পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
২০২৫ এবং ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম থেকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের, বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলমানদের, বাংলাদেশে পুশ-ইন বা জোরপূর্বক পাঠানোর হচ্ছে। আসাম সরকার মূলত অভিবাসী (আসাম থেকে বহিস্কার) নির্দেশ-(১৯৫০ আইন from Assam Act, 1950) নামক একটি ঔপনিবেশিক আমলের আইন ব্যবহার করে বাংলাভাষী ও কথিত অবৈধ অভিবাসীদের বাংলাদেশে পুশ-ইন করছে।
অভিবাসী বহিস্কার আইন-১৯৫০ করার ১০ বছর আগে ১৯৬০ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পিতা শিশির অধিকারী (পূর্বনাম মাখনলাল ভট্টাচার্য) ও মা গায়ত্রী দেবী (পূর্বনাম গায়ত্রী ভট্টাচার্য) নাম পরিবর্তন করে আদি বাড়ি বাংলাদেশের বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার বাটাজোর গ্রাম ছেড়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। শুভেন্দু অধিকারীও ১৯৭০ সালে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁকুলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন অভিবাসী বহিস্কার আইন-১৯৫০ করার ২০ বছর পর। তাঁর বাবা-মা এখনও জীবিত আছেন।
প্রশ্ন উঠেছে,পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পরিবারও ১৯৫০ সালের অভিবাসী বহিস্কার আইন অনুযায়ী 'অবৈধ অভিবাসী'। কারণ তাঁর বাবা-মা বাংলাদেশের আদি বাড়ি বরিশাল ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে গেছেন ১৯৬০ সালের ঔপনিবেশিক আমলের অভিবাসী বহিস্কার আইন, ১৯৫০, এর ১০ বছর পর। শুভেন্দু অধিকারীও জন্মগ্রহন করেছেন ১৯৫০ সালের অভিবাসী বহিস্কার আইন করার ২০ বছর পর। তাহলে শুভেন্দু অধিকারীর পরিবার 'বাংলাভাসী হিন্দু' বলে অবৈধ অভিবাসী হবে না কেন? বা তাদেরকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করা যাবে না কেন? ভারত-বাংলাদেশ প্রটোকল ও মানবাধিকার সনদের অনুস্বাক্ষরকারী দেশ হয়েও শুধু বাংলাভাষী মুসলমানদের ভারত থেকে তারিয়ে দেওয়ার নামই হচ্ছে 'পুশ ইন'।
অপরদিকে, শুভেন্দু অধিকারী নিজেই বলেছেন, "আমার মা বরিশাল থেকে এসেছিলেন, হিন্দু নিপীড়নের যন্ত্রণা আমি বুঝি।" অপরদিকে, শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন মমতা ব্যানার্জীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। সেই শুভেন্দু অধিকারীই মমতা ব্যানার্জীকে পরাজিত করে বিজেপি থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর হয়েছেন। তিনি বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভা ও রাজনৈতিক সমাবেশে 'আসাম মডেল' অনুসরণ করে বাংলাভাষী মুসলিমদের চিহ্নিত করার এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করার কড়া বার্তা দিয়েছিলেন। গত ১২ মে আসামের গুয়াহাটিতে তিনি বলেছেন, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে অনুপ্রবেশ রোধে যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হয়েছিল, তা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে পশ্চিমবঙ্গেও বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি অভিযোগ করেন যে, আগের সরকার অনুপ্রবেশের বিষয়ে উদাসীন ছিল এবং বিএসএফকে বর্ডার অবকাঠামো নির্মাণের জন্য জমি পর্যন্ত দেয়নি।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর, প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে শুভেন্দু অধিকারী ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে (বিএসএফ) জমি বরাদ্দের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করছে যে, ভারতের প্রাদেশিক সরকার 'অবৈধভাবে বসবাসকারী' ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাচ্ছে। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই বন্দুকের মুখে বা জোর করে অনেককে সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অভিযানের শিকার হয়ে অনেকেই—যাঁরা দাবি করছেন তাঁরা ভারতেরই নাগরিক—বাংলাদেশে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, মে ২০২৫ সালে ভারত থেকে ১২০০ জনেরও বেশি মানুষকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার সীমান্তে এই ধরনের পুশ-ইন প্রচেষ্টা ঠেকাতে নজরদারি বাড়িয়েছে এবং প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। ভারতের আসামসহ বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষী মুসলিমদের 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী' হিসেবে চিহ্নিত করার একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা বা কৌশল হিসেবে এই পুশ-ইন চলছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তাঁরা মনে করেন, ভারত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিবেশি দেশ। অনেক ক্ষেত্রেই ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের উপর নির্ভরশীল। তাই দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে বাংলাদেশ সরকার উভয় পক্ষই পক্ষপাতহীন আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো সমস্যার সমাধান করাই কল্যাণকর।
লেখক: এম এ আজিজ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
ছবি : সংগৃহীত
একটি শিশুর হাসি যেমন একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি, তেমনি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের কারণে সেই হাসি ম্লান হয়ে যাওয়া আমাদের সবার জন্য বেদনাদায়ক। বাংলাদেশে সম্প্রতি শিশুদের মধ্যে হাম রোগের পুনরুত্থান আমাদের সামনে এমনই এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরছে; যেখানে সামান্য অসচেতনতা বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
কতটা ভয়ংকর এই ‘হাম’?
