ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের মানুষ গত প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে নাটকীয় সূর্যগ্রহণ উপভোগ করেছেন। বিরল ও অনন্য এ মহাজাগতিক ঘটনা কোটি কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ করেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের প্রত্যক্ষদর্শীরা একটি আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ পান। দেশটির স্থানীয় সময় অনুযায়ী গতকাল বুধবার সন্ধ্যা সাতটার কিছু পর এ গ্রহণ চূড়ান্ত রূপ নেয়। এমন পরিস্থিতিতে বেশির ভাগ এলাকা থেকেই দেখা যায়, সূর্যের ৯০ শতাংশের বেশি অংশ চাঁদের আড়ালে ঢাকা পড়েছে।
তবে গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও স্পেনের কিছু অংশে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। এসব অঞ্চলের মানুষ পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সাক্ষী হন। ফলে সেখানে নেমে আসে অনেকটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে সমবেত বিশাল জনতা সূর্যগ্রহণের দৃশ্য দেখে বিস্ময় ও উল্লাসে ফেটে পড়ে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানপ্রেমীদের মতে, মহাবিশ্ব যে কতটা ‘বিস্ময়কর’, এ ঘটনা তা আরও একবার মনে করিয়ে দিল।
এ পূর্ণ সূর্যগ্রহণের পথটি শুরু হয়েছিল রাশিয়ার সাইবেরিয়ার উত্তর প্রান্ত থেকে। ভীষণ দুর্গম ও নির্জন এলাকা হওয়ায় সেখানে মানুষের আনাগোনা যেমন ছিল না, তেমনি ছিল না বিজ্ঞানীদের টেলিস্কোপ দিয়ে তা পর্যবেক্ষণের সুযোগ।
তবে দ্রুতই সূর্যগ্রহণের পথ উত্তর মহাসাগর দিয়ে ঘুরে সন্ধ্যার শুরুতে আইসল্যান্ডে পৌঁছায়। এরপর দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হওয়ার ফলে যুক্তরাজ্যের মানুষও মহাজাগতিক এ বিস্ময়ের আংশিক রূপ দেখার সুযোগ পায়।
উত্তর স্কটল্যান্ডে যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সময় অনুযায়ী সন্ধ্যা প্রায় ছয়টার দিকে এ আংশিক সূর্যগ্রহণ শুরু হয়। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে এটি দেখা যায় সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের কিছু আগে।
সূর্যগ্রহণের শুরুর দিকে বিষয়টি একেবারেই টের পাওয়া যায়নি। তবে যেসব এলাকার আকাশ মেঘমুক্ত ছিল, সেখানকার মানুষ ধীরে ধীরে চাঁদের আড়ালে সূর্যের একাংশ ঢাকা পড়ার দৃশ্যটি লক্ষ করেন।
মধ্য ও দক্ষিণ ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের বেশির ভাগ এলাকার আকাশ ছিল চমৎকার পরিষ্কার। ফলে সেখানকার বাসিন্দারা টানা এক ঘণ্টা ধরে সূর্যের ওপর দিয়ে চাঁদের ধীরগতিতে এগিয়ে যাওয়ার এক অতুলনীয় দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ পান।
উত্তর ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের আকাশ তুলনামূলক মেঘাচ্ছন্ন ছিল। তবে তা সত্ত্বেও বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানগুলোতে সাধারণ মানুষের ঢল নামানো ঠেকানো যায়নি।
কেউ কেউ আগেভাগেই বিশেষ সূর্যগ্রহণ চশমা সংগ্রহ করেছিলেন। তবে মহাজাগতিক ঘটনাটির ঠিক আগের দিনগুলোতে চোখের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি এই চশমার বেশ সংকট দেখা দেয়। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যে চশমা বিক্রির দোকান, হার্ডওয়্যারসামগ্রীর দোকান, এমনকি বেকারিতে রাখা চশমাগুলোও নিমেষে শেষ হয়ে যায়।
অবশ্য এ চশমা-সংকট মানুষকে ঘরে আটকে রাখতে পারেনি। সূর্যগ্রহণ নিরাপদে দেখার জন্য অনেকেই রান্নাঘরের ঝাঁজরি, কর্নফ্লেক্সের খালি বাক্স ও বিশেষ ধরনের কাগজের টুকরা ব্যবহার করেন।
মূলত চাঁদ যখন সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে চলে আসে, তখনই সূর্যগ্রহণ ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে চাঁদ সূর্যের আলো আংশিক বা পুরোপুরি আটকে দেয়। ফলে আমাদের গ্রহের ওপর সাময়িকভাবে ছায়া পড়ে।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে চাঁদ খুব ধীরে অথচ নিশ্চিতভাবে সূর্যের আরও বেশি অংশ ঢেকে দিতে থাকে। এ সময় পুরো প্রক্রিয়া দেখতে অনেকটা লাইটের আলো কমিয়ে দেওয়া রেগুলেটর বা ডিমার সুইচের মতো কাজ করে।
