ছবি : সংগৃহীত
বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই একটি সংবাদ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফেসবুক, এক্স, ইউটিউব কিংবা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন অসংখ্য পোস্ট, ফটোকার্ড ও সংবাদ আমাদের চোখে পড়ে। অনেক সময় আবেগ, ভালো লাগা বা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে আমরা কোনো খবর যাচাই না করেই লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার করে ফেলি।
অথচ ইসলাম আমাদের শুধু মিথ্যা বলা থেকেই নয়, মিথ্যার প্রচার ও প্রসারে সহযোগিতা করতেও কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। তাই একজন সচেতন মুসলমানের দায়িত্ব হলো কোনো তথ্য প্রচার বা সমর্থনের আগে তার সত্যতা যাচাই করা। কেননা এক ক্লিকের গুনাহ: ভুয়া ফটোকার্ড, মিথ্যা সংবাদ ও লাইক-শেয়ারের রয়েছে ভয়াবহ পরিণতি।
মিথ্যা রচনা ও প্রচার: ইসলামে গুরুতর অপরাধ
মিথ্যা বলা, মিথ্যা সংবাদ তৈরি করা কিংবা ভুয়া ফটোকার্ড বানানো- সবই ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয় কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّمَا يَفْتَرِي الْكَذِبَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَاذِبُونَ
‘মিথ্যা রচনা তো তারাই করে, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহে বিশ্বাস করে না। আর তারাই প্রকৃত মিথ্যাবাদী।’ (সুরা আন নাহল: আয়াত ১০৫)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মিথ্যাবাদী ও অকৃতজ্ঞকে হিদায়াত দেন না।’ (সুরা আয-যুমার: আয়াত ৩)
ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করা কিংবা মিথ্যা সংবাদ প্রচার করা মূলত মিথ্যা রচনারই একটি আধুনিক রূপ। তাই এসব কাজে জড়িত ব্যক্তিরাও এই সতর্কবার্তার অন্তর্ভুক্ত।
মিথ্যা প্রচারে সহযোগিতাও গুনাহ
অনেকেই মনে করেন, আমি তো মিথ্যা বানাইনি; শুধু শেয়ার করেছি। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মিথ্যা প্রচারে সহযোগিতা করাও অপরাধ। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা করো; কিন্তু পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা আল-মায়েদাহ: আয়াত ২)
অতএব, মিথ্যা সংবাদে লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার দেওয়া সেই মিথ্যার প্রসারে সহযোগিতা করার শামিল; যা কবিরা গুনাহের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
যাচাই ছাড়া সংবাদ প্রচার নয়
ইসলাম সংবাদ যাচাইয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا
‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তা যাচাই করে নাও।’ (সুরা আল-হুজরাত: আয়াত ৬)
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই আয়াতের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। কারণ একটি মিথ্যা সংবাদ মুহূর্তেই বিভ্রান্তি, অপবাদ ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।
মিথ্যা বলা: মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য
রাসুলুল্লাহ (সা.) মিথ্যাকে মুনাফিকির অন্যতম প্রধান লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হাদিসে পাকে এসেছে-
آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ
‘মুনাফিকের আলামত তিনটি- যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন প্রতিশ্রুতি দেয় তা ভঙ্গ করে এবং যখন আমানত রাখা হয় তখন খিয়ানত করে।’ (বুখারি)
এ হাদিস একজন মুসলমানকে সতর্ক করে দেয় যে, মিথ্যা কোনো সাধারণ দোষ নয়; বরং এটি মুনাফিকির অন্যতম চিহ্ন।
যা শুনি তাই প্রচার করা কেন বিপজ্জনক?
