ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর হাজারীবাগের ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী মা ও তার সাত মাস বয়সী শিশুকে ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচিত ঘটনায় আপাতত শিশুটিকে মায়ের জিম্মায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত শুনানি শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী জজ মো. সায়েম খান।
তিনি বলেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সাত মাস বয়সী শিশুটি আপাতত তার মায়ের সঙ্গেই থাকবে। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শুনানির সময় কিশোরী মাকে ফেসবুক, টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আইন মেনে চলতে উভয় পক্ষকেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
লিগ্যাল এইড সূত্র জানায়, শিশুটির স্থায়ী অভিভাবকত্ব নিয়ে বাবার করা আবেদন বর্তমানে সংশ্লিষ্ট পারিবারিক আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। ফলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত লিগ্যাল এইড নয়, বরং পারিবারিক আদালতের রায়ের ভিত্তিতেই হবে।
সম্প্রতি হাজারীবাগের এই ১৩ বছর বয়সী কিশোরী ও তার সাত মাসের শিশুকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, টিকটকের মাধ্যমে পরিচয়ের পর কিশোরীকে ফুসলিয়ে নিয়ে নোটারির মাধ্যমে বিয়ে করা হয়। পরবর্তীতে তিনি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন এবং একপর্যায়ে তার সন্তানকে তার কাছ থেকে আলাদা করে রাখা হয়।
পরে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইডের সহায়তায় শিশুটিকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। শিশুর নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে লিগ্যাল এইডের উদ্যোগে এ শুনানির আয়োজন করা হয়। তবে শিশুটির স্থায়ী অভিভাবকত্ব নির্ধারণের বিষয়টি এখন সংশ্লিষ্ট পারিবারিক আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
যেভাবে আলোচনায় আসে ঘটনাটি
ঘটনাটি প্রথম আলোচনায় আসে গত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই)। সেদিন ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের নির্দেশে সাত মাস বয়সী শিশুটিকে তার কিশোরী মায়ের জিম্মায় দেওয়া হয়। শুনানির সময় লিগ্যাল এইড অফিসে শিশুটিকে কোলে নিয়ে বসে থাকা ১৩ বছর বয়সী মায়ের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
ভাইরাল সেই ১৩ বছরের মা, সামনে এল পুরো ঘটনা
পরিচয় থেকে সংসার
কিশোরীর পরিবারের দাবি, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় টিকটকের মাধ্যমে শাকিল মিয়া (২২) নামের এক যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয় ওই কিশোরীর। পরে তাকে বিভিন্ন সময় বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়।
কিশোরীর পরিবারের অভিযোগ, কোনো বৈধ কাবিন ছাড়া নোটারির মাধ্যমে বিয়ের ভুয়া কাগজ তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে সন্তান জন্মের কয়েক মাস পর শিশুটিকে রেখে কিশোরীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। নিজের সন্তানকে ফিরে পেতে চলতি বছরের ২০ মে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে আবেদন করে ওই কিশোরী।
আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ১৬ জুলাই উভয় পক্ষকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযুক্ত পক্ষ উপস্থিত না হওয়ায় চকবাজার থানাকে শিশুটিকে উদ্ধারের নির্দেশ দেন আদালত। পরে পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে।
গত ২৮ জুলাই ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে মানবিক দিক বিবেচনায় লিগ্যাল এইড অফিসার মো. সায়েম খান শিশুটিকে আপাতত তার কিশোরী মায়ের জিম্মায় রাখার নির্দেশ দেন। শুনানির সময় কোলে সন্তান নিয়ে বসে থাকা ১৩ বছর বয়সী ওই কিশোরী মায়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
