ছবি : সংগৃহীত
পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) পর্যালোচনা সম্মেলনে ইরানকে অন্যতম সহ-সভাপতি নির্বাচিত করা নিয়ে জাতিসংঘে বিতণ্ডায় জড়াল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ইরানের এ নির্বাচনকে এনপিটি চুক্তির প্রতি ‘উপহাস’ বলে বর্ণনা করেছে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরান তাদের পারমাণবিক দায়বদ্ধতা পালনে ব্যর্থ হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গেও পূর্ণ সহযোগিতা করছে না। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।
ইরান বলেছে, পরমাণু চুক্তি মেনে চলার বিষয়ে মন্তব্য করার নৈতিক অধিকার বা গ্রহণযোগ্যতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। তারা যুক্তি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বের একমাত্র দেশ, যারা যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে।
তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই
পাকিস্তানে আফগান শিক্ষার্থীদের মেডিকেল শিক্ষা স্থগিত
পাকিস্তানে আফগান শিক্ষার্থীদের মেডিকেল ও ডেন্টাল পড়ালেখা স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির শিক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘পাকিস্তান মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল’ (পিএমডিসি) । পাশাপাশি বর্তমানে অধ্যয়নরত আফগান শিক্ষার্থীদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পিএমডিসির প্রকাশিত এক দাপ্তরিক চিঠির বরাতে আফগান বার্তা সংস্থা খামা প্রেস জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানের সব সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ আদেশ কার্যকর থাকবে।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকারের উচ্চপর্যায়ের জাতীয় নীতিগত নির্দেশনা এবং গত ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত পিএমডিসির বৈঠকের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নতুন এই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আফগান শিক্ষার্থীদের জন্য চিকিৎসাবিদ্যা ও দন্ত চিকিৎসায় নতুন ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।
পাশাপাশি ইতোমধ্যে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা স্থগিত রেখে আফগানিস্তানে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। পড়াশোনা চলাকালে পাকিস্তানের এক মেডিকেল বা ডেন্টাল প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলি বা স্থানান্তরের সুবিধাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অন্যদিকে যেসব আফগান শিক্ষার্থী ইতিমধ্যে কোর্স শেষ করেছেন, তাদের ডিগ্রি অর্জন এবং পাকিস্তান ছাড়ার বিষয়টি প্রামাণিকভাবে নথিবদ্ধ ও নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল এবং ডেন্টাল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজকে তাদের প্রতিষ্ঠানে পড়া আফগান শিক্ষার্থীদের যাবতীয় তথ্য আগামী তিন দিনের মধ্যে পিএমডিসির কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে।
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তথ্য জমা দিতে ব্যর্থ হলে, বিলম্ব করলে বা তথ্য গোপন রাখা হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে পিএমডিসি।
পাকিস্তানের মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার মান ও পেশাগত নিবন্ধন নিয়ন্ত্রণ করে থাকে সংবিধিবদ্ধ সংস্থা পিএমডিসি। সংস্থাটির এই আকস্মিক পদক্ষেপে দেশটিতে অবস্থানরত আফগান শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা শিক্ষা অর্জনের পথ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
মর্কিন সেনা
মার্কিন সেনাকে হত্যা বা আটক করে ইরানের সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করতে পারলে ৩০ হাজার ডলার পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। কোনো ইরানি নারী এ কাজ করলে পুরস্কারের পরিমাণ দ্বিগুণ করা হবে বলে জানিয়েছেন দেশটির সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি। রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএকে দেওয়া বক্তব্যে হাতামি এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, বিপুলসংখ্যক মানুষ ‘আর্থিক জিহাদে’ অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করায় এ পুরস্কারের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
