দেশের পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা বন্ধ
গত দুই বছরে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এই হিসাব শিল্প পুলিশ ও উদ্যোক্তা সংগঠনগুলোর। কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ গ্যাস-বিদ্যুতের অভাব এবং সে কারণে উৎপাদন সক্ষমতা কমে আসা। এমন পরিস্থিতিতে আরও অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
উদ্যোক্তা ও শ্রমিক নেতারা বলছেন, কারখানা বন্ধের কারণে বহু শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। শুধু পোশাক খাতেই কাজ হারিয়েছেন দেড় লাখ শ্রমিক। অন্যান্য খাত হিসাবে নিলে এ সংখ্যা অনেক বড় হবে।
শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার প্রভাবে রপ্তানি আয়ও কমছে। সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি আগের অর্থছরের চেয়ে ১ শতাংশের মতো কমেছে। আর রপ্তানি আয় কমেছে আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
পাশাপাশি এই সময়ে নতুন রপ্তানি আদেশ কমেছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হালনাগাদ উপাত্ত বলছে, গত অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়া দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অভিঘাত বলছেন অর্থনীতিবিদরা। গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এত শিল্পকারখানা বন্ধ থাকা এবং আরও বড় সংখ্যক কারখানা বন্ধের ঝুঁকিতে থাকা দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য অনেক বড় অভিঘাত। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তাঁর মতে, সরকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করলেও অনেক শিল্পকারখানাই এখন আর উৎপাদনে ফেরার মতো অবস্থায় নেই। কিছু কারখানার জন্য টাকাই যথেষ্ট নয়। তাদের জন্য ‘এক্সিট পলিসি’ নেওয়া যেতে পারে। আর প্রণোদনায় প্রাণ ফিরবে এমন কারখানায় পরিচালন পুজি জোগান ও গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রমিকের একটু ভালো রাখার জন্য শিল্প এলাকায় ওএমএস কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা দরকার।
কাজ হারিয়েছেন দেড় লাখ শ্রমিক
ইন্ডাস্ট্রিঅল গ্লোবাল ইউনিয়ন ট্রেড ইউনিয়নের একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম। ১৩০টি দেশে তাদের কার্যক্রম রয়েছে। প্ল্যাটফর্মটির বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার মনে করেন, দুই বছরে বন্ধ কারখানার প্রকৃত সংখ্যা ৫০০ নয়, এর দ্বিগুণ হবে।
বড় কারখানার বাইরে ছোট কারখানা বন্ধ হলে সরকারি সংস্থা বা বাহিনী তা নথিভুক্ত করে না। তাঁর দাবি, গত দু্ই বছরে শুধু পোশাক খাতেই দেড় লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন।
উদ্যোক্তা ও শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, কারখানা বন্ধের প্রধান কারণ গ্যাস-বিদ্যুতের অভাব এবং উৎপাদন সক্ষমতা কমে আসা। কিছু কারখানার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা ও সময়মতো শিপমেন্ট করতে না পারা বন্ধ হওয়ার কারণ। আন্তর্জাতিক কারণের মধ্যে রয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলাকে কেন্দ্র করে জ্বালানিসহ বিশ্ববাজারে অস্থিরতা; রাশিয়া, ইউক্রেনের যুদ্ধের অভিঘাত, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ এবং এর জেরে বিশ্ববাণিজ্যের ওলট-পালট পরিস্থিতি ও বিশ্ববাজারে নিম্নমুখী চাহিদা।
পরিসংখ্যান কী বলে
শিল্প পুলিশের হিসাবে ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরে ৪৫৭টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে ১৭০টি। বাকি ২৮৭টি পোশাকবহির্ভূত। বন্ধ হওয়ার তালিকায় তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সদস্য কারখানা ১০৮টি, নিট ক্যাটেগরির পণ্য উৎপাদক ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএর কারখানা ৩৫টি, বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর কারখানা আটটি। বাকি ১৯টি বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ বা বেপজার অধিভুক্ত কারখানা।
তবে শিল্প পুলিশের তথ্যের সঙ্গে পোশাক ও বস্ত্র খাতের তিন সংগঠনের তথ্যের ফারাক রয়েছে। বিজিএমইএর উপাত্ত বলছে, দুই বছরে সংগঠনের ২২১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে।
