ছবি : সংগৃহীত
ইতালি থেকে অস্ট্রেলিয়াগামী কান্তাস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ছারপোকার উপদ্রপ দেখা দেওয়ায় ফ্লাইটটি বাতিল করা হয়েছে। সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার পার্থ থেকে রোমগামী প্রায় ১৭ ঘণ্টার ফ্লাইটে বেশ কয়েকজন যাত্রী ছারপোকা কামড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। এ সময় তাদের অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয়। কিন্তু একপর্যায়ে ফ্লাইটে সেই ওষুধের মজুদ ফুরিয়ে যায়।
কান্তাস এয়ারলাইন্সের এক মুখপাত্র জানান, ঘটনার পর বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজটি জীবাণুমুক্ত ও পরিষ্কার করতে সেটির উড্ডয়ন বাতিল করা হয়।
মুখপাত্র বলেন, 'রোম থেকে পার্থগামী শনিবারের ফ্লাইটটি বাতিল করার জন্য আমরা যাত্রীদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। ইকোনমি ক্লাসের কয়েকটি আসনে সমস্যা চিহ্নিত হওয়ার পর আমাদের প্রকৌশলী ও রক্ষণাবেক্ষণ দলকে বিমানটি সম্পূর্ণ পরিষ্কার করার সুযোগ দিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।'
এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত সব যাত্রীকে আবাসন সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাদের বিকল্প ফ্লাইটে বুকিংয়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার (এনএইচএস) ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ছারপোকা এক প্রকার পরজীবী; যা পোশাক, আসবাবপত্র ও বিছানায় বাস করে। এদের কামড়ে চুলকানি বা অস্বস্তি হলেও সাধারণত গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয় না।
ভ্রমণে ছারপোকার কারণে বিশৃঙ্খলা তৈরির ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। দুই সপ্তাহেরও কম সময় আগে ইংল্যান্ডে কয়েকটি 'সাউথইস্টার্ন' ট্রেন সার্ভিস বাতিল হয় ছারপোকার কারণে। ওইসব ট্রেনের চালকরা ড্রাইভিং ক্যাবিনে ছারপোকার উপদ্রবের অভিযোগ জানিয়েছিলেন।
২০১৭ সালে ভ্যাঙ্কুভার থেকে লন্ডনগামী একটি ফ্লাইটে ছারপোকার কামড়ে এক পরিবারের কয়েকজনের শরীরে ক্ষতের সৃষ্টি হয় এবং ফুলে যায়। পরে তাদের কাছে ক্ষমা চায় ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ।
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে চরম নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়েছেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। পরিস্থিতি বিবেচনায় ৪১ বছর বয়সী এই যুবরাজকে কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে বাংকার-সুবিধাসম্পন্ন বিভিন্ন রাজপ্রাসাদে দফায় দফায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ তথ্য জানিয়েছে।
গত শনিবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। গত এক দশকের মধ্যে দেশটির ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় ও রক্তক্ষয়ী হামলা।
ওই হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হন। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের বিমান হামলায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। পাশাপাশি রিয়াদের ‘মক্কা চুক্তি’র মিত্ররাও সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
গত মঙ্গলবার একটি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর থেকে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তাঁর সুরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারা জানান, ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াই তীব্র হওয়ায় তাঁর নিরাপত্তায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। লোকচক্ষুর আড়ালে রেখে বিশেষভাবে বাছাই করা একটি সুদক্ষ নিরাপত্তা দলের তত্ত্বাবধানে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতির বিষয়ে মন্তব্যের জন্য সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
হুতিদের এক মুখপাত্র রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করে স্পষ্ট জানিয়েছেন, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় তাঁদের এ হামলা অব্যাহত থাকবে। গত পাঁচ দিনে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চারবার হামলা চালানো হয়েছে। গত সপ্তাহান্তের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর থেকেই এ বিমানবন্দরটি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
উড়োজাহাজ চলাচলবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘সিরিয়াম’-এর তথ্য অনুযায়ী, এ অচলাবস্থার কারণে রিয়াদ বিমানবন্দরের নির্ধারিত ফ্লাইটের প্রায় ৬০ শতাংশই বাতিল করতে হচ্ছে।
হুতিদের এমন আক্রমণের জবাবে সৌদির জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান বলেছেন, হামলার ভয়াবহতা বিবেচনা করে সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়াও সমপর্যায়ের কঠোর হবে। তবে দেশটির কর্মকর্তারা গোপনে স্বীকার করেছেন যে একের পর এক হামলা ঠেকাতে গিয়ে তাঁদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের (ইন্টারসেপ্টর) মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
এ পরিস্থিতিতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করতে গত মাসে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের নিজের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও এখন বেশ কম।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পর ২০২২ সালে সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে এক ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। কিন্তু গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হলে সেই চুক্তি পুরোপুরি ভেস্তে যায়।