হাম পৃথিবীর অন্যতম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত শিশু থেকে গড়ে ১২-১৮ জন অ-টিকাপ্রাপ্ত শিশু সংক্রমিত হতে পারে। বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাস খুব দ্রুত পরিবার ও সমাজে বিস্তার লাভ করে।
লক্ষণ: প্রথমেই চিনে নিন
> উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া
> চোখ লাল হয়ে যাওয়া
> মুখের ভেতরে সাদা দাগ (Koplik spots)
> মুখ থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া লাল ফুসকুড়ি
জটিলতা: অবহেলার সুযোগ নেই
হাম কখনোই ‘হালকা’ রোগ নয়; বিশেষ করে কিছু শিশুর জন্য এটি জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সম্ভাব্য জটিলতা–
> নিউমোনিয়া
> ডায়রিয়া ও ডিহাইড্রেশন
> কানের সংক্রমণ
> এনসেফালাইটিস
দীর্ঘমেয়াদে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়া জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশু: তারা কি বেশি ঝুঁকিতে? একজন পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্ট হিসেবে আমার অভিজ্ঞতায়; জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুরা হামের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকে, বিশেষ করে–
> যাদের হার্টের সমস্যা এখনও সম্পূর্ণ সংশোধন (corrected) হয়নি
> যাদের হার্ট ফেইলিউর বা ফুসফুসে অতিরিক্ত রক্তপ্রবাহ রয়েছে
> অপুষ্ট বা বারবার অসুস্থ হয়ে পড়া শিশু
কেন তারা বেশি ঝুঁকিতে?
> হামের সময় নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা আগে থেকেই দুর্বল হার্ট ও ফুসফুসের জন্য বিপজ্জনক
> জ্বর ও সংক্রমণের কারণে হার্টের ওপর চাপ বাড়ে
> অক্সিজেনের চাহিদা বাড়ে, যা সায়ানোটিক হার্ট ডিজিজে আক্রান্ত শিশুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে
> ডিহাইড্রেশন ও ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা হার্টের অবস্থা খারাপ করতে পারে অর্থাৎ একটি ‘সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণ’ এই শিশুদের জন্য দ্রুত জটিল অবস্থায় রূপ নিতে পারে।
এসব শিশুর জন্য বিশেষ সতর্কতা
> টিকাদানে কোনো বিলম্ব নয়
> নির্ধারিত সময়েই MR টিকা অবশ্যই দিতে হবে
> প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে আগাম সুরক্ষা পরিকল্পনা করা যেতে পারে
> ভিড় বা অসুস্থ মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন
> পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে শিশুকে আলাদা রাখুন
দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ
> জ্বর, কাশি বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান
> ‘দেখি নিজে নিজে ভালো হয় কিনা’–এই অপেক্ষা বিপজ্জনক হতে পারে
পুষ্টি ও ফলোআপ নিশ্চিত করা
> অপুষ্টি থাকলে ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে
> নিয়মিত কার্ডিওলজি ফলোআপ বজায় রাখা জরুরি
প্রতিরোধ: টিকাই একমাত্র ঢাল।
হরমুজ প্রণালি
প্রায় ৭ মাস ধরে যুদ্ধ চলছে ইরানের সঙ্গে। হরমুজ প্রণালির অস্থিরতাও শুরু তখন থেকে। এর মধ্যে নতুন আতঙ্ক তৈরি করছে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও। বিশ্বের প্রায় ৩৫ শতাংশ তেলের সরবরাহ চ্যানেলে এভাবে বাধা তৈরি হলেও বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বাস্তবতা মেনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এগোচ্ছে বিকল্প পথে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে কমাচ্ছে চাহিদা। কমাচ্ছে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা। এমন পরিবর্তনের কারণে আগের তুলনায় কম আমদানির পরও সচল রয়েছে দেশের ইস্টার্ন রিফাইনারি।
রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠান আগে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার হাজার টন এলপিজি, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, ডিজেল, ফার্নেসসহ ১৬ ধরনের তেলজাতীয় পণ্য উৎপাদন করলেও এখন তাতে পরিবর্তন এনেছে। তারপরও বড় ধরনের সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়নি বাংলাদেশেও। জ্বালানির দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু অন্যতম প্রধান দুটি প্রণালি আক্রান্ত হওয়ার পরও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠেনি এখনও।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার বাজারে যাওয়া মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এলএনজির ১৫ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। প্রতিদিন যার পরিমাণ ছিল প্রায় ২ কোটি ব্যারেল। হরমুজ দিয়ে যাওয়া এই জ্বালানির প্রায় ৮৯ শতাংশ আসে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বাজারে। আরেক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব দিয়ে বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ১২ শতাংশ পরিবহন করা হয়। এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরকে যুক্ত করেছে এবং সুয়েজ খালের দিকে যাওয়ার অন্যতম পথও এটি।
জেপি মরগ্যানের প্রধান পণ্যবাজার বিশ্লেষক নাতাশা কানেভার সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, তিন কারণে তেলের বাজার ধারণার চেয়ে কম বেড়েছে। তাঁর হিসাবে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপর তেলের দাম দেড়শ ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে শঙ্কা থাকলেও এখন মনে হচ্ছে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলেও তেলের দাম সে পর্যায়ে বাড়বে না। তাঁর সর্বশেষ এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের বিকল্পব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। হুতিদের দ্বারা বিকল্প পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগে সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল ইরানের নাগালের বাইরে থাকা বন্দরে পাঠিয়েছে। এটির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিল, গায়ানা ও কানাডা সম্মিলিতভাবে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের জ্বালানি চাহিদা আগের তুলনায় কমিয়েছে। আবার যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ছাড়া অধিকাংশ দেশ ধারণার তুলনায় কম তেল ব্যবহার করেছে তাদের মজুত থেকে। এজন্য যুদ্ধের সময়ে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল কমেছে। ভ্রমণ কমে যাওয়া, গণপরিবহন ব্যবহার ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ার কারণে যেমন তেলের চাহিদা কমেছে, তেমনি অনেক প্রতিষ্ঠানের বাড়ি থেকে কাজের ধারায় ফিরে যাওয়ার কারণেও তা কমেছে।
সরবরাহ চ্যানেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ কমেছে। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে চাহিদাও কমেছে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানায়, স্বাভাবিক সময়ে দেশে প্রতিবছর ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ বেশি। প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে, যা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। এলপিজি, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, ডিজেল, ফার্নেসসহ ১৬ রকমের তেলজাতীয় পণ্য উৎপাদন করে ইস্টার্ন রিফাইনারি। আগে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার হাজার টন জ্বালানি পণ্য উৎপাদন হলেও এখন হচ্ছে গড়ে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টন। উৎপাদিত পণ্যের পরিমাণও ১৬ থেকে কমে নেমেছে আট থেকে দশে। এই কারখানায় এতদিন কেবল সৌদি আরবের ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা হলেও যুদ্ধ শুরুর পর বিকল্প দেশ হিসেবে মালয়েশিয়ার ক্রুড অয়েল ব্যবহারের কথা ভেবেছে ইস্টার্ন রিফাইনারি।