বর্তমানে সাত মাস বয়সী শিশুটি লিগ্যাল এইডের নির্দেশে তার ১৩ বছর বয়সী মায়ের কাছে রয়েছে। তবে শিশুর স্থায়ী অভিভাবকত্ব, কথিত বিয়ের বৈধতা এবং কিশোরীর পরিবারের আনা অভিযোগ–এসব বিষয়ে পৃথক আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ফলে পুরো ঘটনার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখন আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
কিশোরীর বাবা জুয়েল খান বলেন, ওই ছেলে প্রথমবার মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার পর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছি। পরে মেয়েকে ফিরিয়ে আনলেও আবারও তাকে নিয়ে যায় সে।
‘আমাকে ফুসলিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল’
ওই কিশোরী বলেন, ‘আমার বয়স তখন মাত্র ১১ বছর। দুই মাসের পরিচয়ের পর শাকিল আমাকে নানা কথা বলে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। সে বলেছিল, দুই পরিবারের কেউ আমাদের সম্পর্ক মেনে নেবে না, তাই তার সঙ্গে চলে যেতে। এরপর কেরানীগঞ্জে নিয়ে গিয়ে কাজির মাধ্যমে ঘরোয়াভাবে বিয়ে হয়। পরে আদালতে গিয়ে জানতে পারি, নোটারির মাধ্যমে করা ওই কাগজের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। তখনই বুঝতে পারি, আমার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।’
এই কিশোরী বলেন, ‘শাকিল ও তার পরিবারের লোকজন আমার মা-বাবাকে বিভিন্ন সময় প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে। আমার বাবা গাড়ি চালাতেন। তাকেও রাস্তায় পেলে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হতো।’
কিশোরীর অভিযোগ, ‘শাকিলের বাসায় যাওয়ার পর কোনো ভরণপোষণ দেওয়া হতো না। একটি ছোট ঘরে কয়েকটি পরিবার একসঙ্গে থাকত। সেখানে আমার ওপর নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। এমনকি একাধিকবার আমাকে হত্যাচেষ্টাও করা হয়েছে। বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে।’
ওই কিশোরী আরও বলে, ‘আমার সন্তান জন্মের কয়েক মাস পর সন্তান রেখে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আমি আমার সন্তান ফিরে পাই। আদালতে যখন আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল শিশুটি আমার কি না, তখন আমি বলেছি, হ্যাঁ, এটা আমার। এরপর জানতে চাওয়া হয়েছিল, সন্তানকে ফিরে পেয়ে আমি খুশি কি না। আমি বলেছি, আমি অনেক খুশি।’
ওই কিশোরী বলেন, ‘আমি চাই আমার সন্তান আমার কাছেই থাকুক। আর আমার সঙ্গে যা করা হয়েছে, তার সুষ্ঠু বিচার হোক। যারা আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং নির্যাতন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
নির্যাতন, হুমকি ও বিচার চাওয়ার কথা বললেন কিশোরীর বাবা
কিশোরীর বাবা বলেন, ‘আমার মেয়ে তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত। শাকিলের সঙ্গে ফোনে পরিচয়ের বিষয়টি জানার পর আমি তাদের বলেছিলাম আমার মেয়ে নাবালিকা। কোনোভাবেই বিয়ে দেব না। সে অন্তত এসএসসি পরীক্ষা শেষ করুক, এরপর বসে কথা বলা যাবে। তারা তখন বিষয়টি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিলেও কিছুদিন পর আমার অজান্তে মেয়েকে ফুসলিয়ে নিয়ে যায়।’
তিনি বলেন, মেয়েকে না পেয়ে থানায় জিডি করি। কয়েক দিন পর মেয়েকে ফিরে পেলেও আবার শুটিং স্পট দেখানোর কথা বলে নিয়ে গিয়ে নোটারির মাধ্যমে কথিত বিয়ে করানো হয়। এসব বিষয়ে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি।
তার ভাষ্য, মেয়ের গর্ভধারণের বিষয়টি আমরা পরে জানতে পারি। এরপর চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। সন্তান জন্মের কয়েক মাস পর আমার মেয়ের কাছ থেকে শিশুটিকেও আলাদা করে দেওয়া হয়। মেয়েকে মারধর ও নির্যাতন করা হয়েছে, ঠিকমতো খেতে দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, আমার নাবালিকা মেয়ের সঙ্গে যা হয়েছে তার সুষ্ঠু বিচার চাই। যারা তার জীবন নষ্ট করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। একই সঙ্গে আমার নাতির ভবিষ্যৎ ও ভরণপোষণের বিষয়েও আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি।