যুক্তরাজ্য থেকে দেখার সময় সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী পুরোপুরি সরলরেখায় ছিল না। এর ফলে সেখানে আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যায়। দেশটির বেশির ভাগ এলাকা থেকেই চাঁদের ছায়ায় সূর্যের প্রায় ৯০ শতাংশ ঢাকা পড়ার চিত্র চোখে পড়ে। ১৯৯৯ সালের পর এটিই দেশটির সবচেয়ে নাটকীয় সূর্যগ্রহণ। তবে কর্নওয়ালে সূর্য ঢাকা পড়ার এ হার ছিল আরও বেশি, প্রায় ৯৫ শতাংশ।
এদিকে স্পেনের কিছু অংশের মানুষ আরও বেশি জাদুকরি অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছেন। যুক্তরাজ্যের সময় অনুযায়ী সন্ধ্যা প্রায় সাড়ে সাতটায় (স্পেনের স্থানীয় সময় রাত সাড়ে আটটা) সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী একদম নিখুঁতভাবে এক সরলরেখায় চলে আসে। আর এতেই দেখা পাওয়া যায় পূর্ণ সূর্যগ্রহণের।
চিলির বিজ্ঞানী ইয়াসমিন কাত্রিচিও এ বিরল ঘটনাটি দেখতে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে উত্তর-পশ্চিম স্পেনের আ করুনা শহরে এসেছিলেন। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সেই মুহূর্তে সবাই উল্লাস করছিলেন এবং এই অসাধারণ দৃশ্যের উত্তেজনা একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছিলেন। সেই অনুভূতি আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’
মহাবিশ্ব সত্যিই বিস্ময়কর
সাধারণত পৃথিবীর কোথাও না কোথাও প্রতি ১৮ মাস বা দেড় বছর পরপর পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ঘটে। তবে নির্দিষ্ট কোনো একটি এলাকায় এটি অত্যন্ত বিরল ঘটনা। হিসাব অনুযায়ী, একই স্থানে সাধারণত প্রায় ৪০০ বছরে মাত্র একবার পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যায়।
স্পেনে পূর্ণ সূর্যগ্রহণের নির্দিষ্ট গতিপথে সমবেত হওয়া মানুষ সেই বিরল ঘটনারই সাক্ষী হয়েছেন। এ সময় চাঁদের পেছন থেকে উঁকি দেওয়া সূর্যের লালচে আভা দৃশ্যটিতে এক অনন্য মাত্রা যোগ করে।
প্রায় ঘুটঘুটে অন্ধকারের বুক চিরে বেরিয়ে আসা সেই আলো আসলে ছিল সূর্যের করোনা বা আলোকবলয়। এটি মূলত হাজার হাজার মাইল দূরের মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়া অত্যন্ত উত্তপ্ত গ্যাসের তীব্র প্রবাহ।
আর যাঁরা খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করছিলেন, তাঁরা হয়তো সূর্যের অশান্ত চৌম্বকক্ষেত্রের কারণে তৈরি হওয়া গ্যাসের ছোট ছোট গোলাপি বলয়ও দেখতে পেয়েছেন। বিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে বলা হয় প্রমিনেন্স বা সৌরশিখা। এর কিছুক্ষণ পরই অবশ্য চাঁদ তার আড়ালে লুকিয়ে রাখা সূর্যকে আবারও দৃশ্যমান করতে শুরু করে। এ পূর্ণ সূর্যগ্রহণ স্থায়ী হয়েছিল দুই মিনিটের কম। তবে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ উপভোগ করতে উপস্থিত হওয়া অনেকের জন্যই মুহূর্তটি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আমাদের এ পৃথিবীতে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ উপভোগ করতে পারার পুরো বিষয় আসলে এক অবিশ্বাস্য মহাজাগতিক কাকতালীয় ব্যাপার। সূর্য আমাদের পৃথিবী থেকে ১৫ কোটি কিলোমিটার (৯ কোটি ৩০ লাখ মাইল) দূরে অবস্থিত, যা পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্বের ঠিক ৪০০ গুণ বেশি। আবার কাকতালীয়ভাবে চাঁদের ব্যাসও সূর্যের ব্যাসের চেয়ে ঠিক ৪০০ গুণ ছোট।
আর এ নিখুঁত অনুপাতের কারণেই আমাদের আকাশ থেকে চাঁদ ও সূর্যকে একদম একই আকারের মনে হয়। চাঁদের আকার যদি সামান্য ছোট হতো কিংবা এর কক্ষপথ পৃথিবী থেকে আরেকটু দূরে থাকত, তবে আমরা মানবজাতি কখনোই পূর্ণ সূর্যগ্রহণের এ অনিন্দ্যসুন্দর দৃশ্য দেখতে পেতাম না।
বিজ্ঞানীদের মতে, আমরা খুব দ্রুতই, অর্থাৎ ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে পূর্ণ সূর্যগ্রহণের এক ‘স্বর্ণযুগে’ প্রবেশ করতে যাচ্ছি। ফলে সূর্যগ্রহণপ্রেমীরা কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে তিনটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার রোমাঞ্চকর সুযোগ পাবেন।
তবে এই সূর্যগ্রহণের কোনোটিই যুক্তরাজ্য থেকে দেখা যাবে না। ২০২৭ সালে দেশটি থেকে বড়জোর একটি আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যেতে পারে, যেখানে কিছু অঞ্চলে সূর্যের মাত্র ৪৫ শতাংশ ঢাকা পড়বে। এ পরিস্থিতিতে আজকের চেয়ে বড় বা পূর্ণাঙ্গ কোনো সূর্যগ্রহণ দেখতে যুক্তরাজ্যবাসীকে কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হবে।