সৌদি ক্রুড অয়েলের অভাবে চলতি বছরের এপ্রিলে পরিশোধন কার্যক্রম কিছুদিন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল ইস্টার্ন রিফাইনারি। অবশ্য সেই সময়টাতেও কারখানা সংস্কারের বিকল্প কাজ সম্পন্ন করেছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগারটি। তখন থেকে উৎপাদনের পরিমাণও কমিয়েছে সংস্থাটি। দেশে এলএনজি ও এলপিজির সরবরাহ প্রক্রিয়াতেও সম্প্রতি বাধা তৈরি হয়েছিল।
কারিগরি ত্রুটির কারণে কয়েকদিন সমস্যা হলেও দেশে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়নি মজুতে। কারণ, দাম বেশি পড়লেও বাংলাদেশ বিকল্প দেশ থেকে বিকল্প উপায়ে জ্বালানি সরবরাহ করেছে।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না বাংলাদেশকে। জ্বালানি তেল ও গ্যাস সংগ্রহের জন্য বিকল্প উৎসের সহায়তা নিচ্ছি আমরা।’
র্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকনালি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, তেলের দাম আর হু হু করে বাড়বে না। একশ ডলার ছাড়িয়ে দেড় শতকের ঘর এটি আর স্পর্শ করবে না শিগগির। বিশ্ববাজারে মিলছে এর ইঙ্গিতও। বাব আল-মান্দেব হুতিরা নিয়ন্ত্রণে নিলেও গত সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের নভেম্বর মাসের ফিউচার দর ২ দশমিক ১১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৬৮ ডলারে নেমেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর তেলের দাম ১০৯ ডলারে উঠেছিল। ১৬ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ এক দিনের মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০৪ ডলারে নেমে আসে। এরপর সোমবার তেলের দাম ১০১ ডলারে নেমে যায়। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করে। এর পর ৩০ এপ্রিল তেলের দাম সর্বোচ্চ ১২৬ ডলার পর্যন্ত ওঠে। পরে আবার তা কমে আবার বাড়লেও অতিক্রম করেনি ১২৬ ডলারের ঘর।
ছবি : সংগৃহীত
ভোরের আলো ফুটতেই সন্ধ্যা নদীর বুকে যেন প্রাণের সঞ্চার হয়। চারপাশ থেকে ছুটে আসে শত শত ছোট-বড় ডিঙি ও ট্রলার। নদীর স্নিগ্ধ হাওয়ায় মিশে যায় মানুষের কোলাহল, দাঁড় টানার ছপছপ শব্দ আর ধান-চাল মাপার খসখস আওয়াজ। এক নৌকায় হয়তো চলছে ধানের দরদাম, তো ঠিক পাশে অন্য নৌকায় মাপা হচ্ছে চকচকে চাল।
ক্রেতা-বিক্রেতার দরকষাকষি, বস্তা টানাটানি আর নগদ লেনদেন-সবকিছুই চলছে নদীর বুকে ভাসমান নৌকায়। বরিশালের বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীর বুকে বসা ধান-চালের এ ভাসমান হাট কেবল একটি বাজার নয়, এটি যেন আবহমান বাংলার কৃষিনির্ভর অর্থনীতির এক জীবন্ত ক্যানভাস।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, প্রমত্তা সন্ধ্যা নদীর তীরে ধান-চালের এই ভাসমান বাণিজ্যের বয়স প্রায় ২০০ বছর। একসময় নদীর দুই পাশে সারি সারি ধান-চালের আড়ত ও চালকল ছিল। মোল্লা, ব্যাপারী, মৃধা, সরদারসহ বিভিন্ন উপাধিধারী ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত পুরো এলাকা। কালের বিবর্তনে অনেক কিছু বদলে গেলেও নদীর বুকে নৌকায় নৌকায় বেচাকেনার সেই আদি রীতি আজও টিকে আছে।