স্বামী শাকিলের দাবি
ওই কিশোরীর স্বামী শাকিল মিয়া অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, বিয়ের সময় মেয়েটির বয়স ২০ বছর উল্লেখ ছিল এবং তিনি স্বেচ্ছায় এসেছিলেন। তিন মাস আগে সে (তার স্ত্রী) বাবার অসুস্থতার কথা বলে সন্তান তার কাছেই রেখে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় সন্তানের কোনো খোঁজ নেয়নি।
শাকিল মিয়া জানান, মেয়েটির বাবা যে জন্মসনদ তাকে দেখিয়েছিলেন সেখানে বয়স ২০ বছর উল্লেখ ছিল। কিন্তু মামলা হওয়ার পর আদালতে গিয়ে তিনি আরেকটি কাগজে মেয়েটির বয়স ১৩ বছর দেখতে পান।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে শাকিল বলেন, ‘ওই কিশোরী তখন জানিয়েছিল তার বাবা তার জোর করে অন্যত্র বিয়ে ঠিক করেছে। তখন অনুরোধ করেছিল যদি তাকে নিয়ে না যাই তাহলে সে আত্মহত্যা করবে।
অভিভাবকত্ব নিয়ে আদালতে মামলা
শিশুটির স্থায়ী অভিভাবকত্ব চেয়ে ঢাকার পারিবারিক আদালতে মামলা করেন শাকিল মিয়া। অন্যদিকে কিশোরীর পরিবার বলছে, শিশুটিকে মায়ের কাছ থেকে আলাদা করতেই এ মামলা করা হয়েছে। বর্তমানে শিশুটি মায়ের জিম্মায় থাকলেও চূড়ান্তভাবে কার হেফাজতে থাকবে, সে বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে উভয় পক্ষ।
ধর্ষণের অভিযোগে নতুন আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি
কিশোরীর পরিবার পুরো ঘটনাকে ধর্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের দাবি– নাবালিকা এই মেয়েকে ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়ে সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য করা হয়েছে।
কিশোরীর আইনজীবী মৃণাল কান্তি মিত্র জানিয়েছেন, নাবালিকার সঙ্গে সংঘটিত ঘটনাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় বিচারযোগ্য। তিনি অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন।
বিয়ের বয়স নিয়ে কী বলছে আইন
দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, নারীদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। নির্ধারিত বয়সের আগে সম্পন্ন হওয়া বিয়ে বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য হয় এবং তা আইনসম্মত নয়। আইন অনুযায়ী, উভয় পক্ষের স্বাধীন ও স্বেচ্ছায় সম্মতি ছাড়া কোনো বিয়ে বৈধ হতে পারে না। জোরপূর্বক আদায় করা সম্মতির ভিত্তিতে সম্পন্ন বিয়েও আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
ঢাকা মহানগর আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুব বলেন, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নারীদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। এর কম বয়সে সম্পন্ন হওয়া বিয়ে বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য হয় এবং এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু বয়সের শর্ত পূরণ হলেই বিয়ে বৈধ হয় না; উভয় পক্ষের স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাধীন সম্মতিও আইনের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। জোরপূর্বক, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বা প্রতারণার মাধ্যমে আদায় করা সম্মতির ভিত্তিতে সম্পন্ন কোনো বিয়ে আইনি সুরক্ষা পায় না। যদি কোনো নাবালিকাকে প্রলোভন দেখিয়ে, অপহরণ করে বা জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে পরিস্থিতি অনুযায়ী বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, দণ্ডবিধি বা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আইনে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এমন ঘটনায় ভুক্তভোগীর সর্বোত্তম স্বার্থ, নিরাপত্তা ও অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
নোটারির মাধ্যমে বিয়ে কি বৈধ?
