ছবি : সংগৃহীত
দক্ষিণ মরক্কোর উপকূলীয় শহর ইমসোয়ানের একটি সার্ফশপে (সার্ফিংয়ের সরঞ্জাম বিক্রির দোকান) কাজ করেন ২৬ বছর বয়সী হামজা (ছদ্মনাম)। দোকানে বসে মুঠোফোনে ইনস্টাগ্রাম দেখছিলেন তিনি। চোখের সামনে ভেসে উঠছিল শৈশবের বন্ধুদের ছবি।
গত সেপ্টেম্বরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাছের ইউরোপের দেশ স্পেনে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তাঁরা। দোকানের বাইরে তখন সার্ফিং শেষে ফিরছিলেন ক্লান্ত পর্যটকেরা। পাশেই বিলাসবহুল একটি বুটিক হোটেল, যার বেশির ভাগ অতিথিই তরুণ ইউরোপীয় সার্ফার।
হামজা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘স্পেনে যেতে গিয়ে আমার শৈশবের বন্ধুরা মারা যেতে পারত। তারপরও তাঁদের কাছে সেই ঝুঁকি নেওয়াটা সার্থক মনে হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে যেসব ছেলের সঙ্গে আমি বড় হয়েছি, তাঁদের অনেকেই দারিদ্র্যের এক অন্তহীন চক্রে আটকে পড়েছেন। যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।’
সেপ্টেম্বরে স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় প্রবেশের আশায় মরক্কোর প্রায় চার হাজার তরুণ এবং সাবসাহারা আফ্রিকার কয়েকজন অভিবাসী সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ওই ঘটনার কথাই বলছিলেন হামজা। ইউরোপে ভালো জীবনের স্বপ্নে যাত্রা করা ওই মানুষের ভিড়ে ছিলেন তাঁর শৈশবের ছয় বন্ধুও।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেউতায় প্রবেশের আহ্বান ছড়িয়ে পড়ার পর এই তরুণেরা ৫০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে স্পেনের ওই স্বায়ত্তশাসিত শহরের সীমান্তসংলগ্ন জনপদ বেলিউনেশে পৌঁছান।
উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতা ও মেলিইয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একমাত্র আফ্রিকান স্থলসীমান্ত। উন্নত জীবনের আশায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা সেখানে প্রায়ই দেখা যায়।
মরক্কো কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর দেশটির বিভিন্ন শহর থেকে আসা তিন হাজার মানুষ সীমান্তের বেড়া টপকে সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করার সময় আটক হন। এ উদ্যোগের আয়োজনে জড়িত থাকার সন্দেহে প্রায় ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সঙ্গে কয়েকজন আলজেরীয় কর্মীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলে মরক্কো। তবে আলজেরিয়ার সংবাদমাধ্যম সে অভিযোগ অস্বীকার করে।
ঘটনার সময় মরক্কোর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। যদিও কর্মকর্তারা অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে মরক্কোর ঐতিহাসিক শহর তেতোয়ানের সরকারি কৌঁসুলি ভিডিওগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দেন।
‘মরক্কোতে জীবন যেন বৃথা’
সীমান্ত থেকে যাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই শত শত মানুষের বিপরীতে হামজার বন্ধুরা ছিলেন সেউতায় পৌঁছাতে সক্ষম হওয়া হাতে গোনা কয়েকজনের মধ্যে।
হামজা বলেন, ‘আমার বন্ধুরা এখন কেমন আছে, আমি জানি না। তারা খুব একটা কিছু বলে না। সম্ভবত কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ার ভয়ে।’
এটাই প্রথম নয়। এর আগেও ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন হামজার শৈশবের বন্ধুরা।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে হামজার নিজ শহর এল জাদিদা থেকে ১৭ তরুণ স্পেনে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বের হন। আটলান্টিক উপকূলের এ বন্দরনগরী কাসাব্লাঙ্কার কাছাকাছি। ওই সময় তাঁরা নৌকায় করে স্পেনের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছান।
মুঠোফোনে সেই বন্ধুদের একজনের পাঠানো একটি বার্তা দেখান হামজা। বর্তমানে তিনি আইবেরীয় উপদ্বীপে বসবাস করছেন। হামজা বলেন, ‘ইনস্টাগ্রামে এটিই তার সর্বশেষ পোস্ট। দেখে মনে হচ্ছে সে যেন ছুটি কাটাচ্ছে। কিন্তু আমি জানি, স্পেনে তার জীবন মোটেও সহজ নয়।’
ভিডিওতে দেখা যায়, হামজার সেই বন্ধু-যিনি একজন ফুটবলার-সমুদ্রসৈকতের কাছের একটি রৌদ্রোজ্জ্বল উন্মুক্ত চত্বরে বসে পানীয় পান করছেন। পেছনে বাজছে প্রাণবন্ত সংগীত।