বানারীপাড়ার নামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ‘বালাম চাল’। সরু, লম্বাটে ও সুগন্ধি এই চালের একসময় দেশজুড়ে ব্যাপক কদর ছিল। বালামের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের ধান ও চাল বেচাকেনা হয় এখানে। তবে এই হাটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলেন ‘কুটিয়াল’রা।
ধান কিনে তা প্রক্রিয়াজাত করে চালে রূপান্তরের কারিগরদের স্থানীয় ভাষায় কুটিয়াল বলা হয়। নৌকায় ধান কিনে প্রথমে তা পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর ভোরে বিশাল আকৃতির চুলায় বিশেষ পাত্রে সেই ধান সেদ্ধ করা হয়।
এরপর দুই-তিন দিন কড়া রোদে উঠানে শুকিয়ে চালকলে ভাঙানোর পর মেলে সেই কাঙ্ক্ষিত ঝরঝরে চাল। একসময় বানারীপাড়ার ঘরে ঘরে কুটিয়ালদের ব্যস্ততা ছিল, যা আজ অনেকটাই ম্রিয়মাণ।
বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে নদীপথে ব্যবসায়ীরা ছুটে আসেন এই হাটে। বরগুনার ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন যেমন এক নৌকা ধান নিয়ে এসেছেন। তাঁর মতে, এখানে ধানের ন্যায্য দাম পাওয়া যায়, আবার ফেরার পথে তুলনামূলক কম দামে ভালো মানের চালও কিনে নেওয়া যায়। যাতায়াতে সময় ও দূরত্ব বেশি হলেও নদীপথে পণ্য পরিবহনের সুবিধা এবং ব্যবসায়িক বিশ্বস্ততার কারণে তিনি দশকের পর দশক ধরে এই হাটে আসেন।
আগে যেখানে পালতোলা নৌকার আধিক্য ছিল, এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে যন্ত্রচালিত ট্রলার বা ইঞ্জিন নৌকা। তবে নদীর বুকে সারি সারি নৌকায় ধান-চালের পসরা সাজানোর সেই চিরায়ত দৃশ্যটি বদলায়নি।
বানারীপাড়ার এই মূল হাট বসে সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার। তবে আগের দিনের হাটের রেশ ধরে রবি ও বুধবারও কিছুটা বেচাকেনা চলে, যাকে স্থানীয়রা বলেন ‘গালার হাট’। হাটের দিনগুলোয় পাইকার, কুটিয়াল আর শ্রমিকদের দম ফেলার ফুরসত থাকে না। এত ব্যস্ততার মধ্যেও রয়েছে এক অন্য রকম প্রশান্তি।
ছবি : সংগৃহীত
বিসিএসসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার লিখিত ধাপ পেরিয়ে ভাইভায় পৌঁছানো একটি বড় অর্জন। তবে ভাইভায় ভালো করার জন্য শুধু সাধারণ জ্ঞান ও সাম্প্রতিক ঘটনা জানলেই হবে না। প্রার্থীর একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড, বিষয়ভিত্তিক মৌলিক জ্ঞান, বিশ্লেষণক্ষমতা, ব্যক্তিত্ব এবং নিজের পড়াশোনাকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভাইভার আগে একাডেমিক প্রস্তুতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রথমেই নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রতিটি স্তর সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিতে হবে। কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েছেন, কোন বিষয়ে পড়েছেন, কেন সেই বিষয়টি বেছে নিয়েছেন, বিষয়টির গুরুত্বপূর্ণ শাখা কী এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রে এর ব্যবহার কী– এসব প্রশ্নের উত্তর অনুশীলন করা প্রয়োজন। নিজের সিভি বা আবেদনপত্রে দেওয়া প্রতিটি তথ্য সম্পর্কে প্রস্তুত থাকতে হবে। কোনো তথ্য উল্লেখ করে থাকলে সেখান থেকেই প্রশ্ন আসতে পারে। নিচের বিষয়গুলোকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।
> নিজের পরিচয় ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে। নিজের নাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভাগ, বিষয়, শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং কেন নির্দিষ্ট বিষয়টি বেছে নিয়েছেন– এসব প্রশ্নের উত্তর সাবলীলভাবে দিতে পারতে হবে।
> নিজের একাডেমিক বিষয়ের মৌলিক ধারণাগুলো ভালোভাবে ঝালিয়ে নিতে হবে। সংজ্ঞা, গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব, সূত্র, পরিভাষা, ধারণা ও ব্যবহারিক প্রয়োগ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। শুধু মুখস্থ নয়, কোনো বিষয় কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবে কোথায় এর প্রয়োগ রয়েছে, সেটিও বুঝতে হবে।
> নিজের বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কোর্সগুলো পুনরালোচনা করতে হবে। বিশেষ করে যেসব বিষয় স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়েছেন, সেগুলোর মৌলিক অধ্যায় ও গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলো আবার পড়া প্রয়োজন।
> একাডেমিক ফলাফল নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে। কোনো বিষয়ে ভালো বা খারাপ ফলাফলের কারণ, প্রিয় বিষয়, কঠিন বিষয় এবং নিজের একাডেমিক শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে যুক্তিসংগত উত্তর অনুশীলন করা উচিত।
> থিসিস, গবেষণা, প্রজেক্ট বা ইন্টার্নশিপ করে থাকলে সেগুলো ভালোভাবে ঝালিয়ে নিতে হবে। গবেষণার বিষয়, উদ্দেশ্য, পদ্ধতি, ফলাফল এবং বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে প্রশ্ন আসতে পারে।
> নিজের একাডেমিক বিষয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতার সম্পর্ক বুঝতে হবে। নিজের বিষয়ের জ্ঞান কীভাবে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রযুক্তি, পরিবেশ বা প্রশাসনে কাজে লাগতে পারে, তা নিয়ে চিন্তা করা দরকার।
> বাংলাদেশের সংবিধান, মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে মৌলিক ধারণা রাখতে হবে।
> নিজ জেলা সম্পর্কে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, অর্থনীতি, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, নদনদী, শিল্প ও উল্লেখযোগ্য স্থাপনা সম্পর্কে প্রশ্ন আসতে পারে।
> সাম্প্রতিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি নিয়মিত পড়তে হবে। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, প্রযুক্তি, পরিবেশ ও সামাজিক ঘটনাগুলোর কারণ ও প্রভাব বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
> নিজের ক্যারিয়ার পরিকল্পনা পরিষ্কার রাখতে হবে। কেন সরকারি চাকরি করতে চান, কেন বিসিএস বেছে নিয়েছেন এবং পছন্দের ক্যাডার সম্পর্কে আপনার ধারণা কী—এসব প্রশ্নের উত্তর অনুশীলন করা প্রয়োজন।
> পরিস্থিতিভিত্তিক প্রশ্নের অনুশীলন করতে হবে। একজন কর্মকর্তা হিসেবে কোনো সমস্যা দেখা দিলে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন, কীভাবে জনগণের সঙ্গে কাজ করবেন বা সংকট মোকাবিলা করবেন—এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর যুক্তি দিয়ে দেওয়ার অভ্যাস করতে হবে।
> বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় নিজের পরিচয় এবং একাডেমিক বিষয় সহজভাবে ব্যাখ্যা করার অনুশীলন করা ভালো।
> প্রতিদিন কিছু সময় মক ভাইভা দিতে হবে। শিক্ষক, বন্ধু বা অভিজ্ঞ ব্যক্তির সামনে বসে প্রশ্নের উত্তর দিলে ভয় ও জড়তা কমবে।
> শরীরী ভাষা ও আচরণের দিকে নজর দিতে হবে। চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা, স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসা, প্রশ্ন মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সংক্ষিপ্ত ও পরিষ্কার উত্তর দেওয়ার অভ্যাস করতে হবে।
> উত্তর জানা না থাকলে কীভাবে তা সামলাতে হবে, সেটিও অনুশীলন করতে হবে। ভুল তথ্য দেওয়ার চেয়ে বিনয়ের সঙ্গে না জানার বিষয়টি স্বীকার করা বেশি গ্রহণযোগ্য।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, ভাইভায় বোর্ড সাধারণত শুধু কত কিছু মুখস্থ আছে তা জানতে চায় না; বরং প্রার্থী নিজের জ্ঞান কতটা বুঝেছেন এবং সেই জ্ঞান বাস্তব পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রয়োগ করতে পারেন, সেটিও দেখতে চায়। তাই ভাইভার আগে একাডেমিক বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পুনরালোচনা, নিজের গবেষণা বা প্রজেক্ট ঝালিয়ে নেওয়া, সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং মক ভাইভার মাধ্যমে দুর্বলতা চিহ্নিত করাই হতে পারে প্রস্তুতির সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
ছবি : সংগৃহীত
অধিকাংশ মায়ের অভিযোগ তাদের সন্তান খায় না, রুচি নেই। এ জন্য তারা তাদের ছোট শিশুকে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। ফলে একপর্যায়ে দেখা যায় সন্তানকে সারাদিন খাবার না দিলেও তার ক্ষুধা লাগে না।
সন্তানকে খাওয়ানোর সময় দুটি জিনিস মনে রাখতে হবে। তার আসলে ক্ষুধা লেগেছে কিনা এবং খাবারের নির্দিষ্ট সময় মেনে চলছেন কিনা। ক্ষুধা না লাগলে সন্তান খাবে না। কাজেই আগের খাবারটা হজম হওয়ার সময় দিতে হবে। অনেক মা শিশুকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় এটা-সেটা খাইয়ে ক্ষুধা নষ্ট করেন। আবার ভাত খাওয়ার সময় কলা, কলা খাওয়ানোর সময় ভাত নিয়ে বসেন। আবার পেট ভরে গেলেও পুরোটা খাওয়ানোর জন্য তাড়াহুড়া করেন।
এতে যে যে সমস্যা হয়
১. শিশু খেতে না পেরে বমি করতে পারে, হজম না হয়ে পাতলা পায়খানা হতে পারে।
২. জোর করায় খাবার গলায় আটকে শ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফুসফুসে গিয়ে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। এমনকি ফুসফুসে ঘা বা নিউমোনিয়া হতে পারে।
৩. সন্তানের খাবারে ভীতি জন্মাতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে তীব্র ক্ষুধামান্দ্য হতে পারে।
৪. খাবারে ভীতি জন্মানোর ফলে না খেয়ে পুষ্টিহীনতায় ভুগতে পারে।
৫. অনেক সময় খাদ্যভীতি জন্মানোর ফলে সন্তানের স্বাভাবিক ক্ষুধা নষ্ট হয়। শিশু মানসিকভাবে এতটা অসুস্থ হয়ে পড়ে যে খাবার দেখতে, খাবার তৈরি করার আওয়াজ বা গন্ধ পেলে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, বমি করা শুরু করে। এতে শিশু মায়ের প্রতি বিরূপ আচরণও করতে পারে, অবিশ্বাস থেকে সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দিতে পারে।
৬. জোর করে খাওয়াতে থাকলে শিশু অস্বাভাবিক রকম খুঁতখুঁতে হয়ে যেতে পারে, বেছে বেছে খাওয়ার ফলে নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে অস্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের কারণে অতিরিক্ত স্থূলতার সমস্যায়ও পড়তে পারে। তাই শিশুকে জোর করে খাওয়ানোর বদলে খাবার খাওয়ার পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য নিয়ে আসুন। যেমন তাকে খাবার হজমের জন্য সময় দিন, দুই খাবারের মধ্যে পর্যাপ্ত সময়ের ব্যবধান রাখুন, খাবার দেওয়ার একটা নির্দিষ্ট সময় ও জায়গা নির্বাচন করুন, একসঙ্গে বেশি খাবার না খেতে চাইলে অল্প অল্প করে খাবার দিন।
পুরো বাটির খাবার শেষ না করা পর্যন্ত মায়েরা থামতে চান না। কখন থামতে হবে তা অভিভাবককে বুঝতে হবে। শিশু মুখ না খুললে, মাথা সরিয়ে নিলে, বমিভাব করলে খাবার দেওয়া বন্ধ করুন। কম খেলে চেষ্টা করুন যতটুকু খাবার খায় তা যেন পুষ্টিকর হয়। এক চামচ খেলে ওই এক চামচে যেন যথেষ্ট পরিমাণ প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল, কার্ব ও ফ্যাট থাকে সেটি নিশ্চিত করুন।
শিশুকে জোর করে খাওয়ালে হয়তো আপনি সাময়িকভাবে তার পেট ভরাতে পারবেন, এতে আপনার মানসিক শান্তি মিলবে। সময়ের সঙ্গে এটি বুমেরাং হয়ে আপনাকে বিপদে ফেলবে। আপনার সন্তান সত্যি সত্যিই ‘কিছুই খায় না’ রোগ বাঁধিয়ে শারীরিক ও মানসিক অশান্তির কারণ ঘটাবে।