অনেক সময় আমরা কোনো খবরের সত্যতা যাচাই না করেই অন্যদের কাছে পৌঁছে দিই। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে কঠোর সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন-
كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই বলে বেড়ায়।’ (মুসলিম)
আজকের ডিজিটাল যুগে এই হাদিস যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ একটি শেয়ার বা ফরওয়ার্ডের মাধ্যমে আমরা অজান্তেই মিথ্যার বাহক হয়ে যেতে পারি।
মিথ্যার ভয়াবহ পরিণতি
মিথ্যা শুধু একটি পাপ নয়; এটি মানুষকে আরও বড় পাপের দিকে নিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلَعْنَتُ اللَّهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ
‘আর মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ৬১)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন-
إِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ، فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ، وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ
‘তোমরা মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ মিথ্যা পাপের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।’ (বুখারি)
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি লাইক, কমেন্ট কিংবা শেয়ার অনেক সময় আমাদের কাছে সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু যদি তা মিথ্যা, অপপ্রচার বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রসারে ভূমিকা রাখে, তবে ইসলামের দৃষ্টিতে সেটি গুরুতর গুনাহের কারণ হতে পারে। তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো কোনো সংবাদ বা ফটোকার্ডে প্রতিক্রিয়া জানানোর আগে তার সত্যতা যাচাই করা, মিথ্যা ও অপপ্রচার থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হওয়া। মনে রাখতে হবে, কিয়ামতের দিন আমাদের জিহ্বার পাশাপাশি আমাদের আঙুলের ক্লিকেরও হিসাব দিতে হবে।
মানুষের জীবনে কিছু বিস্মৃতি আছে, যা সাময়িক, আবার কিছু বিস্মৃতি এমন, যা মানুষের গোটা জীবনবোধকে বিপর্যস্ত করে দেয়। আল্লাহকে ভুলে যাওয়া তেমনই এক বিস্মৃতি, যার অভিঘাত মানুষের হৃদয়, চিন্তা, চরিত্র এমনকি পরকাল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার পাঁচটি অনিবার্য পরিণতি হলো—
১. নিজেকে ভুলে যাওয়া
আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার প্রথম এবং সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিণতি হলো, এতে মানুষ নিজের প্রকৃত পরিচয় এবং পৃথিবীতে আগমনের মূল উদ্দেশ্য ভুলে যায়। মানুষ তখন নিজের দেহের যত্ন নিলেও আত্মার পরিচর্যায় উদাসীন হয়ে পড়ে, ভবিষ্যতের জন্য সম্পদ সঞ্চয় করলেও আখেরাতের জন্য নেকি সঞ্চয়ে তেমন তৎপর থাকে না।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে তিনি তাদের নিজেদেরই ভুলিয়ে দিয়েছেন।’ (সুরা হাশর, আয়াত:১৯)
আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হলে মানুষের নিজের সঙ্গেও সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়। এটাই আত্মবিস্মৃতির সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ।
২. জীবন সংকীর্ণ হয়ে ওঠে
অন্তরের প্রশান্তি মানুষের জীবনে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। প্রাসাদ-অট্টালিকা, অর্থবিত্ত, সুনাম-সুখ্যাতি কিংবা সামাজিক মর্যাদা মানুষের বাহ্যিক জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের অস্থিরতা দূর করতে পারে না।
হৃদয়ের প্রকৃত প্রশান্তি আল্লাহর স্মরণে নিহিত। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ, আয়াত: ২৮)
অন্যদিকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখতার পরিণতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, তার জীবন হবে সংকীর্ণ।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ১২৪)
‘সংকীর্ণ জীবন’ মানেই যে দরিদ্র জীবন, বিষয়টি এত সরল নয়। ঘরে প্রাচুর্য থাকলেও হৃদয় অস্থিরতায় বিপর্যস্ত হতে পারে, চারপাশে অগুনতি মানুষ থাকলেও অন্তরে বাসা বাঁধতে পারে নিঃসঙ্গতা। এগুলো সংকীর্ণ জীবনেরই চিত্র।
৩. দুনিয়া হয়ে যায় জীবনের লক্ষ্য
আল্লাহকে ভুলে গেলে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। যে জীবনকে আল্লাহ আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহের সুযোগ হিসেবে দিয়েছেন, সেটিই তখন চূড়ান্ত গন্তব্য বলে মনে হয়।
ফলে সম্পদ, সন্তান, পদপদবি, জনপ্রিয়তা ও সামাজিক মর্যাদা প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে জীবনের আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে চলে আসে। মানুষ এগুলোর জন্য আল্লাহর নির্দেশও উপেক্ষা করতে শুরু করে।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এমন করবে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা মুনাফিকুন, আয়াত: ৯)