ইয়েমেনের সানা বিমানবন্দর থেকে হুতিদের প্রতিনিধিদের নিয়ে তেহরানগামী ইরানের একটি উড়োজাহাজ উড্ডয়নের চেষ্টার সময় সৌদি বাহিনী গুলি চালিয়েছে-হুতিরা এ অভিযোগ তোলার পরই মূলত এই অঞ্চলে নতুন করে সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে।
ইরান-সমর্থিত হুতিরা এ অঞ্চলে তেহরানের অন্যতম প্রধান ও সুসজ্জিত মিত্র সামরিক শক্তি। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘আরব উপদ্বীপের এ উত্তেজনা বৃদ্ধি নিয়ে তেহরান গভীরভাবে চিন্তিত।’ এ লড়াইয়ের ফলে শুধু ‘ইসরায়েল সরকারই লাভবান হবে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
উত্তেজনা প্রশমনে গত রোববার রাতে সৌদি আরব ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা টেলিফোনে দীর্ঘ আলাপ করেছেন বলে জানা গেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রাজনৈতিক সমাধান উপেক্ষা করে শুধু সামরিক পথে হাঁটার ব্যাপারে রিয়াদকে সতর্ক করেছেন। সেই সঙ্গে রিয়াদ ও হুতিদের মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ শুরু করতে তেহরান সব ধরনের সহযোগিতা করবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে ইয়েমেন সরকারের পক্ষে সৌদি আরব সরাসরি দেশটির গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করার পর থেকেই মূলত হুতিদের সঙ্গে সৌদির এ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা হয়।
ছবি : সংগৃহীত
টানা তৃতীয় দিনের মতো সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা।
ইয়েমেনে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, তাদের বাহিনী হুতিদের ছোড়া আরও একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি রিয়াদ লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল।
গত কয়েক দিনে রিয়াদে একের পর এক হামলা হয়েছে। এসব হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন। হামলার ধাক্কা সামলে ওঠার চেষ্টা করছে রিয়াদ। সৌদি জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানান।
তুর্কি আল-মালিকি বলেন, হুতিরা রিয়াদ লক্ষ্য করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এ ছাড়া সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের দিকে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। তিনি বলেন, তিনটি ক্ষেপণাস্ত্রই ‘শনাক্ত ও ধ্বংস’ করা হয়েছে। এদিকে গত রাতে রিয়াদের বাসিন্দাদের মুঠোফোনে আকাশপথে হামলার আশঙ্কা জানিয়ে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। এর কিছুক্ষণ পরই শহরে কয়েকটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ বেশির ভাগ জনবহুল এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখা হুতিরা জানিয়েছে, তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানান, ইয়েমেনের সীমান্তসংলগ্ন সৌদি আরবের খামিস মুশাইত শহরের একটি সামরিক বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ছোড়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলো ও যাত্রীদের সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনা ও যাতায়াত না করতে আবারও সতর্ক করে দিয়েছেন ইয়াহিয়া সারি। তিনি বলেন, ‘পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনা সতর্কতার বাইরে থাকবে। তবে অন্য শহরের বিমানবন্দরগুলো নিরাপদ নয়।’
নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার খবর এমন সময় পাওয়া গেল, যখন কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ আছে। গত শনিবার বিমানবন্দরটিতে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে অন্তত ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন।
এ ঘটনার পরপর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সব ধরনের কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়। গত রোববার সেখানে আবারও হামলা চালায় হুতিরা। নিহত হন একজন, আহত হন ১১ জন।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী শনিবার পর্যন্ত কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। বিভিন্ন এয়ারলাইনস এরই মধ্যে রিয়াদসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রেখেছে।
হুতিরা বিমানবন্দরের পাশাপাশি সৌদি আরবের বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামোয় একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর সঙ্গে হুতিদের দীর্ঘদিন লড়াই চলছে। এ ছাড়া সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। পাশাপাশি ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিচ্ছে তারা। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সর্বাত্মক হামলাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার মধ্যেই এ সংঘাত নতুন করে জোরালো হয়ে উঠেছে।
রিয়াদে একটি জ্বালানি সম্মেলনে অংশ নিয়ে সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী আবদুল আজিজ বিন সালমান আল সৌদ বলেন, গত সপ্তাহে বিমানবন্দরগুলোতে হামলার ঘটনাগুলো সৌদি আরবের সহনশীলতা ও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতার পরীক্ষা নিয়েছে।
জ্বালানিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো গুরুতর। আমাদের প্রতিক্রিয়াও সমান গুরুত্বের হতে হবে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনীতি বহুমুখীকরণ পরিকল্পনা বা ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখতে হবে। বিনিয়োগও চালিয়ে নিতে হবে।’
নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেন ধারাবাহিক হামলা ঠেকাতে পারেনি, তা তদন্ত করে দেখছে সৌদি আরবের কর্তৃপক্ষ। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে এ তথ্য জানিয়েছেন আঞ্চলিক দুই কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা এ কথা বলেন।
প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, হুতিরা প্রথমে কয়েকটি ড্রোন ছোড়ে। এর মাধ্যমে তারা ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলার পথ পরিষ্কার করে। পরে ক্ষেপণাস্ত্র বিমানবন্দরে আঘাত হানে বলে জানান ওই কর্মকর্তারা।
হুতিদের হাতে এমন সব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলোর ওয়ারহেড মাঝ আকাশে দিক পরিবর্তন করতে পারে। এতে সৌদি আরবের হাতে থাকা প্যাট্রিয়টসহ অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পক্ষে সেগুলো প্রতিহত করা কঠিন।
প্রায় এক হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রিয়াদে পৌঁছালেও কেন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আগেভাগে সতর্কবার্তা দিতে পারেনি—সেই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
সৌদি আরবে হামলার ঘটনায় হুতিদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঝেড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও। তবে তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।
হুতিদের বিষয়ে কী কী করার পরিকল্পনা করছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আসলে হুতিরা খুবই খারাপ আচরণ করছে। এটা মোটেও ভালো না।’
হুতিদের এক কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এ সংঘাতে জড়ালে সেটার পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ইরানকে চীন ও রাশিয়া কোনো সহায়তা করছে বলে বিশ্বাস করেন না যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, ইরানকে সহায়তা করলে চীন ও রাশিয়ার হারানোর ঝুঁকি অনেক বেশি। আর দেশ দুটি এমন কোনো সহায়তা দিলে যুক্তরাষ্ট্র তা দ্রুত জানতে পারবে। সোমবার (১২ অক্টোবর) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এসব কথা বলেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
ট্রাম্প লেখেন, তার সমালোচক ও বিরোধীরা দাবি করছেন, চীন ও রাশিয়া ইরানকে সহায়তা করছে। তবে তিনি মনে করেন, এমন কিছু ঘটলেও তা খুবই সীমিত পর্যায়ে হতে পারে। তার ভাষায়, ‘আমি বিশ্বাস করি না, তারা আদৌ এমনটা করছে।’
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘তাদের হারানোর অনেক কিছু আছে। আর তারা এমন কিছু করলে আমরা তা জানতে পারব, খুব দ্রুতই জানতে পারব।’
গত জুলাইয়েও ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরান যুদ্ধে তেহরানকে সহায়তা না করতে চীন ও রাশিয়াকে সতর্ক করেছেন তিনি। তখন তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, দেশ দুটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে তাদের জন্য তা খুব খারাপ হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে চলমান যুদ্ধ শুরু হয়। এর জবাবে ইরান ইসরাইল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকা দেশগুলোতে হামলা চালায়। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানে এবং লেবাননে ইসরাইলি হামলায় হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন লাখ লাখ মানুষ।
এর আগে ইরান যুদ্ধের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ‘নিরপেক্ষ’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন ট্রাম্প।
চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিন্দা জানিয়েছে বেইজিং। দেশটির মতে, তেহরানের ওপর ওয়াশিংটনের হামলা ইরানের সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
অন্যদিকে, মস্কো সতর্ক করে বলেছে, ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গত মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ওয়াশিংটন সফরের সময় ট্রাম্প তাকে ইরানকে সহায়তা না করার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন বলে জানিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত। সে সময় চীন এ ধরনের সহায়তা দেবে না বলে আশ্বাস দিয়েছিল বলেও জানান তিনি।
এর আগে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, চীন ইরানকে কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহ করেছে এবং চীনের সহায়তায় ইরান তেল বিক্রির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পেয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরে এমন একটি প্রতিবেদনও নাকচ করেছিলেন ট্রাম্প, যেখানে বলা হয়েছিল, জুলাইয়ে জর্ডানে মার্কিন সেনাদের একটি ঘাঁটিতে হামলার আগে চীনা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ওই ঘাঁটির স্যাটেলাইট চিত্র সংগ্রহ করেছিল ইরান। ওই হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হন।
ছবি : সংগৃহীত
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে নতুন করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিরা। একই সঙ্গে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত খামিস মুশাইতের কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার কথাও জানিয়েছে গোষ্ঠীটি। তবে হামলার সাফল্য নিয়ে হুথিদের দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য এখানে নেই।
এদিকে, সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, রিয়াদ অভিমুখে ছোড়া হুথিদের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এ তথ্য জানান।
অন্যদিকে, সৌদি কর্তৃপক্ষ সাম্প্রতিক হামলাগুলো নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। কেন দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আগেভাগে হামলার সতর্কবার্তা দিতে পারেনি, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সৌদি কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) এ তথ্য জানিয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন এক হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে রিয়াদে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলার ঘটনা দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং এর জেরে আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
কারা এই হুথি?
হুথিরা ইয়েমেনের একটি সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন। দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহেও প্রভাব ফেলেছে গোষ্ঠীটি।
১৯৯০-এর দশকে উত্তর ইয়েমেনে জায়েদি শিয়া সম্প্রদায়ের পুনর্জাগরণ আন্দোলন হিসেবে হুথিদের উত্থান ঘটে। একসময় এই সম্প্রদায় ইয়েমেন শাসন করলেও পরবর্তী সময়ে তাদের ঐতিহাসিক আবাসভূমি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক হয়ে যায়।
প্রথম দিকে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে একাধিক গেরিলা যুদ্ধে জড়ায় হুথিরা। প্রতিবেশী সুন্নি-অধ্যুষিত সৌদি আরবের সঙ্গেও তাদের সীমান্ত সংঘর্ষ হয়।
২০১১ সালে আব বসন্তের গণবিক্ষোভের মধ্যে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর উত্তর ইয়েমেনে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে হুথিরা। উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থনে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়াও তারা প্রত্যাখ্যান করে। এ সময় ইরানের সমর্থন নিয়ে গোষ্ঠীটির নেতা আবদুল মালিক আল-হুথি তাদের যোদ্ধাদের একটি বড় সশস্ত্র বাহিনীতে রূপান্তর করেন।
২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দক্ষিণাঞ্চলের এডেনে সরে যেতে বাধ্য হয়।
হুথিদের নিজেদের সংগঠনের নাম ‘আনসার আল্লাহ’, যার অর্থ ‘আল্লাহর সাহায্যকারী’। তবে প্রতিষ্ঠাতা নেতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুথির নাম থেকেই গোষ্ঠীটি ‘হুথি আন্দোলন’ নামে পরিচিতি পায়।
সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাত কেন?
ইয়েমেনে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় অস্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল সৌদি আরব। এ কারণে ২০১৫ সালের শুরুতে হুথিদের হটিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার পুনর্বহাল এবং রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিক অভিযান শুরু করে।
কিন্তু সেই অভিযান ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ জোটের সদস্যদেশগুলোর বিমান হামলা এবং বিভিন্ন পক্ষের সংঘর্ষে দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়।
ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে কোনো পক্ষই চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। হুথিরা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে, যেখানে দেশটির অধিকাংশ মানুষ বসবাস করেন।
এ সময় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ায় গোষ্ঠীটি। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করেও হামলা চালায় তারা।
দীর্ঘ সংঘাতের পর জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালে ইয়েমেনের যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আবারও উত্তেজনা বেড়েছে।
লোহিত সাগরে হামলা, বিশ্ববাণিজ্যে চাপ
২০২৩ সালের নভেম্বরে ইসরাইলের গাজা যুদ্ধের প্রতিবাদ এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থনের কথা জানিয়ে লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা শুরু করে হুথিরা। একই সঙ্গে ইসরাইল লক্ষ্য করেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় তারা।
পরবর্তী সময়ে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে হুথিদের হামলা আবারও বাড়ে। ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটালে সৌদি আরবকে লোহিত সাগরের বন্দর এবং বাব আল-মানদেব প্রণালির মাধ্যমে তেল রপ্তানির ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়।
এতে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে হুথিরা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ এবং মোখা বন্দর শহর দখল করে। বাব আল-মানদেব প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো এবং ইরানকে সহায়তা করার লক্ষ্যেই তারা এ পদক্ষেপ নেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবের আশপাশের নৌপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পথে চলাচল ব্যাহত হলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহণকারী জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে পরিবহণ ব্যয় ও সময় বাড়ে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে সৌদি আরবের গুরুত্ব
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব। দেশটির জ্বালানি খাত অর্থনীতির প্রধান ভিত্তিগুলোর একটি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বে মোট তেল উৎপাদনের প্রায় ১১ শতাংশ সৌদি আরব থেকে আসে। দেশটির কাছে বিশ্বের প্রমাণিত তেল মজুতের আনুমানিক ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ রয়েছে। সৌদি আরবের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় অর্ধেক এবং রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে তেল ও গ্যাস খাত থেকে।
ফলে দেশটির তেল স্থাপনা, বন্দর ও পরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের হামলা হলে তার প্রভাব শুধু সৌদি অর্থনীতিতে নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।
কতটা শক্তিশালী হুথিরা?
ইয়েমেনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে হুথিরা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় দেশটির প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ বসবাস করেন।
২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদনে হুথিদের সশস্ত্র সদস্যসংখ্যা এক লাখ ৮০ হাজার থেকে দুই লাখ বলে অনুমান করা হয়েছিল। তাদের অস্ত্রভান্ডারে ট্যাংক, সাঁজোয়া ও অন্যান্য সামরিক যান, ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ইয়েমেনের বাইরেও দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম। ইসরাইলে পর্যন্ত হামলা চালানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে গোষ্ঠীটি। সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনাও তাদের সামরিক সক্ষমতার পরিচয় দেয়।
এ ছাড়া ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থান হুথিদের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করেছে। বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছাকাছি অবস্থানের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ রয়েছে তাদের।
ইরানের সঙ্গে হুথিদের সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ?
ইরান মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ নামে পরিচিত আঞ্চলিক বলয়ের অংশ হিসেবে হুথিদের সমর্থন করে। এই বলয়ের অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের কয়েকটি শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী।
তবে হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের ধরন হিজবুল্লাহ বা ইরাকের ওই গোষ্ঠীগুলোর সম্পর্কের মতো পুরোপুরি এক নয়। হুথিরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে নিজেদের চূড়ান্ত ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকার করে না। তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকাণ্ডে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান হুথিদের অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করে এবং এ কাজে হিজবুল্লাহও ভূমিকা রাখে। তবে হুথিরা নিজেদের ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন গোষ্ঠী হিসেবে বর্ণনা করার বিরোধিতা করে। তাদের দাবি, তারা নিজেরাই অস্ত্র তৈরি করে।
হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো কঠিন কেন?
হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল ও বিস্তীর্ণ মরুভূমি তাদের লুকিয়ে থাকা এবং অবস্থান পরিবর্তনের সুযোগ করে দেয়।
দ্বিতীয়ত, তাদের হাতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে তারা। হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হলেও তাদের সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত করা সম্ভব হয়নি।
তৃতীয়ত, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে হুথিরা বিভিন্ন গতি ও ধরনের ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহার করে। এতে হামলা শনাক্ত করা এবং সব অস্ত্র প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাদের উন্নত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘প্যালেস্টাইন-২’, যা দুই ধাপের কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র এবং এতে হাইপারসনিক সক্ষমতা রয়েছে বলে দাবি করা হয়। এ ছাড়া ‘তুফান’ ক্ষেপণাস্ত্রটিকে ইরানের ‘ঘাদর’ ক্ষেপণাস্ত্রের পরিবর্তিত নাম বলে ধারণা করা হয়।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনের বরাতে আরও বলা হয়েছে, হুথিদের হাতে ‘বুরকান’ ও ‘বদর’ সিরিজের স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে, যেগুলোর উৎস ইরান বলে মনে করা হয়।
ছবি : সংগৃহীত
সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ইয়েমেনি গোষ্ঠী হুতিদের হামলার ঘটনায় ঢাকা থেকে রিয়াদ, দাম্মাম ও জেদ্দাগামী ফ্লাইট একের পর এক বাতিল হচ্ছে। গত শনিবার থেকে আগামী ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত এ তিন পথে বিভিন্ন এয়ারলাইন্স মোট ৫১টি ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে।
ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও ফ্লাইট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা আজ সোমবার বিকালে বলেন, এখন পর্যন্ত এসব ফ্লাইট বাতিল ঘোষণা করেছে এয়ারলাইন্সগুলো। এর মধ্যে তারা আরও ফ্লাইট বাতিল ঘোষণা করলে তখনই তা জানানো হবে।
ইতোমধ্যে বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর পাঁচ হাজার ৪১৮ জন যাত্রী বাংলাদেশে আটকা পড়েছেন বলে জানান তিনি।
সরাসরি চলাচলকারী যেসব ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে বিমানের চারটি, ইউএস-বাংলার দুটি এবং রিয়াদ এয়ার ও সৌদিয়ার তিনটি করে ফ্লাইট।
এছাড়া ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে, যার মধ্যে আছে ইনডিগোর ১৬টি, সালামএয়ারের ৩টি, ইজিপ্টএয়ারের ১টি, এমিরেটসের ৯টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৫টি এবং ফ্লাইদুবাইয়ের ৫টি।
গত শনিবার রিয়াদে বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৩ নম্বর টার্মিনালের ওপর একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণ হয়। এতে দুই বাংলাদেশিসহ ১৩ জন নিহত হন, আহত হন ৩০৮ জন।
নিহত অন্যদের মধ্যে সৌদি আরবের চারজন এবং ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিশরের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। এ ঘটনার রেশ না কাটতেই রোববার ফের বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে নিশানা করে হুতিরা। তাতে এক প্রবাসী পাকিস্তানি নিহত হওয়ার পাশাপাশি ১১ ব্যক্তি আহত হয়েছেন।
হুতিরা জানিয়েছে, তারা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহার করে বিমানবন্দরটিকে নিশানা করেছে।
গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি বলেন, পূর্ব সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও দাম্মাম বিমানবন্দরেও হামলা চালানো হয়েছে।
পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনার বিমানবন্দর ছাড়া সৌদি আরবের সব বিমানবন্দরই সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু বলে সতর্ক করেছেন ইয়াহিয়া সারি।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেন সরকারের মধ্যে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। দুই দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর ওই বছরের ২ অক্টোবর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়।
যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে
দিল্লিতে বিক্ষোভ-সমাবেশের নির্ধারিত স্থান হিসেবে আর থাকছে না ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর। এর পরিবর্তে রাজধানীতে বিক্ষোভ আয়োজনের জন্য তিনটি বিকল্প স্থান নির্ধারণ করেছে দিল্লি পুলিশ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গতকাল রোববার দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নির্দেশিকা জারি করা হয়। তবে নির্দেশিকাটি প্রকাশ্যে আসে আজ সোমবার। দিল্লির পুলিশ কমিশনার অনুরাগ কুমারের জারি করা নির্দেশনায় যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। নতুন নির্ধারিত স্থানগুলো হলো রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান ও সিবিডি ময়দান। এসব স্থানে বিক্ষোভ-সমাবেশ আয়োজনের জন্য কীভাবে অনুমতি নিতে হবে, সে বিষয়ে পরে বিস্তারিত নির্দেশনা প্রকাশ করা হবে।
২০২২ সালের ২৮ এপ্রিল জারি করা পুরোনো নির্দেশনায় সংশোধন এনে নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
দিল্লির রাজনীতিতে যন্তর মন্তর দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদ ও আন্দোলনের পরিচিত কেন্দ্র। সংসদ ভবন, রাষ্ট্রপতি ভবন এবং নর্থ ব্লক ও সাউথ ব্লকসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের কাছাকাছি হওয়ায় এলাকাটি প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এ অবস্থায় সেন্ট্রাল দিল্লিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও জনসমাগম সামাল দেওয়ার লক্ষ্যেই বিক্ষোভের স্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নীতির প্রতিবাদে রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে দিল্লিতে উত্তেজনা চলছে। আজ সোমবার ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) তিন শীর্ষ নেতা-নেত্রী শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির অনুমতি চাইতে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় যান।
এ ঘটনার মধ্যেই বিক্ষোভের স্থান পরিবর্তনের নির্দেশিকা সামনে আসে। পরে সিজেপির প্রধান অভিজিৎ দিপকে বলেন, ‘এবার পুরো দেশই যন্তর মন্তর হবে।’