হিসাব অনুযায়ী, ২০৮১ সালে যুক্তরাজ্যে এমন একটি সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে, যেখানে সূর্যের প্রায় ৯৯ শতাংশ অংশ ঢাকা পড়বে। আর যুক্তরাজ্যে পরবর্তী পূর্ণ সূর্যগ্রহণটি দেখা যাবে ২০৯০ সালে।
ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বে প্রথমবারের মতো সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের এক রোগীর মস্তিষ্কের টিউমার অপসারণ করেছেন চিকিৎসকেরা। চিকিৎসকেরা বলেছেন, এই অস্ত্রোপচার না করা হলে ওই ব্যক্তি দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারতেন। ৪৮ বছর বয়সী রিস হিবার্ট দুই সন্তানের বাবা। তিনি যুক্তরাজ্যের বেডফোর্ডশায়ারের বাসিন্দা। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন হাসপাতালের চিকিৎসকেরা সরাসরি এআইয়ের সহায়তায় তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করেন।
অস্ত্রোপচারের সময় এআইয়ের একটি ব্যবস্থা সরাসরি ভিডিও চিত্র বিশ্লেষণ করে চিকিৎসকদের সহায়তা করে। মস্তিষ্কের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বাইরে থেকে দেখা যায় না—এমন রক্তনালি ও স্নায়ুগুলোর সম্ভাব্য অবস্থান চিহ্নিত করে চিকিৎসকদের সতর্ক করে দেয় এআই–ব্যবস্থা। ফলে কোনো ঝুঁকি ছাড়াই টিউমারটি অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে।
হিবার্ট বলেন, ‘রোগীর নিরাপত্তার দিক থেকে এআইয়ের সহায়তার বড় সুবিধা রয়েছে। কারণ, আমাদের মাথার ভেতরে তো আর পথ চেনার কোনো দিকনির্দেশনা থাকে না।’
কাস্টমার সার্ভিস ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ৪৮ বছর বয়সী হিবার্ট ১৮ মাস আগেও সুস্থ ও কর্মক্ষম ছিলেন। প্রতিদিন দুপুরে তিনি প্রায় দুই মাইল হাঁটতেন। এমনই এক দুপুরে হাঁটার সময় রাস্তায় হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়ে যান তিনি এবং তাঁর খিঁচুনি শুরু হয়।
স্বাস্থ্য পরীক্ষায় হিবার্টের মস্তিষ্কে ১১ মিলিমিটার আকারের একটি টিউমার ধরা পড়ে। টিউমারটিতে ক্যানসারের ঝুঁকি ছিল না। এটি বেড়ে উঠেছিল পিটুইটারি গ্রন্থিতে। মস্তিষ্কের নিচের দিকে থাকা মার্বেলের মতো ছোট একটি গ্রন্থি পিটুইটারি। এটি শরীরের বৃদ্ধি, বিপাকক্রিয়া এবং রক্তচাপ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরি করে।
পিটুইটারি গ্রন্থির খুব কাছেই রয়েছে ক্যারোটিড ধমনি। মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী এই রক্তনালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর কাছেই রয়েছে দৃষ্টিশক্তি নিয়ন্ত্রণকারী অপটিক স্নায়ু।
হিবার্টের টিউমারটি বড় হতে থাকায় তাঁর অপটিক স্নায়ুর ওপর চাপ পড়তে শুরু করে। ফলে ধীরে ধীরে তাঁর দৃষ্টিশক্তি কমে যাচ্ছিল।
শুরুতে হিবার্টের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু পরে ঝাপসা দেখার কারণে তিনি হাঁটার সময় বিভিন্ন জিনিসে হোঁচট খেতে শুরু করেন। একই সঙ্গে প্রচণ্ড ক্লান্তি ও মাথা ঘোরার সমস্যাও দেখা দেয়।
হিবার্ট বলেন, ১৮ বছর ধরে দাম্পত্য জীবনে তিনি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে স্ত্রীর জন্য এক কাপ কফি বানাতেন। তিনি ঠিক করেছিলেন, এই টিউমার তাঁকে সেই কাজ থেকে বিরত রাখতে পারবে না।
অস্ত্রোপচারের আগে হিবার্টের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল মানসিক ও আবেগজনিত। তাঁর ভাষায়, অনেকে সাহায্যের প্রস্তাব দিলেও তিনি কারও ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চাননি।
চিকিৎসকেরা হিবার্টকে তাঁদের তৈরি এআই–ব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রথম রোগী হিসেবে অস্ত্রোপচারে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হন।
হিবার্ট বলেন, রোগীরা গবেষণায় অংশ নিতে প্রস্তুত না হলে চিকিৎসকেরা কীভাবে শিখবেন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি কীভাবে হবে?