অর্থাৎ সমস্যা সম্পদে নয়, সন্তানেও নয়, সমস্যা তখনই, যখন এগুলো মানুষকে আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এর ফলে দুনিয়া ব্যবহার করার পরিবর্তে মানুষ দুনিয়ার দ্বারা ব্যবহৃত হতে থাকে।
৪. শয়তান হয়ে যায় তার নিত্যসঙ্গী
মানুষের অন্তর কখনো শূন্য থাকে না। আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হলে শয়তান ধীরে ধীরে মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘পরম দয়াময়ের স্মরণ থেকে যে বিমুখ হয়, আমি তার জন্য এক শয়তান নিয়োজিত করি, অতঃপর সে তার সঙ্গী হয়ে যায়।’ (সুরা যুখরুফ, আয়াত: ৩৬)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘শয়তান তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে এবং তাদের আল্লাহর জিকির ভুলিয়ে দিয়েছে।’ (সুরা মুজাদালা, আয়াত: ১৯)
শয়তান যখন মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তখন গুনাহ আর আগের মতো ভয়ংকর মনে হয় না। হারামকে বিভিন্ন যুক্তির আলোকে বৈধ মনে হয়, পাপের পর অনুশোচনা কমে আসে, নসিহত বিরক্তিকর মনে হয়।
৫. আখেরাতে অনুতাপ
আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার ভয়াবহ পরিণতি দুনিয়াতেই শেষ হয়ে যায় না, এর ছায়া বিস্তৃত থাকে আখেরাত পর্যন্ত।
এমন ব্যক্তি সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় সমবেত করব।’ সে বলবে, “হে আমার প্রতিপালক, আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় কেন উঠালেন? অথচ আমি তো দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন ছিলাম।”
আল্লাহ বলবেন, “এভাবেই তো আমার নিদর্শনাবলি তোমার কাছে এসেছিল, কিন্তু তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। আজ তেমনিভাবেই তোমাকে ভুলে যাওয়া হবে।”’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ১২৪-১২৬)
প্রতিদান কর্মের অনুরূপই হয়ে থাকে। যে ব্যক্তি দুনিয়ায় আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হয়ে তাঁকে ভুলে গিয়েছিল, এমনকি তাঁর স্মরণে নিহিত নিজের কল্যাণ থেকেও বিস্মৃত হয়েছিল, আখেরাতে তাকে অন্ধ, বধির ও বোবা অবস্থায় জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। (ইবনে নাসির সাদি, তাইসিরুল কারিমির রহমান ফি তাফসিরি কালামিল মান্নান, ৫১৬, মাকতাবাতুল উবাইকান, রিয়াদ, ১৪২২ হিজরি)
ফেরার দরজা এখনো খোলা
আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার পরিণতি যতই ভয়াবহ হোক, তাঁর দিকে ফিরে আসার দরজা এখনো খোলা। নিজের ভুল উপলব্ধি করাই সেই প্রত্যাবর্তনের প্রথম ধাপ।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর রহমত থেকে তোমরা নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)
আল্লাহর স্মরণ মানে জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে তাঁর বিধানকে প্রাধান্য দেওয়া, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্যে তাঁর ভয় অন্তরে ধারণ করা, নিয়ামতের শোকর আদায় করা, বিপদে তাঁর ওপর ভরসা রাখা এবং গুনাহ হয়ে গেলে বিলম্ব না করে তওবার মাধ্যমে রবের দিকে ফিরে আসা।
ছবি : সংগৃহীত
পবিত্র আখেরি চাহার সোম্বা আজ বুধবার। হিজরি ২৩ সনের সফর মাসের শেষ বুধবার মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) দীর্ঘ রোগে ভোগার পর সুস্থবোধ করেন। দিনটি বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোয় অত্যন্ত মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয়ে থাকে।
২৩ হিজরির শুরুতে মহানবী (সা.) গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ক্রমে অবস্থার অবনতি হওয়ায় নামাজের ইমামতি পর্যন্ত করতে পারছিলেন না। ২৮ সফর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। ওই দিন শেষবারের মতো গোসল করে নামাজে ইমামতি করেন রাসুল (সা.)। তাঁর সুস্থতার খবরে সাহাবিরা উচ্ছ্বসিত হয়ে হাজার হাজার স্বর্ণমুদ্রা দান করেন। তবে পরদিন আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। ১৫ দিন পর ১২ রবিউল আউয়ালে ইন্তেকাল করেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)।
ফারসি শব্দগুচ্ছ ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ অর্থ শেষ বুধবার। সাহাবিদের অনুসরণে এ দিন দানখয়রাত করেন মুসলমানরা। আখেরি চাহার সোম্বা উপলক্ষে আজ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।
ছবি : সংগৃহীত
সারাদিন কাজ আর কাজের চিন্তায় আমরা সব শক্তি শেষ করে ফেলি। দিনশেষে যখন ইবাদত করার সময় আসে, তখন শরীর আর সায় দিতে চায় না। মনে হয়, ইবাদতও বুঝি সারাদিনের কাজের তালিকার আরও একটা দায়িত্ব।
তাই আমরা চেষ্টা করি যত দ্রুত সম্ভব নামাজটা পড়ে শেষ করে দায়মুক্ত হতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নামাজ আর ইবাদত কি সত্যিই আমাদের জন্য কোনো বোঝা? নাকি আমাদের এই ব্যস্ত জীবনে শান্তির সবচেয়ে বড় জায়গা এটিই হতে পারত?