আইনজীবীদের মতে, নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে করা কোনো অ্যাফিডেভিট মুসলিম বিয়ের বৈধ বিকল্প নয়। মুসলিম বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ (নিবন্ধন) আইন অনুযায়ী, নিবন্ধিত কাজি বা নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে কাবিন সম্পন্ন হলেই কেবল সেই বিয়ে আইনগত স্বীকৃতি পায়।
কোর্টের আইনজীবীদের ভাষ্য, নোটারির মাধ্যমে করা তথাকথিত বিয়ের ভিত্তিতে স্বামী-স্ত্রীর কোনো আইনি অধিকার–যেমন দেনমোহর, খোরপোশ বা উত্তরাধিকার দাবি করা যায় না। বয়স গোপন করে এ ধরনের অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে বাল্যবিবাহের চেষ্টা করলে সেটিও দণ্ডনীয় অপরাধ হতে পারে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুব বলেন, দেশের প্রচলিত আইনে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে করা কোনো অ্যাফিডেভিট বা ঘোষণাপত্র মুসলিম বিবাহের আইনগত বিকল্প নয়। মুসলিম বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ (নিবন্ধন) আইন অনুযায়ী, নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজির মাধ্যমে কাবিন নিবন্ধন সম্পন্ন হলেই কেবল সেই বিয়ে আইনগত স্বীকৃতি পায়।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে বয়স গোপন করে বা ভুল তথ্য দিয়ে নোটারির মাধ্যমে তথাকথিত বিয়ের দলিল তৈরি করা হয়। কিন্তু এ ধরনের দলিল কোনোভাবেই বৈধ বিয়ের প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয় না এবং এর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। ফলে দেনমোহর, ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার বা বৈবাহিক অধিকারসংক্রান্ত বিরোধে এমন অ্যাফিডেভিটের ভিত্তিতে দাবি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, যদি কোনো নাবালিকার বয়স গোপন করে নোটারির মাধ্যমে বিয়ের চেষ্টা করা হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রকৃতি অনুযায়ী বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনসহ অন্যান্য প্রযোজ্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই বিয়ে অবশ্যই আইনসম্মত প্রক্রিয়ায়, নিবন্ধিত কাজির মাধ্যমে এবং প্রকৃত বয়স ও পরিচয় যাচাই করে সম্পন্ন করা উচিত।
১৬ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে আইনের অবস্থান
২০২৬ সালে সংশোধিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বলা হয়েছে, ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর সঙ্গে তার সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে।
আইনজীবীদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে এবং আপসের সুযোগও অত্যন্ত সীমিত।
বিষয়টি সম্পর্কে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুব বলেন, ২০২৬ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আনা সংশোধনের ফলে ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর ক্ষেত্রে আইনের সুরক্ষা আরও জোরদার হয়েছে।
তিনি বলেন, সংশোধিত আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর সঙ্গে তার সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে। ফলে এ ধরনের মামলায় ভুক্তভোগীর সম্মতির প্রশ্নটি আইনি দায় নির্ধারণে প্রাধান্য পায় না; মূল বিষয় হলো ভুক্তভোগীর বয়স এবং ঘটনার প্রমাণ।
এখন কী হবে
বর্তমানে সাত মাস বয়সী শিশুটি লিগ্যাল এইডের নির্দেশে তার ১৩ বছর বয়সী মায়ের কাছে রয়েছে। তবে শিশুর স্থায়ী অভিভাবকত্ব, কথিত বিয়ের বৈধতা এবং কিশোরীর পরিবারের আনা অভিযোগ–এসব বিষয়ে পৃথক আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ফলে পুরো ঘটনার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখন আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুবের মতে, বর্তমানে শিশুটিকে মায়ের জিম্মায় দেওয়া হলেও এটি চূড়ান্ত অভিভাবকত্বের সিদ্ধান্ত নয়।
তিনি বলেন, লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে দেওয়া এমন ব্যবস্থা সাধারণত তাৎক্ষণিক সুরক্ষা ও শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া হয়। অন্যদিকে শিশুর অভিভাবকত্ব, কথিত বিয়ের বৈধতা, নাবালিকার বয়স এবং সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি অভিযোগ–এসব বিষয় পৃথক আইনি কাঠামোর আওতায় বিচার হবে। যদি আদালতে প্রমাণিত হয় যে কিশোরী নাবালিকা ছিল এবং বয়স গোপন করে বা বেআইনি উপায়ে বিয়ের চেষ্টা করা হয়েছে, তাহলে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে পারিবারিক আদালত শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে স্থায়ী হেফাজত বা অভিভাবকত্বের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।