অস্ত্রোপচারের সময় হিবার্টের নাক দিয়ে একটি সরু ক্যামেরা প্রবেশ করিয়ে খুলির নিচের অংশে নেওয়া হয়। সেখানে টিউমারটি হাড় ও শক্ত একটি আবরণের আড়ালে ছিল। টিউমারটি বের করার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা শনাক্ত করা সহজ ছিল না। কারণ, প্রত্যেক মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ গঠন কিছুটা আলাদা।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এ ধরনের অস্ত্রোপচারে টিউমারের পুরোটা অপসারণ করতে না পারার আশঙ্কা ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ। আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি শূন্য দশমিক ৫ থেকে ২ শতাংশ।
এখানেই এআই–ব্যবস্থা চিকিৎসকদের সহায়তা করেছে। অস্ত্রোপচারের সময় অন্য একটি পর্দায় এআই–ব্যবস্থা সরাসরি ভিডিও চিত্র বিশ্লেষণ করেছে। একই সঙ্গে অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত যন্ত্রগুলোর গতিবিধি অনুসরণ করেছে এবং মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও স্নায়ু যেখানে থাকার সম্ভাবনা বেশি, সেসব জায়গা চিহ্নিত করেছে। কোন অংশ দিয়ে টিউমার অপসারণ করা তুলনামূলক নিরাপদ, সেটিও দেখিয়েছে।
মুঠোফোনে মুখ শনাক্ত করার প্রযুক্তির মতোই কাজ করেছে এআই–ব্যবস্থা। তবে মুখের পরিবর্তে এটি মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ ও অনেক সময় আড়ালে থাকা শারীরিক গঠন শনাক্ত করেছে।
যুক্তরাজ্যের একজন চিকিৎসক বছরে এ ধরনের ১০ থেকে ২০টি অস্ত্রোপচার করেন। অস্ত্রোপচারের আগে করা স্ক্যান দেখে রোগীর মস্তিষ্কের গঠন সম্পর্কে ধারণা নিয়ে তাঁরা অস্ত্রোপচার করেন।
গবেষকেরা পিটুইটারি গ্রন্থির টিউমার অপসারণের শত শত অস্ত্রোপচারের ভিডিও ব্যবহার করে এআই–ব্যবস্থাটিকে প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষা করেছেন। প্রতিটি ভিডিওতে রক্তনালি ও স্নায়ুর অবস্থান আলাদাভাবে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে এআই–ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক গঠনগুলো শনাক্ত করতে শিখেছে।
অস্ত্রোপচারে যুক্ত অধ্যাপক হানি মার্কাস বলেন, একজন চিকিৎসক সারা জীবনে যত অস্ত্রোপচার দেখেন বা করেন, তার চেয়েও বেশি অস্ত্রোপচারের তথ্য দিয়েছে প্রশিক্ষিত এই এআই–ব্যবস্থা। তাই এটি একজন বিশেষজ্ঞের মতো কাজ করতে পারে।
হানি মার্কাস বলেন, পরীক্ষামূলক অন্য অনেক এআই–ব্যবস্থার সঙ্গে এর পার্থক্য হলো, এটি অস্ত্রোপচারের সময় সরাসরি কাজ করতে পারে।
তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এআই চিকিৎসকদের শুধু সহায়তা করেছে। অস্ত্রোপচারের পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিল চিকিৎসকদের হাতেই।
অধ্যাপক মার্কাস বলেন, তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো চিকিৎসকদের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যা অনেকটা চ্যাটজিপিটির মতো কাজ করবে। অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকেরা চাইলে এর কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারবেন। আবার পরামর্শের সঙ্গে একমত না হলে তা উপেক্ষাও করতে পারবেন।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিসার্চ এবং গুগলের অর্থায়নে গবেষকেরা কয়েক বছর ধরে পরীক্ষাগারে এআই প্রযুক্তিটি নিয়ে কাজ করেছেন। প্রথমবার বাস্তব অস্ত্রোপচারে এর ব্যবহার নিয়েও তাঁরা সন্তুষ্ট। এখন বড় পরিসরে এর পরীক্ষা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অস্ত্রোপচারের পর হিবার্ট বলেন, চোখ খোলার পর তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি যেন চারপাশের সবকিছু খুব ভালোভাবে দেখতে পাচ্ছেন। প্রায় এক বছর ধরে তিনি এতটা পরিষ্কার দেখতে পাননি।
অস্ত্রোপচারের পর আট সপ্তাহে হিবার্টের দৃষ্টিশক্তি অনেক উন্নত হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর কর্মশক্তিও ফিরে এসেছে। অস্ত্রোপচারের আগে থাকা অন্যান্য সমস্যাও চলে গেছে। তিনি বলেন, অস্ত্রোপচার তাঁকে তাঁর জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান বিন জসিম আল থানি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া পুনরায় শুরুর উদ্যোগ হিসেবে বৃহস্পতিবার তেহরান সফর করবেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান বিন জসিম আল থানি। ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মার্কিন ঘোষণা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যেই এ সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। খবর রয়টার্সের
