পাকিস্তান সীমান্তঘেঁষা খুনজেরাব পাসের কাছে তুষারের মধ্যে সামরিক মহড়া চালাচ্ছেন সৈন্যরা
হিমালয়ের একটি বিতর্কিত অংশে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যকার সীমানাকে বহু দশক ধরে স্বীকৃতি দেয়নি ভারত। নয়াদিল্লি হিমালয়ের এ দুর্গম অঞ্চলকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। তবে গত সপ্তাহে একটি চুক্তির মাধ্যমে ওই দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের একটি অংশে আনুষ্ঠানিকভাবে সীমানা চূড়ান্ত করেছে পাকিস্তান ও চীন। এতে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত।
পাকিস্তান ও চীন যৌথ সীমান্ত কমিশন গঠনসংক্রান্ত একটি চুক্তিতে সই করেছে। পাকিস্তান বলেছে, এটি একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’। এর মাধ্যমে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ দুটির সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বাড়বে। তবে ভারত এই চুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই। নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করা একটি অঞ্চলকে ভারত পাকিস্তান ও চীনের মধ্যকার সীমান্ত বলে স্বীকৃতি দেয়নি। পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে সীমানা নির্ধারণ নিয়ে এ ঘোষণা বিশেষভাবে সংবেদনশীল একটি সময়ে এসেছে।
বছরের পর বছর সামরিক উত্তেজনার পর এশিয়ার দুই প্রভাবশালী প্রতিবেশী ভারত ও চীন এখন নিজেদের সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। দুই দেশের হিমালয় সীমান্তের বড় একটি অংশে সেনাদের অবস্থান আলাদা করে রেখেছে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি। বিতর্কিত সেই সীমান্ত নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা চলছে। একই সময়ে সীমান্তের আরেকটি অংশে চীন ও পাকিস্তান সহযোগিতা জোরদার করছে। ওই অংশের ভূখণ্ডও ভারত নিজেদের বলে দাবি করে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ‘পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই। আমরা তথাকথিত যৌথ কমিশন প্রত্যাখ্যান করছি। এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।’ এই যৌথ কমিশন মূলত পাকিস্তান–চীন সীমান্ত নিয়ে কাজ করবে। এর আওতাভুক্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে বিতর্কিত শাকসগাম উপত্যকা। ১৯৬৩ সালে প্রায় ৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের উপত্যকাটি চীনের কাছে হস্তান্তর করে পাকিস্তান। তবে ভারত এটিকে দেশটির লাদাখ অঞ্চলের অংশ বলে দাবি করে।
ভারত বলছে, শাকসগাম উপত্যকা ছিল তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের অংশ। পাকিস্তান ওই ভূখণ্ড অবৈধভাবে দখল করার পর একটি চুক্তির মাধ্যমে সেটি চীনের কাছে হস্তান্তর করে। ভারত কখনো ওই চুক্তিকে স্বীকৃতি দেয়নি। এটিকে অবৈধ ও অকার্যকর বলে মনে করে নয়াদিল্লি। এ ইতিহাসই ১৬ সেপ্টেম্বরের ঘোষণাটিকে ঘিরে বিশেষ সংবেদনশীলতার কারণ ব্যাখ্যা করে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘অবৈধভাবে ও জোর করে দখল করে রাখা’ ভারতীয় ভূখণ্ড নিয়ে কোনো ধরনের চুক্তি সই করার আইনি এখতিয়ার পাকিস্তানের নেই।
অন্যদিকে পাকিস্তান বলেছে, জম্মু ও কাশ্মীর এখনো একটি বিতর্কিত ভূখণ্ড। তাই ১৯৬৩ সালে চীনের সঙ্গে করা সীমান্ত চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার ভারতের নেই। পাকিস্তান ওই চুক্তিকে বৈধ বলে মনে করে।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
দিল্লির শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও গভর্ন্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক জাবিন টি জ্যাকব বলেন, এ উদ্যোগ পুরোপুরি নতুন কোনো ব্যবস্থা নয়; বরং পুরোনো একটি ব্যবস্থাকে আবার চালু করা হয়েছে। টি জ্যাকব বিবিসিকে বলেন, ১৯৬৩ সালের চীন–পাকিস্তান চুক্তিতেই যৌথ সীমান্ত কমিশনের কথা বলা হয়েছিল। এখানে প্রশ্ন হলো, এখন কেন এটি চালু করা হলো।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জ্যাকব নিজেই বলেন, এ সময়ে কমিশন চালুর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে চীনের সীমান্তগুলো চিহ্নিত করার বৃহত্তর উদ্যোগ এবং সীমান্ত এলাকায় যোগাযোগ ও চলাচলকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা। বিশেষ করে পাকিস্তানের অন্য সীমান্তগুলোয় যখন সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে, তখন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। জ্যাকব আরও বলেন, এ ঘটনায় ভারতের ‘উদ্বিগ্ন’ হওয়াই উচিত। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ১৯৬৩ সালের মূল চুক্তির একটি নির্দিষ্ট বিধান বা শর্তকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওই চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছিল, কাশ্মীর বিরোধের সমাধান হলে যে দেশ ওই ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নেবে, তার সঙ্গে চুক্তিটি নিয়ে আবারও আলোচনা করতে হবে। এই অধ্যাপকের মতে, আন্তর্জাতিক তথ্য ও সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রেও ভারতের সমস্যা রয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে চীন অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, যা দিল্লির কূটনৈতিক লড়াইকে কঠিন করে তুলছে।
যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বর্তমানে আনোয়ার গারগাশ ডিপ্লোম্যাটিক একাডেমি অ্যান্ড হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো হুসেইন হাক্কানি বলেন, নতুন এ কমিশন একই সঙ্গে বাস্তবসম্মত ও রাজনৈতিক। তিনি বলেন, ‘এটি সীমান্ত ও সীমানা–সংক্রান্ত সহযোগিতা বাড়ানো, অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপার ঠেকানো এবং সিপিইসি–সংশ্লিষ্ট কৌশলগত অবকাঠামো সুরক্ষার একটি ব্যবস্থা।’ এর মাধ্যমে ভারতকেও একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। সেটি হলো, কাশ্মীর ইস্যুকে বেইজিং এখনো পাকিস্তানের চোখ দিয়েই দেখে।
হাক্কানি বলেন, ‘চীন কখনোই কাশ্মীর বিষয়ে ভারতের অবস্থান মেনে নেয়নি। চীন গিলগিট–বালতিস্তানকে ভারতের নয়, পাকিস্তানের চোখ দিয়ে দেখে।’এখানে হাক্কানি পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ওই অঞ্চলের কথা উল্লেখ করেছেন, যার সঙ্গে চীনের সীমান্ত রয়েছে এবং যেটিকে ভারত নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে।
তিনি বলেন, ভারত–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানের অবস্থানও বদলেছে। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান এখনো মনে করে, জম্মু ও কাশ্মীরের চূড়ান্ত মর্যাদা নির্ধারিত হয়নি। তবে ভারত যেহেতু কাশ্মীরে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত অংশে অভ্যন্তরীণ কিছু পরিবর্তন এনেছে, যেমন ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করেছে। তাই ১৯৬৩ সাল থেকে চীনের সঙ্গে যে বিষয়টি কার্যত চালু আছে, সেটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পাকিস্তানের কোনো আপত্তি নেই।’
বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে, এ ব্যবস্থা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে ভারতকে ঘিরে নিজেদের অবস্থান সামলানো ও তা জানানোর বৃহত্তর কৌশলের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। হাক্কানি বলেন, কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানকে আশ্বস্ত করার বিষয়টি বেইজিংয়ের জন্য কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, ‘কৌশলগত দিক থেকে এটি পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আরও গভীর করে। আর ভূ–কৌশলগত দিক থেকে এটি ভারতের জন্য চীন ও পাকিস্তান—দুই দিক থেকে হুমকির আশঙ্কা আরও জোরালো করে। এতে পাকিস্তান সন্তুষ্ট হয় এবং চীনও লাভবান হয়।’
নতুন এই চুক্তির ঘোষণা যে সময়ে এলো, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। হাক্কানি বলেন, ‘চীন সব সময়ই কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর আগেই কী সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে, সেই পরিকল্পনা করে ফেলে। তাই যৌথ সীমান্ত কমিশনকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই বেশ কিছুদিন আগেই নেওয়া হয়েছিল।’
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং সম্প্রতি ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে নয়াদিল্লি সফর করেছেন। এর পরপরই চুক্তির খবর প্রকাশ করার মাধ্যমে পাকিস্তানকে কৌশলগত অংশীদারত্ব নিয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, বহুপক্ষীয় যোগাযোগ বাড়লেও দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে চীনের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
জ্যাকব সতর্ক করে বলেন, এ ঘটনাকে ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় (এলএসি) এর কোনো তাৎক্ষণিক বা স্পষ্ট প্রভাব নেই।’ এ থেকে বোঝা যায়, গত সপ্তাহের ঘোষণার গুরুত্ব হিমালয়ের বিতর্কিত সীমান্তে তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তনের চেয়ে বরং ভারত যেসব ব্যবস্থাকে বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে এসেছে, সেগুলোকে ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার মধ্যেই বেশি নিহিত।