আসুন, নতুন করে ৫টি উপায় চর্চা করি, যা ইবাদতের স্বাদ ফিরিয়ে দেবে।
১. ভাবনাটা একটু বদলে নেওয়া দরকার
কেন আমাদের কাছে ইবাদত অনেক সময় কঠিন মনে হয়? কাজের ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়ার জন্য আমরা যতখানি মনোযোগ দিই, ইবাদতের বেলায় অতখানি দিতে পারি না। কেন এমন হয়? কারণ সংসারের কাজের ফল আমরা সঙ্গে সঙ্গে দেখতে পাই, আর ইবাদতের সুফল বা মানসিক শান্তিটা আমরা চট করে চোখে দেখতে পাই না।
তাই প্রথমেই আমাদের চিন্তাভাবনাটা একটু বদলে ফেলতে হবে। নামাজ কেন পড়ি? কেবল হুকুম মানার জন্য নয়, বরং আমাদের নিজেদের মঙ্গলের জন্যই মহান আল্লাহ এটি দিয়েছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, নামাজ মানুষকে অন্যায় ও খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখে। (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)
অন্য জায়গায় বলা হয়েছে, দিন ও রাতের নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায় করো, নিশ্চয়ই ভালো কাজ খারাপ কাজকে দূর করে দেয়। (সুরা হুদ, আয়াত: ১১৪)
দিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আসলে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরা কেন এই পৃথিবীতে এসেছি। মহান আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন তাঁর আনুগত্য ও ইবাদতের জন্য। (সুরা যারিয়াত, আয়াত: ৫৬)
এই সহজ কথাটা মনে লালন করতে পারলে নামাজকে আর কোনো কঠিন দায়িত্ব মনে হবে না। সারাদিনের বিশৃঙ্খলা ও মানসিক চাপের মধ্যে নামাজ আমাদের মনকে এনে দেবে অদ্ভুত এক শান্তি ও স্থৈর্য। তখন আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোকেই জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা বলে মনে করবে।
২. মনকে এক জায়গায় আনা
আমাদের জীবনটা এখন এমন হয়ে গেছে যে, আমাদের মন কখনোই এক জায়গায় স্থির থাকে না। মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া, নানা চিন্তা—সব মিলিয়ে মন অলস বসে থাকার সুযোগ পায় না।
এমনকি যখন আমরা নামাজে দাঁড়াই, তখনও মাথার ভেতরে সংসারের নানা চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে। ফলে রুকু-সেজদা তো আমরা করি ঠিকই, কিন্তু অন্তরে আল্লাহর সঙ্গে সেই গভীর যোগাযোগটা তৈরি হয় না।
এই যান্ত্রিকতা দূর করার সহজ উপায় হলো সেজদা। সেজদাই হলো মানুষের জন্য তার স্রষ্টার সবচেয়ে কাছাকাছি যাওয়ার সময়। রাসুল (সা.) বলেছেন, বান্দা সেজদার অবস্থাতেই তার রবের সবচেয়ে কাছে পৌঁছায়, তাই তোমরা সেজদায় বেশি বেশি দোয়া কোরো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২)
তাই নামাজে সেজদার সময় তাড়াহুড়ো না করে কিছুটা বেশি সময় থাকুন। নিজের মনের সব কথা ও অনুভূতি নীরব ভাষায় আল্লাহর কাছে খুলে বলুন। সেজদার এই কয়েকটা মুহূর্তই আপনার নামাজকে একটি নিয়মমাফিক অভ্যাসের বদলে হৃদয়ের সুগভীর ভালোবাসায় বদলে দেবে।
৩. সংসারের দায়িত্বও তো ইবাদত
ইবাদতকে গুরুত্ব দেওয়ার মানে কিন্তু এই নয় যে আপনি সংসারের কাজ বা অন্যান্য দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন। ইসলাম আমাদের কাজ ফেলে ঘরকুনো হয়ে বসে থাকতে বলে না। পরিবার, সন্তান, মা-বাবা কিংবা সহকর্মীদের প্রতি আমাদের যে দায়িত্ব রয়েছে, তা পালন করা অত্যন্ত জরুরি।
সত্যি বলতে কি, সঠিক নিয়তে পরিবারের যত্ন নেওয়া বা নিজের দায়িত্ব পালন করাও এক ধরনের ইবাদত। মহানবী (সা.) বলেছেন, একজন মুমিন যা ভালো কাজ করে এবং পরিবারের জন্য যে খরচ করে, সেটাও তার জন্য সদকা বা ইবাদত হিসেবে লেখা হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫)
কাজের পাশাপাশি যদি অন্তরে এই চিন্তা থাকে যে আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কাজগুলো করছি, তবে আপনার পুরো দিনটাই ইবাদতে পরিণত হবে। প্রতিদিন সকালে কাজের শুরুতেই মনে মনে আল্লাহকে স্মরণের নিয়ত করে নিন।
কাজের চাপে মন যখন ক্লান্ত হয়ে পড়বে, তখন আবার নতুন করে আল্লাহর নাম স্মরণ করুন। ইবাদত জীবন থেকে আলাদা কিছু নয়, বরং সুন্দর জীবনযাপনেরই পথ।
৪. নিজের সাধ্য জানা ও মধ্যপন্থা