ইরানের উপসাগরীয় প্রতিবেশী এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র কাতার দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে পর্দার আড়ালে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে আসছে। গত জুনে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সময় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায়ও দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। যুদ্ধ ষষ্ঠ মাসে গড়ালেও বর্তমানে সংঘাত অনেকটাই স্তিমিত। তবে কূটনৈতিক অগ্রগতির স্পষ্ট কোনো লক্ষণ নেই। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে তেহরান দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সরু এই জলপথ দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো। তবে সর্বশেষ জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ গত তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। সোমবার এ পথে দৈনিক প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। যুদ্ধের আগে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ২ কোটি ব্যারেল।
বুধবার ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ডস জানায়, হরমুজ প্রণালী ও এর আয় কীভাবে ভাগাভাগি করা হবে, সে বিষয়ে ইরান ও ওমান একমত হয়েছে। তবে পরে ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দুই দেশ এখনও চুক্তির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে।
এদিকে সংঘাতের শুরুতে বিমান হামলায় ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এখনও যথেষ্ট রয়েছে। এসব অস্ত্রের মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকা দেশগুলোতে হামলা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকারের যাতায়াতে বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতা তেহরানের রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন সামরিক পদক্ষেপের বদলে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশলে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে দেশটিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে দীর্ঘমেয়াদি এই উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালীর নৌ চলাচলেও। জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালীতে ৭০টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৯ জন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন।
ছবি : সংগৃহীত
নেপালে প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যার যে কম্পন বুধবার সকালে অনুভূত হয়েছিল, তা ভূমিকম্পের কারণে নয়- ভূমিধসের কারণে হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) বুধবার রাতে বিষয়টি স্পষ্ট করেছে যে, হিমবাহ ধসে পড়া এবং এর সঙ্গে পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত নামার কারণে ওই কম্পন তৈরি হয়েছিল।
এর আগে স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ইউএসজিএস জানায়, কাঠমান্ডুর উত্তরে নেপাল-চীন সীমান্ত এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছে। পরে সংস্থাটি তাদের তথ্য সংশোধন করে জানায়, সেখানে কোনো ভূমিকম্প হয়নি। যে কম্পন রেকর্ড করা হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহ ধসে পড়া এবং ধ্বংসাবশেষের প্রবাহের কারণে তৈরি হয়েছিল। ইউএসজিএস জানায়, এই ঘটনায় নদীর নিম্নাঞ্চলে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে।
প্রাথমিকভাবে প্ল্যানেট ল্যাবসের উপগ্রহের ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বরফ ও পাথরের বড় একটি ভূমিধসের কারণে লহেন্দে নদীতে হঠাৎ কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত নামে। ঘটনাটি নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুওয়াগাড়ি সীমান্ত চৌকি থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ঘটে। লহেন্দে নদী ভোতে কোশি নদীর একটি শাখা। নদীটি চীনের তিব্বত অঞ্চল থেকে নেপালে প্রবাহিত হয়েছে।