তিনি আরও বলেন, একটি মামলার ফলাফল অন্য মামলার ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হয় না। তাই ফৌজদারি অভিযোগ, বিয়ের বৈধতা এবং শিশুর হেফাজত–প্রতিটি বিষয় আদালত আলাদাভাবে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করবেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
২০২৪ সালের জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া পলাতক সাত আসামির মধ্যে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনান ছাড়া অন্যদের অর্ধেক সম্পদ জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।পাশাপাশি তাদের সম্পদ জুলাই আন্দোলনে আহত ও নিহতদের পরিবারকে দিতে বলা হয়েছে। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল আজ মঙ্গলবার রায় ঘোষণার সময় এই আদেশ দেন।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অপর আসামিরা হলেন- কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল। এই মামলার সব আসামি পলাতক রয়েছেন।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-২ আজ মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মঙ্গলবার রায় ঘোষণার পর এক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমাদের রুলস অ্যান্ড স্ট্যাটিউটসে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত করার বিধান আছে। এবারই প্রথম ট্রাইব্যুনাল তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করেছে। সেই ৫০ শতাংশ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই ফাউন্ডেশন বা বিধিবদ্ধ কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শহীদ ও আহতদের মধ্যে বিলি বণ্টনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট এবং মনে করি, এটি একটি প্রত্যাশিত রায় হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আজকে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, ২৫ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। এই শহীদ ও আহতদের প্রতি আজ ন্যায়বিচার করা হয়েছে বলে আমরা মনে করি।’
ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাদ্দাম হোসেন ও শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির সাত নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-২ আজ মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অপর আসামিরা হলেন- কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। এই মামলার সব আসামি পলাতক রয়েছেন।
আগের দিন সোমবার রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে এ মামলায় আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত চেয়েছেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। অপরদিকে ওবায়দুল কাদেরসহ পলাতক সাত আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত দুই আইনজীবী হাসান ইমাম ও ইসরাত জাহান অনি আসামিদের এ মামলা থেকে অব্যাহতি চেয়েছেন।
এ বছরের জানুয়ারিতে শীর্ষস্থানীয় এই সাত নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ আসামিদের অব্যাহতি আবেদন নাকচ করে চার্জ গঠন করেন। একইসঙ্গে মামলার সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ১৭ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন। ওই অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
গত ১৮ জানুয়ারি প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ওই দিন প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। শুনানিতে তারা আসামিদের ব্যক্তিগত দায় তুলে ধরেন এবং ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে আনা তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পড়ে শোনান।
অন্যদিকে পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী লোকমান হাওলাদার ও ইশরাত জাহান শুনানি করেন। শুনানিতে তারা দাবি করেন, তাদের মক্কেলদের সঙ্গে এসব অভিযোগের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। যথাযথ তথ্যপ্রমাণ না থাকায় তারা আসামিদের অব্যাহতি দিয়ে অভিযোগ গঠন না করার আবেদন জানান।
এর আগে গত ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশন আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করলে ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নেন। পরোয়ানা জারির পর গত ২৯ ডিসেম্বর আসামিদের গ্রেপ্তার করে ট্রাইব্যুনালে আনার কথা থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের কোনো ঠিকানায় খুঁজে পায়নি। এরপর ৩০ ডিসেম্বর তাদের হাজির হতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়।
ছবি : সংগৃহীত
জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির শীর্ষস্থানীয় সাত নেতার বিরুদ্ধে করা মামলার রায় ঘোষণা করা হবে মঙ্গলবার।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-২ আজ সোমবার এই তারিখ ঠিক করেন। ট্রাইবুনালের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন।