জয়সোয়াল বলেন, এ নিয়ে ভারতের অবস্থান ‘স্পষ্ট ও অভিন্ন’। দিল্লি যেটিকে ভারতীয় ভূখণ্ডে পাকিস্তানের অবৈধ দখল বলে মনে করে, তাকে বৈধতা দেওয়ার যেকোনো চেষ্টা অগ্রহণযোগ্য। এর ফলে ওই ভূখণ্ডের ওপর ভারতের সার্বভৌমত্বের দাবির ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে হাক্কানি মনে করেন, এ বিরোধ শুধু সীমান্তের আইনি বিষয় নিয়ে নয়। কারণ, সীমান্ত ও সীমানা নিয়ে ভারত ও চীনের মূল বিরোধটি শুধু মানচিত্রগত নয়; বরং ভূ–কৌশলগত। তাই সীমান্ত নিয়ে আলোচনা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, পাকিস্তান এখনো ‘ভারতের বিরুদ্ধে চীনের দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রতিরোধব্যবস্থা’ হিসেবে কাজ করছে। আর ইসলামাবাদের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ক দিল্লির কাছে সেই বার্তা দিয়ে যাবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস থেকে মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার আদেশটি স্থগিত করে দিয়েছেন দেশটির এক ফেডারেল বিচারক। একইসঙ্গে সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোর সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশের অনুমতি পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
রয়টার্স জানিয়েছে, আজ বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ডিস্ট্রিক্ট জজ টিম কেলি এ আদেশ দেন। তিনি বলেন, ওই তিনটি সংবাদমাধ্যমের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা ছিল অসাংবিধানিক।
এই আদেশকে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ওই তিন সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার বাতিল করে দিয়েছিলেন। এর বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমগুলো যে মামলা করেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক এই আদেশ দেন।
বিচারক কেলি ট্রাম্প প্রশাসনকে অবিলম্বে ওই সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রেস পাস ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি আগামী ১৪ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞার পেছনে জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখানো হলেও বিচারক তা গ্রহণ করেননি।
আদেশে কেলি বলেন, ‘বাদীদের প্রেস পাস বাতিল করলে জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষিত হবে, এমন দাবির পক্ষে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে তাদের প্রবেশাধিকার ফিরিয়ে দিলে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে, এমন দাবিরও ভিত্তি নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছিলেন যে ওই সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে “সত্যতার ঘাটতি ও নেতিবাচকতার” কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস এবং সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিনিধিরা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প বলেছিলেন, ওই তিন সংবাদমাধ্যমের ‘মিথ্যা ও কল্পকাহিনী’ প্রকাশ বা প্রচার চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। অন্যদিকে, মার্কিন বিচার বিভাগের আইনজীবীরা জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে নিষেধাজ্ঞার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
সোমবার ওয়াশিংটনের একটি ফেডারেল আদালতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করে সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকো কর্তৃপক্ষ। তাদের অভিযোগ, এই নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে থাকা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মুক্ত গণমাধ্যমের অধিকার এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অধিকারকে লঙ্ঘন করেছে।
মামলার শুনানি চলাকালে হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার অবিলম্বে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য তারা আদালতের কাছে ট্রাম্পের আদেশে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করে।
বুধবারের শুনানিতে বিচারক কেলি বলেন, কলাম্বিয়া সার্কিটের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আপিল আদালতের দুটি পূর্ববর্তী রায়ে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, হোয়াইট হাউসের প্রেস পাস বাতিলের আগে সাংবাদিকদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ দিতে হবে।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোকে তাদের প্রবেশাধিকার বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে আপত্তি জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে মনে হচ্ছে।
সংবাদমাধ্যমগুলোর আইনজীবী আদালতে বলেন, কোনো ধরনের আগাম নোটিশ বা সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ ছাড়াই তাদের হোয়াইট হাউসে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তিনি এটিকে নজিরবিহীন, অযৌক্তিক ও কঠোর শাস্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
