ছবি : সংগৃহীত
সাহস, আত্মত্যাগ, দৃঢ়তা ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন সাহাবি জুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.)। তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ফুফাতো ভাই, ঘনিষ্ঠ সাহাবি এবং জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবির একজন। বদর, উহুদ, খন্দক, ইয়ারমুকসহ গুরুত্বপূর্ণ সব যুদ্ধে তিনি বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে নিজের হাওয়ারি বা একান্ত সহচর ও সাহায্যকারী হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
জুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.)-এর বংশ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বংশের সঙ্গে মিলিত হয়েছে কুসাইয়ের মাধ্যমে। সাফিয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব ছিলেন তার মা।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন তিনি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অংশ নেওয়া কোনো যুদ্ধেই তিনি অনুপস্থিত ছিলেন না। ইসলাম গ্রহণের পর তাকে নির্যাতনেরও শিকার হতে হয়।
বর্ণিত আছে, তার চাচা তাকে চাটাইয়ে পেঁচিয়ে আগুনের ধোঁয়া দিতেন এবং বলতেন, কুফরিতে ফিরে যাও। জবাবে জুবায়ের (রা.) বলতেন, আমি কখনো কুফরি করব না।
নবীজির (সা.) প্রতি ভালোবাসা
সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর পথে সর্বপ্রথম তরবারি বের করেন জুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.)।
একদিন জুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.) শুয়ে ছিলেন। হঠাৎ তিনি শুনতে পেলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিহত হয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঘর থেকে বের হয়ে খোলা তরবারি হাতে নিয়ে ছুটতে লাগলেন। পথিমধ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে তার দেখা হলো।
রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে, জুবায়ের? তিনি বললেন, শুনেছি আপনি নিহত হয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তাহলে তুমি কী করতে? জুবায়ের (রা.) বললেন, আল্লাহর কসম, আমি মক্কার সবাইকে আক্রমণ করতে বেরিয়ে পড়তাম। তখন নবীজি (সা.) তার জন্য কল্যাণের দোয়া করেন।
সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব (রহ.) বলেন, আমি আশা করি, আল্লাহর কাছে জুবায়ের (রা.)-এর জন্য নবীজি (সা.)-এর সেই দোয়া কখনো বিফলে যায়নি।
হাবশা ও মদিনায় হিজরত
সাহাবিদের ওপর কুরাইশের নির্যাতন যখন চরমে পৌঁছাল, তখন সাহাবিদের হাবশায় হিজরতের পরামর্শ দেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। সেখানে ন্যায়পরায়ণ শাসক নাজাশির আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ ছিল। ফলে সাহাবিরা সেখানে নিরাপদ পরিবেশে বসবাস করতে থাকেন।
এভাবে তারা নিরাপদ ও স্থিতিশীল জীবনযাপন করছিলেন। একপর্যায়ে হাবশার এক ব্যক্তি নাজাশির সঙ্গে রাজক্ষমতা নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এতে মুসলমানরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় সাহাবিরা নীল নদের অপর পারে নাজাশি ও ওই ব্যক্তির মধ্যে চলমান সংঘর্ষের খবর জানতে চাইলেন।
উম্মে সালামা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা বললেন, কে এমন ব্যক্তি আছেন, যিনি গিয়ে তাদের যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করে আমাদের কাছে খবর নিয়ে আসবেন? জুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.) বললেন, আমি যাব। তারা বললেন, তাহলে তুমিই যাও। তখন তিনি ছিলেন দলের সবচেয়ে কম বয়সীদের একজন।
তার জন্য একটি মশক ফুলিয়ে দেওয়া হলো। তিনি সেটি বুকে বেঁধে সাঁতার কেটে নীল নদের সেই অংশে পৌঁছালেন, যেখানে দুই পক্ষের লোকজন একত্র হয়েছিল। এরপর তিনি সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেন।
উম্মে সালামা (রা.) বলেন, তখন কী ঘটতে যাচ্ছে, তা নিয়ে উব্দেগ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম আমরা। এমন সময় জুবায়ের (রা.) ফিরে এলেন। তিনি নিজের কাপড় নাড়িয়ে বলতে লাগলেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। নাজাশি বিজয়ী হয়েছেন। আল্লাহ তার শত্রুকে ধ্বংস করেছেন এবং তার দেশে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
হাবশা থেকে মক্কায় ফিরে আসার পর জুবায়ের (রা.) প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সান্নিধ্যে থেকে ইসলামের শিক্ষা, আদেশ ও নিষেধ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে থাকেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় হিজরত করেন, তখন জুবায়ের (রা.)-ও মদিনায় হিজরতকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
বদর যুদ্ধে জুবায়ের (রা.)