হামজা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘ওর প্রতিভা আছে। স্পেনে সুযোগ পাওয়ার আশায় আছে। কিন্তু বৈধ কাগজপত্র না থাকায় এখন পর্যন্ত সব ক্লাবই তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে।’
হোটেলের সার্ফিং পরিবেশের সঙ্গে মানানসই পোশাক পরা হামজা সেউতায় আটকে পড়া তাঁর ছয় বন্ধুর ভবিষ্যৎ নিয়ে মিশ্র অনুভূতির কথা জানান।
ভালো বেতন, শিক্ষিত মা–বাবা এবং ভূতত্ত্বে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকার কারণে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার কথা হামজা কখনো ভাবেননি। তবে তাঁর বন্ধুরা কেন সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা তিনি বুঝতে পারেন।
হামজা বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা দেখে ইউরোপের মানুষের জীবন কেমন। তাদের কারও কারও মনে হয়, মরক্কোতে থেকে তারা শুধু জীবনটাই নষ্ট করছে। হয়তো এটাই তাদের জন্য নতুন একটি সুযোগ।’
টিকটক–ইনস্টাগ্রামে ইউরোপ–যাত্রার স্বপ্ন ভাগাভাগি
সেউতার ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভাইরাল প্রবণতার কথাও উঠে আসে হামজার সঙ্গে আলাপে। টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে বহু তরুণ নিজেদের ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন ও যাত্রার গল্প ভাগাভাগি করছিলেন।
এসব পোস্টে প্রায়ই ব্যবহার করা হতো ‘হাররাগা’ শব্দটি। উত্তর আফ্রিকার কথ্য আরবি থেকে আসা এ শব্দের অর্থ হলো পরিচয় গোপন রাখতে অবৈধভাবে অভিবাসনের আগে নিজের পরিচয়পত্র পুড়িয়ে ফেলা মানুষ।
মরক্কোর অভিবাসনবিষয়ক পরামর্শক ও গবেষক আলী জুবেইদি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘অভিবাসীদের একজোট হওয়ার আহ্বান জানিয়ে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা ছড়াতে শুরু করল, তখন আমি ভেবেছিলাম, এটি মজা। পরে বুঝলাম, বিষয়টি সত্যি।’
আলী জুবেইদির মতে, গত সেপ্টেম্বরে যা ঘটেছিল, তা ২০২১ সালের গণ–অভিবাসনের চেষ্টার তুলনায় একেবারেই ভিন্ন। ২০২১ সালে আট হাজারের বেশি মানুষ সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন। কেউ সীমান্তের দেয়াল টপকে, কেউ আবার মরক্কোর সৈকত থেকে সাঁতরে সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
ওই সময় পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে মাদ্রিদের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে মরক্কো কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে সীমান্তে যেতে দিয়েছিল বলে অভিযোগ করেছিল স্পেন।
কিন্তু গত সেপ্টেম্বরের চিত্র ছিল ভিন্ন। তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে নিজেরাই সংগঠিত হয়েছিলেন মরক্কোর তরুণেরা। এ ক্ষেত্রে মানব পাচারকারী বা দালালদের কোনো ভূমিকা ছিল না।
এর আগে সীমান্ত পার হওয়ার বেশির ভাগ চেষ্টাই করতেন সাবসাহারা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা। কিন্তু সেপ্টেম্বরে সেউতায় যাওয়ার চেষ্টাকারীদের বড় অংশই ছিলেন মরক্কোর নাগরিক। জুবেইদির ভাষ্য, এই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের পরিচিতিও ছিল ভিন্ন।
জুবেইদি বলেন, ‘সাধারণত যাঁরা অবৈধভাবে অভিবাসনের চেষ্টা করেন, তাঁরা মরক্কোর তরুণ, দীর্ঘদিন রাস্তায় থাকছেন, কাজ নেই, পরিবারের সহায়তা পান না—এমন সব ব্যক্তি। কিন্তু সেপ্টেম্বরে আমরা এমন অনেককে দেখেছি, যাঁদের চাকরিবাকরি আছে ও মাসে ৪–৫ হাজার দিরহাম (প্রায় ৪৫০ মার্কিন ডলার) আয়ও করেন।’
জুবেইদির মতে, এই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের এমন সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণ ছিল হতাশা ও অসন্তোষ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবি ও বাস্তবতায় বিপুল ফারাক
হামজার জন্মশহরের বাসিন্দাদের কাছে নিজ দেশ মরক্কো ছেড়ে বিদেশে যাওয়া এক বড় স্বপ্ন। এর পেছনেও রয়েছে একই কারণ। হামজা বলেন, এখানকার তরুণদের আলোচনার মূল বিষয়ই বিদেশে যাওয়া।
ফোনে আরও কিছু পোস্ট দেখান হামজা। সেখানে সীমান্ত পেরিয়ে ইউরোপে পৌঁছাতে পারা মানুষদের অভিনন্দন জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ স্পেনে ঢোকার জন্য মানব পাচারকারীদের অর্থ দিতে বছরের পর বছর কাজ করেছেন।
এ সময় কথোপকথনে যোগ দেন হামজার এক বন্ধু। তিনি বলেন, ‘আমি এমন মানুষকে চিনি, যাঁরা মরক্কো থেকে সেউতার সাত কিলোমিটার দূরত্ব সাঁতরে পাড়ি দেওয়ার জন্য মাসের পর মাস অনুশীলন করেছেন।’
