ছবি : সংগৃহীত
নেপালের জন্য সাধারণত বর্ষা মৌসুমই বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময়। এ সময় ভারী বৃষ্টিতে দেশটির নদীগুলো ফুলেফেঁপে ওঠে। ‘রান অব দ্য রিভার’ অর্থাৎ নদীর পানি দিয়ে চালিত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে তখন উৎপাদন বাড়ে। যার ফলে নেপাল নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে বিক্রি করতে পারে। আর সেই নদীই এবার হয়ে উঠল বিপর্যয়ের উৎস।
গত ২৬ আগস্ট ভোতে কোশি নদীতে আকস্মিক বন্যায় বন্ধ হয়ে গেছে নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো। যার ফলে নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। রপ্তানিও কমিয়ে ফেলতে হয়েছে দেশটিকে। এ দিকে ভারতীয় গ্রিডের মাধ্যমে সম্প্রতি নেপাল থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া শুরু করেছিল বাংলাদেশ। বন্যায় সেটিও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নেপাল ভারত ও বাংলাদেশে ২ হাজার ৯৩২ কোটি রুপি মূল্যের বিদ্যুৎ রপ্তানি করেছে। একই সময়ে শুষ্ক মৌসুমে ভারত থেকে ১ হাজার ২৩ কোটি রুপি মূল্যের বিদ্যুৎ আমদানি করেছে দেশটি। ফলে বিদ্যুৎ বাণিজ্যে নেপালের নিট উদ্বৃত্ত ছিল ১ হাজার ৯০৯ কোটি রুপি।
বর্ষা মৌসুমে নেপাল গড়ে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করত। এখন তা কমে প্রায় ৬৫০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। শুষ্ক শীত মৌসুমে, বিশেষ করে বছরের পর বছর বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরশীল থাকার পর নেপাল যখন নিজেকে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ রপ্তানিকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, তখন এই বিঘ্ন দেখা দিল।
২২ দশমিক ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ হতো। গত সপ্তাহ থেকে দুটি প্রকল্পের বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।
চিলিমে প্রকল্প থেকে ভারতে ২১ দশমিক ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রির অনুমোদন ছিল। অন্যদিকে ত্রিশূলী প্রকল্পের অনুমোদন ছিল ১৮ দশমিক ৬ মেগাওয়াট। ভারত হয়ে বাংলাদেশেও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমোদন পেয়েছিল নেপাল। আর বাংলাদেশে বিক্রি করা বিদ্যুতের মূল্য ডলারে পায় দেশটি।
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠ বলেন, ‘বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা দুটি প্রকল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই বিকল্প হিসেবে অন্য কোনো প্রকল্পের বিদ্যুৎ পাঠানোর অনুমতি দিতে আমরা ভারতকে অনুরোধ করেছি। বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি কার্যত শূন্য।’
তবে ক্ষয়ক্ষতি শুধু এই দুটি প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ নেই। বন্যার পর থেকে ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সানজেন, আপার সানজেন ও সালাসুঙ্গি প্রকল্পকে ‘আইসোলেটেড মোডে’ রেখেছে নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। এর অর্থ, প্রকল্পগুলো জাতীয় গ্রিডের বাইরে থেকে পরিচালিত হচ্ছে এবং শুধু আশপাশের এলাকার চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।
তবে বিদ্যুৎ রপ্তানিতে বিঘ্ন শুধু বন্যার কারণে হয়নি। যে সময়ে নেপাল সাধারণত ভারতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ বিদ্যুৎ রপ্তানি করে, সেই সময়েও ভারত তিনটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের রপ্তানি অনুমোদন নবায়ন না করায় দেশটি ওই প্রকল্পগুলো থেকে ৭৩ দশমিক ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করতে পারছে না।
৩৮ দশমিক ৮ মেগাওয়াট ক্ষমতার আপার চামেলিয়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের রপ্তানি অনুমোদনের মেয়াদ ৩১ জুন শেষ হয়েছে। তবে তা এখনো নবায়ন করা হয়নি। ২৪ দশমিক ২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সেতি রিভার এবং ১০ দশমিক ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আপার তাদি খোলা প্রকল্পের অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হয়েছে ৩১ জুলাই।
অনুমোদনগুলো নবায়ন না হওয়া পর্যন্ত নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ প্রকল্প তিনটির সম্মিলিত ৭৩ দশমিক ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ভারতে বিক্রি করতে পারবে না। এসব অনুমোদন প্রতি বছর নবায়ন করতে হয়।
ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎ আমদানি ও রপ্তানির অনুমোদন দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা। কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ রপ্তানি করার আগে নেপালকে ওই সংস্থার অনুমোদন নিতে বা বিদ্যমান অনুমোদন নবায়ন করতে হয়।
নেপাল বিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণের চেষ্টা করলেও এই সমস্যাটি দেশটির সামনে থাকা সীমাবদ্ধতাগুলো তুলে ধরে।
এ পর্যন্ত নেপাল ৩৭টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ রপ্তানির জন্য ভারতের অনুমোদন পেয়েছে। এসব প্রকল্পের সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। চিলিমে ও ত্রিশূলীও এসব প্রকল্পের মধ্যে ছিল।
নেপাল ইন্ডিয়ান এনার্জি এক্সচেঞ্জের ডে-অ্যাহেড ও রিয়েল-টাইম বাজারের মাধ্যমে ভারতে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করে। এ ছাড়া ভারতের হরিয়ানা ও বিহার রাজ্যের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মধ্যমেয়াদি বিদ্যুৎ বিক্রয় চুক্তির আওতায়ও বিদ্যুৎ বিক্রি করে দেশটি।