হাতামি বলেন, কোনো ব্যক্তি কোনো ‘আগ্রাসী মার্কিন সামরিক সদস্যকে’ হত্যা বা আটক করে ইরানের সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করলে তাকে ৩০ হাজার ডলার বা ৫ বিলিয়ন ইরানি তোমান পুরস্কার দেওয়া হবে। কোনো ‘সাহসী ইরানি নারী’ এ কাজ করলে তিনি দ্বিগুণ পুরস্কার পাবেন।
তবে মার্কিন সেনাদের কোথায় বা কখন হত্যা কিংবা আটকের চেষ্টা করা হবে, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি ইরানের সেনাপ্রধান।
হাতামি আরও বলেন, কোনো ব্যক্তি মার্কিন সেনাকে হত্যায় যে অস্ত্র ব্যবহার করবেন, সেটি দ্বিগুণ দামে কিনে নেওয়া হবে এবং তাকে নতুন একটি অস্ত্র দেওয়া হবে। ব্যবহৃত অস্ত্রটি পরে একটি পরিকল্পিত জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে ইরানের ভূখণ্ডে মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েনের কোনো তথ্য নেই। গত এপ্রিলে একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর একজন মার্কিন বিমানসেনাকে উদ্ধারে অভিযান চালানো হয়েছিল।
এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবি আবারও জানিয়েছেন হাতামি। তিনি বলেন, পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর কিংবা হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের অনুমতি যুক্তরাষ্ট্রের আর নেই।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত কয়েক মাসে হামলা ও পাল্টা হামলা হয়েছে। বর্তমানে সংঘাতের বড় অংশ দক্ষিণ ইরান ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও বড় কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি এখনো দেখা যায়নি।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরান কয়েকটি শর্ত দিয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের দাবিও রয়েছে। প্রণালিটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর দুই দেশের উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
এদিকে ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি এর আগে ট্রাম্পকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ‘বিপজ্জনক রসিকতা’ না করার সতর্কতা দেন। তিনি বলেন, ইরানকে নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য করা বড় ভুল এবং প্রয়োজনে ইরানি যোদ্ধারা ট্রাম্পের ‘পা ভেঙে’ দিতে পারে।
বর্তমান সংঘাতে এ পর্যন্ত ১৭ মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। নিহতদের কেউই ইরানের ভেতরে মারা যাননি; জর্ডান ও ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলায় একটি হোটেলে আগুন লেগে অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার ভোরে তারাপীঠ মন্দিরের কাছে এ ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে; খবর ভারতীয় গণমাধ্যমের।
এনডিটিভি জানিয়েছে, বীরভূমের মন্দির শহর তারাপীঠের একটি পাঁচতলা হোটেলের নিচতলায় ভোর প্রায় সাড়ে ৪টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। তখন হোটেলের অধিকাংশ অতিথি ঘুমিয়ে ছিল। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
খবর পেয়ে দমকল বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কিন্তু ততক্ষণে আগুনে দগ্ধ হয়ে ও ধোঁয়ায় দমবদ্ধ হয়ে অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়। হোটেলটির নিচতলার অধিকাংশই পুড়ে যায়।
আহতদের উদ্ধার করে নিকটবর্তী রামপুরহাট সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হোটেলের মালিক কল্যাণ পাল আনন্দবাজার পত্রিকাকে বলেন, “আমাদের এখানে রাতে পাহারার দায়িত্বে যারা ছিলেন তার সঙ্গে সঙ্গে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র সচল করেন, বিদ্যুৎ সরবরাহের তার বিচ্ছিন্ন করেন। কিন্তু ততক্ষণে আগুন হোটেলের সাজসজ্জার ফাইবার আবরণগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।