হিমবাহ ও পাথর ধসে নদীতে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসার পর ভোতে কোশি নদীতেও আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। এই বন্যায় নেপালে ১৫৭ জনের বেশি মানুষ মারা গেছেন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভয়াবহ ওই ভূমিধসের শক্তি পরে ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য হিসেবে হিসাব করা হয়েছে। আকস্মিক বন্যার পর নেপালের রাসুওয়া, ধাদিং ও নুওয়াকোটসহ বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণকাজ শুরু হয়েছে। নেপাল পুলিশ এখন পর্যন্ত ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজও চলছে। তবে দুর্যোগের কয়েক ঘণ্টা পরও শত শত মানুষের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অন্তত ৪০৩ জন পর্যটকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তাদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে নেপাল পর্যটন বোর্ড। কাদা ও পানির নিচে আটকে থাকা মানুষ এবং মরদেহ উদ্ধারে উদ্ধারকারীরা কাজ করছেন। দুর্গম ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছাতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। সারা দিন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর আকাশে হেলিকপ্টার চক্কর দিতে দেখা গেছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেছেন, ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে সরকারের সব ধরনের সম্পদ ব্যবহার করা হবে।
স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে ভোতে কোশি নদীতে হঠাৎ পানির ঢল নামে। তিব্বতের দিক থেকে বিপুল পরিমাণ পানি নেমে এসে নদীটি প্লাবিত করে। নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুওয়া ও ধাদিং জেলা এবং নুওয়াকোট জেলার বিভিন্ন এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানির সঙ্গে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসায় বহু বাড়িঘর, গাছপালা ও যানবাহন পানিতে ডুবে যায়। অনেক স্থাপনা ও যানবাহন কাদার নিচে চাপা পড়ে। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের তিব্বত অংশের নিরাপত্তা ক্যামেরার ভিডিওতে দেখা গেছে, পাথর, কাদা ও পানির প্রবল স্রোত নেমে আসার আগে অনেক মানুষ দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর প্রবল স্রোত ভবন ও যানবাহন ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
এদিকে তিব্বতের গিরং এলাকায়ও এই দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, সেখানে তিনজন নিহত হয়েছেন এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তবে নিহতের সংখ্যা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। তিব্বত অংশেও উদ্ধারকাজ চলছে। সীমান্তের দুই পাশেই পানির প্রবল স্রোত, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের কারণে যোগাযোগ ও স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত নুওয়াকোট ও ধাদিং এলাকার অনেক বাসিন্দা নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে নেপালি সেনাবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের বাইরে জড়ো হয়েছেন। উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার পরিচালনার জন্য কেন্দ্রটি ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করতে সেখানে তালিকা তৈরি করছে পুলিশ। বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। ফলে পুলিশ সদস্যদের মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইটের আলো ব্যবহার করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের নাম ও তথ্য লিখে রাখতে দেখা গেছে।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে আটকে পড়া জীবিত মানুষদের দ্রুত উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে বাড়িঘর, গাছপালা ও যানবাহন পানিতে ডুবে গেছে বা কাদার নিচে চাপা পড়েছে। একই সঙ্গে কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়া মরদেহ উদ্ধারের কাজও চলছে। জীবিতদের উদ্ধার করে নিয়ে যেতে সারা দিন ওই এলাকার আকাশে হেলিকপ্টার চক্কর দিয়েছে। দুর্যোগের পর নেপালের বিভিন্ন এলাকায় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিখোঁজ মানুষদের সন্ধান করা এবং দুর্গতদের কাছে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছোট ছেলে ব্যারন ট্রাম্পকে হত্যার সম্ভাব্য ষড়যন্ত্র নিয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবিতে প্রচারিত একটি ভিডিও সম্পর্কে অবগত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিস। সংস্থাটি জানিয়েছে, ভিডিওটিকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার সিক্রেট সার্ভিসের মুখপাত্র নেট হেরিং এক ই-মেইলে বলেন, সিক্রেট সার্ভিস ভিডিওটি সম্পর্কে অবগত এবং আমাদের সুরক্ষার আওতায় থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এমন যেকোনো বিষয় তদন্ত করে।