৪০০ কিলোভোল্ট ক্ষমতার ঢালকেবর–মুজাফফরপুর সঞ্চালন লাইন এবং ১৩২ কিলোভোল্ট ক্ষমতার তানকপুর–মহেন্দ্রনগর, কাটাইয়া–কুশাহা, রাকসৌল–পরওয়ানীপুর, গান্ধক–রামনগর ও মাইনাহিয়া–সম্পতিয়া সঞ্চালন লাইনসহ বেশ কয়েকটি সংযোগের মাধ্যমে দুই দেশ বিদ্যুৎ বাণিজ্য করে।
বাংলাদেশের বাজার এই ব্যবস্থায় আরও একটি জটিলতার মাত্রা যোগ করেছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে ঢাকায় নেপাল ও বাংলাদেশের জ্বালানি সচিব পর্যায়ের যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে বিদ্যমান ৪০ মেগাওয়াটের ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি আরও ২০ মেগাওয়াট বাড়াতে দুই দেশ সম্মত হয়েছিল।
প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু করতেও তারা সম্মত হয়। তবে পরে ভারত জানায়, সঞ্চালন সক্ষমতার ঘাটতির কারণে অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করা সম্ভব নয়।
জুনে নেপাল-ভারত জ্বালানি সচিব পর্যায়ের যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে নেপাল আবারও অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন দিতে ভারতের কাছে অনুরোধ জানায়।
৪৫৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার আপার তামা কোশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ অন্যান্য প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদনও চেয়েছে নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। তবে চীনা বিনিয়োগ, চীনা ঠিকাদার অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে চীনা সরঞ্জাম যুক্ত প্রকল্পগুলোর জন্য ভারতের অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে না।
আপার তামা কোশি এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। প্রকল্পটির হাইড্রোমেকানিক্যাল, ইলেকট্রোমেকানিক্যাল ও সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজের চুক্তি ভারতীয় কোম্পানিগুলো পেলেও বেসামরিক নির্মাণকাজ করেছে একটি চীনা কোম্পানি। এ প্রকল্পের বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন এখনো দেয়নি ভারত।
দ্বিপক্ষীয় জ্বালানি বৈঠকগুলোতে নেপাল বারবার বিষয়টি উত্থাপন করেছে।
আনুষ্ঠানিক বিধিনিষেধটি এমন প্রকল্পের বিদ্যুতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেখানে ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত রয়েছে কিন্তু ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ খাত সহযোগিতাবিষয়ক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নেই—এমন তৃতীয় কোনো দেশের বিনিয়োগ রয়েছে। তবে নেপালি কর্মকর্তা ও জ্বালানি খাতের অংশীজনেরা বলছেন, চীনা ঠিকাদার বা চীনা সরঞ্জাম যুক্ত প্রকল্প থেকেও বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন দিতে ভারত অনিচ্ছুক। এমনকি প্রকল্পগুলোতে চীনা বিনিয়োগ না থাকলেও এমন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
তাঁদের যুক্তি, নেপাল যদি বিদ্যুৎ রপ্তানি বাড়াতে চায়, তাহলে কূটনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন হবে।
সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী কুলমান ঘিসিং বলেন, ‘বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন নবায়ন বা নতুন অনুমোদন পেতে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করতে হয়। কখনো কর্মকর্তাদের সঙ্গে, কখনো নির্বাহী পরিচালকের সঙ্গে, আবার কখনো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের মাধ্যমে আলোচনা করতে হয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী আমাদের আলোচনা করতে হবে এবং বিদ্যুৎ বাণিজ্যের অনুমোদন পাওয়া ও নবায়নের বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে।’
ঘিসিং বলেন, তিনি প্রতি ইউনিট ৫ দশমিক ৪৫ ভারতীয় রুপিতে ভারতে ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রির একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু এরপর থেকে নেপাল ওই পরিমাণ বিদ্যুৎ রপ্তানি বাড়াতে পারেনি।
২০২১ সালে নেপাল বিদ্যুৎ রপ্তানি শুরু করার পর এই নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। এর মাধ্যমে এমন একটি দেশের জন্য বড় পরিবর্তন এসেছিল, যে দেশটি আগে ব্যাপকভাবে বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল।
সংগৃহীত ছবি
বাস্তুচ্যুত হয়ে বিদেশে অবস্থান করা নাগরিকদের ‘নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ’ প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মিয়ানমার। আজ বৃহস্পতিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরকারের এই প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়েছে।
তবে ‘রোহিঙ্গা’ নামে দেশটিতে কোনো জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব থাকার কথা অস্বীকার করেছে তারা। মালয়েশিয়া থেকে দেড় হাজার মানুষের আসন্ন প্রত্যাবাসন নিয়ে জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশের পর মিয়ানমার সরকার থেকে এই প্রতিশ্রুতির কথা জানানো হলো।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবারও বলেছে, তারা নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুদের নিজেদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, এ কারণে দেশে ফেরানোর রোহিঙ্গারা আবারও বিপদে পড়তে পারে।
জুলাই মাসে মালয়েশিয়া জানিয়েছিল, মিয়ানমার পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে মিয়ানমারে এই গোষ্ঠীটি চরম সহিংসতা ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে।
দুই দেশই জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে প্রথম ধাপে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরবে মিয়ানমারের প্রায় দেড় হাজার নাগরিক। তবে এর মধ্যে কতজন রোহিঙ্গা থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘যাচাই-বাছাই করা বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে স্বেচ্ছায় দেশে ফেরা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ও বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে মিয়ানমার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
২০১৭ সালে শুরু হওয়া সামরিক বাহিনীর দমনপীড়নের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে যায়। এর ভিত্তিতেই আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) একটি গণহত্যার মামলা চলছে। সীমান্ত পেরিয়ে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থীশিবিরে বসবাস করছে। তবে তাদের দেশে ফেরানোর আলোচনা খুব সামান্যই এগিয়েছে।
এর বাইরে আরও ১ লাখ ২৬ হাজার রোহিঙ্গা মালয়েশিয়ায় বাস করছে। সেখানে মিয়ানমারের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুত নাগরিকেরাও রয়েছে। মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের আলাদা কোনো ঐতিহ্য থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসীদের বংশধর। এমনকি তারা ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করতেও রাজি নয়।
আজ বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবারও তাদের সেই পুরোনো দাবি তুলে ধরেছে। তারা বলেছে, ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি দিয়ে এমন এক জাতিগত পরিচয়ের মিথ্যা দাবি করা হয়, যার অস্তিত্ব মিয়ানমারে কখনোই ছিল না। এ ছাড়া সম্প্রতি কয়েকটি দেশে ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস’ পালনেরও নিন্দা জানিয়েছে তারা।
মালয়েশিয়ার যোগাযোগমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিল বলেছেন, দেশে ফিরলে ‘যদি নির্যাতনের শিকার হতে হয় বা জীবনের ঝুঁকি থাকে’, তবে মিয়ানমারের নাগরিকদের ফেরত পাঠাবে না তাঁর দেশ।
কিন্তু অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, যেই দেশে রোহিঙ্গাদের পরিচয়ই মুছে ফেলা হয়েছে, সেখানে তাদের ফেরত পাঠালে নতুন করে আবার নির্যাতনের পথ তৈরি হবে।
গতকাল বুধবার জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছা, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের মতো পরিবেশ বর্তমানে (মিয়ানমারে) নেই।’
মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অনেক অভিবাসীকে আটককেন্দ্রে (ডিটেনশন সেন্টার) আটকে রাখা হয়েছে। তাই দেশে ফেরার সিদ্ধান্তটি তারা স্বাধীনভাবে নিতে পারছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জোহরান মামদানি
শিশুদের শিক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহর। বুধবার শহরের মেয়র জোহরান মামদানি এক বছরের জন্য এই নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় এই স্কুল বোর্ডের নেওয়া সিদ্ধান্তটি সারা দেশেই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার প্রভাব পড়বে পাবলিক স্কুলের প্রায় ৬ লাখ শিক্ষার্থীর ওপর। তবে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এআই ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ হলেও হাইস্কুলের শিক্ষার্থীরা (যাদের বয়স সাধারণত ১৪ বা তার বেশি) সীমিত কিছু পাইলট প্রোগ্রামে এটি ব্যবহারের সুযোগ পাবে এবং তাদের বছরে দুবার এআই সাক্ষরতা ক্লাস করানো হবে।
বিশেষভাবে মানসিক সহায়তার জন্য ডিজাইন করা কম্প্যানিয়ন চ্যাটবটগুলো সব গ্রেডেই (শ্রেণি) নিষিদ্ধ থাকবে।
এক বিবৃতিতে মেয়র জোহরান মামদানি বলেন, ‘প্রযুক্তি শিল্প আমাদের এটা বিশ্বাস করাতে চায় যে, এআই-চালিত প্রারম্ভিক শিক্ষা (আর্লি এডুকেশন) কেবল অনিবার্যই নয়, বরং প্রয়োজনীয়। আমরা বিষয়টিকে সেভাবে দেখি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিখতে এবং বেড়ে উঠতে শিশুদের শিক্ষক এবং মানবিক সংযোগের প্রয়োজন। তাদের সহপাঠীদের সাথে দক্ষতা বিকাশ করতে হবে, শিক্ষকদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে এবং নিজেদেরই কঠিন সমস্যাগুলোর মোকাবিলা করতে হবে।’
তবে শিক্ষকরা পাঠ পরিকল্পনা এবং প্রশাসনিক কাজের জন্য এখনও এআই ব্যবহারের অনুমতি পাবেন।
২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষ জুড়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, নির্বাচিত কর্মকর্তা এবং শিল্প বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি টাস্কফোর্স তাদের ফলাফল প্রকাশের আগে এই স্থগিতাদেশের প্রভাব মূল্যায়ন করতে মিলিত হবে।
নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হচুল বুধবার বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি যেন আমাদের শিশুদের এবং তাদের শিক্ষার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়িয়ে বরং তাদের সহায়তা করে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের রয়েছে।
সূত্র: এএফপি
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিসে বন্দুক হামলায় অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন, যাদের মধ্যে তিনজন পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন। পুলিশের গুলিতে সন্দেহভাজন হামলাকারীও নিহত হয়েছেন। এএফপি ও এপির বরাত দিয়ে বৃহস্পতিবার এ খবর প্রকাশ করেছে আলজাজিরা।
পুলিশের মুখপাত্র গ্যারেট পার্টেন জানান, স্থানীয় সময় বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার পর মিনিয়াপোলিসের ডাউনটাউনের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে বন্দুক হামলার খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে যায়। ভবনটির ভেতরে ঢোকার কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশ হতাহতদের দেখতে পায়।
পার্টেন জানান, ঘটনাস্থলেই একজনের মৃত্যু হয়। আহত চারজনকে হাসপাতালে নেওয়া হলে পরে আরও একজন মারা যান।
হাসপাতালে নেওয়া তিন পুলিশ কর্মকর্তার মধ্যে দুজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। হেনেপিন কাউন্টি মেডিকেল সেন্টার জানিয়েছে, তিন পুলিশ কর্মকর্তার অবস্থাই স্থিতিশীল।
সন্দেহভাজন হামলাকারী কীভাবে মারা গেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। হামলার উদ্দেশ্য এবং আহত অন্যদের অবস্থা সম্পর্কেও বিস্তারিত জানা যায়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে মিনিয়াপোলিস কনভেনশন সেন্টারের কাছে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন লক্ষ্য করে পুলিশ সদস্যদের অস্ত্র তাক করে থাকতে দেখা যায়।
মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ডাউনটাউন মিনিয়াপোলিসে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করতে রাজ্য কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে কাজ করছেন।
একই দিন ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের ওয়েনসবোরো শহরের ওয়েস্টউড হিলস এলিমেন্টারি স্কুলেও বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটে। কর্তৃপক্ষ জানায়, ১৯ বছর বয়সী এক বন্দুকধারী স্কুলে জোর করে ঢুকে এক কর্মীকে গুলি করে আহত করার পর আত্মহত্যা করে।
এর আগে রোববার ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের শিকাগো ও নিউ জার্সির ট্রেন্টনে পৃথক বন্দুক হামলায় অন্তত তিনজন নিহত ও ১৮ জন আহত হন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সূত্র: আলজাজিরা
ছবি : সংগৃহীত
প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর সন্তানের ভবিষ্যতের প্রতি মায়ের অদম্য মমতার কাছে হেরে গেছে দারিদ্র্য ও শারীরিক প্রতিকূলতা। মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাতে সাধারণ শাড়ি পরে ও খালি পায়ে ম্যারাথনে দৌড়ে তরুণ প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে প্রথম হয়েছেন ৪৭ বছর বয়সী এক মা। অবিশ্বাস্য এই ঘটনাটি ঘটিয়েছেন ভারতের মহারাষ্ট্রের বিড জেলার আম্বাজোগাই এলাকার বাসিন্দা রমাবাই রণবীর।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় শিক্ষা প্রসারক সংস্থার খোলেশ্বর এডুকেশনাল কমপ্লেক্সের অমৃত মহোৎসব উপলক্ষে ‘অমৃত দৌড়’ নামে একটি ম্যারাথনের আয়োজন করা হয়। ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ চৌক থেকে শুরু হয়ে ভাগ্যনগর চৌকে গিয়ে শেষ হওয়া এই প্রতিযোগিতায় স্থানীয় অসংখ্য তরুণ-তরুণী অংশ নেন।
প্রতিযোগিতার শুরুতেই সাধারণ শাড়ি ও পায়ে সামান্য চপ্পল পরে সবার সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন রমাবাই। তবে বাঁশি বাজার পর দৌড় শুরু করতেই অসমান রাস্তায় বারবার পা থেকে চপ্পল খুলে গিয়ে তার গতি কমে যাচ্ছিল। একমুহূর্ত সময় নষ্ট না করে চপ্পল জোড়া হাতে তুলে নিয়ে পাথর আর রুক্ষ রাস্তায় খালি পায়েই দৌড়াতে থাকেন তিনি। তীক্ষ্ণ পাথর ও শারীরিক ব্যথার তোয়াক্কা না করে সব তরুণ প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে সবার আগে ফিনিশিং লাইন স্পর্শ করেন এই অদম্য মা।
৪৭ বছর বয়সী রমাবাইয়ের এমন জয় দেখে উপস্থিত দর্শক ও আয়োজকরা আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। খালি পায়ে জয়ী হয়ে পুরস্কার হিসেবে পাওয়া ৩ হাজার রুপি সরাসরি মেয়ের পড়াশোনার খরচের জন্য তুলে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। এই কারণেই তার জয় শুধু একটি ম্যারাথন জেতার ঘটনা নয়। মেয়ের শিক্ষার জন্য একজন মায়ের সংকল্প এবং লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে এই দৌড়।
সৌদি আরবে ৭ আগস্ট মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর একসঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। (ছবি-রয়টার্স)
সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান- মুসলিম বিশ্বের এই তিন দেশ সম্প্রতি যে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে, তাতে বাংলাদেশও যোগ দেবে কি না তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। একদিকে সামরিক তাৎপর্য, অন্যদিকে জোটের সম্প্রসারণের চেষ্টা দুটি মিলিয়েই এই চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশেও আগ্রহ আছে। যদিও বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এখানো চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পায়নি।
যদিও চুক্তির ব্যাপারে বাংলাদেশ 'ইতিবাচক অবস্থানে' আছে বলে তিনি জানান। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মক্কা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া কতটা জরুরি? এই প্রশ্ন উঠছে, কারণ মক্কা জোটে যোগ দিলে ভূ-রাজনৈতিক নানা ঝুঁকির কথাও বলছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এই জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের লাভ কী এবং এতে কোনো ঝুঁকি আছে কি-না।
এই জোটের গুরুত্ব কী?
মুসলিম বিশ্বের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ- সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান। সৌদি আরব বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারকদের একটি এবং একইসঙ্গে বড় অর্থনৈতিক শক্তি। তুরস্ক নেটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর অধিকারী। তাদের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি অত্যন্ত উন্নত মানের এবং দেশটির আধুনিক যুদ্ধবিমান, ড্রোন, মিসাইল সমৃদ্ধ শক্তিশালী সেনাবাহিনী রয়েছে। আর মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রশক্তির দেশ পাকিস্তান।
তিনটি দেশ মিলে যে চুক্তি সই করে তার আনুষ্ঠানিক নাম মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। এটা স্বাক্ষরও হয় মুসলিমদের সর্বোচ্চ পবিত্র নগরী মক্কায়। একে এমন একটি জোট হিসেবে দেখা হচ্ছে যেখানে মুসলিম দেশগুলো একত্রিত হচ্ছে। সামরিক জোটের অংশ হিসেবে সামরিক প্রশিক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ব্যয় আর গোয়েন্দা তথ্য আদান প্রদানের ক্ষেত্রে কোন দেশ কতটুকু অবদান রাখবে, তা নিয়ে সব দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা ইঙ্গিতও দিয়েছেন।
ফলে সামরিক তাৎপর্য থাকায় তিনটি দেশের এই যৌথ প্রতিরক্ষা জোট বৈশ্বিক রাজনীতিতে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা তৈরি করে। অনেকেই এটাকে 'মুসলিম নেটো' নামেও ডাকছেন। কারণ, চুক্তি অনুযায়ী স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ঠিক একইরকম ধারা ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধীতায় মার্কিন নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নেটোতেও রয়েছে। ফলে মক্কা জোটের সামরিক উদ্দেশ্য তাৎপর্যপূর্ণ। প্রায় এক বছর ধরে আলোচনার পর গত সাতই অগাস্ট এই চুক্তিতে সই করেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কী বলেছেন?
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমনি ফারহানা মক্কা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন করেন। জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানান, মক্কা প্যাক্টকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে বাংলাদেশ। তবে এ নিয়ে আলোচনা করার সময় এখনো আসেনি। "এতে যোগদান করার বিষয়টি এখানো আসেনি। কারণ এটা নির্ভর করছে যারা এই প্যাক্টের সদস্য, তাদের অভিপ্রায়ের ওপর। তারা যদি অভিপ্রায় প্রকাশ করেন বাংলাদেশকে এই প্যাক্টে নেওয়ার জন্য, তাহলে আমরা নিশ্চয়ই সেটা ইতিবাচকভাবেই বিবেচনা করবো।" মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশ যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ না পেলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট, বাংলাদেশ এতে যোগ দিতে আগ্রহী। "মক্কা প্যাক্ট হচ্ছে বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার একটা ব্যবস্থা এবং এটা আমাদের মুসলিম পরিবারের আভ্যন্তরীণ বিষয়। সুতরাং এটা নিয়ে কারো, অন্যান্যদের উদ্বেগের কোনো অবকাশ নাই," বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। একইসঙ্গে তিনি জানান, যেহেতু এই জোটে বাংলাদেশ যুক্ত হয়নি ফলে এখানে যোগ দিলে কী লাভ হবে সেগুলোও আলোচনা করার সময় এখনো আসেনি।
বাংলাদেশের লাভ কী?
মক্কা প্যাক্ট মূলত প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি। নামেই প্রতিরক্ষা শব্দটি আছে। চুক্তিতেও আলোচনা হচ্ছে মূলত এই জোটের যৌথ সামরিক সক্ষমতা নিয়ে। যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে তুরস্ক ও পাকিস্তান। যৌথ জোটের দেশগুলো সামরিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় থেকে শুরু করে অস্ত্র প্রযুক্তি বিনিময় পর্যন্ত যেতে পারে। জোটের তিনটি দেশের তিন ধরনের সক্ষমতা আছে। যেটা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে।
সৌদি আরবের আছে অঢেল অর্থ, তেল, ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধা এবং রাজনৈতিক শক্তি। তুরস্কের আছে অত্যাধুনিক সামরিক শিল্প, ড্রোন প্রযুক্তি, মিসাইল, সেন্সর, নৌশক্তি এবং ইলেক্ট্রনিক যুদ্ধের সক্ষমতা। আছে উন্নত মানের অস্ত্র প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ। পাকিস্তানের আছে দক্ষ সৈন্য, বিশাল পেশাদার সেনাবাহিনী ও অবকাঠামো, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা এবং পরমাণু অস্ত্র। এই চুক্তির ফলে সৌদি আরবের জন্য আমেরিকার বাইরে অস্ত্র সংগ্রহের নতুন দ্বার খুলে যাচ্ছে। তারা তুরস্ক ও পাকিস্তান থেকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র আমদানি করতে পারবে।
অন্যদিকে তুরস্ক ও পাকিস্তানের দরকার অর্থ। তারা অস্ত্র ও প্রযুক্তি বিক্রি করে সেটা পাবে এবং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নতুন বিনিয়োগ করতে পারবে। এই দেশগুলো যদি নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামরিক সক্ষমতা নিয়ে যৌথভাবে কাজ করে তাহলে সেটা দেশগুলোর জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে। আর এখানেই আসছে বাংলাদেশসহ নতুন দেশগুলো যদি মক্কা জোটে যুক্ত হয়, তাহলে তাদের লাভবান হওয়ার সুযোগ। সেগুলো কী? "এখানে বাংলাদেশের প্রাপ্তির অনেক কিছুই আছে। সেটা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে হতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে পার্টনারশিপ হতে পারে, ইন্টেলিজেন্স বা গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের সম্পর্ক সৃষ্টি হতে পারে যেটা আসলে বড় বড় সামরিক জোটে এধরনের তথ্য আদান-প্রদান হয়ে থাকে," বলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক হাসিব আজিজ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক হাসিব আজিজ আরও বলেন, আমরা তুরস্ক থেকে বায়রাক্তার ড্রোন, আরমার্ড ভেহিকেল এরকম অনেক কিছুই আমদানি করি। এই অংশীদারত্বটা আরো বড় হতে পারে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের একটা সুযোগও আসে যে, তুরস্কের মতো একটা দেশের সঙ্গে আমরা জয়েন্ট কোলাবরেশনে গিয়ে কোনোকিছু উন্নত করতে পারি কি-না, বিশেষত মিলিটারি টেকনোলজির ক্ষেত্রে। এছাড়া এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের নৌপথের কৌশলগত সাপ্লাই চেইনকেও শক্তিশালী করবে।
তিনি বলেন, আপনি যদি ম্যাপ খেয়াল করেন। বঙ্গোপসাগর, তারপর ভারত মহাসগর এবং এরপরে আরব সাগর। সুতরাং আমরা যখন ভারত মহাসগরকে ক্রস করে যাচ্ছি, তখন যদি আমার ওই অঞ্চলে একটা চুক্তি থাকে, তাহলে সেটা আমাদের প্রবেশাধিকারকে অনেক সহজ করে। আমরা ওখান থেকে এলএনজি আনছি, পেট্রোলিয়াম আসে। সুতরাং সেখানকার কোনো একটা সিগনিফিকেন্ট অ্যাক্টরের সঙ্গে যদি সামরিক সম্পর্ক থাকে, সেটা তো আমার বেনিফিটে কাজ করার কথা। এবং একইসঙ্গে এটা আমার ইকোনমিক লাইফ লাইনকেও সাহায্য করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কে অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিনও মনে করেন, মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সমুদ্রে নৌ-চলাচল এবং নিরাপত্তা একটা বড় উদ্দেশ্য। তাছাড়া সৌদি আরবে বহুসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি আছেন। দেশটি বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের একটি প্রধানতম উৎস। সৌদি আরব বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগীও বটে। ফলে চুক্তিতে থাকলে সেটা বাংলাদেশের শ্রমিক পাঠানো থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ সহায়তারও নতুন দ্বার খুলতে পারে।
বাংলাদেশের ঝুঁকি কী?
বাংলাদেশ যদি চুক্তিতে যোগ দেয়, তাহলে ঝুঁকি অনেকগুলোই আছে। প্রথমটিই হচ্ছে, জোটের একটি নির্দিষ্ট নীতি যেখানে বলা হয়েছে, কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে সেটা জোটের বাকি দেশগুলোর উপরও হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে বলা হচ্ছে, নেটোর আদলে এমন কোনো জোটে বাংলাদেশ থাকলে সেটা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করবে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি। মক্কা জোটে পাকিস্তান থাকায় তার প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত শুরু থেকেই এই জোটকে এক ধরনের হুমকি হিসেবেই বিবেচনা করছে। তাছাড়া ভবিষ্যতে ভারত-পাকিস্তান যেকোনো সংঘাতে মক্কা জোটের ভূমিকা কী হবে এবং বাংলাদেশের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয় হচ্ছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্টের ঝুঁকি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় প্রক্সি ফোর্সের সংখ্যা বাড়তে পারে।
মক্কা জোটে যাওয়ার আগে বাংলাদেশের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিন।তিনি বলেন, আমাদের প্রায়োরিটি অনেকগুলো আছে। সেগেুলো মাথায় রেখে আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে যে, আমি একটি সামরিক জোটে জয়েন করতে চাই কি না। একইসঙ্গে আমাকে চিন্তা করতে হবে যে, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের জন্য আমার দক্ষিণ এশিয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ নাকি একটি সামরিক জোটে যোগ দেওয়া বেশি প্রয়োজন। এখানে অবশ্য বিষয়টা এমন না যে, যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে হবে। এখানে দুটোই একইসঙ্গে সম্ভব। কিন্তু চুক্তিতে ডিফেন্স কথাটা যেহেতু আছে এবং ডিফেন্স প্যাক্টের মতো করে এটা চিন্তা করা হচ্ছে, সুতরাং এই এলাকায় এর প্রভাবটাও বিবেচনা করতে হবে।
তার মতে, বাংলাদেশ সবসময় সামরিক জোট থেকে দূরে থাকার নীতি অতীতে দেখিয়েছে। বাংলাদেশ এখনো পর্যন্ত কখনই কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়নি। যদি এখন যোগ দিতে চায় তাহলে সেটা হবে প্রথম। সুতরাং কোনো কিছুতে প্রথম হওয়ার আগে জাতীয় পর্যায়ে এটাকে আলোচনা করা দরকার। এছাড়া জোটে পাকিস্তান থাকায় এই জোট নিয়ে ভারতের সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে।
বাংলাদেশের একজন ভূ-রাজনীতির গবেষক ও বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, বাংলাদেশ এই জোটে যখনই যুক্ত হবে, তখন প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হবে। যেটি একদিক বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকির কারণ হিসেবেও দেখছেন তিনি। তিনি বলছিলেন, এটার তাৎক্ষণিক একটি প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। কারণ তখন ভারত ভাব পারে সে অনিরাপদ। তখনই সে ইসরায়েলে শরণাপন্ন হতে পারে। এই ইস্যুতে তখন ভারতকে সহযোগিতায় আগ্রহী হতে পারে ইসরায়েল। দক্ষিণ এশিয়ায় তৈরি হতে পারে সামরিক উত্তেজনা। এ উত্তেজনায় দক্ষিণ এশিয়ায় প্রক্সি ওয়ার এবং প্রক্সি ফোর্সের সংখ্যা বাড়তে পারে। সেদিক থেকে বাংলাদেশ বাড়তি ঝুঁকিতে থাকবে। সেক্ষেত্রে চুক্তিতে ঝুঁকলেও এক ধরনের ঝুঁকি, না ঝুঁকলেও থাকবে আরেক ধরনের ঝুঁকি।
এছাড়া প্রতিরক্ষামূলক এই জোটে বাংলাদেশের প্রকৃত অর্থে ভূমিকা রাখার সুযোগ কতটা আছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যে কোনো যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর মতো সক্ষমতায় নেই। তাছাড়া বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ কাজে সৌদি আরবে সৈন্য মোতায়েন করতে পারে। এতে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যাবে। কিন্তু সেখানেও সৌদি আরব মূলত পাকিস্তান নির্ভর। তবে বাংলাদেশ জোটে প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত বিষয়ে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক হাসিব আজিজ। তিনি বলেন, আমাদের অনেক বড় একটা ফুটপ্রিন্ট জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে আছে। সেখান থেকে এই জোটে আমরা মূলত প্রশিক্ষণ এবং কমপ্লায়েন্স রিলেটেড বিষয়গুলো অফার করতে পারি। কিন্তু যখন স্পর্শকাতর ওই বিষয়টা সামনে আসে যে, বাংলাদেশ এমন একটা প্যাক্টে জয়েন করে সৈন্য পাঠাবে কি না। এমনটা হলে বড় ধরনের আঞ্চলিক এবং বাইরের বিশ্বে নানা রকম ইমপ্লিকেশন আছে।
এটা ঠিক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একধরনের অসামরিক নীতি রয়েছে। কিন্তু এটাও একটা বাস্তবতা যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের পর আঞ্চলিক বিশেষত, বাণিজ্যিক নৌরুটের নিরাপত্তার ধারণায় বড় পরিবর্তন এসেছে। যেখানে মার্কিন নির্ভরতা কমে যাওয়ায় নিজস্ব নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে। বাংলাদেশ সেই নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ না হয়েই তার অর্থনৈতিক স্বার্থ আদায় করার সুযোগ পেতে থাকবে কি না, সেটাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
মক্কা জোটে থাকলেই কি যুদ্ধের বাধ্যবাধকতা আছে? বিষয়টা মোটেও এরকমও নয়। এখানে দুটি উদাহরণ আছে। প্রথমটি হচ্ছে, একইধরনের একটা প্রতিরক্ষা চুক্তি আছে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে। যেটা স্বাক্ষর হয় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে। কিন্তু এরপর সৌদি আরব ইরানের হামলার মুখে পড়লেও পাকিস্তানকে সৌদি আরবের পক্ষে যুদ্ধ করতে হচ্ছে না। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, বাংলাদেশ নিজেও গত জুলাইয়ে সৌদি আরবের উদ্যোগে একটি সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হয়। যার উদ্দেশ্য হচ্ছে, বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষা করা। কিন্তু বাব আল-মান্দেবে হুতিদের আক্রমণ হলেও বাংলাদেশকে সেখানে যুদ্ধ করতে হয়নি, সৈন্যও পাঠাতে হয়নি।
মক্কা জোট নিয়ে জানতে চাইলে তুরস্কের সমরবিশারদ ও হাসান কালিয়ানকু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক মুরাত আসলান বলেন, এই প্যাক্ট মূলত আত্মরক্ষামূলক চুক্তি। ফলে এই জোটে থাকলেই যে যুদ্ধ করতে হবে, ব্যাপারটা তেমন নয়। আপনি এটাকে যদি শুধু সামরিকভাবে দেখেন তাহলে ভুল হবে। কারণ, এটা আসলে কোনো আক্রমণাত্মক জোট নয়, বরং প্রতিরক্ষামূলক। এই জোটের কোনো নির্দিষ্ট শত্রু দেশ নেই। এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে, জোটের দেশগুলো নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করবে না। এবং তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াবে। একইসঙ্গে মক্কা প্যাক্টকে নেটোর মতো করে এখনই দেখার সুযোগ নেই বলেও মত দেন তিনি।
তিনি বলেন, আমি মনে করি না যে এটা একটা নতুন নেটো। কারণ এখানে নেটোর মতো কোনো কমান্ড স্ট্রাকচার নেই, কোনো সেনাবাহিনীও নেই। তাছাড়া এরকম চুক্তি সৌদি-পাকিস্তানের মধ্যেও রয়েছে। সেখানে আমরা দেখি, সৌদি আরব ইরানের হামলার শিকার হলেও পাকিস্তানকে কিন্তু যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয়নি। তবে হ্যাঁ, চুক্তিতে কী আছে, সেটা আমরা বিস্তারিত জানি না। তিনি মনে করেন, একটা বৃহত্তর জোট হলে এবং সেই জোটের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা থাকলে সেটা অন্য কোনো দেশের হামলাকে এমনিতেই নিরুৎসাহিত করবে।
নেপাল সেনাবাহিনী বন্যাদুর্গত রসুয়া জেলায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে পড়া শত শত শ্রমিককে উদ্ধার করছে।
ফোন বাজছে, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই। মিথু খড়কা প্রতি মুহূর্তেই ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকছেন– কখন ওপাশ থেকে স্বামী কমল খড়কার গলা ভেসে আসে! গত বুধবার সকাল সাড়ে ৮টায় শেষবার ভিডিও কলে স্বামীর সঙ্গে কথা হয়েছিল তাঁর। এর ঠিক দুই ঘণ্টা পরই হিমবাহধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে যায় নেপালের রসুয়া ও নুওয়াকোটের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো।
কাঠমান্ডু পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, নিখোঁজ শত শত কর্মীর তালিকায় আটকা পড়েছে কমলের নাম। মিথুর মতো হাজারো স্বজন এখন সুড়ঙ্গের আঁধার চিরে ভেসে আসা অলৌকিক কোনো সংবাদের অপেক্ষায়। সময়ের সঙ্গে আশার প্রদীপ নিভে এলেও তারা আঁকড়ে ধরে আছেন একটাই বিশ্বাস, ‘শরীর না দেখা পর্যন্ত আশা মরে না।’
প্রলয়ঙ্করী এই বন্যায় নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে প্রাণহানির সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। নেপাল সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সপ্তম দিন মঙ্গলবার পর্যন্ত কেবল নেপালেই ১ হাজার ৫০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং এখনও নিখোঁজ প্রায় চার হাজার মানুষ। অন্যদিকে তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু ও ৫৪৬ জন নিখোঁজের খবর নিশ্চিত করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম। দুই দেশ মিলিয়ে এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৬-এ। নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা সাড়ে চার হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে ৩৯ দেশের ৫৯০ জন বিদেশি রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছেন নেপালের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর শত শত শ্রমিক ও প্রকৌশলী।
সুড়ঙ্গের অন্ধকারে উদ্ধার অভিযান
ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় নির্মাণাধীন ও চালু থাকা বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করা শত শত প্রকৌশলী, কারিগরি কর্মী ও শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন। নেপালের ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, ১১টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্তত ৮৯৮ জন কর্মী এখনও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
বর্তমানে এই উদ্ধার অভিযানের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে সুড়ঙ্গগুলোর ভূগর্ভস্থ পাওয়ার হাউস। রসুয়ার ২১৬ মেগাওয়াট সম্পন্ন উইপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করতেন কাঞ্চনপুরের ২০ বছর বয়সী অনুশ গুরংয়ের বাবা লক্ষ্মণ গুরং। বাবার শেষ অবস্থান নিয়ে একেকজন সহকর্মী একেক কথা বললেও অনুশের বিশ্বাস, বাবা সুড়ঙ্গের ভেতরেই আটকে আছেন। অনুশ বলেন, ‘আমাদের শেষ আশা এখন ওই সুড়ঙ্গের ভেতরেই। যদি সময়মতো সেখানে পৌঁছানো যেত, তবে হয়তো তাঁকে জীবিত পাওয়া যেত।’ প্রকল্পটিতে ২৫৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনও নিখোঁজ ৫৭৬ জনেরও বেশি মানুষ।
একই অবস্থা ৩৭ মেগাওয়াট উইপার ত্রিশূলী-৩বি এবং ১১১ মেগাওয়াট রসুয়াগাধি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে। রসুয়াগাধি প্রকল্পের কোম্পানি সচিব নরনাথ নেউপানে জানান, সেনা সদস্যরা সুড়ঙ্গের সংকীর্ণ পথ ধরে বহুদূর হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ করলেও পাওয়ার হাউসের মাত্র ৭ মিটার আগে গিয়ে পথ সম্পূর্ণ বন্ধ পান। ওই অংশে পৌঁছাতে ভারী ড্রিলিং মেশিন ছাড়া উপায় নেই।
একই সঙ্গে ৬০ মেগাওয়াটের উইপার ত্রিশূলী-৩ এ প্রকল্পের প্রায় ৪ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গের ভেতর পানির লেভেল আর কাদার স্তূপ ঠেলে এগোতে হচ্ছে উদ্ধারকারীদের। সেখানে প্রায় ১২০ মিটার পথ এখনও কাদায় অবরুদ্ধ। স্বজনদের দাবি, পাওয়ার হাউসের ওপরের স্তরে অক্সিজেনের ব্যবস্থা এবং কন্ট্রোল রুম থাকায় সেখানে মানুষের বেঁচে থাকার সুযোগ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সাহায্য
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে নেপাল সেনাবাহিনী ও যৌথ উদ্ধারকারী দল ভারী যন্ত্রপাতি ও এক্সক্যাভেটর নিয়ে সুড়ঙ্গগুলোর পথ পরিষ্কারের কাজ চালাচ্ছে। সাহায্য পাঠিয়েছে প্রতিবেশী দেশ চীন ও ভারত। বিশেষ উদ্ধারকারী দল, জীবন শনাক্তকারী আধুনিক যন্ত্র, ড্রোন এবং ওয়াটার পিউরিফায়ার নিয়ে মাঠে নেমেছে চীনা দল। ৯ জন নিখোঁজ নাগরিককে খুঁজতে ৪৪ সদস্যের দল পাঠাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়াও।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ সামাজিক মাধ্যমে জানান, ১১ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং প্রায় ২৭৯ জন জলবিদ্যুৎ কর্মীকে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ও আশপাশ এলাকা থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এখনও প্রায় ৬৩৯ জন জলবিদ্যুৎ কর্মী সুড়ঙ্গ ও ধ্বংসাবশেষে আটকা পড়ে আছেন।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নেপালকে আজ চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই বিষয়টি শক্তভাবে তুলে ধরার সময় এসেছে।