এর মধ্যে গত বছর সর্বাধিক ১৪১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। আগের বছর ২০২৪ সালে বন্ধ হয় ৭৭টি কারখানা। ঢাকা ও চট্টগ্রাম জোন মিলে বিজিএমইএর সদস্য কারখানা এখন ২ হাজার ১২৭টি।
শিল্পাঞ্চলে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট
গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। চাহিদার তুলনায় সাভার ও আশুলিয়ার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর সরবরাহ প্রায় ৪০ শতাংশ কম। ফলে লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে জেনারেটর চালাতে হয়। সে ক্ষেত্রেও গ্যাস ও ডিজেল চাহিদামতো না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এ ছাড়া নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় অনেক কারখানা উৎপাদনে যেতে পারছে না। চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের ডজন খানেক স্টিল রি-রোলিং মিল এবং সিরামিক কারখানা গ্যাসের চাপ সংকটের কারণে তাদের চুল্লি ঠিকমতো চালু রাখতে পারছে না।
আরও কারখানা ঝুঁকিতে
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বন্ধ হওয়া দুই শতাধিক কারখানার বাইরে আরও দুই শতাধিক কারখানা বন্ধের ঝুঁকিতে রয়েছে। কারখানাগুলো এখন আংশিক সচল। যে কোনো সময় এগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সরকারের প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ পাওয়ার আগ্রহ দেখানো এই ৪০০ কারখানার সক্ষমতা যাচাইয়ে দুটি অডিট ফার্মকে এরই মধ্যে কাজ দেওয়া হয়েছে। কারখানাগুলো পরিদর্শন করে বিজিএমইএর কাছে প্রতিবেদন জমা দেবে তারা। অডিট ফার্মগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে বিজিএমইএ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তালিকা দিয়ে ঋণ সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানাবে।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ‘যদি আমাকে ৫০০ বার প্রশ্ন করেন, শিল্পের জন্য কী চান? প্রতিবারই আমি বলব নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ।’ গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া না গেলে ঋণ সহায়তা দিয়ে শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।’
বিটিএমএ সূত্রে জানা গেছে, সংগঠনের সদস্য ২৩৪টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। অবশ্য এই হিসাব ২০১৯ সাল থেকে গতকাল পর্যন্ত। বন্ধ কারখানার মধ্যে ১১৪টি স্পিনিং অর্থাৎ সুতা উৎপাদনের কারখানা। বন্ধ থাকা বাকি কারখানাগুলো কাপড় তৈরি, ডায়িং, প্রিন্টিং ও ফিনিশিংয়ের। বন্ধ হওয়ার পর বিটিএমএর কারখানার সংখ্যা এখন ১ হাজার ৮৬৯টি। বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল সম্প্রতি জানিয়েছেন, তাঁরই পাঁচটি স্পিনিং মিল বন্ধ রয়েছে।
বিটিএমএ সূত্র জানিয়েছে, কারখানা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ১ হাজার ১২১ কারখানায় আংশিক উৎপাদনে রয়েছে। সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক উৎপাদন হচ্ছে কারখানাগুলোতে। বিজিএমইএর এ মুহূর্তে আংশিক সচল কারখানার সংখ্যা ১ হাজার ৩২১টি। আংশিক চালু কারখানাগুলোর অধিকাংশই বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।
আশুলিয়ার লিটিল স্টার স্পিনিং মিল দীর্ঘদিন ধরে সক্ষমতার ৫০ শতাংশ কম উৎপাদন করছে। মিলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম খোরশেদ আলম বলেন, তাঁর কারখানায় গ্যাসের চাপ থাকার কথা ১০ পিএসআইজি। অথচ বেশির ভাগ দিনই ১ বা ২ পিএসআইজির বেশি থাকে না। এ কারণে মেশিন চালু করা যায় না। কোনো রকমে সক্ষমতার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।
রপ্তানি আদেশ কমছে
রপ্তানি আদেশের পরিস্থিতি বোঝা যায় ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন- ইউডির উপাত্তে। রপ্তানি আদেশ পাওয়ার পর পোশাক উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানি করে থাকে কারখানাগুলো। আদেশে উল্লিখিত পোশাকের পরিমাণ অনুযায়ী কাঁচামালের প্রয়োজনীয়তার সনদ হচ্ছে ইউডি। এ সনদ সরকারের পক্ষে পোশাক খাতের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ দিয়ে থাকে।