ইউরোপে যেতে সফল হওয়া ব্যক্তিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ সক্রিয়। সেখানে ঐতিহাসিক স্থাপনার সামনে তোলা সেলফির পাশাপাশি দেখা যায় পার্টির নানা ভিডিও।
তবে হামজা জানেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা সেই জীবনের সঙ্গে বাস্তবতার বড় ফারাক রয়েছে। তিনি বলেন, দেখলে মনে হয়, সবাই জীবনের সেরা সময় কাটাচ্ছেন। কিন্তু তাঁরা তো তাঁদের রাস্তায় ঘুমানোর ছবিগুলো পোস্ট করেন না।
সেউতা সীমান্তের কোল ঘেঁষে থাকা এমদিক-ফেনিদেক প্রদেশের তরুণদের কাছে ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্নটা একেবারে হাতের নাগালের বিষয় ছিল। মরক্কোর তাঞ্জার-তেতোয়ান অঞ্চলে বসবাসকারী বাসিন্দাদের এক বড় অংশই এভাবে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেছে।
কোভিড-১৯ মহামারির পর সীমান্ত–বাণিজ্য ও সীমান্ত পেরিয়ে কর্মসংস্থানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পরে স্পেনের সঙ্গে মরক্কোর কূটনৈতিক টানাপোড়েনও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে ওই অঞ্চলের বাসিন্দারা বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা খেয়েছেন।
অস্থায়ী হিসেবে শুরু হওয়া এসব বিধিনিষেধ পরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও মরক্কোর মধ্যে হওয়া বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে নতুন বাস্তবতায় পরিণত হয়। ২০২১ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে অভিবাসন ঠেকানো এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদারের বিনিময়ে মরক্কোকে ৫০ কোটি ইউরো দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় ব্রাসেলস।
মরক্কোর সঙ্গে এ সহযোগিতা এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুরূপ চুক্তিগুলো মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শরণার্থীদের ইউরোপে পৌঁছানো ঠেকাতে ইইউ জেনেশুনেই মরক্কোসহ তৃতীয় দেশগুলোকে সম্ভাব্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে ফেলেছে।
২০২২ সালের জুনে স্পেনের মেলিইয়া শহরের সীমান্তে ঘটে যাওয়া সহিংস ঘটনাকে এসব নীতির ক্ষতিকর প্রভাবের একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। সীমান্তরক্ষীদের সঙ্গে উত্তেজনার জেরে ওই ঘটনায় অন্তত ৩৭ জন নিহত হন।
এসব নীতির মানবিক মূল্য সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়েছে ফেনিদেকে। আগে প্রতিদিন হাজারো মরক্কোর বাসিন্দা কাজের জন্য সেউতায় যাতায়াত করতেন। সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এলাকাটিতে বেকারত্ব বেড়ে যায়। গত পাঁচ বছরে ফেনিদেকের মানুষের আয় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
‘সোজা পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলাম’
এমদিক–ফেনিদেক প্রদেশেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা ১৭ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী বুশরা আবজাইউর মতে, বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির পর তৈরি হওয়া হতাশা মানুষকে ইউরোপে যাওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে বাধ্য করছে।
মিডল ইস্ট আইকে এই স্কুলছাত্রী বলেন, ‘মরক্কোতে তরুণদের পরিস্থিতি খুব কঠিন। আমার আশপাশে যাদের দেখি, প্রায় সবাই বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে।’
বুশরার ভাই ২০২১ সালের গণ–অভিবাসনের সময় মরক্কো ছেড়েছিলেন। চার বছর পরও স্পেনে টিকে থাকার সংগ্রাম করছিলেন তিনি। বহুবার তাঁকে রাস্তায় রাত কাটাতে হয়েছে। তারপরও তাঁর তথাকথিত ‘সফলতার গল্প’ অনুপ্রাণিত করেছে বুশরার এক চাচাতো ভাইকে, যিনি গত সেপ্টেম্বরে সীমান্ত পেরোনোর চেষ্টা করেন।
এখন সেউতার একটি অপ্রাপ্তবয়স্কদের আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ১৭ বছর বয়সী ইব্রাহিম (ছদ্মনাম) জানায়, সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আহ্বান দেখে বা কোনো পরিকল্পনা করে সীমান্ত পার হয়নি। সে বলেন, ‘আমি ফেনিদেকের বাসিন্দা। সীমান্তে প্রতিদিন কী হয়, আমি নিজের চোখেই দেখি। আলাদা করে আর কিছু জানার দরকার হয় না।’