তবে বিচার বিভাগের আইনজীবী বলেন, মঙ্গলবার পাঠানো চিঠিতে ট্রাম্প প্রশাসন প্রেস পাস বাতিলের যথেষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছে। কিন্তু বিচারক এ যুক্তির বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ওই চিঠিগুলো প্রেস পাস বাতিলের পর এবং মামলা দায়েরের পরে পাঠানো হয়েছে।
মঙ্গলবার আদালতে জমা দেওয়া এক নথিতে বিচার বিভাগ যুক্তি দেয়, হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার কোনো অধিকার নয়, বরং এটি একটি বিশেষ সুবিধা। তাই সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রবেশাধিকার স্থগিত করার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের রয়েছে।
এদিকে, বুধবার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন এবং কয়েক ডজন সংবাদমাধ্যম ওই তিন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আদালতে একটি নথি জমা দিয়েছে। এতে তারা বলেছে, কোনো সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় অবস্থান বা দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সাংবাদিকদের অধিকার কেড়ে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের কয়েক দশকের সিদ্ধান্তের পরিপন্থি।
ওই নথিতে সই করেছে রিপোর্টার্স কমিটি ফর ফ্রিডম অব দ্য প্রেস, রয়টার্স, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও ফক্স নিউজসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সংগঠন।
ছবি : সংগৃহীত
আফগানিস্তানে আবারও হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। এবার অন্তত ১০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। আজ বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় এক বাসিন্দা এএফপিকে জানান, গতরাতে আফগানিস্তানের দক্ষিণে অবস্থিত কান্দাহার শহরে বিমান হামলা হয়েছে।
এই শহরেই তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার অবস্থান বলে জানা গেছে।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানান, তাদের বাহিনী আফগানিস্তানে ১০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তবে কোথায় কোথায় হামলা চালানো হয়েছে, তা নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেননি তিনি।
প্রতিবেশী দেশটির বিরুদ্ধে ‘নিজ ভূখণ্ডে সন্ত্রাসীদের আশ্রয়স্থল’ গড়ে উঠতে দেওয়ার অভিযোগও আনেন তিনি। এই হামলার বিষয়ে মন্তব্যের জন্য আফগানিস্তানের সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পায়নি এএফপি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর কয়েক দিন আগেও আফগানিস্তানের সীমান্ত এলাকায় বোমা হামলা চালিয়েছিল পাকিস্তান।
গতরাতের হামলার বিষয়ে কান্দাহারের ওই বাসিন্দা এএফপিকে বলেন, তিনি একটি যুদ্ধবিমানের শব্দ শোনার পর বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ পান। এরপর শহরের কেন্দ্রে আগুন জ্বলতে দেখেন।
কয়েক ঘণ্টা পর পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার আফগানিস্তানে বিমান ও ড্রোন হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তারার এক্সে (সাবেক টুইটার) বলেন, ‘আফগানিস্তানের ১০টি স্থানে নির্ভুলভাবে বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান।’
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্ভুলভাবে ও নির্ধারিত মাত্রার মধ্যে থেকে এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি শুধু চিহ্নিত সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তারার আরও দাবি করেন, এর আগে ওই লক্ষ্যবস্তুগুলো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামলায় ব্যবহার হয়েছে।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের শুরুতে আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলে চালানো হামলায় অন্তত তিনজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। তবে পাকিস্তানের দাবি, ওই হামলায় ২৮ জন জঙ্গি নিহত হয়েছেন।
এএফপি বলছে, সীমান্ত এলাকায় এ ধরনের একাধিক হামলার নজির থাকলেও আফগানিস্তানের শহরগুলোতে হামলার ঘটনা বেশ বিরল।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে লড়াই শুরু হলে কান্দাহার ও রাজধানী কাবুলেও হামলা হয়েছিল।
জাতিসংঘের আফগানিস্তান মিশন (ইউএনএএমএ) জানিয়েছে, কয়েক সপ্তাহের ওই সহিংসতায় শত শত আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।
মার্চে যুদ্ধবিরতি হলেও কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় দুই প্রতিবেশীর মধ্যে স্থায়ী সমাধান আনার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। নিরাপত্তা ইস্যুতে মতবিরোধই প্রধান বাধা হয়ে আছে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই আফগানিস্তানের কাছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে।
