একটি প্রতারণার মামলায় ঢাকার আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন দুই নারী। আদালত জামিন না দিয়ে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এর দুদিন পর বাদী পক্ষে দাবি করা হয়েছে ওই দুই নারী আসামির একজনের বদলে তার ছোট বোন কারাগারে গেছেন। আদালত এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে এ ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। আর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় আসামি পক্ষের আইনজীবী নি:শর্ত ক্ষমা চেয়ে এ মামলা থেকে সরে দাঁড়ানোর আবেদন করেছেন।
আসামি বড় বোনের পক্ষে ছোট বোনের আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যাওয়ার এ ঘটনা ঘটে মঙ্গলবার। তবে বৃহস্পতিবার এ আসামির রিমান্ড শুনানিকালে বাদী পক্ষে দাবি করা হয়, কাঠগড়ায় উপস্থিত নারী আসল আসামি নন। তিনি অন্য কেউ। বৃহস্পতিবার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুল ইসলামের আদালতে এ ঘটনা ঘটে।
এটি জানাজানি হয় রোববার; যখন এ মামলার চার আসামির আইনজীবী রাজু আহম্মেদ রাজিব ‘আয়নাবাজি’ কাণ্ডের পর এ মামলা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে আদালতে আবেদন করেন।
আইনজীবী, তদন্ত কর্মকর্তা ও আদালত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ‘বড় বোনের বদলে ছোট বোনের’ আত্মসমর্পণ ও কারাগারে যাওয়ার ‘আয়নাবাজির’ মত এ ঘটনা জানা গেছে।
আদালত সংশ্লিষ্টরা বলেন, শারমিন আক্তার একা ও লাইলী শাহনাজ খুশি নামে এ দুই আসামি মঙ্গলবার উত্তরা পূর্ব থানার প্রতারণার ওই মামলায় আত্মসমর্পণ করেন। সেদিন তাদের কারাগারে পাঠান বিচারক।
পরে একাকে জিজ্ঞাসাবাদে ১০ দিনের রিমান্ডে চায় পুলিশ। বৃহস্পতিবার এ নিয়ে শুনানি শুরু হয় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুল ইসলামের আদালতে।
শুনানিকালে একাকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার বাদী আজিজুল আলমের বন্ধু বাদল আহম্মেদ আদালতে উপস্থিত ছিলেন। কাঠগড়ায় দাঁড়ানো নারী মামলার আসামি একা নন বলে শুনানিকালে আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতকে জানান বাদল। এসময় বোরকা ও নেকাপ পরিহিত ছিলেন ওই আসামি।
এমন তথ্যে আদালত ওই নারীকে মুখ দেখাতে বলেন। তখন আসামির জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের ছবির সঙ্গে মিল পাওয়া যায় না কাঠগড়ায় দাঁড়ানো নারীর।
পরে ব্চিারক এই নারী আসামি শারমিন আক্তার একা কিনা তা যাচাই করে প্রতিবেদন জমা দিতে তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন।
মামলার বাদী আজিজুল আলম বলেন, “আমি ১০০ ভাগ নিশ্চিত আমি যাকে আসামি করেছি সেই একা ইনি নন। এটা তার ছোট বোন। তবে নাম জানি না। আদালতের সাথে প্রতারণা করেছে। একা না হয়ে একা সেজে কারাগারে রয়েছে।"
তার বন্ধু বাদল আহম্মেদ বলেন, "সেদিন আমি আদালতে উপস্থিত ছিলাম। ওই আসামি মুখে পর্দা দিয়ে রেখেছিল। বডির স্ট্রাকচার দেখে বুঝি সে একা না। আদালতকে জানাই। আদালত জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্টের সাথে আসামির চেহারার মিল পাননি। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।"
মামলার চার আসামি শারমিন আক্তার একা, লাইলী শাহনাজ খুশি, এ আর রাসেল ও আব্বাসের পক্ষে মামলা পরিচালনা করতেন আইনজীবী রাজু আহম্মেদ রাজিব।
এ ঘটনার পর ক্ষমা চেয়ে রোববার আদালতে করা আবেদন তিনি বলেন, “আত্মসমর্পণ করার সময় একা ও খুশি বোরকা ও নেকাপ পরিহিত থাকায় আইনজীবী হিসেবে আসামিদের নাম-ঠিকানা জিজ্ঞাসাবাদ করে সরল বিশ্বাসে আদালতে হাজির করাই। এর আগে আসামিদের সাথে আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না। ব্যক্তিগতভাবে তাদের বিষয়ে ওয়াকিবহাল ছিলাম না। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, বাদী ও বাদীপক্ষের আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করে পরে উপলব্ধি করতে পারি, আসামিরা আমাকে প্রতারিত করেছে।"
আদালত তার আবেদনটি নথিভুক্ত করেছেন বলে জানান প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই আতিকুর রহমান। সোমবার একার রিমান্ড বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।
রাজু আহম্মেদ রাজিব বলেন, “এই আসামি যে একা না ঠিক পাইনি। এখন এর বেশি কিছু বলছি না।"
এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী আবু বকর সিদ্দিক বলেন, “আয়নাবাজির মত ঘটনা ঘটেছে। আসামি একার হয়ে একজন প্রক্সি দিয়েছিল। বাদীপক্ষ বিষয়টি আদালতকে জানায়। আদালত বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তাকে তদন্ত করতে বলেছেন।"
তিনি বলেন, “ওরা একটা চক্র। ওদের কাজই হলো আয়নাবাজির মত ঘটনা ঘটানো, এমন কাজ করা।”
এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পূর্ব থানার এসআই মাহবুবুল আলম বলেন, "একজনের হয়ে আরেকজন কারাগারে গেছে। বিষয়টা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ওই আসামি কারাগারে আছে। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সব কিছু জানা যাবে। তারপর আদালতে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেব।"
মামলার পূর্বাপর
প্রাচীন পিলারের ব্যবসার প্রলোভন দেখিয়ে, ‘কুফরি-কালাম, শয়তানের নি:শ্বাসের’ মাধ্যমে এক ব্যবসায়ী ও প্রবাসীর কাছ থেকে ‘প্রতারণামূলকভাবে’ ২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে একটি চক্রের বিরুদ্ধে এ মামলা চলছে।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, ভয়-ভীতি দেখিয়ে চক্রটি ১৪-১৬ কোটি টাকার জমিও লিখে নিয়েছে। এ ঘটনায় আজিজুল আলম নামের ওই ব্যবসায়ী উত্তরা পূর্ব থানায় চক্রের ২৪ সদস্যের নামে মামলা করেন।
মামলার পর শাখাওয়াত হোসেন শিমুল, নাজমুল হাসান, এ আর রহমান ও আবু ইবনে বিন আব্বাস ওরফে তুষারকে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এদের মধ্যে শিমুল ও নাজমুল জামিন পেয়েছেন।
আজিজুল মামলায় অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি তার বন্ধু মনিরের মাধ্যমে মিজান তার কাছে যায়। তার বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে কি না জানতে চায়। আজিজুল জানান, আছে। পরে মাজহারুল ইসলাম সোহেল ফকির, নাজমুল হাসান ও কামাল তার অফিসে গিয়ে জানায়, প্রাচীন পিলার বিদেশে বিক্রি করে বিদেশি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ‘বিলিয়ন বিলিয়ন’ টাকা আনবে। যার অর্ধেক আজিজুলকে দেবে।
“সোহেলের সুন্নতি লেবাস ও চটকদার কথাবার্তায় আজিজুল বিশ্বাস অর্জন করেন। এরপর থেকে তার কারসাজি শুরু হয়। বিশ্বাস অর্জনের পর তাকে বিভিন্ন কুফরি কালাম ও শয়তানের নিঃশ্বাস ব্যবহার করে হিপনোটাইজ করে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেয়। এরপর তারা কোটি কোটি টাকা, স্বর্ণালংকার, জায়গা-জমি হাতিয়ে নেওয়া শুরু করে।
“তাদের কাছে অলৌকিক ও জ্বিনের মাধ্যমে মূল্যবান প্রাচীন পিলার ম্যাগনেট এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে আসতে পারে বলে জানায়। এরপর তারা তার অফিসে মাঝে মধ্যে যাতায়াত শুরু করে এবং তাকে বিভিন্ন ধরনের খাবার ও মিষ্টি খাওয়ায়। খাবার খাওয়ার পর থেকে তার মাথায় কাজ করছিল না। আজিজুল তাদের অনুগত হয়ে যান। তারা যা বলে তারা তাই করে।”
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, “কিছুদিন পর আবার জ্বিনের মা পরিচয়ে এক নারী তাকে বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন দেয়। তারপর থেকে নাজমুল ও সোহেল এবং অন্যদের মাধ্যমে তার কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা নিতে থাকে। বিভিন্ন তারিখ ও সময়ে তারা তার কাছ থেকে নগদ কয়েক কোটি টাকা প্রতারণা করে হাতিয়ে নেয়।
“পরবর্তীতে জ্বীনের বাদশা (রাসেল) তাকে ফোন করে বলে সোহেল ও নাজমুলকে পাঠিয়েছে। তাদের কাছে ৫ কোটি টাকা দিয়ে দে। যদি না দিস তাহলে তোর ক্ষতি হবে। এভাবে ২০২৫ সালের ১৫ মে পর্যন্ত তারা বিভিন্ন সময় ২০ কোটি পাঁচ লাখ টাকা প্রতারণা করে নিয়ে নেয়।”
এছাড়া তার উত্তরখান এলাকা ১৪-১৬ কোটি টাকার ২৭ দশমিত ১৫ কাঠা জমি লিখে নেয় বলে অভিযোগ করেন বাদী।
ছবি : সংগৃহীত
প্রিজনভ্যান থেকেই আদালত বিল্ডিংয়ে প্রবেশের আগেই মাথায় পরানো হেলমেট ছুড়ে ফেলে দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান।
আজ শনিবার ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে প্রিজনভ্যান থেকে নামানোর সময় হেলমেট ছুড়ে ফেলার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। আখতারুজ্জামানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এক দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আজ ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীর এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এদিন দুপুরে আখতারুজ্জামানকে আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার উপ-পরিদর্শক মাজেদুল ইসলাম। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিলসহ জামিনের আবেদন করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক তার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মকর্তাকে হুমকির ঘটনায় দায়ের করা মামলায় শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্টের ডিওএইচএসের বাসা থেকে আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।
