তি। আমলের মাধ্যমে ইবাদতকারীর মন উত্ফুল্ল হয়। ইবাদতের স্বাদ বলে একটি কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু বহু মুসলমান এমন আছে, যারা বছরের পর বছর ইবাদত করে, আমলময় জীবন যাপন করে, কিন্তু কোনো শান্তি, কোনো তৃপ্তি অনুভূত হয় না।
এখানে ইবাদতে তৃপ্তি আসার উপায় নিয়ে আলোচনা করা হলো—
১. ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করা : ভালো কাজে প্রতিযোগিতা ইবাদতে প্রশান্তি আনে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা প্রতিযোগিতা করো তোমাদের রবের ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে, যার প্রশস্ততা আকাশ ও পৃথিবীর প্রশস্ততার মতো। (সুরা : হাদিদ, আয়াত : ২১) তাই কোনো সৎকর্মের সুযোগ এলে দ্রুত তা সম্পাদন করা সত্যিকার মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
২. ইবাদতে কষ্ট স্বীকার করা : কষ্টের সঙ্গে পূর্ণভাবে অজু করা, এশা ও ফজরের জামাতে যোগদান করা, শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়া, কষ্টের সময় ও সচ্ছলতার সময় আল্লাহর পথে ব্যয় করাকে হাদিসে সর্বোত্তম আমল বলা হয়েছে। আল্লাহ তাঁর নবীকে বলেন, ‘অতঃপর নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।
অতএব যখন অবসর পাও একান্তে ইবাদত করো এবং তোমার রবের দিকে মনোনিবেশ করো। (সুরা : ইনশিরাহ, আয়াত : ৫-৮)
৩. বেশি বেশি নফল ইবাদত করা : নফল ইবাদত তৃপ্তিদায়ক আমলের ক্ষেত্রে সহায়ক। আল্লাহ তাঁর নবীকে বলেন, ‘আর রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ো। এটি তোমার জন্য অতিরিক্ত। নিঃসন্দেহে তোমার রব তোমাকে প্রশংসিত স্থানে উঠাবেন।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭৯)
৪. কোরআন অনুধাবন করা : যেকোনো অবস্থায় কোরআন হলো মুমিনের জন্য শিফা বা আরোগ্য। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তবে কি তারা কোরআন অনুধাবন করে না? নাকি তাদের হৃদয়গুলো তালাবদ্ধ?’ (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ২৪)
৫. পাপের কাছেও না যাওয়া : বারবার পাপ কাজ করার দ্বারা অন্তরে মরিচা পড়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘...প্রকাশ্য বা গোপন কোনো অশ্লীলতার নিকটবর্তী হবে না। ন্যায্য কারণ ছাড়া কাউকে হত্যা করবে না, যা আল্লাহ হারাম করেছেন। এসব বিষয় তিনি তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, যাতে তোমরা অনুধাবন করো।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫১)
৬. অনর্থক কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকা : সফল মুমিনদের গুণাবলি ব্যাখ্যায় আল্লাহ বলেন, ‘যারা অনর্থক ক্রিয়াকলাপ থেকে নির্লিপ্ত।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৩)
রাসুল (সা.) বলেন, ‘ব্যক্তির ইসলামী সৌন্দর্য হলো, অনর্থক কর্মকাণ্ড পরিহার করা।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৯৬৭)
৭. ইবাদতে অহংকার না করা : আগে-পিছে সব গুনাহ মাফ থাকা সত্ত্বে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাহাজ্জুদে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে ইবাদত করতেন। এতে তাঁর দুই পা ফুলে যেত। এ প্রসঙ্গে স্ত্রী আয়েশা (রা.)-এর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?’ (বুখারি, হাদিস : ৪৮৯৭)
৮. সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করা : আল্লাহর স্মরণে অন্তর প্রশান্ত হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘...জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ২৮)
এ জন্য বিভিন্ন সময়ে কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। যেমন—খানাপিনা, ওঠা-বসা, নিদ্রাকালে ও জাগরণে দৈনন্দিন পঠিতব্য দোয়াগুলো বুঝেশুনে পাঠ করা উচিত। মহান আল্লাহ আমাদের আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।