তবে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি বলেন, অপারেশনাল নিরাপত্তার স্বার্থে সুরক্ষাসংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে আমরা আলোচনা করি না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত প্রায় তিন মিনিটের ওই ভিডিওতে ২০ বছর বয়সী ব্যারন ট্রাম্পকে হত্যার সম্ভাব্য একটি ষড়যন্ত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়।
প্রায় তিন মিনিটের ভিডিওটি শুরু হয় ইংরেজিতে লেখা একটি গ্রাফিকে দেখা যায়, ব্যারন ট্রাম্পকে কোথায় এবং কীভাবে হত্যা করা উচিত? এবং এতে শৈল্পিক গ্রাফিক্সের মাধ্যমে সেইসব স্থান দেখানো হয়েছে যেখানে কনিষ্ঠ ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে সময় কাটাতে দেখা যায়, যার মধ্যে নিউ ইয়র্কের ট্রাম্প টাওয়ারও রয়েছে।
ভিডিওতে দাবি করা হয়, ব্যারনের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে এবং তাকে হত্যার জন্য ১ কোটি ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।
এর আগে চলতি মাসেই রয়টার্স জানায়, গত এক বছরে ইরান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনা করছে এমন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বেশ কয়েকবার সতর্ক করেছে ইসরায়েল। তুরস্কে ট্রাম্পকে ঘিরে একটি গোপন বিমানবাহিনী কৌশল নেওয়ার আগেও এ ধরনের সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানায় রয়টার্স।
ট্রাম্প নিজেও এর আগে ইরানের সম্ভাব্য হামলার প্রসঙ্গে নিজেকে ইরানের হত্যার তালিকায় এক নম্বরে রয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বড় ছেলে ইয়াইর নেতানিয়াহুকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল ইরানের একটি চক্র। হুমকি শনাক্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য থেকে তাকে দ্রুত ইসরায়েলে ফিরিয়ে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে মার্কিন ডানপন্থি সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্স।
একজন মার্কিন সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ডিসেম্বরে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা জানতে পারে, ফ্লোরিডার হল্যান্ডেল বিচ এলাকায় অবস্থানরত ৩৫ বছর বয়সী ইয়াইরকে হত্যার পরিকল্পনা করছে ইরানের গুপ্তচররা।
ওই সময় ইয়াইর মিয়ামির কাছাকাছি হল্যান্ডেলে ছিলেন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইরানের একটি সেল তখন মিয়ামি এলাকায় সক্রিয় ছিল এবং ইয়াইরের বাসস্থান ও দৈনন্দিন চলাফেরার ওপর নজরদারিও চালিয়েছিল।
চক্রান্তের তথ্য পাওয়ার পর দ্রুত মার্কিন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হলে ইসরায়েলি নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে ইয়াইরকে অবিলম্বে ওই এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এতটাই জরুরি ছিল পরিস্থিতি যে ইয়াইর নিজের কিছু জিনিসপত্রও ফ্লোরিডায় রেখে ইসরায়েলে ফিরে আসতে বাধ্য হন। বর্তমানে তিনি ইসরায়েলেই অবস্থান করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার মধ্যে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে এসব শুল্ক কার্যকর হবে। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রয়টার্স এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
কানাডা সরকারের ঘোষণায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় ৭০০ ধরনের পণ্যের ওপর ১৫, ২৫ ও ৫০ শতাংশ হারে শুল্ক বসানো হবে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক শুল্কের জবাব দেওয়া হচ্ছে।
গত শনিবার কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়। দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর এই শুল্ক আরোপ করা হয়।