আত্মিক উন্নতির পথে আরেকটি বড় বাধা হলো নিজের সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ করতে যাওয়া। ধর্মের ক্ষেত্রে সবার ক্ষমতা সমান নয়। ইসলাম মানুষের ওপর অসাধ্য কিছু চাপিয়ে দেয় না। যেমন, কারও যদি নফল রোজা রাখা সহজ মনে হয়, তবে তিনি রোজা রাখতে পারেন।
কিন্তু যদি রোজা রাখলে শরীর বেশি খারাপ হয়ে যায় বা দৈনন্দিন কাজে বড় ব্যাঘাত ঘটে, তবে নিজেকে জোর না করে অন্য কোনো আমল বেছে নেওয়া উচিত।
আপনি সাধ্যমতো দান-সদকা করতে পারেন, রাতে একটু তাহাজ্জুদ পড়তে পারেন কিংবা আল্লাহর রাসুলের ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করতে পারেন।
মহানবী (সা.) ইবাদতের ব্যাপারে সবসময় সহজ পথ ও মধ্যপন্থা বেছে নিতে বলেছেন। তিনি আমাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যে ব্যক্তি ধর্মের ব্যাপারে অতিরিক্ত কঠোরতা করে, ধর্ম তার ওপর বিজয়ী হয়ে যায় এবং একপর্যায়ে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯)
তাই নিজের শরীর ও মনকে জানুন। আপনার জন্য যে আমলটি সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়, সেটির মাধ্যমেই আল্লাহর প্রিয় হওয়ার চেষ্টা করুন।
৫. কারো তুলনা নয়, নিজের উন্নয়ন
ইবাদতকে দীর্ঘস্থায়ী ও আনন্দময় রাখার শেষ উপায় হলো, নিজের সঙ্গে অন্যের তুলনা না করা। কে কত বেশি নামাজ পড়ছে বা কে কতটা ইবাদত করছে, তা দেখে নিজের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করা ঠিক নয়। প্রত্যেকের পরিস্থিতি ও শক্তি আলাদা।
অন্যের দেখাদেখি হঠাৎ এমন কোনো কঠিন কাজ শুরু করা উচিত নয়, যা পরে ধরে রাখা যায় না। বরং নিজের আগের অবস্থার সঙ্গে আজকের অবস্থার তুলনা করুন।
যেমন—আপনি যদি এখন প্রতিদিন কোরআনের একটি পৃষ্ঠা পড়েন, তবে আস্তে আস্তে তা বাড়িয়ে দুটি পৃষ্ঠা করার চেষ্টা করুন। সেই নিয়মটি নিজের অভ্যাসে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত সেটুকুই ধরে রাখুন।
ইসলামে খুব বেশি আমল একবারে করার চেয়ে নিয়মিত ছোট ছোট আমল করাকে বেশি পছন্দ করা হয়েছে। নবীজিকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি? তিনি উত্তরে বললেন, যে আমল নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৫)
সাধ্যের বেশি করতে গেলে একসময় মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং সব আমল একবারে ছেড়ে দেয়। তাই নিজেকে সময় দিন এবং অল্প হলেও নিয়মিত ইবাদত চালিয়ে যান।
পরিশেষে বলা যায়, ইবাদত কোনো যান্ত্রিক শারীরিক অভ্যাস নয়, এটি হলো স্রষ্টার সঙ্গে বান্দার এক মধুর আত্মিক সম্পর্ক। ক্লান্তি আর ব্যস্ততায় ভরা জীবনে ইবাদতকে যদি একটু বিরতি ও শান্তির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা যায়, তবে তা আমাদের মন ও জীবনের গতি পুরোটাই বদলে দেবে।
দাম্পত্য জীবনের শুরুটা সহজ, কিন্তু সেটাকে বছরের পর বছর সুন্দর রাখা মোটেই সহজ কাজ নয়। এর জন্য লাগে ধৈর্য, আন্তরিকতা, ত্যাগ আর একটু প্রজ্ঞা। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে গিয়ে অনেক সময় নিজের অভিমান আর রাগ সংযত করতে হয়।
একজন স্বামীর ভূমিকা তখন হয়ে ওঠে কৌশলী আর স্নেহশীল একজন অভিভাবকের মতো। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাপড়া না থাকলে সম্পর্ক ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে, কখনো কখনো তা গড়ায় বিচ্ছেদ পর্যন্ত।
অথচ কিছু সহজ, প্রতিদিনের অভ্যাস নিয়মিত চর্চা করলে ভালোবাসা আর বিশ্বাস অনেক গভীর হয়ে ওঠে। স্ত্রীর ভুল হলে অপমান নয়, ভালোবাসা দিয়েই তা সংশোধন করা উচিত। তাঁকে অনুভব করাতে হয় যে পৃথিবীতে আপনিই তাঁর সবচেয়ে আপন মানুষ।
১. নিজের যত্ন নেওয়া, তাঁর যত্ন নেওয়া
স্ত্রীর সামনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকাটা ছোট বিষয় মনে হলেও এর প্রভাব গভীর। সাহাবি ইবনে আব্বাস (রা.) নিজে এ অভ্যাসের কথা বলেছেন, ‘আমি আমার স্ত্রীর জন্য এমনই পরিপাটি থাকতে পছন্দ করি, যেমন আমি তার কাছ থেকে সাজগোজ পছন্দ করি।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবাহ, হাদিস: ১৯২৬৩)
স্ত্রী যেভাবে দেখতে পছন্দ করেন, সেভাবে থাকার চেষ্টাটা আসলে সম্মানেরই একটা প্রকাশ।