ইসলামাবাদের অভিযোগ, পাকিস্তানে সাম্প্রতিক হামলা বেড়ে যাওয়ার পেছনে টিটিপিসহ অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীই দায়ী। তালেবান সরকার ওই গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দিচ্ছে।
টিটিপি বহু বছর ধরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সহিংস অভিযান চালিয়ে আসছে।
তারার এক্সে বলেন, ‘পাকিস্তান বহু বছর ধরে তালেবান সরকার ও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী ব্যক্তিদের কাছে আফগান ভূখণ্ডে সন্ত্রাসীদের আশ্রয়দান ও তাদের সহযোগী নেটওয়ার্কের উপস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়ে এসেছে।’
তারার দাবি করেন, তালেবান সরকার জেনে-বুঝেও এসব সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বরং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ড্রোন হামলা চালিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
যদিও আফগান কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি করেন, পাকিস্তান বৈরী গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেয় এবং আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখায় না।
চলতি সপ্তাহে সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানের হামলার আগে শুক্রবার উত্তর পাকিস্তানে পুলিশের সদরদপ্তরে হামলা হয়। ওই হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত হন।
টিটিপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠী ওই হামলার দায় স্বীকার করে।
ছবি : সংগৃহীত
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে বুধবার ওয়াশিংটনে স্বাগত জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিন দিনের এই সফরে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, ইরান ও তাইওয়ানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই নেতার আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যেই দুই দেশ চলমান বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়াতে সম্মত হয়েছে।
প্রায় তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্র সফরে আসা শি জিপিংকে মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানান ট্রাম্প। সেখানে দুই নেতা ও তাদের স্ত্রীরা করমর্দন করেন এবং কিছুক্ষণ কথা বলেন। এ সময় সামরিক ব্যান্ড সংগীত পরিবেশন করে, তোপধ্বনি দেওয়া হয় এবং একটি বি-১ সামরিক বোমারু বিমান ওপর দিয়ে উড়ে যায়।
সিএসপ্যানের তথ্য অনুযায়ী, ১১ বছর পর প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে গিয়ে বিদেশি কোনো নেতাকে স্বাগত জানালেন। এর আগে ২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সেখানে পোপ ফ্রান্সিসকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
শি জিনপিং এক লিখিত বিবৃতিতে বলেন, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার হওয়া উচিত, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।’ তার এই বিবৃতিতে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, দুই দেশ ১১ মাসের বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, নতুন চুক্তির আওতায় বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে। এর আগের মেয়াদ ১০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল।
২০২৫ সালের শুল্কযুদ্ধের পর বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা তীব্র হয়। ওই সময় দুই দেশের পণ্যের ওপর তিন অঙ্কের শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। নতুন সমঝোতা বিশ্ববাজারে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা কিছুটা কমাতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। বিরল খনিজ ও কম্পিউটার চিপের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, ইরানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এবং তাইওয়ানকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন— এসব বিষয় নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বিরোধ রয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুই নেতার বৈঠকে নির্দিষ্ট কিছু খাতে শুল্ক কমানো, মাদক পাচার রোধে সহযোগিতা এবং দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে চুক্তি হতে পারে। চীনে আটক কিছু মার্কিন নাগরিক ও অন্যদের মুক্তির বিষয়টিও ট্রাম্প তুলতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও দুই দেশ আরও আলোচনায় সম্মত হতে পারে। এ খাতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন তীব্র প্রতিযোগিতায় রয়েছে।