গত ১ অক্টোবর বিমানবন্দরে অব্যবস্থাপনা, লাগেজ ট্রলির সংকট, লাগেজ পেতে বিলম্ব এবং জমজমের পানি না আসাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা শুরু হয়, যা পরবর্তীতে হুমকি-ধামকির পর্যায়ে পৌঁছায়।
এরপর বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে হেনস্তার অভিযোগে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের নামে মামলা দায়ের করা হয়।
হেলমেট ছুড়ে ফেললেন
প্রিজনভ্যান থেকেই আদালত বিল্ডিংয়ে প্রবেশের আগেই মাথায় পরানো হেলমেট ছুড়ে ফেলে দেন মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। আজ শনিবার দুপুরে একটি প্রিজনভ্যানে হাতকড়া পরিয়ে তাকে ঢাকার সিএমএম আদালতের সামনে আনা হয়।
এরপর কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাকে প্রিজনভ্যান থেকে নামিয়ে আদালতে নেওয়া হয়। প্রিজনভ্যান থেকে নামার আগেই দরজায় দাঁড়িয়েই মাথা থেকে হেলমেট খুলে ছুড়ে ফেলে দেন আখতারুজ্জামান। এ সময় তিনি বলেন, আমি হেলমেট মানি না। সরকারের অবৈধ অর্ডার মানি না।
আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়া গেছে—দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এমন ব্রিফিংয়ের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেছেন তিনি।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিটটি দায়ের করা হয়। বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর হাইকোর্ট বেঞ্চে রিটটির শুনানি হবে।
রিটে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে দুদক যেন কোনো প্রেস ব্রিফিং করে তার সম্মানহানি না করে—এ মর্মে নির্দেশনা দেয়া হোক। একই সঙ্গে আসিফ মাহমুদকে নিয়ে দুদকের প্রেস ব্রিফিংয়ে দেয়া বক্তব্য ভুল ছিল—এটি স্বীকার করার নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।
রিটের পর আসিফ মাহমুদের আইনজীবী জহিরুল ইসলাম মুসা সাংবাদিকদের বলেন, কোনো ধরনের তদন্ত শেষ না হওয়া বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার এমন বক্তব্যের কারণে তাকে ঘিরে ব্যাপক ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ শুরু হয়। এতে অভিযোগগুলো যেন আগেই প্রমাণিত—এমন ধারণা জনমনে তৈরি হয়েছে, যা তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে।
পরে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আখতারুল ইসলাম দুদক বিটের সাংবাদিকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বার্তা দিয়ে জানান, তার ওই বক্তব্য ভুলবশত দেওয়া হয়েছিল। সংবাদ প্রচারের সময় ‘প্রাথমিক সত্যতা’ কথাটি বাদ দেওয়ার জন্যও সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন তিনি।
তবে সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার বা সংশোধন করা হয়নি। রিটে দাবি করা হয়েছে, ফলে ওই বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া নেতিবাচক ধারণা ও ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ এখনো অব্যাহত রয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর বাড্ডা-রামপুরায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ রাষ্ট্রপক্ষের চতুর্থ সাক্ষী হানিফ মিয়ার জবানবন্দি গ্রহণের সময় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় আসামির কাঠগড়ায় থাকা সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা কামরুল ইসলাম প্রসিকিউটরের উদ্দেশে উচ্চস্বরে কথা বলেন।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেয়ার সময় হানিফ মিয়া বলেন, জুলাই আন্দোলনে কারফিউ চলাকালে বাড্ডা-রামপুরায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ১৪ দলের নেতারা দায়ী। টেলিভিশনে এসব নেতার বৈঠক করে আন্দোলনকারীদের দমন-পীড়নের সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা শুনেছেন বলেও জানান তিনি।