আজ রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত চেয়েছেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। অপরদিকে ওবায়দুল কাদেরসহ পলাতক সাত আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত দুই আইনজীবী হাসান ইমাম ও ইসরাত জাহান অনি আসামিদের এ মামলা থেকে অব্যাহতি চেয়েছেন। ১৭ আগস্ট উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়েছিল।
মামলার অপর আসামিরা হলেন- কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। এই মামলার সব আসামি পলাতক রয়েছেন।
হাইকোর্ট
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১১ হাজার ১৩৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। একই সময়ে নতুন মামলা দায়ের হয়েছে ৯ হাজার ১৩৯টি। ফলে এ সময়ে দায়েরকৃত মামলার তুলনায় ১ হাজার ৯৯৭টি মামলা বেশি নিষ্পত্তি হয়েছে। আজ রোববার সুপ্রিম কোর্ট থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়, মামলা দায়ের ও নিষ্পত্তির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১, ২০২২, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আপিল বিভাগে মোট মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে যথাক্রমে ৬ হাজার ৮৫৯টি, ৫ হাজার ৪০৬টি, ৫ হাজার ৩৪৯টি, ৫ হাজার ৩১২টি ও ৭ হাজার ৫৫৩টি। অর্থাৎ এ পাঁচ বছরে গড়ে বছরে প্রায় ৬ হাজার ৯৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর বিপরীতে, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই ১১ হাজার ১৩৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। একই সময়ে মামলা দায়েরের পরিসংখ্যানেও উল্লেযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আপিল বিভাগে নতুন মামলা দায়ের হয়েছিল যথাক্রমে ৭ হাজার ৮০৬টি, ২৯ হাজার ১৬২টি, ১১ হাজার ৯৩৮টি, ২৯ হাজার ৯১৫টি এবং ১৭ হাজার ৯৮৪টি। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে নতুন মামলা দায়ের হয়েছে ৯ হাজার ১৩৯টি।
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মামলা নিষ্পত্তির ধারাবাহিকতা স্পষ্ট। জানুয়ারি মাসে ২০ কর্মদিবসে ২ হাজার ৭০৫টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ১৮ কর্মদিবসে ২ হাজার ৭২৪টি, মার্চ মাসে ১০ কর্মদিবসে ১ হাজার ১০৭টি এবং এপ্রিল মাসে ১ হাজার ৩২১টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এছাড়া মে মাসে ১৫ কর্মদিবসে ৬৩৮টি, জুন মাসে ১৮ কর্মদিবসে ১ হাজার ৩২১টি, জুলাই মাসে ২২ কর্মদিবসে ৬৮৭টি এবং আগস্ট মাসে ১৯ কর্মদিবসে ৬৩৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। উল্লিখিত আট মাসে আপিল বিভাগে মোট ১৩২ কর্মদিবসে ১১ হাজার ১৩৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৪১ হাজার ৫৫১টি। প্রথম আট মাসে দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তি বেশি হওয়ায় ৩১ আগস্ট শেষে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ৫৫৪টিতে।
হাইকোর্ট বিভাগে ৮ মাসে নিষ্পত্তি ৮৭ হাজারের বেশি
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) মোট ৮৭ হাজার ৫৯৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার ৯৫০টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে যা চলতি বছরে মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এবং বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত বিচারপ্রাপ্তি ও মামলা জট নিরসনে উল্লেখযোগ্য গতিশীলতার প্রতিফলন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত ৭ হাজার ৭৩৯টি, ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ২৭ হাজার ৫৬০টি, শুধু জুলাই মাসে ৩২ হাজার ২১১টি এবং শুধু আগস্ট মাসে ২০ হাজার ৮৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। অর্থাৎ, বছরের দ্বিতীয় কোয়ার্টার থেকে মামলা নিষ্পত্তির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে মামলা দায়ের হয়েছে যথাক্রমে ২২ হাজার ৯৯৯টি, ২৭ হাজার ৮০৩টি, ১০ হাজার ২৩২টি এবং ১৩ হাজার ৫৭৩টি।
মামলা দায়ের ও নিষ্পত্তির পরিসংখ্যান অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে ২০২১ সালে ২৩ হাজার ৬৫৪টি, ২০২২ সালে ৮৭ হাজার ৪৭৪টি, ২০২৩ সালে ৭৪ হাজার ২৭৮টি, ২০২৪ সালে ৩৮ হাজার ২৯৭টি এবং ২০২৫ সালে ৫৫ হাজার ৭৫৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছিল। অর্থাৎ, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসের (জানুয়ারি-আগস্ট) নিষ্পত্তি করা মামলার সংখ্যা বিগত পাঁচ বছরের যেকোনো পূর্ণ বছরের নিষ্পত্তি করা মামলার তুলনায় বেশি। বিশেষ করে, ২০২৫ সালের পুরো বছরে নিষ্পত্তি হওয়া ৫৫ হাজার ৭৫৬টি মামলার তুলনায় এ সংখ্যা এখন পর্যন্ত ৩১ হাজার ৮৪০টি বেশি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৫৯ হাজার ২৫৬টি। প্রথম আট মাসে দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তি বেশি হওয়ায় ৩১ আগস্ট শেষে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ২৭৬ টিতে। অর্থাৎ বছরের প্রথম আট মাসে বিচারাধীন মামলা কমেছে ১২ হাজার ৯৮০টি।