পরিবারের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো খাবারের ব্যবস্থা করাও এ যত্নেরই অংশ। সব সময় সম্ভব না হলেও মাঝেমধ্যে বিশেষ আয়োজন করা যায়, আর এখানে কার্পণ্য না করাই ভালো।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘সওয়াবের আশায় কোনো মুসলিম যখন তার পরিবারের জন্য ব্যয় করে, তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৫১)
ঘরের কাজে সুযোগ পেলে সহযোগিতা করা আর ছোট ছোট ভালো কাজেরও আন্তরিক প্রশংসা করা—এসবও একই সুতোয় গাঁথা। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবীজি প্রায়ই খাদিজা (রা.)-এর প্রশংসা করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২২৯)
এমনকি খাদিজার মৃত্যুর পরও নতুন স্ত্রীর সামনেই প্রশংসা করতেন। প্রশংসা কখনো পুরোনো সম্পর্ককে খাটো করে না; বরং ভালোবাসা বাড়ায়।
২. সম্মান কখনো হারাতে দেওয়া যাবে না
দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ হতেই পারে। প্রয়োজনে কিছু সময় দূরে থাকা যায়, বিছানা আলাদা করা যায়, কিন্তু গায়ে হাত তোলা কখনোই নয়। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কেউ যেন নিজের স্ত্রীকে দাসের মতো প্রহার না করো। দিনের শেষে তো তার সঙ্গেই মিলিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২০৪)
এ সতর্কতা এতটাই স্পষ্ট যে এখানে কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না।
সম্মান রক্ষার আরও কিছু দিক আছে, যেগুলো চোখে কম পড়ে, কিন্তু প্রভাব ফেলে গভীরভাবে। খারাপ নামে ডাকা, অশালীন ভাষা ব্যবহার, স্ত্রীর মা–বাবাকে নিয়ে কটূক্তি—এসব সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য; যৌতুকের দাবি বা ইঙ্গিতও তা-ই।
স্ত্রীকে অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করাটাও একধরনের অসম্মান। তাঁকে বরং অনুভব করানো উচিত যে তিনি অনন্য, প্রতিস্থাপনযোগ্য নন। তাঁর ভুল সবার সামনে প্রকাশ না করে আড়ালে ভালোবাসার সঙ্গে সংশোধনের চেষ্টা করাই ভালো, আর পুরোনো ভুল বারবার মনে করিয়ে দেওয়াও একধরনের নিষ্ঠুরতা।
ক্ষমা করতে শেখা আর সামনে এগিয়ে চলাই সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ।
৩. সময় দেওয়া: নবীজি যা মনে রাখতেন
দাম্পত্য জীবনে হালকা, খেলাচ্ছলে সময় কাটানোকে অনেকে গুরুত্বহীন মনে করেন, অথচ নবীজির নিজের জীবনেই এর স্পষ্ট নজির আছে।
আয়েশা (রা.) বলেন, এক সফরে নবীজি তাঁর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। প্রথমবার আয়েশা জিতে যান। বছর কয়েক পর, যখন আয়েশার শরীর কিছুটা ভারী হয়ে গেছে, আবার প্রতিযোগিতা হলো, এবার নবীজি (সা.) জিতলেন। তিনি হেসে বললেন, ‘এটা সেই আগের হারের বদলা।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৭৮)
এই ছোট্ট ঘটনাই বলে দেয়, স্ত্রীর সঙ্গে হালকা, রসিকতাপূর্ণ সময় কাটানো নবীজির নিজস্ব অভ্যাসের অংশ ছিল।
এ বিষয়ে নবীজি (সা.) একটা সাধারণ নীতিও বলে দিয়েছে, মানুষের অধিকাংশ বিনোদনমূলক কাজই অর্থহীন, তবে কয়েকটি ব্যতিক্রম আছে। তিনি বলেন, ‘মানুষ যা নিয়ে খেলাধুলা করে, তার সবই অনর্থক, তিনটি বিষয় ছাড়া—তিরন্দাজি, ঘোড়া প্রশিক্ষণ আর স্ত্রীর সঙ্গে খেলা।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৬৩৭)
অর্থাৎ স্ত্রীর সঙ্গে হালকা সময় কাটানোকে ইসলাম নিছক অপচয় নয়; বরং সময়োপযোগী ও অর্থবহ কাজ হিসেবে দেখে।
এর আলোকেই প্রতিদিন কিছুটা সময় মন খুলে কথা বলা, একসঙ্গে খাওয়া, একটু হাঁটা, মাঝেমধ্যে কোথাও ঘুরতে যাওয়া—এসব ছোট অভ্যাসকে বাড়তি বিলাসিতা না ভেবে বরং সুন্নাহরই একটা অংশ হিসেবে দেখা যায়।
নতুন দাম্পত্যে স্ত্রীকে একা না রেখে সান্নিধ্যে রাখা, আবার তাঁকে মাঝেমধ্যে বাবার বাড়িতে যেতে দেওয়া—দুটোই এই একই নীতির বাস্তব প্রয়োগ: সম্পর্কটাকে জীবন্ত রাখা।
৪. রাগের মুহূর্তই আসলে পরীক্ষা
ওপরের প্রতিটি অভ্যাসের আসল পরীক্ষা হয় রাগের মুহূর্তে। নবীজি (সা.) শক্তির সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিলেন এ প্রসঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং শক্তিশালী সে-ই, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)
দাম্পত্য জীবনের ঝগড়া-বিবাদে এ নীতিই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে—রাগের মাথায় নেওয়া সিদ্ধান্ত প্রায়ই সারা জীবনের অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়; যেখানে একটু থেমে শান্ত হওয়াটাই বড় শক্তির পরিচয়।
সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে ওঠে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ, ক্ষমাশীলতা আর আল্লাহভীতির ওপর। অভিমান, রাগ, অহংকার আর অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া থেকে দূরে থেকে একে অপরের সুখ-দুঃখের সাথি হওয়ার চেষ্টাই আসল কাজ।
সুন্দর সংসার হঠাৎ তৈরি হয় না, এটা গড়ে ওঠে প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণ, ত্যাগ আর আন্তরিকতার মধ্য দিয়ে। আল্লাহ–তাআলা আমাদের সবাইকে ভালোবাসা, রহমত ও প্রশান্তিতে ভরপুর দাম্পত্য জীবন দান করুন।
ছবি : সংগৃহীত
দাম্পত্য জীবনের শুরুটা সহজ, কিন্তু সেটাকে বছরের পর বছর সুন্দর রাখা মোটেই সহজ কাজ নয়। এর জন্য লাগে ধৈর্য, আন্তরিকতা, ত্যাগ আর একটু প্রজ্ঞা। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে গিয়ে অনেক সময় নিজের অভিমান আর রাগ সংযত করতে হয়।
একজন স্বামীর ভূমিকা তখন হয়ে ওঠে কৌশলী আর স্নেহশীল একজন অভিভাবকের মতো। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাপড়া না থাকলে সম্পর্ক ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে, কখনো কখনো তা গড়ায় বিচ্ছেদ পর্যন্ত।
অথচ কিছু সহজ, প্রতিদিনের অভ্যাস নিয়মিত চর্চা করলে ভালোবাসা আর বিশ্বাস অনেক গভীর হয়ে ওঠে। স্ত্রীর ভুল হলে অপমান নয়, ভালোবাসা দিয়েই তা সংশোধন করা উচিত। তাঁকে অনুভব করাতে হয় যে পৃথিবীতে আপনিই তাঁর সবচেয়ে আপন মানুষ।
১. নিজের যত্ন নেওয়া, তাঁর যত্ন নেওয়া
স্ত্রীর সামনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকাটা ছোট বিষয় মনে হলেও এর প্রভাব গভীর। সাহাবি ইবনে আব্বাস (রা.) নিজে এ অভ্যাসের কথা বলেছেন, ‘আমি আমার স্ত্রীর জন্য এমনই পরিপাটি থাকতে পছন্দ করি, যেমন আমি তার কাছ থেকে সাজগোজ পছন্দ করি।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবাহ, হাদিস: ১৯২৬৩)
স্ত্রী যেভাবে দেখতে পছন্দ করেন, সেভাবে থাকার চেষ্টাটা আসলে সম্মানেরই একটা প্রকাশ।
পরিবারের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো খাবারের ব্যবস্থা করাও এ যত্নেরই অংশ। সব সময় সম্ভব না হলেও মাঝেমধ্যে বিশেষ আয়োজন করা যায়, আর এখানে কার্পণ্য না করাই ভালো।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘সওয়াবের আশায় কোনো মুসলিম যখন তার পরিবারের জন্য ব্যয় করে, তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৫১)
ঘরের কাজে সুযোগ পেলে সহযোগিতা করা আর ছোট ছোট ভালো কাজেরও আন্তরিক প্রশংসা করা—এসবও একই সুতোয় গাঁথা। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবীজি প্রায়ই খাদিজা (রা.)-এর প্রশংসা করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২২৯)
এমনকি খাদিজার মৃত্যুর পরও নতুন স্ত্রীর সামনেই প্রশংসা করতেন। প্রশংসা কখনো পুরোনো সম্পর্ককে খাটো করে না; বরং ভালোবাসা বাড়ায়।
২. সম্মান কখনো হারাতে দেওয়া যাবে না
দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ হতেই পারে। প্রয়োজনে কিছু সময় দূরে থাকা যায়, বিছানা আলাদা করা যায়, কিন্তু গায়ে হাত তোলা কখনোই নয়। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কেউ যেন নিজের স্ত্রীকে দাসের মতো প্রহার না করো। দিনের শেষে তো তার সঙ্গেই মিলিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২০৪)
এ সতর্কতা এতটাই স্পষ্ট যে এখানে কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না।
সম্মান রক্ষার আরও কিছু দিক আছে, যেগুলো চোখে কম পড়ে, কিন্তু প্রভাব ফেলে গভীরভাবে। খারাপ নামে ডাকা, অশালীন ভাষা ব্যবহার, স্ত্রীর মা–বাবাকে নিয়ে কটূক্তি—এসব সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য; যৌতুকের দাবি বা ইঙ্গিতও তা-ই।
স্ত্রীকে অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করাটাও একধরনের অসম্মান। তাঁকে বরং অনুভব করানো উচিত যে তিনি অনন্য, প্রতিস্থাপনযোগ্য নন। তাঁর ভুল সবার সামনে প্রকাশ না করে আড়ালে ভালোবাসার সঙ্গে সংশোধনের চেষ্টা করাই ভালো, আর পুরোনো ভুল বারবার মনে করিয়ে দেওয়াও একধরনের নিষ্ঠুরতা।