এ সময় প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সাক্ষীকে ১৪ দলের নেতাদের নাম বলতে বলেন। তখন আসামিদের জন্য সংরক্ষিত কাচের ঘেরের ভেতর থেকে কামরুল ইসলাম উচ্চস্বরে বলেন, ‘এভাবে বললে তো হবে না। আমার ৪০ বছরের ওকালতির ক্যারিয়ার। আপনি সাক্ষীকে দিয়ে জোর করে নাম বলাচ্ছেন।’
এ সময় কামরুল ইসলামকে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ বলেন, ‘আপনি এভাবে সাউট করেন কেন। আপনার কিছু বলার থাকলে আইনজীবীর মাধ্যমে বলবেন।’ তিনি আরও বলেন, আসামির কাঠগড়া থেকে এভাবে উচ্চস্বরে কথা বলা আদালতের প্রতি চরম অবমাননাকর।
পরে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘আমার মনে হয় জবানবন্দি গ্রহণে ভুল হয়নি। প্রসিকিউশনের একটাই টার্গেট, একটাই উত্তর চাই। সাক্ষী ১৪ দলের কথা বলায় তিনি নাম বলতে বলেছেন।’
এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী মুনসুরুল হক বলেন, ‘It is a matter of identification। আপনারা প্রশ্ন করে নাম বলাচ্ছেন।’ জবাবে মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘এটা লিডিং প্রশ্ন না।’
এরপর সাক্ষী আবার তার জবানবন্দি দেয়া শুরু করেন।
জবানবন্দি গ্রহণ শেষে কামরুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন বলেও সাংবাদিকদের জানান প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় করা মামলায় ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে চতুর্থ সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হচ্ছে। সোমবার সকালে কারাগার থেকে মেনন ও কামরুল ইসলামকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। চতুর্থ সাক্ষীর জবানবন্দি শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাকে জেরা করবেন।
গত ২৩ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে মামলাটির আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। ওইদিন রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করা হয়।
এদিকে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মিরপুর এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা ও মাইনুল ইসলাম নিখিলসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ একটি ফরমাল চার্জ দাখিল করেছে প্রসিকিউশন।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সালমান এফ রহমানের বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের বিষয়ে একটি আবেদনের শুনানির জন্য আজ ২৮ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য ছিল। তবে প্রসিকিউশন জানায়, চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম দেশের বাইরে থাকায় তারা আজ শুনানি করতে আগ্রহী নয়। পরে ট্রাইব্যুনাল মামলাটির শুনানি আগামী ২৬ অক্টোবর পুনর্নির্ধারণ করেন।
ছবি : সংগৃহীত
রাজধানীর গুলিস্তানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে আটক ২৭ জনের পক্ষে করা জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। আজ সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তার এ আদেশ দেন।
জামিন নামঞ্জুর হওয়া আসামিরা হলেন- মো. দিদারুল আলম তুহিন, ইমান আহমেদ ইমন, মোল্লা মো. শাহজাহান সিরাজ, জয় সরকার, মো. মিরাজ আহমেদ, মো. মিরাজ মালিখা, মো. রবিউল ইসলাম, মিলন কুমার মহন্ত, মো. কাউসার হোসেন, অঞ্জন শিল, জালাল উদ্দীন মন্ডল, আব্দুল লতিফ, শামীম আহমেদ, আহাম্মেদ আহসান হাবিব, মো. সুজন আলী, মো. তসিকুল ইসলাম, মো. সাইফুল্লাহ সায়েক, নয়ন আলী সাজিদুল ইসলাম তুহিন, তাজুল ইসলাম, নিস্কর সম্রাট হোসেন তালুকদার, আনোয়ার হোসেন, মো. আলমগীর হোসেন, মো. আল আমিন হাওলাদার, মো. তুষার আলী, মো. রাশিদুল হক ও মীর মুক্তিসুর রহমান।
রোববার রাতে তদন্ত কর্মকর্তা পল্টন মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. নাজমুল ইসলাম আসামিদের ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। একইদিন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জামিন আবেদন করেন। তবে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম জামিন শুনানির জন্য আজকের দিন ধার্য করে তাদের কারাগারে পাঠানের আদেশ দেন।
সে অনুযায়ী আজ আসামিপক্ষে আইনজীবীরা জামিন আবেদনের শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরোধিতা করে। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে আদেশ দেন। আটকদের বিরুদ্ধে জাসদ কার্যালয়ে ঢুকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে অস্থিতিশীল ও বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়েছে।
গাজী নজরুল ইসলাম
দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে করা মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে আবারও রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রিপন হোসেন তাঁর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
প্রথম দফার চার দিনের রিমান্ড শেষে আজ বৃহস্পতিবার গাজী নজরুল ইসলামকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের তেজগাঁও জোনাল টিমের ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই রফিকুল ইসলাম বলেন, সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছিল। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
বিকেল ৪টা ৪ মিনিটে ডিবির একটি সাদা গাড়িতে করে গাজী নজরুল ইসলামকে আদালতে আনা হয়। পরে তাঁকে হাজতখানায় রাখা হয় এবং বিচারকের সামনে হাজির করা হয়। শুনানির সময় তিনি আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।
আসামিপক্ষ রিমান্ড আবেদন বাতিল করে জামিনের আবেদন করে। তবে রাষ্ট্রপক্ষ এর বিরোধিতা করে। শুনানি শেষে বিকেল ৪টা ৪৭ মিনিটে আদেশ দেন বিচারক।
২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের বিপরীত দিকে ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই রাতে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। পরে মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং নিহতের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ।
পরদিন শেরেবাংলা নগর থানার এসআই মো. শামসুজ্জোহা সরকারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গাজী নজরুল ইসলামের চার দিন এবং মাকছুদা বেগমের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। ওই রাতেই মামলার তদন্তভার গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
রিমান্ড শেষে ২২ সেপ্টেম্বর মাকছুদা বেগমকে কারাগারে পাঠানো হয়। অন্যদিকে গাজী নজরুল ইসলামের চার দিনের রিমান্ড শেষে আজ বৃহস্পতিবার তাঁকে আবার আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করা হয়।
এ ছাড়া বুধবার মামলার তৃতীয় আসামি ওবায়দুর রহমানকে ঢাকার বাইরে থেকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-২। পরে তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও দেবাশীষ রায়
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী হাইকোর্ট বিভাগে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।
আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট উভয় বিভাগের বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রির কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার জেনারেল আশিকুল খবির শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।
সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলামের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আজ বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল আলমগীর ২১ সেপ্টেম্বর দেবাশীষ রায় চৌধুরীকে হাইকোর্টের (স্থায়ী) বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন।
২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান দেবাশীষ রায় চৌধুরী। একই সময়ে নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন অতিরিক্ত বিচারপতিকে ২০২৫ সালের নভেম্বরে স্থায়ী করা হলেও তাঁকে তখন স্থায়ী করা হয়নি। সে সময় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানিয়েছিল, বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর বয়স ৪৫ বছর পূর্ণ না হওয়ায় তাঁকে স্থায়ী করা হয়নি। বয়সের শর্ত পূরণ হওয়ায় সোমবার তাঁকে হাই কোর্ট বিভাগে স্থায়ী করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার।
ব্রিটেন থেকে আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পর ২০০৫ সালে জেলা আদালতের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন দেবাশীষ রায় চৌধুরী। ২০০৭ সালে হাই কোর্ট বিভাগ এবং ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন তিনি।
বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর ছেলে। তাঁকে নিয়ে হাইকোর্ট বিভাগে স্থায়ী বিচারকের সংখ্যা হল ১০০ জন।