উপাত্তে দেখা যায়, আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে রপ্তানি ইউডি সংখ্যা ও অর্থমূল্যে ব্যাপক হারে কমেছে। গত বছরের মার্চ মাসে ইউডির সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ৬৯৭টি। অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩৫ কোটি ডলার। এ বছরের মার্চে ইউডি কমে হয়েছে ২১ হাজার ৪৪১টি। অর্থমূল্য ২০০ কোটি ডলারের কিছু কম।
গত বছরের এপ্রিলে ইউডির সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৪৮৮টি। এর বিপরীতে পণ্যের অর্থমূল্য ছিল ২৩৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার। এ বছরের এপ্রিলে ইউডি ছিল ২৭ হাজার ৫১৫টি। অর্থমূল্য ২৮৫ কোটি ডলারের কম। গত বছরের মে মাসে ইউডি ছিল ২৬ হাজার ৫৪১টি। অর্থের পরিমাণ ২২৭ কোটি ডলার।
এ বছরের একই মাসে ইউডি কমে হয় ২৬ হাজার ৬৮টি। অর্থমূল্য কমে দাঁড়ায় ২৫৪ কোটি ডলার। গত বছরের জুনে ছিল ১৮ হাজার ৩৭২টি। অর্থের পরিমাণ ছিল ২২৭ কোটি ডলারের বেশি, যা গেল জুনে হয়েছে ১৭৯ কোটি ডলার।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, কৃষিখাত লাভজনক করতে সরকারকে প্রণোদনা দিতে হবে, কৃষকদের সাহায্য করতে হবে। কৃষিতে ভর্তুকি দিতে হবে। যদিও বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ ভর্তুকি দিতে বাধা দেয়। আজ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের আয়োজনে কৃষি বিজ্ঞানীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, যেসব খাতে ঘাটতি আছে, গবেষণার মাধ্যমে তা সমাধান করা প্রয়োজন। উৎপাদনের পর কৃষক দাম পায় না, আবার কৃষক যখন ফসল ফলায় তখন বাড়তি দামে বীজ কিনতে হয়।
ফল ও সবজি দীর্ঘদিন মজুত রাখার জন্য কোল্ড স্টোরেজ করা প্রয়োজন জানিয়ে তিনি বলেন, এজন্য বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে।
কৃষি এখন লাভজনক নয় উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, জীবন ব্যয়ের যোগান না থাকায় মাঠে এখন শ্রমিক পাওয়া যায় না। কৃষি এখন লাভজনক নয় বলেই অনেকেই পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। এক্ষেত্রে সরকারকে প্রণোদনা দিতে হবে, কৃষকদের সাহায্য করতে হবে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, পেঁয়াজ চাষে বিপ্লব হয়েছে, এখন আর আমদানি করতে হয় না। ফলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে গেলেও তার প্রক্রিয়া সুখকর নয়। জমিতে সার ব্যবহার নিয়ে কৃষকদের সচেতনতা তৈরি করতে হবে। জমিতে ফার্টিলাইজার ব্যবহারে ঊর্বরতা কমে যায়।
কৃষি বিজ্ঞানীদের নিয়ে তিনি বলেন, কৃষি বিজ্ঞানীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। আইন পরিবর্তন করে হলেও কৃষি বিজ্ঞানীদের পেনশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনে সব ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি সবপ্রতিষ্ঠানে ছেয়ে গেছে। এখন সুযোগ এসেছে সেখান থেকে বের হয়ে আসার। সবাই একটু ধৈর্য্য ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলে সফলতা আসবে।
এই মতবিনিময় সভায় উঠে আসে বাংলাদেশের বর্তমান কৃষি নানা চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা। বক্তারা বলেন, কৃষিতে উৎপাদনের সাথে সাথে মানের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে তবে এখন রপ্তানি দিকে নজর দিতে হবে। শুধু বাংলাদেশিদের জন্য নয় বরং এর বাইরে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে পণ্য পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশের কথা মাথায় রেখে কীটনাশক আরও উন্নত করার জন্য গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রতীকী ছবি
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি এসময়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৪৩ জন। আজ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়।
বুলেটিনে বলা হয়, এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট ৩৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে অক্টোবরের প্রথম ১৪ দিনে মারা গেছে ৮৬ জন। পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ ১৪৮ জন, আগস্টে ৪৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন, জুনে ১৩ জন, মে মাসে একজন এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