“ধোঁয়া পাঁচতলা পর্যন্ত উঠে যায়। আতঙ্কিত অতিথিরা ঘর ছেড়ে বাইরে এসে আগুনের মধ্যে পড়ে যান। পিছন দিক দিয়ে বের হওয়ার দরজা থাকলেও অন্ধকারের মধ্যে সেটা কেউ খুঁজে পাননি। তারা রিসেপশনের সামনে দিয়ে বের হতে শুরু করলে আগুন দগ্ধ হন।”
হোটেলের উপরের তলাগুলোতে অনেকে আটকা পড়েছিলেন। তবে আগুন দোতালার উপরে উঠেনি। তাই তারা বেঁচে যান। হোটেলটির অধিকাংশ অতিথিই পুণ্যার্থী। তারা তারাপীঠ মন্দিরে পূজা দিতে এসেছিলেন। মৃতদের নাম, পরিচয় জানা যায়নি।
দমকল বিভাগের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়।
ঘটনার খবর পেয়ে নিকটবর্তী থানা থেকে পুলিশ হাজির হয়েছে ও তদন্ত শুরু করেছে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক (ফাইল ফটো)
মিয়ানমারের সামরিক সমর্থিত সরকার শনিবার (১৫ আগস্ট) জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে বাংলাদেশের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে থাকা ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে তারা প্রস্তুত। রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের নয় বছর পূর্তির প্রাক্কালে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘোষণা দিলো। মিয়ানমারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জুলাইয়ের শেষ নাগাদ বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন শরণার্থীর তালিকা তারা যাচাই করেছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের পরিচয় যাচাই করা সম্ভব হয়েছে। যাচাই করা ব্যক্তিদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আরও ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় সফলভাবে যাচাই করা যায়নি। এছাড়া ৪ হাজার ২৪১ জন ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত ছিলেন বলে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যাচাই করা এসব সাবেক বাসিন্দাকে ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে মিয়ানমার।
এদিকে রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে- এমন দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছে মিয়ানমার। দেশটির দাবি, ২০১৭ সালের সহিংসতার পর ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে যায়। আর উত্তর রাখাইনে ২ লাখের বেশি মানুষ থেকে যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ দুই বছরের একটি প্রত্যাবাসন কাঠামোতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালে দেশটির সেনাবাহিনী নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়। এতে মিয়ানমারে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে ব্যাপক সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়। এরপর থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগগুলো বাস্তবে কার্যকর হয়নি।
২০২৩ সালে রাখাইনভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নতুন করে সংঘাত শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলা এই যুদ্ধে আরও বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। জীবন বাঁচাতে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। বর্তমানে রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জীবনযাত্রার অবনতি, আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তায় বড় ধরনের কাটছাঁট এবং মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা না থাকায় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় বাধ্য হচ্ছেন। অযোগ্য ও অনিরাপদ নৌযানে করে তারা মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উদ্দেশে সমুদ্র পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করছেন।