ইব্রাহিমের ভাষায়, ‘মরক্কো ভেঙে পড়েছে। দারিদ্র্যই আমাকে সাগরে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করেছে।’
ইব্রাহিম যেদিন সেউতার উদ্দেশে সাঁতরে রওনা দেয়, সেদিন স্পেন–মরক্কো সীমান্তসংলগ্ন আকাশ ছিল মেঘলা ও কুয়াশাচ্ছন্ন। সাত কিলোমিটারের সেই যাত্রার কথা স্মরণ করে সে বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, জীবনে এমন সুযোগ আর না–ও আসতে পারে।’ সে আরও বলে, ‘আমার কাছে সাঁতারের কোনো সরঞ্জাম ছিল না। পথও চিনতাম না। তবু সোজা পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলাম।’
ইব্রাহিম ভাগ্যবান ছিল। কিন্তু গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সমুদ্রপথে সেউতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহরের উপকূলের কাছে তাঁদের মরদেহ ভাসতে দেখা যায়।
ওই সময় অনেকে আবার মরক্কো পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। পরে বাসে করে তাঁদের দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেউতাভিত্তিক স্প্যানিশ বেসরকারি সংস্থা ‘নো নেম কিচেন’– এর মুখপাত্র ফ্রানচেসকা ফুসারো মিডল ইস্ট আইকে এ তথ্য জানান।
ফুসারো বলেন, তরুণেরা যাতে আবার সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা না করেন, সে জন্য মরক্কো কর্তৃপক্ষ নিয়মিতই এ পদ্ধতি অনুসরণ করে।
ইব্রাহিমের ভাষায়, সমুদ্রে কাটানো সেই কয়েক ঘণ্টা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। বলে, ‘আমার মনে হচ্ছিল, জীবনের সব স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আমি ভেবেছিলাম, এবার হয়তো মারা যাব। তখন ভবিষ্যতের কথা ভাবছিলাম, প্রিয়জনদের কথা ভাবছিলাম। বিশেষ করে বারবার মনে পড়ছিল মায়ের কথা।’
এদিকে সেউতায় গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ২৪ ঘণ্টায় অর্ধলাখের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রবেশ করেন। স্থল ও সমুদ্রপথে সীমান্ত পার হতে গিয়ে এ সময় অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে। সীমান্তের স্পেন অংশে উদ্ধার করা হয় ৫৭ জনের মরদেহ। মরক্কোর দিকেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
সর্বব্যাপী ‘দমন-পীড়ন’
মরক্কোর নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক খালিদ মুনার মতে, গত সেপ্টেম্বরে যা ঘটেছে, তা শুধু উন্নত জীবনের খোঁজে তরুণদের দেশ ছাড়ার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ নয়। বলেন, ‘এটি একধরনের রাজনৈতিক প্রতিবাদ। তরুণেরা অভিবাসনকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা মরক্কোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।’
খালিদ মুনা বলেন, দমন-পীড়নের মুখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন তরুণদের জন্য শক্তিশালী একটি হাতিয়ার। তাঁর ভাষায়, জনপরিসরে দমন-পীড়ন সব সময়ই রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন বিভিন্ন প্রান্তিক অঞ্চলের তরুণদের একত্র হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরেই মরক্কোতে মানবাধিকার দমনের অভিযোগ তুলে আসছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মরক্কোতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংগঠন করার অধিকারের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে। এর প্রমাণ হিসেবে হাইপ্রোফাইলের মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের কারাবন্দী করা এবং হয়রানির ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিতর্কিত পশ্চিম সাহারা অঞ্চলের ঘটনাও রয়েছে।
মুনা ও জুবেইদির মতে, মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের দুর্বল অবস্থাও তরুণ মরক্কোবাসীদের দেশ ছাড়তে উৎসাহিত করছে।
২০২৩ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মরক্কোর ৬ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ (প্রায় ২৫ লাখ) বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছেন। অর্থাৎ শুধু আয়ের অভাব নয়, শিক্ষা, মৌলিক অবকাঠামো, সেবাসহ নানা ক্ষেত্রেই তাঁরা বঞ্চিত।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে আরও ১০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েন। ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে।