শি জিনপিংয়ের সফরে বৃহস্পতিবার প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছে। এতে অ্যাপলের টিম কুক, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং ও ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যানের মতো প্রযুক্তি খাতের নেতারা অংশ নিতে পারেন। এ ছাড়া হোয়াইট হাউসে সামরিক অনুষ্ঠান এবং ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে পৌঁছেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার ওয়াশিংটনে মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে পৌঁছালে সি ও তাঁর স্ত্রী পেং লিউয়ানকে স্বাগত জানান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। চীনের প্রেসিডেন্টের ওয়াশিংটনে এ সফরকে দুই পরাশক্তির সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেননা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তাইওয়ান ও ইরান ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে এখনো উত্তেজনা রয়েছে।
প্রায় তিন বছর পর সি চিন পিং ওয়াশিংটন সফর করছেন। তাঁর এ সফর থেকে বড় কোনো অর্জন উঠে আসবে—বিশ্লেষকেরা তা মনে করছেন না। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে ১১ মাস ধরে চলা বাণিজ্য সমঝোতার মেয়াদ বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, এ সমঝোতার মেয়াদ বৃদ্ধি করার বিষয়ে দুই দেশ একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে।
বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনের চীনা দূতাবাসের তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সি চিন পিংকে উদ্ধৃত করে দূতাবাস থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার হওয়া উচিত।’ বিবৃতিতে বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে উল্লেখ নেই।
সি চিন পিং ওয়াশিংটনে নামার পর উভয় দেশের প্রেসিডেন্ট ও তাঁদের স্ত্রীরা পরস্পরের সঙ্গে হাত মেলান। তাঁরা দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিট কথা বলেন, ছবি তোলেন। এ সময় সামরিক ব্যান্ডে বাদ্য বাজছিল। কামানের গোলার শব্দ শোনা যায়। আকাশে উড়ে যায় বি-১ বোমারু বিমান।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সম্প্রচারমাধ্যম সি-স্প্যানের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১১ বছর পর কোনো বিদেশি রাষ্ট্রনেতাকে ওয়াশিংটনের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে স্বাগত জানালেন কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এর আগে ২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সেখানে পোপ ফ্রান্সিসকে স্বাগত জানান।
চীন–যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমিত পরিসরে হলেও একটি বাণিজ্যচুক্তি বিশ্ববাজারে স্বস্তি ফেরাতে পারে। ২০২৫ সালের শুল্কযুদ্ধের ধাক্কায় বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। ওই সময় বিশ্বের এ দুই বৃহৎ অর্থনীতির পণ্যের ওপর পাল্টাপাল্টি শুল্ক তিন অঙ্কে পৌঁছেছিল।
বেসেন্ট ফক্স নিউজের ‘স্পেশাল রিপোর্ট’ অনুষ্ঠানে জানান, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সমঝোতার মেয়াদ নতুন করে আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হবে। এর মেয়াদ আগামী ১০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল।
তবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এখনো বড় ধরনের মতবিরোধ রয়ে গেছে। বিরল খনিজ আর কম্পিউটার চিপ রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ, ইরান–চীন সম্পর্ক এবং তাইওয়ানকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন—এসব বিষয় নিয়ে দুই দেশ পরস্পরের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে।
দুই পরাশক্তির প্রেসিডেন্টরা এমন এক সময় বৈঠকে বসছেন, যখন ইরান যুদ্ধ নিয়ে ব্যাপকভাবে অসন্তোষের মুখে রয়েছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে চীনেও নানা অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে; যদিও দেশটির বাণিজ্য খাত এখন বেশ শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে। ফলে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির অনেক নেতা চীনকে তাঁদের দেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেন। কাজেই চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ট্রাম্পের বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে।
দুই প্রেসিডেন্টের বৈঠকের বিষয়ে জানাশোনা আছে—এমন কর্মকর্তারা জানান, ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে সি তাইওয়ানের ওপর চীনা দাবির বিষয়টি নতুন করে তুলে ধরতে পারেন। তবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। অন্যদিকে সির আপত্তি থাকলেও ট্রাম্প চীনের ওপর পণ্য রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কঠোর রাখতে নিজেদের অবস্থান অটুট রাখতে পারেন।