জুলাইয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানান, মিয়ানমার তার দেশে বসবাসরত ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে। এটি একটি প্রত্যাবাসন উদ্যোগের অংশ বলে তিনি জানিয়েছিলেন। তবে সে সময় মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হান উইন অং এপি’কে জানান, ওই কর্মসূচি শুধু মালয়েশিয়ার আটককেন্দ্রে থাকা যাচাই করা মিয়ানমারের নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য।
রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে মিয়ানমার সরকার সম্মত হয়েছে- এমন প্রতিবেদনও তিনি নাকচ করে দিয়েছিলেন। সর্বশেষ বাংলাদেশে থাকা তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিয়ে রাজি হয়েছে দেশটি। তবে এতেও দেশটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ভয়াবহ দমন-পীড়নের মুখে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
এর আগে থেকেই কয়েক দফা সহিংসতার কারণে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে বসবাস করছিলেন। এসব সহিংসতা মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অভিযানের ফলে সংঘটিত হয়েছিল। ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানের ব্যাপকতা, পরিকল্পনা ও নৃশংসতার কারণে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের ব্যাপক অভিযোগ তোলে।
মিয়ানমার, যা আগে বার্মা নামে পরিচিত ছিল, দেশটির ১৩৫টি স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর একটি হিসেবে রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দেয় না। বরং তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করে। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
ছবি : সংগৃহীত
ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে আজ শনিবার ৭ দশমিক ৭ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প এবং তা পরবর্তী একের পর এক পরাঘাতের ঘটনায় অন্তত ৩৮ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা।
এদিকে উদ্ধারকর্মীরা উপকেন্দ্রের সবচেয়ে কাছের এলাকাগুলোয় পৌঁছাতে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভোররাতের এই ভূকম্পনের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দ্বীপরাষ্ট্রটির বেশ কিছু এলাকায় ১ মিটারের কম উচ্চতার সুনামি ঢেউ রেকর্ড করা হয়। তবে ভূমিকম্পের প্রায় তিন ঘণ্টা পর সুনামি সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়।
দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার প্রধান সুহারিয়ান্তো এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গতকাল শুক্রবার বেলা ৩টা পর্যন্ত ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে ও ১৩ জন আহত হয়েছেন। প্রায় ২ হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে সরে গেছেন।
এর আগে বন্দর নগরী মাউমেরের উদ্ধার সংস্থার প্রধান ফাতুর রহমান জানান, সেখানে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ২০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, আহত হয়েছেন ৬ জন এবং ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়ে আছেন ২ জন। ইন্দোনেশিয়ার বিশাল দ্বীপপুঞ্জের পূর্বাঞ্চলীয় ফ্লোরেস দ্বীপের সিক্কা রেজেন্সির প্রধান শহর হলো এই মাউমেরে।
সুহারিয়ান্তো জানান, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকটি ভবনে এখনো বাসিন্দারা আটকা পড়ে আছেন এবং ভূমিধসের কারণে কয়েকটি সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
উপকেন্দ্রের সবচেয়ে কাছের অঞ্চল নাগেকেওতে এখনো উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি এবং সেখানকার যোগাযোগের ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলে নিশ্চিত করেছেন ফাতুর। তিনি জানান, সড়কপথে গাড়িতে করে নাগেকেও যাওয়ার চেষ্টা ভূমিধসের কারণে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আরেকটি দল ফেরিতে করে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
ইস্ট নুসা টেঙ্গারা প্রদেশের গভর্নর এমানুয়েল মেলকিয়াদেস লাকা লেনা এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ঘুমের মধ্যে ধসে পড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে অন্তত ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ইস্ট নুসা টেঙ্গারার তালিবুরা গ্রামের ৫১ বছর বয়সী বাসিন্দা নোনা বলেন, ভূমিকম্পটি ছিল প্রচণ্ড শক্তিশালী, ধাক্কাটা এতই তীব্র ছিল যে প্রাণ বাঁচাতে আমরা সবাই দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসি।