বুশরার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউরোপ সম্পর্কে যে অবাস্তব ও বিভ্রান্তিকর ধারণা ছড়িয়ে পড়ে, সেটিও পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছে। তিনি বলেন, স্পেনে পৌঁছাতে পেরেছে-এমন মানুষের গল্প আর অভিবাসনে উৎসাহ জোগানো অসংখ্য গান তরুণদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়।
বুশরা বলেন, ‘মরক্কোর তরুণদের মধ্যে বারবার এমন চিন্তা ফিরে আসছে-এ নিয়ে আমি খুবই উদ্বিগ্ন।’
এদিকে দক্ষিণ মরক্কোর সমুদ্রসৈকতে নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন হামজা। চলতি বছর তিনি ইউরোপে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন এবং শিক্ষার্থী ভিসার জন্য আবেদন করবেন। তবে তিনি জানেন, পরিবারের সমর্থন না থাকায় তাঁর বন্ধুদের সে সুযোগ নেই।
আরও একবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুদের খোঁজ করেন হামজা। ইউরোপে কষ্টে দিন কাটালেও লজ্জায় তাঁরা পরিবারের সদস্য ও পরিচিত ব্যক্তিদের সামনে সুখী জীবনের ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করেন। হামজা জানেন, তাঁদের কেউ কেউ রাতে রাস্তায় ঘুমান। কিন্তু স্বজনদের চোখে তাঁরা যেন পূরণ করে ফেলেছেন ‘ইউরোপ-যাত্রার স্বপ্ন’।
জীবন বাঁচাতে কার্নিসে আশ্রয় দম্পতির
কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেল। রাত দেড়টার পর একটি কক্ষের দরজায় জোরে ধাক্কা দেন কেউ। ভেতরে ছিলেন বাংলাদেশি দম্পতি সোমাইয়া আখতার ও রেজাউল ইসলাম।
দরজার ওপাশ থেকে আগুন লাগার খবর শুনতেই দুজন জানালা দিয়ে বেরিয়ে কার্নিসে আশ্রয় নেন। হোটেলটি নিউমার্কেট এলাকায় চারতলা ভবনের তৃতীয় তলায়।
ভারতীয় দৈনিক আনন্দবাজারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সপ্তাহখানেক আগে বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় বেড়াতে গিয়েছিলেন সোমাইয়া ও রেজাউল। শিখা ইন হোটেলে ওঠেন দুইদিন আগে। গতকাল মঙ্গলবার গভীর রাতে হোটেলটিতে আগুন লাগে।
সোমাইয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, রাত ১টা ৫০ মিনিটের দিকে হঠাৎ তাদের কক্ষের দরজায় কেউ জোরে ধাক্কা দিতে থাকেন। ওই সময় তিনি জেগে ছিলেন। ধাক্কার শব্দে ঘুম ভাঙে রেজাউলের। দুজন বিছানা ছেড়ে উঠে দরজা খুলে দেখেন বারান্দা ধোঁয়ায় ভরে গেছে।
চিৎকার, ধোঁয়া দেখেও সে সময় মাথা ঠান্ডা রেখেছিলেন রেজাউল। দ্রুত চিন্তা করে ঠিক করেন, দরজা দিয়ে নয়, জানালা দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করবেন। স্ত্রীকে নিয়ে চলে যান জানালার কাছে। এরপর নেমে যান কার্নিসে। এরপরের ঘটনার বর্ণনা দেন সোমাইয়া। বলেন, ‘কার্নিসে দাঁড়িয়ে হেল্প, হেল্প, আগুন, আগুন বলে চিৎকার করছিলাম।’
ধোঁয়ার কারণে তিনতলার কার্নিস থেকে ওই সময় রাস্তা ভালভাবে দেখা যাচ্ছিল না। নিচে থেকে ওপরে কারও অবস্থান বোঝার উপায় ছিল না। তাই মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে উদ্ধারকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন এই দম্পতি।
সোমাইয়া বলেন, ‘রাস্তা দিয়ে যারা যাচ্ছিলেন, তাদের ডেকে আমাদের বিপদের কথা বলি। প্রায় আধা ঘণ্টা আমরা কার্নিসে দাঁড়িয়ে ছিলাম।’ পরে তিনতলার কার্নিস থেকে দুজনকে মইয়ের মাধ্যমে নামান দমকলকর্মীরা।
সোমাইয়া-রেজাউল ছাড়াও ওই ভবনের অন্য হোটেলগুলোতে আরও কয়েকজন বাংলাদেশি ছিলেন। তারা চিকিৎসা বা ব্যবসার কাজে ভারতে গিয়েছিলেন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নয়জন নিহতের খবর জানা গেছে। তাদের মধ্যে আটজন বাংলাদেশি বলে জানিয়েছে কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশের পর দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের যৌথ সামরিক মহড়া ছোট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১১ দিনের পরিবর্তে এবার ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ মহড়া চলবে পাঁচ দিন।
একই সঙ্গে মহড়ার কিছু প্রশিক্ষণও কমিয়ে দেওয়া হবে। আজ বুধবার বার্তাসংস্থা রয়টার্স এ খবর দিয়েছে।
১৭ আগস্ট শুরু হওয়া মহড়া ২১ আগস্ট শেষ হবে। আগে এটি ২৭ আগস্ট পর্যন্ত চলার কথা ছিল। মহড়ার কিছু মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণও কমানো হবে। কিছু প্রশিক্ষণ বাতিল করে সিমুলেশনের মাধ্যমে করা হবে বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহন গিউ-ব্যাক জানিয়েছেন, মহড়ার দ্বিতীয় ধাপও বাতিল করা হতে পারে। এই ধাপে প্রতিরক্ষামূলক প্রশিক্ষণের পর পাল্টা হামলার অনুশীলন হওয়ার কথা ছিল।
গত রোববার ট্রাম্প মহড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর’ নির্দেশ দেন। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তার ‘খুব ভালো সম্পর্ক’ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, মহড়া কমানোর পেছনে ট্রাম্পের একাধিক লক্ষ্য থাকতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো, ইরান পরিস্থিতি সামলানো এবং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আবার কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করা এর মধ্যে থাকতে পারে।
এদিকে মহড়া কমানোর পরও উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক মহড়ার নিন্দা জানিয়েছে।
দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেসিএনএ বলেছে, ওয়াশিংটন ও সিউলের সামরিক হুমকি মোকাবিলায় উত্তর কোরিয়া আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ চালিয়ে যাবে।
তবে এবার উত্তর কোরিয়া ট্রাম্পের নির্দেশ বা মহড়া কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। এক বিশ্লেষকের মতে, এর মাধ্যমে পিয়ংইয়ং ভবিষ্যতে কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ খোলা রাখতে চাইছে।
এদিকে কিম জং উনের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের জন্য ট্রাম্প তার কর্মকর্তাদের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন বলে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। নভেম্বরে চীনে এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপেক) সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সময় এমন বৈঠক হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে রয়টার্স এ তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে পারেনি।
দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র এসব যৌথ মহড়াকে প্রতিরক্ষামূলক এবং উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে দেখে। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া বরাবরই এসব মহড়াকে নিজেদের বিরুদ্ধে হামলার প্রস্তুতি বলে অভিযোগ করে আসছে।
সূত্র: রয়টার্স
ছবি : সংগৃহীত
কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে ৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক এবং একজন ভারতীয় নাগরিক বলে জানা গেছে।
নিহতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৬ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি এবং একজন ভারতীয়। নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে রয়েছেন শণশিষ দত্ত, আফসানা শিম্মিন, দেবাশীষ দত্ত ও মোহাম্মদ আকরাম আলী। তারা সবাই বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে আহমেদ বাবু নামে আরও একজন নিহত হয়েছেন। তিনি ঢাকার সাভারের আমিনবাজারের বেগুনবাড়ি এলাকার বাসিন্দা। তার বাবার নাম আদম আলী।
নিহত ভারতীয় নাগরিকের নাম সন্দীপ পাসওয়ান। তিনি ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা এবং ওই হোটেলের কর্মচারী ছিলেন।
আগুন লাগার সময় হোটেলের অধিকাংশ মানুষ গভীর ঘুমে ছিলেন। ঘুমের মধ্যেই অনেকের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। যারা দ্রুত বিষয়টি বুঝতে পেরে বের হওয়ার চেষ্টা করেছেন, তাদের কেউ কেউ প্রাণে বেঁচেছেন। তবে কয়েকজন ঘুমের মধ্যেই মারা যান।
ভোররাতে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার আবাসিক হোটেলগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়ভাবে ‘মিনি বাংলাদেশ’ হিসেবে পরিচিত নিউমার্কেট এলাকা। এর আশপাশের কলিন স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট ও মার্কুইস স্ট্রিটসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক আবাসিক হোটেল রয়েছে।
এসব এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০টি হোটেল রয়েছে।
নিউমার্কেট এলাকায় বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। ফলে অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের বেশির ভাগ বাংলাদেশি হওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে বাংলাদেশিদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তেহরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য, বাণিজ্যিক লেনদেন ও আর্থিক কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আঞ্চলিক উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, চলমান উত্তেজনা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে আমিরাতের বাণিজ্যিক ও আর্থিক সম্পর্কের গুরুত্ব বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত তেহরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন জেনারেল ও সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক কিমিট বলেছেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার চেয়েও আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, ইরানের অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিশেষ করে দুবাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
কিমিট আল জাজিরাকে বলেন, ইরানের সঙ্গে দুবাইয়ের পণ্য ও আর্থিক লেনদেনের গুরুত্ব কোনোভাবেই কম করে দেখার সুযোগ নেই। ইরানে আমদানি করা পণ্যের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হলো দুবাই ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এ ক্ষেত্রে চীন ও তুরস্কও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
তার ভাষ্য, ইরানের মোট আমদানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দীর্ঘদিন ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাধ্যমে আসে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে দুবাইয়ের ভূমিকা ইরানকে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছে।
কিমিট বলেন, ‘অনেক দিক থেকেই আমিরাতের এই নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
ইরানের হামলা অব্যাহত থাকলে অন্যান্য উপসাগরীয় দেশও আমিরাতের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করতে পারে কি না—এ বিষয়ে কিমিট বলেন, তারা আপাতত পরিস্থিতি সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করবে বলে তিনি মনে করছেন।
তিনি বলেন, ‘আমিরাত ও ইরানের মধ্যে কী ঘটে, সেটিই এখন সবাই দেখবে এবং অপেক্ষা করবে।’
কিমিটের মতে, আমিরাতের এ সিদ্ধান্ত ইরানের কাছে অত্যন্ত গুরুতর বার্তা বহন করছে। এমনকি তেহরান এটিকে যুদ্ধ ঘোষণার কাছাকাছি কোনো পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচনা করতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপের সঙ্গে তুলনা করেন।
সূত্র: এনডিটিভি, আল জাজিরা
কলকাতা নিউমার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেল শিখা ইনে আগুন
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের একটি আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের পরদিন মঙ্গলবার গভীর রাতে কলকাতার আরেকটি হোটেলে আগুন লেগেছে। এতে আবাসিক হোটেলে থাকা ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬ জন পুরুষ, ২ জন নারী ও একজন শিশু রয়েছে। মৃতদের পরিচয় এখনও জানা যায়নি। মৃতররা সকলে বাংলাদেশি বলে জানিয়েছে এনডিটিভি।
দমকলকর্মীরা হোটেলের ভেতর থেকে অজ্ঞান অবস্থায় ৯ জনকে উদ্ধার করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। হাসপাতাল সূত্রে খবর, তাদের সকলকেই মৃত অবস্থায় আনা হয়েছিল।
এর আগে বীরভূম জেলার তীর্থস্থান তারাপীঠ মন্দির সংলগ্ন একটি হোটেলে সোমবার সকালে অগ্নিকাণ্ডে ৮ জন নিহত এবং ১৩ জন আহত হয়। সেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ওই দিন রাতেই হোটেলের মালিক ও তার ছেলেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সেই রেশ কাটতে না কাটতে আবার আরেকটি অগ্নিকাণ্ড ঘটলো।
কলকাতার আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশ জানিয়েছে, মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলের তিন তলায় আগুন লাগে। আগুন ছড়িয়ে পড়ে অন্তত চারটি ঘরে। চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ঘুম ভেঙে যায় হোটেলের বাসিন্দাদের। তবে ধোঁয়ার কারণে হোটেল থেকে বের হওয়ার সুযোগ পাচ্ছিলেন না তারা।
ভোর তিনটার দিকে আগুন লাগার খবর পায় পুলিশ ও দমকল কর্মী। আগুনের ঘটনাস্থলের একেবারে কাছেই দমকল অফিস। দমকলের ৪টি ইঞ্জিন ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে হোটেলের একাংশ পুড়ে যায়।