কানাডার পাল্টা শুল্কের আওতায় ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, আসবাবপত্র ও পোশাকে ৫০ শতাংশ, পনির, গৃহস্থালি সরঞ্জাম ও কিছু সামুদ্রিক খাবারে ২৫ শতাংশ এবং ইলেকট্রনিক পণ্য ও বিভিন্ন সরঞ্জামে ১৫ শতাংশ শুল্ক বসবে।
এছাড়া প্রক্রিয়াজাত খাবার, সুগন্ধি, প্রসাধন ও পরিচর্যা সামগ্রী, প্লাস্টিক, কাঠ, কাগজ, কার্পেট, যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, রেল ইঞ্জিন, মোটরসাইকেল ও গেমিং সরঞ্জামও শুল্কের আওতায় থাকবে।
কানাডার শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলি বলেছেন, এসব পাল্টা শুল্কের মূল লক্ষ্য কানাডার ব্যবসাগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যে রাজনৈতিক চাপ তৈরিও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাই কোন পণ্যে শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে, সেটি নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়েছে।
শুধু পাল্টা শুল্ক নয়, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা ও কর্মীদের জন্য ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন কানাডীয় ডলারের সহায়তা প্যাকেজও ঘোষণা করেছে অটোয়া। এর আওতায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার জন্য অর্থায়ন এবং শুল্কের কারণে ঝুঁকিতে পড়া কর্মীদের সহায়তা দেওয়া হবে।
কানাডার সরকারি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব কানাডা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাগুলোকে ২৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ কানাডীয় ডলার পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ দেবে। এসব ঋণের অর্থ পরিশোধ শুরু করতে ৩৬ মাস সময় দেওয়া হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আকাশপ্রেমীরা আগামীকাল বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ভোর পর্যন্ত একটি গভীর আংশিক চন্দ্রগ্রহণের সাক্ষী হতে যাচ্ছেন। এ সময় পৃথিবীর ছায়া চাঁদের প্রায় ৯৬ শতাংশ অংশ ঢেকে ফেলবে। গ্রহণের কারণে চাঁদের বড় একটি অংশ লালচে বা তামাটে রঙ ধারণ করতে পারে। খবর আনাদোলু এজেন্সির।
নাসার তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময়ের পার্থক্যের কারণে চন্দ্রগ্রহণটি ২৭ থেকে ২৮ আগস্টের মধ্যে দেখা যাবে। ২৮ আগস্ট আন্তর্জাতিক সময় প্রায় ৪টা ১২ মিনিটে গ্রহণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে পুরো গ্রহণটি দেখা যাবে। ইউরোপ ও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে চাঁদ ওঠা বা অস্ত যাওয়ার সময় গ্রহণের একটি অংশ দেখা যাবে।
এটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ নয়। কারণ চাঁদের সামান্য একটি অংশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘন ছায়ার বাইরে থাকবে। গ্রহণের সময় চাঁদের যে অংশ পৃথিবীর গাঢ় ছায়ায় ঢেকে যাবে, সেটি লালচে বা তামাটে রঙ ধারণ করতে পারে।
সূর্যের আলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় ছড়িয়ে পড়ে ও প্রতিসরিত হয়ে চাঁদের পৃষ্ঠে পৌঁছায়। এর ফলে চাঁদের গ্রহণগ্রস্ত অংশে লালচে আভা তৈরি হয়, যাকে অনেক সময় ‘ব্লাড মুন’ বলা হয়।
চন্দ্রগ্রহণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলবে। তবে গভীর আংশিক গ্রহণের সময়কাল হবে এর তুলনায় অনেক কম। সর্বোচ্চ পর্যায়ে চাঁদের ব্যাসের প্রায় ৯৩ শতাংশ পৃথিবীর আমব্রার মধ্যে থাকবে বলে জানিয়েছে নাসা ও বিভিন্ন জ্যোতির্বিজ্ঞান সূত্র।
এর মাত্র দুই সপ্তাহের কিছু বেশি সময় আগে, ১২ আগস্ট একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও স্পেনের বিভিন্ন এলাকা থেকে সেটি দেখা গিয়েছিল। সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের নির্দিষ্ট সরলরৈখিক বিন্যাসের কারণে সাধারণত সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ কাছাকাছি সময়ে জোড়ায় ঘটে।
সূর্যগ্রহণ দেখার মতো চন্দ্রগ্রহণ পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো চোখের সুরক্ষা প্রয়োজন হয় না। দূরবীন বা টেলিস্কোপ ব্যবহার করলে চাঁদের গ্রহণ আরও কাছ থেকে দেখা যাবে। আকাশ পরিষ্কার থাকা এবং দিগন্তে কোনো বাধা না থাকলে গ্রহণ দেখার অভিজ্ঞতা সবচেয়ে ভালো হবে।