ইন্দোনেশিয়ার ভূপ্রকৃতিবিদ্যা সংস্থা বিএমকেজি জানিয়েছে, ভোর ৪টা ৫৮ মিনিটে ১৫ কিলোমিটার গভীরে প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে এবং পরবর্তী সময় বেশ কয়েকটি পরাঘাত রেকর্ড করা হয়।
ইন্দোনেশিয়া প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অগ্নিবলয়ে অবস্থিত, যা একটি ভূকম্পন সক্রিয় অঞ্চল। পৃথিবীর ভূত্বকের বিভিন্ন টেকটোনিক প্লেটের মিলনস্থল হওয়ায় এই অঞ্চলে প্রচুর সংখ্যায় ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে থাকে।
বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ফ্লাইট ডেক থেকে উড্ডয়ন করছে একটি এফ/এ-১৮ই সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমান। ৩১ জুলাই ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর দায়িত্ব পালন শেষে কবে নাগাদ ফেরা যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পাঠানো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর নাবিক ও সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটেছে। একই সঙ্গে তাঁদের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নাবিকদের পরিবার ও সহকর্মীরা। সম্প্রতি এ উদ্বেগের কথা সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরেছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
সান ডিয়েগোতে অনুষ্ঠিত এক উত্তপ্ত টাউন হল সভায় নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হাং কাও এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সামনে তাঁরা এ ক্ষোভ উগরে দেন। সভায় উপস্থিত দুই নাবিকের স্ত্রী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সান ডিয়েগোর ওই সভায় আনুমানিক ২০০ জন উপস্থিত ছিলেন। সেখানে অংশ নেওয়া এক নাবিকের স্ত্রীর ভাষ্য, সভার দিনই তিনি তাঁর স্বামীর কাছ থেকে একটি বার্তা পান।
অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি কর্মকর্তাদের জানান, তাঁর স্বামী তাঁকে লিখেছেন যে ‘তিনি আশা করেন আগামীকাল যেন তাঁর আর ঘুম না ভাঙে।’
ওই নারী আরও জানান, সভায় উপস্থিত নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই সুনির্দিষ্ট বা আবেগঘন বক্তব্যের কোনো সরাসরি জবাব দেননি। তবে জাহাজে থাকা নাবিকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী, চ্যাপলিন (ধর্মীয় শিক্ষক) এবং চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত সুবিধা রয়েছে বলে আশ্বস্ত করেন তাঁরা।
একই সঙ্গে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুদ্ধজাহাজটিতে আরও বেশি মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ পাঠানোর কাজ চলছে বলে জানান নৌবাহিনীর সেই কর্মকর্তারা।
টানা ২৫০ দিন সমুদ্রে: চরম ক্লান্তি ও হতাশায় মার্কিন নাবিকেরা
গত সপ্তাহের সভায় যে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে, তার সঙ্গে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় নাবিক ও তাঁদের পরিবারের পক্ষ থেকে স্বাধীনভাবে সামরিক সংবাদমাধ্যম ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর কাছে ব্যক্ত করা মতামতের হুবহু মিল রয়েছে।
বর্তমানে কর্মরত নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সাক্ষাৎকার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রু সদস্যদের ডজনখানেক মন্তব্য ও পোস্ট থেকে এ সংকটের গভীরতা স্পষ্ট। তাঁদের বিবরণ অনুযায়ী, চরম ক্লান্তি ও মনোবল ভেঙে পড়ায় নাবিকেরা প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন। এর মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তার মতো গুরুতর বিষয় যেমন রয়েছে, তেমনি অন্তত একজন ক্রু সদস্যকে জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া থেকে বিরত রাখার ঘটনাও ঘটেছে।
নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অস্বাভাবিক ও অত্যন্ত কঠিন এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন এ যুদ্ধজাহাজের নাবিকেরা। মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের অধীন ৪০ দিন ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধাভিযানে অংশ নিতে হয়েছে তাঁদের। সব মিলিয়ে সমুদ্রে টানা ২৫০ দিন পার করার এক নজিরবিহীন ধকল সামলাচ্ছেন তাঁরা।
গত নভেম্বরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েনের উদ্দেশ্যে এ বিমানবাহী রণতরি সান ডিয়েগো ত্যাগ করেছিল। তবে পরে সেটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে কোনো ধরনের বন্দরবিরতি বা যাত্রাবিরতি ছাড়াই সমুদ্রে রেকর্ডসংখ্যক দিন পার করে আট মাসের বেশি সময় ধরে মোতায়েন রয়েছে যুদ্ধজাহাজটি।
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান সফল করতেই ক্রুদের এ দীর্ঘ সময় পার করতে হয়েছে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, গত মে মাসে এ মিশন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা বাড়ানো হয়েছে। তবে কবে নাগাদ তাঁরা ফিরতে পারবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ প্রকাশ করেনি মার্কিন প্রশাসন।
সভায় মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যার ঝুঁকি নিয়ে পরিবারের সদস্যরা যে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, সে বিষয়ে নৌবাহিনী ঠিক কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয়নি। তবে নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রণতরিটিতে পরামর্শক, চ্যাপলিন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, অন্যান্য জরুরি সহায়তাসহ মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক বা ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
খাদ্য-পানির সংকট, বাড়ি ফিরতে চান ৫ হাজার সেনা
মার্কিন নৌবাহিনী গত সোমবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘নাবিকদের মানসিক সুস্থতা পর্যবেক্ষণ ও বজায় রাখার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রতিনিয়ত মূল্যায়ন বা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে যাচ্ছে।’
এদিকে প্রতিশোধ বা আইনি জটিলতার আশঙ্কায় এ প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়া নাবিকদের স্ত্রী, পরিবারের অন্য সদস্য ও কর্তব্যরত নাবিকদের নাম-পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করা হয়েছিল। ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’সেই অনুরোধের প্রতি সম্মান দেখিয়েছে।
পরিবারের সদস্য ও নাবিকদের অভিযোগ, আব্রাহাম লিংকন যুদ্ধজাহাজে থাকা প্রায় ৫ হাজার সেনাসদস্য চরম খাদ্য ও পানিসংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিঠি বা ডাক যোগাযোগে বিঘ্ন এবং একটানা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, যেখানে বিশ্রামের সুযোগ মেলাই ভার।
সাধারণত সাগরে থাকাকালীন নাবিকদের একঘেয়েমি ও ক্লান্তি দূর করতে নিয়মিত বিরতিতে বন্দরে যাত্রাবিরতি বা ‘পোর্ট কল’ দেওয়া হয়। তবে মোতায়েনের দীর্ঘ সময়ে আব্রাহাম লিংকনের ক্রুরা এমন কোনো স্বাভাবিক সুযোগ পাননি বললেই চলে।
মার্কিন নৌবাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী, রসদ সংগ্রহ, জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্রুদের বিশ্রামের জন্য সাধারণত প্রতি ৩০ থেকে ৪৫ দিন পরপর বিমানবাহী রণতরিগুলো কোনো না কোনো বন্দরে নোঙর করতে হয়।
যুদ্ধজাহাজটিতে থাকা এক নাবিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পুরো মোতায়েনজুড়ে আমরা কোনো বিরতি ছাড়াই জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করে গেছি।’ অথচ মোতায়েনের শুরুতে বিভিন্ন বন্দরে যাওয়া এবং বিশ্রামের আশায় সবার মনোবল বেশ চাঙা ছিল বলে তাঁর মন্তব্য।
বর্তমানে ক্রুদের মনোবল এতটাই ভেঙে পড়েছে যে তাঁরা সামনে কোনো বন্দরে বিশ্রামের সুযোগও চান না; বরং যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফেরার স্বার্থে যেকোনো বিরতি ত্যাগ করতে তাঁরা রাজি। সেই নাবিকের আকুতি, ‘এই মুহূর্তে আসলে আমাদের আর কোনো প্রত্যাশা নেই। আমরা শুধু বাড়ি ফেরার একটি সুনির্দিষ্ট তারিখ চাই।’
জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা: নাবিকের করুণ আকুতি
নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান পরিচালনা করা সামরিক জীবনেরই অংশ। তবে সেটি তাঁরা মেনে নিলেও অনেকেরই অভিযোগ, শারীরিক ও মানসিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা না করেই এ যুদ্ধজাহাজের ক্রুদের অস্বাভাবিক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে টানা যুদ্ধাভিযান চালাতে বাধ্য করা হচ্ছে।
গত জুলাই মাসে এক চিন্তিত অভিভাবক ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-কে দেওয়া এক চিঠিতে লেখেন, ‘আমার ছেলে বর্তমানে ওই যুদ্ধজাহাজে আছে। সে এবং তার সহকর্মীরা একটু স্বস্তি পেতে প্রতিনিয়ত জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার কথা ভাবছে, এটি শোনা একজন বাবার জন্য অত্যন্ত কষ্টের।’
নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে এই অভিভাবক আরও বলেন, ‘আমরা রাতে ঘরের নরম বিছানায় আরামে ঘুমাই, অথচ আমাদের প্রিয়জনেরা ওখানে যুদ্ধ করছে। তারা আসলে কিসের জন্য জীবন বাজি রাখছে, সেটিও তাদের কাছে স্পষ্ট নয়।’
জাহাজে থাকা একাধিক নাবিক জানিয়েছেন, কিছুদিন আগে এক ক্রু সদস্যকে জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছিল। এক নাবিকের ভাষ্য, ‘আমাদের এখানে এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে দায়িত্বরত প্রহরীদের এক নাবিককে সাগরে লাফ দেওয়া থেকে আটকাতে হয়েছিল।’ ঘটনাটি পুরো জাহাজের লাউডস্পিকারে ঘোষণার মাধ্যমে সব ক্রুকে জানানো হয়েছিল বলে তাঁদের দাবি।
তবে এই সুনির্দিষ্ট ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও মার্কিন নৌবাহিনী সরাসরি কোনো জবাব দেয়নি। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সাধারণ প্রশ্নের উত্তরে বাহিনী জানিয়েছে, ‘কর্তৃপক্ষ সব সময়ই পরিবারগুলোর কথা শুনতে, সেনাসদস্যদের পাশে দাঁড়াতে এবং আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের লক্ষ্য নিরাপদে ও সফলভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সম্পদ বা সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
নাবিক, তাঁদের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন, এর আগে আব্রাহাম লিংকন যুদ্ধজাহাজে খাবার রেশন করে দেওয়া, তীব্র পানির সংকট এবং টানা এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে কাপড় লন্ড্রি করতে না পারার মতো বড় সমস্যা তৈরি হয়েছিল। তবে এখন সেসব সমস্যার বড় অংশই সমাধান হয়েছে এবং চিঠি বা ডাক যোগাযোগের ব্যবস্থাও ক্রমান্বয়ে উন্নত হচ্ছে বলে তাঁদের মত।
মানসিক ভাঙন ও তীব্র হতাশা, তা-ও মিলছে না ফেরার তারিখ
গত জুলাইয়ের শুরুতে ওমানের একটি বন্দরে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির কারণে যুদ্ধজাহাজটিতে নতুন করে রসদ সরবরাহের সুযোগ হয়। ফলে দীর্ঘ কয়েক মাস পর ক্রুরা তাজা ফলমূল ও শাকসবজি পান বলে জানান এক নাবিক। তবে সে সময় অনেক নাবিককে জাহাজ থেকে নামার অনুমতি দেওয়া হলেও তাঁদের বন্দর এলাকার একটি সুরক্ষিত সীমানার মধ্যেই আটকে রাখা হয়েছিল।
এর আগে গত ডিসেম্বরেও ‘আব্রাহাম লিংকন’ গুয়াম দ্বীপে একটি সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি করেছিল। কিন্তু জাহাজে থাকা অনেক নাবিকই সেই সময় তীরে নামার সুযোগ পাননি বলে জানান তাঁদের স্ত্রীরা।
সেনাসদস্যদের জন্য নিয়মিত বন্দরবিরতির অভাব, ডাক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ঘাটতি নিয়ে এক নাবিকের স্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘নিজের মানুষের (নাবিক) এই অবস্থা দেখাটা দিন দিন অসম্ভব হয়ে উঠছে।’ অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমি চোখের সামনে আমার স্বামীকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেখছি। মনে হচ্ছে, তারা যেন সব আশাই হারিয়ে ফেলছে।’