অগ্নিকাণ্ডের সময় আহত কয়েকজনকে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। হোটেলের এসি থেকে আগুন লাগতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে। আগুনের পর ঘটনাস্থলে যান দমকল মন্ত্রী ও কলকাতা পুলিশের কমিশনার।
দমকলকর্মীরা হোটেলের ভেতর থেকে অজ্ঞান অবস্থায় ৯ জনকে উদ্ধার করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। হাসপাতাল সূত্রে খবর, তাদের সকলকেই মৃত অবস্থায় আনা হয়েছিল।
পুলিশ এলাকাটি ঘিরে রেখে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। গুরুতর আহত ৬ জনের চিকিৎসা চলছে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে।
অভিযোগ রয়েছে, হোটেলের ঢোকা-বেরোনোর পথ খুবই সঙ্কীর্ণ। হোটেলটি থেকে ৬০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল
বাংলাদেশের সঙ্গে গঠনমূলক ও ইতিবাচক সম্পর্ক চায় ভারত। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ কথা জানিয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশের অতিরিক্ত জ্বালানির চাহিদা পূরণের আবেদনও ভারত খতিয়ে দেখছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র জানান, এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য নেই এবং নতুন কোনো আপডেট পেলে তা জানানো হবে। পাশাপাশি তিনি জানান, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের জন্য আন্তরিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
শেখ হাসিনাকে ফেরতের বিষয়ে বাংলাদেশের আহ্বান ভারত খতিয়ে দেখছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অতিরিক্ত জ্বালানির চাহিদা পূরণের আবেদনটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এর আগে এক ব্রিফিংয়ে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছি। এর পাশাপাশি ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে অংশ নেওয়ার জন্যও ভারতের তরফ থেকে তাকে সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই আমন্ত্রণগুলো ইতিমধ্যে পৌঁছে দেয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে নতুন কোনো অগ্রগতি হলে তা পরবর্তী সময়ে জানিয়ে দেয়া হবে।’
একই ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহের বিষয়ে ভারতের মনোভাব তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশে বিদ্যমান জ্বালানিসংকট এবং নতুন করে জ্বালানি সহায়তার অনুরোধ-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই মুখপাত্র জানান, বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টিকেও ভারত ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে।
রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘আপনারা জানেন, ডিজেল সরবরাহের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের একটি চলমান চুক্তি রয়েছে, যা এখনো অব্যাহত আছে। আর আপনারা যে অতিরিক্ত সরবরাহের অনুরোধের কথা বললেন, সেটি ভারতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা, নিজেদের শোধন ক্ষমতা এবং দেশে ডিজেলের সার্বিক প্রাপ্যতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পর্যালোচনা করা হবে।’
অপরদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করেছে সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে।
সরকার বলছে, গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দেয়ার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফরকে ঘিরে বিদ্যমান পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সফরের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়ার আগে পারস্পরিক আস্থা ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করাকে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রতিবেশী দেশসহ অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ তার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অব্যাহত রাখবে। সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতেই এসব সম্পর্ক জোরদার করা হবে।
বাংলাদেশের অবস্থান অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও পারস্পরিক আস্থা নিশ্চিত হওয়ার পরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ এগিয়ে নেয়া হবে।