ইরান যুদ্ধের জেরে মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান অচলাবস্থা কাটাতে চীন ট্রাম্পকে সহযোগিতা করবে কি না, সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। এ ছাড়া দেশ দুটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়েও আলোচনা করতে পারে। এআই নিয়ে দুই দেশের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আজ বুধবার ভাষণ দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান
‘ইরান কূটনীতির দরজা খোলা রাখতে প্রস্তুত। তবে কোনো চাপের মুখে মাথা নত করবে। ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব নয়।’ বুধবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বিশ্বনেতাদের সামনে দেওয়া ভাষণে দৃঢ়কণ্ঠে এ ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব নয়।
বক্তব্যের শেষ দিকে ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে পেজেশকিয়ান বলেন, নিষেধাজ্ঞা, বাড়তি চাপ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মুখে ইরানি জনগণের প্রতিরোধ আরও বাড়বে। নিষেধাজ্ঞা, চাপ ও হুমকি বাড়ানো হলেও ইরানের জনগণ কখনো মাথা নত করবে না। আমরা কখনো মাথা নত করব না, হাঁটু গেড়ে বসব না।
ইরান সংলাপ ও আলোচনার জন্য প্রস্তুত রয়েছে উল্লেখ করে পেজেশকিয়ান বলেন, তবে কোনো ধরনের ‘শক্তির ভাষা’ মেনে নেবে না তার দেশ। তিনি বলেন, ‘তারা বুঝেছে যে ইরানকে আত্মসমর্পণ করানো যায় না।’ তিনি মন্তব্য করেন—ইরান কখনো আগ্রাসী দেশ ছিল না, কোনো যুদ্ধ শুরু করেনি এবং সবসময় আলোচনার টেবিলে বসার ব্যাপারে নিজেদের প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছে।
ব্ক্তব্যের শুরুতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতিসংঘের আগের দিনের বক্তব্যের প্রসঙ্গ তোলেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ট্রাম্প ইরানকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর জবাবে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমরাই সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েছি।’
ভাষণে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকানো হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো সমঝোতা না হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ‘ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকিও দেন তিনি।
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির একটি ছবি তুলে ধরে পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলা শুরুর প্রথম দিন তেহরানে তাঁর কম্পাউন্ডে বিমান হামলায় খামেনি নিহত হন। এরপর তিনি হামলায় নিহত শিশুদের ছবিও দেখান।
ইরান নিয়ে জাতিসংঘের একটি অনুসন্ধানী মিশন চলতি মাসের শুরুতে জানিয়েছিল, একটি স্কুল ও একটি ক্রীড়া স্থাপনায় সামরিক হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার ‘যুক্তিসংগত ভিত্তি’ রয়েছে এবং এসব হামলা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে।
পারমাণবিক কর্মসূচি প্রসঙ্গে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানের প্রয়োজন পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, পারমাণবিক বোমা নয়। তাঁর দাবি, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ইরানের অগ্রগতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত। তবে পশ্চিমা দেশগুলোর সন্দেহ করে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থান করা ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা বা সিক্রেট সার্ভিস। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
ইরানের প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি দেশটির প্রতিনিধি দলের অন্য কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের কূটনৈতিক নিরাপত্তা শাখার গোয়েন্দারা। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফেডারেল নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের গোয়েন্দা শাখার সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন।
পেজেশকিয়ান ও ইরানের প্রতিনিধি দলের নিরাপত্তায় নিউইয়র্ক পুলিশের গোয়েন্দা সদস্যদের পাশাপাশি গোয়েন্দা বিভাগের অন্যান্য সদস্য এবং মহাসড়ক পুলিশের গাড়িবহরও থাকবে।
জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে ইরান কয়েক দশক ধরে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও তার পূর্বসূরি ইব্রাহিম রাইসি।
তবে এবারের অধিবেশনে ইরানের উপস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। কারণ ইরানের প্রতিনিধি দল এমন একটি দেশের মাটিতে অবস্থান করছে, যার সঙ্গে দেশটির যুদ্ধ এখনো চলছে।
এ অবস্থায় ইরানের প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালন বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবেই করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা অংশ নিচ্ছেন। অধিবেশন ঘিরে নিউইয়র্কে নিরাপত্তাব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।