নৌবাহিনী অবশ্য তাদের জবাবে উল্লেখ করেছে যে লিংকন যুদ্ধজাহাজটি বর্তমানে অত্যন্ত বৈরী ও যুদ্ধসংক্ষুব্ধ এক পরিবেশে দায়িত্ব পালন করছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী রসদ সরবরাহ কেন্দ্রগুলো সামরিক সংঘাতের কারণে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন বাহিনী রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রে মিশনের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর তালিকায় প্রথমে খাবার, তারপর স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী ও সবশেষে চিঠি বা ডাকের স্থান।
নৌবাহিনীর দাবি, যুদ্ধজাহাজ থেকে আসা সাম্প্রতিক প্রতিবেদন নিশ্চিত করছে যে সেখানে পরিষ্কার পানি, সচল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও প্রতিবেলার খাবারে দুটি আমিষের ব্যবস্থা রয়েছে। রসদ সরবরাহের এ প্রবাহ দিন দিন আরও উন্নত হচ্ছে।
গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত দুটি সভার (একটি সশরীর ও অন্যটি অনলাইনে) একটিতে নেভাল এয়ারফোর্সেসের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল ডগলাস ভেরিসিমো, নেভাল সারফেস ফোর্সেসের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল জোসেফ কাহিলসহ অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ভারপ্রাপ্ত নৌ সেক্রেটারি হাং কাও সশরীর উপস্থিত থাকলেও ভিডিও কলে যুক্ত ছিলেন না।
সভায় অংশ নেওয়া এক নারী কাও, ভেরিসিমো ও কাহিলকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনারা আমাদের এবং নেতৃত্বের মধ্যকার বিশ্বাসের জায়গাটি সম্পূর্ণ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন।’
সামরিক সংবাদমাধ্যম ‘ইউএসএনআই নিউজ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ১৬২ দিনের একটি মোতায়েন শেষে ঘরে ফেরার এক বছরের কম সময়ের মধ্যে সান ডিয়েগোর নিজস্ব বন্দর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে মোতায়েনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল লিংকন। কিন্তু এর পরপরই রণতরিটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয় এবং গত জানুয়ারি মাসে সেটি সেখানে পৌঁছায়। সেই থেকে আজ অবধি যুদ্ধজাহাজটি আরব সাগরেই অবস্থান করছে।
সামরিক নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা আব্রাহাম লিংকন কবে দেশে ফিরবে সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বলে জানান নাবিকদের স্ত্রীরা।
বিভিন্ন গবেষণায়ও দেখা গেছে, লিংকন যুদ্ধজাহাজের নাবিক এবং তাঁদের পরিবারের বর্ণনা করা এ পরিস্থিতিগুলো সমুদ্রে থাকা সেনাসদস্যদের জন্য তীব্র মানসিক চাপের অন্যতম প্রধান কারণ।
একাডেমিক জার্নাল ‘মিলিটারি মেডিসিন’-এ ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মোতায়েনকালে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম নিতে না পারা এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগই নাবিকদের সবচেয়ে বেশি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
বিমানবাহী রণতরি, ডেস্ট্রয়ার এবং উভচর যুদ্ধজাহাজে কর্মরত ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর পরিচালিত এ সমীক্ষায় আরও উঠে আসে যে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে জটিলতা এবং মানসিক চাপ কমানোর সুযোগের অভাবও তাঁদের বড় উদ্বেগের কারণ।
নৌবাহিনীতে দীর্ঘ ২০ বছর দায়িত্ব পালন করা ও চারবার মোতায়েন হওয়া অবসরপ্রাপ্ত চিফ পেটি অফিসার থমাস নাটজম্যান জানান, একটি মোতায়েন কবে শেষ হবে, তা না জানাটা নাবিকদের ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।
দীর্ঘ সময় সমুদ্রে কাটানোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে নাটজম্যান বলেন, ‘সেখানে কোনো সোম, মঙ্গল বা বুধবার নেই; প্রতিটি দিনই যেন একটি দিন। আপনি আপনার সাধ্যমতো ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করেন।’
সংকটের জায়গাটি উল্লেখ করে নাটজম্যান বলেন, ‘সমস্যা হলো, আপনি যখন অনেক লম্বা সময় সমুদ্রে থাকবেন, তখন মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা একটা সময় এসে থমকে যাবে আর ঠিক সেখান থেকেই মানসিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে শুরু করবে।’