জুবায়ের (রা.) ছিলেন দুর্ধর্ষ অশ্বারোহী ও সাহসী যোদ্ধা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোনো যুদ্ধেই তিনি অনুপস্থিত ছিলেন না। প্রতিটি যুদ্ধ ও সংঘাতে তাকে সাহস, বিরল বীরত্ব, পূর্ণ নিষ্ঠা এবং সত্যের বিজয়ের জন্য আত্মনিবেদনের দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যায়।
আল্লাহর পথে তিনি নিজের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করেছিলেন। এর বিনিময়ে আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত করেছেন।
বদর যুদ্ধে তার মাথায় হলুদ পাগড়ি ছিল। উরওয়া (রহ.) থেকে বর্ণিত, বদরের দিন জুবায়ের (রা.)-এর মাথায় হলুদ পাগড়ি ছিল। জিবরাইল (আ.) তার আকৃতিতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এটি ছিল এমন এক মর্যাদা, যার তুলনায় পুরো দুনিয়ার সম্পদও তুচ্ছ।
খন্দক যুদ্ধে নবীজির সহচর জুবায়ের
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে দাওয়াতের পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন জুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.)। অল্প বয়স থেকেই ইসলামের দায়িত্ব বহনের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। আহজাবের যুদ্ধে জুবায়ের (রা.)-এর ভূমিকা তার সাহস, সাহায্যের মানসিকতা ও ব্যক্তিত্বের অনন্য পরিচয় বহন করে।
খন্দকের যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, বনু কুরাইজা সম্পর্কে কে আমাকে খবর এনে দেবে? জুবায়ের (রা.) বললেন, আমি যাব। তিনি ঘোড়ায় চড়ে রওনা হলেন এবং তাদের সম্পর্কে খবর নিয়ে ফিরে এলেন। এরপর নবীজি (সা.) দ্বিতীয়বার একই কথা বললেন। জুবায়ের (রা.) আবার বললেন, আমি যাব। তিনি আবার গেলেন।
তৃতীয়বারও রাসুলুল্লাহ (সা.) একই কথা বললে তিনি বললেন, আমি যাব। তখন নবীজি (সা.) বললেন, প্রত্যেক নবীর একজন হাওয়ারি থাকে, আর আমার হাওয়ারি হলো জুবায়ের।
হাওয়ারি বলতে বোঝায়, আমার ঘনিষ্ঠ সহচর, সাহায্যকারী ও একান্ত অনুগত সাহাবি। ঈসা (আ.)-এর সাহাবিদেরও হাওয়ারি বলা হয়। অর্থাৎ হাওয়ারি হলো এমন এক নিষ্ঠাবান সাহায্যকারী, যে সত্যের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়।
ইয়ারমুকের যুদ্ধে জুবায়ের (রা.)
উরওয়া থেকে বর্ণিত, ইয়ারমুকের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা জুবায়ের (রা.)-কে বললেন, আপনি কি একবার শত্রুদের ওপর আক্রমণ করবেন না? আমরা আপনার সঙ্গে আক্রমণ করব। তিনি বললেন, আমি যদি আক্রমণ করি, তাহলে তোমরা কি সত্যিই আমার সঙ্গে থাকবে? তারা বললেন, অবশ্যই থাকব।
জুবায়ের (রা.) শত্রুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তিনি তাদের সারি ভেদ করে এত দূর চলে গেলেন যে তার সঙ্গে আর কেউ ছিল না। এরপর তিনি ফিরে এলেন। সাহাবিরা তার ঘোড়ার লাগাম ধরে তাকে থামালেন। তার কাঁধে দুটি আঘাতের দাগ ছিল। এর একটি বদরের দিনকার আঘাত।
উরওয়া বলেন, আমি ছোটবেলায় সেই আঘাতের দাগে আঙুল ঢুকিয়ে খেলতাম। সেদিন তার সঙ্গে তার ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়েরও ছিলেন। তখন তাঁ বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। জুবায়ের (রা.) তাকে ঘোড়ায় বসিয়ে একজন ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে দেন।
মিসর বিজয়ে জুবায়ের (রা.)
আমর ইবনে আস (রা.) যখন মিসর বিজয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন তার সঙ্গে থাকা বাহিনী মিসর বিজয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল না। তাই তিনি ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর কাছে আরও সৈন্য পাঠানোর অনুরোধ করেন।
ওমর (রা.) আমরের বাহিনীর সংখ্যা কম হওয়ায় উদ্বিগ্ন হলেন। তিনি জুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.)-এর নেতৃত্বে আরও ১২ হাজার সৈন্য পাঠান। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, ওমর (রা.) চার হাজার সৈন্য পাঠিয়েছিলেন। এই বাহিনীতে বিশিষ্ট্য সাহাবিদের ছিলেন জুবায়ের, মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ, উবাদা ইবনে সামিত ও মাসলামা ইবনে মুখাল্লাদ।
ওমর (রা.) চিঠিতে লিখেছিলেন, আমি তোমাকে চার হাজার সৈন্য দিয়ে সাহায্য করছি। তাদের প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে এমন একজন রয়েছেন, যিনি এক হাজার সৈন্যের সমান।
জুবায়ের (রা.) আমরের কাছে পৌঁছে দেখলেন, তিনি বাবিলিয়নের দুর্গ অবরোধ করেছেন। জুবায়ের (রা.) ঘোড়ায় চড়ে দুর্গের চারপাশের পরিখা ঘুরে দেখলেন এবং পরিখার চারদিকে সৈন্যদের অবস্থান করালেন।
অবরোধ দীর্ঘ হতে হতে সাত মাসে পৌঁছাল। তখন জুবায়ের (রা.)-কে বলা হলো, দুর্গের ভেতরে প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি বললেন, আমরা তো আঘাত ও মহামারির মুখোমুখি হতে এসেছি।
আমর ইবনে আসের জন্য বিজয় বিলম্বিত হচ্ছিল। তখন জুবায়ের (রা.) বললেন, আমি নিজেকে আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করছি। আশা করি, এর মাধ্যমে আল্লাহ মুসলমানদের বিজয় দান করবেন।
তিনি একটি মই এনে দুর্গের পাশের হাম্মাম মার্কেটের দিকের দেয়ালে সেটি ঠেকিয়ে দিলেন। এরপর তিনি মই বেয়ে ওপরে উঠলেন এবং সৈন্যদের বললেন, তোমরা যখন আমার তাকবির শুনবে, তখন সবাই একসঙ্গে তাকবির দেবে।
হঠাৎ তারা দেখল, জুবায়ের (রা.) দুর্গের চূড়ায় উঠে গেছেন। তার হাতে তরবারি এবং তিনি তাকবির দিচ্ছেন। তাকে অনুসরণ করে সৈন্যরা মইয়ের ওপর উঠতে শুরু করল। তখন আমর ইবনে আস (রা.) তাদের থামালেন, কারণ তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, বেশি লোক উঠলে মইটি ভেঙে যেতে পারে।
রোমানরা যখন দেখল, আরবরা দুর্গ দখল করে ফেলেছে, তখন তারা সেখান থেকে সরে গেল। এভাবেই বাবিলিয়নের দুর্গ মুসলমানদের জন্য খুলে গেল। এই দুর্গ বিজয়ের মধ্য দিয়ে মিসর বিজয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। জুবায়ের (রা.)-এর অসাধারণ সাহসই মুকাওকিসের বিরুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের সরাসরি কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ইসলামি উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী ছেলে সন্তান না থেকে শুধু মেয়ে সন্তান থাকলে সম্পদের বণ্টনের অনুপাত এবং অংশীদার বদলে যায়। প্রখ্যাত ইসলামি আলোচক ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আহমাদুল্লাহ এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
সম্প্রতি তাকে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেন বর্তমানে যাদের ছেলে নাই কিন্তু মেয়ে আছে, তার বাবা মৃত্যুর আগে সম্পত্তি মেয়েদের নামে লিখে দিয়ে যায় যাতে ভাতিজারা যেন না পায়। তা কতটুকু শরীয়ত সম্মত?
প্রশ্নের জবাবে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, কোনো মানুষ জীবদ্দশায় একটা মেয়ে আছে, সব সম্পদ তাকে লিখে দিয়েছে, অথবা দুইটা মেয়ে আছে, সব সম্পদ তাদেরকে দিয়ে গেছেন। ভাতিজারা যেন না পায় বা হকদাররা যেন না পায়। এই কাজ করা অনুচিত। যদি দিয়ে যায়, মেয়েদের জন্য সেটা হালাল হবে।
তিনি বলেন, এটি করা অনুচিত, কারণ কোনো ওয়ারিসকে বা আপনার সম্পদ কেউ পেতে পারে তাকে আপনি বঞ্চিত করার ইচ্ছা করলেন, এটা হলো তার প্রতি এক রকমের অবিচার ও জুলুম, এটা জায়েজ না। কিন্তু যদি এভাবে দিয়ে দেয় মেয়েদেরকে হেবা হিসেবে বা দান হিসেবে—ঠিক আছে আমি তোমাদেরকে দান করে দিলাম বা বাপ মেয়েদেরকে দান করতেই পারে সমান হারে দিল—তাহলে সেক্ষেত্রে সেটা দেওয়াটা জায়েজ হবে, কিন্তু অন্যকে যে ঠকানোর উদ্দেশ্য হয়েছে ওটার কারণে তার গুনাহ হবে।
তিনি আরও বলেন, অতএব এরকমটি না করা উচিত। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, তোমাদের ওয়ারিসদের মধ্যে কে বেশি উপকারে তোমরা জানো না। এজন্য আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন সে অনুযায়ী দেওয়া উচিত এবং ওইটাকে মানার ভেতরেই কল্যাণ আছে। আহমাদুল্লাহ বলেন, তবে হ্যাঁ, মেয়েদেরকে কিছু সম্পদ আপনি গিফট হিসেবে সমান হারে ভাগ করে দেন জীবদ্দশায়, সেটা ভিন্ন বিষয়। আর কিছু সম্পদ রাখেন যে মৃত্যুর পরে সমান হারে যার যা প্রাপ্য তা পাবে। সবগুলো আপনি দিয়ে দিবেন না। আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদেরকে আমল করার তৌফিক দান করুন।
দিনের সমস্ত ক্লান্তি দূর করে ঘুম মানুষের শরীরকে আবারও প্রাণবন্ত করে তোলে। এটি মহান আল্লাহ তা’য়ালার অশেষ নেয়ামতগুলোর মধ্যে একটি। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তিনিই তোমাদের জন্য রাতকে আবরণ ও নিদ্রাকে আরামপ্রদ করেছেন এবং দিনকে করেছেন জাগ্রত থাকার সময়।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৪৭)
পবিত্র কুরআনে মহান রাব্বুল আলামিন আরও ইরশাদ করেছেন, ‘আর আমি তোমাদের নিদ্রাকে করেছি ক্লান্তি দূরকারী। রাত্রিকে করেছি আবরণ।’ (সুরা নাবা, আয়াত: ৯-১০)। তবে ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষ অবচেতনভাবে নানা কাল্পনিক ঘটনা অনুভব করে থাকে, যাকে আমরা স্বপ্ন বলে অবহিত করে থাকি। এ ক্ষেত্রে স্বপ্নকে দুইভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। একটি হলো الرُّؤْيَا (আর-রুউয়া) বা ভালো স্বপ্ন এবং অপরটি الْحُلْمُ (আল-হুলমু) বা দুঃস্বপ্ন কিংবা খারাপ স্বপ্ন।
হাদিসে এসেছে, ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, আর খারাপ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে আসে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫১৫, ৬৫৩৩)। এজন্য রাসুল (সা.) দুঃস্বপ্ন বা খারাপ স্বপ্ন দেখলে উম্মতদের মহান রাব্বুল আলামিনের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলেছেন। আবার কোনো কোনো হাদিসে খারাপ স্বপ্ন দেখলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার পাশাপাশি বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলার কথাও এসেছে। (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস: ৩৪৫৩)
আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- ভালো স্বপ্ন হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর দুঃস্বপ্ন হলো শয়তানের পক্ষ থেকে। কাজেই কেউ যদি স্বপ্নে অপছন্দনীয় কিছু দেখে, তবে সে যেন তার বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে, আর এর অনিষ্ট থেকে যেন আল্লাহর কাছে পানাহ চায়। ফলে তা তার কোনো ক্ষতি করবে না। (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস: ২২৮০)
এ ক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যে অনেক সময় মানুষ স্বপ্নে মৃত বাবা-মা কিংবা পরিচিত কাউকে ডাকতে দেখেন। কেউ কেউ আবার নিজের কিংবা আত্মীয়-স্বজনদের কারও মৃত্যুও দেখে থাকেন। যার ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমন শোনা যায় যে, স্বপ্নে মৃত কাউকে ডাকতে দেখা কিংবা নিজের মৃত্যু দেখার অর্থ কাছের কেউ বা পরিচিত কেউ মারা যাবে। এমন স্বপ্ন আসলেই কি এই ইঙ্গিত দেয়?
আলেমদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শয়তান মানুষকে নাজেহাল করতে খারাপ স্বপ্ন দেখায়। অযথাই মানুষকে ভয়ংকর কিছু দেখায় পেরেশানি বা দুশ্চিন্তায় রাখতে। তবে কেউ খারাপ স্বপ্ন দেখলে সেটি আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি বা আলেম কিংবা স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানেন- এমন কাউকে ছাড়া অন্যদের বলার ক্ষেত্রে নিষেধ রয়েছে।
ইসলামিক স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহর মতে, স্বপ্নে কাউকে ডাকতে দেখা কিংবা নিজের মৃত্যু দেখলেই যে কেউ মারা যাবে, বিষয়টি এমন নয়। হতে পারে স্বপ্নে কেউ নিজের মৃত্যু দেখলো, অথচ বাস্তবে তার হায়াত (আয়ু) বাড়বে। এ কারণে যারা স্বপ্নের ব্যাখ্যা ভালো বুঝেন, এমন কারও কাছেই একমাত্র স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া উচিত।
জনপ্রিয় এই ইসলামিক স্কলারের ভাষ্য, যে স্বপ্ন দেখার পর নিজের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করে, এমন মনে হয় যে স্বপ্নে খারাপ কিছুর ইঙ্গিত পেয়েছেন- এমন স্বপ্ন কাউকে বলা উচিত নয়। এমন হলে বেশি বেশি ইস্তিগফারের পাশাপাশি মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে পানাহ চাওয়া উচিত। সেই সঙ্গে সম্ভব হলে তৎক্ষণাৎ বাম পাশে তিনবার থুথু ফেলার পাশাপাশি দুই রাকাত সালাত আদায় করা যেতে পারে বলেও মত শায়খ আহমাদুল্লাহর।
মনে রাখতে হবে, আবু রাযীন রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুসলিমের স্বপ্ন হয় নবুওয়াতের ছেচল্লিশ ভাগের একভাগ। যতক্ষণ পর্যন্ত এ বিষয় কারও সঙ্গে আলোচনা না করে, ততক্ষণ তা পাখির পায়ের ঝুলন্ত জিনিসের মতো। কিন্তু কারও সঙ্গে আলোচনা করে ফেললে (প্রদত্ত তা’বীর অনুসারেই বা স্বপ্নের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা অনুসারে) তা ঘটে যায়। (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস: ২২৮২)
এ ছাড়াও ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখার ক্ষেত্রে হাদিসে একই কথা হাদিসে এসেছে। আবু সালামা (রহ.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, আমি আবু কাতাদা (রা.) কে বলতে শুনেছি, তিনি এমন স্বপ্ন দেখতেন যা তাকে রোগাক্রান্ত করে ফেলত। অবশেষে তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেন- ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। তাই যখন কেউ পছন্দনীয় কোনো স্বপ্ন দেখে তখন এমন ব্যক্তির কাছেই বলবে, যাকে সে পছন্দ করে। আর যখন অপছন্দনীয় কোনো স্বপ্ন দেখে, তখন যেন সে এর ক্ষতি ও শয়তানের ক্ষতি থেকে আল্লাহর আশ্রয় চায় এবং তিনবার থু থু ফেলে আর সে যেন তা কারও কাছে বর্ণনা না করে। তাহলে এ স্বপ্ন তার কোনো ক্ষতি করবে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫৬৮)
মানুষের জীবনে কিছু বিস্মৃতি আছে, যা সাময়িক, আবার কিছু বিস্মৃতি এমন, যা মানুষের গোটা জীবনবোধকে বিপর্যস্ত করে দেয়। আল্লাহকে ভুলে যাওয়া তেমনই এক বিস্মৃতি, যার অভিঘাত মানুষের হৃদয়, চিন্তা, চরিত্র এমনকি পরকাল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার পাঁচটি অনিবার্য পরিণতি হলো—
১. নিজেকে ভুলে যাওয়া
আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার প্রথম এবং সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিণতি হলো, এতে মানুষ নিজের প্রকৃত পরিচয় এবং পৃথিবীতে আগমনের মূল উদ্দেশ্য ভুলে যায়। মানুষ তখন নিজের দেহের যত্ন নিলেও আত্মার পরিচর্যায় উদাসীন হয়ে পড়ে, ভবিষ্যতের জন্য সম্পদ সঞ্চয় করলেও আখেরাতের জন্য নেকি সঞ্চয়ে তেমন তৎপর থাকে না।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে তিনি তাদের নিজেদেরই ভুলিয়ে দিয়েছেন।’ (সুরা হাশর, আয়াত:১৯)
আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হলে মানুষের নিজের সঙ্গেও সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়। এটাই আত্মবিস্মৃতির সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ।
২. জীবন সংকীর্ণ হয়ে ওঠে
অন্তরের প্রশান্তি মানুষের জীবনে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। প্রাসাদ-অট্টালিকা, অর্থবিত্ত, সুনাম-সুখ্যাতি কিংবা সামাজিক মর্যাদা মানুষের বাহ্যিক জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের অস্থিরতা দূর করতে পারে না।
হৃদয়ের প্রকৃত প্রশান্তি আল্লাহর স্মরণে নিহিত। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ, আয়াত: ২৮)
অন্যদিকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখতার পরিণতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, তার জীবন হবে সংকীর্ণ।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ১২৪)
‘সংকীর্ণ জীবন’ মানেই যে দরিদ্র জীবন, বিষয়টি এত সরল নয়। ঘরে প্রাচুর্য থাকলেও হৃদয় অস্থিরতায় বিপর্যস্ত হতে পারে, চারপাশে অগুনতি মানুষ থাকলেও অন্তরে বাসা বাঁধতে পারে নিঃসঙ্গতা। এগুলো সংকীর্ণ জীবনেরই চিত্র।
৩. দুনিয়া হয়ে যায় জীবনের লক্ষ্য
আল্লাহকে ভুলে গেলে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। যে জীবনকে আল্লাহ আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহের সুযোগ হিসেবে দিয়েছেন, সেটিই তখন চূড়ান্ত গন্তব্য বলে মনে হয়।
ফলে সম্পদ, সন্তান, পদপদবি, জনপ্রিয়তা ও সামাজিক মর্যাদা প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে জীবনের আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে চলে আসে। মানুষ এগুলোর জন্য আল্লাহর নির্দেশও উপেক্ষা করতে শুরু করে।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এমন করবে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা মুনাফিকুন, আয়াত: ৯)
অর্থাৎ সমস্যা সম্পদে নয়, সন্তানেও নয়, সমস্যা তখনই, যখন এগুলো মানুষকে আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এর ফলে দুনিয়া ব্যবহার করার পরিবর্তে মানুষ দুনিয়ার দ্বারা ব্যবহৃত হতে থাকে।
৪. শয়তান হয়ে যায় তার নিত্যসঙ্গী
মানুষের অন্তর কখনো শূন্য থাকে না। আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হলে শয়তান ধীরে ধীরে মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘পরম দয়াময়ের স্মরণ থেকে যে বিমুখ হয়, আমি তার জন্য এক শয়তান নিয়োজিত করি, অতঃপর সে তার সঙ্গী হয়ে যায়।’ (সুরা যুখরুফ, আয়াত: ৩৬)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘শয়তান তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে এবং তাদের আল্লাহর জিকির ভুলিয়ে দিয়েছে।’ (সুরা মুজাদালা, আয়াত: ১৯)
শয়তান যখন মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তখন গুনাহ আর আগের মতো ভয়ংকর মনে হয় না। হারামকে বিভিন্ন যুক্তির আলোকে বৈধ মনে হয়, পাপের পর অনুশোচনা কমে আসে, নসিহত বিরক্তিকর মনে হয়।
৫. আখেরাতে অনুতাপ
আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার ভয়াবহ পরিণতি দুনিয়াতেই শেষ হয়ে যায় না, এর ছায়া বিস্তৃত থাকে আখেরাত পর্যন্ত।
এমন ব্যক্তি সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় সমবেত করব।’ সে বলবে, “হে আমার প্রতিপালক, আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় কেন উঠালেন? অথচ আমি তো দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন ছিলাম।”
আল্লাহ বলবেন, “এভাবেই তো আমার নিদর্শনাবলি তোমার কাছে এসেছিল, কিন্তু তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। আজ তেমনিভাবেই তোমাকে ভুলে যাওয়া হবে।”’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ১২৪-১২৬)
প্রতিদান কর্মের অনুরূপই হয়ে থাকে। যে ব্যক্তি দুনিয়ায় আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হয়ে তাঁকে ভুলে গিয়েছিল, এমনকি তাঁর স্মরণে নিহিত নিজের কল্যাণ থেকেও বিস্মৃত হয়েছিল, আখেরাতে তাকে অন্ধ, বধির ও বোবা অবস্থায় জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। (ইবনে নাসির সাদি, তাইসিরুল কারিমির রহমান ফি তাফসিরি কালামিল মান্নান, ৫১৬, মাকতাবাতুল উবাইকান, রিয়াদ, ১৪২২ হিজরি)
ফেরার দরজা এখনো খোলা
আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার পরিণতি যতই ভয়াবহ হোক, তাঁর দিকে ফিরে আসার দরজা এখনো খোলা। নিজের ভুল উপলব্ধি করাই সেই প্রত্যাবর্তনের প্রথম ধাপ।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর রহমত থেকে তোমরা নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)
আল্লাহর স্মরণ মানে জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে তাঁর বিধানকে প্রাধান্য দেওয়া, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্যে তাঁর ভয় অন্তরে ধারণ করা, নিয়ামতের শোকর আদায় করা, বিপদে তাঁর ওপর ভরসা রাখা এবং গুনাহ হয়ে গেলে বিলম্ব না করে তওবার মাধ্যমে রবের দিকে ফিরে আসা।
ছবি : সংগৃহীত
পবিত্র আখেরি চাহার সোম্বা আজ বুধবার। হিজরি ২৩ সনের সফর মাসের শেষ বুধবার মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) দীর্ঘ রোগে ভোগার পর সুস্থবোধ করেন। দিনটি বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোয় অত্যন্ত মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয়ে থাকে।
২৩ হিজরির শুরুতে মহানবী (সা.) গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ক্রমে অবস্থার অবনতি হওয়ায় নামাজের ইমামতি পর্যন্ত করতে পারছিলেন না। ২৮ সফর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। ওই দিন শেষবারের মতো গোসল করে নামাজে ইমামতি করেন রাসুল (সা.)। তাঁর সুস্থতার খবরে সাহাবিরা উচ্ছ্বসিত হয়ে হাজার হাজার স্বর্ণমুদ্রা দান করেন। তবে পরদিন আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। ১৫ দিন পর ১২ রবিউল আউয়ালে ইন্তেকাল করেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)।
ফারসি শব্দগুচ্ছ ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ অর্থ শেষ বুধবার। সাহাবিদের অনুসরণে এ দিন দানখয়রাত করেন মুসলমানরা। আখেরি চাহার সোম্বা উপলক্ষে আজ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।
ছবি : সংগৃহীত
সারাদিন কাজ আর কাজের চিন্তায় আমরা সব শক্তি শেষ করে ফেলি। দিনশেষে যখন ইবাদত করার সময় আসে, তখন শরীর আর সায় দিতে চায় না। মনে হয়, ইবাদতও বুঝি সারাদিনের কাজের তালিকার আরও একটা দায়িত্ব।
তাই আমরা চেষ্টা করি যত দ্রুত সম্ভব নামাজটা পড়ে শেষ করে দায়মুক্ত হতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নামাজ আর ইবাদত কি সত্যিই আমাদের জন্য কোনো বোঝা? নাকি আমাদের এই ব্যস্ত জীবনে শান্তির সবচেয়ে বড় জায়গা এটিই হতে পারত?
আসুন, নতুন করে ৫টি উপায় চর্চা করি, যা ইবাদতের স্বাদ ফিরিয়ে দেবে।
১. ভাবনাটা একটু বদলে নেওয়া দরকার
কেন আমাদের কাছে ইবাদত অনেক সময় কঠিন মনে হয়? কাজের ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়ার জন্য আমরা যতখানি মনোযোগ দিই, ইবাদতের বেলায় অতখানি দিতে পারি না। কেন এমন হয়? কারণ সংসারের কাজের ফল আমরা সঙ্গে সঙ্গে দেখতে পাই, আর ইবাদতের সুফল বা মানসিক শান্তিটা আমরা চট করে চোখে দেখতে পাই না।
তাই প্রথমেই আমাদের চিন্তাভাবনাটা একটু বদলে ফেলতে হবে। নামাজ কেন পড়ি? কেবল হুকুম মানার জন্য নয়, বরং আমাদের নিজেদের মঙ্গলের জন্যই মহান আল্লাহ এটি দিয়েছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, নামাজ মানুষকে অন্যায় ও খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখে। (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)
অন্য জায়গায় বলা হয়েছে, দিন ও রাতের নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায় করো, নিশ্চয়ই ভালো কাজ খারাপ কাজকে দূর করে দেয়। (সুরা হুদ, আয়াত: ১১৪)
দিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আসলে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরা কেন এই পৃথিবীতে এসেছি। মহান আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন তাঁর আনুগত্য ও ইবাদতের জন্য। (সুরা যারিয়াত, আয়াত: ৫৬)
এই সহজ কথাটা মনে লালন করতে পারলে নামাজকে আর কোনো কঠিন দায়িত্ব মনে হবে না। সারাদিনের বিশৃঙ্খলা ও মানসিক চাপের মধ্যে নামাজ আমাদের মনকে এনে দেবে অদ্ভুত এক শান্তি ও স্থৈর্য। তখন আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোকেই জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা বলে মনে করবে।
২. মনকে এক জায়গায় আনা
আমাদের জীবনটা এখন এমন হয়ে গেছে যে, আমাদের মন কখনোই এক জায়গায় স্থির থাকে না। মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া, নানা চিন্তা—সব মিলিয়ে মন অলস বসে থাকার সুযোগ পায় না।
এমনকি যখন আমরা নামাজে দাঁড়াই, তখনও মাথার ভেতরে সংসারের নানা চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে। ফলে রুকু-সেজদা তো আমরা করি ঠিকই, কিন্তু অন্তরে আল্লাহর সঙ্গে সেই গভীর যোগাযোগটা তৈরি হয় না।
এই যান্ত্রিকতা দূর করার সহজ উপায় হলো সেজদা। সেজদাই হলো মানুষের জন্য তার স্রষ্টার সবচেয়ে কাছাকাছি যাওয়ার সময়। রাসুল (সা.) বলেছেন, বান্দা সেজদার অবস্থাতেই তার রবের সবচেয়ে কাছে পৌঁছায়, তাই তোমরা সেজদায় বেশি বেশি দোয়া কোরো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২)
তাই নামাজে সেজদার সময় তাড়াহুড়ো না করে কিছুটা বেশি সময় থাকুন। নিজের মনের সব কথা ও অনুভূতি নীরব ভাষায় আল্লাহর কাছে খুলে বলুন। সেজদার এই কয়েকটা মুহূর্তই আপনার নামাজকে একটি নিয়মমাফিক অভ্যাসের বদলে হৃদয়ের সুগভীর ভালোবাসায় বদলে দেবে।
৩. সংসারের দায়িত্বও তো ইবাদত
ইবাদতকে গুরুত্ব দেওয়ার মানে কিন্তু এই নয় যে আপনি সংসারের কাজ বা অন্যান্য দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন। ইসলাম আমাদের কাজ ফেলে ঘরকুনো হয়ে বসে থাকতে বলে না। পরিবার, সন্তান, মা-বাবা কিংবা সহকর্মীদের প্রতি আমাদের যে দায়িত্ব রয়েছে, তা পালন করা অত্যন্ত জরুরি।
সত্যি বলতে কি, সঠিক নিয়তে পরিবারের যত্ন নেওয়া বা নিজের দায়িত্ব পালন করাও এক ধরনের ইবাদত। মহানবী (সা.) বলেছেন, একজন মুমিন যা ভালো কাজ করে এবং পরিবারের জন্য যে খরচ করে, সেটাও তার জন্য সদকা বা ইবাদত হিসেবে লেখা হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫)
কাজের পাশাপাশি যদি অন্তরে এই চিন্তা থাকে যে আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কাজগুলো করছি, তবে আপনার পুরো দিনটাই ইবাদতে পরিণত হবে। প্রতিদিন সকালে কাজের শুরুতেই মনে মনে আল্লাহকে স্মরণের নিয়ত করে নিন।
কাজের চাপে মন যখন ক্লান্ত হয়ে পড়বে, তখন আবার নতুন করে আল্লাহর নাম স্মরণ করুন। ইবাদত জীবন থেকে আলাদা কিছু নয়, বরং সুন্দর জীবনযাপনেরই পথ।
৪. নিজের সাধ্য জানা ও মধ্যপন্থা
আত্মিক উন্নতির পথে আরেকটি বড় বাধা হলো নিজের সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ করতে যাওয়া। ধর্মের ক্ষেত্রে সবার ক্ষমতা সমান নয়। ইসলাম মানুষের ওপর অসাধ্য কিছু চাপিয়ে দেয় না। যেমন, কারও যদি নফল রোজা রাখা সহজ মনে হয়, তবে তিনি রোজা রাখতে পারেন।
কিন্তু যদি রোজা রাখলে শরীর বেশি খারাপ হয়ে যায় বা দৈনন্দিন কাজে বড় ব্যাঘাত ঘটে, তবে নিজেকে জোর না করে অন্য কোনো আমল বেছে নেওয়া উচিত।
আপনি সাধ্যমতো দান-সদকা করতে পারেন, রাতে একটু তাহাজ্জুদ পড়তে পারেন কিংবা আল্লাহর রাসুলের ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করতে পারেন।
মহানবী (সা.) ইবাদতের ব্যাপারে সবসময় সহজ পথ ও মধ্যপন্থা বেছে নিতে বলেছেন। তিনি আমাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যে ব্যক্তি ধর্মের ব্যাপারে অতিরিক্ত কঠোরতা করে, ধর্ম তার ওপর বিজয়ী হয়ে যায় এবং একপর্যায়ে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯)
তাই নিজের শরীর ও মনকে জানুন। আপনার জন্য যে আমলটি সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়, সেটির মাধ্যমেই আল্লাহর প্রিয় হওয়ার চেষ্টা করুন।
৫. কারো তুলনা নয়, নিজের উন্নয়ন
ইবাদতকে দীর্ঘস্থায়ী ও আনন্দময় রাখার শেষ উপায় হলো, নিজের সঙ্গে অন্যের তুলনা না করা। কে কত বেশি নামাজ পড়ছে বা কে কতটা ইবাদত করছে, তা দেখে নিজের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করা ঠিক নয়। প্রত্যেকের পরিস্থিতি ও শক্তি আলাদা।
অন্যের দেখাদেখি হঠাৎ এমন কোনো কঠিন কাজ শুরু করা উচিত নয়, যা পরে ধরে রাখা যায় না। বরং নিজের আগের অবস্থার সঙ্গে আজকের অবস্থার তুলনা করুন।
যেমন—আপনি যদি এখন প্রতিদিন কোরআনের একটি পৃষ্ঠা পড়েন, তবে আস্তে আস্তে তা বাড়িয়ে দুটি পৃষ্ঠা করার চেষ্টা করুন। সেই নিয়মটি নিজের অভ্যাসে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত সেটুকুই ধরে রাখুন।
ইসলামে খুব বেশি আমল একবারে করার চেয়ে নিয়মিত ছোট ছোট আমল করাকে বেশি পছন্দ করা হয়েছে। নবীজিকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি? তিনি উত্তরে বললেন, যে আমল নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৫)
সাধ্যের বেশি করতে গেলে একসময় মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং সব আমল একবারে ছেড়ে দেয়। তাই নিজেকে সময় দিন এবং অল্প হলেও নিয়মিত ইবাদত চালিয়ে যান।
পরিশেষে বলা যায়, ইবাদত কোনো যান্ত্রিক শারীরিক অভ্যাস নয়, এটি হলো স্রষ্টার সঙ্গে বান্দার এক মধুর আত্মিক সম্পর্ক। ক্লান্তি আর ব্যস্ততায় ভরা জীবনে ইবাদতকে যদি একটু বিরতি ও শান্তির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা যায়, তবে তা আমাদের মন ও জীবনের গতি পুরোটাই বদলে দেবে।
দাম্পত্য জীবনের শুরুটা সহজ, কিন্তু সেটাকে বছরের পর বছর সুন্দর রাখা মোটেই সহজ কাজ নয়। এর জন্য লাগে ধৈর্য, আন্তরিকতা, ত্যাগ আর একটু প্রজ্ঞা। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে গিয়ে অনেক সময় নিজের অভিমান আর রাগ সংযত করতে হয়।
একজন স্বামীর ভূমিকা তখন হয়ে ওঠে কৌশলী আর স্নেহশীল একজন অভিভাবকের মতো। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাপড়া না থাকলে সম্পর্ক ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে, কখনো কখনো তা গড়ায় বিচ্ছেদ পর্যন্ত।
অথচ কিছু সহজ, প্রতিদিনের অভ্যাস নিয়মিত চর্চা করলে ভালোবাসা আর বিশ্বাস অনেক গভীর হয়ে ওঠে। স্ত্রীর ভুল হলে অপমান নয়, ভালোবাসা দিয়েই তা সংশোধন করা উচিত। তাঁকে অনুভব করাতে হয় যে পৃথিবীতে আপনিই তাঁর সবচেয়ে আপন মানুষ।
১. নিজের যত্ন নেওয়া, তাঁর যত্ন নেওয়া
স্ত্রীর সামনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকাটা ছোট বিষয় মনে হলেও এর প্রভাব গভীর। সাহাবি ইবনে আব্বাস (রা.) নিজে এ অভ্যাসের কথা বলেছেন, ‘আমি আমার স্ত্রীর জন্য এমনই পরিপাটি থাকতে পছন্দ করি, যেমন আমি তার কাছ থেকে সাজগোজ পছন্দ করি।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবাহ, হাদিস: ১৯২৬৩)
স্ত্রী যেভাবে দেখতে পছন্দ করেন, সেভাবে থাকার চেষ্টাটা আসলে সম্মানেরই একটা প্রকাশ।
পরিবারের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো খাবারের ব্যবস্থা করাও এ যত্নেরই অংশ। সব সময় সম্ভব না হলেও মাঝেমধ্যে বিশেষ আয়োজন করা যায়, আর এখানে কার্পণ্য না করাই ভালো।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘সওয়াবের আশায় কোনো মুসলিম যখন তার পরিবারের জন্য ব্যয় করে, তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৫১)
ঘরের কাজে সুযোগ পেলে সহযোগিতা করা আর ছোট ছোট ভালো কাজেরও আন্তরিক প্রশংসা করা—এসবও একই সুতোয় গাঁথা। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবীজি প্রায়ই খাদিজা (রা.)-এর প্রশংসা করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২২৯)
এমনকি খাদিজার মৃত্যুর পরও নতুন স্ত্রীর সামনেই প্রশংসা করতেন। প্রশংসা কখনো পুরোনো সম্পর্ককে খাটো করে না; বরং ভালোবাসা বাড়ায়।
২. সম্মান কখনো হারাতে দেওয়া যাবে না
দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ হতেই পারে। প্রয়োজনে কিছু সময় দূরে থাকা যায়, বিছানা আলাদা করা যায়, কিন্তু গায়ে হাত তোলা কখনোই নয়। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কেউ যেন নিজের স্ত্রীকে দাসের মতো প্রহার না করো। দিনের শেষে তো তার সঙ্গেই মিলিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২০৪)
এ সতর্কতা এতটাই স্পষ্ট যে এখানে কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না।
সম্মান রক্ষার আরও কিছু দিক আছে, যেগুলো চোখে কম পড়ে, কিন্তু প্রভাব ফেলে গভীরভাবে। খারাপ নামে ডাকা, অশালীন ভাষা ব্যবহার, স্ত্রীর মা–বাবাকে নিয়ে কটূক্তি—এসব সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য; যৌতুকের দাবি বা ইঙ্গিতও তা-ই।
স্ত্রীকে অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করাটাও একধরনের অসম্মান। তাঁকে বরং অনুভব করানো উচিত যে তিনি অনন্য, প্রতিস্থাপনযোগ্য নন। তাঁর ভুল সবার সামনে প্রকাশ না করে আড়ালে ভালোবাসার সঙ্গে সংশোধনের চেষ্টা করাই ভালো, আর পুরোনো ভুল বারবার মনে করিয়ে দেওয়াও একধরনের নিষ্ঠুরতা।
ক্ষমা করতে শেখা আর সামনে এগিয়ে চলাই সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ।
৩. সময় দেওয়া: নবীজি যা মনে রাখতেন
দাম্পত্য জীবনে হালকা, খেলাচ্ছলে সময় কাটানোকে অনেকে গুরুত্বহীন মনে করেন, অথচ নবীজির নিজের জীবনেই এর স্পষ্ট নজির আছে।
আয়েশা (রা.) বলেন, এক সফরে নবীজি তাঁর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। প্রথমবার আয়েশা জিতে যান। বছর কয়েক পর, যখন আয়েশার শরীর কিছুটা ভারী হয়ে গেছে, আবার প্রতিযোগিতা হলো, এবার নবীজি (সা.) জিতলেন। তিনি হেসে বললেন, ‘এটা সেই আগের হারের বদলা।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৭৮)
এই ছোট্ট ঘটনাই বলে দেয়, স্ত্রীর সঙ্গে হালকা, রসিকতাপূর্ণ সময় কাটানো নবীজির নিজস্ব অভ্যাসের অংশ ছিল।
এ বিষয়ে নবীজি (সা.) একটা সাধারণ নীতিও বলে দিয়েছে, মানুষের অধিকাংশ বিনোদনমূলক কাজই অর্থহীন, তবে কয়েকটি ব্যতিক্রম আছে। তিনি বলেন, ‘মানুষ যা নিয়ে খেলাধুলা করে, তার সবই অনর্থক, তিনটি বিষয় ছাড়া—তিরন্দাজি, ঘোড়া প্রশিক্ষণ আর স্ত্রীর সঙ্গে খেলা।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৬৩৭)
অর্থাৎ স্ত্রীর সঙ্গে হালকা সময় কাটানোকে ইসলাম নিছক অপচয় নয়; বরং সময়োপযোগী ও অর্থবহ কাজ হিসেবে দেখে।
এর আলোকেই প্রতিদিন কিছুটা সময় মন খুলে কথা বলা, একসঙ্গে খাওয়া, একটু হাঁটা, মাঝেমধ্যে কোথাও ঘুরতে যাওয়া—এসব ছোট অভ্যাসকে বাড়তি বিলাসিতা না ভেবে বরং সুন্নাহরই একটা অংশ হিসেবে দেখা যায়।
নতুন দাম্পত্যে স্ত্রীকে একা না রেখে সান্নিধ্যে রাখা, আবার তাঁকে মাঝেমধ্যে বাবার বাড়িতে যেতে দেওয়া—দুটোই এই একই নীতির বাস্তব প্রয়োগ: সম্পর্কটাকে জীবন্ত রাখা।
৪. রাগের মুহূর্তই আসলে পরীক্ষা
ওপরের প্রতিটি অভ্যাসের আসল পরীক্ষা হয় রাগের মুহূর্তে। নবীজি (সা.) শক্তির সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিলেন এ প্রসঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং শক্তিশালী সে-ই, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)
দাম্পত্য জীবনের ঝগড়া-বিবাদে এ নীতিই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে—রাগের মাথায় নেওয়া সিদ্ধান্ত প্রায়ই সারা জীবনের অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়; যেখানে একটু থেমে শান্ত হওয়াটাই বড় শক্তির পরিচয়।
সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে ওঠে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ, ক্ষমাশীলতা আর আল্লাহভীতির ওপর। অভিমান, রাগ, অহংকার আর অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া থেকে দূরে থেকে একে অপরের সুখ-দুঃখের সাথি হওয়ার চেষ্টাই আসল কাজ।
সুন্দর সংসার হঠাৎ তৈরি হয় না, এটা গড়ে ওঠে প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণ, ত্যাগ আর আন্তরিকতার মধ্য দিয়ে। আল্লাহ–তাআলা আমাদের সবাইকে ভালোবাসা, রহমত ও প্রশান্তিতে ভরপুর দাম্পত্য জীবন দান করুন।