ক্ষমা করতে শেখা আর সামনে এগিয়ে চলাই সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ।
৩. সময় দেওয়া: নবীজি যা মনে রাখতেন
দাম্পত্য জীবনে হালকা, খেলাচ্ছলে সময় কাটানোকে অনেকে গুরুত্বহীন মনে করেন, অথচ নবীজির নিজের জীবনেই এর স্পষ্ট নজির আছে।
আয়েশা (রা.) বলেন, এক সফরে নবীজি তাঁর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। প্রথমবার আয়েশা জিতে যান। বছর কয়েক পর, যখন আয়েশার শরীর কিছুটা ভারী হয়ে গেছে, আবার প্রতিযোগিতা হলো, এবার নবীজি (সা.) জিতলেন। তিনি হেসে বললেন, ‘এটা সেই আগের হারের বদলা।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৭৮)
এই ছোট্ট ঘটনাই বলে দেয়, স্ত্রীর সঙ্গে হালকা, রসিকতাপূর্ণ সময় কাটানো নবীজির নিজস্ব অভ্যাসের অংশ ছিল।
এ বিষয়ে নবীজি (সা.) একটা সাধারণ নীতিও বলে দিয়েছে, মানুষের অধিকাংশ বিনোদনমূলক কাজই অর্থহীন, তবে কয়েকটি ব্যতিক্রম আছে। তিনি বলেন, ‘মানুষ যা নিয়ে খেলাধুলা করে, তার সবই অনর্থক, তিনটি বিষয় ছাড়া—তিরন্দাজি, ঘোড়া প্রশিক্ষণ আর স্ত্রীর সঙ্গে খেলা।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৬৩৭)
অর্থাৎ স্ত্রীর সঙ্গে হালকা সময় কাটানোকে ইসলাম নিছক অপচয় নয়; বরং সময়োপযোগী ও অর্থবহ কাজ হিসেবে দেখে।
এর আলোকেই প্রতিদিন কিছুটা সময় মন খুলে কথা বলা, একসঙ্গে খাওয়া, একটু হাঁটা, মাঝেমধ্যে কোথাও ঘুরতে যাওয়া—এসব ছোট অভ্যাসকে বাড়তি বিলাসিতা না ভেবে বরং সুন্নাহরই একটা অংশ হিসেবে দেখা যায়।
নতুন দাম্পত্যে স্ত্রীকে একা না রেখে সান্নিধ্যে রাখা, আবার তাঁকে মাঝেমধ্যে বাবার বাড়িতে যেতে দেওয়া—দুটোই এই একই নীতির বাস্তব প্রয়োগ: সম্পর্কটাকে জীবন্ত রাখা।
৪. রাগের মুহূর্তই আসলে পরীক্ষা
ওপরের প্রতিটি অভ্যাসের আসল পরীক্ষা হয় রাগের মুহূর্তে। নবীজি (সা.) শক্তির সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিলেন এ প্রসঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং শক্তিশালী সে-ই, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)
দাম্পত্য জীবনের ঝগড়া-বিবাদে এ নীতিই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে—রাগের মাথায় নেওয়া সিদ্ধান্ত প্রায়ই সারা জীবনের অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়; যেখানে একটু থেমে শান্ত হওয়াটাই বড় শক্তির পরিচয়।
সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে ওঠে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ, ক্ষমাশীলতা আর আল্লাহভীতির ওপর। অভিমান, রাগ, অহংকার আর অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া থেকে দূরে থেকে একে অপরের সুখ-দুঃখের সাথি হওয়ার চেষ্টাই আসল কাজ।
সুন্দর সংসার হঠাৎ তৈরি হয় না, এটা গড়ে ওঠে প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণ, ত্যাগ আর আন্তরিকতার মধ্য দিয়ে। আল্লাহ–তাআলা আমাদের সবাইকে ভালোবাসা, রহমত ও প্রশান্তিতে ভরপুর দাম্পত্য জীবন দান করুন।
ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ আগামী বছরের পবিত্র হজ প্যাকেজ ঘোষণা করেন
বিমান ভাড়া কমিয়ে ২০২৭ সালের হজ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। আজ মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ এ ঘোষণা দেন।
তিনি জানান, এবার (২০২৭) সরকারি মাধ্যমে দুটি প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে হজ প্যাকেজ-১-এর খরচ ধরা হয়েছে ৬ লাখ ১৫ হাজার ২৬৩ টাকা এবং হজ প্যাকেজ-২-এর খরচ ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৫ হাজার ৬৪৮ টাকা।
অন্যদিকে ‘বেসরকারি মাধ্যমের সাধারণ হজ প্যাকেজ’ নামে একটি প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে ৫ লাখ ১৩ হাজার ৬৪৮ টাকা। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত তিনটি হজ প্যাকেজ ঘোষণা করা যাবে। তবে সরকার ঘোষিত হজ প্যাকেজ-২ এ উল্লিখিত সেবা-সুবিধা কমিয়ে কোনো প্যাকেজ ঘোষণা করা যাবে না বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
ধর্মমন্ত্রী আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে এবার হজ ফ্লাইটের বিমানভাড়া গত বছরের তুলনায় ২৪ হাজার ৮৩০ টাকা কমিয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।