বুলেটিনে উল্লেখ করা হয়, গতকাল সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৯৪৩ জন ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ২৫৯ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ হাজার ৮৩০ জন। এ পর্যন্ত মোট ১ লাখ ১ হাজার ৩১ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়
দীর্ঘসময় বন্ধ থাকার পর অবশেষে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের আবেদন করার আহ্বান জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। আজ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে এই আহ্বান জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়, মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী দেশটিতে কাজ করছেন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বন্ধ ও সীমিত হয়ে যাওয়া বৈদেশিক শ্রমবাজার পুনরায় চালু ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল), ২৫টি বেসরকারি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি এবং ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করতে সম্মত হয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে এজেন্সির সংখ্যা ৩৩৮টি।
মন্ত্রণালয় জানায়, তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিজেদের উদ্যোগে মালয়েশিয়ায় নিয়োগকর্তা খুঁজে বের করতে পারবে, চাকরির চাহিদাপত্র সংগ্রহ করতে পারবে এবং বাংলাদেশ থেকে কর্মী নির্বাচন করে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।
পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার কর্মী সম্পূর্ণ বিনা খরচে নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে মালয়েশিয়া। এ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশটির শ্রমবাজারে আরও উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করছে সরকার।
প্রথম ধাপ: জব ওর্ডার সংগ্রহ
মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত সকল বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার থেকে নিজেদের উদ্যোগে জব ওর্ডার বা ডিমান্ড সংগ্রহ করতে পারবে।
দ্বিতীয় ধাপ: কর্মী নির্বাচন
যে এজেন্সি জব ওর্ডার সংগ্রহ করবে, সেই এজেন্সি বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুসরণ করে নিজের কর্মী নির্বাচন ও নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। অর্থাৎ, কর্মী সংগ্রহ ও নির্বাচন করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির নিজের কাছেই থাকবে।
তৃতীয় ধাপ: মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক প্রসেসিং
যেখানে মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রশাসনিক প্রসেসিং প্রয়োজন হবে, যেমন কলিং ভিসা, ই-ভিসা এবং অন্যান্য নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়া, সেখানে সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)-সহ তালিকাভুক্ত অপর ২৫টি প্রসিসিং ও সার্ভিস এজেন্সি প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে।
চতুর্থ ধাপ: বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স
মালয়েশিয়ার প্রয়োজনীয় প্রসেসিং সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করবে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত প্রতিটি বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সি তার নিজের রিক্রুটিং লাইসেন্সের মাধ্যমেই তার নিজস্ব কর্মীদের বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স সম্পন্ন করতে পারবে।
অর্থাৎ, জব ওর্ডার যে এজেন্সি সংগ্রহ করবে এবং কর্মী যে এজেন্সি নির্বাচন করবে, সেই এজেন্সি নিজের লাইসেন্সের অধীনেই তার কর্মীদের বাংলাদেশের সরকারি ক্লিয়ারেন্স সম্পন্ন করতে পারবে।
সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) এবং অপর ২৫টি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি প্রশাসনিক প্রসেসিংয়ের কাজ করবে। বিএমইটি-এর ছাড়পত্রের জন্য তারা অনুমোদিত এজেন্সিকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দিতে পারবে। এর মাধ্যমে প্রতিটি রিক্রুটিং এজেন্সির নিজস্ব দায়িত্ব, জবাবদিহিতা এবং ব্যবসায়িক স্বাধীনতা বজায় থাকবে।
কর্মীদের স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে
এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বাংলাদেশের কর্মীদের স্বার্থ। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে, কিন্তু সেই কর্মসংস্থানের জন্য একজন কর্মীকে অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা বহন করতে দেওয়া যাবে না। আমরা চাই একজন কর্মী যতটা সম্ভব সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পান।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর প্রতিও আমাদের আহ্বান থাকবে, আপনারা ব্যবসা করবেন, নতুন জব ওর্ডার সংগ্রহ করবেন এবং আরও বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবেন; কিন্তু সবকিছু করতে হবে দেশের আইন মেনে এবং কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে।
এখন পরবর্তী পদক্ষেপ কী
মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের মেডিক্যাল পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টার চূড়ান্ত করা একটি চলমান প্রক্রিয়া। বিদ্যমান এমওইউ অনুযায়ী, মেডিক্যাল সেন্টার চূড়ান্ত করার বিষয়টি বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার যৌথ দায়িত্ব।
শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্তকরণের স্বার্থে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যমান মেডিক্যাল সেন্টারগুলো পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু যেহেতু মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রতিনিধি দল সরেজমিনে বাংলাদেশে এসে প্রতিটি মেডিক্যাল সেন্টার পরিদর্শনের পর চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে, সেহেতু এই প্রক্রিয়ায় সময়ের প্রয়োজন। তাই মালয়েশিয়া সরকার অনুমোদিত বিদ্যমান তালিকা থেকে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে ফ্যাসিবাদ ও অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিতর্কিত মেডিক্যাল সেন্টার বাদ দিয়ে মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত অবশিষ্ট মেডিক্যাল সেন্টারের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে, শ্রমবাজার চালুর পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব মালয়েশিয়ার তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে নতুন নীতিমালার আলোকে যাচাই-বাছাই করে মেডিক্যাল সেন্টারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু করবে।
মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত মেডিক্যাল সেন্টারগুলো বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিয়মিতভাবে যাচাই-বাছাই করা হয় এবং সেগুলোকে স্থানীয় নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। কোনও অনিয়ম পাওয়া গেলে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট মেডিক্যাল সেন্টারের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য করবে। আমরা নিয়মিতভাবে এই প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এছাড়াও যথাসময়ে এই তালিকায় আরও কিছু নতুন মেডিক্যাল সেন্টার যুক্ত করা হবে। দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।
নতুন মেডিক্যাল সেন্টার যুক্ত করা হলে তা সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে এবং আমাদের মন্ত্রণালয়ও সবার জন্য সেই তালিকা ঘোষণা করবে। আমরা পর্যায়ক্রমে অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টারগুলোর তালিকা নিশ্চিত করবো।
আমাদের লক্ষ্য শুধু মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো নয়। আমাদের লক্ষ্য হলো আরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, বৈধ ও যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করা এবং সর্বোপরি আমাদের কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা।
এটি শুধু একটি শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগ নয়। আমরা এটিকে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার শ্রম সহযোগিতার একটি নতুন এবং আরও অংশগ্রহণমূলক অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখতে চাই।
ঘোষণা
মালয়েশিয়ায় যেতে আগ্রহী কর্মী ভাই-বোনদের জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়ে মন্ত্রণালয় এক সংবদা বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, আগ্রহী কর্মীরা তালিকাভুক্ত ও অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন এবং অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টার থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট মেডিক্যাল সেন্টারকে এককভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে না। আমরা চাই, কর্মীরা যেন সহজে, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এবং কোনও ধরনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ পান।
এই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জনে দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মন্ত্রণালয় বলেছে, একইসঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাদের সহযোগিতা ও ইতিবাচক মনোভাবের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানানো হচ্ছে।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, এখন সবার দায়িত্ব সরকার, রিক্রুটিং এজেন্সি এবং কর্মী একসঙ্গে এই সুযোগকে সফল করা এবং মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি, সুশৃঙ্খল ও টেকসই শ্রমবাজার গড়ে তোলা।
দেশে ফিরলেন মির্জা আব্বাস
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেছেন। গতকাল বুধবার রাতে তিনি ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।
মির্জা আব্বাসের সহকারী একান্ত সচিব মিজানুর রহমান সোহেল গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মির্জা আব্বাস চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেছেন। তিনি এখন অনেকটাই সুস্থ। এ সময় তার সঙ্গে সহধর্মিণী আফরোজা আব্বাস ও ছেলে মির্জা ইয়াসির আব্বাসও উপস্থিত ছিলেন।
প্রায় পাঁচ মাস সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা শেষে গত ২ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরেছিলেন মির্জা আব্বাস। পরে ১৬ সেপ্টেম্বর ফলোআপ চিকিৎসার জন্য মালয়েশিয়া যান তিনি। দেশটির প্রিন্স কোর্ট মেডিকেল সেন্টারে তার চিকিৎসা চলে।
১১ মার্চ ইফতারের সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন মির্জা আব্বাস। পরে তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের পর ১৫ মার্চ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে দেড় মাস চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে মালয়েশিয়ায় প্রিন্স কোর্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
সৌদি আরবের মক্কায় একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’ এবং মসজিদের ‘পবিত্রতা ও মর্যাদা লঙ্ঘনের’ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। বুধবার মক্কা অঞ্চলে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি হলেন নজরুল ইসলাম আবদুল বশীর ও সিতি আক্তার।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতির বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যম ‘আজেল নিউজ’ এ তথ্য জানিয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কাজে’ লিপ্ত থাকার অভিযোগে নিরাপত্তা বাহিনী তাদের আটক করে। পরে তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ আনা হয়।
বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত তাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। বিবৃতিতে বলা হয়, সময় ও স্থানের পবিত্রতা বিবেচনায় নিয়ে এবং অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় এ রায় দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে রায় চূড়ান্ত হওয়ার পর তা কার্যকর করা হয়। তবে কী ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পবিত্র স্থান ও মসজিদগুলোর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামি আইন বাস্তবায়নে সৌদি সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
পবিত্র স্থানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা বা সেখানে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছে মন্ত্রণালয়।
রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরত আসা ঝিনাইদহের রাজন হোসেন
‘শরীরের একটা অংশ প্রায় অবশ হয়ে ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হওয়ার পর প্রথমে দেড় মাস একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। হাসপাতালটি রাশিয়ার দখলকৃত ইউক্রেনের অংশে পড়েছিল। সেখান থেকে পরে আমাকে রাশিয়ার কাজান শহরের পাশে একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
চিকিৎসাধীন থাকার সময় রাশিয়ান একজন নারী চিকিৎসক আমাকে সেখান থেকে পালাতে সহায়তা করেন; রাশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এর পর দূতাবাসের সহযোগিতায় ট্রাভেল পাস নিয়ে গত ২৩ আগস্ট বাংলাদেশে ফিরেছি।’
গতকাল বুধবার নিজের জীবনের করুণ গল্প শোনালেন রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরত আসা ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের রাজন হোসেন (২২)। ইউক্রেন বাহিনীর ড্রোন হামলায় কোমরের হাড় ভেঙে গেছে। ডান পায়েও চলাচলের শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। রাজন কালীগঞ্জ উপজেলার মালিয়াট ইউনিয়নের গয়েশপুর গ্রামের কৃষক আবদুল কাদের কালুর ছেলে। এখন ক্র্যাচে ভর করে চলাফেরা করতে হয় তাঁকে।
রাজন জানান, ৮ মে বাংলাদেশ থেকে ৩০ জনের একটি টিম রাশিয়ায় যায়। তাদের সেখানে পিআরও টেকনোলজি নামে একটি প্রতিষ্ঠানে মাসে ৭৫ হাজার রুবলের বিনিময়ে কাজ দেওয়ার কথা ছিল। বাংলাদেশি যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাজন বড় স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়ায় যান, তাদের ১০ লাখ টাকা দিয়েছেন। জমি বিক্রি, বন্ধক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার টাকা জোগাড় করে রাজনের পরিবার।
রাজন আরও জানান, যে প্রতিষ্ঠানে কাজ দেওয়ার কথা ছিল, সেই নামে কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। এটি রাশিয়ায় পৌঁছার পর জানতে পারেন। পরে ১৩ মে ইউক্রেনের যে অংশ রাশিয়া দখল করেছে, সে ধরনের একটি এলাকায় নেওয়া হয়। একটি বাঙ্কারে তাদের রাখা হয়। এরপর ২১ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে বাংলাদেশি ৩০ জনের দলকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। একটি ভাগে ছিল ১৬ জন। আরেকটিতে আটজন। অন্যটিতে ছয়জন। রাজন ছিলেন ছয়জনের দলে।
রাজন বলেন, ড্রোন হামলায় আমার দলের মেহেদী, মিন্টু, রিপন ও মামুন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে মিন্টুর গ্রামের বাড়ি যশোর, রিপনের গাজীপুর, মামুনের ময়মনসিংহ ও মেহেদীর ঢাকায়। ১৪ জুন রাজনের ওপর আঘাত হানে ড্রোন। এরপর মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। কোমরের নিচে আঘাত পান। চার দিনে ৪ কিলোমিটার পথ বুকে ভর দিয়ে অতিক্রম করে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেনের অংশে তাদের ক্যাম্পে পৌঁছান। এরপর তাঁকে নেওয়া হয় হাসপাতালে। পরে কাজান শহরের আরেকটি হাসপাতালে তাঁকে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার সময় রাশিয়ান এক ডাক্তার তাঁকে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিয়ে যান।
রাজন আরও জানান, রাশিয়ায় যাওয়ার পরপর তাদের পাসপোর্ট নিয়ে যান রিক্রুটিং এজেন্সির লোকজন। এ কারণে রাশিয়া থেকে তাঁকে ট্রাভেল ভিসা নিয়ে ফিরতে হয়েছে। রাজনের দেওয়া তথ্যানুসারে, ৩০ বাংলাদেশিকে একটি বাসে করে মস্কো থেকে ওয়ারেনবার্গ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হোটেলে তিন থেকে চার দিন রাখার পর ব্যাংককার্ড, সিমকার্ডের কথা বলে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নেয় দালাল চক্রের রাশিয়ান সিন্ডিকেট। পরে কাজের কথা বলে রাজনসহ অন্যদের নিয়ে যাওয়া হয় একটি অজ্ঞাত রুশ সেনাক্যাম্পে। যুদ্ধক্ষেত্রের বিষয়টি টের পেয়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর সদস্যদের কাছে অনেকে আকুতি জানান। এরপরও তাদের যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত করা হয়।
রাজন বলেন, আমাদের দলের ২০ জন মারা গেছেন। এক দিনে মারা গেছেন ১৭ জন। তাদের মধ্যে অনেকের নাম জানা আছে। অনেকের জেলার নামও জানি। আমরা যে তিনটি গ্রপে ভাগ হয়ে যুদ্ধ করেছি, সেটি কাছাকাছি এলাকায় ছিল। একই ব্যাটালিয়নের আওতায় আমরা ছিলাম। আমাদের সবার কাছে ওয়াকিটকি দেওয়া হয়েছিল। সহযোদ্ধাদের লাশ চোখের সামনে পড়ে ছিল।
ব্র্যাকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সাল থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত বৈধভাবে রাশিয়ায় গেছেন আট হাজার ৬১৮ বাংলাদেশি।