ডেথ রেফারেন্স মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে বিশেষ বেঞ্চ
হাইকোর্ট বিভাগে নিয়মিত মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) সংক্রান্ত বেঞ্চের পাশাপাশি নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) এবং সংশ্লিষ্ট আপীলগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে হাইকোর্ট বিভাগে একটি বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে।
চলতি বছরের জুন মাসে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী এই বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেন। বিশেষ বেঞ্চ গঠনের পর এ পর্যন্ত ২২টি ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত এবং দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন গুরুতর ফৌজদারি মামলাগুলো নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
হাইকোর্ট
আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের হরতাল বা ধর্মঘট কর্মসূচি ডাকাকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ ধরনের কোন ধর্মঘট বা হরতাল ডাকলে বাস মালিক সমিতি, শ্রমিক সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ সংক্রান্ত আগের জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকার ও বিচারপতি ফয়সাল হাসান আরিফ সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ রোববার এ রায় দেন। আদালতে আবেদনের পক্ষে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের জৈষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসদ। তার সঙ্গে ছিলেন অ্যাডভোকেট সঞ্জয় মন্ডল ও অ্যাডভোকেট রিপন বাড়ৈ।
রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আহসান হাবীব, বিআরটিসির পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট আসিবুল হক ও বিআরটিএর পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মো. রাফিউল ইসলাম।
২০১১ সালের আগস্ট মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় ডিলাক্স পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে একটি গাড়ির আরোহী তারেক মাসুদ মিশুক মনির সহ পাঁচজন নিহত হয়। ওই নিহতের ঘটনায় বাসচালকের বিরুদ্ধে মামলা হলে ২০১৭ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত ড্রাইভারকে সাজা দেন।
ওই সাজার প্রেক্ষিতে বাস মালিকরা পরিবহন ধর্মঘট ও হরতাল বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে জনস্বার্থে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ একটি রিট করে।
ওই রিট শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ১ মার্চ রুল জারি করে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ধর্মঘট বা হরতাল আহ্বান কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চান ।
আজ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ সাংবাদিকদের বলেন, আদালতে শুনানি শেষে আজ রুল মঞ্জুর করে রায় দেন এবং স্বরাষ্ট্র সচিব, বিআরটিএ, বিআরটিসিকে নির্দেশনা দেন যে আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে ধর্মঘট বা হরতাল ডাকলে আইনগত ব্যবস্থা এবং ফৌজদারি আইনের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
আদালত রায়ে বলেন, সংবিধানের ১১২ অনুসারে আদালতের রায় সবার জন্য বাধ্যতামূলক কিন্তু রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ থাকলেও রায়ের বিরুদ্ধে হরতাল বা ধর্মঘট আহ্বান করা অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থি।
ছবি : সংগৃহীত
আওয়ামী লীগের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট যথাযথভাবে উত্থাপিত হয়নি মর্মে খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। রোববার বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভূঁইয়া সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
গত ৭ সেপ্টেম্বর মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের বাসিন্দা মো. আল আমিন এ রিট দায়ের করেন। রিটের পক্ষে আইনজীবী ইউনূস আলী।
রিট আবেদনে ২০২৫ সালের ১২ মে জারি করা প্রজ্ঞাপন কেন আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, এ বিষয়ে রুল চাওয়া হয়। রুল হলে তা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় ১২ মের প্রজ্ঞাপনটির কার্যক্রম স্থগিত চাওয়া হয়।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে গত বছরের ১২ মে ওই প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের যেকোনো ধরনের প্রকাশনা, গণমাধ্যম, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো ধরনের প্রচারণা, মিছিল, সভা-সমাবেশ, সম্মেলন আয়োজনসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো।